দানাকিল ডিপ্রেশনে আগ্নেয়গিরির লাভালিপ্ত নিসর্গের বিবরণের সঙ্গে লেখক যুক্ত করেন স্থানীয় আফার সম্প্রদায়ের মানুষের দিনযাপনের খণ্ড কাহিনি। সমান্তরালভাবে উপস্থাপন করেন হরেক কিসিমের পর্যটকের চরিত্র। বিস্তারিত হয় শরণার্থীশিবির, মরুচারীদের গ্রাম বা বেসক্যাম্পের বিষয়-আশয়। পরিশেষে সক্রিয় আগ্নেয়গিরি-সংলগ্ন লাভাহ্রদের পাড়ে রাত্রিযাপনের ঘটনাও পাঠকদের আগ্রহী করে তোলে।
মঈনুস সুলতানের জন্ম ১৯৫৬ সালে, সিলেট জেলার ফুলবাড়ী গ্রামে। তাঁর পৈতৃক নিবাস মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ে পিএইচডি। খণ্ডকালীন অধ্যাপক ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস এবং স্কুল অব হিউম্যান সার্ভিসেসের। ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকার ভিজিটিং স্কলার। শিক্ষকতা, গবেষণা ও কনসালট্যান্সির কাজে বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন। তাঁর ‘জিম্বাবুয়ে : বোবা পাথর সালানিনি’ গ্রন্থটি প্রথম আলো বর্ষসেরা বই হিসেবে পুরস্কৃত হয়। ২০১৪ সালে ভ্রমণসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য পান বাংলা একাডেমি পুরস্কার। প্রাচীন মুদ্রা, সূচিশিল্প, পাণ্ডুলিপি, ফসিল ও পুরোনো মানচিত্র সংগ্রহের নেশা আছে মঈনুস সুলতানের।
"বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি। দেশে দেশে কত-না নগর রাজধানী— মানুষের কত কীর্তি, কত নদী গিরি সিন্ধু মরু, কত-না অজানা জীব, কত-না অপরিচিত তরু রয়ে গেল অগোচরে। বিশাল বিশ্বের আয়োজন; মন মোর জুড়ে থাকে অতি ক্ষুদ্র তারি এক কোণ। সেই ক্ষোভে পড়ি গ্রন্থ ভ্রমণবৃত্তান্ত আছে যাহে অক্ষয় উৎসাহে— যেথা পাই চিত্রময়ী বর্ণনার বাণী কুড়াইয়া আনি।"
রবীন্দ্রনাথের কবিতার এ-ই লাইনগুলো কবে পড়েছি ঠিক মনে নেই। তবে এখনো মাঝে মাঝে উঁকি দেয় লাইনগুলো। বৈচিত্র্যময় পৃথিবীর এক কোণে বসে থেকে কতটুকুই বা জানি! স্মার্টফোনের বদৌলতে হয়তো যাবতীয় খুঁটিনাটি জেনে নেওয়া সহজ কিন্তু উপলব্ধি করতে পারি খুব কমই। তাই ঘর ছেড়ে মানুষ বের হয় উপলব্ধি করতে। পৃথিবীর বুকে আরো একটু হেঁটে বেড়াতে। আর যেসব পর্যটক দিনশেষে ভ্রমণবৃত্তান্ত-ও লিখেন তারা পাঠকদের সুযোগ করে দেন কল্পনায় ভ্রমণসঙ্গী হওয়ার। ভ্রমণের স্বাদ পরিপূর্ণ পাওয়া না গেলেও একটু সুন্দর আবেশ পুরো বই জুড়ে ছড়িয়ে থাকে। কোন নির্দিষ্ট স্থান ভ্রমণ করলে সেই স্থানের মানুষের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, আচার-আচরণ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আমদানি ঘটে লেখকের লেখায়।
"ইথিওপিয়ার দানাকিল ডিপ্রেশনে" বইটিতে লেখক যে ভ্রমণবৃত্তান্ত বর্ণনা করেছেন তার অবস্থান ইথিওপিয়ায়। দানাকিল ডিপ্রেশন নামক স্থানে মূলত আফার সম্প্রদায়ের বাস। যারা নিজ দেশেই বাস্তুচ্যুত, আবার অনেকে পাশের দেশ ইরিত্রিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত। লেখক প্রথমদিকে এইরকম দুইটি শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেছেন। প্রথমটি ছিলো যারা নিজ দেশে নিজেরাই শরনার্থীদের মতো। লেখকর লেখার কিছু অংশ, "কারণ, এ ক্যাম্পের আফাররা আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করে অন্য দেশে গিয়ে পৌছায়নি, সুতরাং টেকনিক্যালি তাদের রিফিউজি স্ট্যাটাস নেই, স্বদেশে ভিটেবাড়ি থেকে উৎখাত হওয়া মানুষদের বলা হয়ে থাকে ‘আইডিপি' বা ‘ইন্টারন্যালি ডিসপ্লেসড পিপল'। তাদের সংজ্ঞানুযায়ী এরা উল্লেখযোগ্য রকমের রিলিফসামগ্রীর দাবিদার হতে পারে না।" এরপরে লেখক ইরিত্রিয়া থেকে উৎখাত হওয়া মানুষদের আবাস ভ্রমণ করেন। পরেরদিন রক হান্টিং এবং সবর্শেষে আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত লাভা প্রান্তরের পাশে ক্যাম্পিং। সবশেষে চমৎকার একটি ভ্রমণ কাহিনি।