আচ্ছা, অলৌকিক বা অতিলৌকিক কিছু কি সত্যি হয়, বা আছে? এই প্রশ্নটার উত্তরে শুধুমাত্র 'হ্যাঁ' বা 'না' বলে প্রশ্নকর্তাকে সন্তুষ্ট করা অসম্ভব। কারণ অধিকাংশ সত্যের মতো এই জায়গাটাও নিছক সাদা বা কালো না হয়ে ধূসর হয়ে থাকে আমাদের কাছে। সেজন্যই, যখন কোনো সংকলনের ট্যাগলাইন স্পষ্টভাবেই বলে দেয় যে তার মধ্যে আছে "বাস্তব-পরাবাস্তব আর আলো-আঁধারি গল্পেরা" তখন কৌতূহলী হতেই হয়। আলোচ্য সংকলনটি মূলত সেই কারণেই আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। হাঁড় কাপিয়ে দেওয়া বা রক্ত জমিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি না দিয়ে এখানে রচয়িতারা এই ট্যাগের মাধ্যমে বলেই দিয়েছেন, এই অরণ্যে তাঁরাও আমাদেরই মতো করে পথ খুঁজছেন। পাওয়া গেল কি পথের সন্ধান? মোট তিনজন লেখকের সাতটি করে ছোট্ট লেখার সংকলন এই বইটি। এদের গল্প বলতে একটু অসুবিধে হচ্ছে, কারণ লেখাগুলোর মধ্যে একটা সত্যের ভাব আছে, যা আমাকে অস্বস্তিতে রেখেছে। তাও লেখাগুলোর নাম লিখি একে-একে~ (ক) সুকন্যা দত্ত লিখেছেন~ ১. ভক্তের আকুতি; ২. নীল প্রহর; ৩. ফুটি মসজিদ; ৪. মৃত্যুদণ্ড; ৫. সেই রাতে; ৬. সত্তা; ৭. তারামতির নাচমহল। এই লেখাগুলো পড়তে গিয়ে আমি বাকরুদ্ধ হয়েছি লেখকের ভাষার মাধুর্যে, গভীর ইতিহাস-চেতনায় এবং প্রজ্ঞায়। তাঁর গদ্য সহজ ও স্বচ্ছন্দ। অথচ লেখা লঘু নয়; তাতে আছে ভারতের নানা প্রান্তের মানুষের জীবনচর্যা আর বিশ্বাসের গন্ধমাখা গাম্ভীর্য। আমি আগে কখনও এঁর লেখা পড়িনি। তবে এর পর থেকে আমি যথাসম্ভব চেষ্টা করব এঁর লেখা অনুসরণ করব; করবই। (খ) দেবলীনা রায়চৌধুরী ব্যানার্জী লিখেছেন~ ১) বেলভেডেয়ার হাউস; ২) দেবাংশী; ৩) দেবপুত্র; ৪) যোগাদ্যার রাত; ৫) মৃত্যু ডাক উজাগর; ৬) সেই সুর; ৭) ভয়পাহাড়। দেবলীনা'র লেখা আমি আগেও পড়েছি। বিভিন্ন সভ্যতা ও সংস্কৃতির মিথের তুলনা করে তার মধ্যে নিহিত ইতিহাস অনুসন্ধান তিনি করে চলেছেন নানাভাবে। কিন্তু এই গল্পগুলো আমাকে মুগ্ধ করল তাদের সহানুভূতি ও লালিত্যে। শুষ্ক জ্ঞান নয়, বরং নানা সময় ও সমাজের মানুষের চোখ দিয়ে দেখা জীবন্ত ও নিত্য-প্রবাহিত জীবনের নানা দিক তিনি তুলে ধরেছেন এতে। তারই মধ্যে ফুটে উঠেছে স্নেহ, প্রেম, ভয়, মৃত্যু! সব মিলিয়ে এই লেখাগুলোও পড়লে মনে হয়, নিছক ভয় বা অলৌকিকের পরিসর ছাড়িয়ে যেন কখন ঢুকে পড়েছি এক অন্য পৃথিবীতে— যেখানে রণ, রক্ত, সফলতা থাকলেও সত্যিটা... একটু অন্যরকম। (গ) বর্ণালী রায় লিখেছেন~ ১. আরূঢ়; ২. চিরঞ্জীবী; ৩. জোয়ার-ভাঁটা; ৪. পঞ্চমুণ্ডির আসন; ৫. বিশ্বাসঘাতক; ৬. সিংগিং বাওল; ৭. সিদ্ধাই বাবা। আমার এই রিভিউ একটা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করেছিলাম। এই সাতটি লেখা আলাদা কাঠামো, আলাদা চরিত্র, সম্পূর্ণ আলাদা পটভূমির মধ্য দিয়েও আসলে ওই প্রশ্নটাই খুঁজতে চেয়েছে। ঘোর অবিশ্বাসীর দৃষ্টিকোণ নিয়ে শুরু হওয়া কঠোর অনুসন্ধান কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে বিপরীতমুখী হয়ে উঠতে পারে— সেটাই দেখিয়েছেন লেখক। ভাষা এখানেও অত্যন্ত সহজ ও স্বাদু। উপস্থাপন এখানেও দ্রুতলয়ে বাঁধা। মনে হয় যেন আমরাও বালি আর পাথরের ওপর দিয়ে অত্যন্ত দ্রুত হেঁটে চলেছি তাঁরই সঙ্গে কোনো এক 'অন্যরকম' গন্তব্যের উদ্দেশে। বইটির ছাপা ও লে-আউট চমৎকার। বানান শুদ্ধ। প্রচ্ছদটি ভারি মায়াবী। ভেতরে একটি মিনিমালিস্ট মোটিফকেই প্রতিটি গল্পের হেডপিস্ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তিনজন রচয়িতার জন্য তিনটি হেডপিস্ ব্যবহার করা হত, তাহলে আরও ভালো লাগত। সব মিলিয়ে, একটি সত্যিকারের মনে রাখার মতো বই পড়লাম। যদি এই আলো-আঁধারে আপনিও দু'দণ্ড বসতে চান, তাহলে এই বইটি পড়ে দেখতে পারেন। আমার ধারণা, হতাশ হবেন না। অলমিতি।