বই-খাতার পাতা ছিঁড়ে কখনো প্যাকেট বানিয়েছেন? এর খুব কাছাকাছি একটা ব্যাপার আমাদের দেহের কোষের মধ্যে হয়। আপনি যদি নারী হয়ে থাকেন, তাহলে এর মধ্যে আপনার দেহকোষে ব্যাপারটা ঘটেও গেছে।
ফেলুদা কিংবা শার্লক হোমসের গল্প পড়েছেন খুনখারাবির রহস্য সমাধান? এর খুব কাছাকাছি কাজ জীববিজ্ঞানীরা হরহামেশাই করেন। সত্যি কথা বলতে, ইদানীং তারা এক বিশ্বব্যাপী ষড়যন্ত্রের সমাধান করার জন্য একজোট হয়েছেন।
আপনার সাহিত্য পড়তে ভাল লাগে? ইতিহাস? বিজ্ঞানী হতে হলে এই জিনিসগুলো খুব দরকার ।
স্বপ্নপুরী হাই স্কুলের উদ্দেশ্য এই তিনরকম জিনিসের সাথে আপনার খানিকটা পরিচয় করিয়ে দেওয়া- দেহের ভেতরের আশ্চর্য অদ্ভুত কলকব্জা, বিজ্ঞানীদের ডিটেকটিভগিরি, আর বিজ্ঞানের সাথে বাকি জগতের সম্পর্ক- হোক তা ইতিহাস, দর্শন বা সাহিত্য। মনে রাখবেন স্বপ্নপুরী হাই স্কুলে বিজ্ঞান ছাত্রের কোনো দোষ নেই, সমস্ত দোষ শিক্ষকের।
আমাদের জানা সবচাইতে জটিল মেশিন হচ্ছে মানুষের শরীর। এটা রাসায়নিক শক্তি নেয়, সেটা থেকে যান্ত্রিক শক্তি তৈরি তো করেই, এমনকি বিদ্যুৎ পর্যন্ত তৈরি করে। এই রিভিউ লিখছি, স্ক্রিনে যে শব্দগুলি আসছে, সেগুলি আমার চোখ থেকে বিদ্যুতের মাধ্যমে মস্তিষ্কে যাচ্ছে। পরের অক্ষরটা কী টাইপ করবো, মস্তিষ্ক বৈদ্যুতিক সঙ্কেতের মাধ্যমে আমার হাত আর আঙ্গুলকে জানাচ্ছে। আর মস্তিষ্ক? সেটা কীভাবে কাজ করে আমরা মোটা দাগে জানি, কিন্তু আরো অনেক কিছু আমাদের এখনো জানার বাকি।
আমি একজন প্রকৌশলী, তাই এই অতি অতি জটিল যন্ত্রটার ব্যাপারে আমার ফ্যাসিনেশন আছে। এবং যখন কেউ বলে, বায়োলজি মুখস্ত করার সাবজেক্ট, বুঝে শেখার কিছু নেই, আমার বেশ অবাক লাগে।
“স্বপ্নপুরী হাই স্কুল” আশা করি মানুষের এই ধারনাটা ভেঙ্গে তাদেরকে বায়োলজি সম্পর্কে আগ্রহী করে তুলবে। হাসান উজ-জামান শ্যামল বিজ্ঞানী, সুলেখক, বিজ্ঞান-ইউটুবার, কিন্তু আমার কাছে তার বড় পরিচয়য়, শ্যামল কঠিন সব বিষয়কে ভেঙ্গে ভেঙ্গে বোঝাতে দুর্দান্ত, এবং তার নতুন বইয়ে সেই ধারা বজায় আছে।
বাংলাদেশের পত্রিকায় প্রায়ই একটা খবর আসে, অমুক প্রাণীর বা উদ্ভিদের (পাট, পেঁপে ইত্যাদি) “জীবনরহস্য উদ্ধার”। এই শব্দযুগলের ব্যবহার অতি বিরক্তিকর লাগে। বইটা শুরু হয়েছে এই রহস্য উদ্ধার আসলে কী, সেটার সঠিক নাম কী হওয়া উচিত ছিল, সেটার ইতিহাস নিয়ে।
তারপর ডিএনএ হয়ে শুরু হয়েছে কোষের কলকব্জার গল্প। কোষের ভেতরের প্ল্যান দেয় ডিএনএ, প্রোটিনগুলো সেই প্ল্যানের বাস্তবায়ন করে। সেইরকম এক প্রোটিনের কারনেই আজকে পৃথিবী ছত্রখান হয়ে আছে, সেটাও আসছে একটু পরে।
গিরগিটির শিং কেন অধ্যায়ে শুধু একটা জীববিজ্ঞানীয় তদন্তের ব্যাখ্যা আছে তাই না, বিজ্ঞানীরা কীভাবে চোখে দেখা ঘটনা (অব্জারভেশন) বোঝার জন্য হাইপোথেসিস বা অনুকল্প দেন, তারপর সেটা পরীক্ষা করে নিজেদের দেয়া তত্বকে হয় পোক্ত করেন অথবা ভুল পেয়ে বাদ দেন, সেটা সুন্দর বুঝিয়ে দেয়া আছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এখানে অব্জারভেশন বা হাইপোথেসিস ধরনের কোন ভারী শব্দের চোখ রাঙ্গানো নেই। যে পড়বে, ভাববে নতুন কিছু জানছে। সাথে করে রহস্য উদ্ধারের একটা টেকনিক, অর্থাৎ গল্প থেকে প্রমাণে পৌঁছানোও শেখা হয়ে যাবে।
প্রজাতির সংজ্ঞা হয়ে পঞ্চম অধ্যায়ে এসেছে করোনাভাইরাসের উপাখ্যান। ভাইরাসের গজাল? কীভাবে সেটা ডাকাতের মত দরজা ভেঙ্গে ঢোকে আমাদের কোষের ভেতরে? কেন গলা আর ফুসফুসকে আক্রমণ করে এই ভাইরাস? হাতে বা পায়ে না কেন? গজালটা এক ধরনের প্রোটিন? মানে যে আমিষ আমরা খাই? নাহ। এই প্রোটিন মানে কোন প্রোটিন, বুঝতে হলে বইয়ের শুরু থেকে আবার চোখ বুলাতে হবে।
তারপর? এখানে বইটা একটা বেশ ইন্টারেস্টিং মোড় নিয়েছে। বিজ্ঞান আর অন্ধ বিশ্বাস একসাথে যায় না। বিজ্ঞানের কাজ হচ্ছে প্রশ্ন করা, কারন সেই সব প্রশ্নের উত্তর থেকেই বের হয়ে আসবে সঠিক তথ্য। তাই একজন নোবেল-জয়ী বিজ্ঞানী বললেন করোনাভাইরাস ল্যাব থেকে এসেছে, সেটার ব্যবচ্ছেদ কীভাবে করা হলো? এখানেও আমরা শুধু বিজ্ঞান শিখব তাই না, বিজ্ঞানের তদন্ত কীভাবে আগায়, সেটাও শিখতে পারবো।
বইয়ের শেষ অধ্যায়, স্বপ্নপূরী হাইস্কুলের এক ক্লাস। সেখানে আমাদের পরিচয় হবে হিমুর সাথে। এই হিমুকে কিন্তু আমরা সবাই চিনি—আমাদের সবার সহপাঠী ছিল এই ছেলে, বা ঠিক তার মত কেউ। অথবা আমরা নিজেরাই হয়তো হিমু। হিমু যথেষ্ট বুদ্ধিমান, কিন্তু কেমিস্ট্রি ক্লাসে তার অসুবিধা হয়। তারপর কী হলো? তার মানে কি হিমু মেধাবী না? এসএসসিতে ফেইল করার পরে হিমুর বাবা তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিলেন?
শিক্ষকরা তার চিন্তার পদ্ধতি বুঝতে পেরেছিলেন, তাই হিমুর পরিণতি সুখকর। এই শিক্ষকরা সম্ভবত বইটার পরিশিষ্টটা পড়তে পছন্দ করতেন।
শেষ করার আগে বইয়ের লেখার ধরনটা নিয়ে একটা কথা। আমাদেরকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে, এমন কাজ বা ক্ষমতার মধ্যে একটা খুব অদ্ভুত জিনিস আছে। গায়ের জোর বা ক্ষুরধার বুদ্ধির সাথে আরেকটা প্রয়োজনীয় ক্ষমতা হচ্ছে গল্প বলা আর সেটা শুনে মনে রাখার ক্ষমতা। মানুষ যে মানুষ হয়ে উঠেছে, তার মধ্যে এই কথা বলার ক্ষমতাকে একটা বিশাল কারন হিসাবে দেখা হয়। তাই যখন কঠিন বিষয়কে গল্পের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়, সেটা আমাদের বোঝার, মনে রাখার বিবর্তনজনিত ক্ষমতাকে জাগিয়ে তোলে, ফলে আমরা সেটা ভালভাবে বুঝতে পারি, মনে রাখতে পারি। “স্বপ্নপুরী হাই স্কুল” এই রকম গল্পের ঢংএ বলা হয়েছে, এবং কঠিন কিছু টপিক খুব সহজ করে গল্পের ছলে বলা হয়েছে। এখানে বেত হাতে কোন মাস্টার নেই, এখানে বন্ধুদের আড্ডায় জীববিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা আছে। আমার কাছে এই গল্পে গল্পে বিজ্ঞানের ধরনটা চমৎকার লেগেছে, আশাকরি বাকিদেরও লাগবে।
শ্যামল ভাইয়ের বই মানেই ভিন্নকিছু। আগের বইটি থেকে এবারের বইটা আরেকটু rigorous হয়েছে। এবারের বইয়ের আলোচনাকে মূলত চারটি অংশে ভাগ করা যায়
» ভাগ ১ - কলকব্জা
(ক) সৃষ্টির ভাষা - এখানে ডিএনএ ও জিনোম সিকুয়েন্সিং নিয়ে অনেক সহজ সরলভাষায় ব্যাখ্যা দেওয়া আছে। আমরা কি আদৌ এখনও স্রষ্টার ভাষা বুঝতে পেরেছি বা কবে পারব তা নিয়েই আলোচনা। তবে এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এসেছে। বিজ্ঞানীদের পার্স্পেক্টিভ আর সাধারণ জনগণের পার্স্পেক্টিভ আলাদা হয়, আর এই বিভেদটা তৈরি করে মিডিয়া সেটা এখানে ফুটে উঠেছে। কেন কথাটা বললাম তা বইটা পড়লেই বুঝতে পারবেন।
(খ) হস্তীর অন্ধদর্শন - পুরো বইয়ের মধ্যে এই অধ্যায়টাই সবচেয়ে কঠিন লেগেছে। এখানে আলোচনা এসেছে এনজাইম ফিলামেন্টেশন নিয়ে।
» ভাগ ২ - তদন্ত
(ক) গিরগিটির শিং পাওয়ার গল্প - একজন বিজ্ঞানী আসলে কীভাবে সায়েন্টিফিক মেথড অ্যাপ্লাই করে নানা রিসার্চ করেন তার একটা সহজ ও উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে এই অধ্যায়টি দেওয়া যেতে পারে। অংশটি ছোট তবে অনেক রোমাঞ্চকর।
(খ) প্রজাতির সঙ্গা - ‘একদল জীব যদি নিজেদের মধ্যে যৌন প্রজনন করে উর্বর সন্তান তৈরি করতে পারে, তাহলে তারা একই প্রজাতি’। প্রজাতির এই সঙ্গাটি আমাদের বিজ্ঞান বইয়ে দেওয়া থাকে এবং সংজ্ঞাটি আসলে অপূর্ণ। কারণ ব্যাকটেরিয়া ভাইরাসের মত অধিকাংশ জীবই যৌন প্রজনন ঘটায় না। এই অধ্যায়ে সেই স্বার্থক ‘প্রজাতির’ সংজ্ঞা খুঁজেছেন লেখক।
(গ) যে বারোটি অক্ষরের জন্য মহামারিটা বাঁধল - করোনা ভাইরাসের গঠন, করোনা ভাইরাস প্রাকৃতিকভাবে ছড়িয়েছে না ল্যাব থেকে ছড়িয়েছে তা নিয়ে ‘নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী’ বাল্টিমোরের মতামত এবং কেউ যদি নোবেল পুরষ্কার পায় তাহলেও তার মতামত বিজ্ঞানের জগতে ভুল হতে পারে কি না তা নিয়ে বিষদ আলোচনা আছে এখানে। এখানে সবচেয়ে মজা লেগেছে রেফারেন্স অংশ। বিজ্ঞানীরা নিজেদের মত ডিফেন্স করার জন্য উভয় পক্ষই প্রমাণ হাজির করছিল বারবার। কেউই কাউকে ছাড় দিচ্ছিল না।
(ঘ) করোনাভাইরাস কি তাহলে ল্যাব থেকেই এসেছিল? - করোনাভাইরাস কি ল্যাব থেকেই এসেছে কি না, ল্যাব থেকে আসলেও সেটা কেউ ইচ্ছা করে করেছে কি না তা নিয়ে বিস্তারিত আল���চনা ও সমালোচনা পাবেন এই অংশে।
» ভাগ ৩ - যাপিত জীবন
(ক) জুতা আবিষ্কার - কিছু কিছু কাজ বিজ্ঞানীরা নিজেরা করেন না। তাদের রিসার্চের ডাটা কালেকশনের জন্য বা ডাটার কিছু সহজ অ্যানালাইসিসের জন্য সিটিজেন সায়েন্টিস্টদের সাহায্য নেন। এরকমই দুইটা কাহিনি নিয়ে জবরদস্ত একটা লেখা এসেছে এখানে। সবশেষে লেখক একটা জিনিস জানতে চেয়েছেন তা হলো ‘আমাদের দেশে সিটিজেন সায়েন্সের কী ধরণের সম্ভাবনা থাকতে পারে?’ আমি বিস্তারিত জানি না। তবে জ্যোতির্বিজ্ঞানে টুকিটাকি কাজ করি ও জানি। সেই হিসাবে নাসার কিছু সিটিজেন সায়েন্স প্রোগ্রামে অংশ নিয়েছি। এমন একটা প্রজেক্ট হচ্ছে ‘zooniverse’। এখানে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ওয়াইল্ডলাইফের বেশ কিছু সিটিজেন সায়েন্টিস্ট প্রোগ্রাম আছে।
(খ) কৌটোর ভেতর অদৃশ্য পোকা - কীভাবে এলো ‘ভাইরাসের ধারণা’ তার ইতিহাস নিয়ে লিখেছেন এ অধ্যায়ে। আসলে আবিষ্কার পিছনের ইতিহাসটা জানানো জরুরি, এতে করে বিজ্ঞানীরা কীভাবে ভাবেন তা আঁচ করা যায় সেটাই এ অধ্যায়ের মূল প্রতিপাদ্য ছিল।
(গ) বিজ্ঞানের ছাত্র হয়ে কেন সাহিত্য পড়বেন? - আমার মতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এটা। এ অধ্যায়টি পড়লে বুঝতে পারবেন, আপনি সাহিত্য না পড়লে আপনার ক্রিটিকাল থিংকিং এর ক্ষমতাই কমে যাবে। অধ্যায়টি পড়ার পর মনে হচ্ছিল, ‘যাক ব্যোমকেশ পড়ে কোনো ক্ষতি করি নাই’।
» ভাগ ৪ - স্বপ্নপুরী হাই স্কুল
এখানে মূলত লেখক তার কল্পিত একটি স্কুলের কথা এনেছেন। স্কুলের ধারণাটা আমার কাছে জোস লাগছে। বাংলাদেশে এমন একটা স্কুল কি করা যায়? যদিও এটার জন্য পুরো সমাজকে চেঞ্জ করে ফেলতে হবে মনে হচ্ছে। আর একই সাথে এখানে আছে দর্শনের যোগসাজশ। দর্শন কি আদৌ বিজ্ঞানের জন্য প্রয়োজন না কি দর্শন দিয়ে হ্যারি পটার যাদু করে? এসব নিয়েই আলোচনা আছে এখানে।
এবার দুইটি বিষয় বলি যা আমার খারাপ লেগেছে। (১) বইয়ের পেইজ অনেক বেশি মোটা করা হয়েছে। বইয়ের পেইজ এতো বেশি মোটা করায় দাম বেড়ে গেছে নাহলে বইয়ের দাম এতো বেশি হতো না। (২) ৪২ নম্বর পেইজে প্রথমদিকে আলোচনায় পিঠার কথা উল্লেখ করছিলেন লেখক। কিন্তু পরের পেইজেই পিঠা হয়ে গেছে রুটি। দুইটা তো দুই খাবার তাই না? এটা ধরে নিচ্ছি অসাবধানতার কারণে হয়েছে। বাকি সব জিনিস টোটাল গুড। বিশেষ করে বিজ্ঞানের বইতে হিউমার অ্যাড করে লিখাটা বইয়ের মৌলিকতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। আশা করি ভবিষ্যতে অন্তত জীববিজ্ঞানের ফিল্ডে এরকম আরো ভালো মানের বই আসুক। বাংলাদেশে জীববিজ্ঞানের ফিল্ডের ভালো বইগুলোতে খড়া চলছে। আরেকটা বিষয় : এত বেশি স্পয়লার দিয়ে দেওয়ার জন্য sorry.
বিশেষ করে মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা জীববিজ্ঞানকে অপছন্দ করে। কারণ হলো জীববিজ্ঞান আমাদের যেভাবে পড়ানো হয় তার কোন “আগামাথা” নেই, অনেক “মুখস্থ” করতে হয়। পদার্থবিজ্ঞান বা রসায়নে যেমন সব বিষয়বস্তু একটা আরেকটার সাথে সম্পর্কিত, জীববিজ্ঞানে সেটা না। শ্যামলের মতে, এরকম মনে হওয়ার দায়ভার অনেকটাই এসে পড়ে যেভাবে জীববিজ্ঞান পড়ানো হয় আমাদেরকে তার উপর। এজন্য সে “স্বপ্নপুরী হাইস্কুল” নামের একটা বিদ্যালয় কল্পনা করেছে যেখানে ছাত্রছাত্রীরা কোনকিছু বুঝতে না পারলে সেটার দোষ শিক্ষার্থীদের দেয়া হয় না, বরং ধরা হয় যেভাবে পড়ানো হচ্ছে সেটতে কোন সমস্যা আছে।
এই বইটায় আমরা সবচেয়ে ভালো লেগেছে যেভাবে বিভিন্ন অধ্যায়ে জীববিজ্ঞানের গল্পগুলো বলা হয়েছে। গল্পগুলো ঠিক যেন ডিটেকটিভ রহস্য, ফেলুদা বা শার্লক হোমস জীববিজ্ঞানের রহস্য তদন্ত করছেন এমন মনে হয়। গল্পের ধাঁচে জীববিজ্ঞানের জটিলতম রহস্যগুলো সরস ভাষায় বলার এমন একটা পদ্ধতি শ্যামল রপ্ত করেছে যা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখতে বাধ্য।
আসলে বিজ্ঞানকে সচরাচর আমাদের পাঠ্যপুস্তকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয় একগাদা তত্ত্ব ও তথ্য হিসেবে, বিজ্ঞান গবেষণা কিন্তু সেরকম নৈর্ব্যক্তিক নয়। শ্যামল নিজে গবেষক হওয়ায় সে গবেষণাগুলোর এবরোথেবরো রাস্তাগুলোর একটা অভিজ্ঞতার ছবি পাঠকদের জন্য বর্ণনা করতে পেরেছে বেশ ভালোভাবে। শুধু বিজ্ঞান নয়, দর্শন ও সাহিত্যও সে ছুয়ে গেছে। অরওয়েলের 1984 ডিস্টোপিয়ান বইটার আলোচনাকে যেভাবে নিয়ে এসেছে বিজ্ঞানের লেন্সে, সেটা আমাকে বেশ অবাক করেছে।
প্রতিটা অধ্যায়ে বিজ্ঞানের ছবিগুলো সম্পর্কিত আলোচনা বুঝতে সাহায্য করেছে। এছাড়া শ্যামল সবগুলো তথ্যসূত্র উল্লেখ করেছে মৌলিক গবেষণা-প্রবন্ধ থেকে। তথ্যসূত্র কেবল নির্লিপ্ত তালিকা নয় বরং কোথা থেকে কোন জিনিস নেয়া হয়েছে সেটার বর্ণনাও পড়তে ভালো লাগে। বইয়ের ছাপায় তেমন কোন ভুল আমার চোখে পড়ে নি।
আমার কাছে মনে হয়েছে “এটাই সায়েন্স ২” নাম দেয়ার কোন প্রয়োজন ছিলো না, যেহেতু প্রথম বইটার সাথে সরাসরি কোন সম্পর্ক নেই। এটা অনেক পাঠককে একটা ভুল বার্তা দিতে পারে। আর ছবিগুলো আরেকটু বড় হলে পড়তে সুবিধা হতো।
শ্যামল শক্তিশালী লেখক, ওর কাছ থেকে আগামী বছরগুলোতে বিজ্ঞানের বিষয়ভিত্তিক বই পাওয়ার প্রত্যাশা রাখি!
হাসান উজ-জামান শ্যামলের "এটাই সায়েন্স" বইটি পড়েছিলাম। বাংলাদেশের অজানা কিছু গবেষণার গল্প নিয়ে ছিল সিরিজের প্রথম বইটি। নিজে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনায় খুব একটা সুবিধা করতে না পারলেও সুলিখিত ঐ বই পড়ার পর গবেষণা ব্যাপারটা নিয়ে দারুণ কৌতূহল তৈরী হয়েছিল, এবং লাইফ সায়েন্স না পড়ায় কিছুটা আফসোস হয়েছিল। "এটাই সায়েন্স" এর দ্বিতীয় কিস্তিও হতাশ করেনি।
এবারের কিস্তিটার নাম স্বপ্নপুরি হাই স্কুল, যেটা শুনে বোঝার উপায় নেই বইয়ের বিষয়বস্তু কী হবে। আমার মতে, বইয়ের নামকরণটা আরও ভালো হতে পারত। এর বিষয়বস্তুগুলোকে মোটা দাগে তিনভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগ, যেটার নাম লেখক দিয়েছেন "কলকব্জা", সেখানে তিনি মূলত জীববিজ্ঞানের দুটি বিষয়, ডিএনএ এবং কোষকঙ্কাল নিয়ে একেবারে জলবৎ তরলং ভাষায় আলোচনা করেছেন। আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, লেখক এখানে 'কেন?' প্রশ্নের জবাব দিতে চেয়েছেন--অর্থাৎ স্কুল-কলেজের জীববিজ্ঞান নিয়ে যে আমাদের অভিযোগ, এতে বোঝার কিছু নেই, শুধু মুখস্থ--সেই ভুল ভাঙানোর জন্য লেখক বিষয়টির দারুণ ইন্টারেস্টিং কিছু বিষয় নিয়ে গোড়া থেকে গল্প করেছেন। অনেক সময় যেটা হয়, জটিল বিষয়ের আলোচনা করতে গিয়ে লেখকরা বিষয়টাকে লঘু করে ফেলেন, এখানে তেমনটা হয় নি, লেখক চেষ্টা করেছেন যথাসম্ভব বস্তুনিষ্ঠ থাকতে এবং প্রতিটি অধ্যায় শেষে যুক্ত করেছেন অধ্যায়সংশ্লিষ্ট গবেষণাপত্রগুলো। হাসান উজ-জামানের ভিডিও আমি দেখেছি। তিনি যে ঢঙে কথা বলেন, তার লেখায় সে ছাপ আছে, আর আছে বিজ্ঞানের খটমটে বিষয়গুলো একইসাথে সহজ এবং নান্দনিক ঢঙে উপস্থাপন করার ক্ষমতা।
পরের ভাগটিতে লেখক বিজ্ঞানের তত্ত্বীয় বিষয় থেকে সরে গিয়ে বৈজ্ঞানিক প্রসেস--অর্থাৎ বিজ্ঞানীরা কীভাবে গোয়েন্দাদের মত তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্যবে���্ষণ করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছান--এসব ব্যাপার নিয়ে গল্প করেছেন। এই অধ্যাওগুলোতে আপনি জানতে পারবেন বিজ্ঞানীরা কীভাবে শিংঅলা গিরগিটির রহস্য ভেদ করলেন, করোনাভাইরাস আদৌ 'মানবসৃষ্ট' কিংবা 'ল্যাব অ্যাক্সিডেন্ট' কিনা, আর কীভাবে বিজ্ঞানীরা ঠিক করলেন 'প্রজাতি'র সংজ্ঞা। এবার আসা যাক তৃতীয় ভাগে, যেটার বিষয়বস্তু বিজ্ঞানের সাথে মানবিক জ্ঞানের অন্যান্য শাখা, যেমন সাহিত্য-দর্শন-ইতিহাসের সম্পর্ক নিয়ে। আপনার বিজ্ঞান ভালো লাগে, আবার সাহিত্য কিংবা ইতিহাস নিয়েও অনেক আগ্রহ? এই অধ্যায়গুলো তাহলে নিঃসন্দেহে আপনি উপভোগ করবেন। লেখকের ভাষাতেই শোনা যাক-
"আপনি বিজ্ঞানের ছাত্র? তবে আপমার জন্য সূক্ষ্মদর্শিতা আর বিশ্লেষণাত্মক মনোভাব- এই দুটো জিনিসের খুব দরকার। এগুলো ভালোমতো রপ্ত করার পূর্বশর্ত হলো ভাব প্রকাশের দক্ষতা। কাজেই সাহিত্য পড়ুন।"
সবমিলিয়ে "এটাই সায়েন্স ২" চমৎকার একটা পপ সায়েন্স বই। কেউ বিজ্ঞানের ছাত্র হোক বা না হোক, লেখকের মুনশিয়ানার কারণ বইটি সবারই পড়তে ভালো লাগবে আশা করা যায়।
"ফিজিক্স নিয়ে বাংলাদেশে যে পরিমাণ পপুলার বই লেখা হয় তার এক ভাগও বায়োলজি নিয়ে হয়না। বিজ্ঞান নিয়ে যেসব কিশোর কিশোরিরা একটু চিন্তা ভাবনা করে, তারাও বায়োলজির ধার খুব একটা ধারেনা। এর বেশ কিছু কারণ আছে । প্রথমত, To quote Sheldon Cooper, Biology is about yucky squishy things. বায়োলজির এর চেয়ে অনেস্ট ডেফিনিশন/ক্রিটিসিজম আমার মনে হয় খুব কমই আছে। এই ইয়াকি স্কুইশি সাইন্স নিয়ে মাতামাতি করাটাই লেইম লাগে অনেকের কাছে। তার উপর আমাদের টেক্সটবুকগুলো মারাত্মক বোরিং, একগাদা তথ্য ঠাসা, কোন ইউনিফাইং কন্টেক্সট নাই। দেখে মনে হবে এই বইটা লিখার উদ্দেশ্যই মানুষকে বায়োলজি ঘৃণা করা শেখানো।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে জীববিজ্ঞান নিয়ে পপুলার লেভেলে যে বই গুলো লেখা হয় তার বেশিরভাগই আসলে জীববিজ্ঞান নিয়ে নয়, বরং ধর্ম নিয়ে। দুই শিবিরের মানুষজন নিজেদের বিলিফ সিস্টেম কে জাস্টিফাই করার জন্য এই জাতীয় বই লিখে, বায়োলজির প্রতি কোন ফ্যাসিনেশন থেকে না। বায়োলজি এখানে শুধুই একটা Weapon. এসব বইয়ের আধিপত্যের কারণেই পোলাপান বিবর্তন আর এর ধর্মীয় ইম্পলিকেশনের চোরাবালির মধ্যে আটকে থেকে যায়। এই ফ্রেমওয়ার্কের বাহিরে বের হয়ে চিন্তা করতে পারেনা। বাংলাদেশের আইডিওলজির ফেরিওয়ালারা বায়োলজি নিয়ে এসব বই লিখে বাংলাদেশে যে দূষিত ডিসকোর্স তৈরি করেছেন, তার মধ্যে হাসান ভাই এর বই গুলো একটা নতুন ধারার সূচনা করছে।
হাসান ভাই অনুজীববিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনা করে এখন পিএইচডি করছেন ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাসে। বিজ্ঞান ও দর্শন নিয়ে তার পড়াশুনার পরিধি বিশাল। উনার বই পড়লেই বুঝতে পারবেন যে, এই বই গুলো লেখা জীববিজ্ঞান এর প্রতি নিখাদ ভালবাসা থেকে। মলেকুলার বায়োলজি থেকে এভলুশন, পাবলিক হেলথ থেকে দর্শন সবকিছু নিয়েই কথা বলেছেন বইটিতে। বইগুলো যদিও মূলত ছোট ছোট বেশকিছু ইন্টারেস্টিং জীববিজ্ঞানের গল্প নিয়ে লেখা, কিন্তু উদ্দেশ্য গল্প বলা না, বরং বিগ পিকচার টা দেখতে শেখানো। বিজ্ঞান নিয়ে কিভাবে চিন্তা করতে হবে, কিভাবে প্রশ্নগুলোকে ফ্রেম করতে হবে এই বেসিক জিনিসগুলো বাংলা ভাষায় এত ভালভাবে কেউ লিখেছে বলে আমার মনে হয়না। চিন্তার শুরুটা এখান থেকে হলেও, আরো ভাল করে জানার জন্য একগাদা রিসোর্স দেওয়া আছে।
বিজ্ঞানের কাঠখোট্টা পড়াশুনার মাঝে সাহিত্য পড়ার কি দরকার এই নিয়ে একটা আস্ত চ্যাপ্টার রেখেছেন হাসান ভাই। আমি পার্সোনালি জানি, উনি এই প্রশ্নটা নিয়ে নিজেও অনেক স্ট্রাগল করেছেন। বাস্তব জীবনেই যখন এত এত জানার জিনিস আছে, এত এত সমস্যা, তাহলে, শুধু শুধু কাল্পনিক চরিত্র, কাহিনি পড়ে সময় নষ্ট করার পেছনে কি যুক্তি থাকতে পারে? লাভটা কি?
এছাড়াও বিজ্ঞানের দর্শন নিয়েও বইয়ের শেষে বেশ বড়সড় আলোচনা আছে। তথাকথিত বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ হওয়া বলতে আসলে কি বোঝায়, বিজ্ঞানের স্কোপ কতটুকু? লিমিটেশন কি? যে প্রশ্নগুলোর জবাব বিজ্ঞান দিতে পারেনা সেই প্রশ্নগুলো নিয়েই বা কিভাবে চিন্তা করা উচিত? এই সব কিছুই খুব অল্প ভাষায় ব্যাখ্যা করা আছে। এবং প্রচুর রিসোর্সের খোঁজ দেওয়া আছে আরো পড়ার জন্য।
Neil DeGrasse Tyson একবার বলেছিলেন, কোন কথা শোনার সাথে সাথেই বিশ্বাস করা যতটা আনসাইন্টিফিক, যাচাই না করে কোন কথা অবিশ্বাস করাটাও ঠিক ততটাই আনসাইন্টিফিক। করোনাভাইরাস এর আউটব্রেক কিভাবে হয় এই নিয়ে বেশ কয়েকটা থিউরি ছিল শুরু থেকেই। কিন্তু সাইন্টিফিক ওয়ার্ল্ড ল্যাব লিক থিউরিকে কোন মতেই সিরিয়াসলি নিতে রাজি ছিলেন না। কারণটা অবভিয়াস। ল্যাব লিক নিয়ে চিল্লাপাল্লা যারা করছিল তারা অনেকেই রেসিস্ট কারণে এইসব থিউরিতে বিশ্বাস করত, অনেকেই ছিল Climate Change Denier. কিন্তু, তার মানে তো এই নয় যে ল্যাব লিক থিউরি ভুল। পরবর্তীতে বেশ কিছু গবেষণায় ল্যাব লিক এর পক্ষে বেশ কিছু শক্ত প্রমাণ আসায় বিজ্ঞানীদের অনেকেই নড়ে চরে বসেন। যদিও এখনো পর্যন্ত এই রহস্যের কোন মীমাংসা হয়নি। এই ল্যাব লিক থিউরি নিয়ে বিশাল আলোচনা আছে বইটিতে। এমন আলোচনা বাংলা ভাষায় এই প্রথম আমার জানামতে।
আমার মনে হয় বইটা স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েদের জন্য খুবই ভাল একটা বই। কিন্তু, যেকোন বয়স বা ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষই এটা পড়ে এঞ্জয় করবেন এবং অনেক কিছু শিখতে পারবেন আমার বিশ্বাস। আশা করি বিজ্ঞান, দর্শন নিয়ে হাসান ভাই সামনে আরো ভাল ভাল বই উপহার দিবেন।"
কোনো লেখকের বিশেষত্ব হল শব্দচয়নে, কারো টুইস্ট প্লেসমেন্ট। শ্যামল ভাইয়ের বিশেষত্ব লেখায় উপমা ব্যবহার করতে পারাতে।
এটাই সায়েন্স ২ঃ স্বপ্নপুরী হাইস্কুল বইটার সাথে ওনার প্রথম বইয়ের বিশাল পার্থক্য রয়েছে৷ আগের বইটা যেখানে আলোচনা করেছিল জনস্বাস্থ্যের নানা বিষয় আর ঘটনা নিয়ে, বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের চতুর আবিষ্কার নিয়ে, সেখানে এই বইতে তিনি সোজা হনহন করে কোষের ভেতরে ঢুকে গিয়েছেন। কোষ নামের মহাজটিল যন্ত্রটার কলকব্জা খুলে বিভিন্ন প্রসেস সহজে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন।
আর ঠিক এখানেই ওনার উপমা প্রয়োগের ব্যাপারটা শুরু। পুরো বইটা, মানে একেবারে পুরো বইটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোষের যাবতীয় জটিল বিষয়গুলোর বর্ণনা করেছেন কোনো টার্মের বা পরিভাষার ব্যবহার ছাড়াই। যার ফলে সেসব পড়তে গিয়ে অযথা কঠিন নাম ধাম মনে রাখার চাইতে মূল বিষয়গুলোতে ফোকাস দেয়াটা সহজ হয়ে গেছে।
বইয়ের শুরুতে লেখক বায়োলজি হেটার্সদের কথা উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, যারা বায়োলজি বিষয়টা নিয়ে পড়তে চায় না, জানতে চায় না, তারা কেন এমনটা অনুভব করে তার একটা কারণ হল অনেকের ধারণা বায়োলজি মানেই অহেতুক মুখস্থবিদ্যা। বায়োলজি বুঝতে হলে একগাদা টার্ম মুখস্ত করতে হয়, ইত্যাদি ইত্যাদি। তো তাদের কথা মাথায় রেখে, বায়োলজির মজাদার বিষয়গুলো তাদের জানানোর হেতুই যে লেখকের এমন উপমা প্রয়োগ তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
পুরো বইটা চারটে ভাগে ভাগ করা। একেকভাগে লেখক একেক টপিকে আলোচনা করেছেন।
প্রথম ভাগঃ কলকব্জায় কোষের ভেতর কী চলে, ডিএনএ প্রোটিন তৈরী ছাড়াও আরো কী কী কাজ করে ইত্যাদি বিষয়গুলো গল্পের ছলে উপস্থাপন করেছেন। এরপরে, তিনি আলোচনা করেছে�� কীভাবে কোষের ভেতরের জিনিসগুলো দেখা হয়। হস্তীর অন্ধদর্শন চ্যাপ্টারের শুরু গল্পটা বেশ ভালো ছিল। আবারো, গল্প না বলে এটাকে আরেকটা উপমা বলা যায়। মূলত আমাদের কোষের মাঝে নতুন কিছু আবিষ্কার হলে বিজ্ঞানীরা কীভাবে সেটা বোঝার চেষ্টা করেন সেই গল্পগুলো বলা।
দ্বিতীয় ভাগঃ তদন্ত
আমার অনেক পছন্দের ভাগ এটা। এটায় চারটা অধ্যায় আছে। বিজ্ঞানীরা আদতে ল্যাবকোট পড়া গোয়েন্দা, আর তাদের গোয়েন্দাগপ্পো নিয়ে লেখা এই অধ্যায়গুলোতে।
কীভাবে বুঝবেন কোনটা হাইপোথিসিস আর কোনটা গালগল্প? কোন জিনিসটা কেন সেভাবেই করে সেটা কীভাবে বের করে? দুটো প্রজাতিকে কীসের ভিত্তিতে আলাদা করা হল? প্রজাতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বিজ্ঞানীদের এত ঘাম ছুটছে কেন?
করোনাভাইরাসকে চেনেন? এটা কোথা থেকে আসল? আৎকা উড়ো কথাগুলো যেসব শোনা যায় যে এটা নাকি চায়নার ল্যাব থেকে ছড়িয়েছিল, সেটার পেছনে তদন্ত কীভাবে হল? আচ্ছা, শুরুতেই বা কেন এমন ধারণা করা হয়েছে যে করোনাভাইরাস প্রাকৃতিক নয়? এসব তদন্তের কাহিনি পড়ার সময় আপনার নিজেকেও গোয়েন্দা মনে করে ফেলতে পারেন৷
তৃতীয় ভাগঃ যাপিত জীবনে লেখক দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান আর কেন বিজ্ঞানের ছাত্র হয়ে সাহিত্য পড়ব তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা আছে। ভাষা সমৃদ্ধির সাথে জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রগতির যে সম্পর্ক তা আমি এই প্রথম জানলাম এখান থেকে। এই চ্যাপ্টারটা বেশ ইন্টারেস্টিং লেগেছে।
চতুর্থ ভাগঃ দর্শন
বিজ্ঞানের মাঝে আবার দর্শন কেন? মূলত, এই চ্যাপ্টারে লেখক দর্শন অধ্যায়ন করা আর চর্চা করার মাঝে পার্থক্য চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন৷ প্রকৃত দর্শন জিনিসটার সাথে বিজ্ঞানের চমতকার মিল দেখিয়েছেন। অন্তত বিশ্লেষণাত্নক দর্শনের ক্ষেত্রে কীভাবে আমরা যাচাই করব কোন তত্ত্ব ঠিক, কোনটা ভুল এগুলোর মাঝে যাচাই করার উপায় বাতলে দিয়েছেন।
পুরো বইটা আমার কাছে উপভোগ্য লেগেছে। তবে কোনো বই স্রেফ উপভোগ্য হওয়ার পাশাপাশি যদি শিক্ষণীয়ও হয় সেটা সোনায় সোহাগা। বই থেকে শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হল,
• জীববিজ্ঞান কঠিন লাগতে পারে যদি আমাদেরকে খুটিনাটি বিষয়গুলো কেউ সহজে উপস্থাপন না করে দেয়, • বিজ্ঞানীরা তুখোর গোয়েন্দা, তারা যা বলেন হুদাই বলেন না। • জীবনে এত ফেইক নিউজ, ভূয়া তথ্য আর ভুল ব্যাখাদের দর্শন ব্যবহার করে চেনার উপায়। কেন অমুকের ব্যাখা ভুল আবার একই বিষয়ে তমুকের ব্যাখা ঠিক এটা বোঝার উপায়।
আমি বইটা পড়ার চেষ্টা করেছি এমনভাবে যে আমি যে বায়োলজির এবিসিডিও পারি এটা ভুলে যেয়ে। আমি বইটা পড়েছি এমন একজন হিসেবে যার কাছে জীববিজ্ঞান কঠিন। বিষয়টা কল্পনা করা আমার জন্য কঠিন ছিল না যেহেতু জীববিজ্ঞান নিয়ে ক্লাসরুমে একগাদা টিনেজারদের ক্লাস নেয়াই আমার দৈনন্দিন জীবনের একটা বড় অংশ। আমি জানি কী ধরণের প্রশ্ন আসে কোন জিনিসগুলো পড়লে। সে অনুযায়ী, বইটা পড়তে যেয়ে আমার এটাও মনে হয়েছে যে বইটার সবচেয়ে "জটিল" অধ্যায় হল "প্রজাতির সংজ্ঞা"। লেখক যদিও স্বীকার করে নিয়েছেন জীবজগত অনেক উইয়ার্ড আর প্রজাতির সংজ্ঞা দেয়া মোটেও সহজ নয়, এই অধ্যায়ে বাকি অধ্যায়গুলোর তুলনায় লেখনী একটু কঠিন এবং যথেষ্ট সহজবোধ্য নয়। জিন শেয়ারিং ব্যাপারটা আরেকটু ব্যাখা করলে মন্দ হত না।
আরেকটা কথা না বললেই নয়, স্বপ্নপুরী হাইস্কুলের কথাটা বইয়ে মরীচিকার মত ছিল। আমি অনেক হাইপড ছিলাম হয়তোবা এই স্কুল নিয়ে অন্তত পুরো একটা চ্যাপ্টার পাবো, কিন্তু এখানে একটু হতাশ হতে হয়েছে। আরো চেয়েছিলাম।
বইটা আরো বড় হলে মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হত।
বইয়ের প্রচ্ছদ সিম্পলের মধ্যে গর্জিয়াস। স্বপ্নপুরী হাইস্কুল দেখতে অচিন্তনীয় হয়েছে, গল্পের স্কুলটাও দুঃখজনকভাবে একইরকম অচিন্তনীয়।
তো এটাই রিভিউ। ওহ, লেখক যদিওবা বলেছেন এটাই সায়েন্স ১ আর এটাই সায়েন্স ২ দুটো আলাদা বই, একে অপরের সাথে যোগসূত্র নেই, আমি দ্বিমত করছি। ঠাস করে একজায়গায় কলেরার জীবাণুর ক্যামিও রয়েছে।
পড়ুন, জানুন, জানান।
এটাই সায়েন্সঃ স্বপ্নপুরী হাইস্কুল লেখকঃ Hassan Uz Zaman Shamol প্রচ্ছদঃ Joy Deb Nath
বুক রিভিউ: এটাই সায়েন্স : স্বপ্নপুরী হাই স্কুল লেখক: Hassan Uz Zaman Shamol
খবরের কাগজে বিজ্ঞানের খবর পড়তে গেলেই দেখা যায় চটকদার খবর। আর স্কুল কলেজের বিজ্ঞান বই, বিশেষ করে জীববিজ্ঞান বই কেমন খটোমটো, তার অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকেরই আছে। কিন্তু এসবের মধ্যে বিজ্ঞান আসলে ঠিক কী রকম? চটকদার খবরগুলোর পিছনের সত্যটা কী, বা বিজ্ঞানের বইয়ে লিখা কথাগুলোই বা বিজ্ঞানীরা কীভাবে বের করেন? এটাই সায়েন্স : স্বপ্নপুরী হাই স্কুল বইয়ের শুরু এই বিষয়গুলো নিয়েই।
বিজ্ঞানীদের কাজ যে অনেকটা প্রকৃতির নিয়মগুলো খুঁজতে তদন্ত করার মতো, স্কুলের বিজ্ঞান বইয়ের মতো বিজ্ঞানের সব কিছু যে আসলে নৈর্ব্যক্তিক নয়, প্রকৃতিকে বাঁধাধরা নিয়মে বাঁধতে গেলেই ব্যতিক্রম বের হয়ে পড়ে, এই দিকটার আলোচনা আমার নিজের সবচেয়ে ভালো লেগেছে।
শ্যামল ভাইয়ের লেখনী আর হাস্যরসের মধ্যে জীববিজ্ঞানের জটিল জটিল জিনিসগুলো পড়তেও খারাপ লাগবেনা। বিজ্ঞানের বইতে বা বিজ্ঞান বিষয়ক লেখায় জটিল জটিল নাম নিয়ে আসার যে প্রবণতা, তাকে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে গিয়ে গল্পের মতোই ফুটে উঠেছে কোষের ভিতরের ঘটনা। তাই বলে বইটি যে শুধু ছোটদের জন্য, তা নয়। এই গল্পের মতো ঘটনাগুলোর পিছনের রিসার্চ পেপারগুলোও উল্লেখ করা আছে প্রতিটা অধ্যায়ের শেষে, কেউ আগ্রহী হয়ে আরো জানতে চাইলে সেটাও বেশ সহজ।
বইটি শুধু বিজ্ঞান নিয়ে নয়, শেষে সাহিত্য আর দর্শনের সাথে বিজ্ঞানের সম্পর্কে টেনে নিয়ে গেছেন শ্যামল ভাই। প্রাচীনকালের বিজ্ঞানীরা কেন কীভাবে চিন্তা করেছিলেন, বা সাহিত্যিকরা কীরকম চিন্তা করেছেন, দর্শনের সাথেই বা বিজ্ঞানের সম্পর্ক কী? এসব প্রশ্ন মাথায় এসে থাকলে বইটা আপনার জন্যই।
আজিব এক যন্ত্র বানিয়েছেন Hassan Uz Zaman Shamol । যন্ত্রের এক দিকে দিয়ে ''I hate Biology' যপ করা পোলাপান ঢুকবে অন্য দিক দিয়ে.....না তারা বদলে গিয়ে 'I love Biology' বলা শুরু করবে তার কোন ভরসা নাই। কারণ তার জন্য মগজ ধোলাই করতে হবে। ভাইয়ার বইটা বরং মগজকে তথা চিন্তাকে বিস্তৃত করবে। যেসব কারনে বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীরা জীববিজ্ঞানের প্রতি বিতৃষ্ণা দেখায়। যেমনঃ এর জটিলতা, রহস্যময়তা... এগুলোই যে তার সৌন্দর্য তাকে সে এপ্রিশিয়েট করতে শুরু করবেন। কোন একটি টপিক সম্বন্ধে লেখক শুধু আলোচনাই করেননি, বরং যদি আরো বিস্তারিত জানতে চান সেই পথও বাতলে দিয়েছেন অধ্যায়ের সাথে সাথে বিভিন্ন রেফারেন্স যোগ করে। সবচাইতে চমৎকার দিক, যেটা আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে তা হল,.... উদাহরণ দিয়ে যদি বলি, যেখানে সাইটোস্কেলেটন নিয়ে বলেছেন সেখানে শুধু এর বেসিক সম্পর্কেই বলেননি। বরং সে বিষয়ে অতিসাম্প্রতিক সময়ে যে গবেষনা হচ্ছে সেসবের ইন্টারেস্টিং দিক নিয়েও জানিয়েছেন। আপনি পাঠক হিসেবে নিজেকে বিগিনার কিংবা অ্যাডভান্সড যা ই ভাবেন না কেন, নতুন অনেক কিছু নিশ্চিত জানবেন। সেই সাথে শ্যামল ভাইয়ের বৈঠকি ঢং এ লেখা পড়তেও বেশ ফুরফুরে লাগে। বইটার কনটেন্ট নিয়ে আসলে কোন অভিযোগ নেই। তবে ছবিগুলো আরেকটু বড় বা রঙিন হলে চমৎকার হত। অ���েক ডিটেইলস আসলে অস্পষ্ট রয়ে গেছে সাদা কালোতে। অনুরোধ করব ইলেকট্রনিক মাধ্যমে অথবা রঙ্গিন এডিশনের কথা ভেবে দেখতে।