আমি কবি-
মৃতদের সাথে আমার বসবাস
আমি কবি-
রক্তের রঙেই আমার উল্লাস।
কবির জীবনটা আর দশজন সাধারণ মানুষের মতো না। কবি অদ্ভুত, কবি অন্যরকম। তার জীবনের পুরোটা জুড়েই খুন, রক্ত, হিংস্রতা। সাথে আছে অদ্ভুত নেশা। কবিতার নেশা। এই নিয়েই কবির জীবন। কবি রক্ত দেখলে রোমাঞ্চ অনুভব করে। তার সাথে মিশে যায় কবিতার পংক্তি। আর দুইয়ে মিলে তৈরি হয় এক শিল্প। ভয়ংকর শিল্প। যার সামনাসামনি হওয়ার সাহস সাধারণ মানুষের নেই।
• কাহিনি সংক্ষেপ :
ঢাকা শহরকে বলা হয় জাদুর শহর। ব্যস্ততার নগরী। সেই নগরী যেন পরিণত হয়েছে খুনে শহরে। হারিয়ে যাচ্ছে যুবতীরা, পাওয়া যাচ্ছে তাদের লাশ। কিন্তু কিছুই যেন করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের ওপর থেকে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। আতংকবোধ করছে সবাই। এই বুঝি আবার কেউ নিখোঁজ হলো, আবার কোনো লাশ পাওয়া গেল শহরের অন্য প্রান্তে। এবার নিজের পালা নয় তো?
আফজাল আজিম অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার। স্ত্রী আকলিমা আজিমকে নিয়ে তার সংসার। অসুস্থ স্ত্রীকে পাশে নিয়ে আফজাল আজিম মাঝেমাঝেই হারিয়ে যান অতীতের স্মৃতিতে। যেই স্মৃতি তাকে পীড়া দেয়। এক অন্ধকার জীবনের কথা মনে করি দেয়। পুলিশি জীবনে এক জাদরেল অফিসার ছিলেন তিনি। তার সেই জীবন ওলটপালট করে দিয়েছে ব্যর্থ এক কেস। যে কেসে তিনি হারিয়েছেন অনেক কিছুই। হারিয়েছেন ভালো থাকার শেষ সম্বলটুকুও। জীবনানন্দ নামের সেই কেসের নির্মম স্মৃতিগুলো কলমের কালিতে জমা করেন। হারিয়ে যেতে দেন না তার অন্ধকার জীবনের গল্প। সেই গল্পে কী হয়েছিল?
রমেশ একজন নাপিত। হাতে কাঁচি, খুর নিয়ে যার কাজকারবার। চুল-দাঁড়ি কেটে ভালোই দিন যাচ্ছে তার। তার জীবনেরও গল্প আছে। যে গল্প সে মনে করতে চায় না। আবার হারিয়েও যেতে দিতে চায় না। কচুরিপানার মতো এদিক ওদিক ভেসে বেড়ানো রমেশের জীবন একটু ঠাঁই খুঁজে। ভালো থাকার শক্তি খুঁজে। সবসময় কি ভালো থাকা যায়? অতীত যে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়। বিভীষিকাময় জীবনের সব গল্প নিয়ে হাজির হয়ে যায়। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?
জেরিন মেয়েটা অন্যরকম। একটু চঞ্চল, ছটফটে। প্রচুর আড্ডাবাজ। অন্যদিকে তার স্বামী অতুল চুপচাপ। কাজের চাপে স্ত্রীকে সময় দিতে পারে না কিছুতেই। বিপরীতে থাকা দুটি জীবন একসাথে থাকলেও এক হয়ে উঠতে পারেনি। আর তাই তো আলাদা হয়ে গিয়েছে দুজন। পুরনো স্মৃতি ভুলে নতুন জীবনকে আকড়ে ধরতে চায় জেরিন। যার সূচনাটা ক্যাফে কাব্য নামের এক ব্যতিক্রম রেস্টুরেন্টে। জেরিন স্বপ্ন দেখছে, নতুন করে জীবন রাঙাবে। অতীতকে ভুলে গিয়ে আবার জীবন শুরু করবে। কিন্তু সব স্বপ্ন তো পূরণ হয় না। দু'চোখে নতুনের স্বপ্ন নিয়ে জেরিন একদিন হারিয়ে গেল। এই শহরে কেউ হারিয়ে গেলে তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। জেরিন ফিরবে তো?
পিবিআই-এর অফিসের বড়ো কর্তা আসিফ আলী শহরে ঘটে যাওয়া খুনগুলোর তদন্ত করছে। সহকারী হিসেবে আছে দুর্জয় শাকিল। পরিশ্রমী ও কর্মঠ অফিসারকে নিয়ে কাজ করছে আসিফ আলী। সাথে আছে আরও কয়েকজন। ক্লু বলতে কিছু নেই। তবুও চেষ্টা চলছে। উপরমহল থেকে চাপ আসছে। শহরবাসী আতঙ্কিত। সব মিলিয়ে বেশ গ্যাড়াকলে পড়েছে তদন্ত কর্মকর্তারা। কিছু একটা করতে হবে। খুন ঠেকাতে হবে যে করেই হোক। তদন্ত করতে গিয়ে আসিফ আলী লক্ষ্য করল, এই কেসের সাথে অতীতে ঘটে যাওয়া একটি কেসের অদ্ভুত মিল আছে। সেই কেসে তিনিও ছিলেন। তাই একটার সাথে আরেকটা মেলাতে বেগ পেতে হয়নি। নিজের ইচ্ছেতেই আবারও খুললেন বন্ধ হয়ে যাওয়া পুরনো সেই কেসের ফাইল। কী হবে এরপর? ঘুমহীন একাধিক রজনী পর করে খুনিকে ধরতে পারবে আসিফ আলীর দল? না-কি অতীতের মতোই এই কেসও হারিয়ে যাবে? হেরে যাবে আসিফ আলী? আসিফ আলীকে জিততেই হবে, যে করেই হোক!
আফজাল আজিম, রমেশ, কবি কোথাও যেন এক সূত্রে বাঁধা। একই সূত্রে বাঁধা আসিফ আলীও। জেরিনও যেন সেই সূত্রের আরেকটি প্রান্ত। একটু একটু করে গল্প এগিয়েছে। একটু একটু করে জট ছুটেছে। আবার পরক্ষণেই জট পাকিয়ে সব যেন ভেস্তে যাওয়ার মতো অবস্থা। সেই সূত্রের প্রধান প্রান্ত কার হাতে? কীভাবে খুলবে এ জট? যখন সব ছাড়িয়ে এক হয়ে যাবে, তখন চমকে যেতে হবে!
• পাঠ প্রতিক্রিয়া :
এই বইটা জোস। খুব বেশি জোস। লেখকের অন্যান্য বইয়ের সাথে তুলনা করলে এই বইটা সেরা। অসাধারণ। এই বইয়ের সবচেয়ে বেশি যেটা ভালো লেগেছে, আমরা হয়ত এরপর কী হবে জেনে যাচ্ছি। কিন্তু পরক্ষণেই ক্লাইম্যাক্স। সব জানার পরও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার উপায় নেই। কেননা পরের পৃষ্ঠাতেই গল্প মোড় নিচ্ছে অন্য জায়গায়, ভিন্নভাবে। পাঠককে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাবে, এই কথা বলাই যায়।
শেষের আগে কখনো শেষ নয়। শেষ পৃষ্ঠার আগে খেলা এখনো বাকি, এই বইটা যেন তারই প্রতিচ্ছবি। পাঠক যখন আরাম আয়েশে বসে চিন্তা করবে, এই বুঝি ধরে ফেললাম। বুঝে ফেললাম এখন কী হবে! বুঝে ফেলার পরও যেন বোঝা হয় না। আর এখানেই লেখকের স্বার্থকতা।
• গল্পবুনন ও চরিত্রায়ন :
এই বইয়ের স্টোরিলাইন অসাধারণ। লেখকের গল্প বলার ধরন বেশ লেগেছে। আরও বেশ লেগেছে চরিত্রগুলোর ব্যাকস্টোরিগুলো। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ন চরিত্রের অতীতের ভালো কিংবা খারাপ দিকগুলো ফুটে উঠেছে বেশ ভালোভাবেই। অনেকগুলো চরিত্র একসাথে এক বইয়ের মলাটে আনলে লেখকেরা খেই হারিয়ে ফেলেন। কোনো চরিত্রকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে অন্য চরিত্র আঁধারে থেকে যায়। রাখার জন্য কেবল রাখা হয় সেসব চরিত্র। এখানে তেমন কোনো বালাই ছিল না। বইটিতে কোনো চরিত্র ফেলনা নয়। ছোটো চরিত্র যেসব কিছুক্ষণের জন্য হলেও পৃষ্ঠায় জায়গা করে নিয়েছে, তাদের অবদানও অস্বীকার করার উপায় নেই।
বইটির আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, মেদহীন লেখা। বাড়তি মসলা যোগ করা হয়নি, অপ্রাসঙ্গিক কিছু লেখা হয়নি। অতীতের যেসব কাহিনি দৃষ্টিপটে এসেছিল, প্রতিটি-ই গুরুত্বপূর্ণ। গল্পের প্রয়োজনেই সেগুলো আনা হয়েছিল বলে মনে হয়েছে। বইয়ে অবস্থিত প্রতিটি সাল প্রয়োজনীয়। কখনো অতীতের গল্পে হারিয়ে যাওয়া, কখনোবা বর্তমানে ফিরে এসে খুনির সাথে চোর পুলিশ খেলা বেশ উপভোগ্য ছিল। বইয়ের ভেতরে থাকা কবিতাগুলোও বইটিকে অলংকৃত করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে।
• বানান, প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন :
বানানের ক্ষেত্রে বলতে হয়, বইটিতে বিশেষ কোনো ভুল বানান নজরে আসেনি। দুই-এক জায়গায় মুদ্রণ প্রমাদ লক্ষ্য করেছি। এছাড়া বানানে তেমন ভুল ছিল না বললেই চলে।
প্রচ্ছদও অসাধারণ। সম্ভবত এবারের বইমেলার সেরা প্রচ্ছদগুলোর একটি। নালন্দার প্রোডাকশন নিয়ে বিশেষ কিছু বলার নেই। সবসময় সেরা কাজ-ই দিতে চেষ্টা করে প্রকাশনীটি। এবারও ব্যতিক্রম নয়।
পরিশেষে, অতঃপর কবি মঞ্চে উঠিলেন। বইটির এই নাম নিয়ে একটা ধোঁয়াশা ছিল। কেন এ নাম? এর রহস্য কী? সেই রহস্য এখন তোলা থাক। কিছু রহস্য সমাধান করা ঠিক নয়। পাঠক বই পড়বে, গল্পে ঢুকবে। গল্পের সাথে মিশে যাবে। আর তখনই বইটির নামের যথার্থতা খুঁজে পাবে। বইয়ের নামটি স্বার্থক, খুব বেশি রকমের স্বার্থক। এমন বই লিখে স্বার্থক লেখকও। লেখকের জন্য শুভকামনা।
[নোট : এই শহরে ক্যাফে কাব্যর মতো এক বা একাধিক রেস্টুরেন্ট থাকলে মন্দ হয় না।]
বই : অতঃপর কবি মঞ্চে উঠিলেন
লেখক : মনোয়ারুল ইসলাম
প্রচ্ছদ : সুরঞ্জিত তনু (রাহুল চন্দের আঁকা অবলম্বনে)
প্রকাশনী : নালন্দা
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২৫২
মুদ্রিত মূল্য : ৫০০৳
ব্যক্তিগত রেটিং : ৫/৫