প্রত্যেক শিল্পীকে প্রশ্ন করা হয়, "তোমরা ধারণাগুলো কোথা থেকে পাও?" সৎ শিল্পীরা বলে, "আমরা সেসব চুরি করি।" পৃথিবীটাকে একজন শিল্পী কিভাবে দেখে? প্রথমত, তোমাকে খুঁজে বের করতে হবে কী চুরি করা যায়। এরপর পরবর্তী ধাপে আগাতে হবে। সে সম্পর্কে এখানে বিস্তারিত বলা হয়েছে।
এই দৃষ্টিকোণ দিয়ে দুনিয়া দেখলে কোনটা ভালো কোনটা খারাপ এসব চিন্তা মাথায় আসে না। কেবল একটা চিন্তাই মাথায় আসে- কোনটা চুরির যোগ্য আর কোনটা চুরির যোগ্য নয়। সবকিছু থেকে আইডিয়া চুরি করতে হবে। আজ যদি চুরির জন্য ভালো কিছু না পাও তাহলে আগামীকাল পাবে। নয়তো এক মাস কিংবা এক বছর পর নিশ্চয়ই খুঁজে পাবে।
ছোটোবেলা থেকেই গল্প শুনতে শুনতে একসময় গল্প বলার ভাষাটা রপ্ত করে নিলাম। স্কুলে পড়ার সময় ব্যাংকার হতে চেয়েছিলাম। চেয়েছিলাম অঢেল সম্পদের মালিক হতে, কিন্তু না। হয়ে গেলাম কথার মালিক। জীবনের বাঁকে বাঁকে লক্ষ্য পাল্টে গিয়েছে। শেষমেশ সব পেশার মানুষকে আমার দিকে টেনে এনেছি, গল্প শোনাবো বলে। এই যে, আপনাকে যেভাবে আনলাম। আমার জন্ম দ্বীপ এলাকায়, যেখানে সমুদ্রের জোয়ার এসে আমাকে ছুঁয়ে দেয়। আবার ভাঁটায় গন্তব্য হারাই। কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া উপজেলায় ১৯৯৭ সালের ২০ জানুয়ারি রাতের মাঝামাঝি সময়ে জন্মগ্রহণ করি। বাবা ব্যবসায়ী, মায়ের পেশার শেষ নেই। কখনো ডাক্তার, কখনো ইঞ্জিনিয়ার, কখনো শিক্ষক, কখনো দরজি, কখনো গৃহিণী...। শুধু শখের জন্য লেখালেখি করি না। পেশার জন্য লিখি। ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে স্নাতকোত্তর পড়ছি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। থ্রিলার আমার পছন্দের জনরা। সে জনরায় কাজ করছি, চেষ্টা করছি পাঠকদের ভালো কিছু দিতে। কবিতার পথ ধরে হাঁটা শুরু করলেও থ্রিলার আমাকে তার পথে হাঁটতে বাধ্য করেছে। অন্যদিকে অনুবাদ আমার প্যাশন।
আমার প্রকাশিত অন্যান্য বই-
মৌলিক : জলজ্যোৎস্নার মাখামাখি - ২০১৯ ( কবিতা ), পদ্মজলের সিঁড়ি - ২০২০ ( কবিতা ), মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন বাঙ্গালী কিশোর জীবনী - ২০২০ ( জীবনীগ্রন্থ ), চার একটি যৌগিক সংখ্যা, ২য় মুদ্রণ - ২০২১ ( থ্রিলার উপন্যাস ), বিশেষ দ্রষ্টব্য -২০২২ ( থ্রিলার উপন্যাস )।
শিশুতোষ : ১০ খন্ডে ছোটোদের নবি রাসূল - ২০২২ ( গল্পে গল্পে নবিদের জীবনী ) ৫ম মুদ্রণ, ৬ খন্ডে ছোটোদের মহানবী - ২০২২ ( গল্পে গল্পে মহানবীর জীবন )।
অনুবাদ : স্টিল লাইক অ্যান আর্টিস্ট, মূল - অস্টিন ক্লেওন (২০২২, মোটিভেশনাল) ; ম্যান'স সার্চ ফর মিনিং, মূল - ভিক্টর ই.ফ্রাঙ্কল (২০২৩, মোটিভেশনাল) ; মুরাকামির হাফ ডজন গল্প, মূল - হারুকি মুরাকামি (২০২২, গল্পগ্রন্থ), হাউ টু লাভ, মূল - থিক নাথ হান (২০২২, মোটিভেশনাল), হাউ টু ওয়াক, মূল - থিক নাথ হান (২০২৩, মননশীল), দ্য আলমানাক অব নাভাল রাভিকান্ত, মূল - এরিক জর্জেনসন (২০২৩, উদ্যোক্তা উন্নয়ন)।
'স্টিল'। মানে চুরি করতে বলছেন অস্টিন ক্লেওন। কিন্তু, কিন্তু চুরি করা তো নৈতিক দিক দিয়ে পাপ এবং আইনগত দিক দিয়ে অপরাধ। এজন্যই ক্লেওন সংযুক্ত করেছেন, 'লাইক অ্যান আর্টিস্ট'।
একজন আর্টিস্ট বা শিল্পীর মত করে চুরি করতে বলছেন লেখক। মানুষের জীবনে নিজের আকাঙ্ক্ষা বলতে গেলে নেই। সে অপরের আকাঙ্ক্ষা অনুকরণ করে। মিম্যাটিক ডিজায়ার বলা হয় এই বিষয়টিকে।
'অপরিণত কবিরা অনুকরণ করে, আনাড়ি কবিরা যা গ্রহণ করে তা-ই নষ্ট করে এবং ভালো কবিরা যা গ্রহণ করে তা আরও ভালো করে আলাদা কিছু তৈরি করে। একজন ভালো কবি তার চুরি করা শিল্পকে অনন্য জিনিসে পরিণত করে। এতটাই অনন্য হয় যে, যেটা থেকে চুরি করা হয়েছে তার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।'
- টি. এস. ইলিয়ট
বেস্টসেলিং এই গ্রন্থে অস্টিন ক্লেওন একদম প্রাঞ্জল ভাষায় সোজাসাপ্টা কথাবার্তা বলেছেন। অনুকরণ করা যে ছিচকে চুরি নয় বরঞ্চ একটি গাড়ির সবগুলো পার্ট খুলে প্রতিটি পার্ট বুঝার প্রচেষ্টা তা তিনি ব্যক্ত করেছেন। মানুষজন যে 'মৌলিক' মৌলিক' করেন সেই বিশুদ্ধ 'মৌলিকত্ব' ক্লেওনের মতে নেই। বরঞ্চ কোন কাজ শুরু করার আগে ভান করা, অনুকরণ করা শুধু কাজটি নয় বরঞ্চ কাজের পিছনের ভাবনাকেও এবং ক্রমাগত এই প্রক্রিয়া যে মানুষকে একই ভাবে হাজার বছর ধরে করে আসা কাজের মধ্যে নিজের কাজকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করার শক্তি দেয় তা-ই সবাই মৌলিক ভাবে। কারণ চুরি নিখুতভাবে হলেও হতে পারে, অনুকরণ নয়।
'আমরা যা হতে চেয়েছিলাম সেটা না হতে পারার ব্যর্থতাই আমাদের অনন্য করে তোলে। ভাগ্যিস!'
-কৌতুকঅভিনেতা কোনান ও'ব্রায়েন
লেখক মূলত পুরো বইয়ে সংক্ষিপ্ত আকারে মানুষের মধ্যকার সৃজনশীলতার অদ্ভুত রকেটটিকে ফুয়েল দেয়ার চেষ্টা করে গেছেন। একইসাথে দিকনির্দেশনাও। লেখকের মতে, 'সত্যিটা হলো, সৃজনশীল হতে প্রচুর শক্তি প্রয়োজন। সেই শক্তি অন্য বিষয়ে খরচ করে ফেললে তোমার আর সৃজনশীল হওয়ার শক্তি থাকবে না।'
শৃংখলা এবং রুটিনের দিকে লেখক মনোনিবেশ করতে বলেছেন। কারণ লেখক নিজে যেমন বহুবছর বেচে থাকতে চান ঠিক তেমনি যাদের গাইড করছেন তাদেরও দীর্ঘায়ু চান মনে হয়। আপনি যা লিখতে পছন্দ করেন সেটিকে আপনি যা জানেন সেটার উপর অগ্রাধিকার দিয়েছেন ক্লেওন। ইন্টারনেট বা ডিজিটাল প্রযুক্তির মানুষের সৃজনশীলতার উপর যে পজেটিভ এবং নেগেটিভ প্রভাব ফেলে সেই বিষয়েও আলাপ আছে উক্ত বইয়ে। লেখকের মতে, 'সব গল্পই আসলে কোনো না কোনোভাবে ফ্যান ফিকশন।' যেহেতু ইন্টারনেটের কারণে ভূগোল এখন আমাদর আর নিয়ন্ত্রণ করে না তাই অস্টিনের মতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ল্যাভারেজ বা সুবিধা। মানুষের একইসাথে সহৃদয় এবং বিরক্তিকর হওয়ার দিকেও আলোকপাত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেয়া এই গ্রন্থকার।
ভাবানুবাদে রিয়াজ মোরশেদ সায়েম চমৎকার কাজ করেছেন। একদম ঝরঝরে ভাষার অনুবাদ কার না ভালো লাগে! 'স্টিল লাইক অ্যান আর্টিস্ট' বইয়ের মধ্যকার সিম্পল অঙ্কনসমূহ সৃজনশীলতার যে কোয়েস্টে শিল্পীরা থাকেন সেসবের উপর লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আসা কিছু বেসিক গাইডলাইন দিয়েছে। অস্টিন ক্লেওন অর্থনৈতিক সচ্ছলতার গুরুত্বের পিছনে মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন তার পাঠকদের। একইসাথে জীবনসঙ্গি ও বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ইম্পর্টেন্স দিয়েছেন। কী বাদ দেয়া দরকার অনেক অপশনের মাঝে তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্তে আসতে বলেছেন লেখক এই বলে,
'তথ্য প্রযুক্তির সহজলভ্যতার এই যুগে, তারাই এগিয়ে যাবে যারা বুঝতে পারবে তাকে কী ত্যাগ করতে হবে। এগিয়ে যেতে হলে কিছু কিছু বিষয় বাদ দিতে হবে। যেন তোমার জন্য আসলেই কী গুরুত্বপূর্ণ তার উপর মনোনিবেশ করতে পারো। অসীম সম্ভাবনার আইডিয়াগুলো দেহকে নিস্তেজ করে দেয়। তুমি যে-কোনো কিছু করতে পারো - এই ধারণাটি খুবই ভয়াবহ।'
অস্টিন ক্লেওনের বইটির অনেক বিষয় সচেতন পাঠক এবং ক্রিয়েটিভরা আগের থেকেই হয়তো জানেন। আবার কিছু গাইডলাইন হয়তো জানেন না। সৃজনশীলতা একটি বড় প্যাচালো এবং রহস্যময় বিষয়। লেখক নিজ জীবন এবং বিখ্যাত অনেক ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তার বয়ান দিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে লেখক কিছুটা ওল্ড স্কুল ট্যাকনিক প্রয়োগ করার কথা বলেছেন। লিখেছেন বিভিন্ন স্মার্ট গ্যাজেটের স্ক্রীণের মাতাতিরিক্ত ব্যবহার কিভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে একজন ক্রিয়েটিভের কর্ম-প্রক্রিয়ায়। আমার কাছে মনে হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু সারকথা আছে বইটিতে। সৃজনশীলতা চর্চার মানুষজন আগ্রহী হলে বইটি পড়ে গুরুত্বপূর্ণ ইনসাইট পেতে পারেন।
বুক রিভিউ
স্টিল লাইক অ্যান আর্টিস্ট মূল : অস্টিন ক্লেওন ভাবানুবাদ : রিয়াজ মোরশেদ সায়েম প্রথম প্রকাশ : মার্চ ২০২২ প্রচ্ছদ : সব্যসাচী মিস্ত্রী প্রকাশনা : অক্ষরবৃত্ত জঁরা : নন-ফিকশন, আর্টিস্টিক বেসিক গাইডলাইন, মোটিভেশনাল রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
স্টিল লাইক অ্যান আর্টিস্ট: সৃজনশীল হওয়ার গোপন মন্ত্র ▫ “লেখক জোনাথন লেথেম বলেন, মানুষ যখন কোনো কিছুকে মৌলিক বলে; বেশিরভাগ সময় তারা আসলে এই মৌলিকের সত্যিকার উৎস সম্পর্কে জানে না। একজন প্রকৃত শিল্পী বোঝেন, আপনাআপনি কিছুই হয় না।”
একটি শিশু জন্মের কয়েক মাস পরে কথা বলার জন্য ঠোঁট নাড়ে। উঠে বসা এবং হেঁটে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে সে হামাগুড়ি দেয়। শিশুর কথা বলতে চাওয়া, উঠে বসতে চাওয়া, হাঁটতে চাওয়া এইসব সে তার মা, বাবা, ভাইবোনকে অনুকরণের চেষ্টা করে। কে কি করছে তা নিখুঁতভাবে দেখে এবং তা নিজে নিজে করতে প্রাণপণ চেষ্টা করে। পরিবারের লোকজন তাকে কথা বলতে শেখান, উঠে দাঁড়াতে শেখান, হাঁটতে শেখান, মায়ের মুখ থেকে বের হওয়া শব্দটি সে অনুকরণ করে বলতে চাই; মাকে বাবাকে অনুকরণ করে হাঁটতে চাই; ধীরেধীরে সে কথা বলতে শিখে যায়, হাঁটতে ও চলতে শিখে যায়। তখন সে নিজের মতো বলে, নিজের মতো হাঁটে তবে তার শুরুটা হয় অন্য মানুষদের অনুকরণে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, শিশুটির প্রতিটি কাজে সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটে এই সৃজনশীলতা সে মা বাবা ও অন্যান্যদের অনুকরণ করতে করতে পায়। প্রতিটি শিল্পী পূর্বের শিল্পীর অনুসরণ এবং অনুশীলনের মধ্য দিয়ে নিজের শিল্পে আলাদা সৃজনশীল হয়ে উঠে।
ফরজদক শায়ের ইমাম মালেকের শানে একটি শে'র রচনা করেন, বাদশাহকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘মক্কার মাটি ও মানুষ যাকে জানে তুমি তাকে জানো না।’ ফরজদক বলেন আমি মানুষের ভালোবাসা দেখে অনুপ্রেরণা এবং কায়েসের কাছে অলঙ্কার পেয়েছি।
“ফরাসি লেখক আঁদ্রে গিদ বলেন, ‘যা কিছু বলা দরকার, তা সবই বলা হয়ে গেছে। তবে যেহেতু কেউ মন দিয়ে শুনেনি, তাই সবকিছু আবার নতুন করে বলতে হবে।’ একেবারে শূন্য থেকে মৌলিক কিছু তৈরি করার চাপটা যদি একবার আমাদের মাথা থেকে নামিয়ে ফেলতে পারি, তাহলে আমরা যে-কোনো অনুপ্রেরণাকে বরণ করে নিতে পারব।”
আমাদের বলা হয়, যদি লিখতে হয় তবে পড়তে হবে৷ নতুন এক চিকিৎসক তার চিকিৎসাসেবার পূর্বে পুরাতন এক অভিজ্ঞ চিকিৎসকের কাজগুলো দেখে তাকে অনুসরণ করে এবং অনুকরণ করে। একজন ডিজাইনার নতুন একটা ডিজাইন করতে অন্যকারো করা ডিজাইনগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে এবং নতুন একটা ডিজাইন সামনে আনে। লেখক লেখার পূর্বে আগে লিখিত লেখা পড়ে অনুপ্রাণিত হয় সেগুলো অনুসরণ ও অনুশীলন করে নতুন এক লেখা লিখে, যা সে লেখা হওয়া উচিত মনে করে। “প্রতিটি নতুন ধারণা হলো পূর্বের এক বা একাধিক ধারণার মিশ্রণ”
পৃথিবীতে প্রত্যেক সৃষ্টিই স্রষ্টার পৃথক সৃজনশীলতা; আবার এতে রয়েছে সমন্বয়। সৃজনশীলতা থাকে সবার মাঝে। তবে তা খুঁজে পায় না অনেকে। সৃজনশীল হতে কঠিন পরিশ্রম, কঠোর অধ্যাবসায় ও পার্থিব সবকিছু ভুলে কঠোর সাধনায় ডুব দেয়া এসব নয়; বরং একদম সহজে সৃজনশীল হওয়া যায় দরকার সঠিক পরিচর্যার। পরিচর্যার জন্য একটি বইও হতে পারে উৎকৃষ্ট মাধ্যম।
সৃজনশীলতার মূল একটি সমস্যাকে আবিষ্কার করতে পারা, তা বিভিন্ন আঙিকে বিভিন্নভাবে বুঝতে পারা এবং তার সমাধান নিয়ে চিন্তা করতে পারা। সমস্যা ধরতে পারলে সমাধান নিয়ে ভাবতে পারবেন, তা আপনাকে নিয়ে যাবে প্রয়োজনের দিকে, আর কথিত আছে ‘প্রয়োজন আবিষ্কারের জননী’, সেখানেই আপনার সৃজনশীলতার বিকাশ হবে। কাজ হলো সৃজনশীল হওয়ার প্রধান মাধ্যম, কাজ না করলে সৃজনশীলতা আর নাই থাকুক। কাজের গুরুত্বে লেখক লিখেছেন, “যা বানানোর বানিয়ে ফেলো মন্ত্রটা হলো, তুমি যে ছবিটা দেখতে চাও সেটা এঁকে ফেলো। তুমি যে ব্যবসাটা করতে চাও সেটা শুরু করে দাও। তুমি যে গানটি শুনতে চাও সেটা তৈরি করে ফেলো। যে বইটা তুমি পড়তে চাও সেটা লিখে ফেলো। তুমি যে পণ্যগুলো ব্যবহার করতে চাও সেগুলো তৈরি করো। যে কাজটি তুমি হতে দেখতে চাও সেটা করে ফেলো।”
২. “The artist is a collector. Not a hoarder, mind you, there’s a difference: Hoarders collect indiscriminately, artist collect selectively.”
‘স্টিল লাইক অ্যান আর্টিস্ট’ বইটি তোমাকে নিজের উপস্থিতি আবিষ্কার করতে বলবে আর কিছুর দরকার নেই। তুমি আছো এটাই যথেষ্ট, সেখান থেকেই শুরু। বইটি বলবে ‘Nothing is new under the sun.’ তোমাকে পুরাতনটি বলতে বলবে। পুরাতনটি বলতে বলতে নতুন কিছু খুঁজে পাবে। একেবারে নতুনের জন্য বসে থাকলে শুরু করাটাই হবে না। তুমি যা চিন্তা করছো তা হতে বলবে এবং হওয়ার পদ্ধতিটা দেখাবে। বইটি তোমাকে বলবে কীভাবে সৃজনশীল হবে। চমকপ্রদ কিছু চিত্রে তোমার সামনে সৃজনশীল হওয়ার উপায়গুলো উপস্থাপন করবে। তুমি বইটি পড়ো এখানে তোমাকে সৃজনশীল হয়ে উঠার গোপন মন্ত্র শেখানো হবে।
৩. অস্টিন ক্লেওনের “স্টিল লাইক অ্যান আর্টিস্ট’ সৃজনশীল হওয়ার এই ১০টি উপায় কেউ তোমাকে বলে নি।’ সেই ১০টি উপায় রিয়াজ মোরশেদ সায়মের কলমে বাংলায় অনুদিত হয়েছে। বইটির আরও অনুবাদ আছে তা এবং মূল বইটি মোটামুটি উল্টেপাল্টে দেখার সুযোগ হয়েছে এটাই আমার সবচেয়ে ভালো অনুবাদ মনে হয়েছে। অনুবাদকের ভাবানুবাদে নিজের চিন্তারও সম্মিলন প্রশংসনীয়।
রিয়াজ মোরশেদ সায়েমের অনুবাদে বইটি দুইবার পড়েছি আমি। অনুবাদককে ভালোবাসা চমৎকার বইটি সাবলীল বাংলায় অনুবাদের জন্য। কেন জানি আবার পড়তে মন চাই। পড়তে পড়তে মনে হয় কথাগুলো আমার জন্য। ১০টি উপায়ের যেটাই পড়ি মনে হয় এটি একান্ত আমার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পড়া শুরু করলে অর্ধেকে রাখতে মন চাই না। উপন্যাস বা গল্পের বইয়ে একটানা শেষ করতে টেনে নিয়ে যায় অনেক গল্প, আত্মউন্নয়ন মূলক বইয়ে এটি টানতে থাকে সামনে, একটি উপায় পড়তে পড়তে পরের উপায় জানতে মনে একধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। যারা সৃজনশীল হতে চান তাদের জন্য অসাধারণ একটি বই। 〰 ▪বই: স্টিল লাইক অ্যান আর্টিস্ট ▪লেখক: Austin Kleon ▪অনুবাদক: রিয়াজ মোরশেদ সায়েম ▪ধরন: আত্মউন্নয়ন ▪প্রকাশক: অক্ষরবৃত্ত (Anis Sujan) ▪মুদ্রিত মূল্য: ৳২৮০ ______________________ খোবাইব হামদান #পাঠপর্যালোচনা চাঁনখালী, চট্টগ্রাম | ৭ বৈশাখ ১৪২৯
হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। প্রত্যেক লেখকই চোর। আর এটা আমার বক্তব্য না। সরাসরি না হলেও আকার ইঙ্গিতে এই বক্তব্যটি উপস্থাপন করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন জনপ্রিয় লেখক অস্টিন ক্লেওন।
যার ভাষ্যমতে, পৃথিবীতে নতুন বলে কিছু নেই। সব কাজের জন্ম অনেক আগেই হয়েছে। শিল্প সাহিত্যের বেলাতেও তা ব্যতিক্রম নয়। আমরা শুধু বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করছি মাত্র। একাধিক ব্যক্তির চিন্তাধারা, তাদের পদাঙ্ক, তাদের কর্মফলকে চুরি করছি। তারপর সেগুলোর সংমিশ্রণকে রূপ দিচ্ছি নিজেদের সৃষ্টি হিসেবে। আর এ কাজে ভিন্নতা এলেই সেসব হয়ে ওঠে আমাদের মৌলিক কাজ। ক্লেওন তার বইতে এরকম দশটি উপায় দেখিয়েছেন, যা আপনার সৃজনশীলতার ভিত্তিকে শক্ত করে তুলবে।
১২৮ পৃষ্ঠার এই বইটি পড়ে শেষ করতে আমার এক ঘণ্টাও লাগেনি। ভীষণ ইন্টারেস্টিং এবং ইউনিক কনসেপ্ট। প্রাঞ্জল উপস্থাপনা। সেইসাথে অনুবাদটাও চমৎকার। বইয়ের ভেতরকার সেটআপটা খুব ভালো লেগেছে। স্ক্র্যাপবুক স্টাইলের হওয়াতে পড়ে আরাম পেয়েছি।
স্টিল লাইক অ্যান আর্টিস্ট এর বাংলা অর্থ দাঁড়ায় শিল্পীর মতো চুরি করো। আক্ষরিক অর্থেই বইটা আপনাকে শেখাবে- কীভাবে চুরি করতে হয়। শুধু শেখাবে বললে ভুল হবে, আপনাকে রীতিমতো মোটিভেট করবে।
কিন্তু এই চুরি করার ব্যাপারটা অপরাধ কিংবা নেতিবাচক কেন্দ্রিক হবে না। বরং আপনি এটাকে সৃজনশীল উপায়ে নিতে শিখবেন। আরও সহজভাবে যদি বলি, চুরি শব্দটাকে অনুকরণ শব্দে বদলে ফেলুন। তারপর শিখুন কীভাবে অনুরকণ করতে হয়। এ প্রসঙ্গে বইয়ে উদ্ধৃত উইলসন মিজনার এর বক্তব্যটি হলো, ‘তুমি যদি শুধুই একজন লেখককে অনুকরণ করো তবে সেটা হবে চুরি; যদি অনেকজনকে অনুকরণ করো তাহলে সেটা হবে গবেষণা।’
বইটা মূলত আত্মোন্নয়ন ঘরানার। লেখক তার ব্যক্তি জীবনের অভিজ্ঞতা, দর্শন, গবেষণা এবং অসংখ্য গুণীজনদের জীবন থেকে সৃজনশীলতার ভাবাদর্শ তুলে এনেছেন। যা পড়লে আপনি নিজের যেকোনো কাজে, বিশেষ করে সৃজনশীল পেশা, লেখালেখিতে উৎসাহ ও আগ্রহ খুঁজে পাবেন। সব মিলিয়ে বেশ উপভোগ্য একটি বই।
যারা অনুবাদ এবং আত্মোন্নয়নমূলক বই পছন্দ করেন, তাদের জন্য ‘স্টিল লাইক অ্যান আর্টিস্ট’ সাজেস্ট রইল। হ্যাপি রিডিং। .