❛এমন একজন মানুষ নেই আর এই পৃথিবীতে। অথচ তিনি আছেন আমাদের বুকের মাঝে অসীম বেদনা হয়ে। তাঁকে কখনো ভুলব না আমরা। তা সম্ভব নয়।❜
হুমায়ূন আহমেদ। বাংলা সাহিত্যজগতে গল্পের জাদুকর, কথা জাদুকর হিসেবে যার পরিচিতি। সাহিত্যিক, নাট্যকার, চলচ্চিত্রকার, প্রযোজক হিসেবে যিনি খ্যাতি কুড়িয়েছেন। হিমু, মিসির আলি, রূপা, বাকের ভাই, শুভ্র চরিত্রগুলোকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে নয়, পাঠক আপন অস্তিত্বে খুঁজে পেতে চেয়েছে এই চরিত্রগুলোকে। লেখকের লেখার গুণেই এমনটা সম্ভব হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদ এমন একজন ব্যক্তিত্ব যাকে উপমা, বিশ্লেষণ দিয়ে বর্ণনা করা যাবে না। ৭০, ৮০ এর দশকের সেই ল্যান্ডফোনের দিনগুলোতে বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল বই। সেই সময় হুমায়ূন আহমেদ তার গল্পের জাদুতে মাতিয়ে রেখেছিলেন। রসায়নের এই অধ্যাপক বাংলা সাহিত্যে এনে দিয়েছিলেন অনন্য এক মাত্রা। যার ধারাবাহিকতা এখনও বজায় আছে। হলুদ পাঞ্জাবীতে নিজেকে হিমু ভাবতে তরুণেরা আজও পছন্দ করে। নীল শাড়িতে রূপা ভাবতে পিছিয়ে নেই রমণীরাও।
সেলিব্রেটি হুমায়ূন আহমেদ তো একরকম। কেমন ছিলেন ব্যক্তি হুমায়ূন আহমেদ? লেখকের বিভিন্ন জীবনী পড়ে আমরা কিছুটা জানতেও পারি। বিভিন্ন সময় হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে লেখা অন্য লেখকদের বই, সাক্ষাৎকার থেকেও জানা যায় তার জীবনের গল্প। তবে হুমায়ূন আহমেদের কাছের মানুষদের চোখে তিনি কেমন ছিলেন? একান্ত আপনজনদের সাথে লেখকের সম্পর্ক, পারিবারিক বন্ধন কেমন ছিল? বাবা, স্বামী হুমায়ূন না লেখক হুমায়ূন কোনটার প্রভাব ব্যক্তিজীবনে বেশি ছিল?
এমনই কিছু বিষয় নিয়ে লেখক আসিফ নজরুল লিখেছেন ❛কয়েকজন হুমায়ূন আহমেদ❜ বইটি। প্রথমদিকে বিচিত্রার সাংবাদিক হিসেবে কর্মরত আসিফ নজরুলের সাথে হুমায়ূন আহমেদের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল বিচিত্রার অফিসে। সে সময় হুমায়ূন আহমেদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মাম লা ঠুকে দিয়েছিল আদালত কর্তৃপক্ষ। অপ রাধ লেখকের বইতে আদালত সম্পর্কে কটুক্তি করা। এই নিয়েই এক প্রতিবেদন করতে পরিচয় তাদের। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে সখ্যতা গড়ে ওঠে। তবে লেখকের জবানীতে আছে এই সখ্যতা বেশিদিন ছিল না। তবে দা-কুমড়া সম্পর্কও হয়নি। হুমায়ূন আহমেদের জন্য গভীরে যে ভালোবাসা তিনি অনুভব করতেন তা আজীবন থাকবে।
গুলকেতিনের দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি হুমায়ুন সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। স্ত্রী (তৎকালীন) হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন হুমায়ূন আহমেদের একজন নিয়মিত পাঠক, সমালোচক। লেখকের লেখা পড়তেন এবং মতামত দিতেন। স্বামী, পিতা হিসেবেও হুমায়ুন আহমেদ কেমন ছিলেন সেসব তথ্যও সাক্ষাৎকারে এসেছে।
গুলকেতিনের সংসারে হুমায়ুন আহমেদ কেমন ভূমিকা পালন করতেন, খ্যাতির শিখরে থাকা এই লেখকের পারিবারিক জীবনের খন্ডচিত্র উঠে এসেছে স্ত্রী এবং তিন কন্যার জবানীতে।
❛কোথাও কেউ নেই❜ ধারাবাহিকে বাকের ভাইয়ের ফাঁ সিকে কেন্দ্রে করে সেই সময়ে হওয়া অস্থির পরিবেশের কথা তুলে ধরেছেন। একজন লেখকের লেখনী, উপস্থাপন কতটা শক্তিশালী হলে তা আমজনতাকে রাজপথে নামিয়ে আনতে পারে, শুধুমাত্র কাল্পনিক এক চরিত্রের ফাঁ সি রুখতে। ধারাবাহিকের শেষ পর্ব প্রচারের আগে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল এবং তা নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের চিন্তাধারা তুলে ধরেছেন।
❛দরজার ওপাশে❜ নামক বইতে আদালত নিয়ে ক টুক্তির দায়ে তিনি অভিযুক্তও হয়েছিলেন। আত্মপক্ষ সমর্থন করে লেখক সে পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দিয়েছিলেন তার কিছু কথাও এখানে আছে।
নুহাশপল্লী তৈরি, সে জায়গাকে কেন্দ্র করে লেখকের স্বপ্ন, আশা এবং তার প্রতিফলনের দৃশ্যও ভেসে উঠেছে।
কন্যা শীলা আহমেদ লেখকের অন্যতম প্রিয় সন্তান। শীলার কাছে বাবা হুমায়ূন, লেখক হুমায়ূন কেমন ছিলেন এ বিষয়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারও বইতে সংযোজিত হয়েছে।
সংযোজন হয়েছে হুমায়ূন আহমেদের নিজস্ব এক লেখাও। যার শিরোনাম ❛কচ্ছপের গল্প❜।
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
২২ এর মেলার অন্যতম কাঙ্খিত বই ছিল ❛কয়েকজন হুমায়ূন আহমেদ❜। হুমায়ূন আহমেদের লেখা পড়তে যেমন কখনও অত্যুক্তি হয় না, তেমন লেখককে নিয়ে লেখা অন্যদের লেখা পড়তেও আমার খুব ভালো লাগে। আর আসিফ নজরুলের এর আগে দুটো বই পড়ার সুবাদে এই বইটিও আমার পড়ার আগ্রহ ছিল। ছোটো আকারের বইতে লেখক বিভিন্ন বিষয় দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেন।
তবে এই বইটি ফিকশন নয়। বিভিন্ন সময় লেখা পত্রিকার লেখা এবং কিছু নতুন সংযোজনের সমাবেশ করেছেন। ৭টি ভিন্ন শিরোনামে লেখক ব্যক্তি হুমায়ূনকে চিত্রায়ন করেছেন।
হুমায়ূন আহমদের ভক্তের সংখ্যা যেমন কম ছিল না, তেমনই নিন্দুকও ছিল সমানুপাতিক হারে। এইসব ব্যাপারগুলো তিনি কীভাবে নিতেন, খ্যাতির চূড়ায় থাকা লেখকের মাঝে অহংবোধ কতটা ছিল, সমালোচনা কেমন নিতে পারতেন এই বিষয়গুলো ছোটো আকারে তুলে ধরেছেন।
হুমায়ূন আহমেদ তার লেখায় কেন মানব চরিত্রের অন্ধকার দিকগুলো আনতেন না, কেনই বা তার লেখাকে অনেকে বাজারী লেখা বলতেন, অথবা এতো লিখতে গিয়ে লেখায় রিপিটেশন থাকা নিয়ে লেখকের মনোভাব কেমন ছিল এগুলো গুলকেতিন ও তার তিন কন্যার জবানীতে তুলে এনেছেন। তবে সূক্ষভাবে লেখক হুমায়ূন আহমেদের জীবনের অনেক অধ্যায়ই এড়িয়ে গেছেন। খুব অল্প পরিসরে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার মেলবন্ধন করেছেন।
আমি একটু বেশিই আশা নিয়ে বইটা পড়তে বসেছিলাম। সেই আশা পুরোটা পূরণ হয়নি। কিছুক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় তথ্যের আধিক্য লেগেছে। যেমন, সাহিত্য বনাম আদালত প্রসঙ্গে দেয়া বর্ণনা আমার অযথা লেগেছে বরং সেখানে এর ইতি কীভাবে ঘটলো তা দিতে পারতেন।
শীলা আহমেদের দেওয়া সাক্ষাৎকারের অংশটুকু খুব ভালো লেগেছে।
মোটের উপর বইটা পড়ে খুব একটা খারাপ লাগেনি আবার আহামরি ভালোও লাগেনি। চাইলেই আরো সুন্দর করে তথ্য দিয়ে সাজানো যেত বইটা।
বইয়ের প্রচ্ছদটা আমার খুব পছন্দের। আর বাতিঘর এর বইয়ের মান নিয়ে কখনই প্রশ্ন থাকে না। এই বইটিও বাতিঘরের উন্নতমানের প্রোডাকশনের ফলাফল।
হুমায়ূন আহমেদ চলে গেছেন। তবে রেখে গেছেন তার অসাধারণ সব কর্ম। ভারিক্কি বই পড়ে যখন ক্লান্ত লাগে বা একঘেয়ে হয়ে যাই তখন ৮০-৯০ পেইজের হুমায়ূন আহমেদ পাঠ যেন সকল জড়তা দূর করে দেয়। অনেককেই বলতে শুনি, সুনীল-সমরেশ-শীর্ষেন্দু পড়ার পরে হুমায়ূন আহমেদকে পানশে লাগে। আমি এদের লেখা পড়ার পরেও হুমায়ূন আহমেদে অন্যরকম তৃপ্তি পাই। এ তৃপ্তি আজীবনের। জোছনা, টিনের চালের বৃষ্টিকে যিনি গভীরভাবে ভালোবেসেছেন তিনি চলে গেছেন অন্যভুবনে। সেখানে থেকে কি আমাদের এই হাহাকার পৌঁছে তার কাছে!