দুটি ভিন্ন স্বাদের বিজ্ঞান কল্পগল্প নিয়ে এই আয়োজন।
১৯৭১ সালে পুরনো ঢাকার শ্রীশ দান লেনে অবস্থিত বিখ্যাত বিউটি বোর্ডিং এ সংঘটিত নির্মম হত্যাকান্ডের পঁয়তাল্লিশ বছর পর এই ঘটনার এক রহস্যময় জট খুলতে সচেষ্ট হয়েছিলেন গেন্ডারিয়া থানার সহকারী পুলিশ কমিশনার আহসান কবির। স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার রুমানা আতিকের ধরিয়ে দেয়া একটি অদ্ভুত গল্পের পেছনে ছুটতে ছুটতে আশ্চর্য সব ঘটনার কথা জানতে পারেন তিনি। বাংলার শ্রেষ্ঠ কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী-চলচ্চিত্রকাররাও যে রহস্যের সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে পড়ছেন, তার একটা সুষ্ঠু বৈজ্ঞানিক যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা তুলে ধরাই ছিল আহসান কবির ও রুমানা আতিকের উদ্দেশ্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিউটি বোর্ডিং রহস্য পুরোটা কি উন্মোচিত হবে পাঠকের সামনে?
তেমনি মৌলভিবাজারের কুলাউড়া থানার কালাপাহাড়ের ওপারে এক আদিবাসী লালেং গ্রামের পাথর সম্প্রদায় একে একে যখন তাদের ভাষা, শব্দ, ঐতিহ্য, কৃষ্টি, আচার সব ভুলে যাচ্ছিল তখন খাসিয়া তরুণ সাংবাদিক সাজু মারসিয়াং আর ঢাকার জাতীয় নিউরোসায়েন্স ইনসিস্টটিউটের পিএইচডির ছাত্রী ইশরাত খন্দকার মরিয়া হয়ে ওঠে এর কারণ নির্ণয় করে একটা সমাধানে পৌঁছার জন্য। আর একটা যথাযথ বৈজ্ঞানিক সমাধানে পৌঁছাতে গিয়ে নিজেদের জীবনই এক সময় বিপন্ন করে তোলে তারা।
তানজিনা হোসেনের জন্ম ১৯৭৫ সালে। বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা ঢাকায়। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে বিজ্ঞান কল্পগল্প ও ফিকশন দিয়ে লেখালেখির শুরু। পাশাপাশি নিয়মিত ছোটগল্প লিখে আসছেন। প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘অগ্নিপায়ী’ (২০০৬)। তানজিনা হোসেন পেশায় চিকিৎসক। শিক্ষকতা করেন ঢাকার একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে।
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া লিখছি। অগোছালো লাগতে পারে। তবু মনে হলে গল্পদুটোর ব্যাপারে ঝটপট আলাপ করে নেই।
বইটা একটু বেশি আঁটসাট। টাইট। ডালপালা মেলার ফুরসত পায়নি। তবে আইডিয়া ভালো। লেখনী ভালো। সাবলীল। স্বচ্ছন্দ। সাইফাই হিসেবে বেশ ব্যতিক্রমী প্লট নিয়ে হাজির হয়েছেন তানজিনা হোসেন যা প্রশংসার দাবীদার।
এই বইয়ের গুডরিডস রিভিউয়ে দেখলাম একজন 'মিডনাইট ইন প্যারিসের' কথা উল্লেখ করেছেন যেখানে ছবির প্রোটাগনিস্ট আচমকা উপস্থিত হয় ১৯২০ এর প্যারিসে। তখন প্যারিস ক্রিয়েটিভ সব জিনিয়াসদের মিলনমেলা। হেমিংওয়ে, পিকাসো, কঁকতো। ওই একই ভাইব পেলাম বইয়ের নাম গল্প বিউটি বোর্ডিং রহস্যে।
এই গল্পে বাংলা সাহিত্যের নামজাদা অনেক কবি-লেখক উপস্থিত। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, সৈয়দ শামসুল হক - কে নেই! গল্পের অধ্যায় গুলো ছোট ছোট। ওগুলো শুরু হচ্ছিল গুচ্ছ গুচ্ছ কবিতা দিয়ে। ভেতরে কবিতা পাঠের বিশদ বর্ণনাও আছে। শামসুর রাহমান তার বিখ্যাত 'দুঃখ' কবিতাটা আবৃত্তি করলেন বিউটি বোর্ডিংয়ের এক আড্ডায়। সবার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া খুব উপভোগ করছিলাম। মনে হচ্ছিল আমিও ওখানে আছি।
কিন্তু বিউটি বোর্ডিং রহস্যটাকে ডানা মেলে ঠিকভাবে উড়তে দেয়া হয়নি মনে হলো। আরো খানিকটা স্পেস, চরিত্রের জন্য আরো মনোযোগ কিংবা ডিটেলিং কি দরকার ছিল? সম্ভবত। তাহলে রহস্যটা আরো জোরালো লাগতো।
দ্বিতীয় গল্পটাও ইন্টারেস্টিং। এক গ্রামের সবাই মাস ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত। গ্রামটা আবার কুলাউড়ার এক গ্রাম যা আমার বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে না। গল্পের মেডিকেল টার্ম বুঝতে একটু বেগ পেতে হয়েছে। তাছাড়া ভালো গল্প। লেখিকা আদিবাসী সম্প্রদায় নিয়ে ভালো পড়াশোনা করেছেন বলে মনে হলো। তবে ঐ যে বললাম গল্প অতিরিক্ত টাইট। এক দৃশ্য থেকে আরেক দৃশ্যে ধুপধাপ জাম্প করে যাচ্ছিলেন লেখিকা। বিষয়টা পীড়া দিচ্ছিল।
তবে ওভার অল ভালো লেখা। তার কাছ থেকে বড় পরিসরে কিছু আশা করাই যায়।
ছোট রিভিউ দুটো রহস্য কল্পগল্প আছে এই বইতে। রহস্য মনোযোগ আঁকড়ে ধরে রেখেছে শুরু থেকে শেষ অবধি। সাথে গল্পগুলোর ইমোশনাল ডেপথ আমাকে বিশেষ মুগ্ধ করেছে। এত ভালো লেগেছে যে এখন সবিস্তারে আলাপ করব, সামান্য কিছু স্পয়লার থাকবে। দুজন বন্ধুকে পড়তে বললাম, তারা পড়ার আগ পর্যন্ত এখানেই লিখে ফেলি।
বড় রিভিউ অল্পস্বল্প স্পয়লার অ্যালার্ট!
'এইখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিরলস বসে আড্ডা দিতেন বাংলার শ্রেষ্ঠ কবি-সাহিত্যিকরা? বিশ্বাস হতে চায় না রুমানার। জায়গাটা মোটেও পছন্দ হলো না তার।' বিউটি বোর্ডিংয়ে আমি একবারই গেছি। এবং সেদিন ঠিক এরকমটা মনে হয়েছিল আমারও। তবে 'বিউটি বোর্ডিং রহস্য' গল্পটা সেই ইমপ্রেশন পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে।
মূল চরিত্র অনিন্দ্যর সাথে আমারও মনে হচ্ছিল স্পষ্ট দেখতে ও শুনতে পাচ্ছি শহীদ কাদরী, সৈয়দ শামসুল হক, শামসুর রাহমানের কবিতা পড়া, আড্ডা দেওয়া অথবা কোণায় বসে ধ্যানমগ্ন হয়ে লিখে যাওয়া। এখনকার বাংলাবাজারের পাবলিশিং হাউস থেকে বের হয়ে অনিন্দ্য যখন জুবিলী স্কুল পার করে ১৯৭১ সালের বিউটি বোর্ডিংয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল এখনকার রাস্তাটা।২৮ মার্চের হত্যাকাণ্ড নিয়ে আমার জানা ছিল না। গল্প শেষে পড়ে দেখলাম। ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল।
কবি কেন বললেন, 'এইটা হলো বিউটি বোর্ডিং। এইখানে স্বপ্ন বিক্রি হয় রোজ।' সেটা কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারছি। গল্পটা Midnight in Paris এর কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।
পরের গল্পটায় আছে আদিবাসী লালেং গ্রামের কথা। এই গল্পে যে সংস্কৃতির কথা বলা হলো, তার সাথে আমার পরিচয় নেই। তবে পড়ে মনে হয়েছে খুব সুন্দরভাবে গ্রামটা, গ্রামের মানুষগুলো, তাঁদের চিন্তাধারা উঠে এসেছে। দুটো গল্পেই চরিত্রদের স্ট্রেট ফরোয়ার্ড, স্বচ্ছ লেগেছে। এমন মানুষের কথা পড়তে আমার ভালো লাগে।
শেষ কথা হলো, অনতিবিলম্বে লেখকের অন্যান্য বইগুলো সংগ্রহ করতে হবে!
রহস্যগল্পে গভীরতা খোঁজার অভ্যেস আমার নেই। আর সেজন্যেই কালেভদ্রে যখন ইমোশনাল ডেপথের সন্ধান পাই, একটু হকচকিয়ে যাই বৈকি। 'বিউটি বোর্ডিং রহস্য' বইটা আমি কিনে ফেলি নিছক কৌতূহলের বশে, কেবল নাম দেখে। তাও ২০২২ বইমেলায় আমাদের বাতিঘর প্রকাশনীর পাশের স্টলটাই চৈতন্যের ছিল বলে। মোট দু'টো গল্প বইটায়। রহস্য গল্প। প্রথমটা ফ্যান্টাসি ধাঁচের। কল্পবিজ্ঞানও বলা যেতে পারে। সবচেয়ে ভালো হবে সায়েন্স ফ্যান্টাসি বললে আর দ্বিতীয়টা আগাগোড়া বিজ্ঞান কল্পগল্প। দু'টো গল্পই পড়েই দারুণ ভালো লেগেছে।
প্রথম গল্প- বিউটি বোর্ডিং রহস্য: 'এইটা হলো বিউটি বোর্ডিং। এইখানে স্বপ্ন বিক্রি হয় রোজ।' এক সময় বাংলার সেরা সব সাহিত্যিকেরা আড্ডার আসন বসাতেন বিউটি বোর্ডিংয়ে। গল্পটা পড়তে পড়তে অনিন্দ্যের পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে যেন দেখতে আর অনুভব করতে পারছিলাম সবকিছু। ভীষণ জীবন্ত বর্ণনা। কোন বাহুল্য নেই। টানটান। এসবের সাথে গল্পের প্লটটাও অনন্য। পড়তে পড়তে কখন যেন শেষ হয়ে গেল। ২৮শে মার্চে বিউটি বোর্ডিংয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটা পড়ে মন খারাপ হলো ভীষণ। এই মন খারাপ ভাবটা গল্পটা শেষ করার পরেও ছিল, সেই সাথে যুক্ত হয়েছিল মুগ্ধতা। বাংলাবাজারে প্রায়শই যাওয়া আসা হয় বিধায় গল্পটার সাথে বেশ কানেক্ট করতে পেরেছি।
দ্বিতীয় গল্প: প্রথম গল্পটার তুলনায় এই গল্পে আমার ভালো লাগার পরিমাণটা কিঞ্চিত বেশি। নিজে অণুজীববিজ্ঞানের ছাত্র বিধায় গল্পের কিছুটা খটমটে 'প্রিয়ন-কালচার-সাইত্রিশ ডিগ্রী সেলসিয়াস' এই শব্দগুলো পড়তে বেশ লাগছিল। তবে একটা আক্ষেপ, গল্পের কলেবর আরেকটু বড় করা যেত বোধহয়। দুই নারী বিজ্ঞানীর গবেষণার অংশটা আরেকটু বড় হলে বোধগম্যতা বাড়ত। মূল গল্পটা এক আদিবাসী গ্রাম নিয়ে। লালেং গ্রাম। তাদের সংস্কৃতির ব্যাপারে কিছুই জানা ছিল না আমার। সেই সাথে গল্পের প্রয়োজনে ঐতিহাসিক বর্ণনাও ছিল। পড়তে গিয়ে একবারও মনে হয়নি যে লেকচার ঝারা হচ্ছে। ইশরাত এবং সাজু মারসিয়াংয়ের চরিত্র দু'টো ওয়ান ডাইমেনশলান হলেও সেটা গল্পের প্রয়োজনেই। নিউরোলজির ব্যাপারস্যাপার, মাইক্রোবায়োলজির ব্যাপার স্যাপার, নৃতত্ত্ব এবং মিথ- এসব মিলিয়েই 'লালেং গ্রামের মেয়ে'। মৌলভিবাজারের কুলাউড়া থানার কালাপাহাড়ের ওপারে এক আদিবাসী লালেং গ্রামের পাথর সম্প্রদায় একে একে যখন তাদের ভাষা শব্দ, ঐতিহ্য, কৃষ্টি আচার সব ভুলে যাচ্ছিল তখন সাজু মারসিয়াং আর ঢাকার নিউরোয়াসেন্স ইনস্টিটিউটের পিএইচডি গবেষক ইশরাত এই রহস্যের সমাধানে নামে। সেই নিয়েই এগিয়ে যায় গল্প।
এবারে লেখিকার অন্যান্য বইগুলো খুঁজে বের করে পড়ে ফেলতে হবে।
বেশ ভালো লাগলো বিশেষ করে লেখকের লেখা বেশ সাবলীল। শব্দচয়নও বেশ দারুন তবে গল্পগুলো আরেকটু সময় নিয়ে হয়ত বিস্তৃত করা যেত। দুটো গল্পের প্রথমটা মানে বইটা যে নামে সেটা বেশ ভালো লেগেছে। অন্যরকম একটা পরিবেশ লেখক তৈরী করেছিলেন কিন্তু দ্বিতীয় গল্পটায় সেদিক দিয়ে একটু পিছিয়ে থাকবে। লেখকের গল্পসমগ্র আর আরেকটা ছোটগল্পের বই আছে সময় করে পড়ব।
৩.৫/৫ গল্পের অলি-গলি ঘুরে দেখার আগেই দেখা গেল পথ শেষ হয়ে এসেছে। আশাব্যঞ্জক প্লট সাজিয়েও যেন দ্রুততার সাথে টেনে নিলেন ক্লাইম্যাক্স এর জাল। লেখিকার বলার ভঙ্গী ভালো লেগেছে তবে চরিত্র রূপায়নে আরেকটু নজর দেয়া উচিত বলে মনে হয়েছে। গল্পের চরিত্রগুলোকে আপন করে নেয়া না গেলে পড়ে আসলে জুত পাওয়া যায়না।
প্রথম গল্প "বিউটি বোর্ডিং রহস্য" দুর্দান্ত, নেশা ধরানো টাইম ট্র্যাভেলের রহস্য। দ্বিতীয় গল্প প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অদ্ভুত ম্যাস ডিমেনশিয়ার গল্প "লালেং গ্রামের মেয়ে"র শুরুটাও একই রকম আশাজাগানিয়া হলেও মাঝখান থেকে শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত মেডিকেল টার্ম আর প্যাঁচাল গল্পটাকে একদম মাঠে মেরে ফেলেছে।
ইনস্টাগ্রামে ভালো রিভিউ দেখে এবারের বইমেলায় বইটা কিনেছিলাম । বইটিতে দুটো গল্প আছে। "বিউটি বোর্ডিং রহস্য" আর "লালেং গ্রামের মেয়ে"। গল্পদুটোয় রহস্য জড়িয়ে আছে। আর প্রথম গল্পে কিছু ফ্যান্টাসি উপকরণ আছে। 'লালেং গ্রামের মেয়ে' আমার বেশি ভালো লেগেছে,এর কারণ হয়ত এখানে মাইক্রোবায়োলজি বিষয়ক কথা আছে আর এই সাব্জেক্ট আমার ভীষণ প্রিয়। বইটির কলেবর ছোট,এক বসাতেই পড়ে ফেলা যাবে।
বইটা কেনবার সময় পুরোটাকে একটা উপন্যাস ভেবে কিনলেও এটা আসলে বিউটি বোর্ডিং রহস্য এবং লালেং গ্রামের মেয়ে নামের দুটো গল্পের সংকলন। বিজ্ঞান, কল্পনা, রহস্য ঘরানার গল্পদুটোতে জাতের মিল থাকলেও কোথাও একটা তাদের ভিন্নতা থেকেই যায়। তাই দুটোকে নিয়ে আলাদা বলাই ভালো।
প্রথম গল্পটা বইয়ের নামে-বিউটি বোর্ডিং রহস্য। গল্পের শুরু আপাত দৃষ্টিতে ২০১৬ সালে হলেও আসলে এর সূচনা ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ। একসময়ে জহির রায়হান, শহীদ কাদরী, শামসুর রহমাম নির্মলেন্দু গূন, শামসুল হকের হাসি কোলাহলে মুখরিত বিউটি বোর্ডিং এ এই দিনে ঘটে যায় এক নির্মম হত্যাকান্ড। তাতে মারা যান প্রতিষ্ঠাতা প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহাসহ ১৭ জন। নাকি ১৮ জন ছিল সেখানে? স্বাধীনতা যুদ্ধের নির্মমতা, স্বপন, সংস্কৃতি, হারিয়ে যাওয়া সময়ের সাক্ষী এই বিউটি বোর্ডিংকে ঘিরে নতুন কল্প-ইতিহাস, কল্প-রহস্য এই গল্প। 'এইটা হলো বিউটি বোর্ডিং। এইখানে স্বপ্ন বিক্রি হয় রোজ।'-সেই স্বপ্নের গল্প এটা।
অনেক অনেক প্রশংসা শুনেছিলাম বলেই কিনা জানিনা হয়ত আমার প্রত্যাশা বইটাকে নিয়ে একটু বেশিই ছিল। সহজ কথায় এ গল্পটা ভীষণভাবে আশাহত করেছে। বই পড়ে আমাকে মুগ্ধ হতে হবে বা চমকে যেতে হবে এমন আশা আমি রাখিনা। তবে এটুকু চাই কিছু একটা ভাবনার জন্ম অন্তত দেবে। এই গল্পটা নিয়ে তেমন কিছুই হয়নি। খুবই বেশি সরল বললেও ভুল বলা হবে। মনে হলো শুধু পড়ে গেলাম কিন্তু গল্প আর জমল না। এই গল্পের রেটিং ২/৫ তারা।
দ্বিতীয় গল্প লালেং গ্রামের মেয়ে নিয়ে খুব একটা উচ্চাশা ছিল না। প্রথম গল্পের পরে ভেবেছিলাম এটাও হয়ত খুব একটা ভাবাবে না। আমাকে অবাক করে দিয়ে এই গল্পটা আমাকে ভীষণভাবে মুগ্ধ করেছে। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলায় লালেং গ্রামে পাথর আদিবাসীদের বাস। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তারা হঠাৎ করে নিজেদের আচার, অনুঠান, স্বাভাবিক জীবনযাপনের সকল স্মৃতি হারিয়ে ফেলে। বিখ্যাত নিউরোলজিস্ট অধ্যাপক কাজী দ্বীন মোহাম্মদের তত্ত্বাবধানে তা নিয়ে গবেষণা করতে সে গ্রামে এসে হাজির হয় ইশরাত। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া জগরু ফিরে আসে গ্রামে। লিপিবদ্ধ করতে থাকা হারাতে থাকা জীবন, প্রথা, আচার, বিশ্বাস। নিজের অস্তিত্ব টিকে রাখার এক আশ্চর্য চেষ্টা। কিছুই ভুলে যাওয়া উচিত নয় আমাদের। ভুলে যাওয়া মানেই মৃত্য।'
এ গল্পকে আমি দিয়েছি ৪/৫ তারা।
দুটো গল্পের মিলের যায়গাটা খুব সূক্ষ্ম কিন্তু আমার ভীষণ ভালো লেগেছে প্রচ্ছন্নভাবে হারানো সময়, স্মৃতি আর মানুষগুলোকে দুটো আলাদা গল্পে তুলে ধরার চেষ্টা। দ্বিতীয় গল্পের জন্যই বইটা পড়তে বলব।
দুটি ভিন্ন স্বাদের বৈজ্ঞানিক কল্পগল্প নিয়ে "বিউটি বোর্ডিং রহস্য"।
১. বিউটি বোর্ডিং রহস্য: সালটা ২০১৬। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ পুরান ঢাকার শ্রীশ দাস লেনের ঐতিহ্যবাহী বিউটি বোর্ডিং'এ ১৭ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করার ৪৫ বছর পার হবার ফলে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দায়িত্বে ছিলেন সে সময়কার গেন্ডারিয়া থানার সহকারী পুলিশ কমিশনার আহসান কবির।
বাগানে সেদিন একটি স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করার কথা ছিল। স্মৃতিস্তম্ভের ফলকে লেখা থাকবে, ১৭ জন নিহতের নাম। সে ১৭ জনের নাম তালিকা করতে গিয়েই ঘটল বিপত্তি। স্মৃতিস্তম্ভের খবরটা স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার রুমানা আতিকের কানে পৌছানোর পরপরই তিনি পুলিশকে দিলেন চাঞ্চল্যকর তথ্য। রুমানার দাবি ছিল, ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ বিউটি বোর্ডিং'এ ১৭ জন নয় নিহত হয়েছিলেন মোট ১৮ জন আর তার চেয়েও অদ্ভুত বিষয় হলো, যাঁকে তিনি এ তালিকায় যুক্ত করতে চাইছিলেন তাঁর জন্মই ১৯৭১ সালে হয়নি। প্রথমে সকলে গাঁজাখুরি গল্প ভেবে বিষয়টি উড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ঘটনাচক্রে এ বিষয় নিয়ে আহসান কবিরকে তদন্তে নামতেই হলো। আর এরপরই বেরিয়ে আসতে থাকে একের পর এক রহস্য। যাঁর কোনো কিনারা করতে পারছিলেন না তিনি। কিন্তু শেষটা কি এমন রহস্যের চাদরেই ঢাকা থাকবে?
২. লালেং গ্রামের মেয়ে: শেরে বাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় নিউরোসায়েন্স ইন্সটিটিউটের বিখ্যাত নিউরোলজিস্ট অধ্যাপক কাজী দ্বীন মোহাম্মদের কাছে হাজির হয় শ্রীমঙ্গলের "দৈনিক চায়ের দেশ" পত্রিকার সাংবাদিক সাজু মারসিয়াং। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া থানার কালাপাহাড়ে ওপারে লালেং গ্রামের পাথর সম্প্রদায় নামক এক আদিবাসী ধীরে ধীরে ভুলতে বসেছে মোটামুটি সবকিছু।
একদম ���ুট করেই এ সম্প্রদায়ের সবকিছু ভুলে যাওয়াটা রীতিমতো রহস্যময় ঠেকে দ্বীন মোহাম্মদসহ ওই রুমে উপস্থিত তাঁর একজন শিক্ষার্থী ইশরাত খন্দকারের কাছেও। এর কারণ নির্ণয় করতে দ্বীন মোহাম্মদের আদেশ অনুযায়ী ইশরাত উপস্থিত হয় সেখানে। কিন্তু এর পেছনের রহস্য উদ্ধার করতে করতে একপর্যায় জটিলতাগুলো যখন আঁকড়ে ধরে ইশরাতকে তখন ইশরাত কী করবে? আছে কি উপায়?
পাঠ-প্রতিক্রিয়া: দুটি ভিন্নধারার গল্প নিয়ে রচিত এ বই। তবে দুটি গল্পের একটি সাদৃশ্য হচ্ছে, দুটি গল্পেই কিছুটা ইতিহাস মিশ্রিত। যদিও দুটোর কম্পোরিজনে প্রথম গল্প "বিউটি বোর্ডিং রহস্য" গল্পে ইতিহাস বেশি উঠে এসেছে। "বিউটি বোর্ডিং রহস্য" গল্পটা যেভাবে শুরু হয়েছিল শেষ অবধি উত্তেজনাটা ধরে রাখতে পারেননি লেখিকা। এর কারণ হিসেবে বলা যায়, ভূমিকাতেই হালকা স্পোয়েলার লেখিকা ইচ্ছাকৃতই দিয়ে দিয়েছিলেন। তাই গল্পটা প্রেডিক্টেবল ছিল। এদিক থেকে "লালেং গ্রামের মেয়ে" স্বার্থক। উত্তেজনা মোটামুটি ধরে রাখতে পেরেছিলেন, প্রেডিক্টেবল লাগেনি। "লালেং গ্রামের মেয়ে" গল্পে পাথর সম্প্রদায়কে পাঠকদের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতে উঠে এসেছে তাঁদের ইতিহাস। এমনকি চিকিৎসা বিজ্ঞানের দুই-তিনটি ইতিহাসের ছাপ ছিল এ গল্পে। ভিন্ন দুটি স্টোরিলাইনের প্রেজেন্টেশন মোটামুটি ভালোই ছিল।
দুটি গল্পের স্টোরিলাইন সমন্ধে আলাদা আলাদাভাবে যদি আলোচনা করি তবে বলতেই হয়, দুটি গল্পের প্লট খুব বেশি ইউনিক না হলেও চমকপ্রদ ছিল ঠিকই। বিশেষ করে, প্রথম গল্প "বিউটি বোর্ডিং রহস্য"। গল্প বলার ধরনটাও ছিল মোটামুটি ভালো। প্লট হোল পাওয়া যায়নি কোথাও। তবে হালকা খাপছাড়া ছিল। বর্ণনা দুই এক ইতিহাসের সঙ্গে মিলছিল না। এ নিয়ে আমি পরবর্তীতে রেফারেন্সসহ আলোচনা করব। এজন্য গল্পে কোনোপ্রকার ফাঁক-ফোঁকড় ছিল না মোটেই। তবে "লালেং গ্রামের মেয়ে" গল্পটার শেষ পর্যায়ে খানিক তাড়াহুড়ো লক্ষ্যনীয়। এটা না হলে, আরও বেটার আউটপুট আসত এ গল্প থেকে। উত্তেজনা যদিও ঠিকঠাক ছিল।
আলোচনা করা যাক, লেখিকা তানজিনা হোসেনের লিখন-পদ্ধতি নিয়ে। বলে রাখা ভালো, তানজিনা হোসেন মোটেই নবীন কোনো লেখিকা নন। তাঁর লেখালেখির বয়স প্রায় দুই যুগ। তিনি মূলত সাইফাই স্টোরি লিখে থাকেন। লেখার প্রেজেন্টেশন বেশ ভালোই বলা যায়। সাবলীল। ইতিহাস, বিজ্ঞান এবং প্রাকৃতিক বর্ণনাগুলো বেশ ভালোভাবে ফুঁটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। ঠিকঠাক ছিল। প্রত্যেকটা শব্দ ব্যবহার করার সময় বিশেষ নজরদারি ছিল যেটা আসলেই পজিটিভ একটি সাইন।
বইটির জনরা সাইফাই স্টোরি হলেও বিজ্ঞানের এমন কোনো কঠিন থিওরি ছিল না যে বুঝতে কঠিন লাগবে। বইটি যেকোনো সাবজেক্টের স্টুডেন্ট পড়ে উপভোগ করতে পারবেন কারণ বৈজ্ঞানিক যে বিষয়গুলোর উল্লেখ আছে সেগুলোও খুব সহজ ভাষায় লেখিকা বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ফলে বুঝতে মোটেও কোনো অসুবিধায় পড়তে হবে না।
এবার আসি, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্ট চরিত্র গঠন বা ক্যারেক্টর ডেভলপিং'এ। এখানে কিছুটা আপত্তির জায়গা আছে। প্রথম গল্প নিয়েই আলোচনা করা যাক। ব্লার্ব পড়লে মনে হতে পারে, গেন্ডারিয়া থানার সহকারী পুলিশ কমিশনার আহসান কবির মোটামুটি গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র। অথচ গোটা গল্পের "ভূমিকা" অংশ ও "শেষ কথা" র এক লাইন বাদে আর কোথাও তার দেখা মেলেনি। এমনকি ফ্ল্যাশ ব্যাক অংশের কোথাও দেখা মেলেনি এ চরিত্রের কিন্তু এ চরিত্রের উপস্থিতি আরেকটু সক্রিয় করা সম্ভব ছিল। গল্পটাকে আরও রোমাঞ্চকর করা যেতো এই চরিত্রের এক্টিভিটি বাড়ানোর মাধ্যমে কিন্তু হয়নি। "শেষ কথা" অংশটাতেও তার তদন্তের কিছু অংশ ফুঁটি তোলা যেত।
এছাড়া বাকি চরিত্রগুলোর গঠন, এক্টিভিটি আশানুরূপ ছিল। এ গল্পে চরিত্র হিসেবে পাওয়া গেছে, প্রখ্যাত ব্যক্তিবর্গকে। যেমন: শহীদ কাদরী, সৈয়দ শামসুল হক, শামসুর রহমান, আল মাহমুদ ইত্যাদি। এমনকি বিউটি বোর্ডিং'র প্রতিষ্ঠাতা প্রহ্লাদ সাহা (বিউটি বোর্ডিং'এ অবশ্য তাঁর নামে "্" ব্যবহার করে যুক্তবর্ণ আলাদা রাখা হয়। তবে মোবাইল কিংবা ল্যাপটপ ডিভাইসে হসন্ত ব্যবহার করলে বিজয়ে তা যুক্তবর্ণে রূপ নেয়) ও তাঁর পুত্র তারক সাহার চরিত্রও ছিল। যদিও তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ কোনো চরিত্র ছিলেন না তবে অতীতকে জীবন্ত করতে ভূমিকা রেখেছেন এই চরিত্রগুলো। এ বইয়ের সবচেয়ে পজিটিভ দিকটি হচ্ছে, এ চরিত্রগুলোর গঠন। যেমনটা বললাম, এঁরা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র নন৷ তবে অতীতের ঘটনাপ্রবাহকে জীবন্ত করে তুলতে এই চরিত্রগুলোর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। এঁদেরকে চরিত্র হিসেবে রূপান্তরিত করার পূর্বে লেখিকা সম্মানিত এই ব্যক্তিবর্গদের নিয়ে বেশ ভালো পড়াশোনা করেছেন বোঝাই যায়। ডায়লগ ডেলিভার ও নরমাল সব ভাষা প্রয়োগ, তাঁদের সবার কথা বলার টোনটা প্রায় সেইম টু সেইম রাখার চেষ্টা করেছেন। সাধুবাদ জানাতে হয় এজন্য। এ বিষয়টি যতোটা না চমৎকার ছিল, ততোটা ছিল মনোমুগ্ধকর। পাঠকদের সেসময়কার দৃশ্যগুলো কল্পনা করতে সহায়তা করেছে এজন্য। দৃশ্যপটে সহজেই কল্পনাশক্তির ব্যবহার করে চোখে ভেসে উঠছিল সেসব। এটার জন্য অবশ্যই লেখিকাকে বিশেষ ধন্যবাদ জানাতেই হচ্ছে।
ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে, এ গল্পে লেখিকার নিজেরও একটা চরিত্র ছিল। সে অবশ্য গল্পের শ্রোতা হিসেবেই ছিল পুরোটা সময়৷ অনেকটা চেতন ভগতের উপন্যাসের মতো। তবে গল্পটা পুরো শোনার পর তাঁর প্রতিক্রিয়া পরিশেষে জানা যায়নি। গল্প শেষে এক পেজে তাঁর প্রতিক্রিয়াটা জানানো যেতো।
কথা বলা যাক, "লালেং গ্রামের মেয়ে" গল্পের চরিত্র নিয়ে। এ গল্পের দুটো প্রধান চরিত্র ছিল ইশরাত ও সাজু মারসিয়াং। এরা দুজনই বেশ এক্টিভ ছিল বিশেষ করে, ইশরাত। তবে নিউরোলজিস্ট অধ্যাপক কাজী দ্বীন মোহাম্মদকে যেভাবে প্রেজেন্ট করা আবশ্যক ছিল সেটা হয়নি। একজন নিউরোলজিস্ট থেকে যে পরিমাণ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়াটা জরুরী তা পাওয়া যায়নি। মানে সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি জায়গায় নিজের ছাত্রীকে একা পাঠিয়ে দেওয়াটা স্রেফ বোকামির পরিচয় দিয়েছে অথচ বর্ণনা অনুযায়ী তিনি বোদ্ধা হবেন এটাই স্বাভাবিক ছিল।
যেমনটা আগেই বললাম, এই গল্পে একটু-আধটু তাড়াহুড়োর ব্যাপারটা খেয়াল করেছি। এ গল্পের দুটি চরিত্র লাভলী ও ফরিদার একটি বিশেষ গবেষণা বা পরীক্ষাটাকে আরেকটু বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করলে বিষয়টা সহজতর হতো এবং এই দুই অন্যতম চরিত্রের প্রেজেন্টেশনও আরেকটু বেটার হতে পারত।
মতিউর রহমান চরিত্রটার যা যা করণীয় ছিল তা করতে দেখা যায়নি। কয়েকটা পরীক্ষা ও তার রেজাল্ট পৌছানো ছাড়া এই লোককে ইশরাতের খুব একটা সাহায্য করতে দেখা যায়নি অথচ তিনি আশ্বস্ত করেছিলেন।
জগরু, লার মন্তানী ও গুনিন বিবুসা। জগরু খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র না হলেও তার প্রয়োজনীয়তা সে ঠিকই পূরণ করতে পেরেছে। এ চরিত্রটা ঠিক ছিল। তবে লার মন্তানী ও গুনিন বিবুসাকে নিয়ে আরেকটু কাজ করা যেতো। বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এ দুজন পিছিয়ে ছিলেন গল্পে।
ইন্টারেস্টিং বিষয়টা হচ্ছে, সাজু মারসিয়াং নামে আসলেই শ্রীমঙ্গলে একজন লোকাল সাংবাদিক আছেন। সিলেটের একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল "EYENEWS" এ তাঁর লেখা আর্টিকেল আছে। যদিও তিনি তাঁর নামটা "মারসিয়াং" না "মারছিয়াং" লিখে থাকেন।
ইশরাতের ভাই ইমরান চরিত্রটাকে ঠিকভাবে ফুঁটিয়ে তোলা সম্ভব হয়নি। প্রবাসে বসেও সে যে তার বোনের কাউন্সিলিং করতো এগুলোকে আরেকটু স্ট্রংলি প্রেজেন্ট করতে পারলে এই চরিত্রটাকে খুব বেশি অপ্রয়োজনীয় মনে হতো না। যেমনটা বললাম, শেষের দিকে তাড়াহুড়ো করে ফেলেছেন। যেহুতু গল্প এটি তাই ছোটো আকৃতির হবে কিন্তু যেটুকু লিখেছেন ঠিক ততোটুকু পর্যন্তই কোনোপ্রকার তাড়াহুড়ো ছাড়াই পুরো গল্পটাকে ধীরে-সুস্থে শেষ করা যেতো, প্রত্যেকটা চরিত্রের এক্টিভিটি ঠিক করে। এক-দুই পৃষ্ঠা বাড়লেও খুব একটা সমস্যা হতো না।
দুটি গল্পেই সবগুলো চরিত্রের মধ্যকার সম্পর্ক বেশ পরিষ্কার ছিল। বুঝতে অসুবিধা হয়নি মোটেও অথবা কে কার কী হোন তাতেও কোনোরকম সংশয় তৈরি হয়নি। যদিও গোটা বইতে আপন কোনো আত্মীয়ের সম্পর্ক খুব একটা দেখানো হয়নি, ইশরাত ও ইমরান বাদে।
এ বইয়ের চরম বিরক্তিকর বিষয়টি ছিল বইটির সম্পাদনায়। বক্তার ডায়লগে কোটেশন ব্যবহার করা হয়নি। বিরামচিহ্ন ব্যবহারে যেন অনীহা। কমা ও ইনভার্টেড কমা নিয়ে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছে। হাতেগোনা কয়েকটা ডায়লগে মাত্র "---" ব্যবহার করা হয়েছিল এছাড়া যেখানে কমা হবার কথা সেখানে কমা নেই। বক্তার কোনো কথাকে আলাদা করে চিহ্নিত করতে যেই ইনভার্টেড কমার ব্যবহার হয় সেটা নেই। কখন কে কথা বলছে, আদৌ তা লেখিকার নিজস্ব বর্ণনা নাকি কোনো চরিত্রের কথা তাই বোধগম্য হচ্ছিল না প্রায়। বই যতোটা উপভোগ্য হবার কথা ছিল সম্পাদনা জনিত এমন একটি অদ্ভুত ভুল হবার ফলে কিছুটা বিরক্তিকর ঠেকেছে। এ বছরের এটিই দ্বিতীয় কোনো বই যা নিয়ে আমি এরকম একটি সমস্যা ফেস করেছি।
বইতে বানান জনিত সমস্যা একেবারেই ছিল না তা নয় তবে খুব বেশি ছিল না। প্রুফ রিডিং মোটামুটি ঠিকঠাক ছিল।
এছাড়া বাঁধাই, প্রিন্টি�� ও পেজের মান নিয়ে কথা বলা যাক। এ তিনটিই ভালো ছিল। চৈতন্য থেকে প্রকাশিত এ প্রথম কোনো বই পড়ার সৌভাগ্য হলো আমার। এ তিনটির প্রডাকশন নিয়ে আমি সন্তুষ্ট।
প্রচ্ছদ করেছেন, নির্ঝর নৈঃশব্দ্য। আমি তাঁর কাজ এর আগে কখনো দেখিনি। প্রচ্ছদটা খুব সম্ভবত হাতে আঁকা। ভালোই। খুব একটা খারাপ না। কিন্তু অভিযোগের জায়গা থেকে যায়। গল্পের সঙ্গে প্রচ্ছদের মিল পাওয়া যায়নি। সিমিলারিটি থাকাটা জরুরী ছিল। তাহলে প্রচ্ছদ আরেকটু আকর্ষণীয় হতে পারত।
আমার চোখে পড়া যতো অসংগতি: ১. পৃ: ১৫'তে অনিন্দ্যের কল্পনায় ভেসে ওঠা ঘটনাটি ঘটেছিল পৃ: ২০ অনুযায়ী "বিউটি বোর্ডিং'র ভেতরে। কিন্তু শহীদ কাদরীর ইন্টারভিউ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এ ঘটনাটি ঘটেছিল তাঁর নিজ বাসায়। বইতে লেখা আছে, শামসুর রহমান পত্রিকা হাতে শহীদ কাদরীর প্রথম কবিতা দেখাতে বিউটি বোর্ডিং গিয়েছিলেন কিন্তু রেফারেন্স অনুযায়ী তা মিলছে না।
রেফারেন্স: আদনান সৈয়দ: আপনার প্রথম কবিতা 'এই শীতে' যখন বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় সে খবরটিও তো আপনাকে শামসুর রাহমানই দিয়েছিলেন, তাই না?
শহীদ কাদরী: হ্যাঁ, সেদিনটির কথা বেশ মনে আছে। আমার মা সেদিন গত হয়েছেন। স্বাভাবিক ভাবেই পরিবারের সবাই সেই শোকে আচ্ছন্ন। আমি তখন নিতান্তই একজন বালক। বয়স মাত্র চৌদ্দ বছর। ঘরের এক কোণে মন খারাপ করে শুধুই মার স্মৃতিতে বিচরণ করছি। হঠাৎ মনে হল পেছন দিক থেকে কেউ একজন দাঁড়িয়ে। কিছু একটা বোঝার আগেই পেছন দিক থেকে শামসুর রাহমান সদ্য প্রকাশিত বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকা ঠিক আমার মুখের সামনে খুলে ধরলেন। দেখি আমার কবিতা। 'এই শীতে'। সেটা ছিল ১৯৫৬ সাল। তখন কবিতা পত্রে কারো কবিতা ছাপা হওয়া মানেই ছিল তাঁর কবি হিসাবে সাহিত্য আসরে স্বীকৃতি পাওয়া। [শহীদ কাদরীর সাথে কিছুক্ষণ, বাংলা বিডিনিউজ ২৪'র ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত]
তাছাড়া এ ঘটনাটা বলার পর অনিন্দ্যর বন্ধু নিশ্চিত করে একটি ইন্টারভিউর কথাও বলছিল। কিন্তু ইন্টারভিউতে এমন কিছু পেলাম না।
২. পৃ: ২৫- "ইউনিভার্সিটিতে পড়তে সে দুজন এসএসসি ক্যান্ডিডেটকে বিজ্ঞান পড়াত...." এখানে "পড়াতে" শব্দটি "পড়াকালীন" হবে।
৩. পৃ: ২১ অনুযায়ী তারক সাহা তখন বয়স্ক লোক ছিলেন। কিন্তু পৃ: ৪৬'এ উল্লেখ করা হয়েছে, তারক সাহা দুই বছর পূর্বে অল্প বয়সেই মৃত্যুবরণ করেন। আবার ফ্ল্যাশব্যাকের ঘটনায় দেখা যায়, বেঁচে থাকাকালীন তাঁকে বয়স্ক উল্লেখ করা হয়েছে। এটা বেশ কনফিউজিং ছিল। যদিও বিউটি বোর্ডিং'র ভেতরে ঝোলানো তাঁর ছবিতে খুব বেশি বয়স্ক মনে হয়নি আবার অল্প বয়স্কও মনে হয় না। ঢাকা টাইমসের আর্টিকেল অনুযায়ী, ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তারক সাহা। বড় ভাই সমর সাহাকে নিজ চোখেই দেখা হয়েছে আমার। সেভাবে ভাইয়ের বয়স হিসেব করলেও অল্প বয়সে মারা যাবার তথ্যটা ভুল।
৪. পৃ: ৬৩'তে "জাদো" নামের খাবারটি খাওয়ার আগে ঐতিহ্যবাহী রণনৃত্যটি হয়। কিন্তু খাসিয়া সম্পর্কে ইন্টারনেটে খানিক ঘাটাঘাটি করতে করতে যা জানলাম তা হলো, জাদো খাওয়ার পর সাংস্কৃতিক অংশটি মঞ্চায়িত করা হয়।
রেফারেন্স: দুপুর গড়িয়ে আসছে। যে যার মতো খাবার নিয়ে এসে খেতে বসেছে। আমরা কলাপাতায় মোড়ানো জাদো নিয়ে এলাম। জাদো হলো খিচুড়ি, ভর্তা, ডিম, মুরগি বা শূকরের মাংস ছেঁচে পেঁয়াজ–মরিচ দিয়ে মেখে সব একসঙ্গে পরিবেশন করা একধরনের খাবার। খেতে মন্দ নয়। খাওয়াদাওয়ার পর মূল আকর্ষণ নাচ–গান। ততক্ষণে পুঞ্জির ভেতর থেকে একে একে এসে হাজির হয়েছে চমৎকার সব পোশাক পরা তরুণ–তরুণী। সবাই তাদের সঙ্গে ছবি তুলতে ব্যস্ত। শুরু হলো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। রণনৃত্যসহ আরও কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী নৃত্য পরিবেশন করল তারা। সবই মনোমুগ্ধকর। নতুন বছরকে এভাবেই স্বাগত জানিয়ে শেষ হলো খানি সিং কুটস্নেম।
আর মজার ব্যাপার হচ্ছে, যে রেফারেন্সটি আমি শেয়ার করছি সেটি লেখিকারই লেখা কন্টেন্ট। সুতরাং, এরকম সুক্ষ্ম ভুল হবার কথা নয়।
৫. পৃ: ৭২'এ উল্লেখ করা হয়েছে, ইশরাতের জ্বর আসে রাতে। পৃ: ৭১ অনুযায়ী, বিকেল ও সন্ধ্যা পর্যন্ত সে মোটামুটি সুস্থই ছিল। কিন্তু পৃ: ৭৩'এ হঠাৎ সময় উলোট-পালোট হয়ে যায়৷ লার মন্তানীর প্রশ্নের জবাবে ইশরাতের অসুস্থতার সময়টি জানানো হয়, বিকেলে অথচ বিকেলে সে সুস্থই ছিল।
৬. পৃ: ৭৪- "তারওপর" নয় হবে, "তার ওপর"।
৭. পৃ: ৭৯- " ভাইরাস ছাড়াও তো আরও অনেক জীবাণু আছে স্যার?"-- এটা কোনো প্রশ্ন ছিল না বরং মন্তব্য ছিল। সুতরাং "?" না হয়ে "।" হবার কথা।
৮. "এরা যে এসব বিশ্বাস করে?"-- মন্তব্য ছিল। সুতরাং, "?" না হয়ে "।" হবার কথা।
৯. পৃ: ৯১'তে বিবুসার সঙ্গে ইশরাত দেখা করতে গিয়েছিল জগরুকে সঙ্গে করে। সেখানে সাজু মারসিয়াং'র উপস্থিতি আমরা তখন টের পেলাম যখন সে হুট করেই কথা বলে উঠল। কিন্তু সে ঘটনাস্থলে কখন উপস্থিত হলো, তার কোনো বর্ণনা পাওয়াই যায়নি।
১০. "লালেং গ্রামের মেয়ে" গল্প পুরোটা পড়লে বুঝতে পারবেন ইশরাত সেখানকার কথিত ভাষা মোটেই বোঝে না। কথা অনুবাদ করে দিতে সবসময়ই একজনকে না একজনকে থাকতে হয়। এবং ইশরাতের কথাও সেখানকার স্থানীয় কেউ খুব একটা বোঝে না একমাত্র জগরু বাদে। অথচ একদম শেষের দিকে এসে ইশরাত ও বিবুসার মধ্যকার কথোপকথনের সময় কথা অনুবাদ করে দেবার বিষয়টি খুঁজে পাইনি। সাজু মারসিয়াং'র উপস্থিতি সেখানে থাকলেও সে যে কথা অনুবাদ করে দিচ্ছে সেটাও উল্লেখ করা ছিল না। অর্থাৎ, পুরো কথোপকথনটা পড়ে মনে হচ্ছিল, ইশরাত ও বিবুসা দুজনই দুজনের ভাষা বোঝেন। উল্লেখ্য, বিবুসা সেখানকার স্থানীয়।
#স্পোয়েলার_এলার্ট "লালেং গ্রামের মেয়ে" গল্পটায় ইশরাতের দেখা পাহাড়ের সেই ভেড়ার দৃশ্যটা কেন প্রায়ই দেখতো (হালকা অতীত মিশ্রিত) এবং কীভাবেই বা বিবুসার চোখেও এ জিনিসটি ধরা পড়ল পুরো গল্প শেষ করার পরও বিষয়টি আমি ঠিকমতো বুঝতে পারিনি। বাদবাকি সব বোধগম্য হয়েছে।
পরিশেষে, একদম সাদামাটা ঘরনার বৈজ্ঞানিক কল্পগল্প পড়তে চাইলে ট্রাই করতে পারেন বইটি।
"বিউটি বোর্ডিং রহস্য" বইটা প্রথম হাতে নিয়েছিলাম সম্ভবত আরো এক-দেড় বছর আগে। নামটা ভালো লেগেছিল। প্রচ্ছদটাও কৌতূহল জাগানিয়া ছিল। তবে লেখিকাকে চিনি না বলে, আর সেদিন হাতে সময় কম থাকায় আর পড়া হয়নি। তবে ব্যাকফ্ল্যাপের অংশটা পড়ে বেশ আগ্রহোদ্দীপক মনে হওয়ায় বইটা উইশলিস্টে রেখেছিলাম। কিছুদিন আগে বাতিঘরে গিয়ে আবার যখন বইটাকে সামনে পেলাম, আর দ্বিতীয়বার না ভেবে পড়া শুরু করলাম। আর আমি খুবই খুশি যে এমন একটা বই দেরিতে হলেও পড়েছি!
বিউটি বোর্ডিং রহস্য বইটিতে মূলত দুটি সায়েন্স ফিকশন নভেলা রয়েছে। যার প্রথমটি বইয়ের নামেই, আর দ্বিতীয়টির নাম "লালেং গ্রামের মেয়ে।" এর আগে আমি যাদের সাই-ফাই লেখা পড়েছি তার বেশিরভাগই চর্বিত চর্বন। সেই ভিনগ্রহী কিংবা রোবটিক বিপ্লব, মানুষ-রোবট/এলিয়েন দ্বন্দ্ব, পৃথিবী বাঁচানোর ম��শন ঘুরেফিরে এগুলোই। তার উপর আবার বেশিরভাগই কিশোর উপযোগী। ব্যতিক্রম ছিল শিবব্রত বর্মনের লেখাগুলো। তবে সেগুলোকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাই-ফাই এর তুলনায় সায়েন্স ফ্যান্টাসি মনে হয়েছে। তানজিনা হোসেনের লেখা পড়ে আমি মৌলিক সাই-ফাইয়ের এক অপূর্ব স্বাদ পেয়েছি। বিউটি বোর্ডিং রহস্য নভেলাটিতে, মূলত ১৯৭১ সালে পুরান ঢাকার বিউটি বোর্ডিংয়ে সংঘটিত হওয়া একটা নির্মম হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। গল্পের প্রধান চরিত্র অনিন্দ্যের সাথে আমিও ঘুরে বেড়িয়েছি বিউটি বোর্ডিংয়ে শহীদ কাদরি, মুর্তজা বশীর, সৈয়দ শামসুল হক, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ প্রমুখের আড্ডায়! আর শেষমেশ... থাক শেষটা বলে দিলে আর পড়বেন কী! টাইম ট্রাভেলের চেনা পরিচিত ছক ভেঙে দেশীয় প্রেক্ষাপটে লেখা এই গল্পটির সাথে ইতিহাসের মিশ্রণ এক চমৎকার আবহ তৈরি করেছে যা বই পড়ার পুরোটা সময় আমাকে মোহগ্রস্ত করে রেখেছিল।
"লালেং গ্রামের মেয়ে" নভেলাটি প্রথমটির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধর্মী নভেলা, এবং এটা আরো বেশি ইন্টারেস্টিং! এক আদিবাসী গ্রামের সবাই হঠাৎ করেই ভুলে গিয়েছে তাদের ভাষা, রীতি-নীতি, জীবনধারা সবকিছু! একবার ভাবুন তো, আপনি সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন কথা বলতে পারছেন না, কারণ ভাষা নামক জিনিসটিই আপনার মস্তিষ্ক থেকে উধাও হয়ে গিয়েছে! শুধু কি তাই, যে পরিচিত ছকে আপনার জীবন বাঁধা, তার সবকিছুই ভুলে গিয়েছেন! কেমন ভয়ংকর লাগছে না ভাবতে? আসলে আমাদের অতীত স্মৃতি এবং অভিজ্ঞতা ছাড়া আমরা কেবল একটা খোলসের মতো! প্রতিটা মুহূর্তে আমরা যে স্মৃতি আর অভিজ্ঞতা জমাই তার ওপর ভর করেই বেঁচে থাকি। লালেং গ্রামের সেই হতভাগা মানুষগুলো তখন স্মৃতি হারানো একেকটা খোলসের মতো ছিল। কিন্তু কেন তারা সবাই একযোগে স্মৃতি হারিয়ে ফেলল? কী এর পেছনের রহস্য? জানতে হলে আপনাকে সাজু মারসিয়াং আর ইশরাত খন্দকারের সাথে পাড়ি জমাতে হবে মৌলভীবাজারের সেই আদিবাসী লালেং গ্রামে!
‘বিউটি বোর্ডিং রহস্য’ লেখিকা তানজিনা হোসেন লিখিত একটি বিজ্ঞান কল্পগল্পের বই! বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২২ সালে। ‘চৈতন্য’ থেকে প্রকাশিত বইটি সম্পর্কে বলার আগে একটু লেখিকার সম্পর্কে বলে নেই। লেখিকা তানজিনা হোসেন কিন্তু পেশায় একজন চিকিৎসক। তার এই বিষয়টিই মূলত বইটি পড়ার প্রতি আমার আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছিল। একজন চিকিৎসকের লিখিত কল্পগল্প পড়তে কেমন হবে তা দেখবার আগ্রহ ছিল। লেখিকার নাম-ডাক সচারাচর শোনা না গেলেও তার লেখালেখির সূচনা কিন্তু নব্বইয়ের দশকে। মূলত বিজ্ঞান কল্পগল্পই লিখে থাকেন তিনি। বর্তমানে ঢাকার একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে শিক্ষকতা করেন তিনি।
যাইহোক এবার আসি বইয়ের কথায়। বইয়ের নামটা আসলেই আগ্রহ উদ্দীপক। বইটিতে দুটি গল্প আছে। যার প্রথমটির নাম “বিউটি বোর্ডিং রহস্য” আর আরেকটি হলো “লালেং গ্রামের মেয়ে”। প্রথম গল্পটি পুরান ঢাকার শ্রীশ দাস লেনের বিখ্যাত বিউটি বোর্ডিং কে ঘিরে। ১৯৭১ সালে এই বিউটি বোর্ডিং এ একটি হত্যাকান্ড সংঘটিত হয় যাতে এর মালিক প্রহ্লাদ সাহাও নিহত হয়। এই সত্য ঘটনাকেই এক্সটেন্ড করে লেখিকা একটি কল্পগল্প লিখেছেন। খুবই ইন্টারেস্টিং। পুরোটা সময় আপনাকে ধরে রাখবে গল্পটি। হত্যাকান্ডের ৪৫ বছর পর এক রহস্যময় জট খুলতে সচেষ্ট হয়ে পুলিশ কমিশনার আহসান কবির কিভাবে স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ রুমানার ধরিয়ে দেয়া অদ্ভুত গল্পের পিছনে ছুটতে থাকে, কিভাবে বাংলার শ্রেষ্ঠ কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী এই রহস্যের সাথে জড়িয়ে পড়ে জানতে অবশ্যই পড়তে হবে বইটি।
দ্বিতীয় গল্প “লালেং গ্রামের মেয়ে”। এটাও অনেক ইন্টারেস্টিং। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া থানার কালাপাহাড়ের ওপারে এক আদিবাসী লালেং গ্রামের পাথর সম্প্রদায় একে একে যখন তাদের ভাষা, শব্দ, ঐতিহ্য, কৃষ্টি আচার সব ভুলে যাচ্ছিল তখন খাসিয়া তরুণ সাংবাদিক সাজু মারসিয়াং আর ঢাকার জাতীয় নিউরোসাইন্স ইনস্টিটিউট এর পিএইচডির ছাত্রী ইশরাত খন্দকার মরিয়া হয়ে ওঠে এর কারণ নির্ণয় করে একটি সমাধানে পৌঁছার জন্য। আর একটি যথাযথ বৈজ্ঞানিক সমাধানে পৌঁছাতে গিয়ে নিজেদের জীবনই একসময় বিপন্ন করে তোলে তারা। এভাবেই এগিয়ে চলে গল্পটি।
দুটি ভিন্ন স্বাদের বিজ্ঞান কল্পগল্প নিয়ে বইটি সত্যিই অসাধারণ! অনেকদিন পরে ভিন্ন স্বাদের একটা অসাধারণ বই পড়লাম। এক বসায় পড়ে বইটি শেষ করে ফেলেছিলাম। আপনারাও যদি ভিন্ন স্বাদের কোন বইয়ের খোঁজে থাকেন তাহলে অবশ্যই পড়ে ফেলতে পারেন বইটি।
বইয়ের দুটো অংশ। দুটোই স্মৃতি নিয়ে। প্রথমাংশে অনিন্দ্য নামের একটি ছেলে পুরান ঢাকার বিউটি বোর্ডিং এর বিখ্যাত কবিদের আড্ডায় চলে যায় স্মৃতিভ্রম হয়ে। বিউটি বোর্ডিং ছিল পুরান ঢাকার শ্রীশ দাশ লেন এ অবস্থিত সম্ভবত বাংলার অনন্য প্রতিভাধর মানুষদের আড্ডাখানা তথা থাকার জায়গা। কে ছিলেন না সেখানে? শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, শামসুল হক, রণেশ দাশগুপ্ত, ফজলে লোহানী, ব্রজেন দাস, হায়াত মাহমুদ, মহাদেব সাহা, আহমদ ছফা, জহির রায়হান, খান আতা, (এবং বলে শেষ করা যাবে না)। অলীক নয়, সেসময়ের কলাকুশলীদের মাঝে ঘটে যাওয়া সত্যি ঘটনার সে যেন জীবন্ত দর্শক (অনেকটা গেম অফ থ্রোনস এর ব্র্যান্ডন স্টার্ক এর মতো)। মাঝে মাঝে, সে কোন বিশেষ কিছু স্পর্শ করলে সেটার সাথে অতীতে ঘটে যাওয়া কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনার সাক্ষী হয়ে যাচ্ছে। এরকম জটিল মানসিক অবস্থা নিয়ে অনিন্দ্য, তার বন্ধু রিসাত ও স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ রুমানা আতিকের মাঝে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী নিয়ে সাজানো এই অংশ। দ্বিতীয়াংশে ম্যাস ডিমেনশিয়া বা গণ-স্মৃতিভ্রংশ নিয়ে। মৌলভীবাজারের প্রত্যন্ত পার্বত্য অঞ্চলে কালাপাহাড়ের পাদদেশের আদিবাসী লালেং গ্রামের সকল মানুষের স্মৃতি লোপ পেয়েছে একসাথে। স্থানীয় সাংবাদিক পাশের লোকালয়ের খাসিয়া তরুণ সাজু মারসিয়াং শরণাপন্ন হয় ঢাকার বিখ্যাত নিউরোসায়েন্স অধ্যাপকের, যার পিএইচডি ছাত্রী ইসরাতের দায়িত্ব পরে ঘটনা রহস্য উন্মোচনের। সেই প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে ইশরাত নিজেই এর শিকার হয়। এটা কি পাশের গ্রামের অধিবাসী তান্ত্রিকদের মতানুযায়ী দেবতার সম্মান না করার অভিশাপ? নাকি ডাক্তারদের মতে কোন বিশেষ জীবাণুর সংক্রমণ? ইশরাত কি সুস্থ হবে???
তানজিনা হোসেন এর লেখার সাথে পরিচয় ফুসিয়া হাউস পড়ে। লেখিকা নিজে ডাক্তার হওয়ায় অনেক বেশি মেডিক্যাল টার্ম সত:স্ফুর্তভাবে ব্যবহার করেছেন। সাথে ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে অনেক তথ্য দিয়েছেন কাহিনীর প্রয়োজনে। তবে কাহিনীর যবনিকাপাতে লেখিকার একটা বৈশিষ্ট্য উল্লেখ্য, তিনি সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "শেষ হইয়াও হইল না শেষ" বেশি সিরিয়াসলি নিয়ে ফেলছেন 🙃। যার কারণে অনেক সুন্দর কাহিনী চিত্রায়ণ দেখলেও শেষমেষ কিসের যেন অপ্রাপ্তি থেকে যায়। অবশ্য, বইয়ের গায়ে কল্পকাহিনী লেবেল দেয়া থাকায় এসব প্রশ্ন করা যাচ্ছে না। তাও....
আমার রহস্য গল্প সব সময় পড়া হয় ���া। অনেক অনেক দিন পর এমন হুট করে এই রহস্যে ঘেরা বইটির দুটি গল্প পড়ে বেশ ভালোই লাগলো। লেখকের পরিশ্রমের প্রশংসা অব্যশই করতে হয়, এতো ঝরঝরা লিখা পড়তে পেরে কেমন অনুভূতি হয় তা কখনোও কেউকে বোঝানো যায় না। প্রতিটা রহস্যে ঘেরা লাইন যেনো প্রতিটা দৃশ্য চোখের সামনে দাড় করিয়ে দিচ্ছিলো। “বিউটি বোর্ডিং রহস্য” গল্পের ‘অনিন্দ্য’র অনাকাঙ্খিত পরিসমাপ্তি মেনে নিতে মনে বাঁধ ছিলো এবং “লালেং গ্রামের মেয়ে” গল্পের ‘ইশরাতের’ যুদ্ধ জয় করার আনন্দে সামলি না হতে পারায় মন খারাপ লাগছিলো। ভালো লাগা মন্দ লাগা সব মিলিয়ে বইটা অনেকটাই ভালো লেগেছে।
বইটিতে দুটি ছোটগল্প রয়েছে! প্রথমটি বিউটি বোর্ডিং এর রহস্য নিয়ে আর দ্বিতীয়টি লালেং গ্রাম নামের একটা গ্রামের মানুষদের অদ্ভুত রোগ নিয়ে! দুটি গল্পই রহস্য বিজ্ঞান-কল্পগল্প ধাঁচের! বরাবর অনাগ্রহের কারনেই কল্পগল্প জনরার বই আমার খুব বেশি পড়া হয়না! এই বইটা তাই আমার কাছে মোটামুটি লেগেছে!
বিউটি বোর্ডিং নিয়ে লেখা পড়ার আগ্রহ ছিলো আমার বরাবরই! তাই বিউটি বোর্ডিং নিয়ে জানার জন্যই একপ্রকার নাম দেখেই বইটা কেনার সিদ্ধান্ত নিই! তবে কল্পগল্প হওয়ার খুব বেশি উপভোগ করিনি! এইখানে একটু আশাহত হয়েছিলাম! তবুও বলবো দুটি গল্পের মধ্যে প্রথমটিই আমার কাছে ভালো লেগেছে!