সত্যজিতীয় ঘরানার কল্পবিজ্ঞান থেকে পুরাণ, প্যারাডক্স, ডিসটোপিয়া, ইউটোপিয়া সবকিছুই এই সংকলনের বিভিন্ন গল্পে এত সহজাতভাবে এসেছে যে সেগুলি মোটেও কষ্টকল্পিত লাগে না। সবথেকে বড় কথা, বিজ্ঞানের ছাত্র না হলেও পাঠকের কোনো গল্পের রস আস্বাদন করতে এতটুকু অসুবিসে হবে না। “কাকে কল্পবিজ্ঞান বলব, কাকেই বা বিজ্ঞান কল্পকাহিনি—" এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার ধারপাশ না মাড়িয়ে এই সংকলনে সবথেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে গল্পকে, সাহিত্যকে। হতে পারে কোনো গল্পের প্রেক্ষাপট ঐতিহাসিক, পৌরাণিক, বর্তমান বা ভবিষ্যৎ সমাজের সেই গল্পটি বলার ক্ষমতাই হল লেখকের আসল মুনশিয়ানার পরিচয়। গল্পের আধার হিসেবে বিজ্ঞান এলে আমরা তাকে "কল্পবিজ্ঞান" বলব, না বললেও কিছু ক্ষতিবৃদ্ধি নেই। . গল্প সূচিপত্র - দ্রোহ - ঋজু গাঙ্গুলী মন - ঐষিক মজুমদার রামধনু রং - সুদীপ দেব বসন্ত এসে গেছে - বিশ্বদীপ দে অভিশাপ খোঁজে ধর্ম - অর্ঘ্য দত্ত মেমোরি-লেন - সিদ্ধার্থ পাল যুগান্তর - প্রিয়াঙ্কা চ্যাটার্জী কুটিলপুরী - অর্ঘ্যজিৎ গুহ ভ্রূণ - শরণ্যা মুখোপাধ্যায় জেকব মিশন - শৌভিক চৌধুরী মদ্যপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক - পরাগ ভূঞা সৌপ্তিক - শ্রীজিৎ সরকার . সম্পাদনায় - সুদীপ দেব
মন - দারুণ ভাবে শুরু হয়েও, শেষে গিয়ে বুঝতে পারলাম না মানবিক চিন্তা শারীরিক রূপ কি করে নিল? এর চেয়ে বেশি বললে স্পয়লার হয়ে যাবে।
রামধনু রং - চিন্তাশীল ও বিজ্ঞানসমৃদ্ধ লেখা, কিন্তু চরিত্রগুলি বেশি ফোটানো হয়নি বলে মনে হয়েছে।
বসন্ত এসে গেছে - চমৎকার অনুবাদ, তবে কাহিনীটি বেশ জনপ্রিয়। আগে না পড়ে থাকলে, ভালোই লাগবে।
অভিশাপ খোঁজে ধর্ম - বিশাল বড় পটভুমির একটি লেখাকে সঙ্কুচিত ভাবে নভেলার রূপ দেওয়া হয়েছে। ফলত লেখক "Show: Don't tell" পন্থা অবলম্বন করেন নি। আরো ভাল হতে পারত। এত চরিত্র আসছে যাচ্ছে, একাত্ত হতে পারি নি। প্রায় প্রতিটি শব্দবন্ধ, পংতি গুরুত্ত্বপুর্ণ। কম্পিঊটার কোডে হয়ত তা মানায়, সাহিত্যে আরো একটু গল্পর শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়ার প্রয়োজন।
মেমোরি-লেন - গ্রাণ্ডফাডার প্যারাডক্স নিয়ে টানটান একটি লেখা। তৃপ্তি পেয়েছি পড়ে।
যুগান্তর - কাহিনীর মাঝামাঝি এসে পুরাণের রেফারেন্স পেয়েও শুধুমাত্র সাহিত্যগুনের জন্যে এই গল্পটি উৎরে গেছে, আমার জন্যে।
কুটিলপুরী - গল্পটি অযথা একটু বড় মনে হল। শুরুটা একদম মন্টো-র 'খোল-দো' কাহিনীর কথা মনে করিয়ে দেয়, পড়ে ওমাজ-ই হয়েছে মনে হয়েছে। বিজ্ঞান আর লোভের চিরাচিত অমোঘ সম্পর্কের কাহিনী।
ভ্রূণ - খুবই বুদ্ধিদীপ্ত লেখা। চরিত্রায়ণ, ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং থেকে শুরু করে ঝরঝরে ভাষা, টানটান প্লট - মেদহীন এই কাহিনীটি সব দিক দিয়ে হয়তো শ্রেষ্ঠ।
জেকব মিশন - শঙ্কু কাহিনীর ২-৩ টি গল্প কোলাজ করে বানানো হয়েছে মনে হল। এখানের প্রয়োগ করা ধারণাগুলি - যেমনি ক্লোনিং বা একগুচ্ছ বিজ্ঞানীদের একটি গোপন জায়গায় গিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটানো ইত্যাদিতে তেমন নতুন্ত্ব নেই। ভালো ওয়ান-টাইম রিড।
মদ্যপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক - একদম শেষে এসে মূল টুইস্ট পড়ে, মনে হল এই ছোটগল্পটি বিজ্ঞানের সাথে আপাত-সামাজিক ও ব্যাঙ্গাত্মক আণ্ডারটোনে মেজাজ হাল্কা করেছে।
দ্রোহ, সৌপ্তিক - শুরু এবং শেষ গল্প দুটিই দারুণ। কিন্ত, এত বেশি জারগন বা প্রতিভাষা ব্যবহৃত হয়েছে, যে তাতে গল্পের গতিতে বাঁধা পড়েছে, গদ্যর স্বাভবিক স্বাচ্ছন্দ খন্ডিত হয়েছে তাতে। তবে ধৈর্য ধরে শেষ করতে পারলে, আরেকবার শুরু থেকে পড়বেন হয়ত 'ইস্টার এগের' জন্যে।