একটা বিন্দু থেকে শুরু হয়ে নির্ধারিত চক্রাকার পথ ঘুরে আরেকটা বিন্দুতে এসে ফুরিয়ে গেলো- এই তো জীবন! নিয়তির কম্পাস কখনো মসৃণভাবে ঘুরছে, আবার কখনও থমকে যাচ্ছে অনিশ্চয়তায়। জীবনের বৃত্তান দিতে গিয়ে তাই দুই শব্দে বলা যায়- বৃত্তবন্দী জীবন। সেই বৃত্তের চারপাশ জুড়ে কত অজস্র রং-রূপ। লাল-নীল-হলুদের পাশাপাশি ধূসর-কালো। কেন্দ্রবিন্দুতে মহাকাল নীরব, নিস্তব্ধ পরিদর্শক। এক নিঃসীম বৃত্তের গল্পে আপনাকে স্বাগত।
কৌশিক জামান একজন অপদার্থ। ইংরেজিতে যাকে বলে- গুড ফর নাথিং। জীবনের প্রতিটা পদক্ষেপে পরাজিত হতে হতে হাল ছেড়ে দেয়া একজন ব্যক্তি। কিছু মানুষ আছে না এক ভুল বার বার করে? তিনিও ঐ কিসিমের।
তাই নিজেকে বন্দী করে রেখেছেন একশ স্কয়ার ফিটের একটা রুমে। রুম ভর্তি শুধু বই আর বই। বই পড়তে পড়তে তার মনে হয়েছে কিছু একটা লিখে ফেলা দরকার। এবং অখাদ্য ছাইপাঁশ কিছু আবর্জনা লিখেছেন যেগুলো প্রকাশক একরকম চাপে পড়ে ছাপিয়ে এখন আফসোস করছেন।
ডিপ্রেশনের কোনো সম্পূর্ণ সংজ্ঞা নেই, তবে অসংখ্য উদাহরণ আছে। আমি জীবনে এমন মানুষ দেখিনি যার কখনও ডিপ্রেশন ছিল না। কিন্তু অসুখটা প্রচণ্ড পরিচিত হলেও, এর কারণ থেকে শুরু করে লক্ষণ পর্যন্ত সবই রহস্য আর বিভ্রান্তিতে ঢাকা। শুধু একটা বিষয়ে সন্দেহ নেই: ডিপ্রেশন মানে একাকীত্ব। জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করা, সবকিছু থেকে একটা সীমাহীন দূরত্ব অনুভব করা।
অ্যান্ড্রিয়া গিবসনের কবিতায় একটা লাইন আছে এমন: “শুনেছি, মাঝে মাঝে ক্ষত সারানোর একটাই উপায় থাকে—বারবার, বারবার, বারবার নিজেকে মনে করিয়ে দিতে হয়, যে আমার মতো অন্য অনেকেই এই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে নিজের বুকে।” হয়তো ডিপ্রেশনের একাকীত্ব কাটানোর এই একটাই উপায়। একাকীত্ব দিয়ে একটা সেতু গড়া, যে সেতুর নাম আর্ট, যে সেতুর নাম সাহিত্য, যে সেতু একাকীত্বকে অন্যের সাথে সংযোগ তৈরি করার একটা পথে রূপান্তরিত করে। কৌশিক জামানের লেখা ‘বৃত্তের চারপাশে’ তেমন এক সেতু। এখানে লেখকের ব্যক্তিগত জীবনের বিষণ্নতার অভিজ্ঞতা, সেই অভিজ্ঞতার শুরু এবং প্রভাব, আর একজন বিষণ্ন মানুষের চোখে পৃথিবী কেমন—এই বিষয়গুলো উঠে এসেছে। ছোট্ট বই হলেও গল্পটা পরিসরে অনেক বড়ো। একজন মানুষের জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো ধরা দিয়েছে পরিষ্কার লেখনীতে।
যা ভালো লেগেছে:
বাংলাদেশের সাহিত্যিকদের মধ্যে একটা রীতি দেখি আজকাল, যেটা আমার বেশ বিরক্ত লাগে। এখনকার ‘মূলধারার সাহিত্যিক’ যারা, তারা সেসব বিষয়ে গল্প লেখেন যেগুলো নিয়ে ‘লেখা উচিৎ’। তাই যেসব বিষয়ে তাদের ধারণা সেকেন্ডহ্যান্ড, যেগুলো নিয়ে প্রত্যক্ষ কোনো অভিজ্ঞতা নেই, সেসব নিয়ে মোটা দাগের গল্প লেখা হয় বেশি। যে রাজনীতি বা হাসপাতাল ব্যবস্থা বা ব্যবসার সাথে কোনোদিন জড়িত ছিল না, সে খবরের কাগজ আর ফেসবুক স্ট্যাটাস পড়ে কাঁচা রূপকের মোড়কে গরম ইস্যুর গল্প লেখে। দেশভাগের গল্প যে লেখে, সে সময় তার বাবারও হয়তো জন্ম হয়নি।
‘বৃত্তের চারপাশে’-কে এ ধরনের লেখার বিরুদ্ধে একটা স্টেটমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করা যায়। গভীর ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা এই বই। কখনও নিজস্ব অভিজ্ঞতার বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করে না। ‘জনগণের’ লেখা হবার চেষ্টা করে না। কিন্তু তাতে একদমই মনে হয় না যে লেখাটা অন্য কারও জন্য নয়। লেখকের সততা আর ভালনারেলিবিটি খুব সহজেই পাঠক বা পাঠিকাকে উপন্যাসের ভেতর টেনে নিয়ে যায়। কোনো ভণিতা নেই এখানে, ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হওয়ার কোনো জোর নেই, শুধু আছে অনাড়ম্বর বর্ণনা। কাম্যু বলেছিলেন আধুনিক সাহিত্যে, অস্তিত্ববাদী সাহিত্যে পৃথিবীর অ্যাবসার্ডিটির কোনো ব্যাখ্যা থাকা উচিৎ নয়। কারণ দর্শানো উচিৎ নয়। শুধু যা নিজে ভাবছি, যেসবের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি—সেসবের নিখাদ বর্ণনা হচ্ছে সৎ সাহিত্য তৈরি করার একমাত্র পন্থা। Just describe, don’t explain. সেদিক দিয়েও ‘বৃত্তের চারপাশে’-কে সফল বলবো।
এ ধরনের সম্পূর্ণ সততার জন্য যথেষ্ট সাহস লাগে। বিশেষ করে লেখার প্রসঙ্গ যখন এমন, যা নিয়ে লেখককে সারাজীবন কথা শুনতে হয়েছে, তখন অতিরিক্ত সাহস প্রয়োজন। ‘বৃত্তের চারপাশে’-জুড়ে এমন সাহস দেখা যায়। কোনো রাখঢাকের চেষ্টা করা হয়নি, আবার নিজেকে ভিকটিম সাজিয়ে পরিস্থিতি বা অন্যদের ওপর দোষ চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। শুধু লেখকের কাছে ডিপ্রেশন কোন রূপ ধরে এসেছে, কোথায় তার উৎপত্তি, আর কেন তার কোনো শেষ নেই—খতিয়ে দেখা হয়েছে এই বিষয়গুলো।
কৌশিক জামান হারুকি মুরাকামির ভক্ত হিসেবে পরিচিত। গভীর ভক্তি মাঝে মাঝে কাঁচা লেখার জন্ম দেয়—আমাদের দেশের অগণিত হুমায়ূন ভক্ত লেখকদের দিকে তাকালে যা বোঝা কঠিন নয়। কিন্তু কৌশিক জামান এই ফাঁদে পা দেননি বলে মনে হয়েছে আমার। মুরাকামির কোনো পরিচিত সিগনেচার তার লেখায় লক্ষ করা যায় না। যদি প্রিয় লেখকের কোনোকিছু তিনি নিয়ে থাকেন, তা হচ্ছে একাকীত্বের আবহ, সহজ ভাষায় একটানা গল্প বলে যাওয়ার দক্ষতা, আর জ্যাজের মতো গল্পের ফ্লো বিভিন্ন দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা।
আর শেষ একটা ব্যাপার: লেখক নিজের তারুণ্যের যে সময়ের বর্ণনা দিয়েছেন, আমার তারুণ্য তেমন পরিবেশেই কেটেছে। আন্ডারগ্রাউন্ড মিউজিক সিন, বাংলাদেশের রকস্টার—এসব নিয়ে আমার প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল। তাই লেখার এই অংশটাও বেশ ভালো লেগেছে।
যা ভালো লাগেনি: উপন্যাসে তাড়াহুড়োর একটা ছাপ লক্ষ করা যায়। তবে এই তাড়াহুড়ো লেখায় নয়, গল্প সাজানোতে। আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে আরেকটু সময় নিয়ে বইটা লেখা দরকার ছিল। একবার লিখে তারপর মাথায় কিছুদিন গল্প থিতু হতে দিলে লেখক রিরাইটিং-এর সময় বুঝতে পারতেন কাঠামোতে কোন পরিবর্তনগুলো দরকার। যেমন কিছু জায়গায় আরেকটু সময় দেওয়া দরকার ছিল—একটা গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর মাত্র এক-দুই পৃষ্ঠায় তার প্রভাবের কথা পড়লে মন ভরে না। বেশ অনেকবার চেষ্টার পর লেখক দুটো সফল ইভেন্ট করতে সক্ষম হন। সেই ইভেন্টগুলো করতে যেয়ে কী কী বাধাবিপত্তি হয়েছিল, সাফল্যের কারণগুলো কী ছিল—এগুলো জানতে বেশ আগ্রহ হচ্ছিল, কিন্তু লেখায় যথেষ্ট বিস্তৃত ভাবে এগুলো আসেনি। আর তিনি যে চিরকূটগুলোর কথা বলেছেন, সেগুলোর একটা অন্তত বইয়ে রাখলে ভালো হতো।
সব মিলিয়ে বইটা চমৎকার লেগেছে। দুই বসায় শেষ করেছি, যেখানে আমার একটা ছোটোগল্প পড়তে আজকাল এক সপ্তাহ লাগে। যারা জীবনে কোনো একবার বিষণ্নতায় ভুগেছেন, তাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য। হয়তো এখান থেকেই ক্ষত সারানোর সূচনা হবে।
অকপটে নিজের জীবনকে তুলে ধরা সহজ কাজ নয়। এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে প্রথমবার যখন নামকরা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাইনি, ডিপ্রেশনের প্রথম ধাক্কাটা টের পেয়েছিলাম তখন। এরপর জীবনে আরও অনেকভাবে ডিপ্রেশন এসেছে। এগুলো নিয়েই আমরা মুখ বুজে চলি। কৌশিকের লেখার হাত ভালো। খুব অল্প কথায় অনেক কিছু বলেছে। এই ভাষায় যদি আরও চারশো পাতাও লিখত, পড়তে অসুবিধা হতো না।
বৃত্তের চারপাশে' আদতে খুব সাদামাটা, ছোট্ট একটা বই। পড়তে গিয়ে মেমোয়্যার/ কামিং অফ এজ/রোমান্টিক ফিকশন - অনেক কিছুই মনে হতে পারে। তবে সবকিছিকে ছাপিয়ে এই বইটার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে 'বিষণ্ণতার ছাপ।' পড়তে গিয়ে বারবার মনে হয়, পিংক ফ্লয়েডের 'কমফোর্টেবলি নাম্ব' শীর্ষক এক জগতে ঢুকে গেছি। চারপাশের দেয়াল চেপে আসছে, আষ্টেপৃষ্ঠে আটকে ফেলতে চাইছে ভীষণভাবে। এই যে মাথার ভেতর সূক্ষ্ম যন্ত্রণার অনুভূতিগুলোকে নতুন করে অনুভব করা কিংবা খুব সাবধানে এদিক-সেদিক তাকিয়ে বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দেয়া - এই দু:খ বিলাসকে এত সহজে উপভোগ করানো চাট্টিখানি কথা নয়!
একটা বিন্দু থেকে শুরু হয়ে নির্ধারিত চক্রাকার পথ ঘুরে ���রেকটা বিন্দুতে এসে ফুরিয়ে গেলো - এই তো জীবন! নিয়তির কম্পাস কখনও মসৃণভাবে ঘুরছে, আবার কখনও থমকে যাচ্ছে অনিশ্চয়তায়। জীবনের বৃত্তান্ত দিতে গিয়ে তাই দুই শব্দে বলা যায় 'বৃত্তবন্দী জীবন।' সেই বৃত্তের চারপাশ জুড়ে কত অজস্র রঙ-রূপ। লাল-নীল-হলুদের পাশাপাশি ধূসর-কালো। কেন্দ্রবিন্দুতে মহাকাল নীরব, নিস্তব্ধ পরিদর্শক। এক নি:সীম বৃত্তের গল্পের জগতে কৌশিক জামান পাঠককে ঘুরিয়ে এনেছেন নিদারুণ দক্ষতায়।
কৌশিক জামানের সরল গদ্যে লিখিত উপাখ্যানের অন্তর্গত বিষাদ পাঠ শেষে পাঠককে ঘিরে রাখে দীর্ঘসময়। 'বৃত্তের চারপাশে'র প্রধান গুণ হচ্ছে এর নিরাভরণ, নিটোল ভাষা।ঘটনার বর্ণনায় কোন জোরপ্রদান নেই।প্রাঞ্জলতার সাথে গল্প এগিয়েছে।গল্প যে খুব আহামরি চমকপ্রদ এমন নয়; সাদামাটা জীবনের নিভৃতে যেসব ট্র্যাজেডি প্রতিনিয়ত নৈঃশব্দে ঘটে যায়।স্তিমিত জীবনের এইসব আটপৌরে গল্প আমাদের খুব চেনা বলে, উপন্যাসটির সাথে পাঠক রিলেট করতে পারেন নিজেকে।হয়তো পাঠক নিজেও এমন কোন এক গল্পের বৃত্তের চারপাশে ঘুরে মরছেন।
উপন্যাসটির ডিটেইলিংয়ে আরেকটু জোর দিলে ভালো হতো। ক্লাইম্যাক্সে যাবার আগে গল্পের খুঁটিনাটি অনেক কিছুই জানতে ইচ্ছে করছিলো যা লেখক এড়িয়ে গেছেন। লেখক চাইলে পুরো কাঠামো টি আরো এফেক্টিভলি ফুটিয়ে তুলতে পারতেন। হয়তো করেননি গল্পটির র'নেস বজায় রাখার জন্য। যাইহোক, শীতের বিকেলে বিষাদগ্রস্ত হতে চাইলে বইটি হাতে নিয়ে বসতে পারেন পাঠক-বৃন্দরা।
মাত্রই বইটা শেষ করলাম, একটা সহজ সাদামাটা জীবনের বিষণ্নতার গল্প। এসএসসির রেজাল্ট থেকে লেখক গল্পটা শুরু করেছেন, রেজাল্ট খারাপ হওয়ার কারণে তখন বিষণ্নতায় চলে যান, এবং সেই থেকে একটা অন্ধকার গর্তের সূচনা হয় তার মধ্যে, যে গর্ত টা কখনও পূরন করা সম্ভব হয় নি, বছরের পর বছর পার করে যখন সে গর্তের কথা ভুলেই গিয়েছিলেন তখন একটা এক্সিডেন্ট এসে আবার গর্ত টাকে চোখের সামনে তুলে ধরে আরও গভীর ভাবে। কিন্তু তারপর কী হয় সেটা হয়তো আমাদের উপরই ছেড়ে দিয়েছে লেখক। শেষটা কেমন যেন হুট করেই। আমার বৃত্তের চারপাশে বই কেনা থেকে শুরু করে শেষ করা সবটাই কেমন অদ্ভুত লাগছে। রিভিউ দেখে লোভ লেগে গেলো, কিনতে গেলাম। গিয়ে দেখি এই এত্তো ছোট সুন্দর কিউট একখান বই। বন্ধুত্বের রঙের বই (হলুদ বন্ধুত্বের রং, লেখক বলেছেন ) কিনে এনে বাসায় বসে এক কাপ চা নিয়ে পড়তে শুরু করলাম, লেখকের বিষণ্নতার সাথে মিল পাওয়ায় আমিও না চাইতেই চলে গেলাম আমার অতীতে। টাইম ট্রাভেল করে এসএসসির রেজাল্ট এর সময়ে চলে গেলাম, কেন গেলাম জানিনা, লেখকের কিছু কথার সাথে মিলে গেল জন্যই হয়তো চলে গিয়েছি। সেদিন আমার রেজাল্ট এসেছিল। আমাদের সমাজে রেজাল্ট বলতেই এপ্লাস গোল্ডেন যার আমার কোনোটাই আসে নি, এ পেয়েছিলাম। কীভাবে বাসায় জানিয়েছিলাম খেয়াল নেই, আত্মীয়রা ফোন দিয়ে ওমুকের গোল্ডেন তমুকের প্লাস ইত্যাদি চালিয়ে যাচ্ছিল। আমিও কান্না করছিলাম, মন খারাপ ছিল সবার ই, কিন্তু বাসা থেকে কেউ একটা কথাও শুনায় নি আমাকে, আব্বু কি বলবে সে ভয় তো ছিলই তার থেকে বেশি ছিল নিজে নিজে কষ্ট পাওয়া৷ কিন্তু সেদিন আব্বু কিচ্ছু বলে নি, আম্মুও কিছুই বলে নি, কোনো শব্দ হয় নি রেজাল্ট নিয়ে। যেন কিছুই না। কেও কিছু বলছে না তবুও আমি নিজেই নিজেকে টেনে ডিপ্রেশনের গর্তে নামাচ্ছি, মাথার মধ্যে আমি কিছু না, আমাকে দিয়ে কিছু হবে না আমার সব শেষ হয়ে গেল এসব টানতে টানতে এতো গভীর ডিপ্রেশনে নিয়ে চলে গিয়েছিলাম যে তার ফল আজও ভোগ করতে হয়। হয়তো সারাজীবন ভোগ করব। কিন্তু মুহূর্ত গুলো তো মনে পরে না, ভুলি নি তবে মনেও পরে না সেই মুহূর্ত গুলো আবার মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য লেখককে কি ধন্যবাদ দেওয়া যায়? খারাপ স্মৃতি মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ দেওয়া নিয়মে নেই তবুও লেখক কে ধন্যবাদ । যাই হোক লেখক আরও বৃত্তান্ত বর্ণনা করেছেন,সব কিছুর সাথে নিজের মিল পাই নি, কিন্তু কিছু কিছু বিষয় গভীরভাবে ভাবিয়ে দিয়েছে। লেখক জীবনকে দেখিয়েছেন কীভাবে জীবন একটা বিন্দু থেকে ঘুরতে ঘুরতে আবার সেই বিন্দুতেই এসে দাড়ায়।
পড়তে পড়তে একটু পরে পাতা উল্টিয়ে দেখি আর নেই। ওমা শেষ! এতো তাড়াতাড়ি! বড্ড তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল কি? তারপর কি হয়েছিল?
যে বিন্দু থেকে শুরু হয়েছিল তার চারপাশ ঘুরিয়ে দেখিয়ে আবার সেই বিন্দুতে এনে গল্পের ইতি টেনেছেন বৃত্তের চারপাশের লেখক। খারাপ বলার প্রশ্নই আসে না, আকর্ষণ রয়ে গেল কী হয়েছিল এরপর! এখানে বিষণ্নতার ছাপ এতো বেশি পরিমানে বাস্তব যে দু একটা ঘটনা সকলের সাথেই মিলে যাবে। ভীষণ চমৎকার একটা বই।
"বৃত্তের চারপাশে", একটা বিষন্নতার গল্প। একটা অপূর্ণ সম্পর্কের গল্প। একজন মানুষের জীবনের উত্থান পতনের গল্প।
লেখক কৌশিক জামানের কোন লেখা আমি আগে পড়িনি। এটাই প্রথম। ভালো লেগেছে। সহজ সরল বাংলায় সাবলীল একটা গল্প বলেছেন। গল্প শুরু করে থেমে যাওয়ার কোন উপায় নেই,টান টান গল্প। তবে বড্ড মন খারাপ করা গল্প।
আমি আশা রাখি লেখক এরকম মৌলিক কাজ ভবিষ্যতে আরো করবেন।
একটি উপন্যাস পাঠককে কিভাবে আকৃষ্ট করতে পারে? সহজে গল্প বলার দক্ষতা, মোহনীয় মুগ্ধতা ছড়ানো আবেগের পংক্তিমালা, গল্পের প্লট কিংবা জীবনের সাথে কতটা সংগতিপূর্ণ? কৌশিক জামানের লেখা 'বৃত্তের চারপাশে' কি আছে কি নেই সেই বাহাসে আজকে না। বরং ডিপ্রেশনের এই গল্প কিভাবে আমাদের এক ধরণের শুন্যতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়, কখনো বা দীর্ঘশ্বাসের স্রোতে ভাসিয়ে দেয়, সেটাই ভাববো।
অতঃপর কোনো এক সন্ধ্যায় বৈষ্ণবভোগ্য চায়ের সাথে মনে পড়ে যায় কিছুদিন আগেও নিজের আরোগ্যলাভের আশায় আমিও চেয়েছিলাম এমন কিছু, যা আমায় বাঁচিয়ে তুলতো কোন এক বুক ভাঙ্গা অনুভূতি থেকে। এরপরে কত কাল পেরিয়ে গেলো, আমি নিজেও ভুলে যাই, কিভাবে আমরা বৃত্তের বাইরে যাওয়ার কথা বলে মিথ্যা নাটক করি।
এভাবে রাত কেটে যায়, জমে থাকা অলসতা আর বিলাপহীন একঘেয়ে আলোর নিঃসঙ্গতা পড়ে থাকে চেয়ারের এক পাশে। ফ্যাকাশে রঙের আকাশে ভোর হয়ে যায়, চলে গেলে কেউ ফিরে আসে না। বৃত্তের মধ্যে জীবন চলে যায়, বসন্তের মতো । কোন দীর্ঘ দুঃস্বপ্নের মতো আমাদের অনুভূতিগুলো জমে যায় আর আমরা কেবলই তলিয়ে যাই মানুষহীন জাহাজের মত। অন্যসব জীবনের মতো শীত আসে ধীরে, অনন্তকাল জুড়ে, আমরাও ব্যস্ত হয়ে যাই খড়িমাটি দিয়ে নতুন গল্প রচনা করতে।
কিছু কিছু বই শেষ করার পর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলতে হয়। বৃত্তের চারপাশে বইটাও ওরকম। ছোট্ট একটা বই, কিন্তু হৃদয়ে দাগ কাটার মত। পুরো বইয়েই বিষণ্নতার ছাপ বজায় ছিল, শেষের ধাক্কাটা বের করে এনেছে দীর্ঘনিশ্বাস। কৌশিক ভাইয়ের লেখার ধরনটাও ভালো লাগল। ব্যান্ড মিউজিক, বন্ধুত্ব, প্রেম, সমাজের বিভিন্ন ইস্যু সংক্ষেপে উঠে এসেছে। সবমিলিয়ে মনখারাপ করা একটা বই। তবে আক্ষেপ একটাই, খুবই দ্রুত শেষ হয়ে গেল। এইধরনের বই রয়েসহে পড়তেই বেশি ভালো লাগে, বিষণ্ণতাকে উপভোগ করা যায়। ফলে কাহিনীটা আরেকটু বিস্তারিত হলে ভালো হত। যাইহোক, এরকম আরও লেখা চাই কৌশিক ভাইয়ের থেকে।
নগরীর প্রতিটা কোণায় কোণায় নিগুঢ় শোক, অসহ্য মেলানকলি। এ শোকতাপ কিসের? জানা নেই। কেউ জানতে চায় না? নাকি কেউ জানাতে চায় না?
দৈর্ঘ্যে, প্রস্থে এই এতটুক একটা বইয়ে যে এতখানি ক্রমবর্ধমান বিষন্নতা আর পাহাড়সমান অব্যয় তা আপনি চাইলেও মাপতে পারবেন না। কারণ, বিষন্নতা এক গাঢ় লাল বৃত্ত। যে বৃত্তে একবার প্রবেশ করলে চক্রাকারে ঘুরতে হয়। যে বৃত্তে একবার ডুব দিলে তা আপন করে নেয়। চাইলেও বোধহয় বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। কিংবা আপনি-আমি বেরিয়ে আসতেও চাই না।
মনে হচ্ছিলো, লেখক স্বয়ং আমার সামনে বসে সরলরৈখিক গতিতে তার গল্প বলে যাচ্ছেন। কি সুন্দর সাবলীলভাবে! গল্প গিয়েও ঠেকলো বিশাল এক দীর্ঘশ্বাস দিয়ে। কিন্তু শেষ হচ্ছে অদৃশ্য এক বৃত্তে। যে বৃত্ত গাঢ়, লাল আর গভীর।
আমি ঠিক এরকম একটা বই খুঁজছিলাম অনেকদিন ধরে। তবে, এমনটা চাইছিলাম না, এমন বিহ্বলতা চাইছিলাম না একদমই!
লেখক যখন বললেন, "হয়তো হাসিখুশি মানুষেরাই বুকের ভেতর সবচেয়ে বেশি অন্ধকার নিয়ে ঘোরে। কেউ কেউ ঘোরে ব্লাকহোল নিয়ে।"—এই কথার রেশ থেকে যাবে, অনেকদিন!
কী বিষণ্ণ। কী ভীষণ সুন্দর। এই বইটা নিয়ে আমার হাজারটা কথা বলার আছে। কিন্ত সেই কথাগুলো বলার জন্যে সঠিক শব্দ আমার জানা নেই।
কৌশিক জামানের লেখার ক্ষেত্রে আমার যেই জিনিসটা সবচাইতে ভালো লাগে সেটা হচ্ছে তাঁর সহজ-সোজাসাপ্টা-সাবলীল লেখনী। আর তাঁর ব্যক্তিগত গল্প বলার ধরন। যেন একটা বিশাল মনোলগ পড়ছি। এই বইটা নিয়ে একটাই অভিযোগ, লেখক বড্ড তাড়াহুড়ো করে শেষ করেছেন। কিছু জায়গায় আরও একটু বর্ণনা পেলে লেখাটা একদম পূর্ণতা পেত আমার কাছে।
বইটা খুব খুব খুব ভালো লেগেছে। প্রিয় একটা বই হয়ে গিয়েছে৷ এ বছর পড়া সবচেয়ে প্রিয় বাংলাদেশী বই এটি। বইটি পড়ে কেঁদেছি। বইটি পড়ে অসংখ্য বার হেসেছি। বইটি পড়তে গিয়ে ২২ পৃষ্ঠায় একটা ব্রেক নিয়েছিলাম, এরপর বইটি নিয়ে অনেক ভেবেছি। এখন বইটি পড়া শেষ। আরও অনেক ভাববো। চিন্তার জগৎ তো আসলে সবার ঠিক একইরকম না। আমার কাছে বইটি এতো বেশি ভালো লেগেছে সম্ভবত আমার নিজের চিন্তার জগতের সাথে বইয়ের চিন্তার জগত মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়ে। এই বইটি দেখতে বা পড়তে গল্প-উপন্যাস ধরনের মনে হলেও আমার কাছে মনে হয়নি এটি গল্প কিংবা উপন্যাস। আমার কাছে এটি কবিতার মতো মনে হয়েছে। ভিন্ন আঙ্গিকে, ভিন্ন ধাঁচে। কবিতায় যেমন ভাবনার সুযোগটা থাকে, এই বইতেও তেমন। কবিতা যেমন চিন্তার জগৎ ছুঁয়ে দিতে পারে, এই বইটিও তেমন। বইটি দেখতে ছোট মনে হলেও বইটি অনেক গভীর। বইটিতে অনেক কিছু লেখা নেই বলে মনে হলেও আসলে বইয়ের লাইনের মাঝে মাঝে না লেখা অগণিত অদৃশ্য লেখা রয়েছে। যার সবটুকু জুড়ে অসাধারণ একটি পাঠ অভিজ্ঞতা আমি পেয়েছি।
আমি সচরাচর দুঃখের বই পড়িনা। নিতে পারিনা৷ এই বইটি অনেক ডিপ্রেসিভ হলেও নিতে পেরেছি। দুঃখের ভেতরে ভেতরে কেমন যেন একটা অবিচ্ছিন্ন প্রার্থনার সুর খুঁজে পেয়েছি আমি। আমার মনের ভুলও হতে পারে অবশ্য।
যাক সেসব কথা। বিষন্ন বই নিয়ে লিখছি, একটা বিষন্ন কবিতা দিয়েই শেষ করা যাক বরং।
"ডিপ্রেশনের বাংলা নাকি নিম্নচাপ ? বৃষ্টি এল। সঙ্গে কফি এক-দু' কাপ নামছে বিকেল, অল্প ভিজে রাস্তাঘাট ছাতার নীচে মিইয়ে গেল পাপড়ি চাট বন্ধুরা সব ফিরছে বাড়ি দূর থেকে... কেন যে আজ হিংসে হল তাই দেখে, দেখতে গিয়ে সন্ধ্যে হল জানলাতেই আগের মত মেঘ করেছে ... কান্না নেই কেবল মুঠোয় বন্দি কফির একলা কাপ ডিপ্রেশনের বাংলা জানি । মনখারাপ ।" -শ্রীজাত
বই আকারে ছোট হলেই যে ইজি-রিড বা কুইক-রিড হয় না এই ভুলটা ভেঙেছিলো গতবছরই। বৃত্তের চারপাশে আবার নতুন করে তা উপলব্ধি করালো। ৬৪ পৃষ্ঠার কিউট সাইজের ছোট্ট একটা বই, অথচ বিষয়বস্তু কত গভীর।
এক কথায় বলতে গেলে বইটা ডিপ্রেশন নিয়ে, অবসাদ নিয়ে৷ এমন কোনো মানুষ হয়তো নেই যে কখনো বিষণ্নতা অনুভব করেনি। কিন্তু এই পরিচিত অনুভূতিটা নিয়েই কথা বলতে পারে কয়জন! পুরো বইটাই ছিলো লেখকের মনোলগ। ফার্স্ট পারসন পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে নিজের জীবনের কিছু ঘটনাবলি বর্ণনা করে গেছেন। প্রথম মৌলিক বইতেই প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে এতো জটিল বিষয় লেখার জন্য লেখক প্রশংসার দাবীদার। লেখনী বেশ সাবলীল, মেদবিহীন ও ঝরঝরে। এক বসাতেই পড়ে ফেলা যায় পুরোটা।
একটাই অভিযোগ, পুরো বই জুড়ে তাড়াহুড়ো ছিলো খুব বেশি। শুরু হতে হতেই যেন কাহিনী শেষ হয়ে গেলো। আরেকটু সময় নিয়ে, আরেকটু বড় লেখা লিখলে হয়তো ইমোশনালি কানেক্ট করতে পারতাম আরেকটু বেশি৷
এক বসাতে অনায়সেই পড়ে ফেলার মতোন ছোটখাটো উপন্যাসিকা। সহজ-সরল বয়ানে কৌশিক জামান যে গল্প বলে গেলেন তা শুরু থেকে শেষ অব্দি আটকে রাখলো। যেসব বই পড়তে গিয়ে আমরা নিজেদের অনুভূতির সাথে মেলাতে পারি সেসব বইয়ের প্রতি আবেগের পরিমাণ বোধহয় বেড়ে যায়। এই বইয়ের বিষণ্ণতা, ঢাকার বিভিন্ন স্থানের সাথে জুড়ে থাকা স্মৃতি আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিলো বহু ঘটনা।
বইয়ের গল্প শুরু হয়েছে এসএসসি পরীক্ষা দেয়া এক বিষণ্ণ যুবককে নিয়ে। অতঃপর কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় অংশের বর্ণনাগুলো কিছুটা দ্রুততায় এসেছে। তবে বর্ণনাগুলো ভীষণ প্রাঞ্জল। মূল চরিত্র এবং তার কথা এসেছে তারও পরে। তার গল্পে ঠিক একটু একটু করে জুড়ে যাওয়া। এরপর ধীরে ধীরে একটা মানুষকে আবিষ্কার করার ব্যাপারগুলো উপস্থাপন করেছেন সযত্নে। তবে সমস্ত গল্প জুড়েই বিভিন্ন রূপে উপস্থিত থেকেছে বিষণ্ণতা।
বেশ অনেকটুকু সময় বইটা ধরে বসেছিলাম আমি। তারপর আস্তে করে উঠে বাতিটা বন্ধ করে শুয়ে পড়ি। এতো ছোট্ট একটা বইতে কখন এভাবে মুদে ছিলাম, খেয়ালই করিনি। রাত আসলেই বিষন্নতা আমাকে একরকম ঘিরে ধরে সে অনেকদিন। বইটার সাথে এবার তা মধ্যরাতে চক্রিয় আকারে ঘিরে ধরলো আরকি। আপনাদের মতো আমিও তাহলে কখনও কখনও হৃদয়ে বিশাল গর্ত নয়, ব্ল্যাকহোল নিয়ে ঘুরি! একা নই...
'একবার শ্রদ্ধা নষ্ট হয়ে গেলে তা আর কখনো ফিরে আসে না। ভুল মানুষ করতেই পারে কিন্তু যে বার বার একই ভুল করে সে ভুল করে না। সে জেনেশুনেই ইচ্ছা করে ভুল করলে সেটাকে ভুল বলা যায় না।'
একা বয়ে যাওয়া বিষন্নতার গল্প বলা বইটি বন্ধুত্বের রঙ, হলুদ রঙের নিশানা তোলা। সহজ সরল অল্প ব্যাপ্তির একটা লেখনী চারপাশটা এভাবে সংকুচিত করে এমন ভাবে বিষন্নতায় ঘিরে ধরবে সেটা আশা করিনি। স্কুল জীবন, কলেজ জীবন থেকে শুরু করে যাপিত জীবনে চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে দুঃখের একই বৃত্তকে বারবার প্রদক্ষিণ করার বাস্তব সময়কালটাই বলতে চেয়েছেন লেখক। শেষটা হলো বড্ড তাড়াতাড়ি আর বিশাল একটা ধাক্কা দিয়ে। মনে মনে বলছিলাম, প্লিজ এখানেই যেন শেষ না হয়, প্লিইইজ!
বহুল প্রচারিত বইয়ের ক্ষেত্রে আমি এক্সপেকটেশন একেবারেই কম, বলতে গেলে শূন্যের কোঠায় রেখে পড়তে বসার চেষ্টা করি। যাতে আমার 'যতটা শুনেছিলাম, অতটা নয়!' গোত্রীয় কথা বলতে না হয়। এই বইটি শুরু করে দ্বিতীয় অধ্যায় যেতেই আমি নড়েচড়ে বসি। আমি লেখক কৌশিক জামানকে দূর থেকে অত্যন্ত মজার মানুষ হিসেবেই চিনি। তাছাড়া, গতবছর প্রকাশিত হওয়া 'দেখিতে গিয়াছি চক্ষু মেলিয়া' তে ওনার লেখাটুকু পড়ে অত্যন্ত খুশি হয়েছিলাম। সেই একই লেখক, তাঁর প্রথম মৌলিক বই এত বিষন্ন? এত গাঢ়? তবে লেখক তার লেখার ধরণ বদলাননি। মেকি কোনো গাম্ভীর্যের ধার ধারেন নি। সেই একই ধাঁচে গল্প বলেছেন, তবে মুদ্রার ওপিঠের গল্প। এরকম একটা গল্প খুঁজছিলাম বোধহয় অনেকদিন!
"বৃত্তের চারপাশে" খুব ছোট একটা বই। আপনি চাইলে এক বসাতেই শেষ করে ফেলতে পারবেন। কিন্তু বইটার রেশ রয়ে যাবে অনেকক্ষণ। জীবনে আমরা সবাই কম বেশি ডিপ্রেসিভ। কারণের শেষ নেই। আমি নিজেও গত এক বছর যাবত ডিপ্রেশনে ভুগছি। কিন্তু ডিপ্রেশনের কারণ হয়তো কিছু না। কিন্তু আবার সেটাও একটা কারণ। আমাদের জীবনের নানান ছোটখাটো বিষয় খুব সহজে আমাদের ডিপ্রেশনে ফেলে দিতে পারে। বইটা পড়ার সময় ঠিক যেন আমার চোখের সামনে প্রতিটা ঘটনা ভেসে ভেসে উঠছিল। এর কারণ সম্ভবত বইয়ের ঘটনাগুলো আমার,আপনার খুবই পরিচিত। কারণ এই ঘটনাগুলোই প্রতিনিয়ত আমার আপনার সাথে ঘটছে। কিংবা আমরা সেগুলো ফেস করে এসেছি। স্কুল,কলেজ, ইউনিভার্সিটি আর পাশ করে বের হওয়ার অনিশ্চয়তা কে দেখে নাই জীবনে! বইটা পড়ে ভীষণ রকম মন খারাপ হয়ে গেলো। তবে এরকম মন খারাপের অনভুতি বারবার নেওয়া যায়। লেখকের কাছে অনুরোধ থাকবে এরকম বই যেন আরও লেখা হয়।
"বৃত্তের চারপাশে" একজন মানুষ তার বিষণ্নতার গল্প বলছেন আর আমি যেন চোখ বড় বড় করে গল্প শুনে চলেছি।
কখনও শুনতে শুনতে মমতা তৈরি হয়েছে সদ্য কৈশোর পেরোনো অসম্ভব অভিমানী এক তরুণের জন্য। কখনও বা মনে হচ্ছিল আচ্ছা করে বকা দিয়ে দেই এই একরোখা ছেলেটিকে। আবোলতাবোল কী বলছে এসব! আবার কখনও মনে করিয়ে দিচ্ছে যেন নিজের জীবনের একান্ত বিষাদময় কোনো মুহূর্তের কথা। হঠাৎ করেই নিজের অজান্তে তৈরি হয় এক হাহাকার!
লেখকের এই ক্ষুদ্র জীবনের বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতার গল্প শুনতে যেয়ে চরম ঈর্ষা বোধ করেছি। হয়তো সেই অভিজ্ঞতা তাকে উপহার দিয়েছে উজ্জ্বল কিছু মুহূর্ত অথবা নিকষ কালো অমাবস্যা। হয়তো আলো-আধারের এই মাপ-কাঠিতে আঁধারের পাল্লাটা বেশী ভারী হয়ে গিয়েছে অথবা এই আঁধারকেই লেখক বেশি আপন করে নিয়েছেন। কোনটা সত্য কে বা জানে?
এই বই নিয়ে প্রোফেশনাল পাঠ প্রতিক্রিয়া, যেমন লেখনি চমৎকার, প্লট দারুণ, নেতিবাচক দিকগুলোর বিবরণ ইত্যাদি এসবকিছু গতনাগুতিক কথা বলা আমার পক্ষে অসম্ভব। কেন অসম্ভব? কারণ বইটি আমাকে বিষন্নতার আছন্নতায় আবিষ্ট করে রেখেছে।
অনেক তরুণ প্রজন্ম নিজের বিষাদ কাটাতে মোটিভেশনাল বইগুলো খুঁজে থাকেন। তাদের জন্য এই বই ব্যক্তিগতভাবে আমি হাইলি রেকমেন্ড করবো। বীজগণিতের একটা সূত্র আছে না মাইনাসে মাইনাসে প্লাস!! ব্যাপারটা অনেকটা ওরকম।
ঘুম আসছিল না। ভাবলাম বইটা একটু পড়ে দেখি। পড়তে পড়তে যেই একটা চরিত্রটার প্রতি ভালোলাগা জন্মালো, অমনি তার করুণ পরিণতি দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল। আসলে অপন্যাসিকের লেখক চটি সাইজের এই বইয়ে একটা ডার্ক হোলের গল্প শুনিয়েছেন। রবি ঠাকুরের কবিতার মত, "ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা ছোট ছোট দুঃখ কথা নিতান্তই সহজ সরল সহস্র বিস্মৃতি রাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি তারি দুচারিটি অশ্রুজল। নাহি বর্ণনার ছটা ঘটনার ঘনঘটা নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ অন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ করি মনে হবে শেষ হয়ে হইল না শেষ।"
মানুষকে আমরা কদ্দূর চিনি? আমার সাথে বসে হাহাহিহি করছে, ফাজলেমি করছি, সেই মানুষটার দৌঁড় কি ঐ পর্যন্তই? সোশ্যাল মিডিয়ায় সর্বক্ষণ দুষ্টুমি করে যাওয়া মানুষটা কি আসলেই ঐরকম? না, তারা কেউ-ই সেরকম নন। প্রত্যেকটা মানুষের ভেতর একটি খুব অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গা আছে। না-বলা কথাগুলো সেখানে গিয়ে জমা হয়। "বৃত্তের বাইরে" তেমন কিছু ঘটনার সমষ্টি। মারদাঙ্গা কোনো উপন্যাসিকা নয়, নয় কোনো সামাজিক আঙ্গিক ফুটিয়ে তোলা লেখা। বড়জোর শেষ না হওয়া একটা আত্মজীবনী বলা যায় একে। তবে এখানে শিক্ষার অভাব নেই। অন্য এক কৌশিক জামানের সাথে পরিচয় হবে। বিষণ্ণ ভায়োলিনের সুর শুনতে পাবেন। তম্রা জারা কৌসিক বাইকে চিনো নাই, তারা এখনও চিনতে পারবে না। তবে অন্তত কিছুটা বুঝতে পারবে মানুষটাকে।
কিছু মুহূর্তে সময় নিজেই নিজেকে ছেড়ে দেয় জীবনের কাছে আবার কিছু মুহূর্তে সময় একদম স্তব্ধ হয়ে পুরনো কোন বটবৃক্ষের মতন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। দিন পার হয়ে রাত একসময় ভোর হয়, অথচ সেইম প্যাটার্নে সময়টা আটকে আছে তো আছেই- এরকমই মনে হতে থাকে। কত্ত কত্ত কাজ জমে থাকে, করা হয়না। আজ করবো কাল করবো এই বলে বলে নিজেকে বুঝানো। আবার যে কাজটা করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেটা শুরু করার পরপরই হঠাৎ স্টোন্ড হয়ে যাওয়া, ব্যাকগ্রাউন্ড এ অবচেতন মনের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। নিজের সাথে নিজের কিংবা নিজের সাথে বাস্তবতার ভয়ঙ্কর একটা সাইলেন্ট ওয়ার টাইপ মুহূর্ত চলাকালীন অবস্থায় কতটা অসহায় লাগতে পারে এই অনুভূতির স্বাদ শুধুমাত্র তাঁরাই জানে, যারা প্রচলিত মুদ্রার ন্যায় জীবনের দুইপিঠ দেখেছে, কিংবা যারা নানান প্রতিবন্ধকতা পাড়ি দিয়ে শেষমেশ কোন রকম একটা মাথা গোজার ঠাই করে নিয়েছে নিজের মতো করে,- তাঁদের রাজ্যে তাঁরাই রাজা, তাঁরাই প্রজা, উজির-নাজির, সভাপতি/সভানেত্রী। অথবা হতে পারে জীবনে কখনো না কখনো পরিবার/সমাজ/কাছের মানুষদের অবহেলা পেয়ে নিজের মতো করে বাঁচতে শেখা মানুষ, খুব আপনভাবা মানুষগুলোর কাছ থেকে ভালোবাসা না পেয়ে ক্যামন একটা ভালোবাসাবিহীন সম্পর্ক টেনেটেনে বয়ে নিয়ে যাওয়া মানুষ, মনের মধ্যে অনেক অভিমান-রাগ নিয়ে নিজেকে সবার থেকে আলাদা করে রাখা মানুষ, এরা প্রত্যেকেই এই সাইলেন্ট ওয়ারটার সাথে পরিচিত! পৃথিবীতে বাস করা প্রতিটি মানুষের জীবনে “বিষণ্ণ অদ্ভুত” নামের ‘সময়’ প্রতিনিয়তই আসা যাওয়া করতে থাকে। - একটু বেশী জটিল মনে হচ্ছে কথাগুলো? পাগলের মতন উল্টাপাল্টা লিখছি?- হয়তো আসলেই উল্টাপাল্টা লিখছি কে জানে? হা হা হা… যাইহোক, কোন কিছু করতে পারি আর না পারি, নিজেকে অনেক কিছুর মধ্য থেকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করি আবার মাঝে মাঝে চুপ করে নিজের মাঝে ডুব দিয়ে দেখে আসি নিজেরই মনের তলদেশ! কৌশিক জামানের “বৃত্তের চারপাশে” পড়বার পর জানিনা ঠিক কতটুকু সময় স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলাম শুধু জানি একটা ঘোরলাগা মুহূর্ত নিয়ে বেশ কিছুদিন নিজের ভেতরেই ডুবে ছিলাম। রিক্সা, গাড়ি, সাইকেল কিংবা হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি কোথাও, হঠাৎ কোন একটা বস্তুর উপর কিংবা কোন মানুষকে দেখে চোখ আটকে গেলে কি করি আমরা? ঘাড় ঘুরিয়ে ভালোভাবে দেখার চেষ্টা করি। এরপর একটা ছোট্ট কৌতুহল বুকের মধ্যে চেপে বাড়ি ফিরি নাহলে অফিস অথবা যার যেখানে প্রয়োজন সেখানেই যাই। কি তাইনা? “বৃত্তের চারপাশ”পড়বার আগেই বইয়ের প্রচ্ছদ, এবং নামকরণ বলা যায় আমাকে একটা কৌতূহলের মধ্যে ফেলে দিয়েছিলো। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম একটা বিন্দু থেকে অসংখ্য বিন্দু এরপর সমস্ত বিন্দুগুলো নিয়ে একটা বৃত্তবলয়ের সৃষ্টি। আর ঐ বৃত্তবলয়টার চারপাশ জুড়ে অসংখ্য বায়স্কোপ যার মধ্য দিয়ে ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট স্ক্রীনে রঙিন ছায়াছবি দেখা যাচ্ছে। যেখান থেকে জীবনের যাবতীয় সমস্ত কিছুর সুত্র, অনেকটা একই জায়গায় শুরু হয়ে এক এক রকম ভাবে ছড়িয়ে পড়ছে- আবার সেখান থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন গল্প তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘশ্বাসেরা বাড়তে বাড়তে এক পর্যায়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে, কোনভাবেই তাদের আটকে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। পৃথিবী যেমন সূর্যের চারপাশে ঘুরে ঠিক তেমনি প্রতিদিনকার ঘটে যাওয়া গল্পগুলো একটা “বৃত্তের চারপাশে” ক্রমান্বয়ে ঘুরছে তো ঘুরছেই। বৃত্তের চারপাশের গল্পকার চমৎকার ভাবে গল্পের প্লট সাজিয়েছেন যা পড়তে গিয়ে মুগ্ধতার অতলে তলিয়ে যাচ্ছিলাম একটু একটু করে। মানুষের মস্তিষ্কের চিন্তা ভাবনা, জীবনদর্শন, তাঁদের আত্মউপলব্ধি গুলো এতো সহজে গল্পের আকারে ফুটিয়ে তুলেছেন যেন প্রতিটি লাইন আমার চেনা এবং খুব কাছের। চিন্তা ভাবনার এতো মিল কিভাবে সম্ভব? নিজের ভেতর খুব গোপনে ডুবে যাওয়া যায় এমন অনুভূতি যে আছে এটা প্রায় ভুলতে বসেছিলাম। কিন্তু শেষমেশ “বৃত্তের চারপাশে” আমাকে সেই অনুভূতির গহীনে ডোবাতে সক্ষম। বইটার ৯-২১ পৃষ্ঠা পর্যন্ত নস্টালজিয়ায় বুঁদ হয়ে ছিলাম। ঐ যে চিন্তা-ভাবনার বেশ মিল! কিন্তু ২২ নং পৃষ্ঠা উল্টাতেই সবার আগে চোখ যেখানে আটকে গেলো আমি কয়েক সেকেন্ড বোকার মতন চুপ থেকে শব্দ করেই বলে উঠলাম- “ওয়াও সাবরিনা!” নিজে সাবরিনা হয়ে গল্পের সাবরিনাকে স্পষ্ট দেখতে পাওয়ার অনুভূতিটা অদ্ভুত। বাস্তবতা এবং কল্পনার মধ্যে বিস্তর মিল। না শুধু সাবরিনা না, মনসুর, রেজওয়ান, সোনিয়া, বীথি, হুন্ডি মকবুল প্রতিটি চরিত্রকেই চিনি বইটি পড়তে পড়তে তাই মনে হয়েছে আমার। কয়েকটা ঘটনা পড়ার সময় ঐ মুহূর্তের অনুভূতি এতোটাই ভিভিড ছিল যে নিজের সত্যিকারের ইমোশনের জায়গাটা স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর দেখতে পাচ্ছিলাম। - “আমি শুধু ওর চোখগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সন্ধ্যার ম্লান বেগুনি আলো এসে ওর মুখের এক পাশে পরছিলো। চুলগুলো বাঁধা থাকলেও দুই গালের পাশে খোলা চুলগুলো মৃদু বাতাসে হাল্কা নড়ছিল। আমি ওর কপালে চুমু খেলাম। আর কিছু বলতে পারলাম না”. - এই পাঁচ লাইন কতবার পড়েছি জানিনা। এই পাঁচ লাইন পড়তে গিয়ে যে অনুভূতির সাথে দেখা তা কোনভাবেই লিখে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। ঘোরলাগা এক সন্ধ্যায় আঁকবাঁক ঘুরে অদৃশ্য এক মুগ্ধতায় হারানোর সন্ধিক্ষণে হঠাৎ ৫৬ পৃষ্ঠায় এসে মনে হল আমার মাথায় ধুপ করে ভারী কিছু ফেলে দেয়া হল আর আমি শোয়া থেকে লাফ দিয়ে উঠে বসলাম। ৫৬ থেকে ৫৯ এই তিন পৃষ্ঠা আবারও আমাকে মনে করিয়ে দিলো জীবনের কঠিন কিছু সত্য আর ঠিক ঐ সময়েই বুকের গভীরে বেড়ে উঠা শূন্যতাটাকে আরও গভীর ভাবে অনুভব করলাম। খুব বিশ্বাস করি "শরীরের উপর জোর খাটলেও মনের উপর জোর খাটে না" - খাটানো যায় না। শারীরিক মৃত্যুর চাইতে মানসিক মৃত্যু একটা মানুষকে কতখানি শূন্য করে দেয় এই অনুভূতিটার সাথে দেখা শেষের তিন পৃষ্ঠায়! কৌশিক জামান- হ্যাটস অফ টু ইউ। "বৃত্তের চারপাশে" আপনার অদ্ভুত সুন্দর এক সৃষ্টি এবং জীবনের কঠিন কিছু সত্য বর্ণনা। মরে গিয়ে বেঁচে থাকা অনেক সাহসের কাজ যা সবাই পারে না। সত্যিকারের "বিষাদ সুন্দর" অনুভূতি নিয়ে শুধু লিখে যান। সামনে আরও ভালো কিছুর সৃষ্টি হোক এই শুভকামনা সবসময়ের জন্য থাকবে। ২০২২ সালের "অমর একুশে বইমেলা"য় পেন্ডুলাম পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত কৌশিক জামানের "বৃত্তের চারপাশে" বইটি আমার বইয়ের তালিকার চার নম্বর বই। শুধু একবার না দুই বার পড়ে মনে হয়েছে পুরো বইটি নিয়ে যতটুকু যাই লিখি না কেন প্রকাশে কিছু অপূর্ণতা থেকেই যাবে। কারণ মাঝে মাঝে কিছু অনুভূতি বোঝানো যায় না। চুপচাপ বসে নিস্তব্ধতার অন্তরালে অনুভব করতে হয়।
ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়,নিজের জীবনকে এবং নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষদের প্রতি সীমাহীন আবেগ-অনুভূতিকে শব্দবন্দী করা অতিশয় কঠিন।হৃদয় জুড়ে কত কথা-স্মৃতি-অভিজ্ঞতা জমা পড়ে থাকে,তার মধ্যে থেকে কোনটা ফেলে রেখে কোনটা তুলে নেওয়া যায়-তা নির্বাচন করাই তো দুরূহ!এই কঠিন কাজটাকে সহজ করতে পেরেছেন লেখক কৌশিক জামান।হাতের তালুতে আটকে যাবার মতো ছোট্ট একটা বই তে শব্দবন্দী করেছেন নিজের বৃত্তবন্দী জীবনের গল্প।মানুষ স্বভাবতই গল্প শুনতে ভালোবাসে।আর তা যদি হয় সত্যিকারের গল্প অথবা জীবনের গল্প,তাহলে আগ্রহের সীমাটাও বেড়ে যায়।সেইজন্যেই বোধহয় শুরু থেকে শেষাবধি বেশ আগ্রহ নিয়ে বইটা পড়েছি।গল্পে কিন্তু আহামরি কোনো ঘটনার ঘনঘটা নেই, আকর্ষণীয় ক্লাইম্যাক্স নেই, কিচ্ছু নেই।নিতান্ত সহজ-সরল-সাদামাটা বাংলায় একটা সরলরৈখিক গল্প বলে গেছেন লেখক।তবুও,শেষ হবার আগ পর্যন্ত একবিন্দুও মনোযোগ সরে যায়নি;লেখকের অনুভূতির সঙ্গে একাত্ম বোধ করতে পারছিলাম বারবার। লেখকের ব্যক্তিগত দুঃখবোধ বারবার মন কে বিষণ্ন করে তুলছিলো।দুম করে শেষ হয়ে যাবার পর অনেকক্ষণ বিষাদমাখা চোখমুখ নিয়ে বসে ছিলাম।ভাবছিলাম- মানুষ হাজার চাইলেও নিয়তির বেড়াজাল থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পার�� না।তাকে ঘিরে থাকে বিষাদের বলয়। একবুক বিষাদ আর না পাওয়ার দগদগে ঘা নিয়ে তাকে বাঁচতে হয় বৃত্তাকার এক জীবন যার অনেকটা জুড়ে থাকে নিকশ কালো অন্ধকার।এইসব ভাববার সঙ্গে সঙ্গে কোত্থেকে যেন ভেসে আসছিলো একটা সুর "হয়তো হাসিখুশি মানুষেরাই বুকের ভেতর সবচেয়ে বেশি অন্ধকার নিয়ে ঘোরে" - এটাই হয়তো মানবজীবনের নির্মম নীতি!
"কেউ কেউ হৃদয়ে গর্ত নয়, ব্ল্যাকহোল নিয়ে ঘুরে "।
এক বিষণ্ণ জীবনচক্রাকার গল্প। স্কুল জীবন, কলেজ জীবন,ক্যারিয়ার, বন্ধুত্ব, প্রেম, হারিয়ে ফেলা প্রিয় মানুষ, এই এক সন্ধিয়াটা জীবন ধারার বাস্তবতার গল্পই লেখক তার লেখায় ধারণ করে। তবে শেষটা এত তারাতারি হবে ভেবে পাইনি। ছোট একটা বই, এক বসায় পড়ে শেষ করার মত। কিন্তু শেষ হয়ে যেনো আরো বিস্তর জানার ছিলো। বইটা পড়ে মনে এক বিষন্নের ছাপ রেখা পরে গেলো।
এইমাত্র শেষ করলাম এর “বৃত্তের চারপাশে”। ছোট্ট একটা বই। বলা যায় ছোট গল্পের মতো। ইদানিংকালে এতো সাবলিল লেখা আমি খুব কমই পড়েছি। পড়া শেষ করে কেমন একটা ঘোরের মধ্যে আছি…। কি জানি একটা ঘটে গেলো টাইপ, ট্রেন ছুটে গেলে যেমন লাগে তেমনি।বইটা কি আরেকটু বাড়ানো যেতো? গল্প কি আরেকটু বলা যেতো? গল্প করার মানুষ যদি না থাকে তবে গল্প বাড়িয়ে লাভই বা কি!!!