"অন্যান্য জগতের অস্তিত্ব অবশ্যই আছে, কিন্তু সেই জগৎগুলো আছে এই জগতের মধ্যেই।"— ফরাসি কবি পল অ্যালার্ড-এর এই কথাটি দিয়েই লেখক নিজের বক্তব্য শুরু করেছেন বইয়ের গোড়ায়। সত্যি কথা বলতে কি, আলোচ্য বইটি এই ভাবনারই এক অনন্য উদ্যাপন। এই বইয়ে স্থান পাওয়া উপন্যাসগুলো বিন্দুতে সিন্ধুর মতো করে আমাদের চেনা-জানা পৃথিবীর 'একটু অন্যরকম' চেহারাতেই ফুটিয়ে তুলেছে এমন কিছু সম্ভাবনা যা আমাদের স্তব্ধবাক করে দেয়। এই 'একটু অন্যরকম'-এর অন্বেষণে এরা ধেয়ে গেছে অতীত থেকে ভবিষ্যতে। কোনো গল্পে ঘটনার আবর্ত রচিত হয়েছে কোনো 'মানুষী' সিদ্ধান্ত বা প্রবৃত্তির চারপাশে, কোথাও নির্ণায়ক হয়ে উঠেছে সময়, আবার কোথাও সবকিছুর মধ্যে স্পন্দিত হয়েছে কিছু সম্ভাবনা— যাদের আমরা অলৌকিক, অপার্থিব... বা এমন কিছুও বলতে পারি। সবটা কেমন ঘেঁটে যাচ্ছে, তাই না? আচ্ছা, বেশ। একটা সুসংহত রিভিউ লেখার চেষ্টা করি বরং। 'লেখকের বয়ান'-এর পর আমরা পেয়েছি 'অনুবাদকের কলমে'। এতে অনুবাদক স্প্যানিশ কল্পবিজ্ঞানের একটি সংক্ষিপ্ত অথচ তথ্যসমৃদ্ধ রূপরেখা পরিবেশন করেছেন। অ্যাংলো-স্যাক্সন কল্পবিজ্ঞান সম্বন্ধে অনেক কিছু জানলেও স্প্যানিশ সাইফি সম্বন্ধে আমাদের নিঃসীম অজ্ঞতা কিছুটা হলেও কাটিয়েছে ওই ছোট্ট লেখাটি। এরপর এই বইয়ে নিম্নলিখিত ক'টি লেখা স্থান পেয়েছে~ ১) যূথ: ভবিষ্যৎ পৃথিবীর এ এক অনন্য আখ্যান। সেই পৃথিবী থেকে মানুষ মুছে গেছে। অথচ মানবিক আচরণ বলতে আমরা যা কিছু বুঝি, তারা তখনও রয়ে গেছে কারও-কারও মধ্যে! তাদের চোখ দিয়েই শেষ আলোটুকু নিভে যাওয়ার এক সংবেদী, মর্মভেদী আখ্যান এটি। ২) নিষিদ্ধ উদ্যান: কল্পনার উড়ান যখন কল্পবিজ্ঞান আর ফ্যান্টাসির মাঝের সীমায় দাঁড়িয়ে আমাদের অসহায়তা আর সত্যি-না-হওয়া স্বপ্নগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে, তখন কেমন লেখা জন্ম নেয়? এই আখ্যান তারই একটি সার্থক নিদর্শন। ৩) ডার্ক ম্যাটার: রসবোধ, ব্যঙ্গ, বিশ্বাস-অবিশ্বাস আর সম্ভাবনার মিশেলে লেখা একটি রুদ্ধশ্বাস কাহিনি এটি। একে আপনি কল্পবিজ্ঞান বলতে পারেন। আবার একে আপনি বিশুদ্ধ ডার্ক হিউমারও বলতে পারেন; তবে রসিকতাটা আপনার সঙ্গে লেখক করলেন, নাকি অন্য কোনো সত্তা— তাই নিয়ে সংশয় থেকেই যাবে সেক্ষেত্রে। আমার মতে এটি এই বইয়ের সেরা লেখা। ৪) পনেরো নম্বর চাল: দাবাপ্রেমীরা 'দ্য কুইন্স গ্যামবিট' দেখে এতটা খুশি হয়েছিলেন কেন বলুন তো? কারণ দাবা যে আসলে মনের যুদ্ধ— যার ক্ষেত্রটা শুধু বদলে যায় সময়ের সঙ্গে, সেটা ওই সিরিজ দুর্দান্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছিল। ঠিক সেইভাবে, কল্পবিজ্ঞান তথা কল্পগল্প যে আসলে মোড় থেকে ছড়িয়ে যাওয়া অনেকগুলো সম্ভাবনার সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে আমাদের ভাবায়, সেটাই তুলে ধরেছে এই কাহিনি। ৫) বরফের প্রাচীর: এই বইয়ের সবচেয়ে ক্রূর ডিস্টোপিয়ান আখ্যান এটি। এতে বিজ্ঞানের প্রয়োগ এবং বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে তার ভবিষ্যৎ প্রোজেকশন— দুটোই পড়ে স্তম্ভিত ও শিহরিত হতে হয়। এইরকম পাঁচটা লেখা দু'মলাটের মধ্যে পড়তে পাওয়ার সুযোগ বিদেশি, পুরস্কার-সমৃদ্ধ সংকলনেও বড়ো একটা মেলে না। তাই গল্পগুলো বাছাইয়ের জন্য আলাদাভাবে কুর্নিশ ঠুকতে হচ্ছে অনুবাদক ও প্রকাশকের উদ্দেশে। আর অনুবাদের মান? সত্যি বলতে কি, এই লেখাগুলোর অনুবাদ এতটাই স্বচ্ছন্দ যে একটি বারের জন্যও ভাষা, সংস্কৃতি বা সমাজের ব্যবধান লেখকের ও আমাদের মধ্যে অন্তরায় হয়ে ওঠেনি। আমরা এই লেখাগুলোকে সলিড গল্প হিসেবে উপভোগ করতে পেরেছি ষোলোর ওপরে আঠেরো আনা। বইটির ছাপা, বাঁধাই, ভেতরের মিনিমালিস্ট অলংকরণ— সব মিলিয়ে একটিই বিশেষণ মনে আসে। সেটি হল~ আন্তর্জাতিক! যদি আপনি কল্পবিজ্ঞান, ফ্যান্টাসি, বা সামগ্রিকভাবে স্পেকুলেটিভ ফিকশন তথা কল্পকাহিনির অনুরাগী হয়ে থাকেন, তাহলে এই বইটিকে অবশ্যই পড়বেন। আপনার ভালো লাগবে— এই বিশ্বাস আমার আছে। প্রকাশক ও অনুবাদক সেসার মাইয়োর্কি'র আরও লেখা আমাদের কাছে এইভাবে নিয়ে আসুন— এই অনুরোধও করে রাখলাম।
স্প্যানিশ ফুটবল নিয়ে বাঙালির জ্ঞান ও চর্চা থাকলেও স্প্যানিশ লেখনী নিয়ে ধারণা একেবারেই শূন্যের কোঠায়। গল্পপ্রিয় বাঙালির কাছে সেই অভাবটা পূরণের গুরুদায়িত্ব নিয়ে লেখিকা মৌসুমী ঘোষ অনুবাদ করেছেন সুপ্রতিষ্ঠিত স্প্যানিশ সাহিত্যিক সেসার মাইয়োর্কির লেখা পাঁচটি কল্পবিজ্ঞানের গল্প। সরাসরি স্প্যানিশ থেকে বাংলায় অনুবাদ করা শুনতে যতটা কঠিন ঠিক ততটাই পাকা রাঁধুনির মতো সাবলীলভাবে রেঁধেছেন থুড়ি অনুবাদ করেছেন লেখিকা। বইতে রয়েছে সেসার মাইয়োর্কির বেছে দেওয়া পাঁচটি জনপ্রিয় গল্প যা কল্পবিজ্ঞানের মোড়কে নাড়া দেবেই মানুষের মনকে। দুঃখ, হাস্যরস, বুদ্ধি সবকিছুই পাবেন লেখকের কলমে। এবার আসি ৫টি গল্পের সংক্ষিপ্ত বর্ণনায়।
প্রথম গল্প "যূথ"। এই গল্প বিষাদের ছায়ার মাঝেও এক অদ্ভুত ভালো লাগার আবেশ আনে। হঠাৎ করে মানবশূন্য হয়ে যাওয়া পৃথিবীতে তিনটি কুকুর আমৃত্যু কিভাবে ভেড়ার পাল প্রতিপালন করে গেল এবং জিওস্যাট-ডি স্যাটেলাইটটি কিভাবে হারিয়ে যাওয়া মানুষের খোঁজে নিজেকে শেষ করে দিতে প্রস্তুত হলো সেই নিয়েই ওভারপ্রতি চার রানের ইকোনমি রেটে এগিয়েছে গল্প।
দ্বিতীয় গল্প "নিষিদ্ধ উদ্যান"। এককথায় বলতে গেলে টাইম লুপে আটকে থাকা এক পরিবারের দুইবোনের শেষ পরিণতি নিয়ে এই গল্প। এর বেশি লিখলে স্পয়লার হয়ে যেতে পারে। গল্পটি বিষাদের পাতলা মোড়কে আলতো করে মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো।
তৃতীয়ও গল্প "ডার্ক ম্যাটার"। আমার চোখে এই বইয়ের সেরা গল্প। যারা প্রেমেন্দ্র মিত্রের লেখা ভালোবাসেন তাদের কাছে দারুণ লাগবে, গ্যারান্টি! ব্রাজিলের চাপচা উপজাতি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে নতুন কী কী জানতে পারলেন পল ভাসলার সেই নিয়েই গল্প। প্রেমেনবাবু স্টাইলেই হাস্যরসের উপাদান। অনুবাদের কাজটিও এক্ষেত্রে খাসা হয়েছে।
চতুর্থ গল্প "পনেরো নম্বর চাল"। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্কোপো এবং দুনকেল পরিবারের শত্রুতার মেটাতে আয়োজিত হয় একটি দাবা খেলার আসর যেখানে প্রতি পঞ্চাশ বছরে দেওয়া যায় একটি করে দাবার চাল। লেখকের এই গল্পও আপনার মন জয় করবে। স্পয়লারের ভয়ে বেশি কিছু লিখবো না।
পঞ্চম গল্প "বরফের প্রাচীর"। এটা একপ্রকার প্রতিশোধ নেওয়ার গল্প। তিনবার নোবেলজয়ী ভারতীয় বিজ্ঞানী জওহরলাল নন্দাকে মেরে প্রতিশোধ নিতে মরিয়া এমন একজন মানুষ যিনি ভুলে গেছেন নিজের নামটাই। ভেক্টর কালী ভাইরাস তার লক্ষ্যপূরণে সফল হল কিনা জানা যাবে এই গল্পেই।
পাঁচটি গল্পই এখানে ভিন্নস্বাদের। স্পয়লার দেবোনা বলে বেশি লিখিনি কোন গল্প নিয়েই। ৩৭৫ টাকায় ২৫৩ পাতার বইটি আপনাকে কোনভাবেই হতাশ করতে পারবে না লেখিকার ঝরঝরে অনুবাদের সুবাদে। বইটির প্রচ্ছদও গল্পগুলির সাথে সাযুজ্য রেখেই আঁকা, বানান ভুল প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু হতাশ হয়েছি প্রচ্ছদ আঁকা কাগজের মলাটের কোয়ালিটি নিয়ে। যথেষ্ট দাম দিয়ে কেনা বইয়ের প্রচ্ছদের কাগজ কেন মাঝারিমানের হবে সেটা প্রকাশকের ভাবা উচিৎ। মৌসুমী ঘোষের থেকে ভবিষ্যতে আরো অনুবাদ পাওয়ার আশা এবং শুভকামনা রইলো।