বর্তমান মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় সংকটের জায়গাটাকে যদি একবাক্যে প্রকাশ করতে হয় তবে বলতে হবে বুদ্ধি ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট। বিগত কয়েক প্রজন্মসহ বর্তমান মুসলিম প্রজন্মের মনস্তত্ত্বকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অচল করে দেওয়া হয়েছে। তাদের মুসলিম জাতিসত্তা ও দীনি ফিতরাত নষ্ট হয়ে গেছে পশ্চিমা ও অন্যান্য জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক আঘাতে। ফলে আজ রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার সর্বত্র দীনহীনতার সয়লাব। স্বাধীনতা, প্রগতি ও যুগচাহিদার নামে বর্তমান মুসলিম উম্মাহ যেই মানসিক দাসত্ব ও ধর্মহীনতার প্লাবনে গা ভাসিয়ে দিচ্ছে এর সাথে বিগত ৩০০ থেকে ৩৫০ বছরের বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের গভীর সম্পর্ক আছে। উম্মাহর মনস্তত্ত্বকে মানুষের দাসত্ব থেকে আল্লাহর দাসত্বে ফিরিয়ে আনার জন্য ইসলামের সোনালি ইতিহাসের পাশাপাশি বিগত ৩০০ বছরের ইতিহাসের সাথে পরিচয় করাতে হবে। তখন তারা বুঝতে পারবে, আজকের শাসনব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, পরিবারব্যবস্থা তাদের নিজস্ব ব্যবস্থা নয়। বরং উপনিবেশ, প্রাচ্যবাদ ও বিশ্বায়নের মাধ্যমে তাদের উপর বিদ্যমান মতাদর্শগুলো চাপিয়ে দিয়েছে ইউরোপ। আর উম্মাহকে ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতেই নাশাত পাবলিকেশন নিয়ে আসছে “বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত”।
বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের মূল অর্থ আমাদের অনেকের কাছেই স্পষ্ট না। অথচ এর সূচনার ইতিহাস খুবই পুরনো। সরাসরি পথে শত্রু যখন আক্রমণ করার কোনো উপায় খুঁজে পায় না, তখনি সে বুদ্ধিকে কাজে লাগায়। বুদ্ধি বা চিন্তা দিয়ে এমন এক ফাঁদ সে তৈরি করে, যে ফাঁদে বুঝ-অবুঝ সকলেই স্বেচ্ছায় ঝাঁপ দেয়। বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন অনেকটা এরকমই৷ এর প্রথম গুরু হলেন, 'ইবলিশ'। হযরত আদম আ: এবং হযরত হাওয়া আ: উভয়কে সে যুক্তি বা চিন্তা দিয়ে ঘায়েল করতে পেরেছিলেন। সূচনা এখান থেকেই...
আমরা অনেকেই মনে করি, বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণ মনে হয় এই ক'দিন পূর্বে শুরু হয়েছে। আসলে তা নয়, প্রতিটি নবী ও রাসূলকে এই চিন্তাযুদ্ধের মুখোমুখি হতে হয়েছে। নব আবিষ্কৃত কূটকৌশল ও চক্রান্তের সঙ্গে সকল আম্বিয়াদের লড়তে হয়েছে। সকল আম্বিয়াদের সরদার বিশ্বনবিকেও এসবের সম্মুখীন হতে হয়েছে। সুতরাং বুঝা যায় এ লড়াই সৃষ্টির শুরু থেকেই চলে আসছে। আজও চলছে। কেয়ামত অবধি এ ধারা অব্যাহত থাকবে। তবে আমাদের বদনসিব আমরা এ বিষয়ে সচেতন নই, জ্ঞাত নই চলমান এ ষড়যন্ত্রের।
পাকিস্তানের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ মাওলানা ইসমাইল রেহান এ বিষয়ে লিখেছেন স্বতন্ত্র একটি বই। যেখানে উঠে এসেছে আদি থেকে চলমানের প্রায় সবকিছুই। বিভিন্ন দীনি প্রতিষ্ঠানে তাঁর এই কিতাব পাঠ্যবই হিসেবেও যোগ হয়েছে। সে বইটিই নাশাত পাবলিকেশন থেকে বাঙলাভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। আমাদেরও উচিত এর গুরুত্ব অনুধাবন করে এ বিষয়ে নিজের জ্ঞানকে আরও প্রসারিত করা।
৩৬৪ পৃষ্ঠার বিশাল এই বই পড়ে একদিকে যেমন মুগ্ধতা আছে, আরেকদিকে আছে আক্ষেপ। আক্ষেপের বিষয়টাই আগে বলি। বাংলাদেশে এখন ইসলামী প্রকাশনার একটা জোয়ার চলছে। ইসলামী ঘরানার পাঠকও অনেক। যে কারণে আদর্শের মতো প্রকাশনীও ইসলামী বই প্রকাশ করছে। আমার আক্ষেপ হচ্ছে ইসলামী প্রকাশনীগুলো থেকে সেরা যে বইগুলো বের হচ্ছে তার অধিকাংশই উর্দু থেকে অনুবাদ করা। এতে আমার কাছে অনুমেয় যে বাংলাদেশে ওয়াজ মাহফিলের বক্তা তৈরি হলেও ভালো মানের ইসলামী লেখক এখনও তৈরি হয়নি।
ইসমাঈল রেহানের এই বই পড়ে মুগ্ধ হয়েছি তার লেখার গভীরতা, তথ্যের উপস্থাপন, চলমান ওয়ার্ল্ড অর্ডার সম্পর্কে তার সুস্পষ্ট ধারণার জন্য। যেখানে অসংখ্য ইসলামী প্রকাশনা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে বর্তমান ওয়ার্ল্ড অর্ডারের নানাদিক তুলে ধরে। সেখানে মাওলানা ইসমাইল রেহান তুলে ধরেছেন যুক্তি ও নিজের গভীর জানাশোনা ও বিশ্লেষণ থেকে।
তিনি চমৎকারভাবে বুঝিয়েছেন 'গ্লোবালাইজেশন' বিষয়টা একটা ধোঁকা ছাড়া আর কিছু না। এছাড়া মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সংস্থা সমূহ এবং খ্রিস্টান মিশনারীদের নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। খ্রিস্টান মিশনারীরা মুঘল সাম্রাজ্যকে খ্রিস্টবাদে রূপান্তরের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। এই তথ্য আমার জানা ছিল না। মিশনারীরা কীভাবে প্রত্যন্ত এলাকায়, কীভাবে সুকৌশলে বিশ্বজুড়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে সেসব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন ইসমাইল রেহান।
কীভাবে ভাস্কো দা গামার ভারত আগমনের পথ আবিষ্কার বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাস বদলে দিয়েছে, কীভাবে এই পথ মুসলমানদের বিশ্বজুড়ে আধিপত্যের কবর রচনা করেছে সবই উঠে এসে এই বইতে। লেখকের জানার পরিধি, তথ্যের উপস্থাপন, বিশ্লেষণ চমৎকার। তবে কিছু জায়গায় সমালোচনা করার সুযোগও আছে।
দ্বিতীয় মুগ্ধতা হচ্ছে বইটির অনুবাদ। অনুবাদ এত প্রাঞ্জল আর সাবলীল যে মনেই হয়নি এটি আরেকটি বই থেকে অনূদিত। বরং মনে হয়েছে এটি বাংলাতেই প্রকাশ হয়েছে। অনুবাদের মান শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই ধাঁচের মনে হয়েছে। কোথাও ছন্দপতন হয়নি।
সবশেষে একজন মুসলমান হিসেবে আমার নিজস্ব মতামত হচ্ছে বইটির প্রচার ও প্রসার প্রয়োজন। বইটির বিভিন্ন অংশ নিয়ে পাঠচক্র হওয়া উচিত। মসজিদের খুতবায় এই বই বিভিন্ন অংশ আলোচনা করা যেতে। মুসলমানদের বর্তমান ওয়ার্ল্ড অর্ডার সম্পর্কে সচেতন করার জন্য সবচেয়ে উপযোগী বই মনে হয়েছে আমার কাছে।
রাসূল সা. এর মৃত্যুর পর থেকেই শুরু হয় ইসলাম ও মুসলিমদের উপর আক্রমণ। সেই আক্রমণের ধারা সময়ে সময়ে ভিন্ন থেকে ভিন্নতর ভাবে হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পর যাকাত অস্বীকার করার মাধ্যমে যে আক্রমণের সূচনা হয়েছিলো তা বর্তমান সময় পর্যন্ত চলছে৷ যুগ যুগ ধরে মুসলিম নেতারা সেগুলো প্রতিরোধও করে আসছে৷
প্রথম থেকেই পরাজিত শক্তি একের পর একের আক্রমণে ব্যর্থ হয়ে নতুন রূপে প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা চালিয়েছে৷ কখনো কখনো কূটকৌশলের মাধ্যমে মুসলিমদের উপর জয় লাভ করলেও অস্ত্রের মুখোমুখি মুসলিমদের বিরুদ্ধে তারা দাড়াতে পারেনি বেশিদিন। একের পর এক ক্রুসেডে পরাজিত হয়ে তারা ভিন্ন পথে এগোতে থাকে৷ যা পরবর্তীতে বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
সরাসরি আক্রমণ না করে কিভাবে ভিতর থেকে শেকড় উপড়ে ফেলা যায় তাই ছিলো এই আগ্রাসনের মূল লক্ষ্য। মুসলিম নেতাদের মধ্যে শত্রুতা তৈরি, জাতীয়তাবাদের নামে পৃথিবীতে অসংখ্য রাষ্ট্রের আবির্ভাব, গ্লোবালাইজেশন নামে নিজেদের সাংস্কৃতিক আচরণ ছড়িয়ে দেয়া সহ তারা হাতে নেয় নানাবিধ কর্মসূচি। প্রথম পর্যায়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে হলেও এই আগ্রাসন এখন চলছে সারা পৃথিবীর বিরুদ্ধে।
বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রাসনের এই ইতিহাস, কার্যক্রম কীভাবে বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে তার ধারাবাহিক আলোচনা উঠে এসেছে বইটিতে৷ তাদের সফলতার কারণ, আমাদের ব্যর্থতার উৎস, কীভাবে এই আগ্রাসনের মোকাবেলা করতে হবে তার বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে বইটিতে৷
দুর্দান্ত বই ছিল। রমজানে পড়ছিলাম। এবং এই বইয়ের রসদপাতি আমাকে আমার জীবনের একটা ইউটার্ন পয়েন্টে পরিচয়ের ময়দানে সমৃদ্ধ করে মশলাপাতি দিছে। বিশেষ করে এর সমুদ্র-উপনিবেশীয় ইতিহাসের আলাপ আমারে তাৎক্ষণিক ফায়দা দিছিল। এইটাই রিভিউ আমার। 🤎