মরণ বিলাস
আহমদ ছফার
মরণ বিলাস আহমদ ছফার একটি মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক উপন্যাস। তবে আমার কাছে উপন্যাসটি যতটা না রাজনৈতিক তার চেয়ে বেশি মনস্তাত্ত্বিক। নষ্টসময়ের রাজনীতিতে একজন নষ্টরাজনীতিকের রাজনৈতিক সামাজিকায়ন অথবা পেশাদার রাজনীতিক হয়ে ওঠার এক অনবদ্য বর্ণনা-এ উপন্যাসটি। আকারে ছোট, মাত্র ৮৬ পৃষ্ঠার এক সুখপাঠ্য উপন্যাস। “মরণ বিলাস” আমার পড়া উপন্যাসগুলোর মধ্যে খুবই বিশিষ্ট একটি রচনা। উপন্যাসটি রচিত হয় ১৯৮৮ সালে, এবং পরের বছরই সেটি প্রকাশিত হয়।
আমি কেন মরণবিলাসকে মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস মনে করি?
মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের প্রধান আশ্রয় পাত্র-পাত্রীর মনোজগতের ঘাত-সংঘাত ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া; চরিত্রের অন্তর্জগতের জটিল রহস্য উদঘাটন ঔপন্যাসিকের প্রধান লক্ষ্য। আবার সামাজিক উপন্যাস ও মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস এর নৈকট্য লক্ষ করা যায়। সামাজিক উপন্যাসের যেমন মনস্তাত্ত্বিক ঘাত-প্রতিঘাত থাকতে পারে, তেমনি মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের সামাজিক ঘাত-প্রতিঘাত থাকতে পারে। মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের কাহিনী অবলম্বন মাত্র, প্রকৃত উদ্দেশ্য থাকে মানবমনের জটিল দিকগুলো সার্থক বিশ্লেষণের মাধ্যমে উপস্থাপন করা। বিশ্বসাহিত্যে ফরাসি লেখক গুস্তাভ ফ্লবেয়ার লিখিত ‘মাদাম বোভারি', রুশ লেখক দস্তয়ভস্কি লিখিত ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট' এবং বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি', চতুরঙ্গ', সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘চাদের অমাবস্যা’ 'কাঁদো নদী কাঁদো' মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের উজ্জ্বল উদাহরণ। যা এই উপন্যাসেও প্রকাশ পায় তাই এটিকে আমার কাছে মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস বলে মনে হয়েছে ।
বাংলাসাহিত্যে এ পর্যন্ত যত প্রাবন্ধিক, লেখক এবং সাহিত্যিক জন্মগ্রহণ করেছেন তাদের মধ্যে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে সাহসী, বুদ্ধিমান, কুশলী, বহুমুখী এবং তেজদীপ্ত লেখকদের তালিকায় একটি নাম জ্বলজ্বল করবে, নামটি “আহমদ ছফা”। মননশীল এবং সত্যসমৃদ্ধ স্পষ্টবাদী সাহিত্যক আহমদ ছফা ছিলেন সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী কণ্ঠ এবং আদর্শনিষ্ঠ-প্রগতিপন্থী একজন গণবুদ্ধিজীবী। নতুন নতুন বিষয় অনুসন্ধান করা তার সাহিত্যের প্রকৃতিজাত স্বভাব।তার উপন্যাসের ভেতর দিয়ে তিনি মানুষের জীবনের-মনস্তত্ত্বের ভাল-খারাপ নানান বিষয়ের আলোকপাত করেছেন খুবই সহজ-সরল ভাষায়।
উপন্যাসের মূল চরিত্র জনাব ফজলে ইলাহি, তিনি দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, যিনি কিনা এক সময়ে পাকিস্তান আমলেও মন্ত্রী ছিলেন এবং ক্রমাগত ভোল পাল্টে মন্ত্রিত্ব বহাল রেখেছেন স্বাধীন বাংলাদেশেও। তিনি মৃত্যুপথযাত্রী, বুঝতে পারছেন ভয়াবহ ক্যান্সারে তিনি মৃত্যুর দিকে ক্রমাগত এগুচ্ছেন। মৃত্যু শয্যায় তিনি দেখতে পাচ্ছেন ইতিপূর্বে করা তার সকল অপকর্ম তার দিকে যেন তেড়ে আসছে, আর মৃত্যুর আগে শেষ সময়টুকু তিনি কাউকে অপকর্মের কথা বলে হালকা হতে চাইছেন। রোগীর সাথে রাতে থাকেন মাওলা বক্স নামক মেরুদণ্ডহীন তোষামুদে এক ব্যক্তি, হাসপাতালে শুয়েশুয়ে যার কাছে মন্ত্রীসাহেব তার অতীতস্মৃতিচারণ করছেন।
ফজলে ইলাহী মূলত তার জীবনের তিনটি বিশেষ ঘটনা বর্ণনা করেন মাওলা বক্সের কাছে। কাম, লালসা, ঘৃণা আর অবিবেচনার মোড়কে আবৃত এই ঘটনাগুলো যেন মানব জীবনের চিরন্তন কদর্যতারই প্রতীক। প্রতিটি পাপকেই ফজলে ইলাহী পাশ কাটিয়ে এসেছেন, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, জীবনে খ্যাতি ও প্রতিপত্তি অর্জন করেছেন, কিন্তু জীবন সায়াহ্নে এসে তার সকল অর্জনের নিষ্ফলতা তার সামনে প্রকট। ছফা অতি সন্তর্পণে কথোপকথনের ছলে কাহিনী প্রবাহ এগিয়ে নিয়েছেন
উপমহাদেশের দ্বি-মেরুকৃত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে হিন্দু মধ্যবিত্তের নাক সিটকানো, আর পশ্চাৎপদ মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমানের হীনমন্যতা কিভাবে সাম্প্রদায়িকতার জন্ম দেয়, সদ্ভাবপূর্ণ দুটি সম্প্রদায়কে কিভাবে ঠেলে দেয় রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের দিকে, তার তাৎপর্যময় বর্ণনা করেছেন আহমদ ছফা।
অনেক পাপ, অনেক হত্যার দায়ভার তার উপর, কিন্তু দেশভাগের দাঙ্গার সময় নিঃস্বার্থ ভাবে জীবন বাজি রেখে একটি কিশোরকে বাঁচানোর স্মৃতি তাকে নিজের ভিতরকার মানুষটিকে অনুভব করায়–“আমার পাপ কর্মগুলো আমাকে গ্রেপ্তার করার জন্য উন্মত্ত আবেগে উদ্বাহু নৃত্য করছে। কিন্তু কাছে ঘেষতে পারছে না। কিশোরটি আমাকে রক্ষা করছে। মাওলা বক্স,আমার মানবজন্ম বৃথা যায়নি। আমারও কিছু সুকৃতি আছে। আমি উদ্ধার পেয়ে যাবো।” হয়তো তাই..আলোর একটি শিখা অনেকখানি অন্ধকার মুছে দেয়–কে না জানে সে কথা!এভাবে, নাতিদীর্ঘ, তবে সুখপাঠ্য উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র ফজলে ইলাহির জবানের মাধ্যমে আহমদ ছফা মানুষের জীবনের উত্থান-পতন, চড়াই-উৎরাইসহ নানা বিষয়ের যে শৈল্পিক বর্ণনা দিয়েছেন, বোধ করি পাঠককে তা নিরাশ করবেনা মোটেই !
মরণ বিলাস’ এর ছফা ঘোর আশাবাদী। মানুষ ও মানুষের জীবন নিয়ে তার দৃপ্ত আশাবাদই মূলত ব্যক্ত হয়েছে এই বইটিতে। তিনি মানুষের প্রগতিতে ও চিরন্তন সম্ভাবনায় বিশ্বাস স্থাপন করেছেন। ফজলে ইলাহীর মতো মানুষরা মৃত্যুর পরে স্বর্গে যায় নাকি নরকে, সে প্রশ্ন উহ্যই থাক। জীবিতাবস্থায় স্বর্গ আর নরকের সহাবস্থানে মানুষের আস্ফালন, পথ নির্ধারণ আর, স্বাধীন ইচ্ছার সঠিক ব্যবহার আর সর্বোপরি এক চিরন্তন অপার সম্ভাবনার মধ্যে দিয়েই মানবজীবন মহিমাময় হয়ে ওঠে। আর তাই মানবজীবন তথা মানুষ সম্পর্কে সংকীর্ণ ধারণা পোষণ করার পক্ষপাতী ছফা নয়।
আহমদ ছফা তার সূক্ষ্ম জীবনবোধ ও মানব দর্শন প্রকাশ করেছেন ‘মরণ বিলাস’-এ। মানুষের জীবনের প্রকৃত অবয়বটি চূড়ান্ত বাস্তববাদিতার সাথে ফুটিয়ে তুলে পাঠককে তিনি ভাবিয়েছেন; যারা আগেও ভেবেছেন, তাদের আরও আরেকবার ভেবে দেখার আগ্রহ জাগিয়েছেন। একইসাথে তিনি সাম্প্রদায়িকতা, পশ্চাৎপ্রদতা, প্রভূত রিপু ও মানবীয় সীমাবদ্ধতাসমূহ অবজ্ঞা করে মানুষ হিসেবে আমাদের যে অপার সম্ভাবনা, তাকে জড়িয়ে ধরার আহবান জানিয়েছেন। নিঃসন্দেহে ‘মরণ বিলাস’ আহমদ ছফার শ্রেষ্ঠতম কীর্তিগুলোর একটি। ভাবতে ভালোবাসেন এমন পাঠকদের জন্য এটি আহমদ ছফার এক অনবদ্য উপহার। তাই আর দেরি না করে পড়ে ফেলুন এই উপন্যাসটি...