যৌনতা নিয়ে আমাদের ভাবনায় যে বহু আবিলতা আছে— এ-কথা কেউই অস্বীকার করবেন না। অথচ চিরকালই কি ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতি একে এই চোখে দেখেছে?
দেখেনি। বরং সৃজনশীলতার প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা এই একান্ত স্বাভাবিক প্রবৃত্তির নান্দনিক উদ্ভাসই দেখেছি৷ অথচ আজ...?
এই পরিবর্তনের কারণ নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্র এটি নয়। আলোচ্য বইটিও সেই পথে হাঁটেনি। বরং মহাভারত ও রামায়ণের নানা অংশে নারী ও পুরুষের মিলন নিয়ে কী বলা হয়েছে, তারই এক শোভন অথচ সমকালীন বর্ণনা তথা বিশ্লেষণ রয়েছে এতে।
মোট ৩৫টি পর্বে বিন্যস্ত হয়েছে এই আলোচনা। অধ্যায়গুলো শীর্ষক-বিহীন। তাই এই বইয়ে কোনো সূচিপত্রই নেই। লেখকের প্রাক্-কথন এবং ডক্টর মৌ দাশগুপ্তের 'ভূমিকা'-র পর এতে আমরা যা-যা পেয়েছি তার মধ্যে রয়েছে~
১. মহাভারতের 'আদি পর্ব'-তে উল্লিখিত নানা ঘটনা বা পুরাকথা;
২. রামায়ণে দশরথের আচরণের কারণ ও ফল;
৩. মহাভারতে অর্জুনের বনবাস পর্বের ঘটনাবলি;
৪. রাবণের ধর্ষকামী মনোভাব ও প্রকাশ;
৫. পাণ্ডবদের জন্মবৃত্তান্ত;
ইত্যাদি ইত্যাদি।
বাজারি সফট পর্ন জাতীয় তথাকথিত 'গবেষণা গ্রন্থ'-র সঙ্গে এই বইয়ের পার্থক্য কী-কী?
প্রথমত, সুড়সুড়ি দিয়ে কাটতি বাড়ানোর লক্ষ্যে এটি রচিত হয়নি। বরং অতীত ভারতে নারীদের যৌন স্বাধীনতা, অধিকারবোধ এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য-কে সম্মান জানানোর উদ্দেশ্য নিয়েই এই অধ্যায়গুলো বিন্যস্ত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে অবস্থানের পরিবর্তনটিও ফুটে উঠেছে এই লেখাগুলোতে।
দ্বিতীয়ত, যৌনতায় পুরুষের ভূমিকা ও দায়িত্বও অত্যন্ত নান্দনিক ভঙ্গিতে বর্ণিত হয়েছে এই বইয়ে। সে আলোচনার ভঙ্গি যেমন সরস, তেমনই মার্জিত৷ তাতে নীতিবাদী হুঙ্কারের বদলে জ্যেষ্ঠার শাসন ও প্রীতির ভাবটিই মুখ্য।
তৃতীয়ত, তথ্যসূত্র এবং মূল শ্লোকের উল্লেখের সাহায্যে এতে কৌতূহলী পাঠককে আরও গভীরে যাওয়ার পথনির্দেশ দেওয়া হয়েছে স্পষ্টভাবে।
কী-কী অপ্রাপ্তি থেকে গেল এই বইয়ে?
প্রথমত, যে কাহিনিগুলো এতে উল্লিখিত হয়েছে, তারা প্রায় সবাই আমাদের খুব চেনা-জানা। তাই সেগুলোর সুষমাময় বর্ণনার পাশাপাশি কিঞ্চিৎ নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ কাঙ্ক্ষিত ছিল।
দ্বিতীয়ত, পেজে পরিবেশনের তাগিদে লেখা বলেই এতে এসেছে নানা পুনরাবৃত্তি। পাঠককে টেনে রাখার খাতিরে আলোচনার ভঙ্গিটি সমাজতত্ত্ব ছেড়ে ব্যক্তিগত বকাবকির দিকেই ঝুঁকে পড়েছে। এর ফলে বইটিকে বাজারি 'মহাভারতে যৌনতা'-র বিকল্প হিসেবে একটি সিরিয়াস স্টাডি হিসেবে নেওয়া কঠিন হয়েছে।
তবু বলব, প্রাচীন ভারতীয় যৌনভাবনা এবং তার প্রকাশ নিয়ে যদি আগ্রহী হন, তাহলে এই বইটি আপনার পড়া উচিত।
পরিষ্কার ও শুদ্ধ মুদ্রণের বইটির সব ভালো; শুধু নামেই কাহিনি বানানটির প্রাচীন প্রয়োগ দেখে থমকাতে হয়। ওটুকু বাদে এ-বই চমৎকার।
সুযোগ পেলেই পড়ে ফেলুন!