বইটিতে 'ফরহাদ মজহারের সিনেমা দেখার তীক্ষ্ণতা' শিরোনামে অধ্যাপক মানস চৌধুরীর একটি ভূমিকা রয়েছে। 'পাঠ : বেদের মেয়ে জোসনা' ও 'সাধারণ মানুষের সিনেমা' নামে দুইটি লেখা রয়েছে ফরহাদ মজহারের।
Farhad Mazhar (ফরহাদ মজহার) is a Bangladeshi writer, columnist, poet, social and human rights activist, and environmentalist. He graduated with honours in pharmacy from the University of Dhaka in 1967 and worked as a pharmacist in New York in the seventies and eighties. Mazhar also studied political economy in New School of Social Research. He is the founding member and managing director of UBINIG (Policy Research for Development Alternative) a policy research and advocacy group in Bangladesh working as an integral part of the community with the grassroots people to strengthen common resistance against the dominant processes of globalisation as well as creating space for strategic negotiations whenever possible.
জনপ্রিয় সিনেমা বা সাহিত্য প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবেই চিন্তামূলকতার আওতার বাইরে থেকে যায় এক বিশেষ পূর্বানুমানের কারণে। সেই পূর্বানুমানটা কি? পূর্বানুমানটা এমন যে, সিনেমাটা বা উপন্যাসটা বিপুল জনগোষ্ঠীর মাঝে জনপ্রিয়তা পেয়েছে কারণ- সিনেমাটা বা উপন্যাসটা লঘু-বিকৃত-নিম্নশ্রেণীর। আর জনপ্রিয় মানেই খারাপ। কিন্তু সিনেমা বা উপন্যাসের মতন একেকটা কালচারাল প্রডাক্ট জনপ্রিয় হয় কেন? সিনেমার টিকিট কিনতে পয়সা লাগে আবার উপন্যাস বই হিসাবে পড়তেও তাই। এখন, জনপ্রিয় কালচারাল প্রডাক্টগুলিতে এমন কি থাকে যে বিপুল সংখ্যক মানুষ পকেটের পয়সা খরচ করে? আর বাংলাদেশের মতন গরিব দেশে খেটে খাওয়া মানুষের গাঁটের টাকা খরচ করবার পিছনে নিশ্চয়ই জুতসই কারণ থাকতে হয়। না হয় অস্তিত্বের প্রাথমিক প্রয়োজনের সাথে সম্পর্কিত না-যেমন, সিনেমা-এমন কিছুর জন্য মানুষ খরচ করে কেন? তাছাড়া তুমুল জনপ্রিয় হতে গেলে জনগোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্ক্ষা-উৎকণ্ঠা-জিজ্ঞাসা’র গড় আবিষ্কার এবং তাকে মূর্ত করে তুলতে হয়। জনপ্রিয় কালচারাল প্রডাক্টের পাঠ তাই এসব আমলে না নিয়ে হতে পারে না। আমাদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এমন অভিযান বেশ বিরল। ফরহাদ মজহার বিশেষ করে সিনেমার ক্ষেত্রে এই কাজটাই করেছেন। প্রথমে জনপ্রিয় সিনেমার একটা পাঠ হাজির করেছেন। অবশ্যই রাজনৈতিক পাঠ। এমন এক সময়ে, এমন এক সিনেমা নিয়ে পর্যালোচনা করেছেন যার সাথে আমাদের বর্তমান সময়ের প্রায় কোন মিল নাই। বেদের মেয়ে জোসনা নিয়ে যখন মজহার আচলচনা করছেন তখন বাংলাদেশ অনেকাংশেই কৃষি উৎপাদন নির্ভর অর্থনীতি। তখন এমন একটা সময় যখন ইন্টারনেট তো দূরে থাক এমনকি স্যাটেলাইট টেলিভিশনও জেঁকে বসেতে পারে নাই। এগুলি খেয়াল রাখা দরকার। বেদের মেয়ে জোসনা সিনেমাটাকে ক্ষমতা সম্পর্ক-উৎপাদন সম্পর্কের সাথে মিলিয়ে পড়েছেন। এইটা খুব কাজের। এই সিনেমার নারীবাদী পাঠটাও জুতসই এবং দরকারি। দ্বিতীয় অংশে মজহার সাধারণ মানুষের সিনেমা আর গণশিল্পকলার রকমফেরের তালাশ করেছেন। তার আগে সাধারণ মানুষের সিনেমা হিসাবে র্যাম্বো সিনেমা ফ্রাঞ্চাইজির কথা বলছেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর, আবার যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসাবে এই সিনেমা ফ্র্যাঞ্চাইজি কিভাবে আমেরিকায় জনমত তৈরি করেছে সেদিকটা আমাদের কাছে ধরা পড়ে খানিকটা। এরপর যুক্তি উপস্থাপন করেছেন- বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় আমরা প্রত্যেকেই একক যুদ্ধযন্ত্র হয়ে গেছি এবং প্রত্যেকের সাথে যুদ্ধে ব্যস্ত আছি। আর যুদ্ধযন্ত্র হয়ে গেছি বলেই র্যাম্বোর মতন কিলিং মেশিনে আমরা নিজের ছবি দেখতে পাই, আর র্যাম্বো সিনেমা দুনিয়াজুড়ে সুপারহিট হয়ে যায়। এই উছিলায় ফরাসি দার্শনিক এলায়ঁ বাদিয়্যু চলে এসেছেন। গণশিল্পকলা বা Mass Art এবং সাধারণ মানুষের সিনেমার মধ্যে যে একটা পরিষ্কার বিভেদ আছে সেদিকে মজহার আমাদের দৃষ্টি টেনে এনে কাজের কাজ করেছেন। গণশিল্পকলার ক্ষেত্রে বাদিয়্যুর যে তত্ত্বায়ন, সেটা দারুণ বুদ্ধির পরিচায়ক হলেও, পুঁজিবাদী বাস্তবতার সাপেক্ষে সিনেমার বিনিয়োগ আর মুনাফা করার দিকটা এড়িয়ে গেছেন। এইটা খেয়াল করলে বাদিয়্যুর চিন্তা আমরা অনেকদূর পর্যন্ত কাজে খাটাতে পারব। তাছাড়া, এই পাঠের সাথে কারো অক্ষরে অক্ষরে একমত হবার কোন কারণ দেখি না। সেই চেষ্টাও করা হয় নাই। বরং, জনপ্রিয় সিনেমা-সাধারণ মানুষের সিনেমা পাঠ করার মধ্য দিয়ে যে জনগোষ্ঠীর স্বরূপ সন্ধানের একটা নতুন দিক খুলে যায়, সেটাই নগদ প্রাপ্তি।