‘অনীশ’ আগে পড়ি নি। তাঁকে স্মরণ করে এমনিই বইটা পড়া শুরু করেছিলাম গতকাল। মিসির আলী সিরিজের বই, সেটাও তুলে নেবার আগে জানতাম না। এখানে নায়িকার নাম রূপা। গল্পটি শুরু হয় হাসপাতালে। সেখানেই মিসির আলীর সাথে মেয়েটির দেখা হয়। ঘটনাক্রমে তাঁর মেয়েটির দিনলিপি পড়ার সুযোগ হলে মিসির আলীর সাথে আমরাও সেটা পড়তে থাকি। জানতে পারি অদ্ভূত এক জীবনের গল্প। বুঝতে পারি যে কিছু কিছু মানুষের মধ্যে আরেকজনকে হাতের মুঠোয় রাখার প্রবল ইচ্ছা থাকে আর সেটা সমাজে কিছুটা সহজ চোখেও দেখা হয়। কিন্তু, এই দেখাটা মানসিক অসুস্থতাকে সুগারকোট করার চেষ্টা বাদে কিছু না। এর ফল ভালো হয় না। জেনারেশনাল ট্রমার জন্ম দিতে পারে এটি।
বইটিতে কাহিনীর যেভাবে ইতি টানা হয়, তাতে একটা ‘ক্লোজার’ পাওয়া যায়। সাধারণত, সেটা না করার একটা প্রবণতা হুমায়ূন আহমেদের ছিল। মিসির আলীর বইগুলোতে অবশ্য এই কাজ উনি কম করতেন। কারণ, বইয়ের ধরনই এমন যে খোলসা করে সবকিছুর গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা না থাকলে পাঠককে এই সিরিজের প্রতি আটকে রাখা মুশকিল হয়ে পড়তো। আর সেই ব্যাখ্যায় চমক রাখাও জরুরী ছিল। গোয়েন্দাগল্প না হয়েও মিসির আলীর গল্পগুলোতে যুক্তিনির্ভর মানসিক ও মাঝে মাঝে অতিপ্রাকৃতিক রহস্যের সমাধান যেভাবে আসে, তা শেষে এসে ভালোই ধাক্কা দেয়। আর এই বইয়ের শেষটাও ব্যতিক্রম নয়। হুমায়ূনের নতুন পাঠক এই বই পড়লে অবশ্যই মিসির আলীর বাকি বইগুলো পড়তে চাইবে।
রূপার জামাইকে নিয়ে মিসির আলীর ব্যাখ্যা পছন্দ হয় নি। তিনি এখানে তাঁকে ‘হৃদয়বান’ বলেছেন কোন যুক্তিতে, আমি জানি না। যেই লোক দিনরাত স্ত্রীর সাথে খারাপ ব্যবহার করে এবং রাতে সুর পাল্টে ফেলে নিজ প্রয়োজনে, সে শুধু সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে নিয়ে যাবার কারনে হৃদয়বান হয়ে গেল কেমনে, বুঝি নাই। বাস্তবে অবশ্য ‘হৃদয়বান’ হবার বারটা আরো নিচে। সুতরাং, খুব অবাক না হলেও বিরক্ত হয়েছি এই অংশ পড়ে।
এই একটা জায়গা বাদে ‘অনীশ’ এর প্রতি কোন অভিযোগ নেই। কারন, এই বাড়তি ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট গল্পে যেই বিষয়টা প্রমাণ করতে চেয়েছে, তা এখন ধোপে টিকে না।
[এখানে ‘অনীশ’ এর রিভিউ শেষ। এরপর আর না পড়লেও চলবে। বাকিটা নিজের বইপড়া আর তাঁর সাথে হুমায়ূনপ্রীতির সম্পর্ক নিয়ে কিছু বকবক]
আমি হুমায়ূনের না পড়া বই খুঁজে পেলে খুব উৎফুল্ল হয়ে পড়ি। আর সেই বইটা যখন এই বইয়ের মতো দারুন কিছু হয়, তখন এক সময়ের হুমায়ূনের একনিষ্ঠ পাঠক হিসেবে মনে হয়, ভালোই কাটতো দিনগুলো। মনে জটিলতা অনেক কম ছিল। দশরকম বই পড়ার লোভ ছিল না। এক বই হাজারবার পড়তাম। খারাপ লাগতো না। বই পড়াটাই মূখ্য ছিল। এখন যে নেই, তা না। কিন্তু, খারাপ লাগে যখন টের পাই যে ঠিকই ফাঁকে ফাঁকে ফোনটা কই, এরকম চিন্তা এসেই যায়। আগের মতো নিবিষ্টতা নেই। সেটা কম সময় ধরে পড়লেও নেই। আর দশরকমের বইয়ের প্রতি লোভ এখন হয়েছে বলে অবশ্য আফসোস নেই। কারন, ঘুরেফিরে ঠিকই হুমায়ূন এক অপার স্বস্তির উৎস হিসেবে আজো এই পাঠকজীবনের অংশ।
না। আসলেই মাঝে মাঝে মনে হয় হুমায়ূন আহমেদের মতো আরেকজন লেখক আর কোনদিন আসবে না। আর তাঁর মতো বলতে, তাঁর কপিক্যাটদের অভাববোধ করি, এমন না। তাঁর মতো বলতে এমন লেখককে মনে মনে খুঁজি যিনি নিজের মতো হতে ভয় পান না। লিখতে গিয়ে অমুক অমুক কেউকেটার বাহ্ বাহ্ পাবার ইচ্ছা ত্যাগ করাটা এই দেশে বিরাট সাহসের কাজ, যা তাঁর মধ্যে ছিল। আর তিনি বুঝতেন যে, যা মন থেকে আসে, তা যত্নের সাথে লেখা হলে পাঠককে ঠকানো হবে না। আর এই পাঠককে ঠকাতে না চাওয়ার সততাটা যেসব লেখায় তিনি আনতে পেরেছেন, সেসব লেখার পাঠকপ্রিয়তা কমবার নয়। আর জগতের কোন লেখকের সব লেখা ভালো হয় না। সেটা শেক্সপিয়রেরও হয় নি।
নতুন কারো লেখায় নিজের মতো হবার বিনীত সাহসের যখন ছিঁটেফোঁটাও পাই, তখন তাঁকে ধন্যবাদ দিতে ইচ্ছা করে। কারন, নতুন লেখকদের লেখা পড়ে মন খুলে তারিফ করতে মন চায় আর সেই সুযোগটা একজন দিলে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে যাই।
হুমায়ূনের মতো সহজতম গদ্য লিখতে চেষ্টা করে যাওয়াটা আসলে জরুরী না। কারো লেখায় যখন ‘আমি কি হনু রে’ পাই না, তখন তা মন ভালো করে দেয়। পাঠক হিসেবে বাহাদুরিপূর্ণ লেখা পড়লে বুঝে ফেলি আজকাল যে লেখক মনে করেন যে আমরা মনে হয় ঘাস চাবাই আর এই মনে করাটা কারোর লেখা নিয়ে একবার মাথায় ঢুকে পড়লে আর সেই লেখকের কিছুই পাতে তুলতে মন চায় না। আর নিজের এই দোষের কারনে দেখা যায় অনেক লেখক পরে ভালো লিখছেন জেনেও পড়তে পারি না।
খুব প্রিয় একজন চিত্রনাট্যকার ও চলচ্চিত্রকারের কথা দিয়ে লেখাটা শেষ করছি। সাধারণত, কোন লেখাতে কোট ব্যবহার করি না.. কিন্তু, এটা যেহেতু রিভিউর পাশাপাশি প্রিয়তম লেখকের প্রতি এক ধরণের শ্রদ্ধাঞ্জলি, তাই জরুরী মনে করছি।
“Your writing will be a record of your time. It can't help but be that. But more importantly, if you're honest about who you are, you'll help that person be less lonely in their world because that person will recognise him or herself in you and that will give them hope.” — Charlie Kauffman.
(এই কথাটির আরেকটি ব্যাখ্যা হল মস্ত ক্যানভাসে নিজের স্বরূপ লুকানো কঠিন। ফাঁপা হলে পাঠক বা দর্শকের কাছে সেটা ধরা পড়বেই। )
হুমায়ূনকে ধন্যবাদ যে তিনি তাঁর সময়কে ধরে রেখে আমাদের সহজ জীবন উঠানামার মাঝেই যে কতো সুন্দর, তা বুঝিয়ে দিয়ে যেতে পেরেছিলেন তাঁর বেশিরভাগ লেখায়। একারনেই, তাঁর গদ্যে আমরা বারবার ফিরে যাই। তাঁর গদ্য আসলেই সহজ চিন্তায় অভ্যস্ত একজনকে একটু কম একাকীত্ব বোধে ভোগায় এবং আশা দিয়ে যায় যে জীবনে হরহামেশা হাতী ঘোড়া মারা জরুরী না।