আমরা অনেকেই পুরাণকে নিজের মতো করে দেখতে চাই। মাথার মধ্যে প্রচুর 'যদি' আর 'কিন্তু' ঘোরাঘুরি করে ওই গল্পগুলো পড়তে গেলেই। তখনই মনে হয়, "আচ্ছা, যদি এমন হয় যে...!" এই প্রশ্নটাকেই সাতজন লেখক নিজের-নিজের মতো করে মোকাবিলা করেছেন এই বইয়ে। এতে যে লেখাগুলো আছে, তারা হল~ ১. দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যের 'ক্লীবকথা': আমার পড়া শ্রেষ্ঠতম মহাভারতীয় বিনির্মাণের অন্যতম এটি। ২. শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'অলিভার ও দ্রৌপদীর বাটি': এ কাহিনি যতটা বিজ্ঞানের, তার চেয়ে বেশিই মানুষী লোভের। ৩. ঋজু গাঙ্গুলী'র 'বরাহ': কিসু কওনের নাই। ৪. পার্থ দে'র 'অন্তিম পান্ডবানী': "মনন শীল" সিরিজের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই গল্পটিতে মিশে গেছে বিজ্ঞান আর পুরাণ, অতীত আর রক্তমাখা বাস্তব। ৫. দৃপ্ত বর্মন রায়ের 'মাদল ঋতু': এ বিশুদ্ধ প্রেমের গল্প— যাতে পুরাণ... অনুষঙ্গ বলাই ভালো। ৬. কর্ণ শীলের 'এলা': পুরাণের গল্পই বটে— তবে যেমন সরস, তেমনই বৈজ্ঞানিক ভাবনার অভিনবত্বে ভাস্বর। ৭. সুদীপ চ্যাটার্জি'র 'এরিয়া এক্স': পরিনেশ ভাবনা, জেনেটিক্স আর অ্যাডভেঞ্চারের একেবারে শ্বাসরোধী মিশ্রণ এটি৷ এর চেয়ে ভালোভাবে সাতটি থ্রিলারের এই সংকলন শেষ করা যেত না। যদি পৌরাণিক আখ্যান, কল্পবিজ্ঞান, আর "যদি এমন হয়"-এ কিছুমাত্র আগ্রহ থাকে, তাহলে এই বইটি পড়তে পারেন। আমার ধারণা, হতাশ হবেন না।
আমরা যারা বাইরে থাকি, আমাদের কাছে নতুন বাংলা বই পড়ার সুযোগ খুবই কম। ইচ্ছে থাকলেও উপায় আমার কাছে আগে সেভাবে ছিলনা। সেই জায়গায় আমাকে অন্তত বাঁচিয়ে রেখেছিল কল্পবিশ্ব এবং অতি অবশ্যই জয়ঢাক। গুগল প্লেস্টোরে যেদিন জয়ঢাকের বইগুলো দেখতে পেলাম মনে হয়েছিল স্বর্গ পেয়েছি। এক ধাক্কায় কিনে নিয়েছিলাম অঘোরী, ইতি রুদ্রট এবং আরও অনেক বই। তারপর থেকে প্রায় প্রতি হপ্তায় জয়ঢাকের ঠিকানায় গিয়ে দেখি যে নতুন কী এলো। সেখান থেকেই এই বইটির সম্পর্কে জানতে পারি। প্রথমে কিনিনি, পরে বইমেলাতে দেবজ্যোতি দা এটি রেকমেন্ড করেন। আর অপেক্ষা করার প্রশ্নই নেই। কিনে পড়া শেষ করতে যেটুকু সময় লাগার ততটুকুই লেগেছে। নাম থেকে বোঝা যাচ্ছে যে পৌরাণিক কাহিনীর সঙ্গে কল্পবিজ্ঞানের মিশেল ঘটানো হয়েছে। বর্তমানে পৌরাণিক কাহিনীর reconstruction বা deconstruction ইত্যাদি হচ্ছে, সেখানে দাঁড়িয়ে এই বইটির বিশেষত্ব কিছু আছে কি? আমি বলবো আছে, কারণ গল্পগুলোর মধ্যে পুরাণ এবং কল্পবিজ্ঞানের fusion টা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হয়েছে, forced মনে হয়নি অতটা (কিছু জায়গা ছাড়া)। আর infodumping হবার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু হতে হতেও হয়নি। সব মিলিয়ে সাতটি গল্প আছে, তবে যদি আলাদা করে বলতে হয় তবে এই তিনটি গল্পের কথা অবশ্যই বলবো: দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য দাদার লেখা ক্লীবকথা - অর্জুন এবং ঊর্বশীর মধ্যেকার রসায়নটিকে সম্পূর্ন অন্য আলোয় দেখানো হয়েছে। পার্থ দে দাদার লেখা অন্তিম পাণ্ডবাণী - মনন শীল আমার খুব পছন্দের চরিত্র, তার ওপর লেখা এই গল্পটির কথা বলতেই হয়। আর এমন একটি চরিত্রকে নিয়ে গল্পটি লেখা যাকে নিয়ে আমার নতুন বইটি লেখা (যার জন্য মারাত্মক চমকেছিলাম)। সুদীপ চ্যাটার্জির লেখা এরিয়া এক্স - নরসিংহ অবতার এবং জিন মিউটেশন এর যে একটা যোগ হতে পারে সেটা এই গল্প না পড়লে জানতে পারতাম না। সব মিলিয়ে বইটি ভালো। ইবুকে এদিক ওদিকে একটু বানান ভুল আছে ঠিকই কিন্তু পড়তে অসুবিধে হবেনা। Give it a shot, you won't regret i believe. Cheers.
বইটির নামটি এতটাই অভিনব যে শুরুতেই একটু থমকে যেতে হয়। কল্পবিজ্ঞানের সাথে থ্রিলার জিনিসটা দিব্বি যায়, কিন্তু পুরাণ? ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘে ডরায়। পুরাণের সাথে কল্পবিজ্ঞান মেশাতে গেলে যে কী ভয়ঙ্কর মলটোভ ককটেল তৈরি হতে পারে তা আমরা বছর দুয়েক আগে নিউ টাউন বইমেলায় দেখেছিলাম। তাও নতুন ও সামান্য অপরিচিত লেখকদের (আমার কাছে অন্তত) হাতে কিছু এক্সপেরিমেন্টাল কল্পবিজ্ঞান পড়ার লোভে বইটা তুলে নিলাম। আগেই বলে রাখি যে কল্পবিজ্ঞানের ব্যাপারে আমি কিছুটা রিজিড, সুতরাং আমার রিভিউের সাথে অবশ্যই আপনি সহমত না হতে পারেন। প্রথমত এরকম একটি নতুন ধারার বইতে অবশ্যই একটি সম্পাদকীয় অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বইয়ের নামটি ব্যখ্যা করতেও অন্তত এই সম্পাদকীয়টি আবশ্যিক ছিল। জানা দরকার ছিল কেনই বা পুরাণ মিশ্রিত বা আশ্রিত কল্পবিজ্ঞান লেখার প্রয়োজন বোধ করলেন লেখকরা। যাই হোক বইটির গল্পগুলি হল -
গল্পগুলিতে পুরাণের ছোঁয়া দেওয়া হয়েছে অবশ্যই, কিন্তু কল্পবিজ্ঞান বা থ্রিলার? আমার সন্দেহ আছে এই দুটি সম্পর্কে। যাই হোক এসব সরিয়ে দেখা যাক গল্পগুলি কেমন হয়েছে। ১) নিঃসন্দেহে এই বইতে ক্লীবকথা সেরা গল্প। অর্জুনের উর্বশীর কাছে অস্ত্রশিক্ষাকে কল্পবিজ্ঞানের মোড়কে লিখেছেন দেবজ্যোতিবাবু। ট্রোপটা খুবই চেনা, পুরাণের বর্ননার জায়গায় ফিউচারিস্টিক গ্যাজেট আর ঘটনা। এটা করলেই পুরাণ কল্পবিজ্ঞান হয় কিনা সেটা পরের তর্ক, কিন্তু দেবজ্যোতিবাবুর প্লট আর ভাষা লা-জবাব। এর থেকে ভালোভাবে বইটির নামের সার্থকতা আর প্রমাণ করা যায় না। ২) অলিভার আর দ্রৌপদীর বাটি পড়ে আমি অনেকক্ষণ বুঝতে পারিনি যে গল্পটি কোথায় যাচ্ছে। আমার ধারণা শান্তনুবাবুও সেটা খেয়াল করেননি অনেকক্ষণ, শেষ হওয়ার সময় হঠাত খেয়াল পড়ায় তাড়াহুড়ো করে গল্পটা মিলিয়ে দিয়েছেন। গল্পটির মধ্যে কল্পবিজ্ঞান অত্যন্ত জোর করে শেষের এক দুই পাতায় ধরানো হয়েছে। ৩) ঋজুবাবুর ক্ষেত্রে একটা সুবিধা হল তিনি বাকিদের মত পিছন থেকে সামনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেননি। বরং বর্তমান থেকে অতীতে যাওয়ার জন্যে তিনি অতি পরিচিত টাইম ট্র্যাভেলের দ্বারা অতীত পালটানোর ট্রোপ ব্যবহার করেছেন। কিছু যায়গায় যুক্তির অভাব থাকলেও এই গল্পটি অবশ্যই ভালো লাগা গল্পগুলির মধ্যে অন্যতম। ৪) মননশীলের গল্প অবশ্যই আমার প্রিয়। অনেক দিন পরে তাকে ফিরে পেয়ে অত্যন্ত খুশি হয়েছিলাম। গল্প এগিয়েছে তড়তড় করে, পার্থবাবু পাকা খেলোয়াড়, ভাষা, প্লট নিয়ে মনন পরিচিত মেজাজে। কিন্তু গল্প যতই শেষের দিকে এগোতে লাগল মাওবাদী অ্যাডভেঞ্চার থেকে ততই তা পুরাণ আর কল্পবিজ্ঞান মেলানোর মরিয়া চেষ্টায় পর্যবসিত হল। তার সাথে যোগ করতে হয় প্রায় সংযোগহীন বর্গীহানার গল্প। গল্পটিতে অবশ্যই আরো ভালো হওয়ার সুযোগ ছিল, কিন্তু সামলাতে না পারায় সেটি ফাস্ট ডিভিশানে পাস করলেও ডিস্টিংসানটা মিস করল। ৫) মাদল ঋতু - এই গল্পটি কেন যে সম্পাদক বইতে রেখেছেন সেটাই একটা থ্রিলার! ৬) এলা - দেবজ্যোতিবাবুর গল্পটা যদি পুরাণকে কল্পবিজ্ঞানের আলোয় নতুন করে লেখার অন্যতম নিদর্শন হয় তাহলে এই গল্পটিকে তার সবথেকে খারাপ প্রচেষ্টা বলে দেখা উচিৎ। ভাষা, বাক্য রচনা আর প্লট - সব দিক থেকে��� গল্পটি এই বইয়ের সবথেকে দুর্বল অংশ। মাঝে অত্যন্ত খারাপভাবে কোট পরা শিবের চুরুট খাওয়া টাইপের অদ্ভুত সব দৃশ্যের অবতারণা করার কারণ আমি অন্তত বুঝিনি। সত্যি বলতে এই গল্পটি পড়ার পরে বইটি নামিয়ে রাখতে বাধ্য হয়েছিলাম আমি। ৭) এবং বইটি আবার পড়া না শুরু করলেই ভালো হত। নইলে একটি সম্ভাবনাময় গল্পের এইরকম অপমৃত্যু দেখতে হতনা। গল্প লেখার আগেই এন্ডিং তৈরি করে তারপর জোর করে মেলানোর একটি উদাহরণ যদি পার্থবাবুর গল্প হয় তাহলে অন্যটি সুদীপবাবুর গল্প। শুরুটা বেশ ভালো হয়েছিল, সুন্দর বর্ননা, তরতরে কলম। কিন্তু মাঝখান থেকে কি হতে কি হয়ে গেল, দস্যু ড্রাগন একহাতে জিন, অন্য হাতে মিউটেশন আরেক হাতে সুপারম্যানকে নিয়ে সিংহের পিঠে চেপে চাঁদে উড়ে গেল। আমি হতবাক হলাম সত্যি এটা দেখে যে এত ভালো কলমকে কেউ বলেনি যে কখন থামা উচিৎ। সব মিলিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া? আমি যেরকম আশা করেছিলাম, সঙ্কলনটি ঠিক সেরকমই হয়েছে। কল্পবিজ্ঞান আর পুরাণ একসাথে যায়না, জোর করে যদিওবা সেটিকে একসাথে করা সম্ভব তাহলে দরকার অত্যন্ত শক্তিশালী কল্পনা ও কলম - দুইই। যারা সেটি ব্যবহার করতে পেরেছেন, তাঁদের গল্প সসম্মানে উৎরে গেছে। আর যারা পারেননি তাঁদের গল্পগুলি মুখ থুবড়ে পড়েছে। যদিও এরকম একটি এক্সপেরিমেন্টাল কাজের প্রচেষ্টার জন্যে সবার সাধুবাদ প্রাপ্য। বিশেষ করে সম্পাদক দেবজ্যোতিবাবুর প্রতি আমি একটু অনুযোগ জানাবো। অন্তত দুটি গল্পকে তিনি একটু গাইড করলেই লেখকদের ঠিক সময় থামিয়ে গল্পগুলিকে উদ্ধার করা যেত। বইটি সুমুদ্রিত এবং হার্ডকভার। সেরকম ছাপার ভুল আমার চোখে পড়েনি। আশা করব জয়ঢাকের কাছ থেকে এরকম আরো নতুন প্রচেষ্টা আমরা ভবিষ্যতে পাবো।
প্রথমেই বলি, বইটার বিষয়বস্তুর কথা। বইটার প্রচ্ছদ থেকে জানা যাচ্ছে: এই বইতে সাতটি থ্রিলার আছে, যেগুলো কল্পবিজ্ঞান এবং পুরাণকাহিনীর সংমিশ্রণে রচিত হয়েছে। এরকম আউট অফ দা বক্স বইয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত একটা ভূমিকার খুব প্রয়োজন হয়, যেটা কিন্তু এখানে অনুপস্থিত। যেমন অনুপস্থিত প্রচ্ছদশিল্পী এবং অলংকরণ শিল্পীর নাম৷ এবার বলি বইটার প্রোডাকশনের কথা। বইয়ের পৃষ্ঠা খুবই ভাল, ছাপা এবং লে-আউট লা জবাব, ফন্ট অত্যন্ত আরামদায়ক। তবে দাম এবং আয়তনের তুল্যমূল্য বিচার করলে কিন্তু একটা ডাস্ট-জ্যাকেট এবং একটা রিবন বুকমার্কের আশা করাই যায়। কারণ বইটাতে একটা করে ফুল-পেজ হেডপিস ছাড়া আর কোনও অলংকরণ নেই। তবে একটা ব্যাপার প্রশংসনীয়। সম্পূর্ণ ফ্রি ডেলিভারির নাম শুনে আমি প্রথমটায় একটু সন্দিহান ছিলাম। কিন্তু বই হাতে পাওয়ার পর দেখলাম—অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে প্যাক করে (বাবল র্যাপিং এবং তৎসহ মোটা খবরের কাগজের আবরণ) তবেই বইটা ক্যুরিয়ার করা হয়েছে। ফলে প্যাকেট খোলার পর আমি জিনিসটা পেয়েছি একদম অক্ষত অবস্থায়। এবার একে একে বলি গল্পগুলোর কথা।
ক্লীবকথা/দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য: অর্জুনকে পাঠানো হয়েছে স্বর্গে। তাকে যুদ্ধের শিক্ষা শিক্ষা দিচ্ছে স্বয়ং স্বর্গবেশ্যা উর্বশী। সেইসঙ্গে ব্যঙ্গে-বক্রোক্তিতে তার মনে বুনে দিয়ে চলেছে ঘৃণার বীজ। কামনা আর ঘৃণার যুগপৎ আক্রমনে দিশেহারা পার্থ... কেন এই কাজ করেছে উর্বশী? দৈবশিক্ষার বিনিময়ে কী দক্ষিণা দিতে হবে অর্জুনকে? যে পথে পুরাণ আর কল্পবিজ্ঞানের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন লেখক, সেটা অত্যন্ত পরিচিত। কিন্তু লেখকের স্বভাবসিদ্ধ দুরন্ত প্লটিং, নিটোল লেখনী আর গতিময় কাহিনীর গুণে গল্পটি হয়ে উঠেছে দুর্দান্ত রকমের উপভোগ্য; সেইসঙ্গে দোসর হয়েছে শক্তিশালী ভিজ্যুয়াল অ্যাপিল।
অলিভার ও দ্রৌপদীর বাটি/শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়: আন্তেনিওর নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে এক প্রতিরোধী দল, যারা রুখে দিচ্ছে অত্যাচারী সৈন্যবাহিনীর আগ্রাসন। আশ্চর্য কথার মায়ায় তিনি বশীভূত করে ফেলছেন গ্রামবাসীদের। কিন্তু এহেন কর্নেলের শরীরেই হঠাৎ দেখা গেল অদ্ভুত এক রোগ; সঙ্গী হল প্রতিকূল আবহাওয়া আর চরম খাদ্যাভাব। পারবে কি আন্তেনিও এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে? সৈন্যবাহিনীর কাছে কি তারা পরাজিত হবে নাকি প্রতিষ্ঠা করবে নিজেদের আধিপত্য? জোর ধাক্কা খেতে হয়েছে এই গল্পটি পড়তে গিয়ে। একে তো অবিন্যস্ত কাহিনী, দুর্বল বাক্যগঠন, কথ্যভাষার অনুপ্রবেশে দুষ্ট গদ্য পড়াই দুষ্কর; তারউপর পুরাণ আর কল্পবিজ্ঞানের উপস্থিতি একেবারে ধূলিকণার মতো ক্ষীণ। যেটুকু আছে, সেও জোর করে ঢোকানো। তাছাড়া যত্রতত্র সম্বোধন গুলিয়ে, ন্যারেশন আর গদ্যের ভাষা এক হয়ে, যতিচিহ্নের ভুষ্টিনাশ ঘটিয়ে—সে এক সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড!
বরাহ/ঋজু গাঙ্গুলি: সৌরজগতের সীমার বাইরে হঠাৎ তৈরি হল এক ব্ল্যাকহোল। এদিকে খ্রিস্টীয় চতুর্থ সহস্রাব্দের মানুষরা তৈরি করল অতি শক্তিশালী এক প্রোব—বরাহ। সেই প্রোবে চেপে রয় এগিয়ে চলল চার হাজার খ্রীস্টপূর্বাব্দের দিকে, এক নিয়ন্ত্রণহীন পুরনো প্রোবকে খুঁজে বের করতে। সেখানে গিয়ে কোন পরিস্থিতির মুখোমুখি হল বরাহ? পারল কি সে উদ্দেশ্য সিদ্ধি করতে? হঠাৎ আয়তন হারাতে শুরু করা ব্ল্যাকহোল উজিয়ে পারবে রয় টাইম লুপে প্রবেশ করতে? নির্মেদ লেখনীর সঙ্গে সঙ্গে এই কাহিনীর পরতে পরতে আছে রোমাঞ্চ আর চমক, প্লটে আছে অভিনবত্ব, হার্ড সাই-ফাই এলিমেন্ট ভরপুর। আর শেষের চমকটা তো পুরো চেরি অন দা কেক। লা জবাব একটা গল্প পড়লাম।
অন্তিম পাণ্ডবানী/পার্থ দে: হঠাৎ অতিসক্রিয় হয়ে উঠেছে মাওবাদী দল। আর্মি বা পুলিশফোর্স নিজেদের সর্বশক্তি দিয়েও প্রতিহত করতে পারছে না তাদের। এমতাবস্থায় অ্যান্টি-মাওইস্ট কোভার্ট অপারেশনের দায়িত্ব পেল মনন শীল। ওদিকে আই জি কিরীটি রানের ছেলে নিহত হয়েছে মাওবাদীদের হাতে। কার নেতৃত্বে এই অমিত শক্তি পেয়েছে মাওবাদীরা? নিজের সম্বাবনাময় কেরিয়ারকে জলাঞ্জলি দিয়ে কোথায় অদৃশ্য হলেন ডক্টর যোগী? যত্নে লেখা গল্পে আছে টানটান রোমাঞ্চ। পৌরাণিক অভিঘাতটি পরিমিত এবং সুগভীর, সাই-ফাই উপাদানও যথেষ্ট। ইনফোডাম্পিং হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকলেও, অভিজ্ঞ লেখক নিজের নির্মোহ লেখনী দিয়ে বন্ধ করেছেন সে সম্ভাবনার পথ। তবে কোথাও কোথাও বোধহয় চাইলেই কিছু কিছু ইংরেজি শব্দ পরিহার করা যেত।
মাদল ঋতু/দৃপ্ত রায় বর্মন: খেলার মাঠে হঠাৎ আবির্ভাব হল দু'জন অদ্ভুতদর্শন ছেলে। আশ্চর্য তাদের পোশাক। কথা বলার পরিবর্তে তারা ইশারায় ব্যক্ত করে নিজেদের মনের ভাব। কারা এরা? কোত্থেকে এসেছে? কী ঘটল একদিন, যাতে বিমূঢ় হয়ে গেল সবাই? ঋতধ্বজের জীবনে কী ভূমিকা ওদের? সাবলীল ভাষায় লেখা গল্পটি অত্যন্ত গতিময়। কিন্তু তারপর? একে তো কাহিনীতে পৌরাণিক প্রসঙ্গ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর; তারউপর সেই অতিব্যবহারে জীর্ণ হয়ে যাওয়া সাই-ফাই এলিমেন্ট আর অকারণ কিছু ইংরেজি শব্দ। পড়তে হয়তো মন্দ লাগে না... কিন্তু পড়ার পর বলতেই হয়, ‘নাথিং ইম্প্রেসিভ’। গল্পে বেশ কিছু বানান ভুলও চোখে পড়ল৷
এলা/কর্ণ শীল: কৈলাস সরগরম! ক্ষয়রোগে আক্রান্ত চন্দ্রদেব এসেছেন মহাদেবের কাছে, নরলোকে নিজের বংশস্থাপনের ব্যবস্থা করে দেওয়ার আর্জি নিয়ে। ওদিকে দীর্ঘদিনের বিবাহিত দম্পতি হয়েও মনু আর শ্রদ্ধা আজও সন্তানের মুখ দেখেননি। তবে? উভয়পক্ষের বংশরক্ষা একযোগে কীভাবে হবে? ঋষি বশিষ্ঠ কি পারবেন নিজ কর্তব্য পালন করতে? কে এই এলা? কী ভূমিকা তার? পুরাণের আধারেই রচিত হয়েছে এই কাহিনী, সে তো বলাই বাহুল্য। কিন্তু এতসবের মধ্যে যে কল্পবিজ্ঞানের ভূমিকাটা কোথায়—তা বলে দিলে মজা নষ্ট। বরং পাঠক নিজেই পড়ে নিন। ছোট্ট পরিসরে চমৎকার কাহিনী, সুতো ছাড়া এবং জোড়ার কাজটি নিখুঁত, তৎসম শব্দে ভারী হয়ে ওঠা গল্প�� মাঝেমধ্যে সূক্ষ্ম হিউমার গুঁজে দেওয়ার রীতিটাও অতি সুন্দর। তবে পরপর বাক্যের শেষে ক্রিয়াপদ ব্যবহার না করে, বোধহয় ফর্ম্যাটে একটু বৈচিত্র্য আনলে সর্বাঙ্গসুন্দর হত।
এরিয়া এক্স/সুদীপ চ্যাটার্জি: ফোটো জার্নালিস্ট কল্পনা আর সেলভান চলেছে সেলভানের নিখোঁজ বাবা শ্রীধরকে খুঁজতে। তাদের সঙ্গী হয়েছে বিষ্ণু। দরগহ হোননুর গ্রামে গিয়ে তারা জানতে পারে, অদূরেই আছে রাক্ষসাদু রাজ্যম বা রাক্ষসদের অঞ্চল—যেখান থেকে ফেরে না কেউ। ওরা কি পারবে সেখানে অভিযান চালিয়ে ফিরে আসতে? খুঁজে পাওয়া যাবে কি শ্রীধরকে? চন্দ্রা কী গোপন করছে ওদের থেকে? কারা এই রাক্ষস? গল্পটায় সায়েন্স ফিকশন কম, সায়েন্স ফ্যান্টাসি বেশি। তা হোক। কাহিনীর নিপুণ বুনন, দুর্দমনীয় রোমাঞ্চ এবং গদ্যরীতি দেখে বারবার মনে হচ্ছিল—বোধহয় দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যের লেখা পড়ছি। কোথাও কোথাও সমাপতনগুলোকে একটু বেশি আরোপিত মনে হলেও নিরন্তর চমক ভুলিয়ে দেয় সেসব কিছু। লেখাটা পুরো শেষপাতে সানডে আইসক্রিমের মতোই উপভোগ্য।
মতামত সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। তবে আমি মনে করি—যদি তথাকথিত ভূত-প্রেত-তন্ত্র-মন্ত্রের বাইরে গিয়ে কিছু পড়ার ইচ্ছা পোষণ করে থাকেন, তবে পড়তেই পারেন বইটা।