খুব সাধারণ একটা মিসিং পারসোনের কেস, প্রফেসর ইফতেখার মাহমুদ নামে তিন বছর আগে হারিয়ে যাওয়া এক আর্কিওলজিস্টকে খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু কাজে নামার সাথে সাথেই ইন্সপেক্টর আহমেদ বাশার সে বুঝতে পারলো কাজটা সহজ তো নয়ই বরং এটা সাধারণ কিছুও নয়। খড়ের গাঁদা থেকে তাকে সূঁচ খুঁজে বের করতে হবে, যেখানে একদিকে সূচটা অত্যন্ত বুদ্ধিমান, তার ওপরে আবার সূচটাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে একাধিক মানুষ। কেসে নামার সাথে সাথেই সে এমন এক ঝুঁকি নিয়ে নিলো যা তাকে নিয়ে যেতে পারে লক্ষ্যের খুব কাছে অথবা পুরোপুরি শেষ করে দিতে পারে সদ্য ধ্বংসস্তুপ থেকে তুলে নিয়ে আসা পুলিশি ক্যারিয়ারকে। কিন্তু ঝুঁকি নিয়েই সে বুঝতে পারলো, বিরাট ভুল হয়ে গেছে।
সময়: ষোড়ষ শতকের শেষভাগ। মোঘল সম্রাট আকবর বাংলাকে বিদ্রোহী প্রদেশ হিসেবে ঘোষণা করে নিজের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাপতিদের একজন মানসিংহকে বাংলায় পাঠালো বারো ভূইয়াদের প্রধান ঈশা খাঁকে যুদ্ধে পরাজিত করে বন্দি হিসেবে আগ্রা নিয়ে যাওয়ার জন্য। বীর ঈশা খাঁ রুখে দাড়ানোর প্রস্তুতি নিতে শুরু করলো। কিন্তু সৈন্য সংখ্যা থেকে শুরু করে সবকিছুই মোঘলদের প্রতিহত করার জন্যে অপ্রতুল। বাধ্য হয়ে সে নিজের বীর সেনাদের একজন মাসুম কাবুলী, যাকে পাঠান সেনাপতি শহবাজ খাঁ রাজদ্রোহী হিসেবে ঘোষণা করেছে, তাকে ভাওয়ালের জমিদার ফজল গাজীর আশ্রয় থেকে ডেকে পাঠালো বিশেষ এক উদ্দেশ্য নিয়ে। মাসুম খাঁ কাবুলীকে পানি-জঙ্গল আর হাওর বিধৌত এলাকা থেকে খুঁজে বের করতে হবে সদ্য বিধাব হওয়া এক সুবাদারের স্ত্রীকে। এই সুবাদারের স্ত্রীর কাছে আছে এমন কিছু যা বদলে দিতে পারে মোঘলদের সাথে বারো ভূইয়াদের যুদ্ধের গতিপথ। কাজে নেমেই মাসুম কাবুলী বুঝতে পারলো এই বিশেষ মানুষটিকে খুঁজে বের করে ঈশা খাঁর নিকটে পৌছাতে হলে তাকে মোকাবেলা করতে হবে মোঘলদের শক্তিশালী বাহিনী, স্থানীয় বিদ্রোহী ডাকাত এবং ভয়ঙ্কর পানির ঠগী হিসেবে পরিচিত পাঙ্গুদের
রবিন জামান খান একজন বাংলাদেশি কথাসাহিত্যিক । রবিন জামান খানের জন্ম ময়মনসিংহ শহরে, পৈত্রিক নিবাস নেত্রকোনার কেন্দুয়ায়। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে পড়ালেখা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষাতত্বে দ্বিতীয় মাস্টার্স সম্পন্ন করেন তিনি। পড়া-পড়ানো, শেখা-শেখানোর চর্চা থেকেই শিক্ষকতাকে পেশা ও লেখালেখিকে নেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সংকলনে বেশকিছু মৌলিক ও অনুবাদ গল্প লেখার পাশাপাশি লিখেছেন একাধিক টিভি নাটক। তার মৌলিক থৃলার উপন্যাস শব্দজাল, ২৫শে মার্চ, সপ্তরিপু, ব্ল্যাক বুদ্ধা, ফোরটি এইট আওয়ার্স, দিন শেষে, আরোহী ও অন্ধ প্রহর ইতিমধ্যেই অর্জন করেছে বিপুল পাঠক প্রিয়তা। বাংলাদেশের পাশাপাশি কলকাতা থেকে প্রকাশিত তার মৌলিক গ্রন্থ ২৫শে মার্চ, সপ্তরিপু ও শব্দজাল পশ্চিম বঙ্গের পাঠক মহলে ভালোবাসা কুড়িয়েছে। ভারতবর্ষের ইতিহাসের রহস্যময় ঘটনাবলী, সেইসাথে মানব মনের জটিল মনস্তত্ত্ব বিষয়ে আগ্রহ থেকে উনি বর্তমানে কাজ করে চলেছেন একাধিক ইতিহাস নির্ভর ও সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার উপন্যাস নিয়ে। এরই প্রেক্ষিতে খুব শিঘ্রই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে তার মৌলিক থ্রিলার উপন্যাস বিখন্ডিত, রাজদ্রোহী, ধূম্রজাল, সিপাহী, অশ্বারোহী, মুক্তি। রবিন জামান খান ঢাকায় প্রথম সারির একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের সহকারি অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবষেণা করছেন তিনি।
বাব্বাহ! চতুর্থটাও শেষ করে ফেললাম!! এই সিরিজের প্রত্যেকটা বইয়ের একটা জাদুকরী গুন আছে। একবার শুরু করলে অন্য বই হাতে নেওয়ার ফুরসত ই পাই না। গত তিনটে থেকে এইটা আরো বেশি ম্যাচিউরড মনে হয়ছে ।
এখন সামনের খন্ডর জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকি। কতদিন লাগবে কে জানে!
ঘটনার শুরু হয় মুঘল সেনাপতি মানসিংহকে বাংলার বারো ভূঁইয়াদের শায়েস্তা করে বাংলার দখল নিতে হবে - এই ঘটনা দিয়ে। এদিকে বারো ভূঁইয়াদের তরফ থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ঈশা খাঁ। আর বর্তমানে মিসিং পারসনের কেস থেকে শুরু করে কোঁচো খুড়তে সাপ বেড়োনোর অবস্থা। সিরিজের বাকি বইগুলোর মত দুইটি টাইমলাইনে সুন্দরভাবে সাজানো গল্প। অতীত যেখানে শেষ হয়, বর্তমানটা খুব সুন্দরভাবে তার পর থেকেই শুরু হয়। সিরিজের আগের তিনটা বই স্ট্যান্ড এলোন হিসেবে পড়া গেলেও, রাজদ্রোহী ধরতে হলে আগেরগুলা পড়া লাগবে।
বইটাতে ঈশা খাঁ এর নাম সবার পরিচিত হলেও মূল নায়ক মাসুম খাঁ - যাকে রাজদ্রোহী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু এই মাসুমের সাহায্য নিয়েই ঈশা খাঁ খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার সাহস করেন। এই রাজদ্রোহীর প্রতিটা চিন্তা আর পদক্ষেপ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। আর নুক্কন - সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোর একটা ছিল, যেটা শেষে গিয়ে বুঝতে পারি। নুক্কন ছাড়া গল্পটা অন্যদিকে চলে যেত হয়তো। রসুল খাঁ আর তার ছেলের চরিত্রটা আরেকটু বিশদ হলে ভালো লাগতো।
ইতিহাসের মাল-মসলা নিয়ে খুব সুন্দরভাবে সাজানো থ্রিলার। টান টান উত্তেজনা অতীত বর্তমান সবখানেই সাজানো। তবে আগের বইগুলা যারা পড়েছেন কেউ খেয়াল করেছেন কিনা জানিনা - অতীত আর বর্তমানের ঘটনার সিকুয়েন্সে একটা প্যাটার্ন চোখে পড়ে গেছে আমার। যার জন্য কয়েকটা টুইস্ট প্রথম থেকেই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। আবার অতীত কিছু পড়ে বর্তমান কী হতে পারে বা বর্তমান থেকে অতীতের একটা আন্দাজ হয়ে যাচ্ছিল। যাই হোক টুইস্ট বুঝতে পারা না পারা গল্পের মূল বিষয় না।
বইয়ের কিছু জায়গায় চরিত্রের বা প্রতিষ্ঠানের নামের বা পদবীর ভুল হয়েছে। বানানে, জ্যোতি চিহ্নে কিছু ভুল চোখে পড়েছে । মাস্টার জেড / ডি এর নাম সম্ভবত ব্ল্যাক বুদ্ধা আর রাজদ্রোহী তে অদলবদল হয়েছে কোথাও। আর সেটা না হলে কীভাবে কে ছাড়া পেল জানতে পারলাম না।
সব মিলিয়ে গল্পটা অনেক ভালো লেগেছে। আর এই সিরিজটা পছন্দের কারণ আমাদের নিজেদের ইতিহাস, নিজেদের পরিচিত পরিবেশ নিয়ে এরকম থ্রিলার গল্প খুব কমই আছে। আর সফলভাবে সেই গল্পকে পাঠকের পছন্দনীয় করতেও খুব লেখকই পেরেছেন।
নিজের ইতিহাসের পটভূমিতে কিছু পড়লে অনুভূতিটা অন্যরকম কাজ করে। মনে হয় যাই গিয়ে দেখে আসি, আসলেও আছে নাকি কিছু, বা পরের পর্বের ক্লু পেয়ে যাই নাকি! এটা ইতিহাসের আশ্রয়ে লেখা থ্রিলার, নিরেট ইতিহাস না। হয়তো গল্পের প্রয়োজনে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এর পরিবর্তন হয়েছে। সেজন্য সত্যি ইতিহাস ভেবে না পড়লেই ভালো।
তবে পায়ামের যুদ্ধের পরিণতিতে আসলে কী ঘটেছিল এটা সিরিজের পরের কোন বইতে জানতে পারবো আশা করি।
১৫৯৬ খ্রিস্টাব্দ। মোঘল সম্রাট আকবর দিল্লির সিংহাসনে অধিষ্ঠিত। তাঁর আমলে ভারতবর্ষের সবচেয়ে বেশি এলাকা মোঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে বাংলা তখনো স্বাধীন অঞ্চল। এই অঞ্চলে প্রায়ই যুদ্ধ বিগ্রহ লেগে থাকতো বলে এই অঞ্চলকে 'বিদ্রোহের দেশ' বলে ডাকা হতো।১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে রাজমহলের যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন সুলতান দাউদ খান কররানী মোঘল বাহিনীর সাথে যুদ্ধে পরাজিত এবং নিহত হন। তখন সম্রাট আকবর বাংলাকে মোঘল সাম্রাজ্যভুক্ত করলেও কার্যত বাংলার একটি ক্ষুদ্র অংশের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। কারণ বাংলার বিভিন্ন অংশে তখন স্বাধীনচেতা বারো ভূঁইয়ারা শাসন পরিচালনা করছিলেন এবং তারা মোঘল বশ্যতা মেনে নেন নি। বারো ভূঁইয়াদের প্রধান ঈশা খাঁ তখন সোনারগাঁ অঞ্চলের শাসক। নানা ঘাত প্রতিঘাত সহ্য করে এই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। মোঘলদের সাথে কয়েকবার যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে, তাঁর অঞ্চলে স্বাধীন শাসন বজায় রেখেছেন। মোঘল শাসক আকবর ক্ষিপ্ত হয়ে সেনাপতি মানসিংহকে পাঠান বাংলা অঞ্চলকে মোঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে। মানসিংহের অগ্রবর্তী বাহিনীর প্রধান বাহরাম খাঁ জঙ্গলমহাল আক্রমণ করে। এই জঙ্গলমহালের সুবাদার ছিলেন ঈশা খাঁ'র মিত্র আসলাম শেঠ। একসময় জঙ্গলমহাল দূর্গের পতন ঘটে, আসলাম শেঠ নিহত হন এবং আসলাম শেঠের স্ত্রী মাত্র কয়েকজন সহচর নিয়ে পালাতে সক্ষম হয়। জঙ্গলমহাল দূর্গ আক্রান্ত হওয়ার আগে আসলাম শেঠ দেখা করেছিলেন ঈশা খাঁ'র সাথে। আসলাম শেঠ জানান তাঁর কাছে এমন এক শক্তির আধার আছে, যা কিনা মোঘলদের সাথে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু সেই শক্তি ঈশা খা'র হাতে আসার আগেই জঙ্গলমহালের পতন হয়। তবে বিশ্বস্ত সূত্রে খবর পাওয়া গিয়েছে সেই অদ্ভুত শক্তি আসলাম শেঠের ভিনদেশী স্ত্রী সঙ্গে নিয়ে পালাতে পেরেছিলেন। মোঘল বাহিনীর তুলনায় বারো ভূঁইয়াদের সৈন্যবাহিনী অপ্রতুল হওয়ায় বাড়তি শক্তি হিসেবে আসলাম শেঠের বর্নিত শক্তির অপরিহার্যতা উপলব্ধি করতে পারেন ঈশা খাঁ। তাই তিনি একসময়ের বন্ধু আসলাম শেঠের স্ত্রী ও সেই শক্তিকে খুঁজে ফিরিয়ে আনার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি হিসেবে মাসুম খাঁ কাবুলিকে নির্বাচন করেন। যে কিনা মোঘল দরবারের আইনের বিরোধিতা করে মোঘল সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে চলে এসেছে এবং পরবর্তীতে যাকে রাজদ্রোহী ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এমন একজন ব্যক্তিকে এই কাজের জন্য নির্বাচন করায় অনেকেই অবাক হয়েছিল। তবে ঈশা খাঁ জানেন তিনি যোগ্য ব্যক্তিকেই বেছে নিয়েছেন। মাসুম কি পারবে যোগ্যতার পরিচয় দিতে নাকি মাসুমের ব্যর্থতা বাংলায় বারো ভূঁইয়াদের স্বাধীনতার সূর্য ডুবিয়ে দেবে?
সিলেটে পিবিআই স্পেশাল উইংয়ের এজেন্ট তানভীর মালিকের ব্ল্যাক বুদ্ধা এবং চট্টগ্রামে শারহান শারিয়ারের মগ জলদস্যুর রহস্যের অপারেশনের পর সবাই জানতে পারে এক ভয়ংকর সংগঠনের ব্যাপারে। যারা কিনা বাংলাদেশে বসে দীর্ঘদিন যাবত কাজ করে যাচ্ছিল, অথচ আইনের লোকেরা এই ব্যাপারে পুরোপুরি অজ্ঞ ছিল তাদের অপারেশনের পূর্বে। এমনই সময় ময়মনসিংহে টুইন কালী কেসের সমাধান করায় বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছেন ইন্সপেক্টর আহমেদ বাশার। সেই জনপ্রিয়তা চোখ এড়ায়নি পিবিআইয়ের স্পেশাল উইংয়ের পরিচালক হাবিব আনোয়ার পাশা স্যারের। তাই এবার বাশারের ডাক পড়লো পিবিআইয়ের স্পেশাল উইংয়ের হয়ে কাজ করার জন্য। মাথার মধ্যে একটাই চিন্তা হুট করে তাকেই কেন এই কাজের জন্য আনা হলো! তবে কিছুটা হলেও আঁচ করতে পেরেছে সে। সম্প্রতি চট্টগ্রামে প্রফেসর আবদেলের গাড়ি দূর্ঘটনায় মৃত্যু এবং পরবর্তীতে শারহান শারিয়ার যে রাজদ্রোহী নামক একটি রহস্যের খোঁজ পায় তার সমাধান করা জরুরি হয়ে পড়ে। এই রহস্যের সমাধান জানেন প্রফেসর আবদেলের সহকর্মী প্রফেসর ইফতেখার মাহমুদ। কিন্তু তিনিও তিন বছর যাবত নিখোঁজ। একেবারে হ��ওয়ার মতো উবে গেছেন মনে হচ্ছে। তাকেই খুঁজে বের করার দায়িত্ব পড়ে ইন্সপেক্টর বাশারের উপর। কাজে নেমেই বুঝতে পারে যতটা কঠিন ভেবেছিল, কাজটা ���ার থেকেও অনেক বেশি কঠিন এবং বিপদজনক। ইন্সপেক্টর বাশার কি পারবে প্রফেসর ইফতেখার মাহমুদকে খুঁজে বের করে রাজদ্রোহীর অমিমাংসিত রহস্যের সমাধান করতে? নাকি কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া সেই রহস্য লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যাবে?
'সময়' সিরিজের অন্যান্য বইয়ের মতো এটাতেও দুইটি সময়কাল নিয়ে গল্প সৃষ্টি করেছেন লেখক। দুই গল্পকে মেলানোর দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে লেখক যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তার ছাপ রেখেছেন। গল্প একটু একটু এগিয়েছে আর চরিত্রগুলো যেন পরিপক্ক হয়েছে। সপ্তরিপুতে আহমেদ বাশারের এক কলঙ্কিত অতীতের আভাস ছিল, সেই অতীতের একটি বিস্তারিত গল্প বলেছেন লেখক। যা আহমেদ বাশারের মানসিক অবস্থান স্পষ্ট করে। আলীম পাটোয়ারীর স্বভাবসুলভ আঞ্চলিক ভাষার কথাবার্তা উপভোগ্য ছিল। সাথে হাবিব আনোয়ার পাশার ব্যক্তিত্ব যেন একটি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার প্রধানের প্রতিনিধিত্ব করে, অথচ তার বন্ধুসুলভ আচরণ জুনিয়রদের কাজের গতি বাড়িয়ে দেয়। যখন কোনো লেখক দুইটা সমান্তরাল গল্প কিন্তু ভিন্ন সময়ের প্রেক্ষাপটে বলতে চান, তখন তাকে খেয়াল রাখতে হয় যেন গল্পের প্রবাহ নিজ ধারা বজায় রাখে এবং একটি নির্দিষ্ট জায়গায় মিলিত হয়। এক্ষেত্রে বলা যায় রবিন জামান খান যথেষ্ট সচেতনতার সাথে সমাপ্তি টেনেছেন।
ঈশা খাঁ ছিলেন বাংলা অঞ্চলের অন্যতম স্বাধীন শাসক, যিনি কিনা মোঘল বাহিনীকে ঠেকিয়ে রেখেছিলেন দীর্ঘদিন। মানসিংহকে দ্বৈত-যুদ্ধের আহবান জানিয়ে বাঙালিদের প্রতি মানসিংহের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করেছিলেন। বইটিতে আমরা পাঙ্গু নামক এক শ্রেণির ঠগীদের পরিচয় পাই। পাঙ্গুরা ছিল দুর্ধর্ষ এবং এরা জলদেবীর পূজা করতো যেখানে সাধারণ ঠগীরা কালীদেবীর পূজা করতো। এরা জলে অর্থাৎ নৌকায় শিকার করে বেড়াত এবং শিকারের মেরুদন্ড এমনভাবে ভেঙে পানিতে ডুবিয়ে দিত যাতে ভেসে না উঠে। এদের প্রধান শিকার ছিল সওদাগরি নৌকার ব্যবসায়ীরা। নৌকার পাটাতনে বৈঠা দিয়ে তিনবার ঠক ঠক আওয়াজ করলেই সেই নৌকার মালিকের আর বাঁচার উপায় ছিল না। পাঙ্গুদের হিংস্রতার জন্য তাদের জ্ঞাতি ভাই তুসুমবাজ ও ভাগিনারাও তাদের এড়িয়ে চলতো।
সপ্তরিপু ও ব্ল্যাকবুদ্ধায় বানান ভুলের যে উৎসব ছিল তা মগরাজে এসে যেন মহোৎসবে পরিণত হয়েছিল। তবে রাজদ্রোহীতে সেই তুলনায় বানান ভুল কম। একেবারে যে নেই, তা না। বইয়ের মান উন্নয়নের দিকে নজর দেওয়াতে প্রকাশনী এবং লেখককে সাধুবাদ জানাই।
ব্ল্যাকবুদ্ধাতে প্রফেসর মিতায়ন ওরফে মাস্টার জেডকে গ্রেফতার করা হয় এবং সে জেলেই ছিল। কিন্তু রাজদ্রোহীতে সেই মাস্টার জেডের নাম মাস্টার ডি হয়ে গিয়েছে। এদিকে রাজদ্রোহীর প্রধান খলনায়ককে পুরো বইতে মাস্টার জেড বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা বইটির সবচেয়ে বড় ভুল।
অধ্যায়ের শিরোনাম যেহেতু বড় অক্ষরে থাকে তাই ওই ভুলটা সবার আগে চোখে পড়ে। পিবিআই এর জায়গায় পিবিআইএস আছে একটি অধ্যায়তে। তাছাড়া একই জায়গার ঘটনা হওয়া সত্ত্বেও ভিন্ন অধ্যায়ে জায়গার নামের শিরোনাম ভিন্ন নাম দেওয়া আছে, অভিন্ন হওয়া উচিৎ ছিল।
প্রমিত বাংলায় বর্ননা দেওয়ার সময় বাবা/পিতাকে বাপ বলে উল্লেখ করাটা ভুল কিনা আমি নিশ্চিত নই। তারপর আঞ্চলিক ভাষার সংলাপে 'তোকে' এর পরিবর্তে 'তোরে' শব্দটা যৌক্তিক। রসুল খাঁ'র জমিদারিতে যখন বাসিম বিভিন্ন উপায় বাতলে দিচ্ছিল তখন তার কাজগুলো বাচ্চাসুলভ মনে হয়েছে। অথচ এই চরিত্রটা আরো পরিপক্ক হওয়া উচিৎ ছিল। এক চরিত্র মনে মনে যা ভাবছে অন্য চরিত্র সেটা বুঝে যাচ্ছে এবং তার উত্তর দিয়ে দিচ্ছে, এটা কি কালোজাদু!
বইয়ের শুরুর দিকে পায়ামের দাদা যেখানে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন, সেখানে আরেক জায়গায় পরদাদা কিংবা আসলাম শেঠের জায়গায় আসলাম শেখের উল্লেখ ছিল। প্রফেসর ইফতেখার মাহমুদের সহকারী চৌধুরী হাসান শেখ তাঁর সাথে কাজ শুরু করেন হারিয়ে যাওয়ার একবছর আগে থেকে। সেই হিসেবে চার বছর আগে থেকে তিনি ইফতেখার মাহমুদের সাথে যুক্ত, কিন্তু বইতে তিন বছর উল্লেখ করা। নৌকাকে বারবার জাহাজ বলা, মাসুম একই কথা কয়েকবার বলেছে ও সেটা কয়বার বলেছে তার ভুল হিসাব এবং একটি ঐতিহাসিক চরিত্রের ভুল সময়ের মৃত্যু( লেখকের স্বাধীনতা আছে ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে নিজ ইচ্ছেমতো লেখার। কিন্তু ঐতিহাসিক চরিত্রের পরিণতি নিয়ে স্বাধীনতা খাটানো পছন্দ হয়নি।) সহ আরো কিছু ছোটখাটো ভুল আছে।
বইটি পড়তে হলে অবশ্যই আপনাকে সিরিজের পূর্বের তিনটি বই(সপ্তরিপু, ব্ল্যাক বুদ্ধা, মগরাজ) পড়তে হবে। আবার এই বইতে সিরিজের পরবর্তী দুই বই(সিপাহী, অশ্বারোহী) সম্পর্কে আভাস দেওয়া হয়েছে। 'সময়' সিরিজের চতুর্থ বই ও একটি রাজদ্রোহীর আখ্যানে আপনাকে স্বাগত। হ্যাপি রিডিং।
অভিজ্ঞতা খুব বেশি সুখকর নয়। প্লট ভালো, চরিত্রায়ন চমৎকার, তবে ইতিহাস আশ্রিত থ্রিলার হলেও গল্পের গতি ম্যাদম্যাদা৷ শেষের দিকে টান মারসে! মোঘল সৈন্যবাহিনীর থেকেও দীর্ঘ, বিস্তৃত বর্ণনা মাঝেমধ্যে বিরক্তিকর ঠেকেছে৷ সত্যি বলতে এই 'সময় সিরিজ' নিয়ে আপাতত আগ্রহ-রদ হইসে।
**রিভিউ শুরু করার আগে একটা অভিযোগ দিয়ে দিয়ে শুরু করে। একটি সিরিজে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে চরিত্র। পূর্ববর্তী বইয়ের সাথে পরবর্তী বইয়ের মেলবন্ধন ঘটে চরিত্রের মাধ্যমে। সেখানে যদি দেখা যায়, একই চরিত্র, কিন্তু নাম পালটে গিয়েছে; তবে কি সেই বইয়ের গুরুত্ব থাকে? “মগরাজ” বইতে প্রফেসর ডক্টর সুলতান আবদেল নামের একটি চরিত্র ছিল। যা “রাজদ্রোহী”-তে হয়ে গিয়েছে প্রফেসর ডক্টর হাসান আবদেল। ইফতেখার আবদুল্লা পালটে গিয়েছে ইফতেখার মাহমুদ নামে। “ব্ল্যাকবুদ্ধা” বইতে থাকা জেড মাস্টার এখানে বদলে হয়েছে মাস্টার ডি। তার পরিবর্তে অন্য এক খল চরিত্রকে মাস্টার জেড হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে। এগুলো আসলে লেখকের উদাসীনতা কিংবা দায়সারা কাজকেই প্রতিফলিত করে। না-কি অন্য কিছু? আমার জানা নেই। সিরিজের ক্ষেত্রে এমন ভুল অমার্জনীয় অপরাধ। যার শুরুটা হয়েছে ফ্ল্যাপ থেকেই। যা হোক, রিভিউ শুরু করা যাক।**
▪️যে সময়ের গল্প বলা হবে, সে সময়ে বাংলার বুকে বারো ভুঁইয়াদের রাজত্ব। যারা ইতিহাস নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করেন, ইতিহাস সম্পর্কে জানেন— তারা অবশ্যই বারো ভূঁইয়া সম্পর্কে জানবেন। যাদের অবিসংবাদী নেতা ছিলেন ঈশা খাঁ। তখন ভারতবর্ষে মুঘলদের শাসন চলছে। কিন্তু বাংলাকে ঠিক কবজা করা যাচ্ছে না। বারো ভূঁইয়াদের রাজত্বে ছেদ ধরানোর কোনো উপায় নেই। আর এই বাঙাল মুল্লুককে তখন বিদ্রোহের রাজ্য হিসেবে মনে করা হতো। কিছু হলেই বিদ্রোহ! নিজেকে স্বাধীন দাবি করা! এমন অবস্থায় বারো ভূঁইয়াদের সাথে নিয়ে কিছু অংশকে স্বাধীন রাখার প্রয়াস নিজে রেখেছেন, তিনি ঈশা খাঁ!
বাংলার একাংশের সুবাদার আসলাম শেঠ পড়েছেন বিপদে। তার জঙ্গলমহাল আক্রান্ত মুঘলদের দ্বারা। সেনাপতি বাহরাম খাঁ তার দলবল নিয়ে এগিয়ে আসছে। আসলাম শেঠের কাছে এমন এক বস্তু আছে, যা বদলে দিতে পারে যুদ্ধের গতিপথ। সেই বস্তুকে বাঁচাতে হবে। বাঁচতে হবে নিজের পরিবারকেও। তাই কঠিন এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে আসলাম শেঠ। নিজেকে বিসর্জনের মাধ্যমে খেলাটা শুরু করবে এবার। যেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তারই প্রিয়তমা স্ত্রী মেহের। সামান্য কি��ু বিশ্বস্ত সহচর নিয়ে লুকিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। অপেক্ষায় আছে, কেউ একজন উদ্ধার করবে তাকে আর তার দলকে। কিন্তু এই পথে যে কেউ আসে না। মিত্রের পরিবর্তে যদি শত্রু আসে?
আসলাম শেঠের শেষ পরিণতির খবর জেনে অস্থির সময় পার করছে ঈশা খাঁ। সেই বিশেষ বস্তুটির জন্য যেমন চিন্তা, তেমন চিন্তা আসলাম শেঠের পরিবারের জন্যও। তাদের খুঁজে বের করতে হবে। এই দায়িত্ব দেওয়ার জন্য ডাক পড়েছে মাসুম খাঁ কাবুলির। যে এককালে মুঘলদের সেনাবাহিনীতে ছিল। আজ তাকে অভিহিত করা হয় ‘রাজদ্রোহী’ হিসেবে। সেই মাসুম খাঁ খুঁজছেন আসলাম শেঠের পরিবারকে। কিন্তু এত সহজে কি খুঁজে পাওয়া যাবে? পুরো বাঙাল মুল্লুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে মুঘলদের সেনাবাহিনী। পথেঘাটে, জলে-জঙ্গলে দস্যু-ডাকাতদের উপদ্রব। তারই মাঝে মাত্র কয়েকজন মানুষকে খুঁজে বের করা খড়ের গাদায় সুচ খোঁজার মতো। তবুও জীবন বিলিয়ে চেষ্টা করতে হবে। নাহলে বাংলার আকাশে পরাধীনতার চাঁদ চিরদিনের মতো দৃশ্যমান হবে।
▪️ চট্টগ্রামে বিশাল এক মহাযজ্ঞ শেষ হয়েছিল মাস্টার ইউকে বন্দী করার মাধ্যমে। যে কাজ শারিয়ার অসমাপ্ত রেখেছিল নতুন করেই সেই কাজের সূচনা। যার সাংকেতিক নাম, রাজদ্রোহী। খুঁজে বের করতে হবে আর্কিওলজিস্ট ইফতেখার মাহমুদকে (না-কি ইফতেখার আবদুল্লা?)। ময়মনসিংহে জোড়া কালী মূর্তি কেসে দারুন সাফল্যের পর বাশারকে ডেকে আনা হয় ঢাকায়। পিবিআইয়ের নতুন উইংয়ে কাজ করার তলব পরে। ডিমোশনের মাধ্যমে যে জীবন অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল, নতুন করে সে জীবন ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা। কিন্তু বাশার জানেনা কিসের মধ্যে সে ডুবে যেতে চলেছে। আর যদি জানত?
প্রায় তিন বছর ধরে লাপাত্তা একজন মানুষকে খুঁজে বের করা কি খুব সহজ? কোন সূত্র নেই, কোন যোগসাজস নেই। বাশার পড়েছে অকূল পাথারে। সাথে সদ্য যুক্ত হওয়া সহযোগী সোহেল। দুই জায়গা থেকে সাহায্য পেতে পারে ওরা। এক. ইফতেখার মাহমুদের মেয়ে পৃথা হাসান। আর দুই. ইফতেখার মাহমুদের অ্যাসিস্টেন্ট চৌধুরীর কাছ থেকে, যে ইফতেখারের অন্তর্ধানের সময় থেকেই জেলে। খেলা শুরু হওয়ার মুহূর্তেই যেন সব বদলে গেল। চৌধুরী পালাল জেল থেকে। পৃথার কাছে যাওয়ার মুহূর্তে কারা যেন আক্রমণ করে বসল। এক বা একাধিক দল পিছনে পড়ে আছে।
যার সূচনা পৃথা হাসানের মা-বাবার পাশাপাশি সুলতান আবদেলের এক গবেষণায়। যে গবেষণায় জড়িয়ে আছে বাংলার ইতিহাস। বারো ভূঁইয়াদের গল্পের পাশাপাশি একাধিক সময়কাল এখানে সম্পৃক্ত। জড়িয়ে গিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র। যে চক্রকে থামাতে গঠিত হচ্ছে টিম আলফা। তবে তার আগে সফল হতে হবে বাশারকে। বৃহত্তর কিছু ঘটতে চলেছে বাংলাদেশ নামক ছোট্ট এই ব-দ্বীপে। যার সাথে মিলেমিশে এক হয়ে যাবে অতীত, বর্তমান…. কিংবা ভবিষ্যতও!
▪️সময় উপাখ্যান সিরিজের চতুর্থ বই “রাজদ্রোহী”। অন্যান্য বইয়ের মতো “রাজদ্রোহী”-ও একই ধারায় বর্ণিত। একই সাথে ছুটে চলেছে অতীত ও বর্তমান। সময়ের নিরীক্ষণে হয়তো একসাথে দুই সময়কাল চলতে পারে না, কিন্তু, একই ঘটনা হয়তো একইভাবে কিংবা ভিন্নভাবে অতীত থেকে বর্তমানে ফিরে আসে। মেলবন্ধন হয় দুই সময়ের।
“রাজদ্রোহী” শুরু হয়েছে সেখান থেকে, যেখানে শেষ হয়েছে “মগরাজ”। একটু ছোট্ট সূত্র “মগরাজ”-এ ছিল। সেই সূত্র খুঁজতে গিয়ে মগদের অত্যাচার থেকে সময়কাল চলে আসে বারো ভূঁইয়াদের সময়ে। তখনও মুঘলদের শাসনকাল। একটা কথা বলা এখানে জরুরি, সময় উপাখ্যান সিরিজের অতীত অংশ ইতিহাসের সময়কাল বর্ণনা করলেও তা ইতিহাস হিসেবে মেনে নেওয়া ঠিক হবে না। ইতিহাস আশ্রিত থ্রিলারে লেখকের স্বাধীনতা থাকে, নিজের মতো করে গল্প বর্ণনা করার। কখনো কখনো কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়। কেউ যদি সে ইতিহাসকে সত্য বলে বিবেচনা করে, তাহলে হয়তো ভুল করা হবে। এখানে সময়কালটা গুরুত্বপূর্ণ, ইতিহাস নয়।
বইটির আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে অতীতের সময়কাল। বিশেষ করে বাংলার আধিপত্য বারো ভূইয়াদের রাজত্ব যেন প্রমাণ করে এই বাংলাও কখনো পিছিয়ে ছিল না। এই ভারতবর্ষে মুঘলদের আধিপত্যের কথা জানে না এমন কাউকে বোধহয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাদের সাহসিকতা, যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতা সবকিছুই আদর্শ হিসেবে গণ্য হয়। সেইখানে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার যে সামর্থ্য বইটিতে দেখানো হয়েছে, প্রশংসা করার মতো। রাজনৈতিক কূটচাল, বিদ্রোহ, প্রায় পাঁচশ বছর আগের যে চিত্র লেখক অংকন করেছেন— বেশ ভালো লেগেছে।
সবচেয়ে ভালো লেগেছে সময়ের বর্ণনায় প্রাকৃতিক পরিবেশকে ফুটিয়ে তোলা। এক্ষেত্রে লেখককে সাধুবাদ দিতে হয়। বর্তমান সময়ে থেকেও অতীতের সময়কালকে ফুটিয়ে তোলা সহজ কথা নয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ বিগ্রহ, সেই সময়ের ভৌগলিক অবস্থান ফুটিয়ে তুলতে পাড়া একটা আর্ট। এক্ষেত্রে লেখক যে খুব পরিশ্রম করেছেন, তা বলাই বাহুল্য।
সেই সাথে তুলে ধরেছেন মানুষের দায়িত্ববোধ। যখন কোন দায়িত্ব কাঁধে ওঠে, সে দায়িত্ব যে করেই হোক পালন করতে হবে। এর জন্য যদি জীবন যাওয়ার মত পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবুও পিছনে ফিরে তাকানো যাবে না। ঠিক একইভাবে কেউ কেউ দায়িত্বকে সুযোগ হিসেবে নেয়। যে সুযোগ কেবলমাত্র নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্যই। অতীতের সময়ে এই বাংলার পথে প্রান্তরে একের পর এক বিপদ সুযোগের অপেক্ষায় থাকত। ঠগী সম্পর্কে তো আপনারা জানেনই, পাঙ্গু সম্পর্কে জানা আছে কি? পথে প্রান্তরে হারিয়ে যাওয়া মানুষের মতো জল পথেও মানুষ হারিয়ে যায়। নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এই পৃথিবীর বুক থেকে। কেউ জানে না। আছে দস্যুদের দল। তারাও ওঁৎ পেতে থাকে শিকারের।
এই বইয়ের বর্তমান সময়কালের ক্ষেত্রে মনে হয়েছে আরো পরিণত গল্প পেয়েছি। রহস্য, একের পর এক চমক, ইদুর-বিড়াল খেলার পর আসলে কী উন্মুক্ত হলো সেটা বুঝতে বুঝতে যা বুঝলাম— পরের বইগুলোর জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্র মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। লেখক একটু একটু করে উন্মুক্ত করছেন সবকিছু। কিন্তু আসলে কী যে উন্মুক্ত হয়েছে, সেটাই বোঝা যাচ্ছে না। কারণ সবই ধোঁয়াশা। কুয়াশার চাদরে ঢেকে থাকা আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র ও একের পর এক মাস্টার অ্যালফাবেট (ডি, ইউ, জেড — এরপর কোনটা?) এলেও কোন কিছুই খোলসা হচ্ছে না। নতুন রহস্য হিসেবে অদ্ভুত এক কাল্টের আবির্ভাব। এরপর?
সময় উপখ্যান সিরিজের প্রথম দুইটি বই পড়ার পর মনে হতে পারে আদতে কোন সংযোগ নেই। সেই ধারাটা ভেঙেছে ”রাজদ্রোহী”-তে এসে। মগরাজ ও রাজদ্রোহীর সূক্ষ্ম সংযোগ আছে সেটা তো জানা যায়। রাজদ্রোহীর শেষে এসে জানা যায়, আগের তিনটি রহস্য এখানে যুক্ত নতুন ভয়ংকর কিছুর অপেক্ষায়। এত দৌড়ঝাঁপ, এত রহস্য, ক্লান্তির শেষ পর্যায়ে এসে জানা যায়— যা কিছু শেষ, তার থেকেই নতুনের শুরু। শেষটা যেখানে শেষ নয়। সিপাহী ও আরোহী অপেক্ষা করছে নতুন কোন রহস্যের।
▪️সময় উপাখ্যান সিরিজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ চরিত্র। একদিকে যেমন ইতিহাসে থাকা চরিত্র গুলোকে জীবন্ত করে তুলতে হয়, অন্যদিকে লেখকের কল্পনায় তৈরি চরিত্রগুলোকেও এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। শুরুতে লেখক এর চরিত্রায়নের কিছু ভুল তুলে এনেছি। অধিকাংশ রিভিউতেই এই ভুলগুলো নিয়ে আলোচনা করতে দেখিনি। কেন, আমার জানা নেই। হয়তো দীর্ঘ সময় পর পর পড়লে চরিত্রগুলো পাঠকের মাথা থেকে উধাও হয়ে যায়। আমি টানা পড়েছে বলে চোখে পড়েছে বেশি। পাঠক ভুলে যেতেই পারেন, কিন্তু লেখকের এমন ভুলে যাওয়া ঠিক নয়। সিরিজের ক্ষেত্রে এগুলোতে নজর দেয়া না হলে সেটা অমার্জনীয় ভুলের শামিল।
সিরিজের তিন মুল এজেন্ট— তানভীর, শারিয়ার ও বাশারের মধ্যে আমার বাশারকে সবচেয়ে ভালো লাগে। এই বইতে তার আরও পরিণত কাজের ধরনের সাথে পরিচয় হওয়া যায়। বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ, ক্ষুরধার মগজের খেলে সে যেভাবে সবকিছু সামাল দিয়েছে, প্রশংসনীয়। সোহেল চরিত্রকে ঠিক মনে ধরল না। হয়তো সামনে কাজের ক্ষেত্রে সেটা আরো ভালো হবে।
অতীতের চরিত্রের ক্ষেত্রে দুর্দান্ত কিছু খেল দেখিয়েছেন লেখক। বিশেষ করে ঈশা খাঁকে যেভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে— দুর্দান্ত, অনবদ্য। সাহসী এক যোদ্ধা, প্রজ্ঞায় অনন্য কোনো কিছুতেই ভেঙে পড়েন না, মানবিক গুণসম্পন্ন এক ব্যক্তিত্বকে তুলে ধরেছেন লেখক। অতীত সময়কালে অল্প কিছুক্ষণ বিচরণ করেও সব আলো কেড়ে নিয়েছেন ঈশা খাঁ। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা চরিত্র মাসুম খাঁ কাবুলি নিজেকে সবচেয়ে দুর্দান্ত হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছেন তার দায়িত্ববোধ, লড়াই করার মানসিকতা, মানবিকতা যেন প্রাণ দিয়েছিল বইতে।
লেখকের একটা গুণ আমার ভালো লাগে, তিনি কোনো চরিত্রকে ছেড়ে দেন না। টুকটাক সব চরিত্রকেই গুরুত্ব দেন, কাজ ধরিয়ে দেন। প্রতিটি চরিত্রই দারুণভাবে সে কাজগুলো সম্পাদনা করে। অতীতের নুক্কুন, মেহের, রায়েলি চরিত্রকে ভালো লেগেছে। আবার বর্তমানে পৃথা হাসানকে ভালো লাগলেও শেষে কেমন যেন হয়ে গেল! খালি চোখে যা দেখা যায়, তা সবসময় সঠিক হয় না। ভালোকে ভালো ভাবলেই, তা যে ভালো হবে তার নিশ্চয়তা নেই। আবার খারাপকে খারাপ মনে করলেও এর উল্টোটাও ঘটতে পারে।
দুই সময়কালের খল চরিত্রের মধ্যে অতীতে ছিল মানসিং ও বাহরাম খাঁ। মুঘল সাম্রাজ্যের দাম্ভিকতা ও ঈশা খাঁর বাঙাল মুল্লুকে প্রভাব প্রতিপত্তির যে লড়াই, বেশ উপভোগ্য ছিল। আর বর্তমান সময়ে যে খল চরিত্র আড়ালে থেকেও সব কলকাঠি নেড়ে চলেছে।
আগের বইগুলোতে কিছু চরিত্র ছিল, যা পূর্ণ বিকাশ সেখানে না হলেও রাজদ্রোহীতে একটু একটু করে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসছে। যেমন হাবিব আনোয়ার পাশা বা মৌসুমী। সবচেয়ে মজাদার চরিত্র লেগেছে আলীম পাটোয়ারীকে। ব্ল্যাক বুদ্ধা ও মগরাজে এক পলকের জন্য এলেও এই বইতে কিছু সময় ছিলেন। আর সেখানে বেশ পছন্দ হয়েছে। বিশেষ করে সিরিয়াস মুহূর্তে মজা করার প্রবণতা ভালো ছিল।
▪️লেখকের সহজ সাবলীল লেখনীতে কাঁটার মতো বিঁধে অতিরিক্ত বর্ণনা করার প্রবণতা। যেমন এখানে একজনের মদ খাওয়ার বর্ণনা লিখতে তিনটি লাইন খরচ করেছেন। কোনো দরকার ছিল? কোনো কোনো অনুচ্ছেদ এক পৃষ্ঠার চেয়েও বিশাল, সংলাপের ক্ষেত্রেও তা-ই। ফলে পড়তে অসুবিধা হচ্ছিল। অন্যান্য বইয়ের মতো এই বইয়ে অতিরিক্ত ব্র্যান্ডিং না থাকলেও, দামী জিনিসের প্রতি লেখকের অবসেশন এখানেও ছিল। পিবিআইয়ের স্পেশাল উইংয়ের যিনি কর্ণধার, তার অফিসের কার্পেট যে দামি হবে; কিংবা যে সেই উইং গঠনে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করছেন, তার হাতের ঘড়ি যে দামি হবে সেটা তো স্বাভাবিক। এই কথা বারবার বলার কী আছে আমি জানি না।
সিরিজের প্রথম দুই বইতে একটা বিষয় লক্ষণীয় ছিল। লেখকের বর্ণনা বা সংলাপে অতীত ও বর্তমানকে আলাদা করা যেত। কিন্তু পরের দুই বইয়ে সেই বিষয়টা অনুপস্থিত। অতীতের চরিত্র আর বর্তমান চরিত্র একই শব্দচয়নে কথা বলছে। কিছু শব্দ বর্তমানে থাকলেও অতীতে থাকার কারণ আছে কি না জানি না। আবার কিছু শব্দের ব্যবহার অধিক হারে ছিল। স্রেফ, আক্ষরিক অর্থে, গোস্তাকি— এর মতো শব্দের প্রাচুর্যে বেশ বিরক্তি ধরেছিল।
আগের বইয়ের রিভিউগুলোতেও উল্লেখ করেছিলাম চরিত্রগুলোর সম্বোধনের গরমিল বেশ ভালোই। একদিনের পরিচয় আপনি থেকে তুমি, তুমি থেকে তুই সম্বোধন বেশ ভালোই অপেশাদার আচরণ। তা-ও না হয় মানা গেল, কিন্তু তুমি থেকে আবার আপনি তে ফিরে এসে আবার তুমি তো যাওয়ার কারণ ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। তাছাড়া লেখক এর লেখায় বডি শেমিংয়ের প্রবণতা আমার ভীষণ খারাপ লাগে। এখানেও টমি পোদ্দারকে পেটমোটা ও ঘুড়িওয়ালা বলে সম্বোধন করা হয়েছে। কেন?
▪️অন্যধারা প্রকাশনী বইয়ের প্রোডাকশন কোয়ালিটি টপ নচ। এই নিয়ে কোন অভিযোগ নেই। হালকা সবুজাভ পৃষ্ঠাতেও পড়তে আরাম লাগে। যে বিষয়ে অভিযোগ করা যায়— সম্পাদনা ও প্রুফ রিডিং। মগরাজের মত অসংখ্য বানান ভুল না থাকলেও খুব যে কম ছিল তেমনটাও না। অগণিত ছাপার ভুল চোখে পড়েছে। কিছু জায়গায় সম্পাদনার অভাব লক্ষ্য করা গিয়েছে। এই বিষয়গুলো কমিয়ে আনা গেলে হয়তো দারুণ কিছু হবে।
প্রচ্ছদ ভীষণ সুন্দর। তবে আমার সামনের দিকের চেয়ে পেছনের দিকটা ভালো লেগেছে। যেখানে হালকা অবয়বে ফুটে উঠেছে বারো ভূঁইয়াদের অবিসংবাদী নেতা — ঈশা খাঁ।
▪️পরিশেষে, সময় উপখ্যান সিরিজের চারটি বই টানা শেষ করলাম। যদিও সপ্তরিপু আগে পড়েছিলাম, তখন তেমনভাবে রিভিউ লেখা হতো না। তাই আবার রিভাইস দিলাম। সিরিজের চারটি বই একসাথে পড়ার পর আমার মনে হয়েছে, নিজেকে কোনো পাপের শাস্তি দিচ্ছি। রাজদ্রোহীর শেষ পৃষ্ঠা উল্টানোর সাথে সাথে সেই শাস্তি থেকে মুক্তির এক অন্যরকম আনন্দ বিরাজমান। এছাড়া আমার আর কোন অনুভূতি নেই।
রবিন জামান খানের লেখার বৈশিষ্ট্যই হলো বিস্তৃত বর্ণনা। তবে বড় বই হলেও লেখার কোন অংশকে অবাঞ্ছিত মনে হয় নি, ঠিক যেন লেখার প্রয়োজনেই কলম এগিয়ে গেছে তরতরিয়ে। এই গল্পের দুটি অংশ অতীত ও বর্তমান simultaneously পরস্পরকে overlap করে এগিয়েছে, অতীতের অংশটা অতীব সুন্দর হলেও বর্তমান অংশটি কেমন যেন মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে এরকম মনে হয়েছে। বর্তমান সময়ের গল্প আরেকটু দীর্ঘতর হলেও ক্ষতি হতো না। তবে সুখপাঠ্য,অবশ্যই পড়া যায়।
বই: রাজদ্রোহী লেখক: রবিন জামান খান প্রকাশনী: অন্যধারা
রাজদ্রোহী বইটা পড়া শেষ করেও বিশ্লেষণমূলক রিভিউ লেখা সম্ভব হচ্ছে না৷ আজকের এই লেখাটা হবে কেন বিশ্লেষণমূলক রিভিউ লেখা হচ্ছে না সেটা নিয়ে, তুলনামূলক অনুভূতি প্রকাশ আর বইটার লেখনশৈলী ভিত্তিক। মাঝের প্যারাগুলোতে বেশ কিছু প্রাসঙ্গিক তবে সামান্য দরকারী কথা থাকবে। এসব কথা মূলত যারা এই সিরিজটা আগে পড়েননি তাদের জন্য লেখা।
কাজেই অন্য পাঠকবৃন্দ সরাসরি 'পাঠপ্রতিক্রিয়া' অংশে চলে যেতে পারেন।
° প্রাসঙ্গিক কথাবার্তা:
রবিন জামান খানের অত্যন্ত পরিশ্রমের ফসল সময় উপাখ্যান সিরিজের চতুর্থ বই রাজদ্রোহী। প্রথম বই কচ্ছপ গতির সপ্তরিপু বেশিদূর আগাতে পারিনি। ১৪৫ পেজে এসে থেমে গেছি। একটা বইয়ের এক তৃতীয়াংশে এসেও যদি মূ��� গল্পে না ঢোকে তবে বইটার প্রতি আর কোনো আগ্রহ থাকে না। এইজন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেম এই সিরিজের আর কোনো বই পড়ব না। তবে রাজদ্রোহী বইটা গিফট পেয়েছি বিধায় পড়তেই হলো।
রাজদ্রোহী প্রথম দোষটা মুক্ত। শুরু থেকে না হলেও ৬০ পেজের পর থেকে মূল গল্পে একেবারেই ঢুকেছে৷ শুরুর ৬০ পেজের ঘটবাপ্রবাহ এবং লেখনশৈলী যথেষ্ট এনগেজিং। ১০০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত টানা পড়ে গেছি৷ এরপর একটা সুকাম/কুকাম করেছি যার কারণে লাভ লস দুইটাই হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে রিডার্স ব্লকে আছি। সব বই পড়তে পারি না। কোনো পড়তে শুরু করে বিশ ত্রিশ পেজেই থেমে যাই। 'আমি পারি না, আর পারি না!' বইটা তখন রেখে দেই।
রাজদ্রোহী ১০০ পেজ পার হবার পরে বুঝলাম এই বইটা শেষ করতে পারব। তারপর গেলাম গুডরিডসে এড করতে। বইটা এড করতে গিয়ে কী মনে করে দুটো রিভিউ পড়লাম, এবং বেশ আশাহত হলাম!
রিভিউয়ারদ্বয়ের মতে, এই সিরিজের বইগুলো সূক্ষ্ম ভাবে পরস্পরের সাথে কানেক্টেড। চরিত্র এবং প্লটের সুগভীর এক সংযোগ আছে। কাজেই সিরিজের বইগুলো সিকোয়েন্স অনুযায়ী পড়তে হবে! কিন্তু আমি তো পড়লাম সিরিজের চতুর্থ বই, এক নাম্বারটা শুরু করেছিলাম শেষ করিনি, মাঝের দুটো বই স্পর্শ করা হয়নি!
এবং বইটা পড়তে বসেও প্রায় প্রতি অধ্যায়েই বুঝতে পারছিলাম যে প্লট আগের তিনটি বইয়ের ঘটনাপ্রবাহের সাথে সংযুক্ত।
একটা উদাহরণ যদি দেই:
প্রথম বই স���্তরিপু লেখা হয়েছে ঠগীদের নিয়ে। রাজদ্রোহীতে ঠগীদের আরেকটা শাখা আছে। 'পাঙ্গু'। এরা জল ঠগী। কাজেই সপ্তরিপু পড়ে ঠগীদের ইতিহাস না জানলে পাঙ্গু দের সম্পর্কে একটা ধোঁয়াশা থেকেই যাবে।
কাজেই বইটার প্লট এবং চরিত্রগুলোর খুব বেশি বিশ্লেষণ করার মতো যোগ্যতা আমার হলো না। আমি হালকাপাতলা একটা 'অনুভূতি প্রকাশ এবং পাঠপ্রতিক্রিয়া' লিখেই ক্ষান্ত হচ্ছি।
°° পাঠপ্রতিক্রিয়া:
প্রথমেই রবিন জামান খানকে সাধুবাদ জানাই অত্যন্ত পরিশ্রম করে এত এত তথ্য সংগ্রহ করার জন্য।
ঈশা খাঁ তথা বার ভূঁঈয়া আমলের বাংলার প্রকৃতি, পরিবেশ, সমাজ, মানুষ, খাবার দাবার, পোষাক, জঙ্গল, নদী, নৌকা ইত্যাদির অসামান্য বর্ণনা তিনি লিখেছেন। কখনো কখনো মনে হচ্ছিলো নিজেই নৌকায় করে জঙ্গলের নদীতে ভ্রমণ করছি!
তবে তথ্য সংগ্রহের মতো কিছুটা পরিশ্রম যদি তিনি লিখনশৈলীতে দিতেন, তাহলে তার লেখা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতো না।
লেখার মাঝে মাঝে কিছু শব্দের বহুল ব্যবহার অত্যন্ত দৃষ্টিকটু লাগে। 'খুব স্বাভাবিকভাবেই' শব্দটা সম্ভবত সেঞ্চুরি করে ফেলেছে!
একেকজনের কোনো একটা কথার পরে বাকিরা তার দিকে খুব অবাক হয়ে থাকায়। একটা দুটো ঘটনার ক্ষেত্রে এটা 'খুব স্বাভাবিক' কিন্তু তাই বলে একজনের প্রতিটা কাজেই এরকম প্রতিক্রিয়া দেখাবে সবাই, এটা স্বাভাবিক মনে হয় না।
চরিত্র গঠনের জন্য তিনি যেভাবে চরিত্রগুলোর তথ্য দিয়েছেন সেটা পর্যাপ্ত। তবে ব্যাকস্টোরির উপস্থাপন অত্যন্ত বিরক্তিকর। একটা চরিত্রকে রণক্ষেত্রে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তার বাপ দাদার ইতিহাস বর্ণনা দৃষ্টিকটু এবং বিরক্তিকর লাগে।
চরিত্রগুলোর মধ্যে মাসুম চরিত্রটাই একটু ভালো লেগেছে। তবে তার অ্যাকশন অত্যন্ত নাটকীয়। সে প্রতিবার বিপদে পড়ে আর মুক্তি পায় নাটকীয়ভাবে। পুরো বইয়ের তার কার্যগুলো সমাধা হয়েছে খুব নাটকীয়ভাবে। তবে তার সাহস, বুদ্ধিমত্তা এবং ম্যান ম্যানেজমেন্ট বেশ ভালো লেগেছে। অন্যদের উপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করতে পারে সে এবং এটা বেশ বাস্তবিক মনে হয়েছে।
আহমেদ বাশার চরিত্রটি ভালো লাগেনি৷ পুরো যাত্রায় সে তার যাবতীয় প্ল্যান পরিকল্পনা নিজের পেটের মধ্যেই চেপে রাখে এবং ক্লাইম্যাক্সের সমাপ্তিতে সে ওয়ান ম্যান শো দেখায়। লেখক এটাকে সম্ভবত টুইস্ট হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছিলেন কিন্তু বিষয়টা হয়ে গেছে বিরক্তিকর।
পুরো বইয়ে অযথা বর্ণনা, রিপিটেড সংলাপ, কোনো চরিত্র, সংগঠন বা ঘটনার ধারাবাহিক বর্ণনার বদলে তার গুণকীর্তন বা দোষ বর্ণনা অত্যন্ত বিরক্তিকর লেগেছে।
অমুক সংগঠন এই করেছে, সেই করেছে, এই করতে পারে, ওই করতে পারে এসবের বর্ণনার আধিক্যে হারিয়ে গেছে তাদের বর্তমান কার্যক্রম।
বইটা শেষ করি প্লট সম্পর্কে সামান্য লিখে৷ পুরো বইটায় দৌড়াদৌড়ি হয় একটা বিশেষ বাক্স নিয়ে। সেই বাক্সে কী ছিল তা জানার জন্যই পুরোটা পড়েছি। আফসোস জানা হলো না।
প্রথমে খানিকটা হতাশ হলেও পরে নিজেকে বোঝালাম, এই সিরিজ তো শেষ হয়নি৷ আরও বই আছে, আসবে। হয়তো সেখানে রহস্যের মীমাংসা হবে।
কাজেই খানিকটা হতাশা, খানিকটা ভালো লাগা নিয়েই বইটা শেষ করলাম। সিরিজের পূর্ববর্তী বইগুলো পড়লে হয়তো প্লট আর ক্যারেক্টারগুলো আরও ভালোভাবে কানেক্ট করতে পারতাম, সেক্ষেত্রে হয়তো বইটা আরও ভালো লাগতে পারতো।
কাজেই, পাঠকদের কাছে আহ্বান, সিকোয়েন্স মেইনটেইন করে বইগুলো পড়বেন।
নাম :রাজদ্রোহী লেখক : রবিন জামান খান জনরা : ইতিহাসআশ্রিত উপন্যাস সিরিজ : সময় উপাখ্যান পৃষ্ঠা : ৪২৪ প্রকাশনি : অন্যধারা
আজকেই একটা বিশাল সুসংবাদ পেলাম সময় উপাখ্যান সিরিজের প্রথম বই "সপ্তরিপু" নিয়ে সিরিজ হবে। আর আজই বই টা আমার শেষ হলো। এই সিরিজের চার নাম্বার বই "রাজদ্রোহী"। আগের বই গুলো পড়তে আমার অনেক মাস লেগেছে। কিছুটা রিডার্স ব্লক, কিছুটা জবের কারনে বেশি মুভ করা। আর এই বই টা প্রথম পৃষ্ঠা থেকে আমাকে জানান দিচ্ছিলো আমি যদি ঠিক মতো ধরি ২ দিনে শেষ। কিন্তু এই রহোস্য ২ দিনে শেষ করতে কি মন চায়। এক সাথে আমি তাই ৩ টা বই পড়া শুরু করি, কিন্তু পাপী মন আমার, সেই ঘুরেফিরে এই বই এর দিকেই হাত যায়।
এই বইটা মূলত আগের সব গুলো বই কে একটা যোগ সূত্রে ফেলা হয়েছে। ঘটনা গুলোর ভিতর ও।আনোয়ার পাশা, পিবিআই স্পেশাল টিম, ইন্সপেক্টর বাশারের সেই ক্ষতস্থান অনেক কিছুই ক্লিয়ার করা হয়েছে। দেখানো হয়েছে ঈশা খাঁ আর মানসিংহের লড়াই থেকে বন্ধুত্ব।যেই হারানো ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া নিয়ে এতো কাহিনী তাকে নিয়েই...... না না এতো রহোস্য জানতে হলে বইটি পড়তে হবে। মোঘল আমল, বারোভুঁইয়াদের ইতিহাস অনেক কিছুই আপনি জানতে পারবেন এই বই থেকে। ঐ আমলের যোদ্ধাদের চিন্তাধারা ও কি চমৎকার।অতীত, বর্তমান এতো সুন্দর ভাবে এগিয়েছে একটুও বোর হওয়ার সুযোগ নাই। আসলে আগের বই গুলো ছিলো একটা রহোস্য নির্ভর আর এই বই টায় জোড়া লাগানো হয়েছে বাকি ৩ টা বই। সময় উপাখ্যান এর জন্য একটা ফরমেট তৈরী করেছেন লেখক এই বই এ।এই বইটি ই আমার মনে হয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সিরিজ এর জন্য। আবার কতো দিন অপেক্ষা পরের বই এর জন্য.....
বইটি আমার হাতে পাবলিশ হওয়ার ২ দিনের মাঝে পৌঁছে দিয়েছে Bangla Bazar Books।
সময় উপাখ্যান সিরিজের অন্য গল্পের তুলনায় একটু কম উত্তেজনাময় আর প্রায় একই ধাঁচের হওয়াতে একটু কম ভালো লেগেছে যদিও লেখনী আর গল্প আগের মতই মারাত্মক আর গভীর। এই বই ঠিক পুরো আলাদা কোন রহস্য নয়, বরং মগরাজ এর দ্বিতীয় পর্ব। রহস্য এখানেও সমাধান করেননি লেখক। তাই অধীর আগ্রহে পরবর্তী দুটো বইয়ের অপেক্ষায় আছি।
"সময় বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়; কিন্তু হাজারো বছরের আগে আর পরে যাপিত জীবনের টানাপোড়েনগুলো সব একই রয়ে যায়, আবেগ আর ভালোবাসাগুলোও এক রয়ে যায়, এটাই সময়ের উপখ্যান।" -------------------------------------------------------------------- সময় : ১৫৯৬ খ্রিস্টাব্দ
বাঙাল মুল্লুকে যুদ্ধের ঘনঘটা। দিল্লির সিংহাসনে অধিষ্ঠিত সম্রাট আকবর। কিন্তু বাংলা তখনও স্বাধীন। ঐ সময়ে এটা একটা স্বাভাবিক ঘটনাই ছিল। প্রায় সময়েই বাংলার স্থানীয় রাজারা দিল্লির কেন্দ্রীয় শাসন থেকে মুক্ত হয়ে নিজেদের স্বাধীন রাজা হিসেবে ঘোষণা করত। তাই বাংলাকে পুরোপুরি দিল্লির অধীনে করতে গিয়ে বারো ভূঁইয়াদের হাতে নাস্তানাবুদ হয়ে মোঘল সম্রাট বাংলাকে বিদ্রোহী প্রদেশ হিসেবে ঘোষণা করেন। সম্রাট নিজের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাপতিদের একজন মানসিংহকে বিশাল বাহিনীসহ বাংলায় পাঠান; বাইশটি পরগনার শাসক, বারো ভূঁইয়াদের প্রধান, মসনদ-ই-আলা উপাধি প্রাপ্ত ঈশা খাঁ কে যুদ্ধে পরাজিত করে বন্দি হিসেবে আগ্রা নিয়ে যাওয়ার জন্য । বীর ঈশা খাঁ রুখে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন, কিন্তু সৈন্য সংখ্যা থেকে শুরু করে সবকিছুই মোঘলদের প্রতিহত করার ��ন্যে অপ্রতুল। বাধ্য হয়ে সে নিজের বীর সেনাদের একজন মাসুম খাঁ কাবুলী, যাকে পাঠান সেনাপতি শহবাজ খাঁ রাজদ্রোহী হিসেবে ঘোষণা করেছেন, তাকে ভাওয়ালের জমিদার ফজল গাজীর আশ্রয় থেকে ডেকে পাঠান বিশেষ এক উদ্দেশ্য নিয়ে। মাসুম খাঁ কবুলীকে পানি-জঙ্গল আর হাওর - বিধৌত এলাকা থেকে খুঁজে বের করতে হবে সদ্য বিধবা হওয়া এক সুবাদারের স্ত্রীকে। এই সুবাদারের স্ত্রীর কাছে আছে এমন কিছু যা বদলে দিতে পারে মো��লদের সঙ্গে বারো ভূঁইয়াদের যুদ্ধের গতিপথ। কাজে নেমেই মাসুম বুঝতে পারে এই বিশেষ মানুষটিকে খুঁজে বের করে ঈশা খাঁর নিকটে পৌছাতে হলে তাকে মোকাবেলা করতে হবে মোঘলদের শক্তিশালী বাহিনী, স্থানীয় বিদ্রোহী ডাকাত বিশা সওদাগর এবং জলের ঠগী হিসেবে পরিচিত ভয়ংকর পাঙ্গুদের।
বর্তমান সময়:
কিছুদিন আগেই চট্টগ্রামের পতেঙ্গা রোডে অ্যাক্সিডেন্টে মারা পড়ে প্রফেসর আবদেল নামে একজন আর্কিওলজিস্ট। তিন বছর আগে প্রফেসর আবদেল ও তার বন্ধু প্রফেসর ইফতেখার ইতিহাসের কোনো একটা বিশেষ রহস্য নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক এন্টিক চোরাচালান কিছু সংস্থার নজরে চলে আসায় পুরোপুরি হাওয়ায় মিলিয়ে যান তারা। আর তারপরেই তিন বছর পর এসে হঠাৎ এই অ্যাক্সিডেন্ট। প্রফেসর আবদেল কী নিয়ে গবেষণা করছিল তা খুঁজে বের করতে মাঠে নামার পরে পিবিআই স্পেশাল উইংয়ের ফিল্ড এজেন্ট শারহান শারিয়ারের হাতে এসে পরে প্রফেসর আবদেলের রেখে যাওয়া একটা ক্লু "রাজদ্রোহী।" সেই রাজদ্রোহীর সমাধান করতে হলে খুঁজে বের করতে হবে চট্টগ্রামে অ্যাক্সিডেন্টে মৃত প্রফেসর আবদেলের পার্টনার এবং বন্ধু প্রফেসর ইফতেখার মাহমুদ নামে আরেক আর্কিওলজিস্টকে। যিনিও হারিয়ে গিয়েছেন তিনবছর আগেই। এই মিসিং পার্সন কেসের দায়িত্ব দেওয়া হয় ময়মনসিংহের আলোচিত টুইন কালি কেসের অপারেশন লিডার ইন্সপেক্টর আহমেদ বাশার কে। কাজে নামার সঙ্গে সঙ্গেই ইন্সপেক্টর বাশার বুঝতে পারেন কাজটা সহজ তো নয়ই বরং সাধারণ কিছুও নয় । খড়ের গাদা থেকে তাকে সুচ খুঁজে বের করতে হবে, যেখানে একদিকে সুচটা অত্যন্ত বুদ্ধিমান, তার ওপরে সুচটাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে একাধিক মানুষ। কেসে নামার সঙ্গে সঙ্গেই সে এমন এক ঝুঁকি নিয়ে নেয় যা তাকে নিয়ে যেতে পারে লক্ষ্যের খুব কাছে অথবা পুরোপুরি শেষ করে দিতে পারে সদ্য ধ্বংসস্তূপ থেকে তুলে নিয়ে আসা পুলিশি ক্যারিয়ারকে।
◑ পাঠ প্রতিক্রিয়া:
রাজদ্রোহী - সময় উপখ্যান সিরিজের চতুর্থ বই। সিরিজের আগের বইগুলোর মতো এই বইয়েও লেখক দুইটা সময়কালকে একসাথে সমান্তরালভাবে নিয়ে গিয়েছেন। মোঘল সাম্রাজ্যের টালমাটাল সময় থেকে শুরু করে বারো ভূঁইয়াদের সাথে সংঘাত সবই উঠে এসেছে এখানে। পাশাপাশি সপ্তরিপুতে যেমন ঠগীদের সাথে পরিচয় করে দিয়েছিলেন লেখক এখানে তেমনি পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন জলের ঠগী হিসেবে খ্যাত পাঙ্গুদের সাথে। ঠগীরা যেখানে দেবী কালীর পূজা করত সেখানে পাঙ্গুরা করত জল দেবীর পূজা। নৌকায় যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়াত আর শিকার করে বেড়াত। শিকারের মেরুদন্ড বিশেষ পন্থায় ভেঙে পানিতে ডুবিয়ে দিত যাতে মৃতদেহ ভেসে না উঠে। কেননা ঠগী এবং পাঙ্গু সমাজের নিয়ম একই, রক্তপাত না ঘটিয়ে কার্যসিদ্ধি করতে হবে। পাঙ্গুরা শিকারের সকল সম্পদ দেবীর আশির্বাদ হিসেবে নিজেরা গ্রহণ করত। পাঙ্গুদের হিংস্রতার জন্য তাদের জ্ঞাতি ভাই তুসুমবাজ ও ভাগিনারাও তাদের এড়িয়ে চলতো। এগুলো খুব ভালো ভাবে লেখক গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন।
রাজদ্রোহী পড়তে গিয়ে একটা বিষয় খেয়াল করলাম যা না বললেই নয়। সিরিজের আগের তিন বইয়ে একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্ন ছিল। কখনও ঠগীদের সময়ে, কখনও বা মৌর্য শাসনামলে আবার কখনও মগ-পর্তুগিজ জলদস্যুদের সময় নিয়ে লেখক লিখেছেন। ইতিহাসের এসব সময় নিয়ে প্রচলিত লোককথা, মিথকে পুঁজি করে লেখক গল্প ফেঁদেছেন। একদিকে অতীতে কোনো প্রধান চরিত্র দৌড়াচ্ছে সেই রহস্যের সমাধানের উদ্দ্যেশ্যে আবার অন্যদিকে বর্তমান সময়েও একজন চেষ্টা করছে ইতিহাসের অতল থেকে হারানো ঐ অধ্যায়কে খুঁড়ে বের করতে। আপাতদৃষ্টিতে সমান্তরালে চলতে থাকা দুটো ভিন্ন গল্প মনে হলেও শেষে গিয়ে লেখক দারুণ মুন্সিয়ানার সাথে অতীত ও বর্তমানের মেলাবন্ধন ঘটান এক বিন্দুতে। মোটামুটি এভাবে করেই সপ্তরিপু, ব্ল্যাক বুদ্ধা ও মগরাজে ইতিহাসের হারানো অধ্যায়ের সমাধান করা হয়েছে।
তো এই প্যাটার্নটা আমার ব্যক্তিগতভাবে খারাপ লাগেনি, প্রতিবারই এটা আমি উপভোগ করেছি আর হারিয়ে গিয়েছি ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু অনেকের কাছেই এটাকে "নতুন বোতলে পুরোনো মদ" টাইপ মনে হতে পারে। কিন্তু এখানেই আসল খেলা। সিরিজের এই পর্যায়ে এসে লেখক রাজদ্রোহীতে ইঙ্গিত দিয়েছেন আরো বড় কিছুর।
সপ্তরিপু, ব্ল্যাক বুদ্ধা এবং মগরাজ পড়ার পর যারা ভাববে যে পরবর্তী চারটি বইয়েও একই ভাবে লেখক ইতিহাসের ভিন্ন ভিন্ন সময় নিয়ে রহস্য তৈরী করবেন তাদের হতাশই হতে হবে। কেননা রাজদ্রোহীতে এসে টুইন কালী, বুদ্ধ মূর্তি, স্বঘোষিত মোঘল সম্রাট শাহ সুজার হারানো সম্পদের কাহিনিকে স্রেফ বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং বড় কোনো রহস্যের টুকরো হিসেবে দেখানো হয়েছে। যে রহস্য আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগের এবং পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর মধ্যে একটা। উপরের তিনটি ঘটনাই নয়, ইতিহাসের আরও অনেক ঘটনার সাথে এর সংযোগ রয়েছে, যে রহস্যের বিস্তৃতি ইতিহাসের অনেক গভীরে।
রাজদ্রোহীতে এসে লেখক নিজের ছড়িয়ে থাকা জাল গুটিয়ে নিতে শুরু করেছেন। ইতিহাসের বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য সময় এবং ঘটনাকে এক সুতোয় বেঁধেছেন। মানে "Everything is connected। " আসল খেলা শুরু হবে সিপাহি থেকে যেখানে বাশার, তানভির, শারিয়ার সবাই থাকবে। আশা করা যায় এই তিনজন প্রোটাগনিস্ট এর এক টিমে কাজ করার মাধ্যমে দারুণ কিছু পেতে যাচ্ছে পাঠক। সিরিজের অন্যান্য বই শুরুর দিকে কিছুটা ধীর গতির হলেও রাজদ্রোহীর ক্ষেত্রে এটা হয়নি। শুরু থেকেই গতিময়তা বজায় ছিল রাজদ্রোহীতে।
সব মিলিয়ে মগরাজ পড়ার পরে রাজদ্রোহীর জন্য যতটা আগ্রহ নিয়ে মুখিয়ে ছিলাম তার থেকে অনেক গুন বেশি আগ্রহ এখন মুখিয়ে আছি সিপাহির জন্য। বেশ উপভোগ্য একটা যাত্রা ছিল রাজদ্রোহী।
◑ চরিত্রায়ন:
বইয়ে অনেকগুলো চরিত্রই ছিল। দুই সময়কালের কাহিনি সমান্তরালভাবে এগিয়ে গেলেও অতীত এবং বর্তমান উভয় ক্ষেত্রেই লেখক চরিত্রায়নের পেছনে সময় দিয়েছেন এবং চরিত্রগুলোকে প্রাণবন্ত করে তুলেছেন। সপ্তরিপুতে বাশারের পুলিশি ক্যারিয়ারের একটা ট্র্যাজেডির কথা উল্লেখ থাকলেও সেটা কী তা বলা হয়নি। ফ্ল্যাশব্যাকের মাধ্যমে বাশারের জীবনে ঘটে যাওয়া সেই ট্র্যাজেডির কথা রয়েছে রাজদ্রোহীতে। ফলে বাশারের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। এছাড়া বরাবরের মতো আলিম পাটোয়ারীর আঞ্চলিক কথাবার্তা ছিল উপভোগ্য। নুক্কুনের চরিত্রটা কে ভালো লেগেছে। পছন্দের চরিত্রের মধ্যে অন্যতম ছিল স্পেশাল উইং এর হেড হাবিব আনোয়ার পাশা এবং ডেস্ক এজেন্ট মৌসুমিকে। সময় এবং পরিস্থিতি কীভাবে একজন মানুষকে পুরোপুরি বদলে দেয় সেগুলো ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক।
◑ লেখনশৈলী:
রবিন জামান খান এর লেখার সাথে পূর্বেই পরিচিত ছিলাম। এখানে যেন শব্দচয়, বাক্যগঠন আরো পরিপক্কতা লাভ করেছে। রাজদ্রোহী সহ সিরিজের অন্যান্য বইগুলোও ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস, নিরেট ইতিহাস নয়। ইতিহাসের পাশাপাশি ইতিহাস যেখানে নীরব সেই জায়গাগুলোতে কল্পনার সাহায্য নিয়ে লেখক সুখপাঠ্য আখ্যানে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এবং এক্ষেত্রে তিনি শতভাগ সফল আমি মনে করি। এতো বিশাল প্রেক্ষাপটে দুইটা সময়কালকে সমানভাবে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া একটি চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার। খেই হারিয়ে ফেলার সুযোগ থাকে। কিন্তু এক্ষেত্রে লেখক উতরে গেছেন বহু আগেই। যার ধারাবাহিকতা বজায় ছিল রাজদ্রোহীতেও। পাশাপাশি টাইমলাইন অনুযায়ী ভাষার ভিন্নতা, আঞ্চলিকতাও তুলে ধরতে পেরেছেন লেখক।
◑ বানান ও সম্পাদনা:
বইয়ের শুরুর দিকে দুই জায়গায় ১৫৯৬ এর পরিবর্তে ১৬৯৬ রয়েছে। পাশাপাশি দুই-এক জায়গায় আসলাম শেঠকে আসলাম শেখ, লতিফ খাঁ কে লতিফ শেঠ বলা হয়েছে। এছাড়া মগরাজে প্রফেসর আবদেলের বন্ধুর নাম প্রফেসর ইফতেখার আব্দুল্লাহ থাকলেও এখানে এসে তা হয়ে গিয়েছে ইফতেখার মাহমুদ। আবার ব্ল্যাকবুদ্ধাতে মাস্টার জেডকে গ্রেফতার করা হয় এবং সে জেলেই ছিল। কিন্তু রাজদ্রোহীতে এসে মাস্টার জেডের নাম মাস্টার ডি হয়ে গিয়েছে অন্যদিকে রাজদ্রোহীতে মূল এন্টাগনিস্ট হিসেবে মাস্টার জেড কে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ছোটখাটো ভুল, টাইপো আশা করি পরবর্তী মুদ্রণে ঠিক করা হবে।
◑ পছন্দের অংশ:
✪ মানুষের ভেতরে বিশেষ অবস্থায় বিশেষ শক্তির জাগরণ ঘটে৷ মানুষ তার নিজের শক্তি-সামর্থ্য আর চিন্তার সীমাকে অতিক্রম করে যেতে পারলে এমন সব কাজ করে বসে যা তার দ্বারা কোন অবস্থাতেই সম্ভব হতো না।
◑ ব্যক্তিগত রেটিং: ৪.৬/৫
◑ বই পরিচিতি: ▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬ ➠ বইয়ের নাম: রাজদ্রোহী ➠ লেখক: রবিন জামান খান ➠ জনরা: ঐতিহাসিক থ্রিলার ➠ প্রকাশনী: অন্যধারা প্রকাশনী ➠ প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২২ ➠ প্রচ্ছদশিল্পী: আশরাফ ফুয়াদ ➠ পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৪২৪ ➠ মুদ্রিত মূল্য: ৬৪০ ৳
❛নাচো সখি নাচো সখা আজ যে খুশি সীমাহীন বীর মাসে না দিওয়ানা ঈশা খাঁর জন্মদিন!❜
Do I have everyone's attention? না পেলেও শুরু করতে হবে উপায় নেই।
সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই মানব জাতি যু দ্ধ বিগ্রহের মধ্য দিয়েই চলছে। ক্ষমতার লড়াই থেকে প্রতিবাদের লড়াই সবকিছুর চূড়ান্ত ফলাফল যু দ্ধ। ভারতীয় উপমহাদেশও সুপ্রাচীনকাল থেকেই নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে।
বাঙাল মুল্লুক অপার সম্ভাবনাময় এবং সম্পদের আঁধার ছিল। মূল শাসন দিল্লিতে হলেও এই মুল্লুক চালাতো অধিনস্ত রাজারা। তবে সে কালে বাঙালি পরিচিত ছিল ❛বিদ্রোহের দেশ❜ হিসেবে। ছোটো ছোটো রাজারা প্রায়ই নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করতো।
সালটা ১৫৯৬। বাংলার আকাশে তখন দুর্যোগের ঘনঘটা। মোগল শাসনের থেকে বেরিয়ে স্বাধীনভাবে থাকতে স্বপ্ন দেখছে তারা। এর কারিগর তখনকার বারো ভূঁইয়ারা। ঈশা খাঁ তখন বাংলার জনপ্রিয় এবং সাহসী নেতা। মোগলদের সাথে সমানে সমান লড়াই করে যাচ্ছেন। দিল্লির সম্রাট কিছুতেই পেরে উঠছে না এই বাঙালির সাথে। ঈশা খাঁকে দমন করতে সম্রাট পাঠালেন মানসিংহকে। লড়াই হবে এবার তুমুল, ছাড় পাবে না কোনো পক্ষই। এদিকে সুবাদার আসলাম শেঠের নেতৃত্বে থাকা জল-জঙ্গল প্রায় দখল করে নিচ্ছে মোগল সেনাপতি বাহরাম খাঁ। শেঠকে পরাজিত এবং দুর্গ দখল করে নেয়াই তার একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। তারা ছুটেছে অন্য এক লক্ষ্যে। নিশ্চিত পরাজয় জেনে আসলাম নিলেন এক কঠিন সিদ্ধান্ত। নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়ে গোপন পথে পাঠিয়ে দিলেন নিজের স্ত্রী সহ ছোটো এক বাহিনীকে। সাথে আছে এক অপার শক্তির উৎস। আসলামের স্ত্রী পারবে সেই শক্তি রক্ষা করতে?
দুর্গম এই পরিস্থিতি থেকে নিজেদের রক্ষা এবং আসলামের স্ত্রী মেহেরকে নিরাপত্তা দিতে ঈশা খাঁ সিদ্ধান্ত নিলেন এমন একজনের আশ্রয় নিবেন যিনি সাবেক মোগল বীর। মোগলদের রুখতে মোগল যোদ্ধা! তবে সে যোদ্ধার নামের সাথে তকমা পেয়েছে ❛রাজদ্রোহী❜ উপাধি। ঈশা জানেন ঠিক লোককেই তিনি নিয়োগ দিয়েছেন। মাসুম খাঁ কাবুলিই পারবে এই কাজ সমাধা করতে। নির্দেশ মতো মাসুম তার যাত্রা শুরু করে। দুর্গম পথ, জলে এবং ডাঙায় শ ত্রু, পানির ঠগী পাঙ্গু, ডাকাত এবং দুর্ধর্ষ মোগল সেনাদের বিপরীতে সে কতটুক সফল হবে? তার বীরত্বগাঁথা প্রচার হবে নাকি শুধু ❛রাজদ্রোহী❜ হয়েই রয়ে যাবেন?
সম্প্রতি মগরাজ রহস্যের শেষে উদ্ভুত ❛রাজদ্রোহী❜ রহস্যের সমাধান করতে পিবিআই অফিসের স্পেশাল উইংয়ে নিয়োগ পায় সপ্তরিপু কেসের হিরো ইন্সপেক্টর আহমেদ বাশার। তাকে দায়িত্ব দেয়া হয় নিখোঁজ আর্কিওলজিস্ট প্রফেসর ইফতেখার মাহমুদকে খুঁজে বের করার।
লুকোচুরি খেলা ভেবে একটু হালকা করে নেয়া কেসটা বাশারকে যে ভোগাবে সে ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি। সঙ্গী সোহেলকে নিয়ে অকূল পাথারে পরে সে। কেসের যতো গভীরে যায় ততোই কঠিন হতে থাকে পরিস্থিতি। ঘটনায় প্রবেশ করে কালো কোটসহ অদৃশ্য কিছু প্রতিপক্ষ। সবাইকে টেক্কা দিয়ে সফলতা পাওয়া বেশ কঠিন। কিন্তু বাশার হাল ছাড়ার পাত্র নয়। পৃথা, সোহেল, চৌধুরী আর উইংয়ের সহায়তা নিয়ে বাশার পারবে কি ছয়শ বছর আগের ঈশা খাঁর রহস্য সমাধান করে বর্তমানে নিখোঁজ মাহমুদকে খুঁজে বের করতে?
অতীত বর্তমানের সমান্তরালে চলা ঘটনাগুলোর কেন্দ্র কোথায়?
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
সময় উপাখ্যান সিরিজের চতুর্থ কিস্তি ❝রাজদ্রোহী❞। পূর্ববর্তী তিনটার মতো এখানেও অতীত বর্তমানের সমান্তরালে দুটো ঘটনার মূল এসে জড়ো হয়েছে। তৃতীয় বই ❛মগরাজ❜ যেখানে শেষ হয়েছে শারিয়ারের চট্টগ্রামে চালানো অভিযানের মাধ্যমে। সেখানেই মূলত আগমন ঘটেছে ❛রাজদ্রোহী❜ রহস্যের। যার সমাধানে সামনে থেকে কাজ করেছেন আহমেদ বাশার। ❛রাজদ্রোহী❜ তেও পূর্বকথা, গল্পের শুরু থেকে শেষ সহ মোট দুই অংশে (কল্পযাত্রা, সত্যাভিযান) ভাগ করেছেন।
প্রথম অংশে গল্পের প্লট এবং চরিত্র আগমন করে পরের অংশে রহস্যের সমাধান এবং ধোঁয়াশা অংশগুলোকে ধীরে ধীরে দিনের আলো দেখিয়েছেন। তবে এই বইতে লেখক শুরুতেই একটা অমীমাংসিত রহস্য রেখে দিয়েছেন যা হয়তো পরের কোনো উপাখ্যানে পরিণতি পাবে। ইতিহাসের আদলে কল্পনার বর্ণনায় লেখক মোগল শাসন এবং তাদের সাথে বাংলার বারো ভুঁইয়াদের সংঘাত এবং এর সমাধানের মাধ্যমে বাংলার ইতিহাসের যে লুকায়িত সম্পদ এবং রহস্যের কথা বলেছেন তা অবশ্যই ভালো লাগার মতো। অতীতের তালে এগিয়েছে বর্তমান। অতীতের বিভিন্ন সংঘর্ষের যে বর্ণনা লেখক দিয়েছেন সেগুলো বেশ উপভোগ্য ছিল। বিশেষ করে ঈশা খাঁ এবং মানসিংহের মধ্যকার দ্বন্দ্বযু দ্ধের যে দৃশ্য তিনি লিখেছেন সেটা মুগ্ধ করেছে। বর্তমানের বর্ণনায়ও বেশকিছু দারুণ অংশ ছিল। ছিল আগের গল্প থেকে আনা কিছু সংযোগ। ইতিহাস আশ্রিত ফিকশনে লেখক যদি বলেন করলা মিষ্টি তবে সেটাই মেনে নিতে হবে। ইতিহাসের সত্যতা যাচাই করার অবকাশ নেই বিধায় এখানে ইতিহাসের কিছু সলিড বিষয়ের একটু এদিক সেদিককে মিষ্টি করলা-ই মনে করেছি।
সিরিজের চারটি বইতে অতীতের মূল চরিত্র ঘটনার খাতিরে বদলেছেন তবে বর্তমানের মূল তিনজনকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাশার, তানভীর, শারিয়ার। তিনজনের মধ্যে আমার পছন্দ বাশার। তাই অপেক্ষায় ছিলাম আবার সে উপন্যাসে আসবে এবং চতুর্থ বইতে সে অপেক্ষা শেষ হয়েছে। এই বইতে বাশার আরো পরিণত এবং দক্ষ ছিল। বিশেষ করে শেষের দিকে বাশার খেলটা দিল একেবারে কিস্তিমাত জাতীয়। তার অতীত জীবনের আরো কিছু বিষয় এখানে এসেছে বিস্তারিতভাবে। অতীতের মধ্যে মাসুম খাঁর ঘটনা দারুণ ছিল। ঈশা খাঁকে যে ভালো লেগেছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। এছাড়াও মেহের, রায়েলি, নুক্কুন এই চরিত্রগুলো দারুণ। উপন্যাসের সমাপ্তিতেই লেখক পরবর্তী দুই উপাখ্যানের ইঙ্গিত দিয়েছেন এবং বোঝাই যাচ্ছে পুরো সিরিজটিই হবে একটা বিশাল ইতিহাসের র���স্যে মোড়া এক উপাখ্যান।
আমি বাশার, তানভীর এবং শারিয়ারের টিম আলফার অপেক্ষায় আছি। এরা একত্র হতে হতে সিরিজের হেপটা শেষ হয়ে না যায় আবার!
সমালোচনা:
প্রদীপের নিচেই যেমন অন্ধকার তেমন ভালো উপন্যাসের মধ্যেও কিছু খারাপ দিক থাকে এই উপন্যাসও সেই বৈশিষ্ট্য গঠিত। লেখকের ইতিহাস বর্ণনা এবং সবকিছুর একদম ডিটেল বলা যেমন ভালো লাগে তেমন বিরক্তির উদ্রেগ করে। এটা আগেও বলেছি। এই উপন্যাসেও তেমন অপ্রয়োজনীয় বর্ণনা ছিল। এক প্যারা জুড়ে কেবল একটা বাক্য লিখেছেন, যেটা চাইলেই আরো ছোটো করা যেত।
আমি জানিনা এটা উনার সিগনেচার স্টাইল কি না। দৃশ্য বর্ণনার ক্ষেত্রে সূক্ষ বিষয় আনা ভালো তবে লেখকের ক্ষেত্রে সেটা একদম অণু পরমাণু এর মতো ছোটো ডিটেল আনার সমান। যেমন:
* কার্পেটে বিড়ির ছাই পড়েছে সেটার ব্যাখ্যা ছিল চার লাইন জুড়ে। * একজন সোনালী তরল পান করছেন সেটার বর্ণনায় তিন লাইন! * Why so ❛স্রেফ❜? পুরো উপন্যাসে ব্যবহৃত শব্দ এক পাল্লায় আর আরেক পাল্লায় যদি ❛আক্ষরিক অর্থেই❜ এবং ❛স্রেফ❜ কে মাপা হয় আমার ধারনা পাল্লা ড্র করবে নাইলে আরেক পাল্লার ভার বেশি থাকবে। এই দুটো শব্দের মাত্রাতিরিক্ত এবং যেখানে ব্যবহার না করলেও চলে সেখানেও ব্যাবহার ভালো লাগেনি। একেবারে ১৫৯৬ থেকে শুরু করে একুশ শতকের বর্তমানের চরিত্ররাও স্রেফ স্রেফ করছিল। * এক জায়গায় লিখেছেন ❛অমুক জলদি জলদি এসেছে। আর্লি আসার কারণ এটা❜। জলদি নাইলে আর্লি যে কোনো একটাই এই প্যারায় ব্যবহার করা যেত। * একদিনের পরিচয়ে সম্বোধন আলোর বেগে বদলে যাওয়ার ব্যাপারটাও ভালো লাগেনি। বাশার সিনিয়র অফিসার তার সাথে সোহেলের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দেখালেও এত অল্প সময়ের মধ্যেই আপনি, তুমি, তুইয়ের পরিবর্তন অদ্ভুত ছিল। আগের দুটো বইতেও এক পলকে সম্বোধন বদলে যাওয়ার ঘটনা আছে।
এত বড় উপাখ্যান লিখছেন সেক্ষেত্রে উচিত ছিল চরিত্রের ধারাবাহিকতা রাখা। ❛মগরাজ❜ এ ভিকটিম এর নাম ছিল ❛সুলতান আবদেল❜ সে ব্যাক্তির নাম আকীকা না করেই ❝রাজদ্রোহী❞ তে হয়ে গেছে ❛হাসান আবদেল❜! আবার ❛মগরাজ❜ এর শেষে আবদেল এর আরেক সহযোগী বন্ধুর নাম ছিল ❛ইফতেখার আব্দদুল্লা❜ সেটাও একই প্রক্রিয়ায় ❝রাজদ্রোহী❞ তে হয়ে গেছে ❛ইফতেখার মাহমুদ❜! সম্বোধনের ভুল এখানেও অব্যাহত ছিল। আসলাম শেঠ হয়ে গেছিলেন শেখ। ❛ব্ল্যাক বুদ্ধা❜ এর জেড মাস্টারকে এখানে মাস্টার ডি বানিয়ে দিয়েছেন এবং এই বইয়ের ভিলেন কে মাস্টার জেড বলে পরিচয় করিয়েছেন কেন আমার জানা নেই। এগুলোকে ভুল-ই মনে হয়েছে। ইফতেখার, আবদেল নিখোঁজের আগে দিয়ে চৌধুরীর সাথে পরিচয় এবং কাজ হলে চৌধুরী কিভাবে জেলে পাঁচ বছরের সাজা শেষ করে (জেলে ১০ মাস বছরের হিসেবের পরেও আমার অংক মিলে নাই!) বেরোয় মুঝে সামাঝ নেহি আয়া। অধ্যায়ের শুরুতেই আগের বইকে অনুসরণ করে বোল্ড ১৬ সাইজের ফন্টে লেখা ❛পিবিআইএস অফিস❜ এবং আরেক জায়গায় ❛১৬৯৬❜ সাল লেখা। গুস্তাকি না হলে আমার মনে হয় সেটা হবে ❛পিবিআই অফিস❜ এবং ❛১৫৯৬❜ সাল। এজাতীয় ভুল একটা সুন্দর উপন্যাসকে ম্লান করে দেয়। তবে আশার করা এখানে জামা প্যান্টের সাথে বিভিন্ন জিনিসের ব্র্যান্ডের বিবরণ কমেছে। যা আমার জন্য স্বস্তিদায়ক।
সম্পাদনা:
আগের বইগুলোতে একটার সাথে আরেকটার বানান ভুলের যেমন হাড্ডাহাড্ডি লড়াই ছিল ❝রাজদ্রোহী❞ এক্ষেত্রে পিছিয়ে। যা পাঠকের জন্য ভালো। বানান ভুলের পরিমাণ ছিল তবে আগের বইগুলোর তুলনায় কম। কিন্তু ইনভার্টেড কমার ব্যবহারে দেখা গেছে যে বাক্যের শুরুতে থেকে দিতে হবে সেটা না দিয়ে মাঝে থেকে দেয়া হয়েছে এবং কোথাও আছে ক্লোজ করা হয়নি। পরের এডিশনে এই ব্যাপারগুলো কমিয়ে আনার আশা রইলো।
সময় বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়; কিন্তু হাজারো বছরের আগে আর পরে, যাপিত জীবনের টানাপোড়নগুলো সব একই রয়ে যায়, আবেগ আর ভালোবাসাগুলোও এক রয়ে যায়, এটাই হয়তো সময়ের উপাখ্যান।
ঘটনার শুরু হয় মুঘল সেনাপতি মানসিংহকে বাংলার বারো ভূঁইয়াদের শায়েস্তা করে বাংলার দখল নিতে হবে - এই ঘটনা দিয়ে। এদিকে বারো ভূঁইয়াদের তরফ থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ঈশা খাঁ। আর বর্তমানে মিসিং পারসনের কেস থেকে শুরু করে কোঁচো খুড়তে সাপ বেড়োনোর অবস্থা। সিরিজের বাকি বইগুলোর মত দুইটি টাইমলাইনে সুন্দরভাবে সাজানো গল্প। অতীত যেখানে শেষ হয়, বর্তমানটা খুব সুন্দরভাবে তার পর থেকেই শুরু হয়। সিরিজের আগের তিনটা বই স্ট্যান্ড এলোন হিসেবে পড়া গেলেও, রাজদ্রোহী ধরতে হলে আগেরগুলা পড়া লাগবে।
বইটাতে ঈশা খাঁ এর নাম সবার পরিচিত হলেও মূল নায়ক মাসুম খাঁ - যাকে রাজদ্রোহী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু এই মাসুমের সাহায্য নিয়েই ঈশা খাঁ খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার সাহস করেন। এই রাজদ্রোহীর প্রতিটা চিন্তা আর পদক্ষেপ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। আর নুক্কন - সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোর একটা ছিল, যেটা শেষে গিয়ে বুঝতে পারি। নুক্কন ছাড়া গল্পটা অন্যদিকে চলে যেত হয়তো। রসুল খাঁ আর তার ছেলের চরিত্রটা আরেকটু বিশদ হলে ভালো লাগতো।
ইতিহাসের মাল-মসলা নিয়ে খুব সুন্দরভাবে সাজানো থ্রিলার। টান টান উত্তেজনা অতীত বর্তমান সবখানেই সাজানো। তবে আগের বইগুলা যারা পড়েছেন কেউ খেয়াল করেছেন কিনা জানিনা - অতীত আর বর্তমানের ঘটনার সিকুয়েন্সে একটা প্যাটার্ন চোখে পড়ে গেছে আমার। যার জন্য কয়েকটা টুইস্ট প্রথম থেকেই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। আবার অতীত কিছু পড়ে বর্তমান কী হতে পারে বা বর্তমান থেকে অতীতের একটা আন্দাজ হয়ে যাচ্ছিল। যাই হোক টুইস্ট বুঝতে পারা না পারা গল্পের মূল বিষয় না।
বইয়ের কিছু জায়গায় চরিত্রের বা প্রতিষ্ঠানের নামের বা পদবীর ভুল হয়েছে। বানানে, জ্যোতি চিহ্নে কিছু ভুল চোখে পড়েছে । মাস্টার জেড / ডি এর নাম সম্ভবত ব্ল্যাক বুদ্ধা আর রাজদ্রোহী তে অদলবদল হয়েছে কোথাও। আর সেটা না হলে কীভাবে কে ছাড়া পেল জানতে পারলাম না।
সব মিলিয়ে গল্পটা অনেক ভালো লেগেছে। আর এই সিরিজটা পছন্দের কারণ আমাদের নিজেদের ইতিহাস, নিজেদের পরিচিত পরিবেশ নিয়ে এরকম থ্রিলার গল্প খুব কমই আছে। আর সফলভাবে সেই গল্পকে পাঠকের পছন্দনীয় করতেও খুব লেখকই পেরেছেন।
নিজের ইতিহাসের পটভূমিতে কিছু পড়লে অনুভূতিটা অন্যরকম কাজ করে। মনে হয় যাই গিয়ে দেখে আসি, আসলেও আছে নাকি কিছু, বা পরের পর্বের ক্লু পেয়ে যাই নাকি! এটা ইতিহাসের আশ্রয়ে লেখা থ্রিলার, নিরেট ইতিহাস না। হয়তো গল্পের প্রয়োজনে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এর পরিবর্তন হয়েছে। সেজন্য সত্যি ইতিহাস ভেবে না পড়লেই ভালো।
তবে পায়ামের যুদ্ধের পরিণতিতে আসলে কী ঘটেছিল এটা সিরিজের পরের কোন বইতে জানতে পারবো আশা করি।
তো যা বলছিলাম....শেষ করে ফেললাম রবিন জামান খানের সময় উপাখ্যান সিরিজের চতুর্থ বই রাজদ্রোহী। সিরিজের ঢাউস আকারের আগের তিন বই পড়তে গিয়ে কাহিনীর গতি কমে যাচ্ছিল মাঝামাঝি এসে যদিও তিন বইয়ের কাহিনীর প্লটই নিঃস্বন্দেহে অসাধারণ কিন্তু রাজদ্রোহী বইয়ে কাহিনীর গতি কমেনি একদমই। প্রতি পাতায় টান টান উত্তেজনা ছিল।
ভেবেছিলাম সিরিজের তৃতীয় বইয়ে যে অমিমাংসিত রহস্য ছ���ল সেটার সমাধান হবে এই চতুর্থ বইয়ে এসে। কিন্তু বইয়ের শেষ অব্দি এসেও রহস্যের কোন কুল কিনারা হয়নি। হয়তো সিরিজের পরের বইয়ে সব রহস্যের সমাধান হবে। অপেক্ষায় রইলাম সিরিজের পঞ্চম বই সিপাহীর জন্য।
"সময় উপাখ্যান" সিরিজে সপ্তরিপুর পর এই বইটিই আমার বেশি ভালো লেগেছে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গল্পের ঘোড়া একই গতিতে ছুটে চলেছে। অতীত ও বর্তমান দুটো টাইমলাইনের গল্পই ভালো ছিলো। বিশেষ করে বারো ভুঁইয়ার অন্যতম নেতা ইশা খার কাহিনি ভালো লেগেছে। শেষটায় ঠিকঠাক টুইস্ট সমেত লেখক ক্লিপ হ্যাংগার রেখেছেন যার জট খুলবে পরবর্তী গল্পগুলোতে। এছাড়া সম্পাদনাও বেশ ভালো ছিলো এই বইটিতে, বানান ভুলসহ অন্যান্য অসংগতি চোখে পরেনি তেমন।
যেভাবে অপেক্ষা করে বসে ছিলাম বইটা পড়ার জন্য, কেনার পর সেই আগ্রহ নিয়ে পড়তে বসা হয়নি। কিন্তু একবার পড়া শুরু করার পর আর রাখতেও পারিনি। রবিন জামান খান তার নামের সুনাম রেখেছেন বরাবরের মতোই।
মজার ব্যাপার, যে রাতে বইটা পড়া শুরু করেছি সেদিনই আমি সোনারগা আর পানাম সিটি ঘুরে এসেছি। তাই আগ্রহটা আরেকটু বেশি ছিল।
সময় উপাখ্যান সিরিজের চতুর্থ বইটি শেষ করলাম। প্লট ভিন্ন হলেও প্রতিটা বইয়ের বনর্নাভঙ্গি একই। অতীত এবং বর্তমানের মিশেলে গল্প এগিয়ে যাওয়া দারুণ উপভোগ করছি। ইতিহাস আশ্রিত হিসেবে বইটি লেখা হলেও গল্পে এতটাই ডুবে গেছিলাম যে আমার একবারও মনে হয়নি ইতিহাস নিয়ে পড়তেছি। প্রতিটা বইয়ে বর্তমানের চেয়ে অতীত গল্পই আমাকে বেশি টেনেছে। এই সিরিজের আরেকটি সুন্দর বই পড়ে ফেললাম। পরের বইয়ের অপেক্ষায় রইলাম।
খুবই কম্ফোর্টাবল রিড। কিন্তু দিনশেষে এখানে প্লটে কোন সামঞ্জস্য নেই, কাহিনীকে ড্রাগ করা হয়েছে, মূল ম্যাকগাফিনকে টেনে সিপাহী বইটাতে নেয়া হয়েছে। আপনার সময় উপাখ্যানের আগের বইগুলা পড়া থাকলে এটা চলবে কিন্তু এমনিতে স্টান্ড এলোন বই হিসাবে এটা দৌড়ায় নাহ
তবে পরের পার্ট এর জন্য অপেক্ষায় থাকব শুধুমাত্র সেই "রহস্যময় শক্তি " এর ব্যাখ্যা পাওয়া যায় নাকি শেষ পর্যন্ত তা রহস্যময় শক্তি হিসেবেই থাকে তা জানার জন্য।
ওভারঅল ভালই লেগেছে, বর্তমান কেমন জানি জোড়া তালি লাগানো; অতীত তুলনামূলক ভাবে বেশি ভাল!
সময়উপাখ্যান সিরিজের ৪ নং বই রাজদ্রোহী। এই সিরিজের অন্য বইগুলোর মত এই বইতেও লেখক সমান্তরাল ভাবে একই বিষয়বস্তু নিয়ে অতিত ও বর্তমান পটভুমিতে গল্প এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এই বইয়ের গল্পটি মূলত সিরিজের ৩য় বই মগরাজের সরাসরি সিক্যুয়েল। তবে স্বতন্ত্রভাবেও গল্পটা পড়া যায়। ঘটনাপ্রবাহের বর্ননা বেশ চমৎকার। বিশেষ করে অতিতের পটভূমি তে মাসুমের সাথে ঘড়িয়ালেরর লড়াই, দুর্গ আক্রমন ও পলায়ন, বিশু ডাকাতকে মোকাবেলা, ইশা খা ও মানসিংহের দ্বৈত যুদ্ধ এই সব ঘটনার লেখক এত সুন্দরভাবে বর্ননা করেছেন যে তা একদম চোখে সামনে ঘটছে এমনটা মনে হয়। বর্তমান পেক্ষাপটে ইন্সপেক্টর বাশারের তদন্তের টুইস্ট গুলো চমৎকার ছিলো। আর শেষের দিকে তো পুরো ঘটনাই উল্টে গেল। ভালো লেগেছে বইটা। তবে আফসোস রহস্য ভেদ হলো না। বইটা শেষ করার পর অতৃপ্ত বাসনা নিয়ে পরবর্তি বইয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে পাঠকদের।