জানিনা আত্মজীবনীমূলক বই কেন আমাকে এত বেশি টানে। যেখানে মানুষ আজ থেকে ১০০ বছর পর কি হবে সেটা নিয়ে ভাবছে ; সেখানে কিনা নানান মনীষীদের অতীতের কথা গুলো পড়তেই বেশি ভালো লাগে।
যে মানুষটার কলাম পড়তে ভালো লাগে ; তিনি কিভাবে দিন পার করছেন? তার বন্ধুবান্ধবই বা কারা? কেমন কেটেছে উনার শৈশব? গ্রাম বাংলার সবুজ শ্যামল প্রকৃতির অতীত ইতিহাস টুকু আমাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে।
গল্প উপন্যাস কবিতাতে হয়তো এই দৃশ্যগুলো ফুটে ওঠে কিন্তু সেখানে কেন জানি বাস্তবের চেয়ে কল্পনা প্রাধান্য পায়। কেমন জানি একটা মেকি মেকি ভাব । কিন্তু আত্মজীবনী পড়লেই মনে হয় মানুষটাকে সামনাসামনি দেখতে পাচ্ছি । ওতে একবিন্দুও খাঁদ নেই।
তবে এটাও ঠিক যে, প্রিয়জনের কাছ থেকে গল্প শুনতে যতটা ভালো লাগে ; অন্যদেরটা অতটা টানে না। প্রত্যেক পাঠকদের কিছু দুর্বল জায়গা থাকে। শরৎবাবু যেমনটা বলেছেন,
"এই পৃথিবীতে এক সম্প্রদায়ের লোক আছে,তাহারা যেন খড়ের আগুন। দপ করিয়া জ্বলিয়া উঠিতেও পারে,আবার খপ্ করিয়া নিবিয়া যাইতেও পারে। তাহাদের পিছনে সদা সর্বদা একজন লোক থাকা প্রয়োজন- যেন আবশ্যক অনুসারে খড় যোগাইয়া দেয়"।
ডঃ আকবর আলি খান আমার কাছে তেমনই একজন। উনার প্রত্যেকটা বই গোগ্রাসে গিলেছি এবং বিভিন্ন প্লাটফর্মে সেগুলো নিয়ে আলোচনাও করেছি। পড়ে ফেললাম উনার আত্মজীবনীমূলক বই 'পুরানো সেই দিনের কথা' ।
১।
তিন টি দায়বদ্ধতার কারণে তিনি আত্মজীবনীটি লিখেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। এক. উনার মেয়েকে কথা দিয়েছিলেন নিজের পূর্বপুরুষদের ইতিবৃত্ত তিনি লিখবেন এবং দুই. ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ থেকে তিনি পদত্যাগ করলে তিনি সাংবাদিকদের এই পদত্যাগের কারণ বিশদে লিপিবদ্ধ করবেন - এই ওয়াদা করেছিলেন।
তিন. আমলাতন্ত্রে যারা ভবিষ্যতে যোগ দেবেন তারা যেন একজন আমলার সফলতা বা ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে পারেন।
জন্ম থেকে ২৯ বছর জীবনকালের ঘটনা স্থান পেয়েছে এই খন্ডে।
তবে উনার বর্ণাঢ্য জীবনের বাকি অংশের কথা প্রকাশিত হবে উনার মৃত্যুর পর, দ্বিতীয় খন্ডে । কারণ এই অংশে অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্পর্শকাতর বিষয়ে আলাপ থাকবে।
২।
বইয়ের প্রথম অংশে তাঁর শৈশবের নবীনগরে বেড়ে ওঠা, তাঁর পরিবার এবং বংশপরিচয় রয়েছে৷ কিভাবে উনার পূর্বপুরুষরা সনাতন ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন ;সেটার বিশাল ঐতিহাসিক বর্ণনা । উনার বংশের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে আলাদা আলাদা বিস্তারিত আলাপ করেছেন। ঘটনাচক্রে কিভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন এবং উনার পিএইচডি চলাকালীন সময়ে গাণিতিক সমস্যার সমাধানে উনার স্ত্রীর কাছ থেকে কীভাবে সাপোর্ট পেয়েছেন সেটা আন্তরিকভাবে বর্ণনা করেছেন। স্ত্রীর একান্ত ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে ধূমপান ছেড়ে দিয়েছেন ,সেটাও কৃতজ্ঞতা ভরে স্মরণ করেছেন । ঈদের দিনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ছেলে তারেক রহমানের উপহার উনার স্ত্রী ফিরিয়ে দিয়েছেন এরকম নানান বর্ণনায় স্ত্রীর ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তুলেছেন। বিশেষ করে, কন্যা নেহেরিন খান সম্পর্কিত বর্ণনা পড়ে পাঠক হিসেবে আমি নিজেও আবেগাপ্লুত হয়েছি।
এই অংশে প্রায় ৭০ পৃষ্ঠা অযাচিত খরচ করেছেন বলেই মনে হয়। তবে ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স এবং মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়া আকবর আলি খান এর ইতিহাস সংক্রান্ত বর্ণনায় মুন্সিয়ানা দেখতে পাওয়া যায়।
৩।
শৈশব, কৈশোর এবং শিক্ষাজীবন নিয়ে আলোচনা করেছেন । বইপড়ুয়া আকবর আলি খান কীভাবে নানা প্রচেষ্টায় বই সংগ্রহ করতেন ; সেই বর্ণনাটুকু আপনাদের ভালো লাগবে।
কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবন সংক্রান্ত বর্ণনায় তৎকালীন সময়ের ছাত্র রাজনীতি , শিক্ষার মান ইত্যাদি আলোকপাত করেছেন । উনার সময়কার শিক্ষকদেরকে নিয়েও ছোট ছোট বর্ণনা রয়েছে। কিভাবে ছাত্র ছাত্র ইউনিয়ন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন সেটিও স্বীকার করেছেন । অনার্স-মাস্টার্স দু'জায়গাতেই রেকর্ড সংখ্যক মার্কস নিয়ে, প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে হয়েও শিক্ষক হতে না পারার আক্ষেপ করেছেন । তৎকালীন সময়ে শিক্ষক নিয়োগের এই ফাঁকফোকরগুলো আলোচনায় এসেছে।
৪।
পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় সারা পাকিস্তানে ১৬ তম এবং বাঙ্গালীদের মধ্যে ৫ম স্থান অধিকার করার মাধ্যমে সিএসপি হিসেবে যোগ দিলেন।। উনার সাথে যারা সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়েছেন তাদের আলোচনা এসেছে।
বইয়ের বাকি অংশ খুবই রোমাঞ্চকর এবং যারা আমলাতন্ত্রে যোগ দিতে চান জন্য অনুপ্রেরণার। কর্মকর্তা হিসেবে কিভাবে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করেছে ; ক্ষেত্রবিশেষে অনেককে শাস্তি দিয়েছেন ,অপরাধ না করেও বিপদে পড়েছেন , আমলাতন্ত্রের ফাঁকফোকর গুলো কোন জায়গায় ; সেগুলো অভিজ্ঞতার আলোকে বর্ণনা করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় । আকবর আলি খান হবিগঞ্জের এসডিও ছিলেন । এ সময় তাঁর ভূমিকা কেমন হবে ?
অখন্ড পাকিস্তান কায়েম করার যে শপথ নিয়ে পাবলিক সার্ভিস এ যোগ দিয়েছেন সেটি অক্ষুন্ন রাখবেন নাকি স্বাধীনতার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বেন? স্বাধীন দেশে উনার ভূমিকা টা কি হবে? কেমন ছিল তখনকার প্রশাসন?
জানতে হলে পড়তে হবে বইটি।
শেষ কথা-
সব বইয়ের কিছু দুর্বলতা থাকে এটিও ব্যাতিক্রম নয়। ব্রাক্ষণবাড়িয়ার নবীনগরের রসুল্লাবাদ খাঁ বাড়ির দীর্ঘ ইতিহাস আপনাকে বিরক্ত করতে পারে । আবার উনার সাথে যোগ দেওয়া সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের বিস্তারিত বিবরণ কিংবা মুক্তিযুদ্ধে কোন সেক্টরে কে যুদ্ধ করেছে ; এরকম সাধারণ বর্ণনাগুলো পাঠকদের ভালো লাগবে না ।
কিছু কিছু জায়গায় উনার অন্য বইগুলোর রিপিটেশন রয়েছে , যেটা হয়তো ওনার মনের অজান্তেই হয়েছে । উনার পূর্বপুরুষ কিভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে , এরকম বর্ণনা উনার 'বাংলায় ইসলাম প্রচারে সাফল্য' বইটি থেকেই পড়েছিলাম। কিংবা জন্মদিন সংক্রান্তঃ চুটকিগুলো 'আজব জবর অর্থনীতি ' বইটি পেয়েছিলাম। এরকম একজন ব্যক্তির আত্মজীবনীর প্রচ্ছদ এতটা বাজে হতে পারে! দুঃখজনক।
যেহেতু উনি শারীরিকভাবে লিখতে অক্ষম ,অন্য একজন নির্দেশনা অনুযায়ী টাইপরাইটিং করছে ; তাই কিছুটা আকবর আলী খানের লেখার রম্য ঘরানা অনুপস্থিত।
সর্বোপরি বইটি আমার দারুন লেগেছে এবং আগ্রহী পাঠকদের তৃষ্ণা মেটাবে বলেই বিশ্বাস করি।