[সম্পাদকীয় নোট: পার্থ চট্টোপাধ্যায় সুপরিচিত তাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। এ সাক্ষাৎকারে তিনি কথা বলেছেন তাঁর স্বভাবসুলভ স্থিতধী ভঙ্গিতে – বাস্তব-পরিস্থিতির কোল ঘেঁষে। প্রশ্নকর্তা হিসাবে সারোয়ার তুষার দুটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিশিষ্টতা সঞ্চারিত করতে পেরেছেন পুরো কথোপকথনে। একদিকে পার্থের নিজের ও সংশ্লিষ্ট কিছু লেখালেখির উপর কার্যকর অধিকার নিয়ে তিনি প্রশ্ন সাজিয়েছেন, অন্যদিকে বাস্তব রাজনীতি ও করণীয় সম্পর্কে দিক-নির্দেশনাও তার আকাঙ্ক্ষায় ছিল। দুয়ে মিলে বিশ্লেষণধর্মী সাক্ষাৎকারটি হয়ে উঠেছে ‘ভাব ও কাজে’র চমৎকার নির্দেশনা।]
বাঙালি মুসলমানের মন অথবা অলৌকিকতার ভূত ।। সলিমুল্লাহ খান
[সম্পাদকীয় নোট: আহমদ ছফার ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ প্রকাশের পর থেকেই বহু পাঠকের সমালোচনা ও প্রশংসায় ধন্য হয়েছে। সম্প্রতি ‘বাঙালি মুসলমান’ বর্গটি নানা কারণে একাডেমিক-বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় নতুন গুরুত্ব পাওয়ার প্রেক্ষাপটে এ প্রবন্ধ আবার আলোচনায় এসেছে। সলিমুল্লাহ খানের বর্তমান প্রবন্ধটি তার ধারাবাহিকতায় রচিত। তবে এ প্রবন্ধকে বলা যায় ‘বাঙালি মুসলমানের মনে’র সমালোচনার সমালোচনা। প্রাবন্ধিক দেখিয়েছেন, ছফার প্রবন্ধের আলংকারিকতা ও অন্তঃস্থ প্রেরণার দিকে যথেষ্ট মনোযোগ না দিয়ে অধিকাংশ আলোচক আক্ষরিক পাঠ আমল করেছেন। ফলে ছফার বক্তব্যের মর্ম ক্ষুণ্ন হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে সলিমুল্লাহ খান অন্যদের ভ্রান্তি-নির্দেশের পাশাপাশি ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধের পাঠ-পদ্ধতিও নির্দেশ করেছেন।]
বাংলার দর্শন : দেহ, ভাব ও ভাষা ।। রায়হান রাইন
[সম্পাদকীয় নোট: দেহ ও ভাবের সম্বন্ধ এবং ভাষার সীমানা দর্শনের এক গোড়ার আলাপ। রায়হান রাইন এ প্রবন্ধে কথাগুলো তুলেছেন বাংলা অঞ্চলের উপনিবেশ-পূর্ব ভাবের বলয়ে। এলানো পরিচিতিমূলকতার বদলে তিনি গেছেন নির্দিষ্ট প্রশ্নের পর্যালোচনায়। চর্যাপদ, বাংলা সুফি-সাহিত্য, লালনের কালাম ইত্যাদি তিনি পড়েছেন বিশুদ্ধ দার্শনিক রচনা হিসাবে। পশ্চিমে আর পুবেও গেছেন তিনি, তবে বাংলার দর্শনের আলোচনাকে পদ্ধতির দিক থেকে ওগুলোর মুখাপেক্ষী করে তোলেননি। পরিচ্ছন্ন ভাষা ও পরিভাষার ব্যবহার এ রচনায় দৃষ্টিগ্রাহ্য রূপ পেয়েছে। তাতে শুধু জানা-বোঝার সুবিধা হয়েছে এমন নয়, বাংলা ভাষায় দর্শন-চর্চার অনায়াস সহজতাও প্রকাশিত হয়েছে।]
‘বাঙালী জীবনে রমণী’ : এক ‘আত্মঘাতী বাঙালি’র খণ্ডিত বাঙালি-জীবন পাঠ ।। মো মেহেদী হাসান
[সম্পাদকীয় নোট: এ প্রবন্ধে লেখক নীরদচন্দ্র চৌধুরীর বিখ্যাত বই বাঙালী জীবনে রমণীর পর্যালোচনা করেছেন; বলা যায়, উপনিবেশ-শাস্ত্রের এলাকায় দাঁড়িয়ে বইটির অপূর্ণতা নির্দেশ করেছেন। ‘প্রেম’ ও ‘কামে’র বাইনারিকে ভিত্তি করে নীরদচন্দ্র বাঙালির অতীত-কালিমার বিপরীতে উনিশ শতকীয় আলোর যে ফিরিস্তি তৈরি করেছেন, লেখক দেখিয়েছেন, তা শুধু খণ্ডিতই নয়, বহুকিছু না-দেখার দোষেও দুষ্ট। ‘না-দেখা’ উপাদানগুলোর তত্ত্বতালাশে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন দীনেশচন্দ্র সেনের। তাতে দেখা যায়, ঔপনিবেশিক জ্ঞানের ছায়ায় নির্মিত এরকম বহু প্রভাবশালী বয়ান আমাদের খণ্ডিত ‘আত্মজ্ঞান’ উপহার দেয়, যেখানে ওই একই সময়ে রচিত কোনো কোনো বয়ানে তুলনামূলক লিবারেল দৃষ্টিভঙ্গি খুবই সুলভ, যেমন পাওয়া যায় দীনেশচন্দ্র সেনের রচনায়।]
জরথুস্ত্রের ধর্মতত্ত্ব, মহাজাগতিক দ্বন্দ্ব এবং পৃথিবীতে তার প্রতিমান ।। মুহাম্মদ তানিম নওশাদ
[সম্পাদকীয় নোট: জরথুস্ত্রের ধর্ম দুনিয়ার বিধিবদ্ধ ধর্মগুলোর মধ্যে প্রাচীনতম। এ ধর্মের প্রভাব পড়েছে একদিকে ভারতীয় প্রধান ধর্মগুলোতে, অন্যদিকে প্রতিবেশী একেশ্বরবাদী ধর্মগুলোতে। বর্তমান প্রবন্ধে প্রধানত সৃষ্টিতত্ত্ব, ভালো-মন্দের দ্বন্দ্ব এবং ধর্ম-প্রচারকের দিক থেকে দুনিয়ার প্রধান কয়েকটি ধর্মের সাথে জরথুস্ত্রের ধর্মের তুলনা টানা হয়েছে। দেখানো হয়েছে, চিন্তা ও কল্পনার কাঠামোগত দিক থেকে পরবর্তী বহু ধর্ম ওই পুরনো ধর্ম ও ধর্মতত্ত্বের কাছে ঋণী। আলোচনাটা শেষতক এগিয়েছে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের ছাঁচে।]
[সম্পাদকীয় নোট: পুঁজি-শাসিত বিশ্ব-সংস্কৃতি পড়ার জন্য সিনেমা আজকাল হয়ে উঠেছে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য টেক্সট, আর পুঁজি ও প্রযুক্তি-ঘন মাধ্যম হিসাবে সিনেমা-পাঠই হতে পারে একালের সংস্কৃতি-পাঠের সবচেয়ে সুফলা মাধ্যম – পারভেজ আলমের প্রবন্ধটি এ সত্যের সুন্দর উদাহরণ। দা বিগ লেবস্কি প্রাবন্ধিকের প্রধান অবলম্বন। এ সিনেমার অন্দরে ঢুকেছেন তিনি। তবে তার লক্ষ্য ছিল বেশ কিছু প্রবণতাকে স্পর্শ করা। বাণিজ্যিক সিনেমা এবং তুলনামূলক ‘আইডিয়া-প্রধান’ সিনেমার মধ্যে আবশ্যক কোনো বিরোধ তৈরি করা ছাড়াই তিনি জনপ্রিয় সংস্কৃতি-পাঠের চৌকাঠে বিচরণ করেছেন। সাথে আছেন যথারীতি দেরিদা ও আগামবেন, এবং রাজনৈতিক তৎপরতাকে বানিয়েছেন নিজের চূড়ান্ত নিশানা।]
নীলচাষ ও রামমোহন ।। দেবোত্তম চক্রবর্তী
[সম্পাদকীয় নোট: ব্রিটিশ-ভারতে নীলচাষ ও তার পরিণতির আংশিক ফিরিস্তি আছে এ প্রবন্ধে। সাথে আঠারশ বিশ ও তিরিশের দশকে এ বিষয়ে বাঙালি ভদ্রলোকশ্রেণির তৎপরতার প্রতিবেদন। তাতে উপনিবেশায়ন-প্রক্রিয়ার এক গভীর ও অন্তরঙ্গ চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু প্রবন্ধটির মূল লক্ষ্য নীলচাষের সামগ্রিক আবহে রাজা রামমোহন রায়ের অবস্থানের পর্যালোচনা। আমাদের প্রভাবশালী বয়ানগুলোতে নীলচাষ-বিষয়ক রামমোহনের অবস্থান ও মতামতকে ব্যাপকভাবে লিবারেল ও আধুনিক ডিসকোর্সের সাথে মিলিয়ে দেখার রেওয়াজ আছে। এ প্রবন্ধ পরিষ্কারভাবে সাক্ষ্য দেয়, উপনিবেশের কার্যকারণ ও শ্রেণিস্বার্থের বাইরে রামমোহন আদতে কিছুই করেননি; আর তাঁর নৈতিক-দার্শনিক অবস্থানগুলোও আসলে ভারতবর্ষস্থ অ-শাসক ইউরোপীয়দের একাংশের অনুকৃতি মাত্র – কোনো অর্থেই পরাধীন দেশে স্বাধীন কর্তাসত্তার অনুশীলন নয়।]