ভ্রমণ-গল্পের উপস্থাপনায় মঈনুস সুলতান অদ্বিতীয়। তাঁর এই ভ্রমণ-উপাখ্যান যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের একটি শহর সংলগ্ন প্রকৃতি-নিবিড় উপবনের। আদিবাসীদের নৃত্যগীতের মাইফিলের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনায় লেখক উপস্থাপন করেন আমেরিকার আদিবাসী কৌমের সাংস্কৃতিক জীবনের চিত্রাবলি। তাদের ঐতিহ্যসংক্রান্ত তথ্যের সাথে যুক্ত হয়েছে এক কালে আদিবাসীদের জোরপূর্বক বাস্তুহারা করে নির্বাসনে পাঠানোর মর্মস্পর্শী বিবরণ। ব্যতিক্রমধর্মী জীবনযাপনে অভ্যস্ত কিছু চরিত্রও এ আখ্যানে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।
মঈনুস সুলতানের জন্ম ১৯৫৬ সালে, সিলেট জেলার ফুলবাড়ী গ্রামে। তাঁর পৈতৃক নিবাস মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ে পিএইচডি। খণ্ডকালীন অধ্যাপক ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস এবং স্কুল অব হিউম্যান সার্ভিসেসের। ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকার ভিজিটিং স্কলার। শিক্ষকতা, গবেষণা ও কনসালট্যান্সির কাজে বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন। তাঁর ‘জিম্বাবুয়ে : বোবা পাথর সালানিনি’ গ্রন্থটি প্রথম আলো বর্ষসেরা বই হিসেবে পুরস্কৃত হয়। ২০১৪ সালে ভ্রমণসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য পান বাংলা একাডেমি পুরস্কার। প্রাচীন মুদ্রা, সূচিশিল্প, পাণ্ডুলিপি, ফসিল ও পুরোনো মানচিত্র সংগ্রহের নেশা আছে মঈনুস সুলতানের।
টিপিক্যাল মঈনুস সুলতান কিন্তু এই বইয়ে সুলতান ব্যক্তিগত কিছু গভীর অনুভব লুকোতে পারেননি।যাযাবর হয়ে ঘুরে বেড়ানো মানুষগুলোর হ্নদয় ও তাহলে কোথাও নিজ ছায়া শিকড়স্বরুপ রোপন করে আসে!
নেটিভ আমেরিকানদের দুর্দশার কথা পড়ে মন ভার হয়েছে। আবার নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার্থে তাদের লড়াই মনে শ্রদ্ধার সঞ্চার ঘটিয়েছে। প্রকৃতির প্রতি এ আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোর আনুগত্যের সঙ্গে একাত্ম না হয়ে পারিনি। পড়তে পড়তে ভেবেছি আমাদের নিজেদের কথা। মনে পড়ে কদিন আগের পহেলা বৈশাখ, মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে ঘটা কাণ্ডকারখানা। আর অবাক হই। ফ্লোরিডার মিউজিক মজমায় আগত অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার সাংস্কৃতিক পরিবেষ্টনে বেড়ে ওঠা সত্ত্বেও শুধুমাত্র পূর্বপুরুষদের সুত্র ধরে এসব অনুষ্ঠানসহ আদিবাসীদের উপর চালানো নির্মমতার প্রতিবাদে হরহামেশা সামিল হচ্ছেন। আর এদিকে আমাদের নিজেদের কওমের লোকজনই নিজেদের সংস্কৃতি ধ্বংসের পাঁয়তারা করছে। কম দুর্ভাগা তো নই আমরাও!
মঈনুস সুলতানের এ বইটির স্বাদ তাঁর অন্যান্য বই থেকে কিছুটা ভিন্ন। এর কারণ বোধ হয়েছে দুটি। এক, এতে বিদেশি শব্দের ব্যবহার তুলনামূলক কম। দুই, মঈনুস সুলতানের স্বভাবসিদ্ধ রসবোধও ছিল খানিকটা কম। তবে এসব অবশ্যই কোনো নেতিবাচক দিক নয়। মিউজিক মাইফেলের যে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা লেখক দিয়েছেন, তাতে মনে হচ্ছিল, উদ্যানের ঘাসে গতর এলিয়ে আমি নিজেই যেন লাইভ উপভোগ করছি। স্বাভাবিকভাবেই নেটিভ আমেরিকান মিউজিক সম্পর্কে জানার কৌতুহল হচ্ছিল। বই শেষ করেই ইউটিউবে ঢুকে ‘পেইন্টেড র্যাবন’ নামের এক ব্যান্ডের পারফরম্যান্স দেখলাম। বেশ ভালো লেগেছে। বয়স্ক হিপি ডাফি মিলগ্রামের মতো একখানা ক্যাম্পারভ্যান আর তাতে চড়ে বেড়ানোরও বড় শখ জেগেছে।
খারাপ লেগেছে মঈনুস সুলতানের কিছু শারীরিক অসুন্থতার কথা জেনে। আশা করছি, তিনি এখন সুস্থ আছেন। তাঁর সুস্থ থাকা এবং স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে বেড়ানো অতীব জরুরি আমাদের জন্য। যেহেতু আমাদের ভ্রমণসাহিত্য তিনি বলতে গেলে একা কাঁধেই বয়ে চলছেন।
লেখক যুক্তরাজ্যোর যে অঙ্গরাজ্যল বাস করেন তার পাশের অঙ্গরাজ্য ফ্লোরিডায় আদিবাসীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত হওয়া এক মিউজিক মজমায় যোগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে পুরো ভ্রমণ কাহিনী। আজে বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার কথা। নানান ধরনের মানুষের সাথে মোলাকাত, তাদের কাছ থেকে শোনা নানা ধরনের অভিজ্ঞতার কথাও লিপিবদ্ধ হয়েছে। মিউজিক মজমাতে জমজমাট গানের আসরের সাথে সাথে আছে শেতাঙ্গ কতৃক আদিবাসীদের নিপিড়নের কথা। আমেরিকার মতো সভ্য দেশে যখন এসব হয় তখন নিশ্চয়ই তাবৎ দুনিয়া জুড়ে আদিবাসীদের স্বীকার করতে হয় নানা ধরণের অত্যাচারের। তাদের ভূমি থেকে তাদের উচ্ছেদ করার মতো হৃদয়বিদারক ঘটনা মনকে কাঁপিয়ে দিয়ে যায়। লেখকের পুরানো বন্ধুর সাথে আবার নতুন করে দেখা হওয়া, তার সাথে সময় কাটানো সহ পুরো অনুষ্টান জুড়ে ঘটে যাওয়া, দেখে যাওয়া সব অনুভূতির প্রকাশ এই বই জুড়ে।