'শ্যাম যমজ' উপন্যাসের মূল পটভূমি, বিষয় এবং বক্তব্য আমার কাছে এভাবেই ধরা দিয়েছিল। হিন্দুরা যদি শুধু হিন্দুদের সাথে বসবাস করতে চায়, মুসলমানরা যদি শুধুই উম্মতে মুহাম্মদ ছাড়া আর কারো সাথে থাকতে না চায় তাহলে উপমহাদেশে হিন্দু মুসলমান এই দুই পক্ষের কোন পক্ষ থাকতে পারবে না, এদের দুই পক্ষ নিশ্চিহ্ন করে নিশ্চিতরূপে তৃতীয় পক্ষের আগমন ঘটবে! একথাও মনে রাখা যেতে পারে, যদি কোন তৃতীয়পক্ষ একই পদ্ধতির মাধ্যমে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখতে থাকে তবে সেপক্ষও নির্ঘাৎ সমূলে নিশ্চিহ্ন হবে! পৃথিবীর সব ফুল নষ্ট করে কেবল গোলাপ বাঁচিয়ে রাখা অবাস্তব পরিকল্পনা। সব পাখি ধ্বংস করে শুধু সুকণ্ঠী কোকিল বাঁচিয়ে রাখার ভাবনাও তেমন এক উন্মাদের দিবাস্বপ্ন। একই ভাবে সমস্ত ধর্ম এবং ধর্মের মানুষদের উড়িয়ে দিয়ে একমাত্র আমার ধর্মের মানুষ এবিশ্বে অধিপতি হবে এমন দিবাস্বপ্ন কোনো দিন বাস্তবায়িত হবে না। এসত্য যে যত আগে বুঝতে পারবে তার মস্তিষ্ক তত দ্রুত সাবালক হতে পারবে, তার আগে নয়।
উপন্যাসটি কলকাতা থেকে তিনবার বিভিন্ন আকারে প্রকাশিত হয়েছে। এখন বাংলাদেশের পাঠকদের হাতে নিবেদন করার সময় আমার একটা কথা মনে হচ্ছে- সাম্প্রতিক কালের সাম্প্রদায়িক অস্থিরতার আবহে এই কাহিনি হয়তো এক বিন্দু হলেও ইতিবাচক ভাবনা চিন্তার পরিসর তৈরি করতে পারে।
বইটি প্রকাশের বিষয়ে আমার স্নেহের বন্ধু মাহবুব মোর্শেদ মানিক যথারীতি আগের মতোই জানপ্রাণ লড়িয়ে দিয়ে প্রকাশকের পাশে দাঁড়িয়েছে। তাকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাবার চেষ্টা অশোভন তাই শুধু ভালোবাসায় ভরিয়ে দিলাম। বাংলাদেশের নতুন প্রকাশক উপকথা প্রকাশন এর কর্ণধার আমার উপন্যাসের মাধ্যমে তার সংস্থার সূচনা করছে। পুত্রপ্রতিম এই লড়াকু প্রকাশককে অন্তরের অভিনন্দন জানিয়ে আশীর্বাদ করি- তার অভিযান সফল হোক, ফুলে ফলে পূর্ণ হোক।
জন্ম ২৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৫০। প্রথম জীবনে কবিতা লিখতেন। উভয় বাংলার শ্রেষ্ঠ পত্রপত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। তারপর সিনেমার বিষয়ে উৎসাহী হয়ে উঠলেন এবং এপর্যন্ত বেশ কিছু তথ্যচিত্রসহ ‘তথাগত’ নামে গৌতম বুদ্ধের জীবনের উপর ভিত্তি করে একটি হিন্দি কাহিনিচিত্র তৈরি করেছেন। তাঁর রচনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষকরা তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং করছেন। ‘ব্যাস’ উপন্যাসের মাধ্যমে নতুন করে সাহিত্যযাত্রা শুরু হয়। তাঁর উপন্যাস নিয়ে প্রখ্যাত সমালোচক পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় ‘শাহ্যাদ ফিরদাউসঃ উপন্যাসের সন্দর্ভ’ নামে একটি গ্রন্থ লিখেছেন। স্বপ্না পালিত ও স্বপন ভট্টাচার্য ‘মুখোমুখি শাহ্যাদ ফিরদাউস’ নামে একটি সাক্ষাৎকার ভিত্তিক গ্রন্থ তৈরি করেছেন। ‘অ-য়ে অজগর’ পত্রিকা তাঁর প্রথম নয়টি উপন্যাস নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। সাহিত্য এবং চলচ্চিত্র ছাড়াও তিনি সামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত। কলকাতার রুশ দূতাবাসের সংস্কৃতি দপ্তরের সহযোগিতায় পরিচালিত সাহিত্য সংস্থা ‘প্রগতি সাহিত্য সংবাস’-এর সম্পাদক। শান্তি সংগঠন ‘কলকাতা পিস মুভমেন্ট’-এর প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক এবং শান্তিপূর্ণ জীবনের শিক্ষা দেওয়া ও নেওয়ার প্রতিষ্ঠান ‘পিস স্কুল’-এর প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক।
একটা জীবন যেভাবে সেভাবে হোক কাটানোই যায়, তবে কে কি ভাবে কাটাবে তা নিজস্ব ভাবনা চিন্তার। যেহেতু মানুষ বেঁচে থাকার জন্য প্রত্যেকে একে অপরের উপর নির্ভরশীল তাই চাইলেও যাচ্ছেতাই ভাবে শুরু নিজের ভাবনা চিন্তা মত চলে নিজের জীবনে বা অন্যের জীবনকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়ে সুন্দর সাবলীল ভাবে জীবন পার করে দেওয়া যায় না।
"শ্যাম-যমজ" একটি রুপকধর্মী উপন্যাস। উপন্যাসের শুরুটা হয়েছে কুতুবউদ্দিন নাসিরুদ্দিন আনসারীর নিজের চিন্তা ভাবনা ও স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে। একটা বিকালে তাকে দেখা যায় বঁড়সি হাতে এশিয়ার বৃহত্তর বিলের একটা ক্ষুদ্র অংশে। প্রথম দিকে আপনি উপন্যাসের মধ্যে না থাকলেও ঠিক এই মুহূর্ত থেকে আপনাকে লেখক এক ঝটকায় ঠিক উপন্যাসের মাঝখানে নিয়ে ফেলবেন। এর পর আস্তে ধীরে উপন্যাসের অন্য চরিত্র গুলোর আগমন- বাঁশি, সরলা, অক্ষয় এবং রুপসা- বিপাসা।
একই সাথে পরস্পরকে আকড়ে ধরে বসবাস করা মানুষ গুলো নিজেদের নিজস্ব ভাবনা আর কর্মের মধ্যে বেঁচে থাকলেও তারা মূলত গভীর ভাবে পরস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। অসামান্য এক রুপকের মাধ্যমে লেখক তা বুঝিয়ে দিয়েছেন।
রুপকধর্মী উপন্যাস হলেও তা মটেও কঠিন নয় যে বুঝতে খুব অসুবিধা হতে। সহজ সরল কিছু বিষয় ও ভাবনার মধ্যে দিয়ে চমৎকার এক উপস্থাপন।
হার মেনে নেওয়ার নাম জীবন নয়.!! লড়াই করে বেঁচে থাকার নামই হলো জীবন.!!
জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য কি? এটা সবার কাছেই একটি প্রশ্ন। প্রশ্ন তো অবশ্যই যে জীবনের সত্যিকার মানে কি। তবে মানব সভ্যতার ইতিহাস অনেক সুদূর প্রসারী হলেও জীবনের রহস্য বা নির্মম সত্য সবাই উদঘাটন করতে পারে না। . মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রতিবার তারা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। পরিবেশ পরিস্থিতি আর পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে নিজেদের ভেতর আলাদা আলাদা অবস্থানে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। তৈরি করে নিজে নিজ আদর্শ। যার জন্য তারা হয়ে গিয়েছে একে অন্যের কাছে আলাদা সত্ত্বা। বন্দি করে নিয়েছে নিজেদের গন্ডির ভেতর, যার বাইরে তারা যেতে চায় না। আর এক জাতি অন্য জাতির ভেতর দ্বন্দ তৈরি হওয়াতে একে অন্যের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক এটাই চেয়ে থাকে। তবে এটা কি সম্ভব? . লেখক শাহযাদ ফিরদাউস এর উপন্যাস “শ্যাম-যমজ” এর মাধ্যমে মানব সমাজের নিপীড়িত ও অমোঘ সত্যকে রূপক অর্থে তুলে এনেছেন। এই উপন্যাসের পটভূমি যদি বলা হয় এমন ভাবে যে, হিন্দুরা যদি শুধু হিন্দুদের সাথে অথবা মুসলমানরা যদি মুসলমানদের সাথে থাকতে চায় তবে অবশ্যই তৃতীয় পক্ষের আগমন ঘটবে। . কারণ হিন্দু বা মুসলমানদের কেউ যদি একে অন্যের সাথে থাকতে না চায় তবে এখানে তাদের বসবাস করা সম্ভব নয়। এজন্যই অপর পক্ষ এখানে আসবে, আবার তারাও যদি এই ভাবে থাকতে চায় তবে তারাও কিন্তু থাকতে পারবে না। কারণ এই পদ্ধতিতে বিশ্বজয় সম্ভব নয়। এতে করে তারাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। . পৃথিবীর অন্যতম বড় সত্য হচ্ছে ধর্ম, তবে ধর্ম কে পুজি করে অনেকেই আবার ভেবে থাকেন যে আমাদের ধর্মই শ্রেষ্ঠ। অথবা বলা যায় তারা ভাবেন যে বিশ্বে আমরাই থাকব অন্য কেউ নয়। কিন্তু লেখকের কথা থেকে বলা যায়, “একইভাবে সমস্ত ধর্ম এবং ধর্মের মানুষদের উড়িয়ে দিয়ে একমাত্র আমার ধর্মের মানুষ এ বিশ্বে অধিপতি হবে এমন দিবাস্বপ্ন কোনো দিন বাস্তবায়িত হবে না। এ সত্য যে যত আগে বুঝতে পারবে তার মস্তিষ্ক তত দ্রুত সাবালক হতে পারবে, তার আগে নয়।” . এই লেখা থেকেই বোঝা যায় যে আমরা কেউ কাউকে ছাড়া নই। কারণ আমরা একে অপরের সাথেই ওতোপ্রতো ভাবে জড়িয়ে আছি। যদি কেউ এটা বুঝতে পারি না। এটাই আমাদের জাগ্রত করতে তুলো সহায়তা করে থাকে। আবার আমাদের ভেতর ঘৃণার যে বিষ বাষ্প রয়েছে সেটাও উঠে এসেছে। তবুও আমরা একই সাথে থাকি আছি থাকব। . উপন্যাসের নাম দেখে মনে হতে পারে গুরু গম্ভীর কিছু লেখা আর শব্দের বিন্যাস। আসলে তা নয়, একদমই নয়। শুরু হলে উপন্যাসের শেষ পর্যন্ত আপনি একদম মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে থাকবেন। এর মানে দাড়াচ্ছে বইটি প্রতি লেখাই আপনাকে আকর্ষণ করবে। শুরুটা হয়ত আপনাকে একটু ভাবাবে যে সামনের দিকে কি রয়েছে। তবে সেটা দায়িত্ব লেখকের। আপনি শুধু পড়বেন আর ভাববেন এভাবেও হয়ত ভাবা যায়। . উপন্যাসের রচিত গুলো একে অপরের সাথে যেভাবে জড়িয়ে আছে সেভাবেই আমরা জড়িয়ে রয়েছি। উপন্যাসে প্রধান চরিত্র কুতুবউদ্দিন নাসিরউদ্দিন আনসারী ওরফে মিলন আপনাকে তার নিজস্ব চিন্তার জগতে নিয়ে যাবে। এরপরেই সে চলে যাবে একটা বিরাট পুকুরে মাছ ধরতে। এখানে মাছ ধরার দৃশ্যের বর্ণনা পড়তে পড়তে অজান্তেই আপনি উপন্যাসে আটকে যাবেন। এরপর ঘটনা প্রবাহে আসবে বাঁশি, অক্ষয়, শুক্তি, সরলা, এবং দুই শ্যাম যমজ, রূপসা আর বিপাশা। . দুই প্রাণ একমন হতে পারে আবার একই দেহে দুই মনের বসবাস থাকতে পারে। রূপসা ও বিপাশা তেমনই। জন্মথেকেই যমজ তারা তবুও তারা আলাদা। চিন্তা ভাবনা সব কিছুতেই তারা আলাদা। তবুও তাদের একই সাথে থাকতে হবে। কারণ আলাদা হলেও মরণ বা মৃত্যু। কেউ মৃত্যু চায় আবার কেউ বাচতে চায়। তবে জীবনের রহস্য কি এখানেই?
“পৃথিবীর সব ফুল নষ্ট করে কেবল গোলাপ বাঁচিয়ে রাখা অবাস্তব পরিকল্পনা। সব পাখি ধ্বংস করে শুধু সুকন্ঠী কোকিল বাঁচিয়ে রাখার ভাবনাও তেমনি এক উন্মাদের দিবাস্বপ্ন।“
লেখক শাহ্ যাদ ফিরদাউস মানবসভ্যতার নিপীড়িত সত্যকে তুলে ধরতে নিয়েছেন রূপকের আশ্রয়, লিখছেন ওনার নতুন উপন্যাস শ্যাম-যমজ। এই মানবজাতি অনেক আদর্শে আর পরিচয়ে নিজেদের বিভক্ত করে রেখেছে। যখন একজন মানুষ কোন নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর গন্ডির ভেতর নিজের বন্দীত্ব মেনে নিয়েছে সে চেয়েছে অন্য সব গোষ্ঠী হয় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক কিংবা তার গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক হোক। লেখকের উপন্যাসের ভূমিকায় আবার একটু ফিরে আসি,
“একইভাবে সমস্ত ধর্ম এবং ধর্মের মানুষদের উড়িয়ে দিয়ে একমাত্র আমার ধর্মের মানুষ এ বিশ্বে অধিপতি হবে এমন দিবাস্বপ্ন কোনো দিন বাস্তবায়িত হবে না। এ সত্য যে যত আগে বুঝতে পারবে তার মস্তিষ্ক তত দ্রুত সাবালক হতে পারবে, তার আগে নয়।“
মূলত এই সত্যকে তীব্র মর্মভেদী করতে লেখক উপন্যাসে দাঁড় করিয়েছেন সম্পর্কের এক জটিল সমীকরণ যেখানে আমরা হিন্দু, মুসলমানসহ সব ধর্মের মানুষ কিভাবে একে অপরের সাথে জড়িয়ে আছি, কতখানি জড়িয়ে আছি, সেই উপলব্ধি আমাদের জাগ্রত করে তোলে। সেখানে ঘৃণার বিষ বাষ্পের উপস্থিতি ভীতও করে খানিকটা।
এই গুরুগম্ভীর নির্বাচিত বিষয়ের জন্য একদম ভাববেন না যে উপন্যাসটির গতি মন্থর কিনা, কাঠিন্য প্রধান কিনা। একদম নয়। শুরু করার দায়িত্ব পাঠকের উপর রাখলেও শেষ করানোর দায়িত্ব লেখক পাঠকের উপর ছাড়েননি। শুরুতেই উপন্যাসে প্রধান চরিত্র কুতুবউদ্দিন নাসিরউদ্দিন আনসারী ওরফে মিলন আপনাকে তার নিজস্ব চিন্তার জগতে নিয়ে যাবে। এরপরেই সে চলে যাবে একটা বিরাট পুকুরে মাছ ধরতে। এখানে মাছ ধরার দৃশ্যের বর্ণনা পড়তে পড়তে অজান্তেই আপনি উপন্যাসে আটকে যাবেন। এরপর ঘটনা প্রবাহে আসবে বাঁশি, অক্ষয়, শুক্তি, সরলা, এবং দুই শ্যাম যমজ, রূপসা আর বিপাশা।
একটুকরো মফস্বল। কিছু মানুষ। কয়েকটা বছর। ক��ভাবে আবেগ, আবদার, অভিমান, অপেক্ষা, বেঁচে থাকার শেকড় এঁকেবেঁকে ছড়িয়ে গেছে এক অপরের কত ভিতরে। একদিকে টান দিলে উপড়ে আসবে রক্ত মাংস, কেউ রেহ��ই পায়না। একপাশে আগুন জ্বালালে আরেক পাশ থেকে পোড়া মাংসের গন্ধ বের হয়।
রূপকের এক অসামান্য প্রয়োগ করেছেন লেখক। রূপসা আর বিপাসার দেহখানি যেন ভারত বর্ষ আর মিলন আর অক্ষয় এই জমিনে চিরন্তন দুই বাসিন্দা। কারও দাবীর অস্বীকার করলে এই জমিন জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাবে। কেউ রক্ষা পাবে না। কেউ জিতবে না।
বইমেলা ২০২২ সালের পড়া প্রথম বই। ভাল স্মৃতি হয়ে রইল।
“শ্যাম-যমজ” নামটার মধ্যে একটা ভারিক্কি ভাব থাকলেও বইটা পড়তে গেলে তেমন মনে হবে না। সহজ ও সাবলীল লেখনী। এই সহজ ভাষার গভীরে লেখক আসলে যা বোঝাতে চেয়েছেন, তার ভারিক্কি উপাদান বুঝতে গেলে মস্তিষ্কের নিউরন খরচ করতে হবে। শাহজাদ ফিরদাউসের লেখা এর আগে পড়িনি। প্রথমবার পড়ার পর মুগ্ধ হয়েছি। মনে হয়েছে লেখক বেশ আন্ডাররেটেড। ভাষাশৈলী এত চমৎকার! গল্পের গাঁথুনি বেশ মজবুত। গতিও নেহাতই মন্দ নয়। সব মিলিয়ে বেশ ভালো মানের একটা বই শেষ করলাম।
এ গল্পটা মিলনের, কিংবা অক্ষয়ের। ওরা দুই বন্ধু। মাস্টার্স পেরিয়ে বয়স ২৭ বছরে পড়লেও অকর্মার ঢেঁকি। এখনো বাপের হোটেলে খায়। কাজকাম কিছু করে না। সারাদিন টো টো করে বেড়ায়, আড্ডাবাজি করে। আর মেয়ে মানুষ দেখলে ঢলে পড়ে।
এই গল্পটা হতে পারে বাঁশি নামের মেয়েটার। ছোট্ট মেয়েটা মিলন কাকুর অন্ধভক্ত। মিলন তাকে মা বলে সম্বোধন করে। পাঁকা পাঁকা কথা বলা মেয়েটাকে ভালো না লেগে উপায় নেই। গল্পটা শুক্তি কিংবা সরলারও। উঠতি বয়সের তরুণী। বয়স তাদের এমন, এই বয়সে পুরুষ মানুষের সানিধ্য ভালো লাগে। মনের মধ্যে উথাল পাথাল ঢেউ উঠে। সমাজ হয়তো এসব ভালো চোখে দেখে না, কানে কানে কত কথা ভেসে বেড়ায়। তাতে কী? যৌবন কি আর থেমে থাকে?
তবে সবকিছু ছাপিয়ে এই গল্পটা দুই বোনের — রূপসা ও বিপাশা। সিয়ামিজ টুইন, বাংলায় যাদের শ্যাম-যমজ বলে অভিহিত করা যায়। একটি দেহ, দুইজন মানুষ। অনেক সময় খবরে আমরা দেখতে পাই এমন কিছু মানুষের কথা, একজনের মধ্যে দুইজনের বাস। জোড়া হয়ে থাকা দুইজন একে অপরের থেকে আলাদা হতে পারে না। রূপসা আর বিপাশা তেমনই। ওদের ঊর্ধ্বাঙ্গ আলাদা সত্তা হলেও নিম্নাঙ্গ জুড়ে একক সত্তায় জীবনযাপন করছে। ওরা এক, তবুও আলাদা। কিংবা ওরা আলাদা দুইজন হয়েও একজন আরেকজনের মুখাপেক্ষী। একজন ছাড়া আরেকজন অসম্পূর্ণ। ভিন্ন মন, ভিন্ন অনুভূতি, ভিন্ন চিন্তাভাবনা, স্বভাব-চরিত্র থাকার পরও একসাথেই চলতে হয়। একজন উঠে বসলে আরেকজনের উঠতে হয়। অন্যজন শুয়ে পড়লে আরেকজনকে বাধ্য হয়ে শুতে হয়। এভাবে কি জীবন চলে? এভাবে কি বেঁচে থাকা যায়? তবুও ওর বেঁচে আছে, অথর্ব হয়েও এই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কাজ হিসেবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
এমন ব্যতিক্রমী অস্তিত্বের কথা চাপা থাকে না। ছড়িয়ে পড়ে শহর থেকে গ্রামে। বিখ্যাত হয়ে ওঠে রূপসা ও বিপাশা। যদিও তাদের এই জনপ্রিয়তা তাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিবর্তন করতে পারে না। ঘটনাক্রমে মিলনদের গ্রামে ঘুরতে যায় ওরা। তাতেই হৈহৈ অবস্থা তৈরি হয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তারা যেন চিড়িয়াখানার জীবে পরিণত হয়। কত মানুষ আসে দেখতে তাদের। যেন বিচিত্র এক প্রাণীকে অবলোকন করছে। এর মাঝে মিলন ও অক্ষয়ও আসে। রূপসাকে দেখে যেমন ভালো লেগে যায় মিলনের, তেমন করে বিপাশার পছন্দ হয় অক্ষয়কে। কিন্তু এমন দুইজন কিন্তু একক মানুষকে কীভাবে ভালোবাসা যায়। কীভাবে পূর্ণতা পাবে এ ভালোবাসা?
“শ্যাম-যমজ” বইটি শাহজাদ ফিরদাউসের রূপকধর্মী উপন্যাস। প্রতীকী গল্পের আড়ালে অনেক কিছুই বোঝাতে চেয়েছেন লেখক। লেখকের দর্শন, মনস্তত্ত্ব, চিন্তাচেতনা যেন বইয়ের প্রতিটি অংশে ফুটে উঠেছে। শুধু যে নিজের মনের ভেতরে থাকা কথাগুলো লেখক বলেছেন এমন না, তার সাথে গল্পও এগিয়েছে সমানতালে।
একটা পত্রিকা পাঠের মধ্য দিয়ে গল্পের শুরু। এই গল্পের শুরু। পত্রিকা যখন আমরা পড়ি তখন অনেক অপ্রিয় খবর সামনে চলে আসে। ধ র্ষ নের মতো ঘটনা যেন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। সেই সাথে গুজরাটের দাঙ্গা নিয়ে লেখক কথা বলেছেন। ধর্মীয় দাঙ্গা খুবই ভয়াবহ বিষয়। এই উপমহাদেশ বারবার এর সাক্ষী হয়েছে। দাঙ্গা যখন লাগে তখন সরকারকে তা থামাতে হয়। কিন্তু এক পক্ষ যখন আরেক পক্ষকে কচুকাটা করে, আর এতে সরকার নীরব ভূমিকা পালন করে; তখন অবশ্যই তা সরকারের মদদে হচ্ছে বলে ধরেই নেওয়া যায়। সামান্য একটা পত্রিকা পাঠের মধ্য দিয়ে লেখক তার দর্শন, ভাবনা দিয়ে এর বিরোধিতা করেছেন; এখানেই লেখকের গল্প বলার ধরনের উপযোগিতা প্রমাণিত হয়।
এই গল্পের মধ্য দিয়ে লেখক বোঝাতে চেয়েছেন, সমাজে বসবাস করতে গেলে সহবস্থান জরুরি। সেটা হতে পারে ধর্ম বা সামাজিক অবস্থান। তবে এই সমাজে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ ধর্ম। একজন মানুষ জন্মের সময় কোনো ধর্ম নিয়ে জন্মায় না। সমাজ ও রাষ্ট্র বা পরিবার তাকে ধর্মীয় অবস্থান সম্পর্কে অবগত করে। এই ধর্মের কারণে বিভেদ, হানাহানি। অথচ সমাজের সৌন্দর্য এক ধর্মের সাথে আরেক ধর্মের সৌহার্দ্যপূর্ণ অবস্থান। কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে পারে না। সমাজে একাধিক ধর্মের পাশাপাশি থাকা, একে অন্যের পরিপূরক হয়ে ওঠার মধ্য দিয়েই সমাজ সুন্দর হয়। একজনকে বাঁচাতে গিয়ে আরেকজনকে মে রে ফেলা বা আরেকজনের গলা টিপে কথা বন্ধ করে দিলে অপরজন কিছুতেই বাঁচবে না।
এখানে দুই বন্ধু অক্ষয় আর মিলনের কাহিনীগুলো মজা লেগেছে। দুই বন্ধু, কিন্তু তাদের তর্ক, বিরোধ, হাতাহাতি পর্যায়ে চলে যাওয়ার পর শীতল সম্পর্কের যে বর্ণনা দিয়েছেন লেখক, পড়তে মজা লেগেছে ও। এমনকি প্রেম নিয়েও দুই বন্ধুর চলা বিরোধ এখানে গুরুত্ব পেয়েছে। একই সাথে পারিবারিক সম্পর্কগুলোও এখানে স্পষ্ট। বাবা-মায়ের কেউ একজন প্রতিনিয়ত সন্তানের প্রতি কঠোর হয়, আবার অন্যজন কোমল থাকে। তবে স্নেহের কোনো কমতি থাকে না। সন্তানের অন্যায় অপরাধ জানার পরও আগলে রাখে। বিষয়টা একদিক দিয়ে খারাপ। এ কারণেই হয়তো সাতাশ বছর বয়সেই টো টো কোম্পানি ছাড়া কোথাও কিছু জুটে না।
লেখকের লেখা গতিশীল। তবে এ জাতীয় গল্পের ক্ষেত্রে লেখায় একটু লাগাম টেনে ধরা প্রয়োজন। কারণ গল্পের গভীরতা, দর্শন, ভাবনাগুলো মস্তিষ্কে থিতিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত গল্পটা অনুভব করা যায় না। এখানে লেখক উঠতি বয়সের তরুণ তরুণীর শারীরিক মানসিক কামনা, চাওয়া পাওয়া, চাহিদাগুলো গুরুত্ব দিয়েছেন। কিছু প্রাপ্তবয়স্ক ঘটনাপ্রবাহ ছিল। আমার কাছে তার বেশকিছু যুতসই মনে হয়নি। অপরিচিত একজন ছেলেকে একবার দেখার পরই তাকে স্বামী মনে করে সবকিছু ছেড়ে দেওয়া আসলে স্বাভাবিক অবস্থায় সম্ভব না। হয়তো লেখক এসবের মধ্য দিয়ে ভিন্নভাবে সমাজকে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।
শুরুর দিকে গামলামুখো এক মাছ নিয়ে বিশাল এক ঘটনা লেখক বর্ণনা করেছেন। এর কি খুব প্রয়োজন ছিল? বোধহয় লেখক দেখাতে চেয়েছেন সমাজের অসংখ্য মানুষ আছে যারা কাজের চেয়ে অকাজে সময় বেশি দেয়। অকাজের পেছনে ছোটে। তবে কোনটা কাজ, আর কোনটা অকাজ সেটা ভাবনার বিষয়। আমাদের জীবনে হয়তো বেঁচে থাকার চেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কাজ আর কিছু নেই। কত মানুষ শুধু বেঁচে থাকার জন্যই সংগ্রাম করছে। সবাই সব কাজের জন্য না। একেকজন
আমি মাঝে মাঝে লেখকদের মনস্তত্ত্ব বুঝি না। কেন তাদের এমন সব চরিত্র মেরে ফেলতে হবে, যাদেরকে ভালো লাগে। এখানেও এমন ছিল। কিন্তু কেন? এ ঘটনা না ঘটালে কি খুব ক্ষতি হতো? লেখকের লেখার গতি এখানে একটু ধীর হলে পরিস্থিতি আরেকটু আবেগের হতো। অনুভব করতে পারতাম। তবে ভীষণ মন খারাপ হয়েছে, এই যা!
পরিশেষে, আমাদের সমাজটা সহবস্থানের উপর টিকে আছে। প্রকৃতি বরাবরই সাম্যাবস্থা পছন্দ করে। ধনী গরীব, বিভিন্ন ধর্মের মানুষ, বিভিন্ন সামাজিক অবস্থানের মানুষেরা যদি একসাথে না থাকত, এই সমাজ কি টিকে থাকত? এখানে তো একজনের উপর নির্ভর করেই আরেকজনকে চলতে হয়। তবুও কেন এই বিরোধ। কেন ধর্মের নামে দাঙ্গা হয়? পাশাপাশি থাকা একাধিক ধর্মের মানুষের মনে কীসের এত ক্ষোভ? এই প্রশ্নের উত্তর কি পাওয়া যাবে?
" তবে কি যুক্তি বুদ্ধি বিবেচনার অধিক এক অকারণ আকর্ষণের নাম প্রেম? "- প্রেম বিষয়ক আমার পড়া সবচেয়ে সেরা উক্তি ও বইয়ের পরিপ্রেক্ষিতে আমার পড়া সবচেয়ে সুন্দর উক্তিগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ। শ্যাম- যমজ বইয়ের প্লট এক গ্রামীণ পরিবেশ যেখানে দুইজন অকর্মণ্য ডাঙর ছেলের অক্ষয় ও মিলনের জীবন ও ভাবদর্শন ফুটে উঠেছে, সাথে উঠতি বয়সী ছেলে-মেয়েদের বাড়তি যৌবনের তাড়না, অথর্ব যমজ মেয়েদের কাছের মানুষদের সাথে দেহ সম্ভোগ যেখানে দুইজনের দেহ আংশিক এবং মন সম্পূর্ণভাবে আলাদা কিন্তু যোনি একটিই। এই বিচিত্র টানাপোড়েনে মধ্যে দিয়েই জীবনের অতিবাহন। দুইজনের অমোঘ বন্ধুত্বের মাঝেও ফুটে উঠেছে, অক্ষয়ের সূক্ষ্ম জ্ঞান-বুদ্ধি, অবস্থা ও বন্ধুকে হীনভাবে তুলে ধরার এক উন্নাসিক মনোভাব। প্রতিটা মূহুর্তে নিজেকে মিলনের তুলনায় বড়, সুসংহত, প্রতিষ্ঠিত ও বিবেবকান ভাবের এক বৃথা চেষ্টার পরিপূর্ণ আস্ফালনের বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে অক্ষয়ের চরিত্র। কিন্তু দিনশেষে যার সবকিছুই মিলন ব্যতিরেকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়৷ অন্যদিকে মিলন খুব স্বাভাবিক, উদাসীন ও ভাবলেশহীন একজন ব্যক্তিত্ব যে নিজের ভবিষ্যতের চেয়ে বর্তমান নিয়ে বেশি চিন্তিত। লেখক ফিরদাউস নিশ্চিত ভাবে অসামান্য লেখক, তার দর্শন, বিচার-বিশ্লেষণ অসাধারণ, তার বহিঃপ্রকাশ যেমন "ব্যাস" বইতেও ফুটে উঠেছে। শ্যাম-যমজ ও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে বইয়ের ঘটনাগুলা কেন যেন পরিপূর্ণতা পাওয়ার আগেই উপসংহারে চলে গেছে কিছু ক্ষেত্রে, তাছাড়া বাদ বাকি সবই সুসংগঠিত। চিন্তাভাবনার এক উত্তম খোরাক যোগাবে এই উপন্যাস।
❛মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মোসলমান। মুসলিম তার নয়ণ-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ॥❜ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার সাহিত্যে সাম্যের বাণী শুনিয়েছেন। পাঠক সে বাণী পড়েছে, পছন্দ করেছে। কিন্তু সঠিকভাবে উপলব্ধি কয়জন করতে পেরেছে? যদি পারতই তবে কেন দাঙ্গা ঘটবে? মুসলিমের হাতে হিন্দু কিংবা হিন্দুর হাতে কেন মুসলিমের প্রাণ যাবে? সব ধর্ম নিশ্চিহ্ন করে কেবল আপন ধর্ম দিয়ে পৃথিবী চলা সম্ভব না। প্রতিটি মানুষ একে অপরের পরিপূরক। তবে কেন এই অরাজকতা? ❛পৃথিবীর সব ফুল নষ্ট করে কেবল গোলাপ বাঁচিয়ে রাখা অবাস্তব পরিকল্পনা। সব পাখি ধ্বংস করে শুধু সুকণ্ঠী কোকিল বাঁচিয়ে রাখার ভাবনা তেমন এক উ ন্মাদের দিবাস্বপ্ন।❜ কুতুবউদ্দিন নাসিরউদ্দিন আনসারী ওরফে মিলন। ভাবনার জগতে তার বাস। মাস্টার্স পাশ বেকার। পরিবারের বড়ো সন্তান হলেও দায়িত্বের দিকে নজর নেই। খাচ্ছে দাচ্ছে আর চিন্তায় নিমগ্ন থাকছে। আবার দুপুরবেলা ছিপ নিয়ে এশিয়ার বৃহত্তম খালের ক্ষুদ্রতম অংশে গামলামুখো মাছ ধরার আশায় বসে আছে। মিলনের পেয়ারের দোস্ত অক্ষয়। তাদের মধ্যে কী গলায় গলায় ভাব না শত্রুতা সেটা ঠাওর করা মুশকিল। এই একজনের জন্যে অন্যজন সব করে ফেলছে, অন্যের মতের গুরুত্ব দিচ্ছে, আবার একজন আরেকজনকে দেখে বি ষিয়ে উঠছে। অক্ষয় মহাজ্ঞানী। নানা রকমের বই পড়ছে, বই নিয়ে মিলনকে পড়তে দিচ্ছে আবার সে বিষয়ে আলোচনা থেকে তর্ক জুড়ে দিচ্ছে। একজন অপরজনের পরিপূরক। একজনের মত, চিন্তা আর অন্যজনের বইয়ের জ্ঞান যেন দুজনকে পূর্ণ করছে। দুজনে মিলে একজন। এই করেই যাচ্ছিল তাদের জীবন। সাধারণভাবে চলে যাওয়া জীবনে হঠাৎ করে এলো দুই যমজ বোন রূপসা আর বিপাশা। তাদেরকে কি দুই বলা যায় না এক? দুটো ভিন্ন সত্তা, ভিন্ন মানসিকতার দুই বোন একইসাথে জড়িত। যাদের জীবন সৃষ্টিকর্তার এক বিস্ময়ে তৈরি। দুজনের চিন্তাধারা তফাৎ হলেও তাদের থাকতে হচ্ছে একটা শরীরে! এরকম জীবনে যদি প্রেম আসে আর সে প্রেমিক পুরুষ যদি হয় দুইজন পুরুষ তবে কেমন হতে পারে? একজনকে মন দিলে আরেকজনকে হেলা করা যাবে না। আবার সে কি পারবে নিজের অস্তিত্ব অস্বীকার করতে? এমনই জটিল এবং দোলাচলে পড়েছে অক্ষয় এবং মিলন। বন্ধুত্ব এবং একইসাথে শত্রুতার সম্পর্কে যোগ হয়েছে নতুন এক টানাপোড়ন। শারীরিক দিকে এক না হয়েও রূপসা-বিপাশার মতন তারাও শ্যাম-যমজ! কিন্তু মনের দিকে? তারা কি একজন আরেকজনের জন্য বাঁচবে না নিজের জন্য? জটিল এই পরিস্থিতি কি পুরো সমাজেরই একটা চিত্র না? একজন আরেকজনের অস্তিত্ব স্বীকার করতে চাই না, চাই তাদের দাবিয়ে রেখে নিজের আমিত্ব বজায় রাখতে। কিন্তু এদিকে একজনের সাহায্য ছাড়া আরেকজনের টিকে থাকা দায়! পাঠ প্রতিক্রিয়া: শাহ্যাদ ফিরদাউস এর লেখা প্রথমবারের মতো পড়লাম। অনেকদিন থেকেই উনার লেখা দুটো বই লিস্টে রাখা ছিল। বেশ প্রশংসা শুনেছি উনার লেখার। এবার প্রমাণও পেলাম। শ্যাম-যমজ বা সিয়ামিজ টুইন কী জিনিস? ভিন্নধর্মী নামটা দেখে অনেককিছু মাথায় আসতে পারে। সিয়ামিজ টুইন ব্যাপারটা আদিকাল থেকে ঘটে এসেছে। কয়েক লাখে একজনের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটে। একটি শরীর তবে দুটো ভিন্ন মানুষ তথা যমজ হিসেবে জন্ম নেয় তারা। যখন ছোটো ছিলাম, তখন ইরাকের লাদান এবং লালেহ এর ঘটনা বেশ আলোড়িত হয়েছিল। দুটো ভিন্ন শরীর তবে তাদের মাথা একত্রে জোড়া দেয়া। এমন আরও আছে। থাইল্যান্ডের দুই ভাইয়ের ঘটনাও আছে সেই ১৮০০সনের দিকে। শ্যাম-যমজ সহোদরেরা একইসাথে যুক্ত। ভিন্ন হয় তাদের আবেগ-অনুভূতি, চিন্তা-চেতনা। তবুও তারা এক। চাইলেও আলাদা হওয়া যায়না। এটাই তাদের জীবন। ❝শ্যাম-যমজ❞ উপন্যাসটি এই যমজের রূপকের দ্বারা রচিত। দুই বোন এবং দুই বন্ধুর মধ্যে চলা শীতল আবার আবেগপূর্ণ সম্পর্কের এক নিদারুণ মেলবন্ধন করেছেন লেখক। যৌবনে পদার্পণ করা কতক যুবক-যুবতীর শরীরের তাড়না, আবেগ এবং তাদের নিজস্ব চিন্তাধারা প্রকাশ হয়েছে। চরিত্রগুলোর নিজস্ব মনে চলা ধারণা, চিন্তা এবং বিচারবোধের মধ্যেই ঘটনা প্রবাহিত হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে উপন্যাসের মূল চরিত্র মিলন। তবে অক্ষয়, রূপসা, বিপাশা চরিত্রগুলোকেও আমার সমান গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। তাদের টানাপোড়ন, ইচ্ছা-অনিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ-ই হয়েছে পুরো উপন্যাসে। শুক্তি, সরলা চরিত্রগুলো সাধারণ। হয়তো আপনার আমার মাঝেই তাদের বাস। ছোট্ট বাঁশি যে কিনা আগের জনমে মিলনের মা ছিল সেও ১৫০ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসে অন্যরকম আলো ছড়িয়েছে। তার স্বল্প উপস্থিতিও তাকে মনে ধরতে কার্পণ্য করেনি। শুরুর দিকে পড়তে গিয়ে আমি যেরকম ভাবছিলাম এবং কিছুটা একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছিলাম। তবে লেখক তার লেখার মোড় ঘুরিয়ে উপন্যাসকে উপভোগ্য এবং চিন্তার খোরাক জুগিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। দর্শনবোধ, চিন্তা এবং একে অপরের সাথে যুগ্মভাবে থাকার যে ঘটনাপ্রবাহ সেটা শুধু এই উপন্যাসের মাঝে নয়। ভাবিয়েছে রূপসা-বিপাশা বা মিলন-অক্ষয় ভারতীয় গোষ্ঠির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। যাকে বাদ দিয়ে ভালো থাকা, এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। একজন বাঁচলে অপরজন বাঁচবে এবং তার বিপরীত। উপন্যাসের শেষ দুই পৃষ্ঠা পড়ে কিছুক্ষণের জন্য হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। শেষের অংশটুকু লেখক কী এক দক্ষতার সাথে লিখলেন আর গোপন এক বার্তা দিয়ে দিলেন! বললাম আগেই, শুরুর দিকে পড়ার সময় শুধু ভাবছিলাম উপভোগ্য হচ্ছে না কেন? পৃষ্ঠা এগিয়ে সামনে যেতে যেতে মুগ্ধ হয়ে পড়েছি শুধু এবং শেষটায়......? নাতিদীর্ঘ আকারের উপন্যাস হলেও আমার মনে হয়েছে একটানে পড়ে শেষ করে ফেলার মতো উপন্যাস নয় এটি। গুরুগম্ভীর লেখা বা ভাষার কাঠিন্য নেই ঠিক। তবে উপন্যাসের পাতায় পাতায় যে দর্শন, উপলব্ধি আর একজনের মনের চিন্তার ব্যাপারগুলো উঠে এসেছে তা আপনাকেও ভাবাবে। ভাবতে গিয়ে পড়া একটু শ্লথ গতিতে এগোবে। তবে পড়া শেষে অভিজ্ঞতা সুখকর হবে। প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন: উপকথা থেকে প্রকাশিত বইটির প্রচ্ছদ আমার খুব পছন্দ হয়েছে। বইয়ের বাঁধাই, পৃষ্ঠা এবং আকার চোখে দেখার মতো। দারুণ লেগেছে।