What do you think?


ডি-মাইনর
"মূলত বর্তমানই নির্মান করে অনাগত ভবিষ্যতের রূপরেখা। সতেজ মানচিত্রের মুখায়ব বদলে দেয় আমাদেরই পরিচিত সেইসব কুশীলব যাদের হাতেই হয়তো কোনো একদিন আমরা নির্দ্বিধায়, অটুট বিশ্বাসে তুলে দিয়েছিলাম আমাদের ভাগ্যের চাবিকাঠি এবং যা সময়ের বিবর্তনে তাদের কাছে হয়ে যায় নিতান্তই খেলার সামগ্রী। বদলে যেতে থাকে আমার চিরপরিচিত আকাশের রঙ, বাতাসের ঘ্রাণ।
এই গল্পের সূচনা হয়েছে কোন এক সালফার বৃষ্টির বিকেলে। সেদিন নিয়তি বা কাকতাল বশত এক তরুণ মিউজিশিয়ানের হাতে এসে পড়ে একটা ম্যানুস্ক্রিপ্ট যা তার সামনে সহসা উপুড় করে দ্যায় বিচিত্র এক সময়ের গল্প যখন সদ্য একনায়কতন্ত্রের হাত থেকে মুক্ত হওয়া একটা দেশ পুনরায় আটকে পড়ার পাঁয়তারা করছে সামরিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এক ম্যানিকুইন রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্তহীন চক্রে। যখন সর্বসাধারণের মৌলিক অধিকারের সাথে সাথে হারিয়ে যেতে শুরু করেছে শিল্প-সাহিত্যের সকল প্রকার মাধ্যম। দেশ-সমাজের কাছে শিল্পীরা হয়ে পড়ছে তুমুল অপ্রয়োজনীয় এবং আগামী প্রজন্মের জন্য তৈরি করা হচ্ছে অদ্ভুত এক ম্যাট্রিক্স যেখানে তারা বেড়ে উঠবে বোধ-বিচার-বিবেচনাহীন ল্যাবরেটরী ইঁদুর হয়ে।
এই গল্পের সূচনা হয়েছে কোন এক সালফার বৃষ্টির বিকেলে। সেদিন নিয়তি বা কাকতাল বশত এক তরুণ মিউজিশিয়ানের হাতে এসে পড়ে একটা ম্যানুস্ক্রিপ্ট যা তার সামনে সহসা উপুড় করে দ্যায় বিচিত্র এক সময়ের গল্প যখন সদ্য একনায়কতন্ত্রের হাত থেকে মুক্ত হওয়া একটা দেশ পুনরায় আটকে পড়ার পাঁয়তারা করছে সামরিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এক ম্যানিকুইন রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্তহীন চক্রে। যখন সর্বসাধারণের মৌলিক অধিকারের সাথে সাথে হারিয়ে যেতে শুরু করেছে শিল্প-সাহিত্যের সকল প্রকার মাধ্যম। দেশ-সমাজের কাছে শিল্পীরা হয়ে পড়ছে তুমুল অপ্রয়োজনীয় এবং আগামী প্রজন্মের জন্য তৈরি করা হচ্ছে অদ্ভুত এক ম্যাট্রিক্স যেখানে তারা বেড়ে উঠবে বোধ-বিচার-বিবেচনাহীন ল্যাবরেটরী ইঁদুর হয়ে।
328 pages, Hardcover
First published February 2, 2022
Ratings & Reviews
Friends & Following
Create a free account to discover what your friends think of this book!
Community Reviews
Displaying 1 - 16 of 16 reviews
May 7, 2022
* মরা বিকেলের ঘ্রাণ চিনো তো? তবে ঠিক এইখানে দাঁড়িয়ে নিশ্বাস নাও বুক ভরে। সহজেই জেনে যাবে এখানে বিকেলগুলো মরে গেছে বহু আগে। এখানে বলতে এই শহরে। আর এই শহর তোমার, আমার, আমাদের। এই শহরের বিকেল থেকে উধাও হয়েছে সোনারং রোদ। দিগন্তে চোখ রাখ, দেখবে শহরের চৌদিক পাহারা দিয়ে রেখেছে একটা ছাইরঙা অন্ধকার। উঁচু উঁচু স্থাপনা ও বহুতল ভবনের হাতখানেক উপরে দিগন্তে যতদূর-যতটুকু আকাশ দেখা যায় তা দৃশ্যত মারমুখী, গোমড়ামুখো।*
৩ নভেম্বর, ২০২৩। সকাল সকাল বাতিঘরে যাচ্ছি। মা বারবার বলছে, "আজকে না গেলে হয় না?" একটু পর ছোটভাই আর ছোটবোনও অনুরোধ করছে ঢাকা না যাওয়ার জন্য। অথচ রৌদ্রোজ্জ্বল স্বাভাবিক একটা দিন। বাসায় কাজ নেই। কিন্তু সবার মনে দুশ্চিন্তা, ভয়। হরতাল অবরোধের দিন চলে এসেছে। যদি গাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়! যদি! "ওদের মনে তো কোনো মায়াদয়া নেই।" এই "ওরা" কারা? আটকে যেতে হবে। আমরা যা দেখছি বিশ্বাস করছি না, কিছু একটা বলতে চাচ্ছি কিন্তু বলতে পারছি না। ফাঁকা জায়গায়ও কথা বলার সময় এদিক সেদিক তাকিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিই, কেউ শুনছে কি না! বাড়ি থেকে রওনা দিলাম। সবাই বারবার বলায় আমার মনেও ভয় ঢুকে গেছে। রাজনীতি নিয়ে আমি মাথা ঘামাতে চাই না,একদম নিজের মতো থাকতে চাই কিন্তু...। চকিতে মনে পড়লো জিল্লুর রহমান সোহাগের "ডি-মাইনর" এর কথা যা গত কয়েক বছরে পড়া আমার অন্যতম প্রিয় উপন্যাস। অজানা ভয়, রুদ্ধ পরিবেশ, মানুষ উধাও হয়ে যাওয়া, নিরাপত্তাহীনতা - আমার ঘটনাটা অনায়াসে "ডি-মাইনর" এ জায়গা পেতে পারতো! কারণ লেখক বর্ণিত জগতেই এখন আমাদের বসবাস।
ডি-মাইনর শুরু হয় সালফার বৃষ্টির বিকেলে। মিউজিশিয়ান রননের হাতে এসে পড়ে বিচিত্র এক পাণ্ডুলিপি। পড়তে পড়তে সে আবিষ্কার করে গল্পটার মূল চরিত্র আসলে সে নিজে। পাণ্ডুলিপির নায়ক তার একান্ত নিজের ভুবনে বাস করতে চায়। শেকড়ের সাথে, মায়ের সাথে তার যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন। হারানো সংযোগ জোড়া দিতে যেয়ে সে আবিষ্কার করে, দেরি হয়ে গেছে। উপন্যাসের আপাত অদ্ভুত, রহস্যময় শহর যে কোনটা তা পাঠক কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝে ফেলবে। বুঝে ফেলবে, সামরিক একনায়কতন্ত্র থেকে নামে মুক্তি আসলেও আমরা এক পুতুল রাষ্ট্রব্যবস্থায় আটকে গেছি যেখানে ব্যক্তিমানুষ হয়ে গেছে ছারপোকার মতো তুচ্ছ। শিল্পচর্চা এখানে মূল্যহীন।
"এই শহরে হঠাৎ করে কারো নিখোঁজ হয়ে যাওয়াটা বর্তমানে নতুন কিছু নয়। এরকম হচ্ছে অহরহই। কারো ভেতর কোনো প্রকার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ামাত্রই যা কিনা রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া বিন্যাসের সামান্য পরিপন্থি সেটিকে স্রেফ মিশিয়ে দেওয়া হয় ধুলোয়। তবে এখানে স্বেচ্ছায় মরে যাওয়াটা আইনের পরিপন্থি। সেটা চাইলে জিততে হবে যুক্তির লড়াই।"
নায়কের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার বর্ণনা কিছুটা একঘেয়ে হলেও অদৃশ্য জাল যখন তাকে ঘিরে ধরতে থাকে, ঘটতে থাকে একটার পর একটা রহস্যময় ঘটনা, অনিচ্ছুক বিমুখ ব্যক্তিকে যখন রাষ্ট্র গিলে ফেলতে থাকে তখন আমরা নায়কের সাথে একই সমান্তরালে নিজেদের আবিষ্কার করি। আবিষ্কার করি, আমরাও এ গল্পের একজন। এটা এমন এক জায়গা যেখানে আত্মহত্যারও অনুমতি নেই। মরতে হবে, কিন্তু নিজের ইচ্ছায় নয়। মরতে হবে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়ে; নিজের আত্মাকে বিক্রি করে দিয়ে। রনন যেমন পাণ্ডুলিপি হাতে নিয়ে গল্পের একজন হয়ে গেছে, তেমনি পাঠকও বইটা হাতে নিয়ে পড়া শুরু করতেই গল্পের এক চরিত্র হয়ে যাবে নিজেই। রননকে যেমন খুঁজে নিতে হবে নিজের জায়গা, তেমনি আমাদেরও করতে হবে কিছু। পালানোর পথ রুদ্ধ। শামসুর রাহমান বহু আগেই বলে গেছেন "গলায় রক্ত তুলেও তোমার মুক্তি নেই।" মুক্তি নেই কিন্তু মুক্তির বাসনা তো আছে! না চাইলেও একটা অবস্থান নিতে হবে। কারণ দানবের বিরুদ্ধে না দাঁড়ালে সেই দানব আমাদের গিলে খাবে বা নিজেদেরই একসময় দানবে পরিণত হয়ে যেতে হবে। এটাই নিয়তি।
৩ নভেম্বর, ২০২৩। সকাল সকাল বাতিঘরে যাচ্ছি। মা বারবার বলছে, "আজকে না গেলে হয় না?" একটু পর ছোটভাই আর ছোটবোনও অনুরোধ করছে ঢাকা না যাওয়ার জন্য। অথচ রৌদ্রোজ্জ্বল স্বাভাবিক একটা দিন। বাসায় কাজ নেই। কিন্তু সবার মনে দুশ্চিন্তা, ভয়। হরতাল অবরোধের দিন চলে এসেছে। যদি গাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়! যদি! "ওদের মনে তো কোনো মায়াদয়া নেই।" এই "ওরা" কারা? আটকে যেতে হবে। আমরা যা দেখছি বিশ্বাস করছি না, কিছু একটা বলতে চাচ্ছি কিন্তু বলতে পারছি না। ফাঁকা জায়গায়ও কথা বলার সময় এদিক সেদিক তাকিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিই, কেউ শুনছে কি না! বাড়ি থেকে রওনা দিলাম। সবাই বারবার বলায় আমার মনেও ভয় ঢুকে গেছে। রাজনীতি নিয়ে আমি মাথা ঘামাতে চাই না,একদম নিজের মতো থাকতে চাই কিন্তু...। চকিতে মনে পড়লো জিল্লুর রহমান সোহাগের "ডি-মাইনর" এর কথা যা গত কয়েক বছরে পড়া আমার অন্যতম প্রিয় উপন্যাস। অজানা ভয়, রুদ্ধ পরিবেশ, মানুষ উধাও হয়ে যাওয়া, নিরাপত্তাহীনতা - আমার ঘটনাটা অনায়াসে "ডি-মাইনর" এ জায়গা পেতে পারতো! কারণ লেখক বর্ণিত জগতেই এখন আমাদের বসবাস।
ডি-মাইনর শুরু হয় সালফার বৃষ্টির বিকেলে। মিউজিশিয়ান রননের হাতে এসে পড়ে বিচিত্র এক পাণ্ডুলিপি। পড়তে পড়তে সে আবিষ্কার করে গল্পটার মূল চরিত্র আসলে সে নিজে। পাণ্ডুলিপির নায়ক তার একান্ত নিজের ভুবনে বাস করতে চায়। শেকড়ের সাথে, মায়ের সাথে তার যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন। হারানো সংযোগ জোড়া দিতে যেয়ে সে আবিষ্কার করে, দেরি হয়ে গেছে। উপন্যাসের আপাত অদ্ভুত, রহস্যময় শহর যে কোনটা তা পাঠক কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝে ফেলবে। বুঝে ফেলবে, সামরিক একনায়কতন্ত্র থেকে নামে মুক্তি আসলেও আমরা এক পুতুল রাষ্ট্রব্যবস্থায় আটকে গেছি যেখানে ব্যক্তিমানুষ হয়ে গেছে ছারপোকার মতো তুচ্ছ। শিল্পচর্চা এখানে মূল্যহীন।
"এই শহরে হঠাৎ করে কারো নিখোঁজ হয়ে যাওয়াটা বর্তমানে নতুন কিছু নয়। এরকম হচ্ছে অহরহই। কারো ভেতর কোনো প্রকার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ামাত্রই যা কিনা রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া বিন্যাসের সামান্য পরিপন্থি সেটিকে স্রেফ মিশিয়ে দেওয়া হয় ধুলোয়। তবে এখানে স্বেচ্ছায় মরে যাওয়াটা আইনের পরিপন্থি। সেটা চাইলে জিততে হবে যুক্তির লড়াই।"
নায়কের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার বর্ণনা কিছুটা একঘেয়ে হলেও অদৃশ্য জাল যখন তাকে ঘিরে ধরতে থাকে, ঘটতে থাকে একটার পর একটা রহস্যময় ঘটনা, অনিচ্ছুক বিমুখ ব্যক্তিকে যখন রাষ্ট্র গিলে ফেলতে থাকে তখন আমরা নায়কের সাথে একই সমান্তরালে নিজেদের আবিষ্কার করি। আবিষ্কার করি, আমরাও এ গল্পের একজন। এটা এমন এক জায়গা যেখানে আত্মহত্যারও অনুমতি নেই। মরতে হবে, কিন্তু নিজের ইচ্ছায় নয়। মরতে হবে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়ে; নিজের আত্মাকে বিক্রি করে দিয়ে। রনন যেমন পাণ্ডুলিপি হাতে নিয়ে গল্পের একজন হয়ে গেছে, তেমনি পাঠকও বইটা হাতে নিয়ে পড়া শুরু করতেই গল্পের এক চরিত্র হয়ে যাবে নিজেই। রননকে যেমন খুঁজে নিতে হবে নিজের জায়গা, তেমনি আমাদেরও করতে হবে কিছু। পালানোর পথ রুদ্ধ। শামসুর রাহমান বহু আগেই বলে গেছেন "গলায় রক্ত তুলেও তোমার মুক্তি নেই।" মুক্তি নেই কিন্তু মুক্তির বাসনা তো আছে! না চাইলেও একটা অবস্থান নিতে হবে। কারণ দানবের বিরুদ্ধে না দাঁড়ালে সেই দানব আমাদের গিলে খাবে বা নিজেদেরই একসময় দানবে পরিণত হয়ে যেতে হবে। এটাই নিয়তি।
March 19, 2024
৪.৫/৫
আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।
নষ্টদের দানবমুঠোতে ধরা পড়বে মানবিক
সব সংঘ-পরিষদ; চলে যাবে, অত্যন্ত উল্লাসে
চ’লে যাবে এই সমাজ-সভ্যতা-সমস্ত দলিল
নষ্টদের অধিকারে ধুয়েমুছে, যে-রকম রাষ্ট্র
আর রাষ্ট্রযন্ত্র দিকে দিকে চলে গেছে নষ্টদের
অধিকারে। চ’লে যাবে শহর বন্দর ধানক্ষেত
কালো মেঘ লাল শাড়ি শাদা চাঁদ পাখির পালক
মন্দির মসজিদ গির্জা সিনেগগ পবিত্র প্যাগোডা।
অস্ত্র আর গণতন্ত্র চ’লে গেছে, জনতাও যাবে;
চাষার সমস্ত স্বপ্ন আস্তাকুড়ে ছুঁড়ে একদিন
সাধের সমাজতন্ত্রও নষ্টদের অধিকারে যাবে।
হুমায়ুন আজাদের এই কবিতারই উপন্যাস সংস্করণ মনে হলো যেন ডি-মাইনর বইটা। বইটা বলে ভবিষ্যতের সেই সময়ের কথা, যখন জীবনের সকল স্বাধীনতা চলে গেছে নষ্টদের অধিকারে, যখন শিল্প চলে গেছে নষ্টদের অধিকারে, প্রেমের আবেদন, একটা বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যা, এক ঝাঁক পাখি বা একাকী মানুষের বেঁচে থাকার স্বাধীনতা, এমনকি মৃত্যুর স্বাধনীতাও চলে গেছে নষ্টদের অধিকারে।
এ বইয়ে ফুটে উঠেছে আমার গল্প, এ বইয়ে ফুটে উঠেছে আমাদের গল্প, ফুটে উঠেছে এ শহরের প্রতিটা মানুষের খণ্ড খণ্ড গল্প, খণ্ড খণ্ড মৃত্যু। তাই বইটা পড়ার সময় মনে হয় বইটা যেন আমারই লেখা, হয়তো অন্য কোন জন্মে অন্য কোন ভুবনে আমি নিজেই লিখেছিলাম এ শহরের প্রতিটা মানুষের পাঁজরের ইতিহাস, নিজের বেঁচে থাকার ব্যর্থতা অথবা টিকে থাকার সফলতা।
আমাদের জীবনের প্রতিদিনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মৃত্যুকে এভাবে কোন বইয়ে রোপণ করতে দেখিনি আমি এর আগে কখনো। আমাদের প্রতিদিনের রোপণ করা খণ্ড খণ্ড মৃত্যু থেকে গড়ে উঠে হতাশার এক একটি গাছ, গড়ে উঠে জীবনের হতাশার অরণ্য, সেই অরণ্যে আমরা নিজেরাই কখন হারিয়ে যাই আমরা জানি না, আমরা তখন সূর্যের আলো দেখতে পারি না, পাহাড় দেখতে পারি না, ঝর্না দেখতে পারি না, এমনকি অরণ্যও দেখতে পারি না। আমরা পড়ে যাই সেই গোলকধাঁধায়, যেখান থেকে আমরা কখনো বের হতে পারি না, আমাদেরকে বের হতে দেয় না আমাদের রাষ্ট্র, আমাদের নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত মানুষরূপী ঈগলেরা।
তবুও এর মাঝে একদল যুবক বের হয়ে আসে অরণ্য থেকে, তারা দেখতে চায় সূর্যের লাল, আকাশের নীলিমা, ঝরনার ঝিরিপথ, পাহাড়ের সবুজ; তারা গড়ে তুলতে চায় সভ্যতার নতুন ভিত্তি, তারা আকাশের মেঘে উড়িয়ে দিতে চায় স্বাধীনতার পতাকা, তারা বেঁচে থাকার স্বাধীনতাকে স্বাভাবিক করতে চায় জীবনকে বাজি রেখে, তাঁরা একটি যুদ্ধ করতে চায় ঈগলের থাবা থেকে এই শহরকে বাঁচাতে। তাদের এই চাওয়াটা পূর্ণতা পেয়েছিল কিনা সেটা বড় প্রশ্ন নয়, তাঁরা চাইতে পেরেছিল সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় ব্যাপার। এই শহরের মানুষ ঈগলের থাবার ভয়ে কোনকিছু চাইতেও ভুলে গিয়েছিলো। এই যুবকের দল অন্তত চাইতে পেরেছিল।
শিরোনামহীনের গানে বললে,
জাহাজীর কাছে ভীষণ সত্য সেই,
পথটাই যাওয়ার, এর আর কোন ফিরে আসা নেই ।
শহরের জাহাজীরা ফিরে আসতে পারে না, ঐ যুবকের দল ফিরে আসতে চেয়েছিল, তারা মুক্তির পথ খুঁজেছিল, তারা মুক্তির গান গেয়েছিল, তারা আলোর পথে খুঁজেছিল, তারা নষ্টদের নষ্ট করতে চেয়েছিল, তারা ঈগলের ডানা পুড়িয়ে দিতে চেয়েছিলো।
বইয়ের ভালো লাগা কিছু লাইন:
পৃষ্ঠপোষকতার নামে যে-কোনো ধরনের আর্টকে রেসের মাঠে নামানোর অর্থই হলো সেটার অমর্যাদা করা।
মানুষকেই ঘুরে দাঁড়াতে হয় চলমান স্রোতের বিপরীতে, কখনো-বা মানুষেরই বিপরীতে। কিন্তু সেটা কি শুধুই স্বেচ্ছা প্রয়োজনে? নাকি অনেকটা বাধ্য হয়ে? অথবা ব্যাপারটা কি এমন যে মানুষের সাথে যাবতীয় জড়তা-স্থবিরতার সম্পর্কটা প্রতিদ্বন্দ্বিতার? বরং এটা ধরে নেওয়ায় সহজ হবে যে মানুষের ধর্মই নয় ক্যালেন্ডার হয়ে দেয়ালে ঝুলে থাকা, মানুষের ধর্ম মূলত চলন্ত ট্রেন কামরায় বসে দেখা মুহুর্মুহু বদলে যাওয়া দৃশ্যকল্পের মতো।
- মনিদা আপনিও কি পালাচ্ছেন আমার মতো?'
- পৃথিবীতে পালানোর মতো কোনো জায়গা আছে নাকি? আমার তো মনে হয় নেই। আমি আসলে খুঁজে বেড়াচ্ছি।
- কী খুঁজছেন দাদা?'
- আমি আসলে খুঁজে বেড়াচ্ছি গান, এটাকে তুমি অন্যকথায় সুরও বলতে পারো তাতে করে অর্থের ব্যপ্তিটা বাড়বে। শোনো, সুর মানে হলো সৃষ্টি বা ভারসাম্য আর বেসুরের অর্থ প্রলয় বা বিশৃঙ্খলা আর সমসুর হলো ভারসাম্যের একটা আইডিয়াল কন্ডিশান। এই যে সমতার নামে এত এত রক্ত ঝরল, মানুষে মানুষে বিভাজন এক থেকে অগণিত হলো সব সমসুর প্রতিষ্ঠার জন্যেই। সবার আগে প্রয়োজন ছিল ছড়ানো ছিটানো সুরকে একত্রিত করা তারপর এগুলোর ভেতর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। জানো তো? বেসুর সংখ্যায় কম কিন্তু ভয়ানক শক্তিশালী।
- শোনো, বিপদ থেইকে পলায়া সাময়িক মুক্তি পাওয়া যায় হয়তো, কিন্তু তাতে কইরে কোনো লাভ হয় না, বরং আরও বিপদ বাড়ে আর কইমে যায় বিপদ মুকাবেলা করার শক্তি।
- তাইলে আমি এখন কী করব আব্বা?
- না পলায়া তোমার উপরে আসা বিপদরে মুকাবেলা করো।
পরিস্থিতি কখনোই আমাদের মতো মানুষের হাতে ছিল না, এখনো নেই এবং ভবিষ্যতেও থাকবে না সেটা নিশ্চিত। একদল পিষবো আর একদল পিষ্ট হইব এইটাই ফ্যাক্ট। এখন তুই আমি কোন দলে যামু এইটা ডিপেন্ড করতেছে তুই আমি জন্মাইছি সোসাইটির কোন ক্লাসে।
আমি আবারও মনোযোগ ফেরাই টিনেজ দলটার দিকে। তারা কি একটা বিষয় নিয়ে যেন হাসাহাসি করছে খুব। সেটা দেখে মাথায় আসে একটা অদ্ভুত চিন্তা। যদিও আমি জানি না তাদের হাসির কারণ, তবুও মনে হয় সে কারণ যা কিছুই হোক না কেন তা নির্ঘাত অন্তঃসারশূন্য। এই জেনারেশনের সাথে কোনো সরাসরি যোগসূত্র নেই আমার তবুও বিগত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় যতটুকু বুঝেছি তাতে আলাদা করে তাদের অস্তিত্বটা টের পাইনি এখন অবধি। বরাবরই আমার মনে হয় তাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা টেস্টটিউবের ভেতর। বাইরের ছায়াচ্ছন্ন পৃথিবীর কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই কিংবা হয়তো সেটা জানার প্রয়োজনও তারা বোধ করে না।
প্রজাপতির যতটুকু সুন্দর সেটা তার ডানার কারুকার্যেই বাকিটা মোটামুটি অর্থে কুৎসিত, মানুষের অন্তকরণের ভেতরকার জমাট ঘৃণার মতো।
শোকেরা স্বভাবে উদ্বায়ী, অল্প আঁচেই উড়ে যায়, যেতে হয়। এই আঁচটা সময়ের, ব্যস্ততার কিংবা নিত্যকার দরকার-অদরকারি ভাবনার উপরিপাতনের।
মূলত প্রতিটা শোকের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে শক্তিশালী এক অদৃশ্য চুম্বক যা দুজন বিপরীতধর্মী মানুষের ভেতর জাগিয়ে তুলে তুমুল এক জৈবিক তাড়না।
ব্যক্তিগত বোঝাপড়াটা মুগ্ধতার একেবারে উল্টো। একটা বাড়লে আরেকটা আপনা আপনিই কমতে থাকে।
(আমার ব্যাক্তিগত সংযোজন: যেসকল মানুষ স্থির হয়ে থাকে জীবনযুদ্ধে, জীবনের অগ্রগতি সম্পর্কে যাদের ইচ্ছে ভঙ্গুর, যারা পরিবর্তনের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে না, তাদের মাঝে মুগ্ধতা একটা সময় পর মলিন হয়ে যায়। কিন্তু যারা এর উল্টো, তাদেরকে প্রতিনিয়ত নতুন করে বুঝতে হয়, তাদেরকে দেখে প্রতিনিয়ত মুগ্ধ হতে হয়)
এই চিঠিটা যখন পড়বে ততদিনে শহর পরিণত হয়েছে প্রেতপুরীতে। উৎপাদন যন্ত্রের নামে বাচ্চাদের খেলার মাঠগুলোর দখল নিয়েছে নামি-বেনামি সব স্থাপনা। নিরাপত্তাকার্যের দায়িত্বে নিয়োজিতদের অনুপস্থিতি ও স্বেচ্ছাচারিতায় শহর হয়ে পড়েছে ভীষণ রকমের অনিরাপদ। মায়েরা তাদের বাচ্চাদের চোখের আড়াল করতে ভয় পাচ্ছে কেন না চোখের আড়াল হলেই তারা শুরু করেছিল হারিয়ে যেতে। এদের ভেতর যারা যারা ফিরে আসছে তাদের ছোট শরীরের ভেতর ঢুকে পড়ছে এক একটা পরিণত মানুষ, যাদের বিবর্ধিত চোখে ইনসমনিয়ার চিহ্ন। সন্ধ্যার পর তুমি রাস্তায় বের হলে মনে হবে এই শহরে কোনো জীবিত মানুষ নেই। শরীরের ছাল-বাকল উঠে যাওয়া দাম্ভিক কুকুরগুলো কেবল শহরের আনাচে কানাচে ঘুরে ঘুরে নিরাপত্তাকর্মীর দায়িত্ব পালন করছে, অন্ধকারে যাদেরকে প্রায়ই তুমি হায়েনা ভেবে আঁতকে উঠবে ভয়ে...
বাঁচা-মরা নিয়া বেশি ভাবনা-চিন্তা কইরো না। যখন দেখবা যে জীবনের উদ্দেশ্য নিয়া ভ্যাবাচেকার মধ্যে পইড়া গ্যাছো শরীর থেইকা এইসব মিথ্যে পোশাক ছুইড়া ফালায়া একেবারে মাটির কাছে চইলা যাইবা। জন্মভূমির মাটির ভেতর অদ্ভুত রহস্যময় একটা ঘ্রাণ আছে। মানুষ মূলত পাগল হয়, নির্বিবাদে রক্ত ঢাইলা দ্যায় ঐ মাটিরে ভালোবাইসায়। সেই তোমারে ইশারা দিবো তোমার কী করা উচিত।
এই শহরে হঠাৎ করে কারো নিখোঁজ হয়ে যাওয়াটা বর্তমানে নতুন কিছু নয়। এরকম হচ্ছে অহরহই। কারো ভেতর কোনো প্রকার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ামাত্রই যা কিনা রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া বিন্যাসের সামান্য পরিপন্থি সেটিকে স্রেফ মিশিয়ে দেওয়া হয় ধুলোয়। তবে এখানে স্বেচ্ছায় মরে যাওয়াটা আইনের পরিপন্থি। সেটা চাইলে জিততে হবে যুক্তির লড়াই।
মানুষ সবচেয়ে বেশি নিরুদ্দেশ হবার প্রেরণা পায় বৃষ্টি ও জোছনা থেকে।
শুধুই 'আমিত্ব' ব্যাপারটা একটা ভয়াবহ অসুখ। কারণ এটা মানুষকে একসময় ঠেলে দেয় নিশ্চিত আত্মবিনাশের পথে। ব্যক্তিগত আয়নায় ঘুরে ঘুরে শুধু নিজেকেই বারবার দেখতে থাকলে একসময় তা থেকে জাগে মারাত্মক সব বিভ্রম। ব্যাপারটা আমি নিজেও টের পেয়েছি বেশ কিছু খণ্ড খণ্ড অভিজ্ঞতায়। অনেক দিন আগে কোথায় যেন শুনেছিলাম যে মৃতের সৎকার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী মানুষগুলোর ভেতর যাদেরকে অন্যান্যদের তুলনায় অধিক নির্ভার দেখায় ওরা মূলত তারাই যারা ভেতরে ভেতরে খুশিই হয় ঐ মৃতের বিপরীতে নিজেদেরকে জীবিত ভেবে। তবে এটা আমিত্বের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়। নিজের প্রতি প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভালোবাসার শুরুটা হয় অনেকটা এরকমভাবেই।
অভ্যাস ভয়ানক শক্তিশালী যা কিনা পুরোপুরি উল্টে দিতে পারে মানুষের আচার-আচরণের ধরন। অস্বস্তিকে বানাতে পারে স্বস্তি এবং সাহসীকে প্রচণ্ড রকমের ভীতু।
আকাশকে ধন্যবাদ জোর করে এই বইটা ধরিয়ে দেওয়ার জন্য।
হারুন ভাইকে ধন্যবাদ বইটিকে ধার দেওয়ার জন্য।
আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।
নষ্টদের দানবমুঠোতে ধরা পড়বে মানবিক
সব সংঘ-পরিষদ; চলে যাবে, অত্যন্ত উল্লাসে
চ’লে যাবে এই সমাজ-সভ্যতা-সমস্ত দলিল
নষ্টদের অধিকারে ধুয়েমুছে, যে-রকম রাষ্ট্র
আর রাষ্ট্রযন্ত্র দিকে দিকে চলে গেছে নষ্টদের
অধিকারে। চ’লে যাবে শহর বন্দর ধানক্ষেত
কালো মেঘ লাল শাড়ি শাদা চাঁদ পাখির পালক
মন্দির মসজিদ গির্জা সিনেগগ পবিত্র প্যাগোডা।
অস্ত্র আর গণতন্ত্র চ’লে গেছে, জনতাও যাবে;
চাষার সমস্ত স্বপ্ন আস্তাকুড়ে ছুঁড়ে একদিন
সাধের সমাজতন্ত্রও নষ্টদের অধিকারে যাবে।
হুমায়ুন আজাদের এই কবিতারই উপন্যাস সংস্করণ মনে হলো যেন ডি-মাইনর বইটা। বইটা বলে ভবিষ্যতের সেই সময়ের কথা, যখন জীবনের সকল স্বাধীনতা চলে গেছে নষ্টদের অধিকারে, যখন শিল্প চলে গেছে নষ্টদের অধিকারে, প্রেমের আবেদন, একটা বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যা, এক ঝাঁক পাখি বা একাকী মানুষের বেঁচে থাকার স্বাধীনতা, এমনকি মৃত্যুর স্বাধনীতাও চলে গেছে নষ্টদের অধিকারে।
এ বইয়ে ফুটে উঠেছে আমার গল্প, এ বইয়ে ফুটে উঠেছে আমাদের গল্প, ফুটে উঠেছে এ শহরের প্রতিটা মানুষের খণ্ড খণ্ড গল্প, খণ্ড খণ্ড মৃত্যু। তাই বইটা পড়ার সময় মনে হয় বইটা যেন আমারই লেখা, হয়তো অন্য কোন জন্মে অন্য কোন ভুবনে আমি নিজেই লিখেছিলাম এ শহরের প্রতিটা মানুষের পাঁজরের ইতিহাস, নিজের বেঁচে থাকার ব্যর্থতা অথবা টিকে থাকার সফলতা।
আমাদের জীবনের প্রতিদিনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মৃত্যুকে এভাবে কোন বইয়ে রোপণ করতে দেখিনি আমি এর আগে কখনো। আমাদের প্রতিদিনের রোপণ করা খণ্ড খণ্ড মৃত্যু থেকে গড়ে উঠে হতাশার এক একটি গাছ, গড়ে উঠে জীবনের হতাশার অরণ্য, সেই অরণ্যে আমরা নিজেরাই কখন হারিয়ে যাই আমরা জানি না, আমরা তখন সূর্যের আলো দেখতে পারি না, পাহাড় দেখতে পারি না, ঝর্না দেখতে পারি না, এমনকি অরণ্যও দেখতে পারি না। আমরা পড়ে যাই সেই গোলকধাঁধায়, যেখান থেকে আমরা কখনো বের হতে পারি না, আমাদেরকে বের হতে দেয় না আমাদের রাষ্ট্র, আমাদের নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত মানুষরূপী ঈগলেরা।
তবুও এর মাঝে একদল যুবক বের হয়ে আসে অরণ্য থেকে, তারা দেখতে চায় সূর্যের লাল, আকাশের নীলিমা, ঝরনার ঝিরিপথ, পাহাড়ের সবুজ; তারা গড়ে তুলতে চায় সভ্যতার নতুন ভিত্তি, তারা আকাশের মেঘে উড়িয়ে দিতে চায় স্বাধীনতার পতাকা, তারা বেঁচে থাকার স্বাধীনতাকে স্বাভাবিক করতে চায় জীবনকে বাজি রেখে, তাঁরা একটি যুদ্ধ করতে চায় ঈগলের থাবা থেকে এই শহরকে বাঁচাতে। তাদের এই চাওয়াটা পূর্ণতা পেয়েছিল কিনা সেটা বড় প্রশ্ন নয়, তাঁরা চাইতে পেরেছিল সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় ব্যাপার। এই শহরের মানুষ ঈগলের থাবার ভয়ে কোনকিছু চাইতেও ভুলে গিয়েছিলো। এই যুবকের দল অন্তত চাইতে পেরেছিল।
শিরোনামহীনের গানে বললে,
জাহাজীর কাছে ভীষণ সত্য সেই,
পথটাই যাওয়ার, এর আর কোন ফিরে আসা নেই ।
শহরের জাহাজীরা ফিরে আসতে পারে না, ঐ যুবকের দল ফিরে আসতে চেয়েছিল, তারা মুক্তির পথ খুঁজেছিল, তারা মুক্তির গান গেয়েছিল, তারা আলোর পথে খুঁজেছিল, তারা নষ্টদের নষ্ট করতে চেয়েছিল, তারা ঈগলের ডানা পুড়িয়ে দিতে চেয়েছিলো।
বইয়ের ভালো লাগা কিছু লাইন:
পৃষ্ঠপোষকতার নামে যে-কোনো ধরনের আর্টকে রেসের মাঠে নামানোর অর্থই হলো সেটার অমর্যাদা করা।
মানুষকেই ঘুরে দাঁড়াতে হয় চলমান স্রোতের বিপরীতে, কখনো-বা মানুষেরই বিপরীতে। কিন্তু সেটা কি শুধুই স্বেচ্ছা প্রয়োজনে? নাকি অনেকটা বাধ্য হয়ে? অথবা ব্যাপারটা কি এমন যে মানুষের সাথে যাবতীয় জড়তা-স্থবিরতার সম্পর্কটা প্রতিদ্বন্দ্বিতার? বরং এটা ধরে নেওয়ায় সহজ হবে যে মানুষের ধর্মই নয় ক্যালেন্ডার হয়ে দেয়ালে ঝুলে থাকা, মানুষের ধর্ম মূলত চলন্ত ট্রেন কামরায় বসে দেখা মুহুর্মুহু বদলে যাওয়া দৃশ্যকল্পের মতো।
- মনিদা আপনিও কি পালাচ্ছেন আমার মতো?'
- পৃথিবীতে পালানোর মতো কোনো জায়গা আছে নাকি? আমার তো মনে হয় নেই। আমি আসলে খুঁজে বেড়াচ্ছি।
- কী খুঁজছেন দাদা?'
- আমি আসলে খুঁজে বেড়াচ্ছি গান, এটাকে তুমি অন্যকথায় সুরও বলতে পারো তাতে করে অর্থের ব্যপ্তিটা বাড়বে। শোনো, সুর মানে হলো সৃষ্টি বা ভারসাম্য আর বেসুরের অর্থ প্রলয় বা বিশৃঙ্খলা আর সমসুর হলো ভারসাম্যের একটা আইডিয়াল কন্ডিশান। এই যে সমতার নামে এত এত রক্ত ঝরল, মানুষে মানুষে বিভাজন এক থেকে অগণিত হলো সব সমসুর প্রতিষ্ঠার জন্যেই। সবার আগে প্রয়োজন ছিল ছড়ানো ছিটানো সুরকে একত্রিত করা তারপর এগুলোর ভেতর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। জানো তো? বেসুর সংখ্যায় কম কিন্তু ভয়ানক শক্তিশালী।
- শোনো, বিপদ থেইকে পলায়া সাময়িক মুক্তি পাওয়া যায় হয়তো, কিন্তু তাতে কইরে কোনো লাভ হয় না, বরং আরও বিপদ বাড়ে আর কইমে যায় বিপদ মুকাবেলা করার শক্তি।
- তাইলে আমি এখন কী করব আব্বা?
- না পলায়া তোমার উপরে আসা বিপদরে মুকাবেলা করো।
পরিস্থিতি কখনোই আমাদের মতো মানুষের হাতে ছিল না, এখনো নেই এবং ভবিষ্যতেও থাকবে না সেটা নিশ্চিত। একদল পিষবো আর একদল পিষ্ট হইব এইটাই ফ্যাক্ট। এখন তুই আমি কোন দলে যামু এইটা ডিপেন্ড করতেছে তুই আমি জন্মাইছি সোসাইটির কোন ক্লাসে।
আমি আবারও মনোযোগ ফেরাই টিনেজ দলটার দিকে। তারা কি একটা বিষয় নিয়ে যেন হাসাহাসি করছে খুব। সেটা দেখে মাথায় আসে একটা অদ্ভুত চিন্তা। যদিও আমি জানি না তাদের হাসির কারণ, তবুও মনে হয় সে কারণ যা কিছুই হোক না কেন তা নির্ঘাত অন্তঃসারশূন্য। এই জেনারেশনের সাথে কোনো সরাসরি যোগসূত্র নেই আমার তবুও বিগত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় যতটুকু বুঝেছি তাতে আলাদা করে তাদের অস্তিত্বটা টের পাইনি এখন অবধি। বরাবরই আমার মনে হয় তাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা টেস্টটিউবের ভেতর। বাইরের ছায়াচ্ছন্ন পৃথিবীর কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই কিংবা হয়তো সেটা জানার প্রয়োজনও তারা বোধ করে না।
প্রজাপতির যতটুকু সুন্দর সেটা তার ডানার কারুকার্যেই বাকিটা মোটামুটি অর্থে কুৎসিত, মানুষের অন্তকরণের ভেতরকার জমাট ঘৃণার মতো।
শোকেরা স্বভাবে উদ্বায়ী, অল্প আঁচেই উড়ে যায়, যেতে হয়। এই আঁচটা সময়ের, ব্যস্ততার কিংবা নিত্যকার দরকার-অদরকারি ভাবনার উপরিপাতনের।
মূলত প্রতিটা শোকের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে শক্তিশালী এক অদৃশ্য চুম্বক যা দুজন বিপরীতধর্মী মানুষের ভেতর জাগিয়ে তুলে তুমুল এক জৈবিক তাড়না।
ব্যক্তিগত বোঝাপড়াটা মুগ্ধতার একেবারে উল্টো। একটা বাড়লে আরেকটা আপনা আপনিই কমতে থাকে।
(আমার ব্যাক্তিগত সংযোজন: যেসকল মানুষ স্থির হয়ে থাকে জীবনযুদ্ধে, জীবনের অগ্রগতি সম্পর্কে যাদের ইচ্ছে ভঙ্গুর, যারা পরিবর্তনের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে না, তাদের মাঝে মুগ্ধতা একটা সময় পর মলিন হয়ে যায়। কিন্তু যারা এর উল্টো, তাদেরকে প্রতিনিয়ত নতুন করে বুঝতে হয়, তাদেরকে দেখে প্রতিনিয়ত মুগ্ধ হতে হয়)
এই চিঠিটা যখন পড়বে ততদিনে শহর পরিণত হয়েছে প্রেতপুরীতে। উৎপাদন যন্ত্রের নামে বাচ্চাদের খেলার মাঠগুলোর দখল নিয়েছে নামি-বেনামি সব স্থাপনা। নিরাপত্তাকার্যের দায়িত্বে নিয়োজিতদের অনুপস্থিতি ও স্বেচ্ছাচারিতায় শহর হয়ে পড়েছে ভীষণ রকমের অনিরাপদ। মায়েরা তাদের বাচ্চাদের চোখের আড়াল করতে ভয় পাচ্ছে কেন না চোখের আড়াল হলেই তারা শুরু করেছিল হারিয়ে যেতে। এদের ভেতর যারা যারা ফিরে আসছে তাদের ছোট শরীরের ভেতর ঢুকে পড়ছে এক একটা পরিণত মানুষ, যাদের বিবর্ধিত চোখে ইনসমনিয়ার চিহ্ন। সন্ধ্যার পর তুমি রাস্তায় বের হলে মনে হবে এই শহরে কোনো জীবিত মানুষ নেই। শরীরের ছাল-বাকল উঠে যাওয়া দাম্ভিক কুকুরগুলো কেবল শহরের আনাচে কানাচে ঘুরে ঘুরে নিরাপত্তাকর্মীর দায়িত্ব পালন করছে, অন্ধকারে যাদেরকে প্রায়ই তুমি হায়েনা ভেবে আঁতকে উঠবে ভয়ে...
বাঁচা-মরা নিয়া বেশি ভাবনা-চিন্তা কইরো না। যখন দেখবা যে জীবনের উদ্দেশ্য নিয়া ভ্যাবাচেকার মধ্যে পইড়া গ্যাছো শরীর থেইকা এইসব মিথ্যে পোশাক ছুইড়া ফালায়া একেবারে মাটির কাছে চইলা যাইবা। জন্মভূমির মাটির ভেতর অদ্ভুত রহস্যময় একটা ঘ্রাণ আছে। মানুষ মূলত পাগল হয়, নির্বিবাদে রক্ত ঢাইলা দ্যায় ঐ মাটিরে ভালোবাইসায়। সেই তোমারে ইশারা দিবো তোমার কী করা উচিত।
এই শহরে হঠাৎ করে কারো নিখোঁজ হয়ে যাওয়াটা বর্তমানে নতুন কিছু নয়। এরকম হচ্ছে অহরহই। কারো ভেতর কোনো প্রকার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ামাত্রই যা কিনা রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া বিন্যাসের সামান্য পরিপন্থি সেটিকে স্রেফ মিশিয়ে দেওয়া হয় ধুলোয়। তবে এখানে স্বেচ্ছায় মরে যাওয়াটা আইনের পরিপন্থি। সেটা চাইলে জিততে হবে যুক্তির লড়াই।
মানুষ সবচেয়ে বেশি নিরুদ্দেশ হবার প্রেরণা পায় বৃষ্টি ও জোছনা থেকে।
শুধুই 'আমিত্ব' ব্যাপারটা একটা ভয়াবহ অসুখ। কারণ এটা মানুষকে একসময় ঠেলে দেয় নিশ্চিত আত্মবিনাশের পথে। ব্যক্তিগত আয়নায় ঘুরে ঘুরে শুধু নিজেকেই বারবার দেখতে থাকলে একসময় তা থেকে জাগে মারাত্মক সব বিভ্রম। ব্যাপারটা আমি নিজেও টের পেয়েছি বেশ কিছু খণ্ড খণ্ড অভিজ্ঞতায়। অনেক দিন আগে কোথায় যেন শুনেছিলাম যে মৃতের সৎকার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী মানুষগুলোর ভেতর যাদেরকে অন্যান্যদের তুলনায় অধিক নির্ভার দেখায় ওরা মূলত তারাই যারা ভেতরে ভেতরে খুশিই হয় ঐ মৃতের বিপরীতে নিজেদেরকে জীবিত ভেবে। তবে এটা আমিত্বের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়। নিজের প্রতি প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভালোবাসার শুরুটা হয় অনেকটা এরকমভাবেই।
অভ্যাস ভয়ানক শক্তিশালী যা কিনা পুরোপুরি উল্টে দিতে পারে মানুষের আচার-আচরণের ধরন। অস্বস্তিকে বানাতে পারে স্বস্তি এবং সাহসীকে প্রচণ্ড রকমের ভীতু।
আকাশকে ধন্যবাদ জোর করে এই বইটা ধরিয়ে দেওয়ার জন্য।
হারুন ভাইকে ধন্যবাদ বইটিকে ধার দেওয়ার জন্য।
February 20, 2022
সালফার বৃষ্টির বিকেলে অসুস্থ কুকুরের মতো ধুঁকছে একটি নগর। এমন দিনে হঠাৎ এক তরুণ হাতে নেয় একটি ম্যানুস্ক্রিপ্ট। সেদিন থেকেই বদলে যেতে থাকে সবকিছু। উন্মোচিত হয় বিচিত্র এক সময়ের গল্প। যেখানে একনায়কতন্ত্রের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া স্বদেশ পুনরায় আটকে যায় অন্ধকারের শিকলে। ঘরের ভেতর বন্ধ দরজা, একোয়েস্টিক গীটারে গুম হয়ে যাবার সুর, নগরবাসীর স্মৃতির অ্যান্টেনায় কয়েকশত মৃত পাখি, রক্ত, যুদ্ধ, যেন শিমুল তুলার মতো নিয়ত ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে। এরমাঝে ‘চৌকাঠ’ ব্যান্ডের ভোকাল ও সময়ের শিল্পীরা কি আদৌ পারবে রাষ্ট্রব্যবস্থার সুচারু চক্র থেকে বের হতে? জিল্লুর রহমান সোহাগের 'ডি-মাইনর' উপন্যাসটি এমন করেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় মনে।
পাঠক হিসেবে বই পড়তে পড়তে কখনও এমন মুহূর্ত আসে যখন লেখকের লেখার মাঝে একজন পাঠক মিশে যেতে পারে নিবিড়ভাবে। এরপর একটা সময় পাঠক আবিষ্কার করে একজন এলিয়েনের মতো সে প্রবল এক আকর্ষণে ঢুকে পড়েছে লেখকেরই গল্পজগতে। যেই জগতের কোনকিছুই হয়তো সে আগে জানেনি, কিন্তু নিয়তির মতো সবকিছুই জীবন্ত হয়ে উঠেছে এখন তারই সামনে। সোহাগের উপন্যাসটি পড়ার সময় এমন কিছুই মনে হয়। একটা গোপন দরজা খোলামাত্রই যেন উন্মুক্ত হয়ে যায় আরও কয়েকশত দ্বিধা ও রহস্যময়তার সম্ভাবনার দরজা। উপন্যাসের প্রোটাগনিস্ট যখন পড়তে থাকা ডায়েরির পাতা উলটাতে থাকে, তখন পাঠক হিসেবে সামনে অনিশ্চিত কী আছে তা জানার একধরণের তীব্র তাগিদ সৃষ্টি হয়। মঞ্চনাটকের মতো এরপর একে একে আসে সঞ্জীব চৌধুরী, মহীনের ঘোড়াগুলির আদি ঘোড়া 'মনিদা’। সৃষ্টি হয় এক বিচিত্র ঘোর। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রের হন্যে হয়ে পরিচয়পত্র খুঁজে বেড়ানো, পলাতক জীবন, চোখের সামনে প্রিয়জনের মৃত্যু, শহর পেরিয়ে গ্রামের পরিচিত ভুবনের ঘুটঘুটে অন্ধকার পাঠকমনে অস্বস্তিকর এক টানাপড়েন সৃষ্টি করে। যেন ভীরু ইঁদুরদের শহরে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে বেড়াচ্ছে শকুনের দল।
নেটফ্লিক্সে ব্যাক মিরর দেখে কেন আমরা চমকে উঠি? কারণ, আমাদের মনে হয় এই ডিস্টোপিয়ান জগতই কি আছে তাহলে আমাদের ভবিষ্যতের ভেতরে? আমাদের বর্ণমালায় না থাকা এই গাঢ় অন্ধকার কি তবে অচিরেই ভাষা উঠবে বেঁচে থাকার নিষ্ঠুর ইঙ্গিতে? ডি-মাইনরও যেন একই ধাতুতে গড়া। যেখানে প্রবাহিত জীবন নিষ্পেষিত, তরঙ্গভঙ্গের আঘাতে জর্জরিত কিন্তু তারপরেও আশ্চর্যরকমের উজ্জ্বল!
ডি-মাইনর সোহাগের প্রথম উপন্যাস হলেও ওর বয়ানে অতিরিক্ত কিছু নেই। নেই একই গল্প বারবার বলার প্রবণতা। অধ্যায়ের নামগুলো ছন্দময় ও অর্থপূর্ণ। একটু অনুসন্ধানী মন নিয়ে খুঁজতে গেলেই অধ্যায়গুলোর নামকরণের সূত্রপাত খুঁজে পাওয়া যায়। উপন্যাস শেষ করে মনে হয়, যেন লেখক সোহাগের সৃষ্টি হয়েছেই এই উপন্যাস লেখার জন্য। সেখানে প্রোটাগনিস্টের হাত ধরে পাঠক ধীরে ধীরে এমন এক পরিণতির দিকে এগিয়ে যাবে, যেখানে খুব কৌশলে মঞ্চস্থ করা হয়েছে এমন এক সময়কে যা সকল সচেতন পাঠকের মনে সজোরে করাঘাত করবেই।
ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৪.৫। অর্ধতারা দেওয়া যায় না বলে পূর্ণ তারাই রইলো।
পাঠক হিসেবে বই পড়তে পড়তে কখনও এমন মুহূর্ত আসে যখন লেখকের লেখার মাঝে একজন পাঠক মিশে যেতে পারে নিবিড়ভাবে। এরপর একটা সময় পাঠক আবিষ্কার করে একজন এলিয়েনের মতো সে প্রবল এক আকর্ষণে ঢুকে পড়েছে লেখকেরই গল্পজগতে। যেই জগতের কোনকিছুই হয়তো সে আগে জানেনি, কিন্তু নিয়তির মতো সবকিছুই জীবন্ত হয়ে উঠেছে এখন তারই সামনে। সোহাগের উপন্যাসটি পড়ার সময় এমন কিছুই মনে হয়। একটা গোপন দরজা খোলামাত্রই যেন উন্মুক্ত হয়ে যায় আরও কয়েকশত দ্বিধা ও রহস্যময়তার সম্ভাবনার দরজা। উপন্যাসের প্রোটাগনিস্ট যখন পড়তে থাকা ডায়েরির পাতা উলটাতে থাকে, তখন পাঠক হিসেবে সামনে অনিশ্চিত কী আছে তা জানার একধরণের তীব্র তাগিদ সৃষ্টি হয়। মঞ্চনাটকের মতো এরপর একে একে আসে সঞ্জীব চৌধুরী, মহীনের ঘোড়াগুলির আদি ঘোড়া 'মনিদা’। সৃষ্টি হয় এক বিচিত্র ঘোর। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রের হন্যে হয়ে পরিচয়পত্র খুঁজে বেড়ানো, পলাতক জীবন, চোখের সামনে প্রিয়জনের মৃত্যু, শহর পেরিয়ে গ্রামের পরিচিত ভুবনের ঘুটঘুটে অন্ধকার পাঠকমনে অস্বস্তিকর এক টানাপড়েন সৃষ্টি করে। যেন ভীরু ইঁদুরদের শহরে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে বেড়াচ্ছে শকুনের দল।
নেটফ্লিক্সে ব্যাক মিরর দেখে কেন আমরা চমকে উঠি? কারণ, আমাদের মনে হয় এই ডিস্টোপিয়ান জগতই কি আছে তাহলে আমাদের ভবিষ্যতের ভেতরে? আমাদের বর্ণমালায় না থাকা এই গাঢ় অন্ধকার কি তবে অচিরেই ভাষা উঠবে বেঁচে থাকার নিষ্ঠুর ইঙ্গিতে? ডি-মাইনরও যেন একই ধাতুতে গড়া। যেখানে প্রবাহিত জীবন নিষ্পেষিত, তরঙ্গভঙ্গের আঘাতে জর্জরিত কিন্তু তারপরেও আশ্চর্যরকমের উজ্জ্বল!
ডি-মাইনর সোহাগের প্রথম উপন্যাস হলেও ওর বয়ানে অতিরিক্ত কিছু নেই। নেই একই গল্প বারবার বলার প্রবণতা। অধ্যায়ের নামগুলো ছন্দময় ও অর্থপূর্ণ। একটু অনুসন্ধানী মন নিয়ে খুঁজতে গেলেই অধ্যায়গুলোর নামকরণের সূত্রপাত খুঁজে পাওয়া যায়। উপন্যাস শেষ করে মনে হয়, যেন লেখক সোহাগের সৃষ্টি হয়েছেই এই উপন্যাস লেখার জন্য। সেখানে প্রোটাগনিস্টের হাত ধরে পাঠক ধীরে ধীরে এমন এক পরিণতির দিকে এগিয়ে যাবে, যেখানে খুব কৌশলে মঞ্চস্থ করা হয়েছে এমন এক সময়কে যা সকল সচেতন পাঠকের মনে সজোরে করাঘাত করবেই।
ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৪.৫। অর্ধতারা দেওয়া যায় না বলে পূর্ণ তারাই রইলো।
March 5, 2022
বিস্তারিত রিভিউর লিংক-
"ডি-মাইনর সমাচার ॥ হামিম কামাল | চিন্তাসূত্র" https://www.chintasutra.com/review/%E...
সংক্ষেপ: লেখার শৈলী নিয়ে কথা আছে৷ কিন্তু শৈলীটা ছাপিয়ে গল্প নিয়ে আমার প্রশংসাবাক্য ছাড়া আর কিছু বলার নেই। যে সৎ উদ্বেগ, প্রশ্ন এই ডিস্টোপিয়ান উপন্যাস তৈরি করছে, আমার কাছে তার তুলনা কেবল ডি মাইনরই।
সমাজদৃশ্য নির্মাণ, চরিত্রের স্পষ্টতা নিয়ে আরো কাজ করার আছে৷ সব মিলিয়ে ঔপন্যাসিক জিল্লুর রহমান সোহাগের আগামীর অভিযাত্রাটা দেখার জন্যে আমি অধীর হয়ে আছি।
"ডি-মাইনর সমাচার ॥ হামিম কামাল | চিন্তাসূত্র" https://www.chintasutra.com/review/%E...
সংক্ষেপ: লেখার শৈলী নিয়ে কথা আছে৷ কিন্তু শৈলীটা ছাপিয়ে গল্প নিয়ে আমার প্রশংসাবাক্য ছাড়া আর কিছু বলার নেই। যে সৎ উদ্বেগ, প্রশ্ন এই ডিস্টোপিয়ান উপন্যাস তৈরি করছে, আমার কাছে তার তুলনা কেবল ডি মাইনরই।
সমাজদৃশ্য নির্মাণ, চরিত্রের স্পষ্টতা নিয়ে আরো কাজ করার আছে৷ সব মিলিয়ে ঔপন্যাসিক জিল্লুর রহমান সোহাগের আগামীর অভিযাত্রাটা দেখার জন্যে আমি অধীর হয়ে আছি।
February 2, 2022
কিছু কিছু বই আছে না, পড়তে শুরু করলে মনে হয় কখন শেষ হবে, গলায় বিঁধে থাকা কাঁটার মতো অস্বস্তি তৈরি করে মনে, শেষটা জানার জন্য আর পাঠক আনন্দের সাথে কী হয়-কী হয় অনুভূতি নিয়ে এক টানা পড়ে পৌঁছায় শেষ পাতায়। আনন্দ তখন দ্বিগুণ হয়ে যায়। জিল্লুর রহমান সোহাগের 'ডি-মাইনর' উপন্যাসটা অনেকটা তেমন। ডিস্টোপিয়ান এই উপন্যাসে সোহাগ এক্সপ্লোর করেছেন রাজনীতি থেকে শুরু করে ব্যক্তিমানুষের সমস্ত অনুভূতির স্তর আর গল্পধর্মী এই উপন্যাসে ঘটনাপ্রবাহ এতো স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসেছে, দীর্ঘ কলেবরে লেখা উপন্যাস শেষ করে পাঠকের মনে হতে পারে, আরেকটু বড় হলে, কী চমৎকার হতো!
যেহেতু, উপন্যাসটা ডিস্টোপিয়ান সেহেতু প্রেক্ষাপট, ঘটনাপ্রবাহে বিশ্বাসযোগ্যতা একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তো পালন করেই, সোহাগের উপন্যাসের প্রথম পঞ্চাশ পাতা পড়লেই এই বিশ্বাসযোগ্যতার জায়গাটা পাকাপোক্ত হয়ে যায়, ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্টে সোহাগ দেখিয়েছেন মুন্সিয়ানা, তাই উপন্যাসের জগতে গা ভাসিয়ে দিতে খুব একটা কষ্ট হবে না পাঠকের। গল্প যতো আগাবে, পাঠক ঠিক ততটাই ইনভলভ হয়ে যাবে গল্পের সাথে এবং টের পাবে লেখক যা লিখেছে তা সে জেনেই লিখেছে। রেফারেন্স হিসেবে এসেছে মিউজিশিয়ানের জীবন, এসেছে মিউজিক, উম্মাতাল শহর, নাগরিক যাপন, একটা ডায়েরি, যে ডায়েরির পাতা থেকে উড়ে যাচ্ছে অসংখ্য হিংস্র ঈগল। খোলা চোখে এই এস্টাব্লিশমেন্টের পথটাকে জটিল মনে হলেও, সোহাগ যেন দূরবীন চোখে দেখেছেন এইসব। তাই, ভিন্ন বাস্তবতায় লেখা এই উপন্যাস পাঠকের কাছে খুব সহজেই হয়ে উঠবে প্রাসঙ্গিক।
উপন্যাসের ভাষা ঝরঝরে, কিন্তু মোটেও তরল নয়। গল্পের গতি চমৎকার। মনে হয়, এতো বড় উপন্যাস সোহাগ লিখেছেন উসাইন বোল্টের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে, তাই হয়তো ক্লান্তি এই উপন্যাসে নেই বরং গল্পের গভীরতা এতো মধুর, আউলা বাতাসের মতো টেনে নিয়ে যাবে পাঠককে।
উপন্যাসের গল্পে আছে অসংখ্য লেয়ার। সোহাগ যে জায়গা থেকে গল্প ফেঁদেছেন, সে জায়গা থেকে অনেক গুলো সম্ভাবনা তৈরি হয়। এই সম্ভাবনাগুলো কখনও কখনও ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্ট তৈরি করবে পাঠকের মনে, কখনও হয়তো পাঠককে করবে উত্তেজিত, চূড়ান্ত মানসিক চাপ তৈরির জন্য কখনও কখনও পাঠক হতে পারে বিরক্ত। কিন্তু, সব শেষে এই লেয়ারগুলো... এই গল্পের আড়ালে গল্পগুলোই হয়তো 'ডি-মাইনর'এর প্রাণপাখি।
উপন্যাসের প্রোটাগনিস্টকে পাওয়া যায় ডায়েরির পাতায়, তাই উপন্যাস পড়তে পড়তে পাঠকের হয়তো হবে একটা চমৎকার ব্যক্তিগত ডায়েরি পড়ার অভিজ্ঞতা। প্রোটাগনিস্টের মনস্তাত্ত্বিক বোধের প্রত্যেকটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গেছে ভাববাদ, জাতীয়তাবাদ এবং কাঙ্ক্ষিত শিল্প। কখনও প্রোটাগনিস্টকে মনে হয় 'আউটসাইডার' উপন্যাসের প্রোটাগনিস্টের মতো নির্লিপ্ত, কখনও মনে হবে 'টিন ড্রাম' উপন্যাসের প্রোটাগনিস্টের মতো লাউড। এছাড়াও বিভিন্ন ক্যারেক্টার যেমন বাবা, বন্ধুরা, আপেক্ষিক অর্থে উপন্যাসের নায়িকা টাইপ ক্যামিও ক্যারেক্টারগুলো চমৎকার রোল প্লে করেছে যার জন্য উপন্যাসে এসেছে দারুণ সাম্যাবস্থা।
এসবের আড়ালেও কথা থাকে, যেমন উপন্যাসে বর্ণিত বাবা ক্যারেক্টারের মধ্যে আমি পেয়েছি তলস্তয়ের প্রফেসি। এক সন্ধ্যায় হঠাৎ দলছুট হয়ে যাওয়া সঞ্জীব চৌধুরীকে সাকুরা বারে দেখতে পেয়ে অদ্ভুত আনন্দে ভরে গেছে মন কিংবা মহিনের ঘোড়ার মতো ছুটে চলা ট্রেনে মনিদা'র সাথে জার্নি দাগ কেটে গেছে বারবার আর এসবের মাঝে মাথার উপর দিয়ে চক্কর দেয়া ঈগল আমাকে ক্রমাগত দিচ্ছিল রুঢ় বাস্তবতার স্বাদ।
সোহাগ এই উপন্যাসের জগত কখনও দেখেছেন, পাখির চোখ দিয়ে, কখনও দেখেছেন জহুরীর চোখে, তৈরি করেছেন সাস্পেন্স, পাঠক হিসেবে আমি পেয়েছি থ্রিল। সুপর্ণার চলে যাওয়া এবং প্রোটাগনিস্টের গ্রামে ফিরে যাওয়ার মধ্যে যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, সুপর্ণার ফিরে আসা এবং ট্রেনে আগুন লাগা থেকে বেঁচে শহরে ফিরে আসার মধ্য দিয়ে হয়েছে সে সম্পর্কের শেষ আর এতো সম্পর্কের সমীকরণের মাঝে লেখকের বর্ণনাকে বারবার মনে হয়েছে ভীষণ মর্মস্পর্শী।
শুরুতেই বলেছি, উপন্যাসটা বিশ্বাসযোগ্য লেগেছে , উপন্যাসটা শেষ করে এই বিশ্বাসযোগ্যতার পিছনের কারণ স্পষ্ট হয় আমার কাছে, পাঠক আমি বুঝতে পারি, এই উপন্যাসের সাথে কোথাও মিশে গেছে লেখকের আত্মা। তাই, ঈগলের চোখ উপেক্ষা করে আমি অপেক্ষা করি একটা কনসার্টের, আমি অপেক্ষা করি, কারণ আমি গলা ছেড়ে গাইতে চাই ঘুম ভাঙ্গানোর গান, আমি অপেক্ষা করি, ডি-মাইনরে একটা সাইকোডেলিক গান তুলবার জন্য, আমি অপেক্ষা করি, কারণ, অপেক্ষা করাই পৃথিবীর শেষ সত্য।
যেহেতু, উপন্যাসটা ডিস্টোপিয়ান সেহেতু প্রেক্ষাপট, ঘটনাপ্রবাহে বিশ্বাসযোগ্যতা একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তো পালন করেই, সোহাগের উপন্যাসের প্রথম পঞ্চাশ পাতা পড়লেই এই বিশ্বাসযোগ্যতার জায়গাটা পাকাপোক্ত হয়ে যায়, ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্টে সোহাগ দেখিয়েছেন মুন্সিয়ানা, তাই উপন্যাসের জগতে গা ভাসিয়ে দিতে খুব একটা কষ্ট হবে না পাঠকের। গল্প যতো আগাবে, পাঠক ঠিক ততটাই ইনভলভ হয়ে যাবে গল্পের সাথে এবং টের পাবে লেখক যা লিখেছে তা সে জেনেই লিখেছে। রেফারেন্স হিসেবে এসেছে মিউজিশিয়ানের জীবন, এসেছে মিউজিক, উম্মাতাল শহর, নাগরিক যাপন, একটা ডায়েরি, যে ডায়েরির পাতা থেকে উড়ে যাচ্ছে অসংখ্য হিংস্র ঈগল। খোলা চোখে এই এস্টাব্লিশমেন্টের পথটাকে জটিল মনে হলেও, সোহাগ যেন দূরবীন চোখে দেখেছেন এইসব। তাই, ভিন্ন বাস্তবতায় লেখা এই উপন্যাস পাঠকের কাছে খুব সহজেই হয়ে উঠবে প্রাসঙ্গিক।
উপন্যাসের ভাষা ঝরঝরে, কিন্তু মোটেও তরল নয়। গল্পের গতি চমৎকার। মনে হয়, এতো বড় উপন্যাস সোহাগ লিখেছেন উসাইন বোল্টের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে, তাই হয়তো ক্লান্তি এই উপন্যাসে নেই বরং গল্পের গভীরতা এতো মধুর, আউলা বাতাসের মতো টেনে নিয়ে যাবে পাঠককে।
উপন্যাসের গল্পে আছে অসংখ্য লেয়ার। সোহাগ যে জায়গা থেকে গল্প ফেঁদেছেন, সে জায়গা থেকে অনেক গুলো সম্ভাবনা তৈরি হয়। এই সম্ভাবনাগুলো কখনও কখনও ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্ট তৈরি করবে পাঠকের মনে, কখনও হয়তো পাঠককে করবে উত্তেজিত, চূড়ান্ত মানসিক চাপ তৈরির জন্য কখনও কখনও পাঠক হতে পারে বিরক্ত। কিন্তু, সব শেষে এই লেয়ারগুলো... এই গল্পের আড়ালে গল্পগুলোই হয়তো 'ডি-মাইনর'এর প্রাণপাখি।
উপন্যাসের প্রোটাগনিস্টকে পাওয়া যায় ডায়েরির পাতায়, তাই উপন্যাস পড়তে পড়তে পাঠকের হয়তো হবে একটা চমৎকার ব্যক্তিগত ডায়েরি পড়ার অভিজ্ঞতা। প্রোটাগনিস্টের মনস্তাত্ত্বিক বোধের প্রত্যেকটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গেছে ভাববাদ, জাতীয়তাবাদ এবং কাঙ্ক্ষিত শিল্প। কখনও প্রোটাগনিস্টকে মনে হয় 'আউটসাইডার' উপন্যাসের প্রোটাগনিস্টের মতো নির্লিপ্ত, কখনও মনে হবে 'টিন ড্রাম' উপন্যাসের প্রোটাগনিস্টের মতো লাউড। এছাড়াও বিভিন্ন ক্যারেক্টার যেমন বাবা, বন্ধুরা, আপেক্ষিক অর্থে উপন্যাসের নায়িকা টাইপ ক্যামিও ক্যারেক্টারগুলো চমৎকার রোল প্লে করেছে যার জন্য উপন্যাসে এসেছে দারুণ সাম্যাবস্থা।
এসবের আড়ালেও কথা থাকে, যেমন উপন্যাসে বর্ণিত বাবা ক্যারেক্টারের মধ্যে আমি পেয়েছি তলস্তয়ের প্রফেসি। এক সন্ধ্যায় হঠাৎ দলছুট হয়ে যাওয়া সঞ্জীব চৌধুরীকে সাকুরা বারে দেখতে পেয়ে অদ্ভুত আনন্দে ভরে গেছে মন কিংবা মহিনের ঘোড়ার মতো ছুটে চলা ট্রেনে মনিদা'র সাথে জার্নি দাগ কেটে গেছে বারবার আর এসবের মাঝে মাথার উপর দিয়ে চক্কর দেয়া ঈগল আমাকে ক্রমাগত দিচ্ছিল রুঢ় বাস্তবতার স্বাদ।
সোহাগ এই উপন্যাসের জগত কখনও দেখেছেন, পাখির চোখ দিয়ে, কখনও দেখেছেন জহুরীর চোখে, তৈরি করেছেন সাস্পেন্স, পাঠক হিসেবে আমি পেয়েছি থ্রিল। সুপর্ণার চলে যাওয়া এবং প্রোটাগনিস্টের গ্রামে ফিরে যাওয়ার মধ্যে যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, সুপর্ণার ফিরে আসা এবং ট্রেনে আগুন লাগা থেকে বেঁচে শহরে ফিরে আসার মধ্য দিয়ে হয়েছে সে সম্পর্কের শেষ আর এতো সম্পর্কের সমীকরণের মাঝে লেখকের বর্ণনাকে বারবার মনে হয়েছে ভীষণ মর্মস্পর্শী।
শুরুতেই বলেছি, উপন্যাসটা বিশ্বাসযোগ্য লেগেছে , উপন্যাসটা শেষ করে এই বিশ্বাসযোগ্যতার পিছনের কারণ স্পষ্ট হয় আমার কাছে, পাঠক আমি বুঝতে পারি, এই উপন্যাসের সাথে কোথাও মিশে গেছে লেখকের আত্মা। তাই, ঈগলের চোখ উপেক্ষা করে আমি অপেক্ষা করি একটা কনসার্টের, আমি অপেক্ষা করি, কারণ আমি গলা ছেড়ে গাইতে চাই ঘুম ভাঙ্গানোর গান, আমি অপেক্ষা করি, ডি-মাইনরে একটা সাইকোডেলিক গান তুলবার জন্য, আমি অপেক্ষা করি, কারণ, অপেক্ষা করাই পৃথিবীর শেষ সত্য।
January 30, 2026
ডি-মাইনর শেষ করলাম।
বেশ লম্বা সময় নিয়ে পড়েছি বইটা। শেষ করার পর তৃপ্ত হয়েছি? — না। বরং বলব, আমার খুব একটা ভালো লাগেনি। বইয়ের জনরা হিসেবে বলা যেতে পারে ‘ডিস্টোপিয়ান’ জনরার বই। এই জনরা আমাদের বাংলা সাহিত্যে কিছুটা নতুন; আমরা সাধারণ পাঠক খুব একটা পরিচিত নই। তাই বলে একেবারে অপরিচিত, সেটাও না। আমাদের প্রথম ডিস্টোপিয়ান সম্ভবত ‘প্রিসিলা’, এর পর ‘গ্রাফিতিও প্রশ্ন করে’। হ্যাঁ, এই দুইটাই পড়েছি। ‘প্রিসিলা’ অসম্ভব ভালো উপন্যাস, ‘গ্রাফিতি’ এভারেজ থেকে বেটার।
তাই, জনরা হিসেবে আমার কাছে ‘ডি-মাইনর’ অপরিচিত ছিল না। বরং বলব, বেশ সুপরিচিত। আমরা স্বাভাবিক যে ফর্মে একটা উপন্যাস কল্পনা করি, এটা সেই ফর্মের বাইরের কাজ। গতানুগতিক ফর্মের বাইরে গিয়েও ভালো উপন্যাস হতে পারে। ‘ডি-মাইনর’ সেটা পারেনি।
উপন্যাসটা আমার কাছে অগোছালো আর এলোমেলো মনে হয়েছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। ছোট ছোট অধ্যায়ে ভাগ করা হয়েছে বলে পড়তে বেগ পেতে হয়নি; নাহলে শেষ করা আমার জন্য কষ্টকর হতো।
‘ডি-মাইনর’ চমৎকার প্রোডাকশনের একটা বই। এই বই হাতে নিলে মন ভালো হয়ে যাবে। ‘চন্দ্রবিন্দু’র যে ৬/৭টা বই আমার আছে, সেগুলো থেকে এটা ভিন্ন। বইটা যে বিশেষ যত্নে ছাপানো, সেটা হাতে নিলেই যেকোনো পাঠক বুঝতে পারবে। আর হ্যাঁ, প্রচ্ছদ ব্যক্তিগত ভাবে পছন্দ হয়েছে, হলুদ রঙ ভাল্লাগে আমার…
এত যত্নের পরও বড়সড় কিছু প্রিন্টিং মিস্টেক থেকে গেছে বইটিতে। ২৯৫ পেজে প্রথম প্যারাগ্রাফ যাবে ২৯৪ পেজের প্রথমে, ২৯২–৯৩ পেজেও এলোমেলো লাগছে। ২৯৪ পেজের প্রথম প্যারাগ্রাফও অন্য কোথাও থেকে এখানে চলে এসেছে… আমারটা ২০২২ সালের প্রথম এডিশন; পরে এটা ঠিক করা হয়েছে কি না, জানি না।
বেশ লম্বা সময় নিয়ে পড়েছি বইটা। শেষ করার পর তৃপ্ত হয়েছি? — না। বরং বলব, আমার খুব একটা ভালো লাগেনি। বইয়ের জনরা হিসেবে বলা যেতে পারে ‘ডিস্টোপিয়ান’ জনরার বই। এই জনরা আমাদের বাংলা সাহিত্যে কিছুটা নতুন; আমরা সাধারণ পাঠক খুব একটা পরিচিত নই। তাই বলে একেবারে অপরিচিত, সেটাও না। আমাদের প্রথম ডিস্টোপিয়ান সম্ভবত ‘প্রিসিলা’, এর পর ‘গ্রাফিতিও প্রশ্ন করে’। হ্যাঁ, এই দুইটাই পড়েছি। ‘প্রিসিলা’ অসম্ভব ভালো উপন্যাস, ‘গ্রাফিতি’ এভারেজ থেকে বেটার।
তাই, জনরা হিসেবে আমার কাছে ‘ডি-মাইনর’ অপরিচিত ছিল না। বরং বলব, বেশ সুপরিচিত। আমরা স্বাভাবিক যে ফর্মে একটা উপন্যাস কল্পনা করি, এটা সেই ফর্মের বাইরের কাজ। গতানুগতিক ফর্মের বাইরে গিয়েও ভালো উপন্যাস হতে পারে। ‘ডি-মাইনর’ সেটা পারেনি।
উপন্যাসটা আমার কাছে অগোছালো আর এলোমেলো মনে হয়েছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। ছোট ছোট অধ্যায়ে ভাগ করা হয়েছে বলে পড়তে বেগ পেতে হয়নি; নাহলে শেষ করা আমার জন্য কষ্টকর হতো।
‘ডি-মাইনর’ চমৎকার প্রোডাকশনের একটা বই। এই বই হাতে নিলে মন ভালো হয়ে যাবে। ‘চন্দ্রবিন্দু’র যে ৬/৭টা বই আমার আছে, সেগুলো থেকে এটা ভিন্ন। বইটা যে বিশেষ যত্নে ছাপানো, সেটা হাতে নিলেই যেকোনো পাঠক বুঝতে পারবে। আর হ্যাঁ, প্রচ্ছদ ব্যক্তিগত ভাবে পছন্দ হয়েছে, হলুদ রঙ ভাল্লাগে আমার…
এত যত্নের পরও বড়সড় কিছু প্রিন্টিং মিস্টেক থেকে গেছে বইটিতে। ২৯৫ পেজে প্রথম প্যারাগ্রাফ যাবে ২৯৪ পেজের প্রথমে, ২৯২–৯৩ পেজেও এলোমেলো লাগছে। ২৯৪ পেজের প্রথম প্যারাগ্রাফও অন্য কোথাও থেকে এখানে চলে এসেছে… আমারটা ২০২২ সালের প্রথম এডিশন; পরে এটা ঠিক করা হয়েছে কি না, জানি না।
September 17, 2023
আমাদের ভবিষ্যৎ পৃথিবী কেমন হতে পারে? অনেক লেখক কল্পনায় সেই ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে দেখার চেষ্টা করেছেন এবং সেই চেষ্টায় সামিল করেছেন পাঠকদের। কল্পনা বলতে এখানে পুরোপুরি কল্পনার আশ্রয় করা হয় এমনটা নয় কারণ ভবিষ্যতের সেই পৃথিবী কল্পনায় লেখক ভিত্তি করেন বর্তমান কিংবা অতীত সময়কালকে। লেখকের ভবিষ্যৎ পৃথিবী যদি নৈরাজ্যে ভরপুর হয়, সে সাথে রাষ্ট্র বলতে যা বোঝায় তা একনায়কতন্ত্রের আদলে গঠিত হয় যেখানে ন্যায়বিচার মুখের বুলি, আপনার মত প্রকাশের অধিকারেও যখন রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করে তখন তা অরাজকতায় ভরপুর এক পৃথিবী হয়ে ধরা দেয় আমাদের মাঝে। যেটাকে ডিস্টোপিয়ান ঘরানা বলে আখ্যায়িত করা হয়।
‘দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে নতুন বাজার, আমাদের চৌদিকে আগুন,
গুলির ইস্পাতি শিলাবৃষ্টি অবিরাম।
তুমি বলেছিলে আমাকে বাঁচাও।
অসহায় আমি তাও বলতে পারিনি।'
-শামসুর রাহমান
ডি-মাইনর ডিস্টোপিয়ান জনরার উপর ভিত্তি করে লোখা একটি উপন্যাস। দুইটি টাইমলাইনে লেখা এই উপন্যাসে বর্তমানের চরিত্র হল রনন নামের এক ব্যক্তি যে একজন পেশায় মিউজিশিয়ান। একদিম সালফার বৃষ্টির রাতে সে খুঁজে পায় একটা পাণ্ডুলিপি। পাণ্ডুলিপির লেখক অতীতের একজন মিউজিশিয়ান। যে সময়ের কথা লেখক তার লেখায় বর্ণনা করেছেন সে সময়ে নিজের স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ পর্যন্ত করা যদয় না। রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া আইনকানুনের ভারে ন্যুব্জ মানুষগুলো মুখ গুঁজে চলা শিখে গিয়েছে যেখানে বৃহৎ আকারে নেই কোন প্রতিরোধ। প্রতিটি মানুষ যেন এক একটি রাষ্ট্র চালিত রোবট। এর মাঝে কিছু যুবক প্রতিরোধ হিসাবে রাতের আঁধারে স্ট্রিটল্যাম্প ভাঙে। তাছাড়া গায়ক হিসাবে নেই কোম স্বাধীনতা, নেই জনসম্মুখে গান করার অধিকার পর্যন্ত নেই। যেখানে জনসমাগম করাটাই অন্যায় সেখানে কনসার্ট তো কোন ছাই! এর মাঝে আমাদের পাণ্ডুলিপির লেখক রবিন গল্প বলে যান নিজের মতো করে।
রনন এবং রবিন দুইজনই যেন একে অপরের প্রতিবিম্ব। দুইজনই আলাদা সময়ের প্রতিনিধিত্ব করলেও চিন্তা ভাবনায় তারা এক।
একজন মিউজিশিয়ান যখন তার সময়কে ছাপিয়ে ভবিষ্যতে তার পেশা কেমন হবে কল্পনা করেন তখনই ডি-মাইনরের মতো উপন্যাস রচিত হয়। লেখক তার শিল্পীসত্তার ছোঁয়া রেখে গিয়েছেন লেখায়। ডিস্টোপিয়ান রাজ্যে একজন মিউজিশিয়ানের খোলা কনসার্টে গান গাইতে না পারার আক্ষেপে, মত প্রকাশ করতে গিয়ে গলায় বন্দী শেকলের জন্য কিছু বলতে না পারার আক্ষেপে বিলাপ করে গিয়েছেন। লেখকরে নিজস্ব চিন্তা ভাবনাও বইয়ে ফুটে উঠেছে। যদিও উপন্যাসটি পেইজটার্নার। সহজে পড়ে ফেলা যায়। তবে মাঝে মাঝে কিছু অস্পষ্টতা রয়ে গিয়েছে যেন! যেমন অরণীর অদ্ভুত আচরণের কথাই বলা যাক, সে তার পেশায় ফ্যাশন ডিজাইনার হলেও লেখক গড়ে তুলেছেন তার চরিত্রটিকে রহস্যের মোড়কে। তাতে করে মনে হয় অরণীকে মনে হয়ে ছোঁয়ার বাইরে। শেষে গিয়ে হঠাৎ সুপর্ণার আগমনও তেমনই রহস্যময়।
এই বইয়ে যে জিনিসটি একটু দৃষ্টিকটু সেটা হলো সম্পানায় খামতি। অনেকসময় পেজের শেষে গিয়ে দেখা যাচ্ছে বাক্য অসম্পূর্ণ, বা পরের পেইজে নতুন লাইন শুরু অথচ পূর্ববর্তী পেইজের শেষ লাইনটার বাকি অংশ নাই। এসবকিছু এড়ালে ডি-মাইনর চমৎকার একটি উপন্যাস!
ডি-মাইনর পড়তে গিয়ে আমার অবচেতন মনে লেখক সুহান রিজওয়ানের "গ্রাফিতিও প্রশ্ন করে" বইটির কথা মাথায় আসছিলো। পড়তে পড়তে হারুন ভাইয়ের সাথে আলোচনার ফাঁকে জানতে পারি ''গ্রাফিতি'' এবং "ডি-মাইনর" আলাদা আলাদা লেখকের আলাদা লেখা হলেও দুই লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকাংশে একই। অর্থাৎ বলা যায় একই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দুইজন লেখক দুইটি আলাদা এবং সতন্ত্র উপন্যাস রচনা করেছেন। আমারও সেটাই মনে হয়। এই নিয়ে লেখক সুহান রিজওয়ানের ডি-মাইনর বইটার রিভিউয়ের কথা খানিকটা উল্লেখ করা চলে,
"দূরবর্তী কোনো সময়ে ডিস্টোপিয়ান এক জনপদে কীভাবে দূষিত হয়ে আছে একদল তরুণের মনোজগৎ, 'ডি-মাইনর' খুঁড়ে দেখতে চেয়েছে সেই সম্ভাবনা- ঠিক 'গ্রাফিতি...' এর মতোই। পার্থক্য বলতে, ‘ডি-মাইনর' উপন্যাসে লেখক তার পর্যবেক্ষণের কেন্দ্র করে তুলেছেন একজন শিল্পীকে (মিউজিশিয়ান), আর অন্য উপন্যাসটায় কেন্দ্ৰীয় চরিত্র ছিলো একজন লেখক।"
‘দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে নতুন বাজার, আমাদের চৌদিকে আগুন,
গুলির ইস্পাতি শিলাবৃষ্টি অবিরাম।
তুমি বলেছিলে আমাকে বাঁচাও।
অসহায় আমি তাও বলতে পারিনি।'
-শামসুর রাহমান
ডি-মাইনর ডিস্টোপিয়ান জনরার উপর ভিত্তি করে লোখা একটি উপন্যাস। দুইটি টাইমলাইনে লেখা এই উপন্যাসে বর্তমানের চরিত্র হল রনন নামের এক ব্যক্তি যে একজন পেশায় মিউজিশিয়ান। একদিম সালফার বৃষ্টির রাতে সে খুঁজে পায় একটা পাণ্ডুলিপি। পাণ্ডুলিপির লেখক অতীতের একজন মিউজিশিয়ান। যে সময়ের কথা লেখক তার লেখায় বর্ণনা করেছেন সে সময়ে নিজের স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ পর্যন্ত করা যদয় না। রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া আইনকানুনের ভারে ন্যুব্জ মানুষগুলো মুখ গুঁজে চলা শিখে গিয়েছে যেখানে বৃহৎ আকারে নেই কোন প্রতিরোধ। প্রতিটি মানুষ যেন এক একটি রাষ্ট্র চালিত রোবট। এর মাঝে কিছু যুবক প্রতিরোধ হিসাবে রাতের আঁধারে স্ট্রিটল্যাম্প ভাঙে। তাছাড়া গায়ক হিসাবে নেই কোম স্বাধীনতা, নেই জনসম্মুখে গান করার অধিকার পর্যন্ত নেই। যেখানে জনসমাগম করাটাই অন্যায় সেখানে কনসার্ট তো কোন ছাই! এর মাঝে আমাদের পাণ্ডুলিপির লেখক রবিন গল্প বলে যান নিজের মতো করে।
রনন এবং রবিন দুইজনই যেন একে অপরের প্রতিবিম্ব। দুইজনই আলাদা সময়ের প্রতিনিধিত্ব করলেও চিন্তা ভাবনায় তারা এক।
একজন মিউজিশিয়ান যখন তার সময়কে ছাপিয়ে ভবিষ্যতে তার পেশা কেমন হবে কল্পনা করেন তখনই ডি-মাইনরের মতো উপন্যাস রচিত হয়। লেখক তার শিল্পীসত্তার ছোঁয়া রেখে গিয়েছেন লেখায়। ডিস্টোপিয়ান রাজ্যে একজন মিউজিশিয়ানের খোলা কনসার্টে গান গাইতে না পারার আক্ষেপে, মত প্রকাশ করতে গিয়ে গলায় বন্দী শেকলের জন্য কিছু বলতে না পারার আক্ষেপে বিলাপ করে গিয়েছেন। লেখকরে নিজস্ব চিন্তা ভাবনাও বইয়ে ফুটে উঠেছে। যদিও উপন্যাসটি পেইজটার্নার। সহজে পড়ে ফেলা যায়। তবে মাঝে মাঝে কিছু অস্পষ্টতা রয়ে গিয়েছে যেন! যেমন অরণীর অদ্ভুত আচরণের কথাই বলা যাক, সে তার পেশায় ফ্যাশন ডিজাইনার হলেও লেখক গড়ে তুলেছেন তার চরিত্রটিকে রহস্যের মোড়কে। তাতে করে মনে হয় অরণীকে মনে হয়ে ছোঁয়ার বাইরে। শেষে গিয়ে হঠাৎ সুপর্ণার আগমনও তেমনই রহস্যময়।
এই বইয়ে যে জিনিসটি একটু দৃষ্টিকটু সেটা হলো সম্পানায় খামতি। অনেকসময় পেজের শেষে গিয়ে দেখা যাচ্ছে বাক্য অসম্পূর্ণ, বা পরের পেইজে নতুন লাইন শুরু অথচ পূর্ববর্তী পেইজের শেষ লাইনটার বাকি অংশ নাই। এসবকিছু এড়ালে ডি-মাইনর চমৎকার একটি উপন্যাস!
ডি-মাইনর পড়তে গিয়ে আমার অবচেতন মনে লেখক সুহান রিজওয়ানের "গ্রাফিতিও প্রশ্ন করে" বইটির কথা মাথায় আসছিলো। পড়তে পড়তে হারুন ভাইয়ের সাথে আলোচনার ফাঁকে জানতে পারি ''গ্রাফিতি'' এবং "ডি-মাইনর" আলাদা আলাদা লেখকের আলাদা লেখা হলেও দুই লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকাংশে একই। অর্থাৎ বলা যায় একই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দুইজন লেখক দুইটি আলাদা এবং সতন্ত্র উপন্যাস রচনা করেছেন। আমারও সেটাই মনে হয়। এই নিয়ে লেখক সুহান রিজওয়ানের ডি-মাইনর বইটার রিভিউয়ের কথা খানিকটা উল্লেখ করা চলে,
"দূরবর্তী কোনো সময়ে ডিস্টোপিয়ান এক জনপদে কীভাবে দূষিত হয়ে আছে একদল তরুণের মনোজগৎ, 'ডি-মাইনর' খুঁড়ে দেখতে চেয়েছে সেই সম্ভাবনা- ঠিক 'গ্রাফিতি...' এর মতোই। পার্থক্য বলতে, ‘ডি-মাইনর' উপন্যাসে লেখক তার পর্যবেক্ষণের কেন্দ্র করে তুলেছেন একজন শিল্পীকে (মিউজিশিয়ান), আর অন্য উপন্যাসটায় কেন্দ্ৰীয় চরিত্র ছিলো একজন লেখক।"
June 18, 2022
ধরা যাক, এমন এক সময় এলো, যখন একটা জনপদের ইতিহাস বলে যা কিছু ছিল সব ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টায় প্রায় সফল হচ্ছে ক্ষমতায় বসে থাকা লোকজন। বর্তমানকে এমনই কোণঠাসা করে রাখা হচ্ছে যে বেঁচে থাকাটাকেই এক বিশাল অর্জন বলে ধরে নিয়ে লোকজন মাথানিচু করে শুধু পার করে চলে দিনের পর দিন।
বাতাস গুমোট, বৃষ্টির জলে দুর্গন্ধ, মানুষ একে অন্যের থেকে বিচ্ছিন্ন। তার স্বাভাবিক জীবন যাপনের নিশ্চয়তা নেই কিন্তু স্বেচ্ছায় মৃত্যু বরণের অধিকারও নেই। এইরকম এক সময়ে, একদা এক রাজ্যে একজন বা একদল শিল্পীর অবস্থানটা কেমন হবে?
জিল্লুর রহমান সোহাগ সেই একজন বা একদল শিল্পীর যে গল্প করেছেন ডি মাইনর-এ, তা এই উপন্যাসকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করায় শেষ পর্যন্ত? আমার ধারণা, আরও অনেক প্রশ্নে জর্জর এক হলুদ রঙের দুপুরে।
ডি মাইনর'র প্রধান টাইমলাইন দুটি। দেশ যখন বদলে যাচ্ছিল, সেই সময়ের আখ্যান আমরা জানতে পারি একটা রহস্যময় পান্ডুলিপি থেকে। সেটি একজন তরুণ পড়ে যেতে থাকে বর্তমানে বসে অর্থাৎ যখন দেশটা একেবারে বদলে গেছে।
পান্ডুলিপির রচয়িতা ও পাঠক, দুজনেই শিল্পী। ওরা গান গায়। প্রথমজনার যাবতীয় কর্ম অতীত হয়ে গেছে, যা শুধু কন্ঠস্বর, আর দ্বিতীয়জন বর্তমানে সক্রিয়। বদলে যেতে থাকা সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সেই শিল্পীর দল কী কী করেছিল? আর যে পান্ডুলিপিটা পড়ছে, সেই বা এসব জেনে কী করবে? নিজের বর্তমান যাপনকে করবে প্রশ্নবিদ্ধ? নাকি বেছে নেবে বিপ্লব? নাকি কিছুই করবে না?
পড়তে পড়তে মনে হয়েছে এ এক পেজ টার্নার। একেবারে বুলেট ট্রেনের গতিতে আমি পাতার পর পাতা উল্টে গেছি।
সম্পাদনাজনিত কিছু ত্রুটি আমার চোখ এড়াতে পারেনি, বারবার মনে হয়েছে আরও কিছু সময় সম্পাদকের টেবিলে এ কাটাতেই পারত। কখনও কখনও লেখকের কন্ঠস্বর অধিক উচ্চকিত হয়ে উঠেছে চরিত্রগুলোকে ছাপিয়ে। কিছু কিছু চরিত্রের আরও জীবন্ত হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও ছিল। প্লটের যে স্বাভাবিক নাটকীয়তার দাবি, সেই প্রলোভন থেকেও লেখক যে শতভাগ উৎরে গেছেন, তা বলবো না।
কিন্তু সমস্ত কিছু পার করেই ডি মাইনরের বড় দুটি সফলতার একটি হল, এর কল্পবিশ্বে উৎপাদিত প্রশ্নগুলোতে পাঠক হিসেবে আমি নিজেও জর্জরিত হয়ে গেছি। যে কোন পাঠকেরই হওয়ার কথা। দ্বিতীয় সফলতা হচ্ছে নিরেট একটা আখ্যান দাঁড় করাতে পারা, যার মাঝখান দিয়ে যেন বা জানালার কাঁচের একধারে দাঁড়িয়ে দেখে নেয়া যায় এক ভয়ানক ডিস্টোপিয়াকে।
বাতাস গুমোট, বৃষ্টির জলে দুর্গন্ধ, মানুষ একে অন্যের থেকে বিচ্ছিন্ন। তার স্বাভাবিক জীবন যাপনের নিশ্চয়তা নেই কিন্তু স্বেচ্ছায় মৃত্যু বরণের অধিকারও নেই। এইরকম এক সময়ে, একদা এক রাজ্যে একজন বা একদল শিল্পীর অবস্থানটা কেমন হবে?
জিল্লুর রহমান সোহাগ সেই একজন বা একদল শিল্পীর যে গল্প করেছেন ডি মাইনর-এ, তা এই উপন্যাসকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করায় শেষ পর্যন্ত? আমার ধারণা, আরও অনেক প্রশ্নে জর্জর এক হলুদ রঙের দুপুরে।
ডি মাইনর'র প্রধান টাইমলাইন দুটি। দেশ যখন বদলে যাচ্ছিল, সেই সময়ের আখ্যান আমরা জানতে পারি একটা রহস্যময় পান্ডুলিপি থেকে। সেটি একজন তরুণ পড়ে যেতে থাকে বর্তমানে বসে অর্থাৎ যখন দেশটা একেবারে বদলে গেছে।
পান্ডুলিপির রচয়িতা ও পাঠক, দুজনেই শিল্পী। ওরা গান গায়। প্রথমজনার যাবতীয় কর্ম অতীত হয়ে গেছে, যা শুধু কন্ঠস্বর, আর দ্বিতীয়জন বর্তমানে সক্রিয়। বদলে যেতে থাকা সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সেই শিল্পীর দল কী কী করেছিল? আর যে পান্ডুলিপিটা পড়ছে, সেই বা এসব জেনে কী করবে? নিজের বর্তমান যাপনকে করবে প্রশ্নবিদ্ধ? নাকি বেছে নেবে বিপ্লব? নাকি কিছুই করবে না?
পড়তে পড়তে মনে হয়েছে এ এক পেজ টার্নার। একেবারে বুলেট ট্রেনের গতিতে আমি পাতার পর পাতা উল্টে গেছি।
সম্পাদনাজনিত কিছু ত্রুটি আমার চোখ এড়াতে পারেনি, বারবার মনে হয়েছে আরও কিছু সময় সম্পাদকের টেবিলে এ কাটাতেই পারত। কখনও কখনও লেখকের কন্ঠস্বর অধিক উচ্চকিত হয়ে উঠেছে চরিত্রগুলোকে ছাপিয়ে। কিছু কিছু চরিত্রের আরও জীবন্ত হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও ছিল। প্লটের যে স্বাভাবিক নাটকীয়তার দাবি, সেই প্রলোভন থেকেও লেখক যে শতভাগ উৎরে গেছেন, তা বলবো না।
কিন্তু সমস্ত কিছু পার করেই ডি মাইনরের বড় দুটি সফলতার একটি হল, এর কল্পবিশ্বে উৎপাদিত প্রশ্নগুলোতে পাঠক হিসেবে আমি নিজেও জর্জরিত হয়ে গেছি। যে কোন পাঠকেরই হওয়ার কথা। দ্বিতীয় সফলতা হচ্ছে নিরেট একটা আখ্যান দাঁড় করাতে পারা, যার মাঝখান দিয়ে যেন বা জানালার কাঁচের একধারে দাঁড়িয়ে দেখে নেয়া যায় এক ভয়ানক ডিস্টোপিয়াকে।
March 23, 2022
ডিসটোপিয়ান উপন্যাস লেখার একটা ঝোঁক এখন দেখা যাচ্ছে। তবে ডিসটোপিয়াকে এত তীব্র বাস্তবতার ভেতরে ফেলে দেওয়া উপন্যাসটি যে ডি মাইনর হবে সেটা আমি শুরুতেই ভাবতে পারিনি। এজন্য লেখকের কাছে ক্ষমাও চেয়ে নেওয়া উচিত হয়তো আমার।
আর্টিস্ট আসলে কী? আর্টিস্টের কাজ আসলে কী? কেন স্বৈরশাসক এলে সবার আগে বন্ধ করে দিতে চাওয়া হয় শিল্পের সকল মাধ্যম?
খুব মৌলিক কিছু প্রশ্ন তাড়া করে ফিরলেন লেখক পুরো উপন্যাসজুড়েই। তার গল্পের শক্তি এতটাই প্রবল ছিল যে শুরুর দিকে ভাষার অহেতুক অলংকারও এই গল্পের আনন্দ নিতে কোনো বাধা তৈরি করল না।
পরবর্তীতে বইটা নিয়ে বিস্তারিত লেখার আশা রাখি।
তবে রিকমেন্ড করব সবাইকেই যারা একটু ভিন্ন ধাঁচের উপন্যাস পড়তে চান।
আর্টিস্ট আসলে কী? আর্টিস্টের কাজ আসলে কী? কেন স্বৈরশাসক এলে সবার আগে বন্ধ করে দিতে চাওয়া হয় শিল্পের সকল মাধ্যম?
খুব মৌলিক কিছু প্রশ্ন তাড়া করে ফিরলেন লেখক পুরো উপন্যাসজুড়েই। তার গল্পের শক্তি এতটাই প্রবল ছিল যে শুরুর দিকে ভাষার অহেতুক অলংকারও এই গল্পের আনন্দ নিতে কোনো বাধা তৈরি করল না।
পরবর্তীতে বইটা নিয়ে বিস্তারিত লেখার আশা রাখি।
তবে রিকমেন্ড করব সবাইকেই যারা একটু ভিন্ন ধাঁচের উপন্যাস পড়তে চান।
August 10, 2023
"... পড়তে পড়তে ভাবিঃ কী করে- একে অন্যের সাথে কিছুমাত্র আলোচনা না করেও - সমকালকে আমরা আবিষ্কার করেছি একইভাবে?
বিস্ময় বোধ না করে পারি না, কী করে, ‘ডি-মাইনর’ হয়ে উঠেছে এমন এক উপন্যাস, যা আদতে আমারই লেখা কিন্তু অন্য কারো শব্দে? "
বিস্তারিতঃ ওয়েবসাইট
বিস্ময় বোধ না করে পারি না, কী করে, ‘ডি-মাইনর’ হয়ে উঠেছে এমন এক উপন্যাস, যা আদতে আমারই লেখা কিন্তু অন্য কারো শব্দে? "
বিস্তারিতঃ ওয়েবসাইট
February 17, 2024
লেখনী শৈলীতেই যে তীব্রতা তা প্রথমেই নজর কাড়ে। সঙ্গে দুর্দান্তসব ইঙ্গিতবহ ঘটনা পুরো উপন্যাসকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। অনেকদিন মনে রাখার মতোন লেখা পড়লাম।
April 28, 2023
অনেকদিন পরে একটা বই পড়ে শেষ করলাম। বইটা পড়ে মনে হইলো যে বর্তমান শাসকগোষ্ঠী বই পড়ে না।পড়লে এতোদিনে লেখকের কাছে ফুডপান্ডার অর্ডার চলে আসতো। একটা আপাত ডিস্টোপিয়ান নভেলই বলা চলে যেটার সাথে আপনি,আমি,আমরা খুবই ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত।আমাদের জীবনে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া ঘটনারই প্রকাশ করেছেন লেখক। কনসেপ্ট টা চমৎকার। কিন্তু এক্সিকিউশন এর ক্ষেত্রে আমার কিছু আক্ষেপ রয়ে গেছে।ঘটনাগুলো যেভাবে গাঁথা, তাতে রোলারকোস্টার জার্নির সম্ভাবনা ক্ষীন।এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এই বইটি আপনার অবশ্যই পড়া উচিত যদি বর্তমান প্রেক্ষাপটে আপনার অবস্থান কোথায় আপনি তা জানতে চান।বেশ সময়োপযোগী এবং থট প্রভোকিং বই।
হাইলি রেকমেন্ডেড
হাইলি রেকমেন্ডেড
March 14, 2025
গল্পের পরিণতিটুকু ওপেন এন্ডেড রাখতে গিয়ে শেষদিকে লেখায় খানিক বিক্ষিপ্তি নজরে পড়লেও নিঃসন্দেহে একটি সুলিখিত উপন্যাস। এই উপন্যাসের গঠন এবং লিখন শৈলীর মধ্যে পছন্দের অনেক এলেমেন্ট খুঁজে পেয়েছি। লেখকের ভবিষ্যতের লেখালেখির প্রতি আগ্রহ রইল। (৪/৫)
January 4, 2026
বিষাক্ত অ্যাসিড বৃষ্টি আর এক বিষণ্ণ শহরে মিউজিশিয়ান রুনন জ্যামিং শেষে ফেরার পথে আশ্রয় নেয় এক অদ্ভুত পুরনো দোকানে। যেখানে যন্ত্রের মতো মানুষগুলো পুরনো বই কেটে ঠোঙা বানিয়ে যাচ্ছে চারদিকে খেয়াল না করেই। সেখানে পুরোনো কাগজের ভাঁজে সে খুঁজে পায় এক বেওয়ারিশ পাণ্ডুলিপি, যার লেখক অজ্ঞাত এক নায়ক, এক মিউজিশিয়ান। পাণ্ডুলিপিটি হাতে পাওয়া মাত্রই রুনন অনুভব করে এক অলৌকিক টান যেন কোনো অশরীরী কণ্ঠস্বর হয়ে তাকে এটি পড়ার আদেশ দিচ্ছে।
বাসায় ফিরে রুনন যখন লেখাটির গভীরে ডুব দেয়, তখন তার চারপাশের পরিবেশ বদলে যেতে শুরু করে। একদিকে পাণ্ডুলিপির অদ্ভুত মিল, আর অন্যদিকে মৃত বন্ধু পৃথ্বীরাজের হাহাকার মেশানো কণ্ঠস্বর, সব মিলিয়ে রুনন এক পরাবাস্তব গোলকধাঁধায় বন্দি হয়ে পড়ে সেই পান্ডুলিপির সাথেই।
এই পান্ডুলিপির লেখক নিজেকে পরিচয় করিয়ে দেয় রবিন নামে। এই নামটি তার নিজের দেওয়া, কারণ বাবার পছন্দ করা পারিবারিক নামটির প্রতি তার চিরকালই এক ধরনের অনীহা ছিল। তবে তার জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় বা পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল এক অদ্ভুত সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই। নিজের নামের পাশাপাশি যখন যেদিন তার মায়ের নামটিও বদলে দিয়েছিলো, সেদিন থেকেই তার জীবনের এক নতুন এবং রহস্যময় অধ্যায়ের সূচনা হয়। তার মতে, মানুষের নাম কেবল একটি সম্বোধন নয়, বরং এটি তার নিজস্ব সত্তার একটি অংশ।
এক সময়ের পিছুটানকে পিছনে ফেলে রবিন এখন শহুরে জীবনে অভ্যস্ত। নিজের চলন বলন আর পোশাক আশাকে সে মফস্বলের সেই পুরনো ছাপটুকু সযত্নে মুছে ফেলেছে। আজকাল বরং নাগরিক এই জীবনের যান্ত্রিকতাটাই তাকে ভাবিয়ে তোলে। গভীর বিস্ময়ে লক্ষ্য করে সে, কীভাবে সময় বদলে যাচ্ছে! এককালের সবুজ বনানী আর ফসলের মাঠ গ্রাস করে নিচ্ছে কাঁচ আর স্টিলের সুউচ্চ অট্টালিকা। প্রকৃতির স্নিগ্ধতাকে গিলে খাচ্ছে নগরায়ন।
ব্যক্তিগত জীবনে রবিন সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগী। গান গাইতে ভালোবাসে, যদিও শ্রোতাদের করতালির পেছনের প্রকৃত অর্থ নিয়ে তার মনে এখনও সংশয় জাগে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু রবিন, ব্রুস, লিপ্টন, কাউয়াস এবং ড্যানি মিলে গড়ে তুলেছিলো গানের দল ‘চৌকাঠ’। তাদের এই বন্ধুত্ব কেবল গান বাজনার নয়, বরং প্রত্যেকের ব্যক্তিগত সংকট ও সম্মিলিত অস্তিত্ব রক্ষার এক লড়াই। যে লড়াই তাদের চালিয়ে যেতে হয় শহরে গড়ে উঠা যাবতীয় প্রশাসনিক আর রাজনৈতিক আগ্রাসনের সাথে। বন্ধুত্বের এই বন্ধন যতই দেখতে দৃঢ় হোক না কেন চৌকাঠের প্রতিটি সদস্যই যেন এক আলাদা, স্বতন্ত্র গল্প বয়ে চলে পান্ডুলিপির কালো অক্ষরে। যেখানে যোগ দেয় আরো অনেক চরিত্র, যাদের কেউ কেউ বিদায় নেয় শীঘ্রই। আর রবিনের জীবনের গল্পে গল্পে আভাস রেখে যায় সেইসব প্রতিটি চরিত্র।
গল্পের কাহিনিগুলোর পাশাপাশি উঠে এসেছে এক অদ্ভুত শহরের পরিবেশের গল্প যেখানে পুরোনো একনায়কতন্ত্রের অবসানের পর এক নতুন ধরনের নিয়ন্ত্রিত শাসনব্যবস্থা চেপে বসেছে দেশের আনাচে কানাচে। উঠে এসেছে কীভাবে একটি প্রজন্মকে নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে তাদের চিন্তা করার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। আর তাতে মানুষ যখন প্রতিবাদ করা ভুলতে বসেছে, তখনই রাষ্ট্রের কাজ সহজ হয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। তবুও শহরে কিছু বখাটে ঘুরে বেড়ায় সব বাঁধা নিয়মকে উপেক্ষা করে। কখনো তারা আগুন দেয় শহরের আভিজাত্যদের আড্ডায় কখনো বা রাস্তায় গানে গানে করে প্রতিবাদ সমাবেশ। তবুও শহরের যাবতীয় শাসনের নিয়মব্যবস্থা আস্তে আস্তে চেপে বসে শহরের মানুষের উপর। মাথার উপর অপেক্ষায় থাকে শকুনেরা, আর নিচে রাস্তার কুকুর, খুবলে খেতে রক্তে মাংসের শরীর।
বছরটা আমার শুরু হয়েছে ডি-মাইনরের মতো চমৎকার একটা বই পড়ে। গল্পের আবহ আমাকে এমন এক আবেশে ঢুকিয়ে দিয়েছে যে অদ্ভুত নিয়মকানুনের পরাবাস্তব শহরের গল্পে রননের সাথে পান্ডুলিপিতে ডুব দেওয়ার পর সেখান থেকে বের হওয়াটা কঠিন হয়ে গিয়েছিলো। সুরের মতোই লেখক জীবনের উত্থানপতনের গল্প তুলে ধরে সাদা পাতায় কালো অক্ষরে সুর তুলেছেন। যেখানে গান আর জীবন মিলেমিশে এক চমৎকার সুরে পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে।
গল্পের প্রতিটি চরিত্র, শহরের নিয়মকানুন, বখাটেদের উৎপাত সবকিছু যখন পড়ে গিয়েছি তখন আমাদেরই দেশের নানাসময়ের নানান রাজনৈতিক আর শাসনব্যবস্থার কথা মনে পড়েছে। মনে পড়েছে বিপ্লবী কিছু স্বাধীনচেতা দামাল ছেলেদের কথা। সাথে গল্পের প্রধান চরিত্রের জীবনের নানান সময় আমাদের ব্যক্তি জীবনের স্মৃতিকেও নাড়িয়ে দিয়ে যায়।
বইটির নামটা বেশ অদ্ভুত। প্রথমে ঠিক ধরতে পারিনি। হয়তো যাদের মিউজিক নিয়ে ভালো একটা ধারণা আছে তারা অনায়াসে ধরে ফেলতে পারবে। ডি-মাইনর শব্দটার মানে খুঁজতে গিয়েই আমি বুঝেছি লেখক কেন এই গল্পের নাম দিয়েছেন ডি-মাইনর। মিউজিকে ডি-মাইনর হলো একটি বিশেষ স্কেল বা কর্ড যে সুরে ফুটে উঠে পৃথিবীর অন্যতম বিষাদ বা দুঃখ গুলো যা শুনলে মনের মধ্যে এক ধরনের একাকীত্ব, বিষাদ আর গাম্ভীর্য তৈরি হয়। লেখক তার বইয়ে 'ডি-মাইনর' শব্দটি দিয়ে কেবল একটি সুর নয়, বরং গল্প কথকের মানসিক অবস্থাকেও বুঝিয়েছেন। এক শব্দে এঁকেছেন গল্পের প্রধান চরিত্রের মনের ভেতর যে হাহাকার, একাকীত্ব, ট্র্যাজেডি রয়েছে, তাকেই। তা কেবল বুঝতে পারবেন বইটি পড়লে।
লেখকের লিখনরীতির বেশ প্রসংশা করতে হয়, পড়লেই মনে হয় এক ধরণের রহস্যময় ও কুয়াশাচ্ছন্ন আবহ ঘিরে ধরছে, যা বইটি পড়তে গিয়ে ঘোরের মধ্যে ফেলে দেয়। লেখক গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে ছোট ছোট বাক্য আর শক্তিশালী উপমার ব্যবহার করেছেন। গল্প বর্ণনায় তার নানা রূপক ব্যবহার কাহিনীর গভীরতা আর বিষণ্ণতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে আর এই কাব্যিক ও ধারালো গদ্যই উপন্যাসটিকে একেবারেই আলাদা করে তুলেছে। সাথে ছোটো গল্পের মতো অদ্ভুত আকর্ষণীয় হেডলাইনের অধ্যায়ে গল্প এগিয়ে যাওয়ায় বইটি শেষ করতে বেশ কম সময়ই লাগবে।
পাঠক বিষন্ন বিকেলে আয়েস করে পড়ার জন্য ডি-মাইনর একটা চমৎকার বই। যার লেখা আর গল্পের জাদু আপনাকে এক অন্য জগতে নিয়ে যাবে। যেখানে শব্দগুলো মায়াজালে আটকে ফেলবে আর তাতেই সাধারণ গল্পটা ধরা দেবে অসাধারণ হয়ে। আর তাই ডি-মাইনর কর্ডের বিষন্ন সুরে আপনাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে গেলাম এই চমৎকার বইটি পড়ার। এমনটা একটা চমৎকার কনটেন্ট আর প্রোডাকশনের বই প্রকাশনীর বইয়ের শেলফে তেলাপোকা খুঁটে খুঁটে খেয়ে চিহ্ন রেখে গেছে ভাবতেই খারাপ লাগছে।
বই: ডি-মাইনর
লেখক: জিল্লুর রহমান সোহাগ
প্রচ্ছদ: শিপাহী রেজা
প্রকাশক: চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন
মূল্য: ৬৫০৳
পৃষ্ঠা: ৩২৭
বাসায় ফিরে রুনন যখন লেখাটির গভীরে ডুব দেয়, তখন তার চারপাশের পরিবেশ বদলে যেতে শুরু করে। একদিকে পাণ্ডুলিপির অদ্ভুত মিল, আর অন্যদিকে মৃত বন্ধু পৃথ্বীরাজের হাহাকার মেশানো কণ্ঠস্বর, সব মিলিয়ে রুনন এক পরাবাস্তব গোলকধাঁধায় বন্দি হয়ে পড়ে সেই পান্ডুলিপির সাথেই।
এই পান্ডুলিপির লেখক নিজেকে পরিচয় করিয়ে দেয় রবিন নামে। এই নামটি তার নিজের দেওয়া, কারণ বাবার পছন্দ করা পারিবারিক নামটির প্রতি তার চিরকালই এক ধরনের অনীহা ছিল। তবে তার জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় বা পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল এক অদ্ভুত সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই। নিজের নামের পাশাপাশি যখন যেদিন তার মায়ের নামটিও বদলে দিয়েছিলো, সেদিন থেকেই তার জীবনের এক নতুন এবং রহস্যময় অধ্যায়ের সূচনা হয়। তার মতে, মানুষের নাম কেবল একটি সম্বোধন নয়, বরং এটি তার নিজস্ব সত্তার একটি অংশ।
এক সময়ের পিছুটানকে পিছনে ফেলে রবিন এখন শহুরে জীবনে অভ্যস্ত। নিজের চলন বলন আর পোশাক আশাকে সে মফস্বলের সেই পুরনো ছাপটুকু সযত্নে মুছে ফেলেছে। আজকাল বরং নাগরিক এই জীবনের যান্ত্রিকতাটাই তাকে ভাবিয়ে তোলে। গভীর বিস্ময়ে লক্ষ্য করে সে, কীভাবে সময় বদলে যাচ্ছে! এককালের সবুজ বনানী আর ফসলের মাঠ গ্রাস করে নিচ্ছে কাঁচ আর স্টিলের সুউচ্চ অট্টালিকা। প্রকৃতির স্নিগ্ধতাকে গিলে খাচ্ছে নগরায়ন।
ব্যক্তিগত জীবনে রবিন সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগী। গান গাইতে ভালোবাসে, যদিও শ্রোতাদের করতালির পেছনের প্রকৃত অর্থ নিয়ে তার মনে এখনও সংশয় জাগে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু রবিন, ব্রুস, লিপ্টন, কাউয়াস এবং ড্যানি মিলে গড়ে তুলেছিলো গানের দল ‘চৌকাঠ’। তাদের এই বন্ধুত্ব কেবল গান বাজনার নয়, বরং প্রত্যেকের ব্যক্তিগত সংকট ও সম্মিলিত অস্তিত্ব রক্ষার এক লড়াই। যে লড়াই তাদের চালিয়ে যেতে হয় শহরে গড়ে উঠা যাবতীয় প্রশাসনিক আর রাজনৈতিক আগ্রাসনের সাথে। বন্ধুত্বের এই বন্ধন যতই দেখতে দৃঢ় হোক না কেন চৌকাঠের প্রতিটি সদস্যই যেন এক আলাদা, স্বতন্ত্র গল্প বয়ে চলে পান্ডুলিপির কালো অক্ষরে। যেখানে যোগ দেয় আরো অনেক চরিত্র, যাদের কেউ কেউ বিদায় নেয় শীঘ্রই। আর রবিনের জীবনের গল্পে গল্পে আভাস রেখে যায় সেইসব প্রতিটি চরিত্র।
গল্পের কাহিনিগুলোর পাশাপাশি উঠে এসেছে এক অদ্ভুত শহরের পরিবেশের গল্প যেখানে পুরোনো একনায়কতন্ত্রের অবসানের পর এক নতুন ধরনের নিয়ন্ত্রিত শাসনব্যবস্থা চেপে বসেছে দেশের আনাচে কানাচে। উঠে এসেছে কীভাবে একটি প্রজন্মকে নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে তাদের চিন্তা করার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। আর তাতে মানুষ যখন প্রতিবাদ করা ভুলতে বসেছে, তখনই রাষ্ট্রের কাজ সহজ হয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। তবুও শহরে কিছু বখাটে ঘুরে বেড়ায় সব বাঁধা নিয়মকে উপেক্ষা করে। কখনো তারা আগুন দেয় শহরের আভিজাত্যদের আড্ডায় কখনো বা রাস্তায় গানে গানে করে প্রতিবাদ সমাবেশ। তবুও শহরের যাবতীয় শাসনের নিয়মব্যবস্থা আস্তে আস্তে চেপে বসে শহরের মানুষের উপর। মাথার উপর অপেক্ষায় থাকে শকুনেরা, আর নিচে রাস্তার কুকুর, খুবলে খেতে রক্তে মাংসের শরীর।
বছরটা আমার শুরু হয়েছে ডি-মাইনরের মতো চমৎকার একটা বই পড়ে। গল্পের আবহ আমাকে এমন এক আবেশে ঢুকিয়ে দিয়েছে যে অদ্ভুত নিয়মকানুনের পরাবাস্তব শহরের গল্পে রননের সাথে পান্ডুলিপিতে ডুব দেওয়ার পর সেখান থেকে বের হওয়াটা কঠিন হয়ে গিয়েছিলো। সুরের মতোই লেখক জীবনের উত্থানপতনের গল্প তুলে ধরে সাদা পাতায় কালো অক্ষরে সুর তুলেছেন। যেখানে গান আর জীবন মিলেমিশে এক চমৎকার সুরে পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে।
গল্পের প্রতিটি চরিত্র, শহরের নিয়মকানুন, বখাটেদের উৎপাত সবকিছু যখন পড়ে গিয়েছি তখন আমাদেরই দেশের নানাসময়ের নানান রাজনৈতিক আর শাসনব্যবস্থার কথা মনে পড়েছে। মনে পড়েছে বিপ্লবী কিছু স্বাধীনচেতা দামাল ছেলেদের কথা। সাথে গল্পের প্রধান চরিত্রের জীবনের নানান সময় আমাদের ব্যক্তি জীবনের স্মৃতিকেও নাড়িয়ে দিয়ে যায়।
বইটির নামটা বেশ অদ্ভুত। প্রথমে ঠিক ধরতে পারিনি। হয়তো যাদের মিউজিক নিয়ে ভালো একটা ধারণা আছে তারা অনায়াসে ধরে ফেলতে পারবে। ডি-মাইনর শব্দটার মানে খুঁজতে গিয়েই আমি বুঝেছি লেখক কেন এই গল্পের নাম দিয়েছেন ডি-মাইনর। মিউজিকে ডি-মাইনর হলো একটি বিশেষ স্কেল বা কর্ড যে সুরে ফুটে উঠে পৃথিবীর অন্যতম বিষাদ বা দুঃখ গুলো যা শুনলে মনের মধ্যে এক ধরনের একাকীত্ব, বিষাদ আর গাম্ভীর্য তৈরি হয়। লেখক তার বইয়ে 'ডি-মাইনর' শব্দটি দিয়ে কেবল একটি সুর নয়, বরং গল্প কথকের মানসিক অবস্থাকেও বুঝিয়েছেন। এক শব্দে এঁকেছেন গল্পের প্রধান চরিত্রের মনের ভেতর যে হাহাকার, একাকীত্ব, ট্র্যাজেডি রয়েছে, তাকেই। তা কেবল বুঝতে পারবেন বইটি পড়লে।
লেখকের লিখনরীতির বেশ প্রসংশা করতে হয়, পড়লেই মনে হয় এক ধরণের রহস্যময় ও কুয়াশাচ্ছন্ন আবহ ঘিরে ধরছে, যা বইটি পড়তে গিয়ে ঘোরের মধ্যে ফেলে দেয়। লেখক গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে ছোট ছোট বাক্য আর শক্তিশালী উপমার ব্যবহার করেছেন। গল্প বর্ণনায় তার নানা রূপক ব্যবহার কাহিনীর গভীরতা আর বিষণ্ণতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে আর এই কাব্যিক ও ধারালো গদ্যই উপন্যাসটিকে একেবারেই আলাদা করে তুলেছে। সাথে ছোটো গল্পের মতো অদ্ভুত আকর্ষণীয় হেডলাইনের অধ্যায়ে গল্প এগিয়ে যাওয়ায় বইটি শেষ করতে বেশ কম সময়ই লাগবে।
পাঠক বিষন্ন বিকেলে আয়েস করে পড়ার জন্য ডি-মাইনর একটা চমৎকার বই। যার লেখা আর গল্পের জাদু আপনাকে এক অন্য জগতে নিয়ে যাবে। যেখানে শব্দগুলো মায়াজালে আটকে ফেলবে আর তাতেই সাধারণ গল্পটা ধরা দেবে অসাধারণ হয়ে। আর তাই ডি-মাইনর কর্ডের বিষন্ন সুরে আপনাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে গেলাম এই চমৎকার বইটি পড়ার। এমনটা একটা চমৎকার কনটেন্ট আর প্রোডাকশনের বই প্রকাশনীর বইয়ের শেলফে তেলাপোকা খুঁটে খুঁটে খেয়ে চিহ্ন রেখে গেছে ভাবতেই খারাপ লাগছে।
বই: ডি-মাইনর
লেখক: জিল্লুর রহমান সোহাগ
প্রচ্ছদ: শিপাহী রেজা
প্রকাশক: চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন
মূল্য: ৬৫০৳
পৃষ্ঠা: ৩২৭
November 2, 2023
সমাজ সংসার মিছে সব
মিছে এ জীবনের কলরব।।
রবীন্দ্রনাথের গানের লাইনগুলো আমার মন মাঝে মধ্যেই চিৎকার করে গেয়ে উঠে। জীবনের পৌনঃপুনিকতা। জীবনের একঘেয়ে একপেশে বিষন্নতায় জর্জরিত দিনগুলোর আবর্তনে। ডি - মাইনর বইয়ের সামগ্রিক আবহ বর্ণনার জন্য রবীন্দ্রনাথের গানের এই দুটি লাইনই যথেষ্ট মনে হয়েছে আমার। লেখকের সাবলীল বর্ণনা, গল্প বলার ধরন, গল্পের দৃশ্যপটগুলো খুব সহজেই চোখের সামনে তুলে ধরছিলো। গল্পের প্রোটাগনিস্টের সাথে অনেক ক্ষেত্রেই একাত্মতাবোধ কাজ করেছে। নিঃসঙ্গ, দলছুট, শেকড়বিহীন মানসিকতায়।
মিছে এ জীবনের কলরব।।
রবীন্দ্রনাথের গানের লাইনগুলো আমার মন মাঝে মধ্যেই চিৎকার করে গেয়ে উঠে। জীবনের পৌনঃপুনিকতা। জীবনের একঘেয়ে একপেশে বিষন্নতায় জর্জরিত দিনগুলোর আবর্তনে। ডি - মাইনর বইয়ের সামগ্রিক আবহ বর্ণনার জন্য রবীন্দ্রনাথের গানের এই দুটি লাইনই যথেষ্ট মনে হয়েছে আমার। লেখকের সাবলীল বর্ণনা, গল্প বলার ধরন, গল্পের দৃশ্যপটগুলো খুব সহজেই চোখের সামনে তুলে ধরছিলো। গল্পের প্রোটাগনিস্টের সাথে অনেক ক্ষেত্রেই একাত্মতাবোধ কাজ করেছে। নিঃসঙ্গ, দলছুট, শেকড়বিহীন মানসিকতায়।
Displaying 1 - 16 of 16 reviews

















