পাক-ভারত উপমহাদেশে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের কোনো কমতি ছিল না। বাংলা অঞ্চলে সুফি সাধকদের মাধ্যমে ইসলাম সবচেয়ে বেশি বিস্তৃতি লাভ করে। প্রথম খন্ডে মোঘল সাম্রাজ্যের পূর্ব সময় পর্যন্ত আলোচনা করা হয়েছিল। দ্বিতীয় খন্ডে মোঘল সাম্রাজ্যের শাসন ও তার সমসাময়িক অন্যান্য ঘটনাবলীকে স্থান দিয়েছেন লেখক।
'মোঙ্গ' থেকে 'মোঙ্গল'; যার অর্থ নির্ভীক এবং এই শব্দ থেকেই মুঘল কিংবা মোগল শব্দটি এসেছে। মোগলদের সাথে মোঙ্গলদের নিকট অতীতে সম্পর্ক ছিল না। চেঙ্গিস-তৈমুরের উত্তরসূরী চাঘতাই তুর্ক বংশের বাবর ভারত উপমহাদেশে মোঘল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন। পানিপথের প্রথম যুদ্ধে লোদী বংশের ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত করার মাধ্যমে দিল্লি অধিকার করেন বাবর। প্রায় তিনশ বছরের সুলতানি শাসনের অবসান ঘটে। মোঘলদের মাধ্যমে উপমহাদেশে দীর্ঘস্থায়ী মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ফারগানা-সমরকন্দে বারবার রাজ্যহারা হয়ে বাবর ভারতের দিকে দৃষ্টি দিয়েছিলেন এবং সফল হয়েছিলেন নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠায়। বাবরের শাসনামলে প্রধান প্রতিদ্বন্ধী ছিল ভারতের রাজপুত রাজারা। একাধিকবার তাঁদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল কিন্তু বাবর সফলকাম ছিলেন। তবে বাবর বেশিদিন শাসন করতে পারেন নি। পুত্র হুমায়ুনের অসুস্থতাকে নিজের ঘাড়ে নিয়ে পুত্রের আরোগ্যের তিনমাস পর মারা যান। হুমায়ুনের শাসনমালকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। শেরশাহের শাসন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অবস্থা। বাবরের মৃত্যুর পর হুমায়ুন সিংহাসনে বসেন। প্রথম দশ বছর নির্বিঘ্নে শাসন পরিচালনা করলেও কনৌজের যুদ্ধে শেরশাহের কাছে পরাজিত হয়ে রাজ্যহারা হন এবং পালিয়ে বিভিন্ন রাজাদের কাছে সাহায্য চান। শের শাহের মৃত্যু ও দীর্ঘ পনেরো বছরের যাযাবর জীবন-যাপন করে পারস্যের বাদশাহের সহায়তায় সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন হুমায়ুন। রাজ্যজয়ের কিছুকাল পরেই গ্রন্থাগারের সিঁড়ি হতে পড়ে নিহত হন তিনি। হুমায়ুনের মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেন আকবর; মাত্র তেরো বছর বয়সে। মোঘল সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ শাসক বিবেচনা করা হয় বাদশাহ আকবরকে। তবে বয়স কম হওয়াতে তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন পিতৃবন্ধু বৈরাম খান। আকবরের সময়েই পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ সংঘটিত হয় বৈরাম খান ও আদিল শাহের সেনাপতি হিমুর মধ্যে। এই যুদ্ধে হিমু পরাজিত ও নিহত হয়। পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ ভারত মোঘল ইতিহাসকে চূড়ান্তভাবে স্থান দেয়। পানিপথের যুদ্ধের পর আকবর সাম্রাজ্য বিস্তারের দিকে নজর দেন। বৈরাম খানের হত্যার মাধ্যমে আকবরের শাসনামলের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়। বৈরাম খানের হত্যাকান্ড নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বৈরাম খানের মৃত্যুর দুই বছর পর আকবর নিজ হাতে শাসন পরিচালনা শুরু করেন। আকবরের সময়ে মোঘল সাম্রাজ্য সবচেয়ে বেশি জায়গায় বিস্তৃত ছিল। বাংলাতেও তার হাওয়া লাগে তবে বারো ভূঁইয়ারা নিজ অঞ্চলগুলোতে স্বাধীনভাবে শাসন করতেন। আকবর সম্রাট থাকাবস্থায় দ্বীন-ই ইলাহি নামক সর্বধর্মের মিশ্রণে একটি ধর্ম প্রবর্তন করেন। যা তাঁর ক্ষমতা প্রদর্শনের অন্যতম দৃষ্টান্ত। তবে শেষ জীবনে তওবা করার প্রমাণ পাওয়া যায়। মোঘল শাসকদের মধ্যে জাহাঙ্গিরের শাসনামল অনেকটা কম আলোচিত। হয়তো পিতা আকবরের ব্যপক জনপ্রিয়তা পুত্রের শাসনামলকে ম্রিয়ম্রাণ করেছে। জাহাঙ্গিরের পর শাহজাহান এবং পরের শাসক হিসেবে আওরঙ্গজেব শাসন করেছেন ভারতকে। আওরঙ্গজেবের শাসনমাল পর্যন্তই মূলত মোঘল শাসনের জৌলুশ ছিল। ধীরে ধীরে এই জৌলুশ কমতে থাকে। তবে এই খন্ডে আওরঙ্গজেব পর্যন্ত ইতিহাসকেই স্থান দেওয়া হয়েছে।
দুই মলাটের মধ্যে মোঘল সাম্রাজ্যের শুরু থেকে প্রথম ছয়জন সম্রাটের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। তাঁদের শাসন পরিচালনায় দক্ষতা, আদর্শ এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার চিত্র উঠে এসেছে বইটিতে। তবে মোঘল সাম্রাজ্যের পূর্ণ ইতিহাসকে স্থান দিলে আরো ভালো হতো। প্রথম খন্ড পড়ার সময় যে পুনরাবৃত্তি দেখেছিলাম, এই খন্ডে সেটা আরো বেশি মনে হয়েছে। সকল সম্রাটের শাসনামল সম্পর্কে লেখার সময় লেখক একই ধরণের বর্ননার অবতারণা করেছেন। বইটিতে মোঙ্গলদের লুন্ঠন কার্যকে মোঘলদের বৈশিষ্ঠ্য হিসেবে বলা হয়েছে। আদতে মোঘলরা লুন্ঠনে যুক্ত ছিলেন না, বরং ভারতের উন্নতিকল্পেই কাজ করেছেন। প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতে সেই অধ্যায়ের সারাংশ দেওয়াটা সিনেমার ট্রেইলারের মতো হয়েছে। মোঘল শাসকরা যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ভাতৃঘাতী ছিলেন, এই ব্যাপারগুলো বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে। দ্বিতীয়ত আকবরের বাংলা সন প্রবর্তন নিয়ে লেখক দুই বাক্যে সমাপ্তি টেনেছেন। এই বিষয়ের বিতর্কগুলো স্পষ্ট করার জন্য একটি অধ্যায়কে স্থান দেওয়া উচিত ছিল। আকবরের দ্বীন-ই ইলাহিকে ইসলামের সাথে মেলানোর কোনো প্রশ্নই আসেনা। এর বিভিন্ন নীতিগুলো ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোর সাথে সাংঘর্ষিক। সর্বোপরি বলা যায়, বইটিতে অনেক বিষয়েরই অনুপস্থিতি রয়েছে। যার ফলে বিস্তারিত ব্যাপারগুলো থাকা সত্ত্বেও সন্তুষ্ট হতে পারিনি। একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তিগুলো এড়াতে পারলে বইটি সুখপাঠ্য হতে পারতো। হ্যাপি রিডিং।