দেবেশ রায়ের জন্ম ১৯৩৬ সালে অধুনা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পাবনা জেলার বাগমারা গ্রামে। ১৯৪৩ সালে তাঁর পরিবার জলপাইগুড়ি চলে আসেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার সময় প্রত্যক্ষ বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। রাজনীতির সূত্রে শিখেছিলেন রাজবংশী ভাষা। কলকাতা শহরেও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সে একজন গবেষণা সহকর্মী ছিলেন। তাঁর প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় ১৯৫৩ সালে জলার্ক পত্রিকায়। প্রথম উপন্যাস ‘যযাতি’। ১৯৭৯ সাল থেকে তিনি এক দশক পরিচয় পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ১৯৯০ সালে ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’ উপন্যাসের জন্যে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ২০২০ সালে কলকাতার একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে দেবেশ রায়ের জীবনাবসান হয়।
ভারতের জাতিভেদ প্রথা ও অস্পৃশ্যতার ভয়াবহ প্রকৃতি ও শোষণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করে যে সাহিত্য রচিত হচ্ছে তা-ই দলিত সাহিত্য। ‘দলিত’ কথাটার মানে হচ্ছে ধর্মের নামে ও অন্যান্য কারনে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে শোষিত ও নির্যাতিত জনগণ। দলিত লেখকেরা আশা করেন এই শোষিত জনগণ এই দেশে একদিন বিপ্লব করবেন। দলিত সাহিত্যিক অর্জুন ডাঙলে সম্পাদিত ‘পয়জনড ব্রেড’ দলিত সাহিত্য সংকলন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলা ভাষায় এই সংকলনটি করা হয়। অনুবাদ করেছেন নবারুণ ভট্টাচার্যের মতো কয়েকজন প্রথিত লেখকগণ। এই সংকলনে মারাঠীর সঙ্গে গুজরাটি ও কন্নড় থেকেও লেখা সংকলিত হয়েছে।
জাতপাতের দ্বন্দ্ব এবং সামাজিক শোষণের স্বীকার মহারাষ্ট্রের দলিত গোষ্ঠী ড. অম্বেডকরের নেতৃত্বে সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি যে সৃজনশীল রচনার জোয়ার এনেছিল সেই সকল কবিতা কথাসাহিত্য এবং আত্মজীবনীর কিছু অংশ দিয়ে সাজানো হয়েছে এই সংকলন। এসকল রচনাকর্মের মধ্যে দিয়ে উঠে আসে দলিতদের শোচনীয় দারিদ্র, দুর্দশা, অধীনতা, অপমান, বর্বরতার বিরুদ্ধে আবেগমথিত ক্রন্দন, নরনারীর সম্পর্ক, গ্রাম্য কঠোর জীবনচক্রে পিষ্ট হাহাকার, আরও অনেক কিছু… অবশ্যই একটি মন খারাপ করা বই। আত্মজীবনীর সংক্ষিপ্ত অংশগুলো পড়ে পুরো বইটি পড়বার ইচ্ছে জাগে। সাহিত্যগুনাগুনে দলিত সাহিত্য যথেষ্ট উচ্চমানের। শঙ্কররাও খরাটের কুয়োর ভেতর মড়া; দয়া পাওয়ারের খোকা পেট ভরে খা; কুমুদ পাওড়ের আমার সংস্কৃত পড়া, প্রভৃতি কাহিনীগুলো বেশ চমকপ্রদ।
কবিতাগুলোর অনুবাদের পাশাপাশি মূল কবিতা শুনলে বা পড়তে পারলে বেশ হত। ইউটিউবে কয়েকটা মারাঠি কবিতা শুনলাম। মনে হলো বুঝতে পারছি কিছু কিছু। মারাঠি শেখা তেমন কঠিন কিছু হবে না বোধহয় (যদি হিন্দিটা টুকটাক জানা থাকে) মারাঠী সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ জেগেছে কোর্ট (২০১৪) নামের একটা মারাঠী সিনেমা দেখার পর থেকে। সিনেমাটা দেখে আমার খুব ভালো লাগে। সে সাথে এও বুঝতে পারি যে মহারাষ্ট্রের ইতিহাস আর সাহিত্য সম্পর্কে আমার তেমন জানাশোনা নাই। এই গ্রন্থটা হাতে পেয়ে বেশ উপকার হয়েছে।