মহাভারতের সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং চরিত্র কে? এই প্রশ্নটা উত্তর করলে অনেকরকম উত্তর পাওয়া যায়। কেউ বলেন কর্ণ, কেউ বা শকুনির নাম নেন, যুধিষ্ঠির থেকে দুর্যোধন, অশ্বত্থামা থেকে একলব্য, কুন্তী থেকে দ্রৌপদী— এমন বহু নাম উঠে আসে সেইসব আলোচনায়। কৃষ্ণ এই মহাকাব্যে ধুরন্ধর ট্যাকটিশিয়ান। কিন্তু ধর্মীয় অনুষঙ্গ, অবতারতত্ত্ব ইত্যাদি নানা কারণে তাঁর রক্ত-মাংসের চেহারা ও সেটির কার্যকলাপ অনেকটাই চাপা পড়ে যায়। "সর্বশক্তিমান" হিসেবেই তিনি জ্ঞাত হন। অর্জুনও বাদ পড়ে যান, কারণ তাঁর আচরণে কোনো রহস্য পাওয়া যায় না। "অপরাজেয়" বীর, যিনি জীবনের নানা পর্যায়ে কারও না কারও আদেশ পালন করেছেন— এইভাবেই তাঁকে আমরা চিনি। আদতে দুটো ধারণাই প্রায় সঠিক... এবং ভুল। মহাভারত কোনো মনোলিথিক বা একশিলা কীর্তি নয় যে সেটির মাত্র একরকম বর্ণনা হয়। হাজার-হাজার বছর ধরে, কোটি-কোটি মানুষের মুখে, মনে, লেখায় এই মহাকাব্যের যে-সব রূপ তৈরি হয়েছে, তাতে এই দু'টি চরিত্রেই দেখা গেছে নানা শেড। তাঁদের 'অপরাজেয়' তকমাটি ভেঙে দিয়েছেন নানা কবি ও রচয়িতা। এই বই তেমনই বেশ কিছু আখ্যানের সমাহার। "ঢাল" নামে একটি অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক ভূমিকা-র পর এতে যে অধ্যায়গুলো এসেছে তারা হল~ ১) ধর্ষক অর্জুন আর তাঁর অজানা স্ত্রী; ২) ভানুমতী হরণ এবং নিকুম্ভ বধ; ৩) কামকটঙ্কটা বনাম শ্রীকৃষ্ণ; ৪) পাগল প্রেমিক অর্জুন এবং তাঁর মৃত্যু; ৫) সহদেব বনাম শ্রীকৃষ্ণ; ৬) ভাগ্যের জোরে কৃষ্ণ-অর্জুনের রক্ষা; ৭) অর্জুন বনাম নাগ-দল; ৮) দানবদের খপ্পরে শ্রীকৃষ্ণ; ৯) বিষ্ণু, কৃষ্ণ এবং জিষ্ণু; ১০) হনুমান বনাম অর্জুন: অর্জুনের দর্পচূর্ণ; ১১) শল্য বনাম ধনঞ্জয়; ১২) জৈন মহাভারত থেকে কয়েকটা গল্প; ১৩) সুধন্বা আর সুরথের গল্প; ১৪) তাম্রধ্বজের কাহিনি; ১৫) কৃষ্ণ, অর্জুন এবং হনুমান বনাম বীরবর্মা; ১৬) কৃষ্ণ-অর্জুনের যুদ্ধ এবং কৃষ্ণের পুত্র বনাম অর্জুনের পুত্র। এরপর "যা যা পড়েছি" অংশে লেখক আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন এক বিপুল পাঠ-নির্দেশিকা, যার সাহায্যে আমরাও তাঁর মতো করে মহাভারতের 'নেশা' করতে পারি। বইটি লা-জবাব। এতে অত্যন্ত সহজ ভাষা ও ভঙ্গিতে নানা আঞ্চলিক মহাভারতের বহু গল্প বলা হয়েছে— যেগুলো এমনিতে আমাদের পক্ষে জানাও কঠিন ছিল। সেই গল্পগুলো পড়লে শুধু যে কৃষ্ণ ও অর্জুনের সম্বন্ধে আমাদের ওই একরঙা ধারণাগুলো বদলায়, তাই নয়। একইসঙ্গে আমরা বুঝতে পারি, আলাদা-আলাদা সমাজ এই 'বীর'-দের কী চোখে দেখেছে এবং দেখাতে চেয়েছে। এমন চমৎকার বইটি হালকা অলংকরণ ও শুদ্ধ বানানে দিব্যি সুন্দর হয়ে উঠেছে। তবে পৃষ্ঠা ৯০-৯১-এ ভূমিকার অংশবিশেষ বোধহয় ভুল করেই আবার ছাপা হয়ে গেছে। আর বেশ ক'টি অধ্যায়ে জৈমিনি ভারতের আখ্যানগুলো বর্ণনা করার সময় যুদ্ধের বর্ণনা পড়তে-পড়তে 'লক্ষ্মণের শক্তিশেল'-এ দূতের মুখে যুদ্ধের বর্ণনার কথা মনে পড়ছিল। ওই রেকারিং ডেসিমেলগুলো কি কিঞ্চিৎ ছাঁটা যেত না? যাইহোক, আবারও বলি, বইটি লা-জবাব। মহাভারতের প্রতি কিছুমাত্র আগ্রহ থাকলে এই বইটি অবশ্যপাঠ্য বলেই আমি মনে করি।
প্রশ্ন হতে পারে মহাভারতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের নিয়ন্ত্রা ও শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর কৃষ্ণ-অর্জুন কি ব্যক্তিগত জীবনে কখনো হেরেছিলেন ? উত্তর - অসংখ্যবার। তাঁরা উভয়ই বহুবার মহাবলশালী বীরদের কাছে কখনো শক্তিতে , কখনো বুদ্ধিতে হেরে গেছিলেন।এমনও হয়েছে কৃষ্ণ-অর্জুন নিজেরাও নিজেদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছিলেন। এই বইতে লেখক সেইসব "হার" ১৬ টি ভিন্ন ভিন্ন শিরোনামে লিপিবদ্ধ করছেন।লেখার উৎস বিভিন্ন আঞ্চলিক মহাভারত,পুরাণ ,হরিবংশ এবং অন্যান্য লেখাজোকা। ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে কৃষ্ণ-অর্জুনকে দেখার জন্য এই বইটি প্রশংসা পেতে পারে।
কৃষ্ণ অর্জুন কি ফ্রয়েডের কাছেও হেরেছিলেন? লেখক অন্বয় গুপ্তর লেখা ‘কৃষ্ণ-অর্জুন যাঁদের কাছে হেরেছিলেন’ এক অন্য মহাভারতের গল্প বলে। হালের ভাষায় বলতে গেলে, বিভিন্ন আঞ্চলিক মহাভারতের গল্পকথার একটা গোছানো ফিল্টার কপি হচ্ছে এই বই। এখন কথাটা হলো ফ্রয়েড এই মহাভারতে কোত্থেকে এলেন?যারা সাইকোলজি পড়ে এবং পড়েনা তারা সবাই সাইকোলজি বললেই সাধারণত ফ্রয়েডের নাম জানেন। তা এই ফ্রয়েড দাদু (আজ্ঞে পেশাগত সূত্রে আমি ফ্রয়েডের বংশধর তাই দাদু বলি)এহেন মহাভারতের গল্পে রেখাপাত করলেন কি করে?একটা বই পড়লে নানান পাঠকের নানান মতামত তৈরি হয়। আমার মনে হয়েছে বইয়ের কিছু কিছু ঘটনার সঙ্গে ফ্রয়েডের কিছু থিয়োরির সাযুজ্য থাকলেও থাকতে পারে। ঠিকভুলের বিচার না করে আপাতত প্রসঙ্গগুলো তুলে ধরি। লেখক অন্বয় গুপ্তর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে সাইকোলজির প্রতি। তাই লেখকের আগ্রহকে গ্রাহ্য করে ওঁর সৃষ্টির প্রতি ফ্রয়েডের দৃষ্টিপাত করার ধৃষ্টতা করছি। বইতে মোট ষোলোখানা গল্পের মাধ্যমে নিজের ষোলোআনা অধ্যাবসায়ের ছাপ রেখেছেন লেখক। এর মধ্যে মোটে চারটে গল্প নিয়ে ফ্রয়েডিয় তত্ত্বমূলক আলোচনা করছি। চারটে গল্পেই নারী চরিত্র লক্ষ্যণীয়ভাবে বর্তমান। আসলে মহাভারতের নারীচরিত্র বেজায় রঙিন তাই বুঝতে গেলে অবস্থা হয় সঙ্গীন। এই যেমন, প্রথম গল্প ‘ধর্ষক অর্জুন আর তাঁর অজানা স্ত্রী’ অলির কথায় আসি। অলি এখানে যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী টমবয় চরিত্র। এদিকে ফ্রয়েড দাদু বলেছেন, ছোট্টোবেলায় ওই তিন থেকে ছয় বছর বয়সে মেয়ে যদি মায়ের পরিবর্তে বাবার গুনাগুণ রপ্ত করতে শুরু করে তাহলে পরবর্তীতে তার মধ্যে টমবয়ের মত হাবভাব দেখা যেতে পারে। অলির জন্মবৃত্তান্ত খুঁজলে সেখানে আমরা মাতৃচরিত্রের দেখা পাই না। কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম যাবে কোথায়? যতই দায়িত্বশীল বীর হোন এবং রাজ্যভার সামলাতে থাকুন, যৌনতার মত স্বাভাবিক বিষয়কে এড়াতে পারেন না অলি। এখানে ফ্রয়েড দাদু বলে রেখেছেন, আপাতদৃষ্টিতে ভেবেচিন্তে যা কিছু আমরা এড়িয়ে চলি তা সবই রেজিস্টার হতে থাকে থাকে অবচেতনে আর এই অবচেতন এসে যাদু দেখায় স্বপ্নে। স্বপ্নে দেখা ঘটনারও প্রতীকী বিশ্লেষণ করে গেছেন ফ্রয়েড। বলেছেন, স্বপ্নে সাপ দেখা মানে হলো যৌনতার প্রতীক। এবার অর্জুন আর অলির গল্পে ফিরি। কৃষ্ণর মায়াশক্তিতে অর্জুন বিরাট, অসম্ভব সুন্দর একটা সাপে পরিণত হয়ে ঘুমন্ত অলিকে ভোগ করে তার কামনা চরিতার্থ করে। মুদ্রার ওপিঠে যদি দেখি, ঘুমন্ত অলি তার স্বপ্নে অবদমিত যৌনচাহিদারই সর্পরূপ দেখেছিলেন? ‘পাগল প্রেমিক অর্জুন এবং তাঁর মৃত্যু’ গল্পে আমরা দেখি, শ্রে���্ঠ ধনুর্ধর অর্জুন যুক্তিবুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে পাল্গুনাডির স্ত্রী আয়ঙ্গরেনির পেছনে ধাওয়া করেন। ছোটোবেলায় শুনেছি যার ভাবনাচিন্তায় কোনো আগল নেই সেই পাগল। এক্ষেত্রে প্রেমিক অর্জুন যথেষ্ট পাগলামিই করেছেন পরস্ত্রী লাভের জন্য। দেবী আয়ঙ্গরেনিকে পাওয়ার জন্য অর্জুন নায়কোচিত স্বভাব ছেড়ে নিয়ম-কানুন লঙ্ঘন করে যাচ্ছেতাই কান্ড করেন। এমনকি পাল্গুনাডিকে ছলের আশ্রয় নিয়ে হত্যা পর্যন্ত করেন। এবার আসরে ফ্রয়েডকে আনলে দেখা যায়, উনি মানুষের মনের ইদ প্রবৃত্তির উল্লেখ করেছেন। ইদের বশবর্তী হলে মানুষের যুক্তিবোধ, জ্ঞানবুদ্ধি সব লোপ পায়। থাকার মধ্যে থাকে কেবল অযৌক্তিক ইচ্ছেপূরণের জেদ। তা অর্জুনের এহেন চরিত্র ইদের তাড়না ছাড়া আর কি? ‘অর্জুন বনাম নাগ-দল’ গল্পে আবার দেখা মেলে নাগরাজ বাসুকির।তিনি এখানে ঘোরতর গব্বর সিং মানে ভিলেন। নিজের গোঁফের একটা চুল ছিঁড়ে তা দিয়ে অর্জুনকে বেঁধে ওঁর সামনেই দ্রৌপদীকে ভোগ করতেন রোজ। এই কাহিনিটুকুর ওপর যদি ফ্রয়েডের থিয়োরির আলো ফেলি তাহলে দেখব, প্রিয়তম স্বামী অর্জুনের প্রতি দ্রৌপদীর ভালোবাসা এবং অভিমান দুইই ছিল তীব্র। অর্জুনের প্রতি অবচেতন মনে তাঁর যাবতীয় যৌনাকাঙ্ক্ষা রূপ নিল সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসির (নাগরাজ বাসুকি এখানে আদপে সাপ)আর দ্রৌপদীর অভিমান রূপ নিল প্রতিশোধস্পৃহায় যে কারনে অর্জুন বাসুকির গোঁফের চুলে বন্দী! বইয়ের শেষ গল্প ‘কৃষ্ণ-অর্জুনের যুদ্ধ এবং কৃষ্ণর পুত্র বনাম অর্জুনের পুত্র’ এ কৃষ্ণপুত্র প্রদ্যুম্নকে কামনা করেন তার পালকমাতা মায়াবতী। মায়াবতীকে গ্রহণ করে বৈষ্ণবাস্ত্র প্রয়োগ করে পালকপিতা শম্বরকে বধ করেন প্রদ্যুম্ন। এদিকে ফ্রয়েড তাঁর বিখ্যাত থিয়োরি ‘ওডিপাস কমপ্লেক্স’ এ বলেছেন, নির্দিষ্ট বয়সের পর পুত্র তার বিপরীত লিঙ্গের মানুষদের মধ্যে প্রথম আকর্ষণ বোধ করে তার মায়ের প্রতি। এবং এই আকর্ষণ বোধ থেকে মাকে কেন্দ্র করে বাবাকে সে ভেবে বসে নিজের প্রতিযোগী। এবার প্রদ্যুম্নর গল্পে ফিরি। মাতা মায়াবতীকে কেন্দ্র করে পিতা শম্বরকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে যুদ্ধ করা এবং যুদ্ধে জয়ী হয়ে মায়াবতীকে নিজের স্ত্রীরূপে গ্রহণ করা, যদি বলি ফ্রয়েডের ‘ওডিপাস কমপ্লেক্স’ এর আরেকটা উদাহরণ?
কৃষ্ণ-অর্জুন যাদের কাছে হেরেছিলেন ◆অন্বয় গুপ্ত ◆প্রচ্ছদ ও অলংকরন কৃষ্ণেন্দু মন্ডল ◆২২৫ টাকা ◆দ্বিতীয় সংস্করণ ◆খসড়া রামায়ন মহাভারত অধিকাংশ পাঠকের মতো আমারও পড়তে ভালো লাগে।গভীরভাবে না জানা থাকলেও মূল কাহিনি সম্পর্কে আমি পরিচিত। ফেসবুকে যখন এই বই সম্পর্কে পোস্ট দেখলাম তখনই বইটি পড়বার আগ্ৰহ তৈরী হয়েছিল। বিষয়বস্তু পুরাণ হিসেবে পরিচিত হলেও নিঃসন্দেহে অভিনব। মহাভারত বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন ভাষায় দেশে এমনকি দেশের বাইরে রচিত হয়েছে। আর তাতে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন গল্প বা কাহিনি ও সেই সময়ের লোকসংস্কৃতি। লেখক মূল মহাকাব্য ও সেই সমস্ত ভার্সন থেকে বিভিন্ন ঘটনা ও কাহিনি গল্পের মতো করে ছোটোছোটো অধ্যায়ে এই বইতে পরিবেশন করেছেন।বই এর নামের সঙ্গে সামাঞ্জস্য রেখেই কৃষ্ণ ও অর্জুন কাদের কাছে হেরেছিলেন বা কাদের পরাজিত করতে রীতিমতো বেগ পেতে হয়েছিল সেই সমস্ত অজানা গল্প নিয়ে এই সংকলন। যে যে গল্প বা কাহিনি এই বইতে রয়েছে ●ধর্ষক অর্জুন আর তাঁর অজানা স্ত্রী ●ভানুমতী হরণ এবং নিকুম্ভ বধ ●কামকটঙ্কটা বনাম শ্রীকৃষ্ণ ●পাগল প্রেমিক অর্জুন এবং তাঁর মৃত্যু ●সহদেব বনাম শ্রীকৃষ্ণ ●ভাগ্যের জোরে কৃষ্ণ -অর্জুনের রক্ষা ●অর্জুন বনাম নাগদল ●দানবদের খপ্পরে শ্রীকৃষ্ণ ●বিষ্ণু ,কৃষ্ণ এবং জিষ্ণু ●হনুমান বনাম অর্জুন ●শল্য বনাম ধনঞ্জয় ●জৈন মহাভারত থেকে কয়েকটা গল্প ●সুধন্বা ও সুরথের কাহিনি ●তাম্রধ্বজের কাহিনি ●কৃষ্ণ ,অর্জুন এবং হনুমান বনাম বীরবর্মা ●কৃষ্ণ-অর্জুনের যুদ্ধ এবং কৃষ্ণের পুত্র বনাম অর্জুনের পুত্র
একদম সহজ সরল ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে প্রতিটি বিষয়। বই এর শুরুতে লেখক রামায়ন মহাভারত নিয়ে একটি আলোচনা করেছেন যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মনোগ্ৰাহী বলেই আমার মনে হয়েছে।মূল মহাকাব্য, তার আঞ্চলিক ভার্সন ,রাজনৈতিক দৃষ্টিকোন ,পৌরাণিক সাহিত্যের সঙ্গে পুরাণের পার্থক্য এবং সহজভাবে মহাভারত পড়া শুরু করতে হলে কিভাবে কোন বই দিয়ে শুরু করা যাবে ইত্যাদি নানা বিষয়ে খুব সুন্দর ও যুক্তি দিয়ে লেখক ব্যাখা করেছেন। কিভাবে মহাভারতের আঞ্চলিক ভার্সন ও এমনকি এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মহাভারত থেকে খুঁজে বের করেছেন এই সমস্ত গল্প।এর থেকেই বুঝলাম যে কতটা সময় দিয়েছেন ও পরিশ্রম করেছেন এই বইটির জন্যে। এতোটাই সাবলীল লেখনী যে কখনোই একঘেয়ে মনে হয়নি। প্রত্যেকটি গল্পের রেফারেন্স কোন অঞ্চলের বা দেশের ভার্সন থেকে নেওয়া হয়েছে তাও বলা হয়েছে। জানলাম অনেক অজানা বীর যোদ্ধাদের সম্পর্কে যারা প্রবল পরাক্রমশালী ছিলেন।প্রচ্ছদ ও অলংকরন এই সংকলনের সম্পদ । প্রচ্ছদে আঁকা কৃষ্ণ ও অর্জুনের ছবি( বিশেষ করে চোখ, ধনুক ,সুদর্শন চক্র) ,রংএর ব্যবহার আকর্ষণীয় লেগেছে। অলংকরন খুবই সুন্দর তবে ছবিগুলির ফ্রন্ট সাইজ আরো একটু বড় হলে ভালো লাগতো ।সবমিলিয়ে মহাভারতের অজানা ঘটনা নিয়ে লেখা এই সংকলনের প্রত্যেকটি কাহিনি ও উপস্থাপনা আমার খুবই ভালো লেগেছে। লেখক ,প্রচ্ছদ শিল্পী সহ এই বই এর সঙ্গে যুক্ত সকলকে ধন্যবাদ জানাই এতো সুন্দর একটি সংকলন প্রকাশের জন্যে। লেখক ও প্রকাশককে রামায়ন ,মহাভারতের অজানা গল্পের এরকম আরও সংকলন প্রকাশের অনুরোধ করবো।যারা পুরাণের বিভিন্ন কাহিনি পড়তে ভালবাসেন তারা এই বইটি পড়তে পারেন ।আমার বিশ্বাস ভালো লাগবে।
মহাভারতের সবচেয়ে বিস্ময়কর চরিত্র কে—এই প্রশ্নটি নিয়ে ভাবতে বসলেই স্মৃতির পর্দায় একে একে জেগে ওঠে নানা মুখ, নানা ভাগ্যগাথা। কর্ণের বেদনা জ্বলে ওঠে সূর্যরথের মতো, শকুনির হাসি ঝরে পড়ে চতুরতার বিষবীজে। দুর্যোধনের অহংকার গর্জে ওঠে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো, দ্রৌপদীর অপমান প্রতিধ্বনিত হয় অন্তহীন এক ব্যথায়, কুন্তীর নীরবতা কথা বলে অব্যক্ত ভাষায়, আর একলব্যের ত্যাগ জ্বলে ওঠে গগনের নক্ষত্রের মতো। এরা প্রত্যেকেই একেকটি আগুন, একেকটি কণ্ঠ, যা মিলেমিশে সৃষ্টি করেছে এই মহাকাব্যের অনন্ত মহিমা।
তবু কৃষ্ণ ও অর্জুনের মতো দুই চরিত্রের আলোয় অন্য সবকিছু যেন ম্লান হয়ে আসে। কৃষ্ণ—যিনি রাজনীতি জানেন, অথচ ধর্মের আলোয় আবৃত থেকে তাঁর মানবিক রূপটি অনেকখানি আড়াল হয়ে যায়। আর অর্জুন—যিনি যোদ্ধা, কর্তব্যপরায়ণ, যাঁর জীবনজুড়ে আজ্ঞা ও আনুগত্যের স্রোত বয়ে চলে। তাঁকে আমরা চিনি বীর হিসেবে, কিন্তু মানুষ হিসেবে কতটা জানি?
এই বই সেই অচেনা দরজাটিই খুলে দেয়। মহাভারতের বহুরূপী স্রোতের ভেতর ডুব দিয়ে লেখক তুলে আনেন কিছু গল্প, কিছু উপাখ্যান—যেখানে দেবত্ব ভেঙে পড়ে মানবিকতার ভিতর, আর বীরত্ব মিশে যায় দুর্বলতার মৃদু ছায়ায়।
ধর্ষক অর্জুনের অজানা স্ত্রী, ভানুমতীর হরণ, সহদেবের সঙ্গে কৃষ্ণের সংঘাত, অর্জুনের অহংভঙ্গ—এইসব কাহিনিগুলো যেন পুরনো মহাভারতের গায়ে নতুন রঙের ছোঁয়া দেয়। এগুলো আমাদের পরিচ���ত বীরদের মুখোশ খুলে তাঁদের অন্তরের মানুষটিকে দেখতে সাহায্য করে।
বইটির ভাষা মসৃণ, অথচ গদ্যের ভেতর লুকিয়ে আছে কবিতার ছোঁয়া। লেখক আঞ্চলিক মহাভারতের অজস্র উপাখ্যানকে এক সুরে বেঁধেছেন, ফলে এই পাঠ শুধু জ্ঞানের নয়, অভিজ্ঞতারও। বইটি শেষ করে মনে হয়—মহাভারত কেবল অতীতের গল্প নয়, এ এক অবিরাম অনুরণন, যেখানে মানুষ, দেবতা আর নিয়তি একে অপরের মধ্যে বিলীন। যাঁরা মহাভারতের বিস্ময়কে অনুভব করতে চান, তাঁদের জন্য এই বই এক অপরিহার্য সঙ্গী। অবশ্যই পড়ুন। নমস্কার!
রামায়ণ - মহাভারত জানে না এমন মানুষ হয়তো নেই। হয়তো বই সবার পড়া নেই তবে কাহিনী সবার জানা। আর সেই মহাভারতে কৃষ্ণ অর্জুনের বীরত্বের কথাও আমাদের সবারই জানা। একজন হলেন স্বয়ং বিষ্ণুর অবতার আর একজন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর, যাদের পরাস্ত করা কখনও সম্ভব নয়। কিন্তু যদি বলি যে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ এবং অর্জুন কেও হারতে হয়েছিল, তাও একবার নয় কয়েকবার, বিশ্বাস হবে কথাটা? হ্যাঁ কৃষ্ণ, অর্জুন-কেও হারতে হয়েছিল বা অন্যদের পরাজিত করতে বেগ পেতে হয়েছিল। তবে এই কাহিনীগুলো মূল মহাভারতে পাওয়া যায় না। এখানেই উঠে আসে আঞ্চলিক মহাভারতের কথা।
মূল মহাভারত ছাড়াও তার পাশাপাশি গোটা এশিয়াতে কয়েকশো মহাভারত আছে। মূল মহাকাব্যের কাহিনী অবলম্বনে বিভিন্ন জনজাতি, বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষজন নিজেদের মতো করে মহাভারত লিখেছেন। যেমন আমাদের বাংলায় শঙ্কর কবিচন্দ্র, কাশীরাম দাসের মহাভারত আছে, তেমনি তামিল, তেলেগু, অহমিয়া, ওড়িয়া ভাষাতেও অজস্র মহাভারত আছে।
আসলে মূল মহাকাব্যের কবিরা অজস্র গোপন দরজা দেখিয়ে দিয়ে মুচকি হেসেছেন। হাজার রকম দৃষ্টিকোণ দিয়ে ভাবার জায়গা রেখেছেন। সেই কৌতূহল পূরণ করেছেন আঞ্চলিক কবিরা। একলব্যের প্রতি দ্রোণাচার্যের অনাচারে যখন আমরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠি, ঠিক তখনই ইন্দোনেশিয়ান মহাভারতে দেখা যায় একলব্যের অতৃপ্ত আত্মা ধৃষ্টদ্যুম্ন হয়ে জন্মাচ্ছে।
এই বইটিতে মোট ১৬ টি গল্প আছে।
একদম সহজ সরল ভাষায় প্রত্যেকটি কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে, যা পড়তে কখনও একঘেয়ে লাগে নি। জানলাম অনেক অজানা বীরদের কথা, যারা ছিলেন প্রবল পরাক্রমশালী। লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ এরকম এটি বই আমাদের উপহার দেওয়ার জন্য। কারণ এই বই না পড়লে আঞ্চলিক মহাভারতের এই কাহিনীগুলো হয়তো অজানাই থেকে যেতো।
সব শেষে, যারা মহাভারত সম্পর্কে আরও জানতে চান, তারা এই বইটি পড়ে দেখুন। আশা করি ভালো লাগবে।