ঘরকুনো বলে একসময় বাঙালির পরিচিতি থাকলেও এখন জামানা বদলেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশীরা এখন প্রচুর ভ্রমণ করেন। ছুটির দিনে দেশের ভিতরের টুরিস্ট স্পট গুলোতে ভিড় জমে যায়। হোটেল রিসোর্টগুলোতে রুম পাওয়া যায়না। আবার লম্বা ছুটি পেলে অনেকেই পাড়ি জমান ভিন্ন দেশে। ভারত, নেপাল, ভুটান, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েসিয়া, কিংবা ভিয়েতনাম, যেখানেই ঘুরতে যাবেন সেখানেই বাঙালি টুরিস্টের দেখা মিলবে। ইউটিউব ফেসবুক ইন্সটাগ্রামের কল্যাণে সবাই যেন এখন ট্রাভেল ব্লগার। তাহলে ভ্রমণকাহিনী নিয়ে বই কেন?
কারন শুধু ছবি আর ইউটিউব Vlog দিয়ে একটা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা পুরোপুরি তুলে ধরা যায় না। অনেক খুঁটিনাটি থাকে, অনেক সূক্ষ্ম অনুভূতি জড়িয়ে থাকে যা হয়ত শুধু মাত্র লেখায় প্রকাশ করা সম্ভব। আর সেই চেষ্টাই করেছেন এই বইয়ের লেখকেরা। ভারত, ফ্রান্স, সিঙ্গাপুর, চীন, নেপাল এবং ভুটান ভ্রমণের আকর্ষণীয় কিছু বর্ণনা তুলে ধরেছেন তারা, যা ভ্রমণ কাহিনী পিপাসুদের আনন্দ দিতে বাধ্য। আসুন না তাদের সাথে দেখে আসা যাক অনিন্দ্য সুন্দর এই পৃথিবী?
কৌশিক জামান একজন অপদার্থ। ইংরেজিতে যাকে বলে- গুড ফর নাথিং। জীবনের প্রতিটা পদক্ষেপে পরাজিত হতে হতে হাল ছেড়ে দেয়া একজন ব্যক্তি। কিছু মানুষ আছে না এক ভুল বার বার করে? তিনিও ঐ কিসিমের।
তাই নিজেকে বন্দী করে রেখেছেন একশ স্কয়ার ফিটের একটা রুমে। রুম ভর্তি শুধু বই আর বই। বই পড়তে পড়তে তার মনে হয়েছে কিছু একটা লিখে ফেলা দরকার। এবং অখাদ্য ছাইপাঁশ কিছু আবর্জনা লিখেছেন যেগুলো প্রকাশক একরকম চাপে পড়ে ছাপিয়ে এখন আফসোস করছেন।
প্রথম পর্ব "দেখিতে গিয়াছি চক্ষু মেলিয়া" ভ্রমণ সংকলনের সাফল্যের পর এই দ্বিতীয় পর্বও বের হয়ে গেলো এবং এবারও আর্টিস্ট রেহনুমা প্রসূন তার জাদু দেখিয়েছেন কাভারে। "দেখিতে গিয়াছি চক্ষু মেলিয়া" তে লিখেছিলেন ৭ জন,তারমধ্যে ৩ জন এই পর্বেও লিখেছেন,বাকি ৩ জন নতুন। ১ম পর্বের রিভিউ লিংক- https://m.facebook.com/story.php?stor...
এবারের পর্বে আছে ৬ টি ভ্রমণকাহিনী।
১.একদা এক রাজ্যে-নাবিল মুহতাসিম ছয়টা গল্পের মধ্যে এইটাই আমার কাছে সবচেয়ে উপভোগ্য ছিলো (একদম ননবায়াসড রিভিউ।পাঠক হিসেবে আমি বেশ ব্রুটাল,ব্যক্তিগত সম্পর্কের এখানে স্থান নেই।)ভ্রমণ কাহিনী তো মানুষ,এখানে গেলাম,এত টাকা লাগলো,চলে আসলাম পড়ার জন্য পড়ে না।ভ্রমণকাহিনী পাঠকের লেখককে আবিস্কারের কাহিনীও বটে,লেখক কী ভাবে,কী অনুভব করে,জীবন ও জগৎকে কিভাবে দেখে-এই সবই ভ্রমণকাহিনীর অংশ।একটা মানুষের সাথে আপনি থেকে তাকে যতটা না চিনবেন,তার লেখা নন-ফিকশন পড়লে তারচেয়ে ঢের বেশি ঢের দ্রুত জানতে পারবেন।সেই দিক দিয়ে এটি সার্থক ভ্রমণকাহিনী।গত বইতে লেখক লিখেছিলেন দার্জিলিং নিয়ে,এবার দার্জিলিং এর সাথে কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার যোগ হয়েছে।
২.সিটি অফ লাইট-সাবাবা মঞ্জুর ইনিও পুরান লেখক।গত বইতে মায়োর্কা ভ্রমণ করে এবার তিনি এসেছেন প্যারিস ভ্রমণ নিয়ে,তাই স্বভাবতই আমি আমার ড্রিম সিটি নিয়ে পড়তে উৎসুক ছিলাম।তবে বেশ হতাশ হলাম,আমি প্যারিসকে যেভাবে আবিস্কার করতে চাইছিলাম লেখায় তার ছিটেফোঁটাও নেই।গতবারের লেখার সাথে তুলনা করে মনে হয়েছে বেশ তাড়াহুড়ো করে লেখা জমা দেয়া।
৩.মঙজালাগুয়োর ভ্রমণ-শাহরিয়ার খান শিহাব ইনি এই বইতে নতুন পাপী,এবং এই সংকলের আমার দ্বিতীয় পছন্দের লেখা।চীন ভ্রমণ নিয়ে লেখা।ভ্রমণের সাথে অন্তর্দৃষ্টি-যেমনটা চাই আমরা,অনেকটাই ফুলফিল করেছেন।তার উপর লেখক পেশায় ফটোগ্রাফার,তাই গল্পের সাথে মন ছুঁয়ে যাওয়া লেখকের ফটোগ্রাফি ফ্রি।
৪.এই শরীর নিয়ে নেপালে?-নিলয় ফয়সাল নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে নেপাল ভ্রমণ নিয়ে লেখা।তবে আমার ভ্রমণের স্টাইল লেখকের চেয়ে লেখকের ভাইয়ের সাথে মিলে বেশি,তাই তার ভাইয়ের জবানবন্দি শুনলে মনে হয় বেশি রিলেট করতে পারতাম😬তবে এই গল্পের সবচেয়ে মুগ্ধ করার মতো বিষয় হচ্ছে লেখক ও তার ভাইয়ের দুই পিচ্চি দুইজনেই ভ্রমণের সময় জার্নালে লিখে ও এঁকে রেখেছে সবকিছু এবং লেখক তাদের সেই ছবিগুলো গল্পের সাথে অ্যাটাচ করে দিয়েছেন।এত্তটুক পিচ্চি অথচ কী সৃজনশীল দেখার দৃষ্টি!এই দুই পিচ্চির জার্নাল ও আঁকা ছবি নিয়ে পিকটোগ্রাফ জাতীয় একটা চিলড্রেনস বুক পাব্লিশ করার জন্য লেখকের কাছে আর্জি পেশ করলাম।
৫.মিস্টার ট্যাম্বোরিন ম্যান-মিলু আমান এই সংকলনের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত গল্প।লেখক সিঙ্গাপুরে বব ডিলানের কনসার্ট দেখতে গিয়েছেন।লেখকের প্রায়োরিটি ক্লিয়ার কাট-ঘুরে দেখাটেখার মধ্যে তিনি আপাতত নেই,তার সঙ্গীতের হিরোকে দেখার অনুভূতিই শুধু তুলে ধরেছেন,আর বিশ্বজোড়া কে না জানে সাহিত্যে নোবেল পাওয়া এই গীতিকার মানুষের অন্তরাত্মা নাড়িয়ে দিতে পারেন গানের কথা ও পরিবেশনা দিয়ে!
৬.যেখানে বজ্রড্রাগনের ভয় সেখানে কী তুষারপাত হয়?-কৌশিক জামান বইয়ের সম্পাদককে সব রেটিং এর বাইরে রাখলাম।প্রথমত গল্পের নাম পড়েই কতক্ষণ হাসলাম।আর ভুটান আমার নিজেরই প্রথম বিদেশ ভ্রমণ ছিলো,তাই পড়তে গিয়ে বারবার নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছিলাম আর Ema datshi (chilli cheese) খাবারের কথা মনে করে খিদাও পাচ্ছিলো।লেখক ভুটানের ইতিহাস বা যেখানে যেখানে গেছেন তার পেছনের ইতিহাসগুলো ইনক্লুড করে লিখেছেন,তাই কাহিনীর সাথে প্রচুর সাধারণ জ্ঞানও ফ্রি পাবেন।