চেঙ্গিস ঝড় ওঠার আগে পূর্বাভাস শুরু হয়ে গিয়েছিল পারস্যের এক অখ্যাত গ্রাম পুষানে। সেখানকার এক কাপড়ের ব্যবসায়ী মুন্তাজিবের পরিবারে এমন কিছু ঘটল যা বাধ্য করল তিয়েনশান পাহাড়ে তাঁবু গেড়ে বসে থাকা মোঙ্গলদের তারিম উপত্যকা পার করতে।
এদিকে হিন্দুস্থানের চার যুবা কিশোর বসরা যাওয়ার পরিকল্পনায় মশগুল। তাদের প্রত্যেকের উদ্দেশ্য আলাদা এবং তারা একে অপরের উদ্দেশ্য জানে না।
দিল্লির তখতে তখন ইলতুতমিস। তাঁর মেয়ে রাজিয়ার চরিত্র নিয়ে কানাঘুষো চলছে। আর সুদূর বাংলায় ঘটতে চলেছে প্রথম জহরব্রত, পদ্মিনীর জহরব্রতর একশো বছর আগে, কিন্তু কেন?
সমরকন্দ, বোখারা, মার্ভ, নিশাপুর, হীরাট সবকটা রেশম নগরীর অশান্ত অবস্থা। বামিয়ান এর মত শান্ত নগর দিন গুনছে। ওরা কি বামিয়ানেও আক্রমণ চালাবে কিন্তু কেন? হিন্দুস্থান, বাঙলা, আরব আর তিয়েনশান থেকে আসা মানুষগুলোর পরিণতি কি হবে। চেঙ্গিসের কবল থেকে উদ্ধার পাবে কি তারা? মৃত্যুই কি জীবনের একমাত্র পরিণতি? নিশ্চয় নয় তাহলে ভাগ্যের সংঘাত কার সাথে? জীবন রহস্য যে অবস্থার সৃষ্টি করে, ডিটেকটিভ থ্রিলার তার কাছে হার মেনে যায়।
হিন্দুস্তানের তিন বিভিন্ন প্রান্তের তিন কিশোরষুরা এবং এক কিশোরী খাম্বাত উপকূল থেকে পাড়ি দেয় মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্য নগরী বসরা। পরস্পরকে এমনকি নিজেকেও তারা বোঝাতে চেয়েছে তারা বসরা যাচ্ছে শুধুমাত্র বাণিজ্য করতে। তবে অজুহাত মাত্র না হলেও বাণিজ্য মূল উদ্দেশ্য নয় কারণ বসরা থেকে তাদের মধ্যে তিনজনা চলে যায় তৎকালীন খোরাসানের সমরকন্দে। এ নগরীতে তখন বইছে মোঙ্লগ ঝড়। সমরকন্দে কী অপেক্ষা করছে তাদের জন্য? তেরশ সালের প্রথম ভাগে অন্ধকারে হারিয়ে যেতে থাকা এক সভ্য দেশ আর কয়েকজন ভাগ্যতাড়িতের কাহিনী।
মৈত্রী রায় মৌলিকের জন্ম কলকাতায়। পেশায় ভূবিজ্ঞানী। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ভূবিজ্ঞানে বিএসসি। ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি, বম্বে থেকে এমএসসি ও এমটেক। বর্তমানে ফিল্ড জিয়োলজিস্ট হিসাবে কাজ করছেন। পরিবেশ বিজ্ঞানে গবেষণার কাজ করছেন নিউজার্সির রাটগার্স স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে। কর্মসূত্রে ভারতবর্ষের প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরেছেন। গল্প, কবিতা রচনার পাশাপাশি অনুবাদ-কর্মে নিযুক্ত। মহাত্মা গাঁধী সর্বোদয়া মণ্ডল সংস্থা থেকে প্রকাশিত পুস্তক সেবাগ্রাম টু সোধগ্রাম বাংলা অনুবাদ করেছেন। তাঁর লেখা কবিতা, গল্প ও উপন্যাস সানন্দা, উনিশকুড়ি সহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া বিশিষ্ট কিছু লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে যুক্ত।
পুর্ণগ্রহণ । মৈত্রী রায় মৌলিক । দূর্বা প্রকাশনী । ২০২২র ৪৫তম বই
২০১৫ সালে প্রকাশিত গ্রহণকালের পরবর্তী বই - পূর্ণগ্রহণ। আগের বইটি শেষ হয়েছিল - চৈনিক সেনাদের গোবি মরুভূমির উপর অতিক্রান্ত ধূসরিত পথে, ধুলোঝড় উঠিয়ে কারাকোরামের উদ্দেশ্যে রওনায়। লেখক তাঁর কাহিনীর শুরুতে পূর্বকথন-এ সেখান থেকেই আবার কলম ধরেছেন, পরের ৬২টি আধ্যায়ে - পাঠক কে বয়ে নিয়ে বেড়িয়েছেন ৪০০০ মাইলের বাকি বিস্তৃত রেশম পথের আঁকেবাঁকে।
ছোট্ট গ্রাম পুষান। নির্বিবাদি, কিছুটা ধর্মভীরু, কাপড়ের ব্যবসায়ী মুন্তাজিব তাঁর তিন বিবি ও রোজকার পণ্য নিয়েই দিন কাটিয়ে দিচ্ছে গ্রীষ্মের তপ্ত আবহাওয়ায়। মাঝেসাঝে যাযাবর মৌলানা বশির এলে, এই সাধারণ জীবনে - বাইরের বিচিত্রতার একটু হাওয়া এসে পড়ে। প্রতিদিনের এই রোজনামচায় একদিন ছেদ পড়ে - হাজির হয় এক আহত ভিনদেশি আগন্তুক। তাকে আশ্রয় দেয় মুন্তাজিব। রেশমের গাঠরি দিয়ে প্রতিদান দেয় আগন্তুক, তারপর একদিন আবার হাওয়া হয়ে যায়। এর মধ্যে আবার কিছুদিন হয়েছে ভাইঝি-নৌশা এসে রয়েছে চাচার কাছে। ভারি সুরেলা তাঁর গলা। মৌলানা বশির জানিয়েছেন আগামী মিলাদে নৌশাকে দিয়ে কলমা পাঠ করাবেন। এদিকে বাজারের অবস্থা ভাল না। সুলতানি সৈন্যরা নাকি বারবার এসে লুঠপাঠ করে যাচ্ছে। কোন গুপ্তচরকে নাকি খুঁজছে তাঁরা। যে রেশমের গাঠরি আগন্তুক দিয়ে গেছে, সেই মূলধনের হদিশ পেয়ে নতুন আশা দেখে মুন্তাজিব। সে কি পারবে এই ক্ষুদ্র গ্রাম থেকে রেশম পথের বিপুল বাজারে নিজের কারোবার খুলে ফেলতে?
খাম্বাত উপকূল। গ্রামের বাকি মেয়েদের থেকে অনেকটাই আলাদা "গাথা" নামের গর্দভ মেয়েটি, দেখতেও রুখাটে, আর সমানে বকবক করে চলে। কি যে বলে, তাঁর কোন ঠিক নেই। পথ-প্রান্তর থেকে আবর্জনা তুলে তুলে বাড়িতে বয়ে নিয়ে আসে। একদম সহ্য করতে পারে না মেয়েটাকে হেমচন্দ্র। অথচ ওঁর দিদি কি অপূর্বই না ছিল। যেমনি অপ্সরার মত দেখতে, তেমনি তাঁর আচার-ব্যাবহার। বেশ মনে ধরেছিল তাকে। অথচ ওঁর দিদির সাথে ভাব আদান-প্রদান করতেই পারল না হেমচন্দ্র। হেমচন্দ্ররা জৈন, পেশায় কাপড়ের ব্যাবসায়ী। গাথারা হিন্দু। গাথার দাদাজি খুবই উচ্চমানের কবিরাজ ও জ্যোতিষী। এক অপরাহ্নে গাথা - হেমচন্দ্রের সাথে ঝগড়া থেকে প্রস্থানরত অবস্থায় - খুঁজে পায় এক আহতপ্রাপ্ত মরণোন্মুখ কিশোর কে। তাকে শুশ্রূষা করে সারিয়ে তোলেন দাদাজি। ছেলেটার নাম অভিনন্দন। নাম জিজ্ঞাসা করায় "অভি-অভি" করছিল নাকি সে। সেও নাকি বানিয়া! দেহলির রাজদরবারে নাকি তাঁর চেনাজানা আছে। এই তিন কিশোর খুব শীঘ্রই একে অপরের সান্নিধ্য উপভোগে ন্যাস্ত হয়ে দেখতে থাকে এক বিপুল স্বপ্ন। তারাও কি পারবে রেশম পথে নিজেদের ব্যাবসা দাঁড় করাতে?
লক্ষণাবতী। বখতিয়ার খলজির বঙ্গবিজয়ের পড়ে ১০-১৫ বছর অতিবাহিত। বাংলা মুলুকে এখন রাজ করছেন ঈওজ খলজি। ক্রমাগত ক্ষয়িষ্ণু সেনরাজ্য থেকে পৃথক, আরেকটি শক্ত হিন্দুনগরী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পাইকারা গ্রামের কাছে - বীরসিংহ তাঁর নাম। বীরসিংহের রাজমহলের খাস-সখী ইন্দুলেখা বেড়াতে এসেছে তাঁর গ্রাম পাইকারা তে। অন্যদিকে, যবন বন্ধু - আবুর বাড়িতে মাঝে মাঝে ঘুরে আসে ললিতদেব। গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে নিভৃতে বাস করে আবুর মা আর দিদি। যবন হলেও, অতিথি সমাগম হতে দেখেনি এই গৃহে সে। মাঝেমধ্যে সে তাই আসে তাঁদের সঙ্গ দিতে। আপাত শান্ত গ্রামেও একদিন যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। ইন্দুবালা ও ললিতদেবের ললাটলেখন মিশে মিলিয়ে যায়, লুপ্ত হয় কাহিনীর বাকি অগনিত স্তরের মধ্যে।
দেহলি। সুলতান ইলতুতমিশ সিংহাসনে। সন্তানদের মধ্যে - নাসিরুদ্দিনকে নিজের ছায়ায় তৈরি করছেন তিনি। সাথে আছেন বিচক্ষণ রাজিয়া - কিন্তু এই বেহায়া শাহজাদি পর্দা মানেন না। কায়ামতের ডর নেই তাঁর। এঁদের থেকে ছোট রুকনুদ্দিন বেশিরভাগ সময় কাটান আমোদ-আহ্লাদে। রাজ্যের নানান জায়গায় বিদ্রোহ দেখা দিচ্ছে - বাংলা, বিহার, বুন্দেলখন্দ, লহৌর। হিন্দুকুশের ওপার থেকে আবার বর্বর মোঙ্গল জাতিও হানা দিতে পারে বলে গুপ্তচরেরা খবর আনছেন। এই বিষম পরিস্থিতিতে কি হবে ভবিতব্য? ভেবে পান না প্রধান উজির।
কারাকোরাম থেকে খোরাসান। বিশ্বত্রাস! মোঙ্গল হানাদার! বর্বর! লুঠেরা! আতঙ্কের আরেক নাম - তেমুজিন বনাম চেঙ্গিস - তাঁর নতুন রাজধানী কারাকোরাম ছেড়ে ধেয়ে চলেছেন - রেশম পথের অন্ত্যস্থলে - হীরাট, মার্ভ, বোখারা, নিশাপুর, দমগন সম্মিলিত "খোরাসানে"। সঙ্গে তাঁর যুদ্ধবাজ সঙ্গী, বন্ধু, পুত্রপুত্রী, সেনাপতি, দাসদাসি ও লক্ষাধিক সৈন্য। পুত্রহত্যার সন্দেশপ্রাপ্ত হয়ে তিনি মরুঝড় উঠিয়েছেন প্রতিশোধের তাড়নায়। বাকিদের সাথে আছে চেঙ্গিসের বিবেক - শিকিগেন আর আকাশদেবতা তেঙ্গেরি।
ভিন্ন এইসকল নদীপথের প্রবাহ এসে মিশেছে একই কাহিনীর পারাবারে।
প্রথম কিস্তির বিস্তীর্ণ ভৌগলিক ও কার্যকালে যোগ হয়েছে আরো কিছু চরিত্র - এরা বুদ্ধিদীপ্ত, চিন্তাশীল, আঙ্গিকে কেউবা পার্শ্ব হলেও - কাগুজে নয়। ছোট ছোট পরিশরে, কুশলী গদ্যে, সুণিপন ভাষ্যে ধরা দিয়েছে আঞ্চলিক রীতি, পরম্পরা, খাদ্যাভ্যাস, সুখদুঃখ, ব্যাবসায়িক বৃত্ত, ইতিহাস, লোককথন, আতঙ্ক, আরাম, বিপর্যয় ও তাঁর মুখে রুখে দাঁড়ানোর প্রতিনিধিত্ব। আছে কাকতালীয় দেজা-ভু, জীবনের আলোছায়া-খেলায় নিজেদের চাওয়া-পাওয়ার সমীকরণ, অজানা নামহীন ভালোবাসার সম্পর্ক। এই কিস্তির সাহিত্যমান নিজগুনে ছাড়িয়ে গেছে আগেরটিকে। ঘটনা-দুর্ঘটনার নদীআবর্তে প্রবাহিত জবানিগুলি পাঠে আত্মস্থ্য হয়ে গেছিলাম। প্রতিটি চরিত্র কি অপূর্ব ভাবে নিজেদের স্বাতন্ত্রতা বজায় রেখেছে! আবার স্থান-কাল-পাত্র-ভাষা-পেশা-খাদ্যভাসের পার্থক্য থেকেও মানুষ হিসেবে এরা সবাই যেন একই -আমাদের একান্ত আপনজন।
পুর্ববর্তি অংশের পাঠ শেষে আমার খেদ ছিল অনেকগুলি। নিচে কোটেশনে কিছুটা দিলাম - "বইয়ের প্রচ্ছদে লেখা ১২০০ শতাব্দীর রেশম পথ। তবে রেশম পথের তুলনায়, বইটি তেমুজিন বা চেঙ্গিস খান-এর উত্থানকাহিনীর আখ্যানই বেশি। সীমিত আমাদের এই উপন্যাসের কাহিনী, রেশমপথের যা ২৫ শতাংশ মাত্র। দু-এক জাগায় যদিও কাশগড়, জিশুই, পাইকেন্দ এসেছে, তবুও রেশমপথের মানচিত্রের বহুলপরিচিত জায়গা যেমন - রোম, ইস্তানবুল, জেরুসালেম, বাইজান্টিয়াম, বুর্সা, আলেপ্পো, দামাস্কাস, পালমিরা, বাগদাদ, তাব্রিজ, বুখারা, সমরখন্দ,হেরাত, খোটান, ছাড়াও কোরিয়া, জাপান বা বঙ্গদেশ যেতে আমাদের কাহিনীর অনেক বাকি।
বইটির পেছনের সংক্ষিপ্ত প্রচারলিপিটিও সঠিক নয়। হিন্দুস্থানের একদল না-শুধু একটিমাত্র যুবকের কাহিনী পাই আমরা এই আখ্যানে। বইটির প্রকাশ অনেক হেলাফেলার সাথে হয়েছে। বহুমাত্রিক চরিতাবলীর কোনো সূচি বা সারসংক্ষেপ নেই। নেই কোন সুগঠিত মানচিত্রের ব্যবহার, যা পাঠককূলকে সাহায্য করবে এতো অপূর্ব পঠনের স্বাদ আস্বাদনে। তেমুজিন/উদয়ন/ফেং/মেং এই চার মূলত যাত্রীর যাত্রাপথ সুন্দর ভাবে চিত্রিত করা যেত সচ্ছল ভাবে। এসকল ছাড়াও বইটির পরের মুদ্রণে অতি-আবশ্যিক ভাবে দরকার সুক্ষ ঐতিহাসিক টিকার ও একটি অধিকতর গ্রন্থ-পঞ্জীর।"
২য় কিস্তিতে এদিকগুলি খুব সুন্দর ভাবে যত্ন নিয়ে গোছানো হয়েছে। বইয়ের ফ্ল্যাপে ও পেছনে যথাযথ ব্লার্ব রয়েছে। কাহিনীর পরিসরে সব চরিত্ররাই সমান জায়গা পেয়েছেন। এর পরতে পরতে ছড়িয়ে থাকা রেশম নামের বহুমুল্য দ্রব্য তাড়িয়ে নিয়ে বেরিয়েছে তাঁদের। সাথে আমাদের চিনিয়ে দিয়েছে বাকি রাস্তার বহুলাংশ। কাহিনীপাঠের সাথে, বইয়ের ফ্রন্টিস্পিসে ও পেছনে সুমুদ্রিত মানচিত্রে চোখ রাখছিলাম - পদাঙ্ক অনুসরণ করছিলাম গল্পের অভিযাত্রীদের। প্রয়োজন অনুসারে অনেক অধ্যায়ে টীকা দেওয়া হয়েছে, যা পাঠসমৃদ্ধ করেছে। শেষপৃষ্ঠায় পেলাম তৎকালীন শব্দবন্ধের অর্থ ও আকর গ্রন্থপঞ্জীর বিবরণী।
তবে কাহিনীর শেষে কিছু অধ্যায়ের শিরোনামের সাথে মিল পেলাম না, সেই অধ্যায়ে বর্ণিত স্থানগুলির। নিচে তালিকা দিলাম সেগুলিরও। এটি হয়ত সম্পাদকের, কিংবা আমার বোঝার ভুল।
৫৩ ,৫৫ - খোরাসান দেওয়া আছে -> বর্ণিত হয়েছে নিশাপুর ৫৬ - খোরাসান দেওয়া আছে -> বর্ণিত হয়েছে বোখারা ৫৭ - খোরাসান দেওয়া আছে -> বর্ণিত হয়েছে নিশাপুর/হীরাট ৫৯ - খোরাসান দেওয়া আছে -> বর্ণিত হয়েছে সমরখন্দ ৬০ - আল-বসরাহ দেওয়া আছে -> বর্ণিত হয়েছে সমরখন্দ ৬১ - খোরাসান দেওয়া আছে -> বর্ণিত হয়েছে সমরখন্দ উল্লেখ্য, নিশাপুর, বোখারা, হীরাট এগুলি খোরাসানের অন্তরভুক্ত হলেও, কাহিনীর পুর্ব-অধ্যায়ের শিরোনামে এগুলি যথামাত্রায় ব্যবহৃত হয়েছে, তাই পরেও তা অবলম্বন করাই উচিত ছিল বলে মনে হয়ছে আমার।
কাহিনীতে ঘুরেফিরে এসেছে অনেক প্রশ্ন - যা আজকেও বর্তমান। সমাজ-ব্যাবস্থা, নারী ও পুরুষের স্থান, বর্ণ-বৈষম্য, সভ্য-অসভ্যের সংজ্ঞা, ঈশ্বরের মানবায়ন বা মানুষের ঈশ্বরপ্রীতি ও ভীতি, রোমাঞ্চ-কৌতুক-কষ্টে আবৃত যাপনকাল। কি মায়ায় ঘেরা এক একটি বার্তালাপ! মানুষ হিসেবে পথে-ঘাটে কত জানা-অজানা ব্যাক্তিরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। আবার হয়ত যা(রা) আমাদের সবচেয়ে ভরসযোগ্য আশ্রয়স্থল, সেখান থেকে পরিচয় পাই হঠকারিতার। জন্মমৃত্যু ও জীবনবোধের অলীক তন্তু বুনে চলা একাধিক পর্যবেক্ষণী ভাষ্যে ও জীবনধারায় - বশির মৌলানা, অন্তর্মুখী শিকিগেন, দৃঢ় সরস্বতী কবিরাজ, দুই বঙ্গমাতা ও কারায় জীর্ণ এক বিস্মৃত ভাগ্যান্বেষীর মুর্ছনা ঝরে পড়েছে জায়গায় জায়গায়, পাঠ থামিয়ে বাধ্য করেছে ভাবতে।
২ বছর আগে পড়েছিলাম উইলিয়াল ডালরিম্পেলের বই -"ইন যানাডু" - রেশম পথ শেষ যখন খোলা ছিল ৮০-র দশকে-সেইসময়ের একটি সরস ভ্রমণকাহিনী । সেই ভুলে যাওয়া ইচ্ছেটা আবার চাগিয়ে দিয়ে গেল এই বইটি। বর্তমান সময়ে আমদের সুসভ্য দেশগুলির আন্তঃঅভ্যতরীণ ব্যাপার হেতু হয়ত আর কোনদিনই সেই সড়কে একজন সাধারণ বেসামরিক নাগরিক হয়ে পা ফেলতে পারব না আমরা কেউ!
লেখক, প্রকাশনী ও এই বইয়ের সাথে জড়িত সব সুধীজনকে আকুন্ঠ ধন্যবাদ জানাই। মুদ্রণ ও বাঁধাই উন্নতমানের। দাম যুক্তিসঙ্গত। বাকি তো উপরেই জানিয়েছি। অবশ্যই সংগ্রহযোগ্য। যাই বলব, পরিমাপে হয়ত কমই পড়বে।
একটাই মন্তব্য- অসাধারণ। কিছু দিনের জন্য ইতিহাসের সেই সময়টাতে রেশমপথের বাকে বাকে হারিয়ে গিয়েছিলাম। লেখিকার লেখনি আরো পরিণত হয়েছে এই খন্ডে। ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য বলবো যে অবশ্যপাঠ্য এই সিরিজ। আশা করি এই ধরণের আরো ঐতিহাসিক উপন্যাস পাবো লেখিকার কাছ থেকে।
বই: পূর্ণগ্রহণ লেখক: মৈত্রী রায় মৌলিক প্রকাশক: দূর্বা প্রকাশনী সংগ্রহ মূল্য: ৩৭৫/-
গ্রহণকাল যেখানে শেষ হয়েছিল সেখান থেকেই পূর্ণগ্রহণের শুরু। খোরাসানের নিশাপুরে যার সূত্রপাত, ক্রমে কাশগড়, বোখারা, সমরখন্দ হয়ে, হিন্দুস্থানের দেহলী, লক্ষণাবতীর পথ ছুঁয়ে, গুজরাট প্রদেশের খাম্বাতের উপকূল থেকে সুদূর বসরা নগরী হয়ে আবার মার্ভ, হীরাট, বোখারা, সমরখন্দ হয়ে নিশাপুরে পৌঁছেছে কাহিনীর রূপরেখা।
পৃথিবীর অধীশ্বর হওয়ার বাসনা নিয়ে তথাকথিত সভ্য দেশগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মোঙ্গল অধিপতি চেঙ্গিস খান। তাঁর যুদ্ধনীতি অনন্য, নৃশংস ও ভয়ঙ্কর। সেই ভয়ঙ্কর চেঙ্গিস খানও একসময় চেয়েছিলেন 'ভালো রাজা' হতে, চেয়েছিলেন তাঁর নিজের দেশ মঙ্গোলিয়ায় ফিরে যেতে যেখানে তাঁর অপেক্ষায় চিরবহমান তাঁর প্রিয় ওনন নদী। কিন্তু ঘটনা পরম্পরা ও ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ স্পৃহা তাঁকে ভালো রাজা হওয়ার পথে অগ্রসর হতে দেয়নি।
ত্রয়োদশ শতকের কয়েকটি আপাত বিচ্ছিন্ন ঘটনাবলী দিয়ে এই উপন্যাসের শুরু; যেখানে নিশাপুরের বস্ত্র ব্যবসায়ী মুন্তাজিব ও তাঁর তিন স্ত্রী আফরিন, নাসরিন ও নুসরতের সুখের সংসারে একদিন উপস্থিত হয় এক রহস্যময় বিদেশী আগন্তুক।
হিন্দুস্থানের গুজরাটের খাম্বাত প্রদেশে জ্যোতিষাচার্য সরস্বতী শাকদ্বীপি, তাঁর পৌত্রী গাথা ও গ্রামের এক সরল তরুণ হেমচন্দ্রের শান্ত জীবনে একদিন প্রবেশ ঘটে এক পরিজনহীন মুমূর্ষু যুবকের, বিধর্মী জানা সত্ত্বেও চিকিৎসকের ধর্ম পালন করে যাকে সুস্থ করে তোলেন ও আশ্রয় দান করেন জ্যোতিষাচার্য। নাম দেন অভিনন্দন। হেমচন্দ্র, গাথা ও অভিনন্দন একদিন পৌঁছে যায় আল-বসরা নগরীতে।
লক্ষণাবতীর এক ছোট্ট গাঁয়ের এক প্রান্তে ছোট্ট ঘর বেঁধে নির্বিরোধী জীবন যাপন করে শান্ত সরল তরুণী জয়নাব ও তার মা। জয়নাবের পিতা অনেক বছর আগে নিরুদ্দেশ, সম্প্রতি নিরুদ্দেশ হয়েছে তার ভাই আবু। গ্রহণকালের হাবিবুদ্দিন ও তাঁর পুত্র আবুর জীবন কোন পথে যাত্রা করেছে তা কেউ জানে না।
অপরদিকে লক্ষণাবতীর সুলতান ইওয়াজের রাজ্যের পাশেই গড়ে উঠেছে এক হিন্দু রাজ্য বীরসিংহপুর। গ্রামের যুবক ললিতের ভালোবাসা জয়নাবকে ছুঁয়ে তার ভাগ্য বাঁধা হয়ে যায় ইন্দুলেখার সঙ্গে। চিতোরের রানী পদ্মিনীর প্রায় একশ বছর আগে বীরসিংহপুর রাজ্যে ঘটে যায় ইতিহাসের প্রথম সংগঠিত জহরব্রত।
দেহলীর তখতে তখন সুলতান ইলতুতমিস। ইতিহাস সাক্ষী থাকবে ইলতুতমিসের অনন্য সাধারণ দুহিতা রাজিয়া সুলতানের। রাজিয়া তখন পিতা ও ভাইয়ের পাশে বসে রাজ্য রাজনীতি সম্বন্ধে আলোচনা করেন।
আর এই সব ঘটনাবলীর মধ্যে সূত্রধরের মত এগিয়ে চলে সুবিশাল মোঙ্গল বাহিনী। ঘোড়ার খুরের তলায় তৃণভূমি পেষণ করতে করতে, সমস্ত সভ্য দেশ রাজ্য নগর ছারখার করতে করতে এগিয়ে চলে তারা। তাদের অধিপতি এক ও একমাত্র চেঙ্গিস খান। মোঙ্গলদের ঈশ্বর।
এত বিশাল পটভূমি, এত বিচিত্র সব চরিত্র নিয়ে গাঁথা হয়েছে পূর্ণগ্রহণ উপন্যাস কিন্তু কোথাও এতটুকু ঠোকর খেতে হয়নি। ইতিহাসের গল্প বলতে বলতে এগিয়েছেন লেখক, মন্ত্রমুগ্ধের মত পাতার পর পাতা উল্টে গেছে পাঠক। মহাকাব্যিক বিন্যাসে গড়া এই উপন্যাসের লেখকের কলমকে তাই কুর্ণিশ জানাতেই হয়। ইতিহাসের কথা এত সহজ সুন্দর ভাষায় বিশ্বাসযোগ্য করে উপস্থাপন করা খুব সহজ কাজ নয়।
চরিত্রগুলো প্রত্যেকে নিজের আলোয় উজ্জ্বল। সরস্বতী শাকদ্বীপি, হাবিবুদ্দিন, ইমাম সাহেবের মত চরিত্ররা পাঠকের শ্রদ্ধা অর্জন করে নেয়। বন্ধুর মত মিশে যায় অভিনন্দন, হেমচন্দ্র, গাথা, সুলেমানের মত চরিত্ররা। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতে হয় রাজিয়া সুলতান বা মুন্তাজিবের তিন স্ত্রী আফরিন, নাসরিন ও নুসরতের দিকে। আপন মনের দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, আনুগত্য নিয়ে প্রজ্জ্বলিত থাকে শিগিকেনের মত এক আশ্চর্য চরিত্র। থাকে চেঙ্গিস খানের চার পুত্র যোচি, চাঘতাই, ওগোদেই ও তলুই এবং তাঁর একান্ত বিশ্বস্ত সহচর জেবে, জেলমে, বরচু, সুবোতেইরা। আর এঁদের সবার ওপরে নীল আকাশের ঈশ্বর টেঙ্গেরীর মত ছাদ হয়ে বিচরণ করেন স্বয়ং চেঙ্গিস খান, যিনি চান না তাঁর মৃত্যু সংবাদ কারোর কাছে পৌঁছক। তাঁর জীবিত থাকার ত্রাস চিরকাল অটুট থাকুক এই কামনায় মৃত্যুর পর নিজের সমাধি সকলের অগোচরে এক গোপন জনবিরল স্থানে নির্মাণের আদেশ দিয়ে যান। আজও চেঙ্গিস খানের সমাধির সঠিক স্থান নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি।
কাহিনীর শেষের দিকে দুটি ঘটনা মনে গভীর ছাপ ফেলে যায়। প্রথমত যখন বহু বাধা বিপত্তি পেরিয়ে তার আকৈশোরের খোঁজ সমাপ্ত হয়, অভিনন্দন ওরফে আবু সন্ধান পায় তার পিতা হাবিবুদ্দিনের, তখন সে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত। মৃত্যুপথযাত্রীর একমাত্র বাসনা তার পিতার কাঁধে যেন থাকে তার জানাজা। মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে পড়তে পড়তে।
দ্বিতীয় ঘটনা যখন হিন্দুস্থানগামী হাবিবুদ্দিনের সাক্ষাৎ হয় এক আশ্চর্য বালিকার সঙ্গে, জুলেখা নাম্নী সেই বালিকা এক আলোকবর্তিকার মত পথ দেখিয়ে এগিয়ে নিয়ে চলে। ফুটনোট থেকে জানতে পারি তের বছর পর এই আশ্চর্য কন্যা জুলেখা জন্ম দেবেন প্রবাদপ্রতিম সুফী সন্ত হজরৎ নিজামুদ্দিন আউলিয়ার। এক অপূর্ব মনোভাব নিয়ে শেষ হয় পূর্ণগ্রহণ উপন্যাস।
ইতিহাস ও ইতিহাস আশ্রয়ী উপন্যাস চিরকালই খুব প্রিয়। মৈত্রী রায় মৌলিকের লেখা পরপর দুটি উপন্যাস গ্রহণকাল ও পূর্ণগ্রহণ আমার সেই পাঠক সত্ত্বার পরিতৃপ্তি ঘটিয়েছে। লেখকের কুশলী কলমের প্রতি আমার শ্রদ্ধা জানাই।
বিঃদ্রঃ গ্রহণকাল উপন্যাসে কোথাও কোনো মানচিত্র ছিল না বলে কিছুটা অসুবিধা হয়েছিল। পূর্ণগ্রহণ সেই অভাব পূর্ণ করেছে। হার্ডকভারের ভেতর দিকে অঙ্কিত মানচিত্রটা কাহিনীর গতিপথ নিরুপণে বিশেষ সাহায্য করেছে। ধন্যবাদ জানাই লেখক ও প্রকাশককে। পরবর্তীতে এই সুদক্ষ লেখকের কাছে আরও ঐতিহাসিক উপন্যাসের প্রত্যাশা রইল।
গ্রহনকালে যে গ্রহন শুরু হয়েছিল চেঙ্গিস খানের বাল্যকালের সঙ্গে সঙ্গে এই বইয়ের শেষে যেন পুর্নগ্রহণের ঠিক পরবর্তি অংশে এক টুকরো সূর্যের লালিমাভা দেখা পেলাম। পরবর্তী খন্ডে সেই সূর্যের দীপ্ত রূপ হয়তো আমরা প্রত্যক্ষ করবো। আসসালাম জুলেখা আম্মা। আপনাদের মত দীপ্ত সূর্যদের জন্যেই হয়তো মনুষ্য সমাজটা এখনো টিকে আছে। নয়তো কবেই উবে যেত।