জৈনধর্ম বাংলায় নতুন কিছু নয়। ইতিহাসের উপাদান বিচার করে বাংলার ইতিহাস লিখতে গেলে একেবারে আদি যুগ থেকেই বাংলায় জৈন সম্প্রদায়ের উপস্থিতির কথা স্বীকার করতে হয়। অথচ এই ধর্ম, তার ইতিহাস এবং দর্শন নিয়ে আমরা খুবই কম জানি। আজকের এই তন্ত্র-অধ্যুষিত পটভূমিতে তো বটেই, তার আগেও বৌদ্ধধর্মের তুলনায় জৈনধর্ম সম্বন্ধে আমাদের অজ্ঞতা বিস্ময়কর বলে মনে হয়। সেই না-জানা ও ভুল জানা-র ধোঁয়াটে জায়গাতেই তথ্য, তত্ত্ব এবং সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ এই বইটি পরিবেশন করেছেন লেখক। 'মুখবন্ধ' ও 'ভূমিকা'-র পর এতে এসেছে শোভন কুমার রায় লিখিত একটি 'প্রাজ্ঞকথন'। এরপর আলোচনা বিন্যস্ত হয়েছে নিম্নলিখিত ক'টি অধ্যায়ে~ ১. ভদ্র বাহুর কথা ২. জৈন ধর্মের ইতিহাস ৩. জৈনদর্শন ৪. কালচক্র ও মেরু পরিবর্তন ৫. সল্লেখন বা সান্থার ৬. তীর্থঙ্করদের কথা ৭. কুলকর ও শলাকাপুরুষ ৮. পৌণ্ড্র বাসুদেবের কথা ৯. মহাবীরের বাংলা-যোগ ১০. মহাবীরের সিদ্ধভূমি ১১. সরাকদের কথা ১২. বাংলায় জৈন প্রত্ন উপাদান ১৩. তেলকূপী ১৪. অন্যান্য আরও প্রমাণ ১৫. জৈন দেবতা ১৬. নমোকার মন্ত্র ও জৈন আচার ১৭. সিন্ধু সভ্যতার যোগ ১৮. আধুনিকযুগে বাংলায় জৈন সম্প্রদায় ১৯. সম্মেদ শিখর ও প্রশ্ন সুলিখিত ও পাঠ-নির্দেশিকায় সমৃদ্ধ এই বইয়ের ভালী দিক কী-কী? প্রথমত, লেখক এটির মাধ্যমে বাঙালিকে জৈন ধর্ম, দর্শন, ইতিহাস এবং তার সম্ভাব্য প্রাগিতিহাস সম্বন্ধে সচেতন করতে চেয়েছেন। দ্বিতীয়ত, একটি যৌক্তিক কাঠামোর মধ্যে মহাবীর-পূর্ব জৈনধর্মের ইতিহাস অন্বেষণে নিবিষ্ট হওয়ার ফলে এই ধর্মের সম্ভাব্য অবৈদিক উৎসের দিকেও তিনি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তৃতীয়ত, রাঢ়ভূমিতে প্রথমে মহাবীরের, পরে জৈন ধর্মাবলম্বী এক প্রাচীন সম্প্রদায়ের সঞ্চারপথ তিনি পরম নিষ্ঠায় ফুটিয়ে তুলেছেন। তারই সঙ্গে আলোচিত হয়েছে বাংলার গৌরবময় এক অতীত— যা আজ বিস্মৃতির গর্ভে তলিয়ে যেতে বসেছে। চতুর্থত, এযাবৎ উপেক্ষিত একটি অধ্যায়ের প্রতি আমাদের কৌতূহলী করে তুলতে চেয়েছেন লেখক। হ্যাঁ, আমি জৈন দেবতাদের কথা বলছি— যাঁদের নিয়ে বাংলায় লেখালেখি হয়ই না। পঞ্চমত, আলোকচিত্র ও মানচিত্রে সমৃদ্ধ এই বইটি পড়তে গেলে ইতিহাস সত্যিই বাঙ্ময় হয়ে ওঠে আমাদের সামনে। এই বই নিয়ে কী-কী অপ্রাপ্তি রয়ে গেল? (১) জৈনধর্ম ও দর্শন নিয়ে এমন সহজপাচ্য অথচ তথ্যানুগ বই বাংলায় আর একটিও আছে কি না সন্দেহ। সেজন্যই মনে হল, জৈন পুরাণ নিয়ে এই বইয়ে বিস্তৃত আলোচনা পেলে বড়ো ভালো হত৷ সেক্ষেত্রে ওগুলোর মধ্যে লুকিয়ে থাকা ইতিহাসের নানা রহস্যময় আভাসের খোঁজ পেতেন পাঠক। (২) বৌদ্ধ ধর্মের নানা বিশেষত্ব লোকাচার ও স্ত্রী-আচারের মাধ্যমে বাংলার মানুষের জীবনে থেকে গেলেও জৈন ধর্মের ক্ষেত্রে তেমন কোনো আত্তীকরণ কেন ঘটল না— এই বিষয়ে লেখক কিছু বলেননি। এটিও আক্ষেপের কারণ হল। তবু বলব, এই বইটি আজকের বাংলায় ইতিহাস-চর্চার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক ভূমিকা পালন করছে। বাংলার সঙ্গে জৈন ধর্মের তথা তার মাধ্যমে প্রাগৈতিহাসিক ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গে এই অঞ্চলের সম্ভাব্য যোগাযোগ এটিতে আলোচিত হয়েছে। তারই সঙ্গে জৈন ধর্মের নানা জটিল ও নীতিমূলক বৈশিষ্ট্যকেও সহজভাবে পরিবেশন করেছে এটি। সুমুদ্রিত ও সুলিখিত বইটি পাঠকের আনুকূল্য পাবে— এই আশায় রইলাম।