"জাদুকরের গোপন শিশি কাত হয়ে বেরিয়ে আসে সন্ধ্যা।"
কিছু কিছু বই নিয়ে গুছিয়ে কিছু লেখা কঠিন কাজ, অন্তত আমার ক্ষেত্রে। "এক সন্ধ্যায় শ্যামশ্রী রায়" তেমনই একটা বই। ২০২২ এর বইমেলায় বেরোনোর পর এই গল্পগ্রন্থ পরপর দুবার পড়েছি। তাও কিছু লেখা হয়নি। যা-ই লিখতে যাই, মনে হয় হামিম কামালের অত্যাশ্চর্য কল্পনা প্রতিভা, সুরেলা সংগীতের মতো ভাষা, জাদুবাস্তবতা আর পরাবাস্তবতার আড়ালে থাকা প্রখর জীবনবোধের প্রতি সুবিচার করা হবে না।বা বলা যায়,কিছু লিখলে গল্পগুলোর ঐন্দ্রজালিক রেশ হারিয়ে যাবে। "যানপ্রেতের বর" এর মতো অদ্ভুত সুন্দর প্রেমের গল্প কি খুব বেশি পড়েছি? মনে হয় না। খেলাচ্ছলে নারীবাদী হয়ে ওঠা গল্প "পাঁচকন্যা পরিবার"ও তো আমার ভীষণ পছন্দের। দুই একটা গল্প বাদে পুরো বইটাই স্মরণীয়। অর্ক "যানপ্রেতের বর" পড়ে বলেছিলো, "এই প্লট লেখকের মাথায় আসলো কীভাবে?" এটা গল্পকার হামিম কামালের বেশিরভাগ গল্প নিয়ে আমারও প্রশ্ন। গল্পগুলো হয়তো আপনার প্রচলিত ধারণার সাথে মিলবে না, অন্যরকম লাগবে। কিন্তু স্বতন্ত্র ও বিস্ময়কর এক গল্পকারের দেখা পেয়ে যাবেন, এটা নিশ্চিত।
মায়াবৃক্ষ দেখতে কেমন? তাঁর ডালে কি ফুটে আছে অজস্র পাখি? জন্মেছিল কোন এক নদীর পাড়ে, এখন নাকি তাঁকে দেখা যায় অতিকায় পাহাড়চূড়ায়? মায়াবৃক্ষ কী মানুষ? হাঁটতে পারে, গাইতে পারে, দুঃখ হলে গান গায়? প্রশ্ন অনেক, উত্তরের সন্ধানে নেমেছি পথে। বৈরিতার ঘূর্ণিতে যখন লাগছে দিশেহারা তখন কে যেন হৃদয়ের খুব কাছে বসে বলছে, এই চিরহরিৎ অরণ্যে আমি এক পাতাঝলসা রোগ, আমাকে খুঁজে বের করো। খুঁজতে খুঁজতে পেলাম নিসর্গের চেয়েও প্রবীণ এক ঝর্ণা, পেলাম অন্তহীন অন্ধকার। তবু, উত্তর মেলে না, আমি হাঁটতে থাকি, হাঁটতেই থাকি, তারপর হঠাৎ দেখি দূরে পড়ে আছে একটা বই, বইটার নাম 'এক সন্ধ্যায় শ্রামশ্রী রায়'। আমি পড়তে শুরু করি হয়তো দুপুরে, গড়িয়ে আসে রাত কিংবা আমি আটকা পড়ি কোন এক সময়হীন জগতের মাঝে, যখন ফিরে পাই সংবিৎ, তখন বুঝতে পারি, মনের ভেতর এই মায়াবৃক্ষ সম্পর্কে সকল প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে 'এক সন্ধ্যায় শ্রামশ্রী রায়' এবং উত্তর'ও লুকিয়ে আছে বইটির মাঝে।
অদ্ভুত কৌতূহল নিয়ে আমি উল্টাই পাতার পর পাতা, দেখি কোথাও লুকিয়ে আছে লোককাহিনীর আদিম রস, তো কোথাও তুমুল জাদুবাস্তবতা। প্রাচ্যদেশীয় পূর্বপুরুষের রক্ত মিশে যায় আমার শরীরে, গঙ্গাঋদ্ধি আদিবাসীদের মতো আমিও শিখে ফেলি কল্পনা ব্যবহার করে মস্তিস্ক থেকে মস্তিস্কে বার্তা পাঠানোর কৌশল। কায়া ফেলে দিয়ে আমি ছায়া নিয়ে ভ্রমণ করি আর একটা কাচদণ্ডের কাছে দৃষ্টি বন্ধক রেখে দেখি, আমি যা ভেবেছি পৃথিবী তারচেয়েও সুন্দর। এই সুন্দরের মাঝে উড়তে উড়তে দেখা মেলে পরিচিত রমনার। এই রমনায় বসে আছে এক ডানা কাটা পরী, তাঁর বাঁশির সুর শুনে যদি ভাঙত আমার ঘুম, এইসব মনে হয়। মনে হতে হতে দেখি রূপালী নদীর উপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে ট্রেন। চলন্ত ট্রেন থেকে আমি হঠাৎ ঝাঁপ দেই জলে, যখন ডুব দিয়ে উঠে আসি ডাঙ্গায় তখন আবিষ্কার করি, আমি'ই সুকুমার, আবার আমি'ই সুমতি... শ্বাসের বাতাস টেনে টেনে বাঁশি বাজিয়ে চলেছে আমাকে আর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে অবসাদগ্রস্ত প্রেম।
যাত্রা তবু শেষ হচ্ছে না। বনজ সুঘ্রাণ পেয়ে ভুলে যাচ্ছি অতীতের সব স্মৃতি, বনের ভেতর তাই তো ছুটে যাচ্ছি সম্মোহিতের মতো। আমাকে সঙ্গ দিচ্ছে বাবা'র মতো আপন কোন এক অজ্ঞাত কণ্ঠ। আমি দেখছি পাখি যেমন পোকাকে খায়, পোকাও খায় পাখি'কে। নিজের সাথে তখন আনমনে আমি কথা বলতে শুরু করি আর জীবনে প্রথমবার টের পাই নিজের অস্তিত্ব। এই অস্তিত্বের সাথে বন্ধুত্ব জমে উঠার আগেই প্রবল জলোচ্ছ্বাসের মতো আমার বাস্তবতায় আসে 'পাঁচকন্যার পরিবার'। আমি যেন ফিরে পাই আমার হারানো শৈশব, আমি যেন ফিরে পাই বালকের উন্মাদনা। 'খাঞ্জালির গল্প' থেকে 'বত্রিশের সিংহাসন' সফর শেষে আমি আটকা পড়ি কোন এক খাঁচায় বন্দী পাখিদের সাথে। ভালোই হতো যদি থাকা যেত সেখানে, কিন্তু হয় না, বাতাসে ওজন চলে আসে, বুঝতে পারি বৃষ্টি হচ্ছে দূরে কোথাও। মনে পড়ে যায় সে'ই প্রেমিকের কথা। কোন প্রেমিক? যাকে তোমরা সবাই চেন। আমি তাঁর সাথে হেঁটে যাই রেললাইন ধরে। যেতে যেতে আটকা পড়ি এই মৃত শহরের জ্যামে। তখন কাগজ কলম আঁকতে শুরু করি এই শহরের ম্যাপ, অগণিত মৃত আত্মা যোগ দেয় আমার এই চিত্রকর্মে, শহরকে টেক্কা দিয়ে কলার উঁচু করে বলি, আমাকে কী দাবিয়ে রাখা যায়? সবকিছুকে পরাস্ত করার পরেও প্রশ্ন থেকে যায়। মায়াবৃক্ষের দেখা মেলে না। তখন সন্ধ্যা। শ্রামশ্রী রায়ের জন্য আমি অপেক্ষারত সুহান কিংবা আমি শ্রামশ্রী রায় হয়ে অপেক্ষা করি সুহানের জন্য। এই প্যারালাল সংকটে আটকা পড়ে আমি কিছুতেই বাড়ি ফেরার পথ খুঁজে পাই না। তখন মনে হয়,কেবল মায়াবৃক্ষ'ই সন্ধান দিতে পারে সঠিক পথের... আমি মায়াবৃক্ষের খোঁজে পথে নামি। মনে অনেক প্রশ্ন, প্রশ্নের মনে উত্তর।
চমৎকার ডিটেলিং ও মনোলগের মাঝে ভাবজগতের সমস্ত দরোজা যখন খুলে যেতে থাকে তখন অনেকগুলো গল্প এক হয়ে উড়ে যায় এক ঝাঁক বকের মতো, দূর থেকে দেখে মনে হয় আকাশে উড়ছে সফেদ কোন মালা। গল্পের আড়ালে থাকে গল্প, যে গল্প পড়ে সবাই হয়তো সন্ধান করবে নিজস্ব একটা মায়াবৃক্ষের, মনে হয় যেখানে সঠিক পথের সন্ধান শুধুই দিতে পারে, এক সন্ধ্যায় শ্যামশ্রী রায়। ...
বাংলা ছোটোগল্পের জগতে হামিম কামাল আমার প্রিয় গল্পকার। 'সোনাইলের বনে' গল্পগ্রন্থ পড়ে লেখকের সাথে পরিচয়। ২৪-এর বইমেলায় 'এক সন্ধ্যায় শ্যামশ্রী রায়' গল্পগ্রন্থে লেখকের দেয়া অটোগ্রাফ আমার জীবনে পাওয়া শ্রেষ্ঠ অটোগ্রাফ। যদিও অটোগ্রাফে আমার কোনো আগ্রহ নাই।
হামিম কামালের গল্পের সংগীতের মতো জাদুকরী ভাষা, আশ্চর্য চরিত্র, প্রতিটা গল্পের স্বতন্ত্র আইডিয়া, তাঁর অত্যাশ্চর্য কল্পনা প্রতিভা, গল্পে জাদুবাস্তবতা আর পরাবাস্তবতার সফল প্রয়োগ যেকোনো পাঠককে সম্মোহিত করবে। বাংলা ছোটোগল্পের জগতে হামিম কামালের মতো জাদুবাস্তবতা আর পরাবাস্তবতার সফল প্রয়োগ সমসাময়িক অন্য গল্পকারের গল্পে খুঁজে পাইনি; যদিও অনেকে দাবি করে।
'এক সন্ধ্যায় শ্যামশ্রী রায়' গল্পগ্রন্থে ৮টি গল্প রয়েছে। গল্পগুলো জাদুবাস্তবতা আর পরাবাস্তবতার, প্রেমের আর মৃত্যুর। প্রতিটা গল্প পড়ার সময় মনে হয়েছে গল্পের চরিত্র গুলোর মতো আমিও ভিন্ন কোনো জগতে চলে গেছি এবং সেই ভিন্ন জগত থেকেই গল্পগুলো পড়ছি। যেন গল্পগুলো আমাকে সম্মোহিত করেছে। যেন আমি স্বপ্নের দেশের কোনো গল্পগ্রন্থ পড়ছি। গল্পগুলোর চরিত্র আন্দালুসিয়া, সম্রান্ত বংশীয় সুন্দরী, সুকুমার, শ্রীপুরের যাত্রী ছেলেটা, নাগার বন্ধু জাহাজের পীত রোগী শেষ নাবিক, প্রেমিক যে তার প্রেমিকাকে পরকাল থেকে এসে নিয়ে যায় পরলোকে, যানপ্রেতের বর আর শ্যামশ্রী রায়ের সুহান যেন আমি নিজেই।
'আন্দালুসিয়া আর যানপ্রেতের বর' এর মতো আশ্চর্য স্বতন্ত্র জাদুবাস্তবতার গল্প অত্যাশ্চর্য কল্পনা প্রতিভা না থাকলে কোনো গল্পকারের পক্ষে লেখা সম্ভব নয়। এমন গল্পও ভাবা যায়। বাপরে!
গল্পপ্রেমিকদের জন্য হাইলি রেকমেন্ডেড। রেটিং- ৪.৫। যারা ছোটোগল্পে জাদুবাস্তবতা আর পরাবাস্তবতার সফল প্রয়োগ কীভাবে করতে হয় তা বুঝতে চান তাদের অনেক উপকারে আসবে। আর সাধারণ পাঠকরা এই গল্পগ্রন্থ পড়ে এমন কিছু গল্পের স্বাদ পাবে যা তারা বাংলা ছোটোগল্পে পূর্বে পায়নি।
‘সন্ধ্যা খুব অদ্ভুত সময়। ওর বাবা বলতো, ‘জাদুকরের গোপন শিশি কাত হয়ে বেরিয়ে আসে সন্ধ্যা।’ একদিন শ্যামশ্রী বলল, ‘বাবা, কিন্তু প্রতিদিন সেই শিশি আবার কে সোজা করে রাখে?’ বাবা বলল, ‘তাও প্রশ্ন।’
জাফর স্বাধীন বাসে করে কোথায় যেন যাচ্ছিল। হঠাৎ করে তার সামনেই সব বাষ্প হয়ে উড়ে গেল। এটা কি সেই অরওয়েলের কাল্পনিক পৃথিবীর বাষ্প হয়ে যাওয়া? যেখানে বিগ ব্রাদার এর বিপরীতে কিছু বললেই বাষ্প করে দেয়া হতো! বুড়োর জন্য কাঁদার কি কেউ নেই? বুড়োর সিটে দেখতে পেল একটি কাচ দন্ড। সেটা নিয়ে তারপর স্বাধীন ফেরত আসলো। অদ্ভুত কাচদন্ডটা ছিল মুর্ধা গেরস্তর মেয়ে আন্দালুসিয়ার। আন্দালুসিয়া দেখতে সুন্দরী হওয়ার উপাদান থাকলেও তার চোখের জায়গায় চামড়া দিয়ে ঢাকা ছিল। তাই যেন সুন্দরী হতে গিয়েও হতে পারেনি। অথচ এই কাচদন্ডটা কতবার হাত বদল হয়েছে।
রমনা পার্কে একটি অশোক গাছের নিচে পাতা বেঞ্চিতে একটি মেয়ে বসে আছে। পেপার হোল্ডারে রেখে দিয়েছে বাঁশি। আরো আছে তার ডানা, অবশ্য লুকানো। সেই বাশির সুরে মাতোয়ারা করে তোলে আশেপাশের সকলকে। তবুও সেই সুরে যেন অচেনা কোনো বার্তা রয়েছে। বাঁশি বাজানো থামিয়ে পার্ক থেকে বেরিয়েই সে উঠে পড়লো রুপালি ট্রেনে। রমনা পার্কের সামনে ট্রেন! খিলগাঁওয়ে এসে থামলো রুপোলি ট্রেন। সেখানে আছে সবুজ রঙের এক বাড়ি। সেখানে থাকে বিশেষ একজন মানুষ, যার রুপালি নদী দেখার অনেক শখ। রুপালি নদীই এসেছে বাঁশির সুর শোনাতে। কিন্তু সেখানে এসে সেই বিশেষ লোকটির মাকেই শুধু পাওয়া যায়। লোকটা নাকি মারা গেছে বহু বছর আগে নিজের শখ অপূর্ণ রেখেই!
অমবস্যার রাতে সুকুমার ও আলাউদ্দিন এসেছিল সুমতির সাথে দেখা করতে। সুমতি সুকুমারের প্রেমিকা। সুকুমার একা আসতে চায় নি, তাই সাথে এনেছিল আলাউদ্দিনকে। হাতে ছিল বাঁশি। এই বাঁশির সুরেই মোহিত হয়ে থাকতো সুমতি। আবদার করতো বারবার বাঁশির সুরে অবগাহন করতে। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও যখন সুমতি আসে না তখন সুকুমারের আশঙ্কা দৃঢ় হয় যে সুমতি মারা গেছে। সুমতি যে মারা গেছে এই বিশ্বাসটা সুকুমারের মনে কীভাবে আসলো তা খুঁজে পায় না আলাউদ্দিন। হেঁটে চলে বাঁজা বিলের দিকে। কসিমের নৌকায় চড়ে ঘুরবে দুই বন্ধু।
বিশ বছর আগে নাগা ও কথক দাঁড়িয়েছিল বরই গাছের নিচে বরই চুরির আশায়। কোনোভাবেই নাগাল পাচ্ছিল না, তখন পায়ের জুতা নিয়ে যখনই ছুড়তে যাবে বাড়ির মালকিন দরজা খুলে বের হয়ে আসে। তখন আর তাদের পায় কে! রাস্তায় সেই মহিলা একদিন কথককে দেখে বাড়িতে যেতে বলে। দুরুদুরু বক্ষে একদিন সাহস করে যায় সেই বাড়িতে। নির্জন শুনশান বাড়ি। তবে বাড়িতে মানুষের সংখ্যা যে অনেক তা বোঝা যাচ্ছিল ঘর-বাহির করা মেয়েদের দেখে। বারান্দায় বসে বইয়ের শেলফে রঙিন মলাটের বই তাকে আকর্ষণ করেছিল। বুঝতে পেরেছিলেন মহিলাটি। পড়তে দিয়েছিলেন। এই বইয়ের লোভেই বারবার সেই বাড়ি যেত কথক। একদিন মহিলার মেয়েরা বইটি দিতে অস্বীকৃতি জানায় তাই মহিলা লুকিয়ে কথককে বইটি দিয়ে দেয়। এরপরই সে পড়ে অসুখে। সেরে উঠে গিয়ে তার পরিচিত দুনিয়া আর পায় না।
শ্যামশ্রী রায় ও সুহানের আজকে রেঁস্তোরায় দেখা করার কথা। সাথে থাকবে সুহানের মা-বাবা। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করার পরেও শ্যামশ্রী আসেনা আবার তার ফোনও অফ। বাড়িতে ফোন দিয়েও জানতে পারে শ্যামশ্রী বেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। সুহানের বাবা-মা আর দেরি করতে না পেরে বাসায় চলে যায়। সুহান একা বসে থাকে রেঁস্তোরায়। ঠিক সময়েই বেরিয়েছিল শ্যামশ্রী। খাবার টেবিলে বসেছিল সবার সাথেই। রান্না হয়েছিল চাঁদ কিন্তু অস্বস্তি হচ্ছিল তার। উঠে পড়েছিল সবার বারণ সত্ত্বেও। ঘুমের মধ্যেই সুহান দেখলো শ্যামশ্রী চলে এসেছে কিন্তু ঘুম ভেঙে কাউকে না পেয়ে রেঁস্তোরা থেকে বের হয়ে আসে সে। হাঁটতে হাঁটতে সে পৌঁছায় এক বাড়িতে। সেখানে সে পায় শ্যামশ্রীকে। সেখানেই নাকি সুহানের জন্য সবাই অপেক্ষা করছিল। এদিকে আবার শ্যামশ্রী রেঁস্তোরায় এসে সুহানের খোঁজ করলে তাকে কোথাও পাওয়া যায় না।
বাস্তব, অবাস্তব, পরাবাস্তব কিংবা জাদুবাস্তব কোনো নির্দিষ্ট বিশেষণেই গল্পগুলোকে আটকে রাখা যায় না। কোনো বাক্য আলাদাভাবে পড়লে মনে হবে অর্থহীন প্রলাপ। কিন্তু এই বাক্যগুলো জোড়া দিয়ে দিয়েই একটি অর্থবহ সুন্দর গল্পের কাঠামো গড়ে উঠেছে। গল্প-উপন্যাস কিংবা পুরনো কিচ্ছা-কাহিনীতে মানুষের কত ধরনের বর প্রাপ্তির গল্প বলা হয়েছে। কিন্তু যানপ্রেতের বর কেউ পেয়েছে কখনো? ঢাকার মতো জ্যামের নগরীতে এই বর পেলে তাকে আর পায় কে! ঢাকার রাস্তায় নিয়মিত চলাফেরা করলে এই গল্পের সাথে নিজেকে মেলাতে চাইবেন অনেকে। হামিম কামালের লেখা আগে কখনো পড়া হয় নি। সেই হিসেবে বলতে গেলে লেখকের সাথে প্রথম পরিচয়েই দারুণ এক অনুভূতির সৃষ্টি হলো। আশা করি ভবিষ্যতেও এমন ভাব বজায় থাকবে। হ্যাপি রিডিং।
'রমনা' গল্পটা পড়ে মনে হলো বড়দের রূপকথা পড়ছি। 'আন্দালুসিয়া' গল্পে দেখলাম শব্দ আর আলোর অবাক ভ্রমণ "যানপ্রেতের বর" আমার পড়া সেরা ভালোবাসার গল্পের মধ্যে একটা এখন থেকে। এবং নামগল্প "এক সন্ধ্যায় শ্যামশ্রী রায়" পড়ার পর বুকভরা হাহাকার সৃষ্টি হলো। হামিম কামালের গল্পের রশদ আসে সুদূর নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে। ঢাকায়, জামালপুরে অথবা নরসিংদীতে এসে ওরা মিশে যায় ভীড়ে। গোপনে, আমাদের দৈনন্দিনে। যাপিত জীবনে তৈরি করে অনুভূতির নতুন মাত্রা। চাঁদ চলে আসে ডিনার টেবিলে। হলুদ আলোর মখমল মাখনে আবৃত হই আমরা। এমন সব গল্পের জন্যে নিঃশ্বাস বন্ধক রাখা যায় বাঁশীর সুরে। হামিম কামাল আমাদের সেই সন্ত বংশীবাদক।
সমস্ত গোপনীয়তা উপুড় করে দেওয়া এই নগরে ব্যক্তিগত আড়াল বলে কিছু নেই। পালাতে চাইলে, হারাতে চাইলে মুহূর্তেই ভীষণ সতর্ক হয়ে ওঠা নাগরিক কোলাহল চারদিক থেকে আটকে দেবে পথ। নিঃশ্বাসে নগরের দূষিত বাতাসের সাথে উড়তে থাকা স্বাচ্ছন্দ্য-সমৃদ্ধির বানোয়াট আশ্বাস টেনে নিতে নিতে আমরা পরিণত হচ্ছি এক একটা অনুভূতিহীন যন্ত্রযানে। ইচ্ছেরা মরে যাচ্ছে, ঘোরগ্রস্থের মতো ক্রমেই ডুবে যাচ্ছি ভয়ানক আস্থাহীন এক সময়ের ভেতর।
তবে এটা ঠিক যে সমস্ত অলৌকিক ঘটনায় বিশ্বাস হারিয়ে ফেলা মন যদি সন্ধান পায় পালিয়ে যাবার জন্য এক যাদুকরী গোপন দরজার, সেখানে অজস্র দ্বিধা জড়ো হয় ঠিকই কিন্তু একবার সে দরোজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়া গেলে এই ভ্রমন কিন্তু হতে পারে উপভোগ্য।
যাদুকরের কাত হয়ে যাওয়া শিশি থেকে বেরিয়ে পড়া সন্ধ্যায় আটকে পড়া সুহান ও শ্যামশ্রী রায় কিংবা স্বচ্ছ কাঁচদন্ড হাতে বাসের সিট থেকে বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়া বুড়ো আজরফের গল্পটা শুরুতে আমাদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলেও পরবর্তীতে ঠিকই ঘুঁচিয়ে দেয় কল্পনা ও বাস্তবের ফারাক। তাইতো রমনা পার্কের বাঁশিয়াল সেই পরী যে লুকিয়ে রেখেছিলো তার ডানা আর বাঁশির সুরে ভাঙ্গাতে চেয়েছিলো জনৈক তরুণের ঘুম, তার সাথে শহরের বুক চিরে ছুটে যাওয়া অলৌকিক ট্রেনে উঠে পড়া যায় নির্দ্বিধায়।
যাদুকর তার কাত হয়ে যাওয়া শিশি তুলে নিতে ভুলে যাওয়ায় আমাদেরকে আটকে পড়তে হয় অন্তহীন এক সন্ধ্যার প্যারাডক্সে। পৌনঃপুনিকতায় ক্লান্ত আমরা হয়তো এক একসময় মুক্তি চাই, আবার একই সাথে আটকে পড়ি প্রেমিকার নিঃশ্বাস চুরি করে বাঁশি বাঁজানো সুকুমার কিংবা বত্রিশ সিংহাসনের মায়াবী বইয়ের মলাটের মায়াজালে।
হামিম কামালের গল্পগ্রন্থ "এক সন্ধ্যায় শ্যামশ্রী রায়" পাঠককে পরিচয় দেবে চেনা পৃথিবীর বাইরে সম্পূর্ণ অন্য এক পৃথিবীর এবং কেবলমাত্র মানুষ ও প্রকৃতির উৎসমূলের সন্ধ্যান করতে গেলেই খুঁজে পাওয়া যাবে এই ভূগলের মানচিত্র। হামিমের লেখার সাথে যাদের একটু হলেও পূর্বপরিচিতি আছে তাদের কাছে অবশ্য এই ভূগলের যাবতীয় অনুষঙ্গের প্রকৃতি খুব একটা অপরিচিত মনে নাও হতে পারে। তবে নতুন পাঠকের জন্য এই বইয়ের গল্পগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পাঠ অভিজ্ঞতা তৈরি করবে।
"জাদুকরের গোপন শিশি কাত হয়ে বেরিয়ে আসে আসে সন্ধ্যা।"
লেখকের হাত ধরে গল্পরাও এভাবে হাঁটাহাঁটি পা পা করে বের হয়ে এসেছে বোধহয়। এক বসাতে শেষ করার মতো বইটি। একটা গল্প শেষ করে অন্য গল্পে যাওয়ার জন্য একটা অদম্য বাসনা মনে জেগে ওঠে। আন্দালুসিয়া গল্পে লেখক যে ভ্রম তৈরি করেছেন তা চমৎকৃত করেছে। সুরেলা গল্পটি সুরের মতো একটা আবহ প্রকাশ করে মনকে স্তব্ধ করে দেয়। তেমন ভাবেই "যানপ্রতের বর" ও "এক সন্ধ্যায় শ্যামশ্রী রায়" গল্পগুলি পড়ার পর রেশ থেকে যায়। লেখকের তৈরি করা জগতে বাস করতে ইচ্ছে করে আরো কিছুক্ষণ। এভাবেই শেষ হতে হতে পড়ে শেষ করে ফেলি গল্পগুলো। এভাবে ত্রস্ত পথে হেঁটে হেঁটে লেখকের তৈরি করা প্রতিটি ভ্রমের জগৎকে ছিন্ন করে নিজেকে শোষণ করে নিতে হয় লেখকের মন্ত্রমুগ্ধ লেখনী।
- আন্দালুসিয়া (২/৫) - রমনা (১/৫) - সুরেলা (৫/৫) - শ্রীপুরের যাত্রী (১/৫) - পাঁচকন্যা পরিবার (৫/৫) - প্রেমিক (৩.৫/৫) - যানপ্রেতের বর (৩/৫) - এক সন্ধ্যায় শ্যামশ্রী রায় (৩.৫/৫)
হামিম কামালের সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার হচ্ছে উনি effortlessly গল্প বলতে পারেন, যেমনটা ধরা হয় বড়মাপের গল্প বলিয়েদের গুন। এই বইয়ের “সুরেলা”, “পাঁচকন্যা পরিবার” গল্প দুটো আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে। বিশেষ করে "পাঁচকন্যা পরিবার" - এ গল্পটা বিষয়ে, লেখার মানের দিক থেকে এতোটাই ভালো হয়েছে যে আমার ধারনা শুধু এই একটা গল্পই হামিমের জন্য যথেষ্ট পাঠকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিতে। “আন্দালুসিয়া”, “রমনা”, আর "শ্রীপুরের যাত্রী” এ গল্পগুলো যে কারণে ভালো লাগেনি সেই ব্যাপারটা এখনকার অন্য কয়েকজনের লেখাতেও পেয়েছি – অবাস্তব, পরাবাস্তবের সাথে seamlessly মূল গল্পটার না মেশাতে পারার দূর্বলতা। একই সমস্যা “এক সন্ধ্যায় শ্যামশ্রী রায়”তেও আছে কিন্তু গল্পটার হাহাকার, ব্যাকুলতা এতো বেশি যে দূর্বলতাটা চোখেই পড়ে না এক পর্যায়ে। তবে “এক সন্ধ্যায় শ্যামশ্রী রায়” আর “সুরেলা”র হামিম কামালকে বরং মনে হয় লাতিন আমেরিকার রাঘব-বোয়াল লেখকদের কারও কারও বেশ খানিকটা কাছের লোক। “যানপ্রেতের বর” গল্পটা ৫ এ ৫ পাওয়ার মত কিন্তু একটা দুটো ব্যাপার আছে যা এর আসল চার্মকে অনেকখানি আন্ডারমাইন করে ফেলেছে। “প্রেমিক” এর কথা আলাদা করে বললাম না কিন্তু এটাও পড়তে বেশ ভালো লেগেছে।
জাদুবাস্তবতা বা Magic Realism বলতে যে শব্দটা রয়েছে সেটা দিয়ে বোঝায়, সাহিত্যের যে ধারায় কাল্পনিক কিংবা জাদুকরী শব্দাবলী কিংবা ঐন্দ্রজালিক পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে বাস্তব পৃথিবীর একটি চিত্রপট তুলে ধরা হয়। বিষয়টাকে অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টের সাথে তুলনা করা চলে। আমাদের জীবনযাপনের বাস্তবতা যেরকম, গদ্যের দুনিয়া ঠিক সেরকম নয়। এর বাইরের আরেকরকম উচ্চস্তরের কল্পিত বাস্তবতা এটি, যেটিকে আপনি লজিকে ঠিক ফেলতে পারবেন না, তবে অনুভব করতে পারবেন। তখন এটি হয়ে দাঁড়াবে অন্তরের খুব কাছের কোনো লেখনি। এই হলো মূল উপজিব্য বিষয় এই ধরণের সাহিত্যের।
এই জাদুবাস্তবতাকে মাটিতে নামিয়ে আনার একটি সুন্দর অভিপ্রায় ছিল হামিম কামালের লেখা 'এক সন্ধ্যায় শ্যামশ্রী রায়'। লেখক হামিম কামালের সাথে আমার এর আগে পরিচয় ঘটেনি। এখানের আটটি গল্পের সবগুলো যে ভালো লেগেছে কিংবা ধরতে পেরেছি তা নয়। কিছু গল্প ঠিক ভালো লাগেনি। তবে সুখপাঠ্য লেখনীর জন্য পড়তে খারাপ লাগেনি। রেখে দিয়ে অপেক্ষা করবার প্রয়োজন পরেনি। তাছাড়া পৃষ্ঠাসংখ্যা হিসেবেও এই ছোটগল্পের বইটি বেশ ছোটোই। আমার সবচেয়ে পছন্দ হয়েছে পাঁচকন্যা পরিবার, যানপ্রেতের বর, এক সন্ধ্যায় শ্যামশ্রী রায় শিরোনামের গল্প তিনটি।
এ ধরণের সাহিত্যের সাথে আমার পরিচয় ঘটছে ধীরলয়ে। তবু একটি বিষয় আমার ছোট মস্তিষ্ক আমাকে বারবার বলছে যে, লেখক হামিম কামাল কন্টেম্পরারি জনরা কিংবা কথাসাহিত্যে লেখার চেষ্টা করলে আমরা খুব ভালো কিছু লেখা পেতে পারি। তার বর্ণণা কিংবা পারিপার্শ্বিকতার সুস্পষ্টতা আমাকে আকর্ষণ করেছে। সেজন্য লেখকের কাছে কথাসাহিত্য ধারার একটি বই লিখবার আর্জি রেখে বইয়ের পাতার একটি লাইন উদ্ধৃত করে শেষ করছি।
...সন্ধ্যা খুব অদ্ভুত সময়। ওর বাবা বলত, 'জাদুকরের গোপন শিশি কাত হয়ে বেরিয়ে আসে সন্ধ্যা।' কিন্তু একদিন শ্যামশ্রী বলল, 'বাবা, কিন্তু প্রতিদিন সেই শিশি আবার কে সোজা করে রাখে?'
বইবন্ধুদের থেকে লেখক হামিম কামালের নাম অনেক শুনেছি। তাই নীলক্ষেতে বইটা পেয়ে লুফে নিতে দেরি করিনি। বইটা পাঁচ ছয়টা গল্পের সংকলন। সবগুলো গল্পই অদ্ভুত জাদুবাস্তবতায় ঘেরা। হেয়ালিরও বেশ খানিকটা ছোঁয়া ছিল বলে মনে হল। লেখকের ভাষাও অন্যরকম সুন্দর। কাব্যিক না হেয়ালি ঢঙে আন্দালুসিয়া থেকে গুলিস্তান শুরু করে মিরপুর, আবার গাজীপুরের রহস্যেঘেরা ভীষণ অরণ্যে সফর। যে সফরগুলো জাদুবাস্তবতার দারুণ অধ্যায় আপনার কাছে উপস্থিত করবে। কিংবা ঢাকার সড়কদ্বীপের সেই অদ্ভুত বাড়ি যেখানে চাঁদ খেতে পাওয়া যায় এরকম গল্পগুলো সুন্দর এক ঘোরের মধ্যে ফেলে দিবে। লেখকের প্রথম বই পড়ার অভিজ্ঞতা ভালো হলো। তার আরও কিছু বই পড়ার জন্য মুখিয়ে রইলাম।
❛এক সন্ধ্যায় শ্যামশ্রী রায়❜ বইটি মূলত ৮টি ছোটগল্পের একটি সংকলন। অবাস্তব সব ঘটনাকে কল্পনার সাথে মিশিয়ে অদ্ভুত সুন্দরভাবে গল্পগুলো লেখা হয়েছে। পরাবাস্তবতায় ঘেরা প্রায় প্রতিটি ছোটগল্পই ভালো লেগেছে, তাই ম্যাজিক রিয়েলিজম ঘরানার গল্প পড়তে যারা পছন্দ করেন তাদের বইটি আশাহত করবে না।
দীর্ঘদিন হুমায়ূনে আসক্ত থেকে অবশেষে মনে মনে ঠিক করেছিলাম এবার একটু স্বাদ বদলানো উচিত। একটাই জীবন, শুধু কী হুমায়ূন পড়েই কাটিয়ে দিব?
কিন্তু কোন লেখকের বই পড়ব? সংগ্রহে রয়েছে প্রচুর সংখ্যক বই। চাইলেই শুরু করে দেওয়া যায় একটা হাতে নিয়ে, কিন্তু কিসের এক পিছুটান সবসময় লেগেই আছে আমার সাথে। এরমধ্যে একদিন মধ্যরাত্রে গুডরিডসের অলিগলি ঘুরতে ঘুরতে নতুন এক লেখকের একটা বই সামনে আসে। লেখক নতুন না কিন্তু আমার জন্য নতুন। বইটার নাম প্রথম দেখায়ই মনে ধরে যায়। "এক সন্ধ্যায় শ্যামশ্রী রায়" কি অদ্ভুত সুন্দর তাই না? নামটা টুকে রাখা উচিত ছিল কিন্তু আমার খেয়ালি মন হারায় ফেললো নামটা। এরপর কেটে গেল আরো বেশ কিছুদিন।
এর মধ্যে আমি পড়লাম আরেক সমস্যায়। উপন্যাস পড়তে খুব প্যারা খেতে হচ্ছিল কারণ একাডেমিক প্রেসার বলা নাই কওয়া নাই হুট করে এসে হাজির। তখন ঠিক করি কিছুদিন উপন্যাসকে আলবিদা বলে ছোটগল্প পড়ব। ছোটগল্প এখানেই সেভিয়ারের দায়িত্ব পালন করে। এখানে নেই কোন এটাচমেন্ট। পড়লাম রেখে দিলাম আবার কিছুদিন পর পড়লাম। তখন খোঁজা শুরু করি কিছু আন্ডারেটেড ছোটগল্প। ফেসবুক, ইনেস্টা কই কই না খুঁজছি! নাম কালেক্ট ও করে ফেলেছিলাম একাধিক। এরই মধ্যে আবার খুঁজে পাই সেই পরিচিত নামটি। "এক সন্ধ্যায় শ্যামশ্রী রায়" লেখক হামিম কামাল। এই বছরের বইমেলায় হামিম কামালের "ত্রিস্তান" বইটি বের হয়েছে। টুকটাক রিভিউ পড়ার জন্য ওনার নামটা মস্তিষ্কে লেগে ছিল। সঙ্গে সঙ্গে এ্যাড করে ফেলি উইশলিস্টে।
অতঃপর... আমার জন্মদিনের প্রায় এক মাস আগে, কোন এক ভর সন্ধ্যায় শিফার মনে খেয়াল আসে, যে যাই গিয়ে এক সারপ্রাইজ দিয়ে আসি। এরপর... সে আর এক লম্বা কাহিনী, যাইহোক, বইটা ওর থেকেই গিপ্ট হিসাবে নেওয়া।
বইটা হাতে আসার পর আর অপেক্ষা করতে পারছিলাম না পড়ার জন্য। এবং শুরু করে দি...
কিন্তু, এ কী! কিছুই তো বুঝি না। লেখকের লেখার ধরন যে খুব গুরুগম্ভীর তা কিন্তু না। তবে লেখকের একটা শখ হচ্ছে শব্দ নিয়ে খেলা করা। এটা তার বিশেষ এক দক্ষতা বলা চলে। লেখকের কল্পনা শক্তি এতটা প্রখর, আমি হিমসিম খাইতে শুরু করি। বইটিতে সর্বমোট ৮ টি গল্প রয়েছে।
সবগুলো গল্পেই রয়েছে জাদুবাস্তবতা বা magic realism. তবে সবকিছুর কেন্দ্র বিন্দুতে ছিল লেখকের সংগীতের সুরের মতন করে শব্দের প্রয়োগ। প্রথম চারটি গল্প আমি কেমন কেমন করে পড়ে শেষ করেছ তা আমি বলতে পারব না। বুঝেও যেন বুঝে উঠতে পারি না, হচ্ছে কী আসলে। এরই মধ্যে তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়ি। বিছানা থেকে নড়ার ক্ষমতাও হারাতে বসেছি। তখনো বইটা মুখের পর তুলে পড়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম কিন্তু মস্তিস্কে চাপ দিয়েও ও বেচারা কোন ফিডব্যাক দিতে পারছিল না। তখন সেফা কে ইমেইল করে জানাই, "হচ্ছে না..পারছি না পড়তে, এমনটা কেন হচ্ছে? কি করব আমি?"। ও তখন বলে রয়েসয়ে পড়তে, 'এত কিসের তাড়া'। ওকে ডান, ধীরে সুস্থে পড়ব ঠিক করলাম। এবং মজার বিষয় হচ্ছে, এরপর যে গল্পটা পড়লাম সেটার সবটাই যেন বুঝতে পারলাম। গল্পের নাম, "পাঁচ কন্যা পরিবার", এই গল্পটা যখন পড়েছি তখন বাসায় ইলেক্ট্রিসিটি নাই, সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে বাইরে। জানালা দিয়ে মলিন আলো এসে পড়ছে ফ্লোরে, আর আমি বিছানায় হেলান দিয়ে সবে পড়ে শেষ করেছি গল্পটা..শেষটা বিরহে গাঁথা। জীবিত মানুষের পাখি হয়ে যাওয়া কিংবা মন ভোলানো। কিছু সময় নিস্তব্ধ হয়ে বসে আবারও পড়া শুরু করলাম পরের গল্পটা, আর এটা যেন আরেক অতল সাগরে ফেললো আমায়। কারণ গল্পটা আমার খুবই পরিচিত। এমন গল্প আমি বছরের পর বছর মধ্যরাত্রে ইনসমনিয়ার দ্বারা ঘায়েল হয়ে, সিলিং ফ্যানের দিকে চেয়ে কল্পনা করে গেছি। হামিম কামাল আমার কল্পনার এক্সেস পেল কিভাবে?
সব কয়টি গল্প শেষ করে, ভাবছিলাম, এই বইটা আমার আবার পড়া লাগবে। কারণ হিসাবনিকাশ এখনো বাকি আছে। এক বসায় সবটা বোঝা অসম্ভব। আরো কয়েকবার পড়লে হয়ত, আস্তে ধীরে সবকিছুই বুঝে উঠতে পারব। তবে এখন না, সময় যাক। এত কিসের তাড়া.. জীবন কি ফুঁড়িয়ে যাচ্ছে?
"Fables are dreams Not lies and the truth changes As man change " - Charles Bokowsky
"এস ভাই, তোল হাই, শুয়ে পড় চিত, অনিশ্চিত এ সংসারে এ কথা নিশ্চিত— এ জগতে সকলি মিথ্যা সব মায়াময় স্বপ্ন শুধু সত্য আর সত্য কিছু নয় " —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ওপরের দুটি কবিতার কী মিল! দুজন দুই সংস্কৃতির দুটি ভিন্ন সময়কালের ভিন্ন দুটি মানুষ। মিল কেবল একজায়গায় তারা দুটি স্বপ্নচারী। স্বপ্নচারিতার অভিন্ন পথের পথিক।
স্বপ্নচারী মানুষের কাছে বাস্তবজগৎ আলো ছায়ার এক বিজড়িত মিশ্রণ। এই মিশ্রণে স্বাভাবিক বস্তুজগৎ আলোছায়ার খেলায় মেতে ওঠে, ভেঙে ফেলে তার আকার আকৃতি রঙ গন্ধ। বাস্তবতা হয়ে ওঠে পরাবাস্তব। পরাবাস্তব হয়ে ওঠে বাস্তব। এক সন্ধ্যায় শ্যামশ্রী রায় বইটির আবহটিই এমন। বাস্তবতা পরাবাস্তবতার সম্মোহনীয় মিশেল। সম্মোহিত স্বপ্নচারী চরিত্রগুলো ঘুরে ফিরে একাধিক গল্পে আসে। চন্দ্রাহত, সম্মোহিত, অন্য ভূবনের আলোকপ্রাপ্ত হয়ে। গল্প বলার ধরণ চারপাশের স্বাভাবিক দৈনন্দিন জগৎকে যেভাবে লেখক পরাবাস্তবতার প্রলেপ দিয়েছেন তা আমার কাছে এক নতুন অভিজ্ঞতা। যদি দুই একটা উদাহরণ টানি : "পাশাপাশি রাখা তিনটি আয়নার একটিতে ঘোলাটে প্রতিবিম্ব দেখা যায়, একটিতে দেখা যায় স্পষ্ট প্রতিবিম্ব, আরেকটি আয়নায় প্রতিবিম্ব দেখা যায় না। স্বপ্নচারীদের স্বগতোক্তির যতিচিহ্ন থাকে না। যানপ্রেতের উপাসক নিজে হয়ে ওঠে উপাস্য দেবী যে প্রেম আরাধনায় তুষ্ট হয়ে উপাসকের যন্ত্রণা হরণ করে অলৌকিকভাবে। " নজরুল নামক স্বপ্নচারী তার প্রিয়াকে বলেছিলো " বাতাস হইয়া জড়াইবো কেশ বেণী যাবে যবে খুলিতে আমারে দেবো না ভুলিতে আমি চিরতরে দূরে চলে যাবো তবু আমারে দেবো না ভুলিতে " পৃথিবীর সকল স্বপ্নচারী প্রেমিকরা কী তার স্বপ্নচারিনীদের এ কথা বলে না? প্রথম দুটি গল্প বাদে আমার বাকি সবগুলো গল্পই ভালো লেগেছে। সুরেলা, শ্রীপুরের যাত্রী, পাঁচকন্যা পরিবার, যানপ্রেতের বর এই গল্পগুলো দীর্ঘস্থায়ী রেশ রেখে যাওয়ার মতো। এক সন্ধ্যায় শ্যামশ্রী রায়ের পাঠপ্রতিক্রিয়া লিখতে বসে আমি ভাবতে পারছিলাম না কী লিখবো। কী লেখা যায়! কী দিয়ে শুরু করা যায়। যাদুকরের জাদুর শিশি কাত হয়ে সন্ধ্যা বেড়িয়ে আসে। আমি পকেট হাতড়ে সেই শিশি পেলুম না পেলুম জাদুকরের রঙিন লম্বা রুমাল। যা পকেট থেকে যতো টানো বের হতে থাকে শেষ হয় না সহজে। রঙ পাল্টাতে থাকে বরং। একটি রুমালের সাথে আরেকটি রুমাল থাকে গিট দেয়া। আমি সেই গিটে বাঁধা পেলাম রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, চার্লস বুকোস্কি, নিজেকে, হামিম কামালকেও।
এক সন্ধ্যায় শ্যামশ্রী রায�� জাদুবাস্তব এক পৃথিবীর গল্প। আনন্দের জায়গাটা এখানেই এই জাদুবাস্তবতা লাতিন জাদুবাস্তবতা নয়, পাশ্চাত্য প্রভাবিত জাদুবাস্তবতা নয়, এটা হামিমের নিজস্ব জাদুবাস্তব জগত, যে জগতটা এই দেশের মাটি ঘেঁষা।
ব্যক্তি জীবনের শূন্যতা, স্বপ্ন, প্রেম, ভালোবাসা এগুলো তো চিরকালীন। সেই চিরকালীন অনুভূতির কথাই লিখেছে হামিম এক অদ্ভুত মিস্টিক জগতে বসে। যে জগতে প্রেমিকার নিঃশ্বাস চুরি করে বাঁশি বাজায় প্রেমিক, যে জগতে রমনা পার্ক দিয়ে ট্রেন চলে অবলীলায়, বাসের ভেতরে শূন্যে মিলিয়ে যায় মানুষ, প্যারালাল জগতের ঘেরাটোপে কেবল চক্রে ঘুরতে থাকে কেউ কেউ।
মুক্তি মেলে না, নির্বান মেলে না। আমরা যে মুক্তির পেছনে ছুটি সেটা এক ধরনের ইল্যুশন, হামিম যেন সেটাই বলতে চাইল। লেখকের লেখায়, ভাষায়, কথায় আমি সেটা দিব্যচোখে দেখতে পেলাম। আমি এমন সব গল্প বারবার পড়তে চাইব।
হামিম কামালের 'এক সন্ধ্যায় শ্যামশ্রী রায়' পড়লাম। সদ্য মাহবুব ময়ূখ রিশাদের আরিমাতানো শেষ করার পর এই বইটা হাতে নিয়ে দেখি লেখক আগেরজনের বন্ধু! যাহোক, প্লট নির্বাচনে বন্ধুর সাথে মিল আছে বলতে হবে, দুইজনই লিখেছেন জাদুবাস্তবতা ব্যবহার করে।
ছোট একটা গল্পের বই। আটটা গল্প আছে এখানে। একেকটার বিষয়বস্তু একেক রকম হলেও মিল যে জায়গায় সেটা হলো প্রতিটা গল্পেই লেখক জাদুবাস্তবতা ব্যবহার করেছে��। এক বুড়োর বাস থেকে বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়া, রমনার ব্যস্ত সড়কে সাদা ট্রেনের চলাচল, বাঁশির মানুষের নিঃশ্বাস টেনে সুর তোলা, বনের জীবন্ত হয়ে ওঠা, মানুষের পাখি হয়ে যাওয়া, মৃত মানুষের পৃথিবীতে ফিরে আসা, বাসের জীবন পাওয়া বা এক অদ্ভুত বাড়িতে দুইটা মানুষের নিজেদের হারিয়ে ফেলা - কোনোটাই ঠিক বাস্তব নয়।
কিন্তু যেটা লেখকের কৃতিত্ব সেটা হলো কিন্তু এই অবাস্তবতাকে এমনভাবে বাস্তবতার সাথে মিশিয়ে দ্রবণ তৈরি করেছেন যে সেখান থেকে আর বাস্তব আর অবাস্তবকে আলাদা করা যায় না! ফলে অদ্ভুত এক পরিবারের গল্প করতে করতে লেখক যখন হঠাৎ করে সেখানে জাদু ঢুকিয়ে দেন তখন অবাক হতে হয় এটা ভেবে যে মানুষ এভাবে ভাবে কিভাবে! বা যখন স্বামীর অসুস্থতার খবর পেয়ে অস্থির স্ত্রী কাগজে কলম ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাসটাকে পঙ্খীরাজ ঘোড়া বানিয়ে ফেলে, তখন মনে হয় এমন যদি হতো! আর দুইজন পৃথক প্রেমিক যখন প্রেমে মজে প্রেমিকার জীবন নিয়ে খেলা শুরু করে তখন মনে হয়, প্রেম কতই না সর্বগ্রাসী!
দু-একটা গল্প গড়পড়তা মনে হলেও বাকি গল্পগুলো ভীষণ ভালো ছিল। পাওয়া-না পাওয়ার হাহাকার, বরই চুরি করা শৈশব, নিজের মুখোমুখি হওয়ার বিপদ লেখক তুলে এনেছেন সাবলীলভাবে।
সকালবেলায় দেখি- 'এক সন্ধ্যায় শ্যামশ্রী রায়' তার সঙ্গীদের সাথে নিয়ে আট হাজার মাইলের ভ্রমণ শেষে আমার বাড়ির দরজায় হাজির। হাতে ছিল হুয়ান রুলফোর পেদ্রো পারামো। সেটা রেখে 'এক সন্ধ্যায় শ্যামশ্রী রায়' হাতে তুলে নেওয়া। আর সেই সাথে মনে হওয়াঃ এ কেমন যোগাযোগ!
একেবারে চেনা জানা বাস্তবতাকে ছাপিয়ে যাওয়া গল্প পড়তে গেলে আমি বিহ্বল হয়ে পড়ি। ঠিক যেন বুঝে উঠতে পারি না কিভাবে সেটা উপভোগ করব। একারণে বাস্তবকে ভেঙ্গেচুরে ফেলা তেমন কোন গল্পে আমি ছাপোষা বেরসিকের মত রূপক খুঁজে ফিরি। কিংবা খুঁজে ফিরি নানান সমকালীন ঘটনার ইঙ্গিত। ধাঁধার মত লাগে। অবশেষে মনে হয়- এ হয়ত কবিতা কিংবা সঙ্গীতের মত বিষয়। হয়ত আবার পড়লে গল্পগুলো অন্য রূপে ধরা দেবে। এতেই আনন্দ।
ব্যক্তিগতভাবে আমার সবচে পছন্দের গল্প ছিল 'পাঁচকন্যা পরিবার'। কারণ শৈশবের স্মৃতি আর সেই স্মৃতির স্মৃতিতে যে বেদনা আর বিস্ময়ের উপাদান থাকে, এমনভাবে অনেকদিন কোন গল্পে পাইনি। এর পরে অবশ্যই 'এক সন্ধ্যায় শ্যামশ্রী রায়' এবং 'যানপ্রেতের বর'।
রেনে মার্গারিটের সুরিয়েল পেইন্টিং নিয়ে কমবেশি অনেকেই জানেন বা চিত্রকর্মগুলো দেখেছেন। এক সন্ধ্যায় শ্যামশ্রী রায় রায় পড়ার সময় মনে হচ্ছিলো মার্গারিটের পেইন্টিংগুলো যদি অক্ষরে রূপ দেয়া যেতো তাইলে হয়তো অনেকটায় এইরকম দাড়াতো। হামিম কামালের গল্প বলার ধরণ বেশ আমুদে, শীতের সকালের নরম রোদ গায়ে লাগলে যেরকম আরাম লাগে উনার গল্প পড়েও ঠিক তেমন লাগলো! মেদহীন লেখা, অহেতুক প্যাচগোজ নেই, সাবলীল বর্ণণা। রমনা, পাঁচকন্যা পরিবার, যানপ্রেতের বর এবং এক সন্ধ্যায় শ্যামশ্রী রায় এই গল্পগুলো বেশি ভালো লেগেছে! শ্যামশ্রী রায় গল্পটা তো পুরাই চমক!! লেখক সাহেবের সাথে দেখা হলে বলতাম, "আপনি শ্যামশ্রী রায় গল্পটা একেবারে শেষে দিয়ে মোটেও ঠিক করেন নি" :P জাদুকরের গোপন শিশি কাত করে মোহগ্রস্ত করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ হামিম কামাল। ৪.৫/৫
হামিম কামালের লেখাগুলো যেন কোন এক স্বপ্নের দেশের গল্প। যেখানে খাতায় আঁকা বুকি করে যানপ্রেতের বরে,দুই ঘন্টার রাস্তা আট মিনিটে পৌছানো যায়। শ্যামশ্রী রায় সুহানের সাথে সাক্ষাৎতে গিয়ে ঢুকে পড়ে কোন এক অদৃভুতুড়ে বাড়িতে। মা মরে হয়ে গিয়ে যান পাখি। পরে পাওয়া কাঁচের টুকরো নিয়ে যায় এক অদ্ভুত জগতে,যেখানে থাকেন আন্দালুসিয়া।
হামিম কামাল আমার ভীষণ প্রিয় লেখক। ভাষার কোমলতা কত যে হতে পারে,তা আমি দুইটা মানুষের লেখা পড়ে বুঝেছি, এক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় আর দুইয়ে হামিম কামাল। এই দুইজন লেখকের লেখার কিছু যদি নাও বুঝি,তাও পড়ে যেতে পারি শুধু মাত্র এনাদের ভাষার কারিগরি সৌন্দর্যের জন্য। এত মধুর একেক শব্দ,বাক্য। অপূর্ব।
ছোটগল্প সাধারণত আমি পড়িনা। কিন্তু হামিম কামালের "এক সন্ধ্যায় শ্যামশ্রী রায়" বইটা মনে দাগ রেখে গেল। বিশেষ করে "রমনা", " যানপ্রেতের বর", "সুরেলা" আর "এক সন্ধ্যায় শ্যামশ্রী রায়" এই গল্পগুলো প্রত্যাশা ছাপিয়ে গেছে। চমৎকার এই গল্পগ্রন্থের জন্য লেখককে সাধুবাদ।