একটি জাতিকে জেগে উঠতে হলে তার প্রকৃত পরিচয়কে জানতে হয়। বাঙালি মুসলমানের পরিচয় “বাঙালি” নাকি “মুসলমান” এই দোলাচালের এক গভীর তমসায় নিমজ্জিত। এই আঁধার থেকে বের হয়ে আলোতে আসার মধ্যেই নিহিত আছে বাঙালি মুসলমানের যাবতীয় কষ্ট, লাঞ্ছনা, আর হতাশা থেকে মুক্তি। কিন্তু কে সেই আঁধারকে উন্মুক্ত করে বাঙালি মুসলমানের জাতিগত পরিচয়কে খোলা আকাশের নিচে দাড় করাবে? তিনি কি ইতিহাস গবেষণায় প্রশিক্ষিত? দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মুক্ত? পুনরুদ্ধার করার চেয়ে পুনরুৎপাদনের দিকেই কি তার খেয়াল?
বাঙালি মুসলমানের জাতিগত পরিচয় নিয়ে জ্ঞানজগতে যা কিছু প্রচলিত আছে তা খণ্ডিত, অসম্পূর্ন এবং প্রায়শঃই বিভ্রান্তিকর। জনপ্রিয় এবং সর্বজনগ্রাহ্য বই-প্রবন্ধ-প্রকাশনা-আলোচনা সবগুলোর মধ্যেই উপস্থিত আছে একটা ওরিয়ান্টালিস্ট কুনজর, যা’ স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে বাঙালি মুসলমানের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে; তাদের জন্ম নির্ণয় করে নিম্নবর্ণের হিন্দুর মধ্যে অথবা বহিরাগত মুসলমানের মধ্যে। জ্যাক দেরিদা, মিশেল ফুকো আর এডোয়ার্ড সাইদের বরাতে "বাঙালি মুসলমান প্রশ্ন" বইটি প্রথমে বাঙালি মুসলমানের ইতিহাসচর্চার মধ্যে থাকা এই কুনজরকে তত্ত্বীয় আর পদ্ধতিগত অঙ্গনে চ্যালেঞ্জ করেছে এবং অগ্রহণযোগ্য প্রতিপন্ন করেছে। এরপর অসীম রায় এবং রিচার্ড ইটনের গবেষণার পাটাতনে দাঁড়িয়ে পূর্ব বাংলার চাষাভুষা প্রান্তিক মুসলমানের আত্মপরিচয়ের চিত্রকল্প এঁকেছে। একই সাথে জাতি, জাতীয়তা এবং জাতিরাষ্ট্র নিয়ে জ্ঞানতাত্ত্বিক আলাপের সূত্র ধরে এই বই বাঙালি মুসলমানকে বাংলার হিন্দু এবং বহিরাগত মুসলমানের থেকে স্বতন্ত্র একটি জাতি হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
বাঙালি মুসলমানের পরিচয় বিষয়ক প্রচলিত জানাশোনার বাইরে সম্পূর্ণ নতুন আলাপ নিয়ে এই বই আপনার চিন্তাজগতে ঝড় তুলবে, বিনাপ্রশ্নে সঠিক বলে গ্রহণ করা জ্ঞানকে জোরালো প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে, এবং সেই সাথে দিবে বাঙালি মুসলমানের সঠিক পরিচয় খোঁজার পথের দিশা।
বাঙালি মুসলমানের জাতিগত পরিচয়ের প্রশ্নের উত্তরে শেষ কথা নয়, বরং জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চায় স্বীকৃত রীতির অনুসরণ করে এই বই আপনাকে উদ্বুদ্ধ করবে বিদ্যমান জ্ঞানের প্রতি প্রশ্ন উত্থাপন করতে, তথ্য ও যুক্তির নিরিখে সাধারণ জানাশোনাগুলোকে যাচাই করে নিতে, নতুন নতুন তত্ত্ব ও পদ্ধতি অনুসরণ করে জ্ঞানের পরিধি বিস্তার করতে।
১. মোগলনামা প্রকাশের আগে দিয়ে একটা দেড়টা ফেসবুক গ্রুপে লেখার অংশবিশেষ পোস্ট করতাম। একটা অধ্যায় লিখতাম, পোস্ট করতাম। লোকে কমেন্ট করত, প্রশ্ন করত। সেসব খুঁজতে গিয়ে নতুন নতুন তথ্য পাইতাম। এর মধ্যে একটা জিনিস খেয়াল করলাম যে যা-ই লিখি না কেন, সেখানে যুক্তিতর্ক, তথ্য না দেইখাই একদল প্রশ্ন করত, ‘রেফারেন্স কী?’ এমনকি বই প্রকাশের পরও এই প্রশ্ন পাইছি। গ্রন্থতালিকা এবং টীকা থাকা সত্ত্বেও এই প্রশ্ন করাটা মেজাজ খারাপ করে। অবশ্য বাংলাদেশে কোনোরকম নীতি, নৈতিকতা ছাড়াই অনেকে উইকি থেকে ‘হনুবাদ’ করে বইটই লিখে ফেলে। রেফারেন্স চাওয়া খারাপ কিছু না, অন্তত যাদের কাছে রেফারেন্স থাকে, তাদের জন্য এইটা কোনো সমস্যা তৈরি করে না। তবে এর মধ্যে আরেকটা জিনিস আমারে বদার করছিল।
বইয়ের একটা রিভিউয়ে একজন কমেন্ট করছিল, ‘বইটা কি অনুবাদ?’ তাকে নেতিবাচক উত্তর দেওয়ার পর পাল্টা প্রশ্ন ছিল, ‘আপনি বলতে চাচ্ছেন মাহমুদুর রহমান গবেষণা করে বইটা লিখেছেন? ওনার গবেষণার উপর প্রশিক্ষণ আছে?’
হাসান মাহমুদের বই নিয়ে লিখতে বসে এই সাতকাহন করার কারণ হাসান মাহমুদ বলছেন ইতিহাস বিষয়ে উপযুক্ত তত্ত্বীয় এবং পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণ না থাকলে ইতিহাস নিয়ে লেখা যায় না। লিখলে সেখানে প্রচুর ভুল তথ্য উপস্থাপিত হয়। এই পর্যন্ত ঠিক ছিল কিন্তু তিনি আসলে বলতে চান এভাবে যারাই যা কিছু লিখেছে তা আসলে কোনো কাজের জিনিস না। যারা যা লিখছে তাদের লেখা কিছুই হয় নাই।
২. বাঙালি মুসলমান সম্পর্কে লিখতে গিয়ে আলোচ্য লেখক প্রথমেই লিখলেন যে তিনি বইটা কীভাবে লিখছেন। অতঃপর তিনি লিখলেন এই বিষয়ে অন্যরা কী লিখেছেন। এরপর তিনি লিখলেন সেই লেখাগুলোতে কী কী সমস্যা ছিল। এ প্রসঙ্গে প্রথমেই তিনি আহমদ ছফার ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ নিয়ে এলেন এবং এটাকে গোঁজামিল বলে সে গোঁজামিলের কিছু প্রমাণও উপস্থাপন করেছেন। অতঃপর আনিসুজ্জামান। এর মধ্যে তিনি জানালেন নিম্নবর্গের হিন্দু থেকে বাঙালি মুসলমানের উৎপত্তি এহেন কথা মিথ্যা। দাবি প্রমাণ করতে দ্বারস্থ হয়েছেন ইটন এবং অসীম রায়ের।
এসবের মধ্যে অরিয়েন্টালিস্ট নজর, বঙ্কিমের হিন্দুত্ববাদ থেকে তিনি এমনকি হোলি আর্টিজান বেকারিতেও ঢুঁ মারেন। বাঙালি মুসলমান নিয়ে তার ধারণা, ধারণার পক্ষে যুক্তি নিয়ে কোনো আপত্তি নেই কিন্তু লেখক যেভাবে নিজের যুক্তি উপস্থাপন করছেন সেখানে কিছু সমস্যা আছে। যেমন লেখকের কোনো দাবীই আসলে কংক্রিট কোনো সূত্র, দৃষ্টান্ত দিয়ে প্রমাণ করা হয়নি। সে প্রসঙ্গে পরে আসা যাবে। প্রথমে তার কিছু ভুল কিংবা একচোখা ধারণার দিকে আসা যাক।
আহমদ ছফার বক্তব্যকে লেখক অস্বীকার করছেন। পাশাপাশি নিয়ে আসছেন বর্তমান সমাজে প্রচলিত একটি পুরনো ধারণা যেখানে মানুষ মনে করে মাদ্রাসা থেকে জঙ্গি তৈরি হয় (সোজা কথা মৌলবাদী)। বাঙালি মুসলমানকে বড় করে দেখা হাসান মাহমুদ (নিম্নবর্গের হিন্দু থেকে বাঙালি মুসলমানের উৎপত্তি কথাটির বিরোধিতা তিনি যেভাবে করেছেন সেটাকে অ্যাকাডেমিক মনে হয়নি, বরং তিনি আহত) গবেষণা ইত্যাদির নানা কথা বলে রাস্তাঘাটের আলোচনার মতো হোলি আর্টিজান বিষয় উত্থাপন করে বলে দিলেন সেখানে জঙ্গিদের আটজনই ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুয়া। অর্থাৎ ইংরেজি মাধ্যমও মৌলবাদী তৈরি করে।
এই বইয়ে এই আলোচনাটি আসার কোনো প্রয়োজনীয়তা ছিল ন। কেননা প্রথমত এই বইয়ের লক্ষ্য বাঙালি মুসলমানের উৎপত্তি নির্দেশ। সে আলোচনায় বর্তমান এ প্রসঙ্গটি যদি এসেই যায় তাহলে বাঙালি মুসলমান মানস এবং বর্তমান জঙ্গিবাদ-রাজনীতির বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন ছিল। মাদ্রাসা সম্পর্কিত একটি রিপোর্টের বরাত ইত্যাদির পাশে হোলি আর্টিজানকে বসিয়ে একটা কথা বলা যুক্তিযুক্ত ছিল না। এই পার্টিকুলার বিষয়টা যতখানি না ধর্মীয় তারচে বেশি আন্তর্জাতিক এবং অর্থনীতি, রাজনীতি থেকে শুরু করে তরুণ মানস—বহুকিছু এখানে আলোচনা করা প্রয়োজন।
৩. বাঙালি মুসলমান প্রশ্ন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে হাসান মাহমুদ কিছু নির্দিষ্ট লেখা নিয়েই কথা বলছেন। এই বইয়ে মূলত লেখকের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ কিছু নেই। বা থাকলেও সেটা স্ট্রংলি বলা হয় না। বঙ্কিম, ছফা, আনিসুজ্জামানের দৈন্য প্রকাশ করে লেখক বাঙালি মুসলমানের উৎপত্তি সম্পর্কে একটা মত দিয়েছেন কিন্তু সেটা পুরোপুরি অসীম রায় এবং ইটনের বরাতে। এ বই তাই একটা মৌলিক বই কম, কিছু বইয়ের সম্মিলিত রিভিউ বেশি মনে হয়।
এখানে বলে রাখা ভালো একাডেমিক কাজগুলো এমন হয় সে সম্পর্কে আমার জানাশোনা আছে। কিন্তু এখানেও এই বইয়ের একটা সীমাবদ্ধতা আমি দেখি। সেটা হলো একাডেমিক গবেষণাপত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনেকটাই নির্মোহভাবে তুলে ধরা হয়। অর্থাৎ, আমার গবেষণায় আমি ভালোমন্দ যা পাইছি তুইলা দিলাম। কিন্তু এখানে লেখকের একটা আবেগ টের পাওয়া যায়। এই আবেগ দুই ধরনের। প্রথমত বাঙালি মুসলমানের স্বরুপ সন্ধানে পুরনো প্রচলিত নিম্নবর্গের হিন্দু থেকে উৎপত্তির বিষয়টি তাকে পীড়া দেয়। দ্বিতীয়ত অন্যরা যে যা লিখেছেন সেসবের প্রতি তীব্র বিরাগ।
সমস্যাটা হয়ে দাঁড়ায় এই দ্বিতীয় বিরাগটা প্রচণ্ড সরাসরি প্রকাশ। একাডেমিক গবেষণায় অন্তত এমন হওয়া উচিৎ না। অন্তত আমার জ্ঞান তাই বলে। পীর কালচার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লেখক অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের প্রসঙ্গ টেনেছেন। আব্দুর রাজ্জাককে পীর বানানো হয়েছে এতে সন্দেহ নেই কিন্তু রাজ্জাক সাহেবের পিএইচডি থিসিস আসল না নকল, তিনি পিএইচডি শেষ করেছিলেন কীনা বা কেন করেননি সে প্রশ্ন এই বইয়ে তোলা আসলেও কোনো প্রয়োজন ছিল না।
৪. বাঙালি মুসলমানের উৎপত্তি নিয়ে লেখক একটি ধারণা দিয়েছেন। সেটা হলো তারা বহিরাগত ছিলেন না। আবার তারা নিম্নবর্গের হিন্দুও ছিলেন না। এরা ছিলেন কৃষিজীবী সমাজের অংশ। মোগল আমলে (লেখকের ভাষায় ‘মুঘল’) মোগল শাসনের অধীনে বন কেটে ফসলী জমি তৈরি করার সময় এই বাঙালি মুসলমানের উৎপত্তি। অর্থাৎ খুবই সহজ একটা কথা। ইতিহাস যারা মোটামুটি পড়ছে, ধারাটা জানে তারা সহজে বুঝবে। এইখানে ষোড়শ সপ্তদশ শতকে জঙ্গল কাটা হইল। কৃষিকাজ শুরু হইল। মোগলদের অধীনে হওয়া এই কাজ এবং প্রসেসের মধ্যে দিয়ে আস্তে আস্তে মানুষ মুসলমান হইতে থাকল।
কিন্তু এখানে প্রশ্ন থাকে, এদের ধর্ম কী ছিল? এই প্রশ্ন করার প্রয়োজন নাই কিংবা প্রয়োজন খুব বেশি। কেননা প্রথমত নিম্নবর্গের প্রশ্ন। সেটা লেখক নাকচ করছেন। দ্বিতীয়ত, পুরো প্রশ্নটাই ‘ধর্মের’। এই ‘মুসলমান হয়ে ওঠা’ গোষ্ঠী অনেকটাই নানা দেবদেবীর উপাসক বলে একটা ধারণা লেখক দিয়েছেন কিন্তু সত্যিকার বিস্তারিত কোনো কথা এখানে নেই। কেননা লেখক এখানে নিজে তেমন কিছু বলেননি। বলেছেন ইটন এবং অসীম রায়ের বরাতে।
আমি সাধারণত গত দেড় দুই বছরে ‘লেখক যা বলেননি’ তা বললে কী হতো এমন কথা রিভিউতে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু হাসান মাহমুদের এই বইয়ে অনেক কিছু থাকা প্রয়োজন ছিল। বইয়ের প্রচ্ছদটা খুব সুন্দর। মনে হয় সত্যিই গ্রামীণ সমাজের মুসলমানদের দেখছি। কিন্তু সেই সমাজটাই এই বইয়ে অনুপস্থিত। এক বইয়েই সব লিখতে হবে এমন না কিন্তু বাঙালি মুসলমানের বিকাশ এবং আজকের পর্যায়ে আসা পর্যন্ত তাদের মানসিকতা এবং যে দৈন্যের কথা লেখক বলছেন সে দৈন্য কেমন করে এলো সেটা জানা প্রয়োজন।
৫. দৈন্য থেকে একটা জিনিস বলা প্রয়োজন। লেখকের মত অনেকটা এমন যে বাঙালি মুসলমানের এই দৈন্য মূলত হিন্দুদের তৈরি করা এবং এখানে ব্রিটিশ প্রভাব ছিল। লেখক মূলত এই দৈন্য থেকে বেরিয়ে আসতে বলছেন। পাশাপাশি তিনি বলছেন আমাদের ইতিহাসে দৈন্য আছে। এ দৈন্যের কারণ হিসেবে তিনি বলেন ইতিহাস গবেষণা করে যারা লিখেছে তাদের এই বিষয়ে তত্ত্বীয় এবং পদ্ধতিগত প���রশিক্ষণ ছিল না। ভালো কথা, ছিল না। কিন্তু হাসান মাহমুদ এমন করে বলেন যে এই প্রশিক্ষণ ছাড়া ইতিহাস লেখাই যাবে না। গোলাম মুরশিদ থেকে শুরু করে মুহম্মদ জাফর ইকবালকে তিনি অভিযোগে বিদ্ধ করেছেন কিন্তু এ কারণে নয় যে তাদের বইয়ে/ লেখায় ভুল আছে বরং এই কারণে যে তাদের তত্ত্বীয় এবং পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণ নেই।
হাসান মাহমুদ অন্তত ৪০/৫০ বার (আনুমানিক) এই কথাটা উল্লেখ করেছেন। বিষয়টা কোনোভাবেই তার খেদ না বরং এক ধরনের অহং প্রকাশ করে। ‘আমি গবেষণার নিয়ম জানি, তুমি জানো না। আমি যা বলতে পারব, তুমি পারবা না’ গোছের। একাডেমিশিয়ানদের মধ্যে এ ধরনের কিছু অহং থাকে, আগেও দেখেছি, কিন্তু একটা বইয়ে একই কথা এভাবে বারবার আসার বিষয়টা অত্যন্ত দৃষ্টিকটু। যে বিষয়টা আগেও বললাম, তথ্য, তত্ত্ব এবং পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করলেই হতো। আনিসুজ্জামান, ছফা কী লিখেছেন সেটা উল্লেখ করলে পাঠক বুঝে নিতো তাদের খামতি কোথায়। হাসান মাহমুদের সেটা বলে দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। যেমন প্রয়োজন ছিল না গোলাম মুরশিদ এবং জাফর ইকবালকে এতো সরাসরি আক্রমন করা।
৬. বইটা কেনার সময় রাজু ভাই (স্বরে অ প্রকাশনীর প্রকাশক) আমাকে বলছিলেন, ‘গালি দিয়েন। সবাই তো দিতেছে।’ গালি দেওয়ার প্রশ্ন আসে না। বিশেষত যে প্রশ্ন নিয়ে লেখক লিখেছেন সে প্রশ্নটা ভ্যালিড। এমনকি লেখকের অ্যাপ্রোচও ঠিক ছিল। কিন্তু আসলে তিনি ঠিক কোথায় পৌঁছতে চাইলেন সেটা আমার বোধগম্য হলো না। তবে শুরু করার জন্য লেখক এবং প্রকাশক ধন্যবাদ পেতে পারেন। 'শুরু' বললাম এ কারণে যে আমার কাছে মনে হয়েছে বিষয়টা আরও অনেক দূর যেতে পারে। বইটার নাম ‘বাঙালি মুসলমান প্রশ্নঃ প্রস্তাবনা’ হলে ভালো হতো। পরবর্তী খণ্ডে বাস্তবতা, সমাজ ইত্যাদি বিষয় আলোচিত হবে। নইলে এখানে যা আছে তা দিয়ে কোনো প্রশ্নেরই উত্তর পাওয়া যায় না।
*১-৫ পর্যন্ত অংশ আমি যে টোন ব্যবহার করেছি, বইটা মূলত এমন টোনে (খানিকটা উন্নাসিক, খানিকটা ক্ষুব্ধ) তবে একটু ভিন্ন ভাষায় লেখা। **গোলাম মুরশিদ এবং জাফর ইকবাল সম্পর্কে লেখকের মত হলো বিশ্বিবদ্যালয়ে অধ্যাপকের পদ এবং বাংলা গদ্যে ভালো দখল ছাড়া এদের তেমন কোনো কৃতিত্ব নেই। আলোচ্য বই পড়ার পর মনে হলো হাসান সাহেবের একটু বাংলা গদ্য অনুশীলন করা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে গোলাম মুরশিদের বই পড়লে খারাপ হয় না। ***তত্ত্বীয় ও পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণ ছাড়া যদি গবেষণা করা না যায় বা গবেষণার ক্রেডিবলিটি না থাকে তাহলে কী গল্প, উপন্যাস লেখার জন্য এইসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে হবে? *৪ বাঙালি ‘গবেষক’দের মন বড় অদ্ভুত।
"বাঙালি মুসলমান প্রশ্ন" বইটা critical thinking মুলত, আপনাকে নতুন করে ভাবাবে।
বাঙালি মুসলমানের পরিচয় বিষয়ক প্রচলিত জানাশোনার বাইরে সম্পূর্ণ নতুন আলাপ নিয়ে এই বই আপনার চিন্তাজগতে ঝড় তুলবে, বিনাপ্রশ্নে সঠিক বলে গ্রহণ করা জ্ঞানকে জোরালো প্রশ্নের মুখে দাড় করিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে, এবং সেই সাথে দিবে বাঙালি মুসলমানের সঠিক পরিচয় খোঁজার পথের দিশা।
সর্বোপরি বইটি বাঙালি মুসলমান সমাজকে জানা-বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন বলে মনে করি।
বই – বাঙালি মুসলমান প্রশ্ন লেখক – হাসান মাহমুদ পেজ সংখ্যা - ১৭৩
Don't judge a book by it's cover! এই বাক্যের উল্টো অর্থের একটা রূপ দেখলাম এইবার। সুন্দর প্রচ্ছদের কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় দেখে বই কিনে কী ঠকাটাই ঠকলাম! এত রিপিটেশন এক কথার, এমন বই আমি আগে আর পড়িনি! কোন গবেষণার প্রশিক্ষণ না থাকলে কেউ গবেষণা করতে পারবে না বা তার গবেষণা গ্রহণযোগ্য হবে না, এই যুক্তি পড়ে ভাবছিলাম আমি চিকিৎসক এর তো সাহিত্য/ইতিহাস/রাজনীতি সব কিছু নিয়ে জ্ঞানার্জন বাদ দিয়ে খালি চিকিৎসা নিয়েই থাকা উচিত! লেখকের কথা থেকেই লেখকের আত্মপরিচয় দেবার এত তীব্র প্রয়াস, ভালো লাগেনি। ৯০% মুসলমানের দেশে তিনি নিজেকে বহিরাগত ভাবতেন, সংস্কৃতির দিক দিয়ে, বিষয়টা খুব বেখাপ্পা লাগল! বইটা কোন একটা নির্দিষ্ট বিন্দুতে গিয়ে ফলপ্রসূ একটা উপসংহারে পৌঁছেছে বলে মনে হয়নি। লেখার স্টাইল এবং পুনরাবৃত্তি, নিজের বক্তব্যের চাইতে অন্যের বক্তব্য যেনতেনভাবে খণ্ডনের প্রতি মনোযোগ এবং মুখ্যত অসীম রায় এবং ইটনের বরাতেই বেশির ভাগ কথাবার্তা বলা ইত্যাদি মিলিয়ে সুখপাঠ্য হয়নি।
ভেবেছিলাম অনেক জ্ঞান অর্জন হবে, উপসংহারে না পৌঁছাতে পারুক অন্তত নতুন কোন দ্বার খুলে দেবে। সেসব দিকে না গিয়ে যা বুঝলাম সারাংশ হল এই যে বাঙালি মুসলমান সম্পর্কে জানতে হলে আগে ইটন এবং অসীম রায়ের লেখা পড়ে আসতে হবে। সে নাহয় পড়লাম। এরপর মেনে নিতে হবে যে বাঙালি মুসলমান স্বতস্ফূর্তভাবে বাংলায় জন্মে গেছে জংগল পরিষ্কার করতে করতে (I mean seriously ! 🙄)। এরপরে রয়েছে বাঙালী মুসলমান জাতিকে সম্ভ্রান্ত প্রমাণের প্রাণন্তকর চেষ্টা। বোধ করি বইটি লেখার উদ্দেশ্য সেই মনোবেদনা থেকেই। বাঙালি মুসলমান সমাজ যদি নিম্ন বর্ণের হিন্দু থেকে উৎপত্তি না হয়ে উচ্চবর্ণের থেকে এসেছে এই যুক্তিতে বেশি লেখাজোখা থাকলে লেখক সম্ভবত বই লেখার ধারেকাছেও যেতেন না। এছাড়াও রয়েছে তার নিজস্ব নানা যুক্তির সংঘর্ষ। যেমন সম্ভ্রান্ত মুসলমান বাঙালি প্রমাণ করতে গিয়ে লেখকের যুক্তি তৎতকালীন নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মুসলিম হিসেবে ধর্মান্তরণকে মেনে না নিলেও জংগল পরিষ্কার করা আদিবাসীদের সম্ভ্রান্ত মেনে নেবার স্বপক্ষের যুক্তিটা বোধগম্য না। আবার এই জংগল কাটা জনগোষ্ঠী কোনভাবেই হিন্দু ছিলনা দাবী করলেও তারা আদিবাসী হিসেবে ঠিক কোন ধর্মের অনুসারী ছিলেন সেটাও বলেননি। জংগল কাটতে কাটতে সেই না জানা ধর্মের লোকজন কেন মুসলমান হয়ে গেল সেটার স্বপক্ষে কোন যুক্তিই দাঁড় করাননি (ইটন আর অসীম রায়ের উদ্ধৃতি উল্লেখ করা ছাড়া)। সাংঘর্ষিক যুক্তিগুলোর আরেকটি উদাহরণ দেই। লেখক দাবী করেছেন ইসলামি ধর্মীয় বিষয়গুলো (যেমন হিজাব পরা) বা ইসলামি সংস্কৃতি বাঙালি মুসলমানের উপর চাপিয়ে দেয়া সাম্রাজ্যবাদের নামান্তর। অন্যদিকে বাঙালি ভাষা আর সংস্কৃতির বিকাশ যা একান্তই হিন্দুদের (আরো স্পেসিফিক করলে পশ্চিমবঙ্গের ভাষা ও সংস্কৃতি) বলে দাবী করে তা বাঙালি মুসলমানের জন্য অগ্রহণযোগ্য দাবী করেছেন। আর এসব কিছুকে বাদ দিয়ে নিজেদের জন্য নতুন সংস্কৃতি তৈরি করতে বলেছেন। ধর্ম আর সংস্কৃতিকে এক করবার প্রয়োজন কেন পড়ল বুঝিনি। আর সেগুলো বাদ দিতে গোঁজামিলের যুক্তি দাঁড় করাতে গিয়ে নতুন আরোপিত সংস্কৃতির জন্ম দিতে চেয়েছেন। সেটা কোন যুক্তিতে ঠিক মাথায় ঢুকছেনা। তারপর আছে কোন লেখক কি মেথডলজি ব্যবহার করেছে বাঙালি মুসলমানের জাতিসত্ত্বা প্রমাণে আর সেই মেথড যে পুরোটাই ভুল তা প্রমাণের নিরন্তর প্রচেষ্টা। সাহিত্য বা দর্শনের কেউ কোনভাবেই ইতিহাস লিখতে পারবেন না সেটা দাবী করা থেকে শুরু করে বঙ্কিম, ছফা, সলীমুল্লাহ, আনিসুজ্জামান সবাই যে অকাট মূর্খতার সাথে ইতিহাস টেনেছে সেটার স্বপক্ষে নানা যুক্তি। বঙ্কিমচন্দ্র যে একজন আপাদমস্তক বর্ণবাদী ছিলেন সেটা অস্বীকার করিনা। তাই বলে তিনি (হাসান মাহমুদ) এবং তার পছন্দের দুই গবেষক (ইটন এবং অসীম রায়) ছাড়া কেউ কিছু বুঝতেন না, জানতেন না এসব দাবী ঠিক কিভাবে সঠিক মাথায় ঢুকলনা। আরো যেটা বিরক্তিকর ছিল ছিল যে কোন কথাবার্তা ছাড়াই বইয়ে নানান লেখককে টেনে আনা। বইয়ের পুরো ২৬১ পৃষ্ঠা জুড়ে বাঙালি মুসলমান সম্ভ্রান্ত প্রমাণ করবার জন্য বঙ্কিম থেকে শুরু করে হালের অধ্যাপক রাজ্জাকের পিএইচডি থিসিসের প্রকাশিত গ্রন্থটিকেও যুদ্ধক্ষেত্রে আনা হয়েছে। তবে তাতে কার সাথে কি এবং কেন আনা হয়েছে সেটা মাথার উপর দিয়েই চলে যাবে। যেমন প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাককে টেনে আনার কোন কারণই খুঁজে পেলাম না। অহেতুক একই কথা বারবার বলা প্রতিটি চ্যাপ্টারে এবং সম্পর্কহীন উদাহরণ টেনে আনা যথেষ্ট বিরক্তি তৈরি করেছে। সাংঘর্ষিক যুক্তিগুলো তো বিপর্যয়ের পর্যায়ে চলে গেছে। একটা ভাল প্রচেষ্টা কিভাবে জলে যায় তার অনন্য উদাহরণ হয়ে রইল বইটি।
১৷ যেহেতু আমার এই বিষয়ে জানাশোনা কিংবা পান্ডিত্য নাই সেহেতু আমি বইটা তথ্য জানার জন্যই পড়েছি। কতটা ঠিক কতটা ভুল সে বিষয়ে আমার ধারণা কম। তবে এখানে লেখক সার্থক এই কারণে যে, এ বিষয়ে জানতে আগ্রহ জন্মেছে আমার ভেতর। ইতিহাস পর্যালোচনা কঠিন কাজ সাথে তথ্য উপাত্ত থাকলে রস কষহীন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে সেখানে লেখক অনেক ভাল মার্ক নিয়ে পাস করেছেন।
২। নিজের মতবাদ দেওয়ার পূর্বের ধারণা বাতিল করেছেন এবং নিজের মতবাদ প্রতিষ্টা করেছেন। প্রতিষ্টা বলাই প্রাসঙ্গিক কেননা তিনি প্রতিটা চ্যাপ্টারে পুরোনো ধ্যান ধারণা কে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন এবং বাতিল করেছেন। আমাদের সমাজের তথাগত যে ধারণা সেগুলো যেভাবে ছুড়ে ফেলেছেন সেটা দরকার আছে বলে মনে হয়েছে কারণ এই ধারণা গুলো এত শক্ত ভাবে মানুষ ধরে আছে যে ছুড়ে না ফেলে দিলে নতুন ভাবে ভাবনা আলোচনায় আসবে না।
৩। এত সময়ের মধ্যে দিয়ে যে পরিবর্তন, মুসলমান সমাজের উৎপত্তি তা মাত্র ১৫০ পাতায় ব্যাখ্যা কম হয়ে যায়। কিন্তু ভাল দিক হলো, লেখাতে অপ্রাসঙ্গিক কথা টেনে আলোচনা বড় করা হয় নি। খারাপ দিক হল কিছু যায়গায় কম আলোচনা হয়ে গেছে। পূর্বের ধারণা বাতিলেই অধিক সময় ব্যয় হয়েছে নিজের ধারণা প্রতিষ্টা তে আরো সময় দিলে খারাপ হত না। লেখক লিখার সময় লেখক হয়তো ভেবেছেন বেশি বড় হয়ে গেলে মানুষ পড়বে কিনা?
৪। এই বইয়ে বিভিন্ন লেখকের লেখাগত পদ্ধতি নিয়ে লেখকের যে প্রশ্ন সেটা ভ্যালিড কিন্তু আমার মনে হয় যে, তাই বলে লিখা উচিত হয় নি এটা বলতে চেয়েছেন। যদি আমার বুঝতে ভুল না থাকে তাহলে আমার মত হল ফিকশনের লেখকদের তথ্য নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। তারা লিখবে কালের গর্ভে বিলীন হবে। যে পাঠক তাদের আকড়ে ধরবে সে আকড়েই থাকবে। যে জানতে চাইবে সে খুজে খুজে বের করবে নিবে। তাদের নিয়ে সময় নষ্ট করাই বোকামী। কারণ বই পড়ে কারো চিন্তা মুক্ত না হলে সে দায় লেখকের একার নয় পাঠকের ও দায় আছে।
৫। এই বইটি নিয়ে আরো আলোচনা হওয়া উচিত।তাতে আরো প্রশ্নের তৈরী হবে। আসবে মতামত। তাতে আমাদের উৎপত্তির ধারণা ক্রমশ বৃদ্ধি পাবে৷
এই বইটি সার্থকতা হল এই যে অনেকদিন পর কেউ একাডেমিক্যালি এই প্রশ্নটি তুলে বিভিন্ন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখানোর চেষ্টা করেছে।
রিচার্ড ইটন ও অসীম রায়ের গবেষণার ভিত্তিতে এই বইয়ে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে পূর্ববঙ্গের বাঙালি মুসলমানদের উৎপত্তি সম্পর্কে এতদিন যে বয়ান দেওয়া হয়েছে তার অসারতা।
বঙ্কিমচন্দ্র, আহমদ ছফা, আনিসুজ্জামান গোলাম মুরশিদের মত লোকরা আমাদের যে জিনিসটা দেখাতে চেয়েছিলেন তার একটা মোক্ষম জবাব একাডেমিক্যালি দেওয়া হয়েছে।
বাঙালি মুসলিম যে এই মাটিরই আদি সন্তান এবং তাদের সম্পর্কে যে শুদ্র গোষ্ঠী থেকে ধর্মান্তরের কথিত তত্ত্ব চালু আছে তার বিরুদ্ধে এই বইটি একটি শক্ত রেফারেন্স হিসেবেই ভবিষ্যতে গণ্য হবে।
তবে বইয়ের ভাষাটি একটু কটমটে হয়ে গেছে। এটাকে সহজবোধ্য করলে পাঠকদের জন্য সুবিধা হত। এই ব্যাপারে পরবর্তীতে আরও লেখা লেখক প্রকাশ করবেন এই আশা করছি।
এই বই একেবারে শুদ্ধ বা প্রামাণিকভাবে প্রমাণ করেছেন এমন না হলেও বেশ ভালভাবে একটা প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। যেটা কিনা অনেকের মাঝে সেই উৎপত্তি খোজার সঙ্গী হবে।
ব্রিটিশ শাসিত বাংলাতে ১৮৭২ সালের আদমশুমারিতে জানা গেল চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, পাবনা ও রাজশাহী জেলায় মুসলমানের সংখ্যা শতকরা ৭০ জনের বেশি, এই হার বগুড়াতে শতকরা ৮০ জনেরও ওপরে। এখানে উল্লেখ্য যে, মুসলমানদের শাসনকেন্দ্র মুর্শিদাবাদে মুসলমানের সংখ্যা শতকরা ৫০ জনেরও কম ছিল। দক্ষিণ ও পূর্ববঙ্গের এই বিশাল মুসলমান জনগোষ্ঠী কোথা হতে এলো? কখন এলো? আর কীভাবেই বা এলো? এসব প্রশ্নমালা শিক্ষিত সমাজে - একটা ব্যাপক বিতর্কের সূত্রপাত করল যা আজ পর্যন্ত আমাদের মাঝে জারি আছে।
বাঙালি জাতির পরিচয় নিয়ে সেই বিতর্কে সর্বপ্রথম অংশ নেন আদমশুমারির প্রধান সরকারি কর্মকর্তা হেনরি বেভারলি নিজেই। বাংলায় মুসলমানদের শাসন কেন্দ্রের বাইরে কীভাবে এত মুসলমান আসল তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বেভারলি বলেন, 'মুঘল রক্ত নয়, বরং নিম্নবর্ণের অধিবাসীরা হিন্দুধর্মের কঠোর বর্ণপ্রথা থেকে ইসলামধর্মে কনভার্ট করেছে।' এরপর কট্টর হিন্দুত্ত্ববাদী বঙ্কিমচন্দ্র তার এক অযৌক্তিক প্রবন্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির ইতিহাসচর্চার যে পদ্ধতিগত এবং তত্ত্বীয় মডেল দাঁড় করিয়ে গেছেন, তা অদ্যাবধি বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসচর্চার মূলধারার অভিমুখ নির্ধারণ করে। আমাদের জাতীয় ইতিহাস চিন্তার আলাপে ‘বহিরাগত বিজয়ী জাতির সংস্কৃতি গ্রহণ/বর্জন করা', “বিজয়ী-বিজিত সংস্কৃতির মধ্যে সমন্বয়' ইত্যাদি অনুমানের মাধ্যমে আর্য জাতির সাথে অনার্যদের মিশে যাওয়া, অথবা অনার্য বা শূদ্রবর্ণের হিন্দু জনগোষ্ঠীর মুসলমান হিসেবে ধর্মান্তরিত হওয়ার অনুমান বঙ্কিমচন্দ্রের পদ্ধতি ও তত্ত্বেরই ধারাবাহিকতা।
বঙ্কিমের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আহমদ ছফা লিখেছেন পক্ষপাতদুষ্ট, বহুল পঠিত বাঙালি মুসলমানের মন' প্রবন্ধ। প্রকৃতপক্ষে, ছফার জবানে বাঙালি মুসলমানের যে বয়ান পাই তার জন্ম আর বেড়ে ওঠা গোঁড়া হিন্দুত্ববাদী লেখকদের (যেমন, বঙ্কিমচন্দ্র, যদুনাথ, রমেশচন্দ্র প্রমুখ) হাতে বলে ঐতিহাসিক এবং সাহিত্য সমালোচকরা একমত"। হিন্দুত্ববাদী এই বয়ানের সারকথা হলো - বাঙালি মুসলমান আদতে নীচুজাতের হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত, গ্রাম্য, খ্যাত, অতীতের কুসংস্কার আঁকড়ে থাকা একটা পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী যার প���রধান কাজ হলো মধ্যযুগের ইসলামে আশ্রয় নিয়ে আধুনিক শিক্ষায় আলোকিত হিন্দু বাঙালির বিরোধিতা করা। অথচ সেইসব হিন্দুর অধীনতার মাধ্যমেই যে তারাও আধুনিক হয়ে উঠবে, প্রগতির পথে চলবে, কুসংস্কার থেকে মুক্তি অর্জন করবে এই সত্য না-বোঝার মতো মূর্খ, বেআক্কেল। দাড়ি-টুপি আর হিজাবের প্রতি প্রগতিশীলদের যে ঘৃণা, মাদরাসার ছাত্রছাত্রীদের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে আর চাকরির বাজারে যে বৈষম্য, এসবের মূলেও এই একই বয়ান যে, বাঙালি মুসলমান অতীতমুখী, আধুনিকতা-বিরোধী, জ্ঞান-বিজ্ঞানবিমুখ এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি অসহিষ্ণু তথা সাম্প্রদায়িক। বাংলা-বিভাগের (এমনকি ভারত বিভাগেরও) দায়ও এজন্যই বাঙালি মুসলমানের। স্বদেশী আন্দোলন (অর্থাৎ বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন) এজন্যই প্রগতিশীলতার অভিমুখী আন্দোলন যার মধ্যে বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম, আর সেই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশপ্রেমিক জাতীয় বীর ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন আর প্রীতিলতা . বাঙালি মুসলমান নিয়ে প্রচলিত ইতিহাস কোনো ঐতিহাসিকের গবেষণা থেকে আসেনি, আর পরবর্তীতে না কোনো ঐতিহাসিকের গবেষণা একে সঠিক হিসেবে প্রতিপন্ন করেছে! উল্লিখিত প্রবন্ধ আর বই দুটোর রচয়িতাদের কারোই ইতিহাস গবেষণায় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ছিল না। হরহামেশাই যাদের এ সংক্রান্ত লেখা প্রকাশিত হচ্ছে, তাদের প্রায় সকলেই হয় বাংলা সাহিত্যে বা দর্শনে এমনকি পদার্থ বিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা নিয়ে রচনা করে চলেছেন বাঙালি জাতির ইতিহাস! অন্যদিকে জাতীয় পর্যায়ে ইতিহাস গবেষক হিসেবে খ্যাতিমানরা আছেন ইতিহাসের অন্যান্য বিষয় নিয়ে। অর্থাৎ, জাতির এবং ব্যক্তির আত্মপরিচয়ের র মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মূলধারার ইতিহাস চর্চা চলছে ইতিহাস। গবেষণায় প্রশিক্ষণবিহীন গবেষক-লেখকদের হাতে।
এই বিষয়টা অনেকটা হাসপাতালের চিকিৎসার কার্যক্রম ডাক্তারিবিদ্যাবিহীন পদাধিকারীদের হাতে ফলাফল হওয়ার দাবি ছেড়ে দেওয়ার মতো। ফলাফল যা হওয়ার কথা তাই হয়েছে। সেই ১৮৮১ সালে সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখে গেছেন, বাঙালি মুসলমান নিশ্চয়ই নিম্নবর্ণের হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়েছে। আমরা দেখছি ১৪০ বছর পরে এসেও আমাদের বর্তমান বুদ্ধিজীবীরা তথ্যবিহীন সেই তত্ত্বেই ঈমান রেখে বাঙালি মুসলমানের ইতিহাসচর্চা এবং সেই অনুযায়ী আমাদের জাতীয় পরিচয় নির্মাণ করে চলেছেন। কিন্তু কেন? ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন হয়ে প্রথমে মুসলমানের জাতিরাষ্ট্র পাকিস্তান তারপর বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরেও কেন হিন্দু জাতীয়তাবাদী একজন সাহিত্যিকের কল্পিত ধারণাকে যথাযথ একাডেমিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরীক্ষা করা হয় না? কেন ইতিহাস গবেষণায় প্রয়োজনীয় তত্ত্ব ও পদ্ধতিগত উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গবেষকদের দিয়ে বাঙালি মুসলমান জাতির উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাস রচিত হয় না?
ইতিহাস গবেষণা একটা পেশাদারি (professional) কাজ, যা যথাযথভাবে করতে গেলে সুনির্দিষ্ট দক্ষতার (expertise) প্রয়োজন হয়। আমরা শারীরিকভাবে অসুস্থ হলে যেমন ইঞ্জিনিয়ারের কাছে না গিয়ে ডাক্তারের কাছে যাই, তেমনি ইতিহাস জানার জন্যও যেতে হবে উপযুক্ত ট্রেনিং নিয়ে পেশাদার হিসেবে স্বীকৃত ঐতিহাসিকের কাছে। আর এসব ট্রেনিং হতে হবে দক্ষ ঐতিহাসিকের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর পড়াশোনা ও গবেষণার মাধ্যমে। পল্লি- চিকিৎসক দিয়ে ওষুধের ফার্মাসি, বড়জোর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার কাজ চলে। কিন্তু রোগ নির্ণয় এবং যথাযথ স্বাস্থ্যসেবার জন্য অন্তত এমবিবিএস পাশ করতেই হয়। অনুরূপভাবে ইতিহাস চর্চায় যোগ্য লোকের দরকার।
দুঃখের বিষয় হলো বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চার কাজটা তুলে দেওয়া হয়েছে অপেশাদার ঐতিহাসিকদের হাতে। যেমন, ডেইলিস্টার-প্রথম আলো গ্রুপের প্রকাশিত সৈয়দ আবুল মকসুদের উল্লিখিত বইটি। এর মূল বক্তব্যকে প্রকাশ করা যায় দুই শব্দে – ভিকটিম ব্লেমিং, অর্থাৎ আক্রান্ত ব্যক্তিই অপরাধী, আক্রমণকারী না। এই গ্রুপ আগেও এমনি করে গোলাম মুরশিদকে ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস' নামের একটা গোঁজামিলে ভরা ইতিহাস বইয়ের জন্য পুরস্কৃত করেছে। “বাংলা একাডেমি' থেকে প্রকাশিত পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক অজয় কুমার রায়ের লেখা ‘আদি বাঙালি: নৃতাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ (১৯৯৭)’- একই ধারার বই, যেখানে নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের কোনোরূপ সংজ্ঞা ছাড়াই বাঙালি জাতির নৃতাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক ইতিহাসের আলোচনা করা হয়েছে। একইভাবে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক জাফর ইকবাল লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। উচ্চতর পর্যায়ে সমাজ, সংস্কৃতি বা ইতিহাস বিষয়ে এদের কারোরই তত্ত্বীয়, পদ্ধতিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং গবেষণা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পদ আর বাংলা গদ্য-লেখায় পারদর্শিতা ছাড়া তাদের আর কোনো দক্ষতা নেই উল্লিখিত বইগুলো লেখার জন্য। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা বই এবং প্রবন্ধ লিখেছেন এবং সেগুলো গ্রহণযোগ্য জ্ঞানের স্বীকৃতি পেয়েছে। অথচ, একটু মনোযোগ দিয়ে পাঠ করলেই দেখা যায় যে, এসব লেখা গোঁজামিলে ভরা। আর উল্লিখিত বিষয়ে সত্যিকার পেশাগত দক্ষতা থাকলে সুনির্দিষ্ট করেই চিহ্নিত করা যায় এসব রচনার মধ্যকার তত্ত্বীয় এবং পদ্ধতিগত ভুলভাল যার খানিকটা উপরে আলোচনা করেছি।
বঙ্কিমের এই ধারা থেকে সম্পূর্ণভাবে বের হতে না- পারলে বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদের ইতিহাসের সঠিক পাঠ অসম্ভব। ফলে ৯০% ভাগ বাংলাদেশি নাগরিক তথা বাঙালি মুসলমানের জাতীয় পরিচয় নির্ণয় এবং তাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করে জাতীয়তাবাদ নির্মাণ করাও অসম্ভব। বঙ্কিমের ধারায় পদ্ধতিগত নানান মৌলিক সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান। এসবকে সংশোধনের মাধ্যমে অধিক গ্রহণযোগ্য ও ফলপ্রসূ পদ্ধতিতে ইতিহাসচর্চা করতে হবে। কিন্তু একইসাথে বঙ্কিমের তত্ত্বের মধ্যে আর্যরক্তের ভিত্তিতে বাঙালিত্ব নির্ণয় করার অনুসিদ্ধান্তকেও অতিক্রম করতে হবে। . অসীম রায়ের গবেষণা থেকে জেনেছি যে, পূর্ববাংলার এই গ্রামীণ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী নিম্নবর্গের থেকে ইসলামধর্মে ধর্মান্তরিত হয়নি, আবার বাইরে থেকে মাইগ্রেট করেও আসেনি। এদের জন্ম এই বাংলার মাটি-আলো-বাতাসের মধ্যেই। এই অঞ্চলে নতুন জেগে ওঠা পাললিক চরাঞ্চলে জঙ্গল পরিষ্কার করে চাষাবাদ বিস্তারের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এই জনগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটেছে স্থানীয় নিম্নবর্গের আদিবাসী তথা কৃষিজীবী, মৎস্যজীবী, বনবাসী, নৌকাবাসী এবং অনুরূপ অন্যান্য জনগোষ্ঠী থেকে। প্রাথমিক পর্যায়ে এদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের কবরে মাজার বা খানকাহ প্রতিষ্ঠা হলে কালক্রমে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তারা পীর হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এরও পরের ধাপে মুসলমান সাহিত্যিকরা সাংস্কৃতিক দূতিয়াল হিসেবে এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে আবির্ভূত হন এবং আরব-ইরানের ইসলামের সাথে এই জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি এবং পার্শ্ববর্তী হিন্দু ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির সমন্বয়ে একটা স্বতন্ত্র সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটে যা উদীয়মান এই মুসলমান কৃষকসমাজের সাথে অভিজাত নগরবাসী মুসলমান সমাজের সাথে যোগসূত্র স্থাপন করেন।
এই মুসলিম সমাজের সূচনা হয়েছে নিম্নবর্গের আদিবাসী তথা কৃষিজীবী, মৎস্যজীবী, বনবাসী, নৌকাবাসী এবং অনুরূপ অন্যান্য জনগোষ্ঠীসমূহ থেকে। অর্থাৎ, এই মুসলমান সমাজ বাংলার বাইরে থেকেও আসেনি, আবার স্থানীয় নিম্নবর্ণের হিন্দু থেকেও ধর্মান্তরিত হয়নি। আর এই সমাজে পীর হিসেবে পরিচিতরাও মূলত সুফি দরবেশ ছিলেন না। বরং তারা ছিলেন দুঃসাহসী ও অগ্রবর্তী কিছু মুসলমান। এদের মধ্যে কিছু সংখ্যক ধর্মীয় ব্যক্ত��ত্ব থাকলেও অধিকাংশই ছিলেন সমাজনেতা, যারা জলা-জংলার মধ্য থেকে কৃষিজমি বিস্তারের পাশাপাশি উদীয়মান কৃষকসমাজে সামাজিক শৃঙ্খলা, কর্তৃত্ব ও বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। নেতৃস্থানীয় বিশেষ ব্যক্তিকে পীর হিসেবে বরণ করার পাশাপাশি স্থানীয় জনতা তার কর্মক্ষেত্রে খানকাহ (আশ্রম/আখড়া) আর মৃত্যুর পর কবরের ওপর দরগাহ বা মাজার গড়ে তোলে, যা উদীয়মান সমাজের স্নায়ুকেন্দ্র হিসেবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জাগতিক, ধর্মীয় ও মানসিক নানাবিধ চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
ব্যক্তি তার পুর্বপুরুষদের সাথে একাত্ম হতে চায়, তাদের সংগ্রামকে এম্ব্রেস করতে চায়। তাদের জাতিগত শৈশব, শিশুকালের স্মৃতিকে ধারণ করতে চায়। আর এই ধারণ করতে চাওয়া থেকেই আসে পরিচয় খোঁজার কার্যক্রম। পরিচয় খোঁজা এবং এরপরে খুঁজে পাওয়া পরিচয়ের ভিত্তিতে যে কমিউনিটি পাওয়া যায় সেখানে নিজেকে সংযুক্ত করার মাধ্যমেই আত্মপরিচয়ের সংকট কাটে।
বাংলাদেশের মুসলমান সমাজের সেই আত্মপরিয়চের সংকট বহুদিনের। বঙ্কিমচন্দ্র প্রবন্ধ লিখে এই সংকট নিরসনের চেষ্টা শুরু করেছিলেন, বলা বাহুল্য তা ছিল চরম সাম্প্রদায়িক এবং ঘৃণ্য রাজনৈতিক চিন্তাসম্পন্ন। এরপরে বহুকালে বহুজন লিখেছেন, আহমদ ছফার বাঙালি মুসলমান মন কিংবা গোলাম মুরশিদের হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি সব একই ধারার লেখা। অর্থাৎ রেটোরিক ভিন্ন ভিন্ন হলেও প্রায়ই উপসংহার এসে একই সরলরেখায় মিশে যায়। বাঙালি মুসলমান সমাজ নিম্ন বর্ণের হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত তত্ব, বহিরাগত মুসলমান তত্ব এ যেন সব লেখার একই পরিণতি।
বাঙালি মুসলমান প্রশ্নে লেখক হাসান মাহমুদ অন্যদের মতো প্রথমেই পরিচয়ের সংকট নিরসনে উদ্যোগী হননি। হয়তো সেটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু মাহমুদ মনে করেছেন প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে অন্যরা যেসব উত্তর দিয়েছেন সেখানে কী কী সমস্যা আছে সেটা দেখানো জরুরি। অর্থাৎ নতুন করে প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আগের উত্তরের সঙ্গে যদি কলিশন করে অবশ্যই আগের উত্তরের কী কী দোষে নতুন উত্তরের প্রয়োজন হলো সেটা প্রথমেই বলে নেয়া বাঞ্ছনীয়। লেখক তাই করেছেন। ওরিয়েন্টালিস্ট নজরে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন কেন সব লেখার উপসংহার একই পথের পথিক হয়।
পুর্বের লেখার সমস্যা, এবং সেই সমস্যার কারণ উদ্ঘাটনের পরে হাসান মাহমুদ শুরু করেছেন মূল আলাপ। অর্থাৎ বাঙালি মুসলমানের উৎপত্তি, তার জন্মের ইতিহাস-রাজনীতি। প্রথমে মনে হয়েছিল লেখক বোধহয় তার নিজের কোন গবেষণা তুলে ধরবেন। তবে আশার কথা তার প্রয়োজন হয়নি। বরং বাঙালি মুসলমানের জন্ম-ইতিহাস নিয়ে খুব প্রসিদ্ধ দুইটি গবেষণা সেই '৮৩ এবং '৯৩-থেকেই জনপরিসরে উপস্থিত। যদি প্রসিদ্ধই হবে তবে আর এই বই লেখার প্রয়োজন হলো কেন? ওয়েল, লেখক দাবি করেছেন উপরোক্ত দুই গবেষণাই প্রচলিত ধারায় পড়া হয়েছে আংশিক এবং ভুলভাবে। খুব বড় ধরনের আপত্তি, কারণ জনপ্রিয় বিভিন্ন এক্টিভিস্ট-লেখক যেমন সলিমুল্লাহ খান এই গবেষণা নিয়ে কথা বলেছেন আপত্তি তুলেছেন। তবে লেখক সঠিকভাবে পড়া এবং সম্পূর্ণ পড়া বলতে কী বলতে চাইছেন?
অধ্যায় নম্বর ৩ এবং ৪-এ যথাক্রমে অসীম রায় এবং রিচার্ড ইটনের গবেষণাকে হাসান মাহমুদ পড়ছেন প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার নিমিত্তে এবং একই সাথে প্রচলিত ধারায় যে সমালোচনার উপস্থিতি তা কেন ভুল উপস্থাপন, তা ব্যাখ্যা করে।
অসীম রায়ের সমন্বয়ী ইসলামের ধারণাকে আংশিক ধারণ করে বলা হয় বাংলায় ইসলাম প্রচার হয়েছে পীর-দরবেশদের মাধ্যমে এবং তাই বাংলার ইসলাম সূফী-ইসলাম। এই কথার প্রথম আলোচনা অসীম রায় করলেও মোটেও এভাবে করেননি। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন কিভাবে ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব না হয়েও পীরিফিকেশন হয়েছে এবং সামাজিকভাবেই ইসলামের প্রচার হয়েছে। তার গবেষণাকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার সমালোচনা করেছেন হাসান মাহমুদ।
রিচার্ড ইটনের সাড়া জাগানো The rise of Islam and the Bengal Frontier গবেষণাগ্রন্থকে নির্ভর করে গড়ে উঠেছে চতুর্থ অধ্যায়। রিচার্ড ইটনের দাবি, বাংলায় মুসলমান সমাজের আবির্ভাব মুঘল আমলের একদম গোড়াপত্তনের সময়ে এবং কৃষি-সম্প্রসারণ প্রক্রিয়ায়। একইসাথে রিচার্ড ইটন প্রচলিত নিম্ন বর্ণের হিন্দু থেকে ধর্ম পরিবর্তন করে ইসলামে আসা কিংবা বহিরাগত মানুষের মাধ্যমে ইসলামের আবির্ভাব তত্বের ইতি টেনেছেন।
সর্বশেষ অধ্যায়ে মাহমুদ সামগ্রিকভাবে পুরো আলোচনার ইতি টেনেছেন জাতি-জাতিরাষ্ট্রের অল্প আলাপ, পরিচয়ের রাজনীতির আলোচনা এবং উপরোক্ত গবেষণাদ্বয়ের ব্যাপারে সমালোচকদের আপত্তির জবাব দিয়ে।
সামগ্রিকভাবে যদি এক বাক্যে বইয়ের পরিচয় দিতে চাই তবে, "বাঙালি মুসলমানের পরিচয়মূলক আলাপে বিরাজমান চিন্তার ভ্রান্তি, রায়-ইটনের গবেষণার সারমর্ম, সমালোচনার জবাব এবং উক্ত বিষয়গুলোর সমন্বয়ে বাঙালি মুসলমান প্রশ্নের উত্তর।" ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে পড়ে বেশ চিন্তার খোরাক যোগায় এমন লেখা মনে হয়েছে। আহমদ ছফার বাঙালি মুসলমান মন এবং বঙ্কিমের আলোচিত দুই প্রবন্ধ আগে পড়া থাকায় আলোচনা ধরতে সুবিধা হয়েছে মনে হলো। তবে অসীম রায় আর রিচার্ড ইটনের গবেষণা দুটো আমার সামগ্রিকভাবে পড়া হয়নি। অর্ডার করেছি, আজকে হাতে পাবার কথা। গবেষণাদুটো পড়া হলে বোধহয় আরো ভালো করে আমি বুঝতে পারবো।
রকমারি, গুডরিডস সহ বিভিন্ন জায়গায় বইয়ের সমালোচনাগুলো পড়ে মনে হলো বেশিরভাগ পাঠক সামহাও নতুন তত্ত্ব নিতে খুব অস্বস্তিতে আছেন এবং ভুল পাঠ করেছেন। হ্যাঁ, হাসান মাহমুদের গদ্য লেখার দক্ষতার প্রশংসা করাটা কঠিন। আলোচনার মোড় বিভিন্ন জায়গায় অযাচিত ভাবে ঘুরে গেছে। আশা করছি গদ্যে তিনি ধীরে ধীরে দক্ষ হয়ে উঠবেন। তবে মূল আলাপ হাজিরের ধরনে তিনি প্রশংসার দাবিদার।
সামগ্রিকভাবে যদি বলি, লেখক অনেক অনেক পড়ালেখা আর পরিশ্রম করেছেন বইটি লেখার পেছনে এবং লেখক যথেষ্ট সৎ তার আলোচনায়। এই দুই প্যারামিটারের কারণেই আমি আপনাদের বইটি পড়তে উৎসাহ দেবো। প্রচলিত কাঠামো ভেঙে এক নতুন(!) আলাপ দেখে আপনার ভালো লাগবে আশা করছি। যদিও পড়ার শেষে একটা আত্মতৃপ্তি কাজ করবে। অন্তত বাঙালি পরিচয়ের ইতিহাস নিয়ে যাদের আগে থেকে কিছুটা হীনমন্যতা বা সন্দেহ ছিল তাদের তো অবশ্যই। আর আমি বরাবরই কোন কিছু পড়া শেষে তৃপ্তি পেলে মনে হয় আমি বোধহয় কনফার্মেশন বায়াসের মধ্যে আছি। তাই কিছুটা চিন্তিতও বটে। রিচার্ড ইটনের বইটা পড়ার পরে এই বইটা আবার পড়ব ভেবেছি।
Hasan Mahmud-কে ধন্যবাদ বাঙালি মুসলমানের পরিচয়ের মতো গুরুত্বপুর্ণ অথচ বেশ অবহেলিত একটা আলোচনাকে একাডেমিক ধাঁচে তুলে আনার জন্য।