আমাদের জীবনে কত রকম গল্প থাকে, কত থাকে অনুভূতি। প্রতিদিন নতুন নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে একটু করে জীবনকে বুঝতে শিখি আমরা, কখনো ভীষণ ভালো লাগা আমাদের ছুঁয়ে যায়, কখনো আমরা হয়ে উঠি বিষণ্ণতাবিলাসী। এই যে ছোট ছোট নানা অনুরণ আর আবেগ আমাদের যাপিত জীবনের, আমাদের ভাবায়, বাঁচিয়ে রাখে, তাই নিয়ে নূহা চৌধুরীর ছোট গল্পের সংকলন "প্রজাপতির দিন"।
আচ্ছা, শুরুতেই লেখিকার কথা একটু বলে নেই। আপনারা যারা 'পেন্সিল' নামক ফেইসবুক গ্রুপটার সাথে জড়িত তারা সবাই ই কম বেশি নূহা চৌধুরীর লেখা পড়েছেন বলেই আমার বিশ্বাস। এই বই টা নূহার একক ভাবে প্রকাশ করা প্রথম বই। যেকোন রাইটারের লেখা প্রথম বই প্রকাশের পরপরই সেটা পড়ে ফেলার মধ্যে একটা আলাদা আনন্দ আছে! যে দুই চারটা পড়েছি সেই বইগুলোর লেখক/লেখিকা এখনো আমার পছন্দের তালিকায় প্রথম দিকেই আছেন। কোন সন্দেহ নেই নূহাও থাকবে! লেখিকাকে শুভকামনা জানিয়েই শুরু করছি রিভিউ।
এই বইটাতে চারটা গল্প আছে। ছোট্ট চারটা গল্প। ব্যাস্ততার দোহাই দিয়ে যারা বই পড়া বন্ধ করে দিয়েছেন তাদেরও এই বই পড়তে খুব বেশি হলে তিরিশ মিনিট সময় লাগবে। ছোট পরিসরেও যে সুন্দর করে গল্প লিখে ফেলা যায় এই গল্পগুলো সেটাই প্রমাণ করে।
প্রজাপতির দিনঃ অসম প্রেম বলে খুব প্রচলিত একটা কথা আছে। কিন্তু প্রেম কি আসলেও অসম হয়? হ্যান্ডসাম এবং স্মার্ট একটা ছেলের সাথে সুন্দরী এবং স্মার্ট একটা মেয়ের হুক আপ হবে, এই ধারণাটাকেই আমাদের সমাজ একক হিসেবে ধরে নিয়ে সব সম্পর্কগুলোকে জাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু আসলে ভালোবাসাটা যদি হয় পরিপূর্ণ সেক্ষেত্রে একটা তথাকথিত অপূর্ণ মানুষও পূর্ণতা লাভ করে। এখানে ভালোবাসাই একটা বড় ফ্যাক্টর! ফেইসবুকে একটা পোস্ট দেখেছিলাম এমন যে ছয় ফুট উচ্চতার একজন সুদর্শন যুবক, যে কিনা সারাজীবন তার উচ্চতা নিয়ে গর্ববোধ করে এসেছে, কিন্তু হুইলচেয়ারে জীবন কাটানো একটা মেয়ের প্রেমে পড়তে তার কয়েক সেকেন্ড ও লাগেনি। ঠিক এমনি একটা চিন্তা ধারাকে গল্পে রূপ দেয়া হয়েছে প্রথম গল্পটাতে। এই গল্প টা আরেকটু ডালপালা মেলতে পারলে আরো ভালো লাগতো!
প্রিয়জনঃ এই লেখাটা অনেক হাহাকারসম! ছোট্ট এই জীবনটা শেষ হয় যেই দুই অক্ষরকে দিয়ে সেই দুই অক্ষর যার জীবনে আসে সেই হয় সবার প্রিয়জন! এই গল্পটা সবচেয়ে ছোট হলেও এর অর্থ বেশ গভীর। আমার বন্ধু এবং ভাই যার সাথে লেখালেখি নিয়ে গল্প করি প্রায়ই, সে এই গল্প পড়লে বলবে এটা শর্ট স্টোরিরও শর্ট ভার্সন। তবে শর্ট শর্ট স্টোরিটাই ভালো। বেশি বড় হয়ে গেলো একঘেয়ে হয়ে যাবার সম্ভাবনা ছিলো। "আহা, কেউ তাকে বলেনি, দু অক্ষর কে আলিঙ্গন করা মাত্র সে মরীচিকার মত সবার প্রিয়জন হয়ে গেলো, যার ব্যাপ্তি চারদিনের মিলাদের প্যাকেট কিংবা বছর পেরিয়ে কোন নির্দিষ্ট তারিখে মিথ্যা করে হলেও ফেলা দীর্ঘশ্বাসের পর্যন্তই!"
বনপাহাড়ীর দেশেঃ জীবন যে একটা ধরাবাঁধা রুটিনে চলে সে রুটিনটা কিছুসময়ের জন্য বদলে দিলেই আমরা বুঝতে পারি ওই রুটিনটাই আমাদের কতো প্রিয়! প্রত্যেকটা গৎবাঁধা কাজের জন্যই একটা ব্রেক দরকার, আমাদের জীবনটা যে আসলে কত সুন্দর তার সরূপ বুঝবার জন্যই! এই গল্পটা চমৎকার, নিজেকে হারিয়ে ফেলে আবার ফিরে পাবার মতো। Homesickness এর ব্যাপারটা মনকে খুব আনন্দে ভরিয়ে দিলো। "ডাউনটাউন অ্যাবিতে মিসেস হিউজ একটা কথা বলেছিলেন-
“There is no shame in being homesick. It means you came from a happy family.”"
শহরবাসীর গল্পঃ "আমি মেঘকে মেঘের মত করে আপণ করে নিয়েছিলাম, তোমাকেও তেমনি। তবু আমাদের একসাথে থাকা হলোনা।"
এটা সবচেয়ে প্রিয়! অমিলনের গল্প গুলো অনেক পোড়ায় কিন্তু কি একটা আজব ভালোলাগাও কাজ করে। লেখাটা খুবই সুন্দর। এটা নিয়ে আর কথা না বাডিয়ে পাঠকদের পড়ার জন্যই রেখে দেই।
গল্পগুলো অন্যরকম। কোন এক বর্ষনমুখর দিনে এই গল্পগুলো পড়ার পর মনটা যেন চলে যায় অনেক দূরে কোন অজানায়। কিছুক্ষন চুপচাপ বসে থাকার পর ফিরে আসতে ইচ্ছে না করলেও ফিরে আসতে হয়। ইলেকট্রনিক বইটাকে ইলেকট্রনিক শেল্ফে তুলে রাখতে হয়। তারপর অনেক দিন পর আবার খুলে কোন একদিন পড়তে বসবো। অনেক ভালোবাসায় চার তারা দিয়ে দিলাম গল্পগুলোকে আর নূহার জন্য রইলো একবুক ভালোবাসা আর শুভ কামনা!
বি.দ্র. বই টা কিনে দিয়েছে আমার ছোট ভাই। ওকে অসংখ্য ধন্যবাদ। বই টা পাবেন বইটই অ্যাপে। অ্যাপটা ডাউনলোড করলেই সেখান থেকে কেনা যাবে। দেরী না করে এখনই কিনে ফেলুন। হ্যাপি রিডিং!
বি.বি.দ্র. দয়া করে কেউ এই কথা বলবেন না যে ইবুক পড়তে ভালো লাগে না। পেন্সিল এর গল্পগুলো কিন্তু একের পর এক পড়ে যান। ইবুক টা এর চেয়ে ভিন্ন কিছুই নয়। নূহা যেহেতু একজন নতুন রাইটার সুতারং ওর বইটা কিনেই ওকে উৎসাহ দিন। সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ।