গল্পকথন মিথলজির চেয়েও পুরনো। বহুকাল ধরে মনুষ্যজাতি স্টোরিটেলিং এর আশ্রয় নিয়েছে। কখনো অতীতকে ভুলে থাকার বা মনে রাখার জন্যে। কখনো বর্তমান বিস্মৃত হয়ে কল্পনার জগতে ঘুরে বেড়ানোর নিমিত্তে। আবার কখনো অনাগত ভবিষ্যতকে বর্তমানের বর্ধিত রূপ হিসেবে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায়। গল্প মানবজীবনের এক বিস্বস্ত সঙ্গি হিসেবে রয়ে গেছে।
৩৬ জন লেখকের সৃজন করা গল্প আছে এই গ্রন্থে। সবার লেখা ভালো লেগেছে একথা বলবো না তবে বেশিরভাগ গল্প ভালো লাগার মতো। ওয়াসি আহমেদের সম্পাদনা এবং নাবিল মুহতাসিমের নামকরণে গল্পের এক রথযাত্রার মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করা হয়েছে এই বইয়ের মাধ্যমে।
কিছু গল্পের নাম বলতে হয়।
যেমন :
চর্মকার : আলী ওয়াহাব সৌহার্দ্য
তাম্বুল রাতুল হৈল : নাবিল মুহতাসিম
ক্লোজ এনকাউন্টার অব থার্ড কাইন্ড অথবা আহনাফদের ছাদে বহির্জীব : মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
ধুর! : শরীফুল হাসান
ভোজ : তানজীম রহমান
গন্তব্য ফিফথ অ্যাভিনিউ : মাহরিন ফেরদৌস
বইপাড়ায় যেভাবে আগুন লাগল : ওয়াসি আহমেদ
উল্লেখ্য গল্পসমুহ আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে। আলী ওয়াহাব সৌহার্দ্য ইজ জাস্ট ব্রিলিয়ান্ট। তাম্বুল হৈল রাতুল আমার ওয়ান অফ দ্য ফেবারিটস। শরীফুল হাসানের কোন পূর্নাঙ্গ বই পড়িনি। তবে ধুর! পড়ে বুঝতে পারলাম এত নামডাক কেন হয়েছে তার। ঐ গল্পে কোথায় যেন হুমায়ূন আহমেদ একঝলক উকি দিয়ে গেলেন। তানজীম রহমানের ভোজ মনে হয় এই বইয়ের সবচেয়ে প্রিয় গল্প আমার। তারও কোন উপন্যাস এখনো পড়িনি। মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন উপহার দিয়েছেন একদম অন্যরকম একটি গল্প। বেশ মজা পেয়েছি পড়ে। গন্তব্য ফিফথ অ্যাভিনিউ এক গল্পে মিশ্র অনুভুতির সৃষ্টি করে বেশকিছু। ওয়াসি আহমেদের গল্পটি খুব ভালো লেগেছে।
এই বইয়ের বেশিরভাগ গল্পকার যে জনরার বই লিখেন সচরাচর সেগুলোর থেকে খানিকটা বেরিয়ে এসে তাদের অন্যরকম লেখনী প্রতিভার পরিচয় রেখেছেন নিজ নিজ স্টোরিতে। বিষয়টা আমাকে খানিকটা চমকে দিয়েছে।
তবে গুডরিডসে যে ৪৮৬ পৃষ্ঠার বই বলা হয়েছে সেটি সঠিক নয়। গ্রন্থটি ৪০৩ পৃষ্ঠার। তাছাড়া লিহুয়ান গল্পটি মনে হয় পুরোপুরি প্রিন্ট হয়নি।
গল্পকথনে লেখক নিজে হারিয়ে যান এবং অন্যদের নিরুদ্দেশ এক কল্পনার রাজ্যে পাঠিয়ে দেন। এই গল্পরথে সেই উদ্দেশ্যহীন এবং অসম্পূর্ণ এক যাত্রায় হারিয়ে যেতে পারেন সচেতন পাঠক।
বাস্তব জীবন এবং ফিকশনে তেমন কোন পার্থক্য নেই। আমাদের এক একজনের জীবন তো এক একটি গল্প-ই।
উপন্যাসের চাইতে গল্পগ্রন্থ পড়ার একটি সুবিধা হলো, একেকটি গল্প একেকরকম অনুভূতির সৃষ্টি করে। এছাড়া একটি গল্প পড়ার পরে বিরতি দিয়ে আরেকটি গল্প পড়া যায়। আর একই সংকলনে একাধিক লেখকের গল্প থাকলে গল্প কিংবা বর্ননায় যে বৈচিত্র্য আসে তা দারুণ। এই সংকলনে মোট ৩৬ জন লেখকের বিভিন্ন স্বাদের গল্পগুলো একত্রিত করা হয়েছে।
ইমতিয়ার শামীমের 'নিমফুলের মৌ' গল্পটি এই গ্রন্থের সবচেয়ে পছন্দের গল্প। চাটমোহরের শিমুল চৌধুরীর বাড়িতে একজন বুনো নাকি সাঁওতাল থাকে। সেই অদ্ভুত মানুষটিকে ঘিরেই এই গল্পটি আবর্তিত হয়েছে, সাথে রয়েছে গ্রামীণ পরিবেশের ছাপ। নাবিল মুহতাসিমের 'তাম্বুল রাতুল হৈল' গল্পটির সমাপ্তি যেভাবে টেনেছেন লেখক, তাতে তাঁর মুন্সিয়ানার পরিচয় পাওয়া যায়। গল্পটির মূল বিষয়বস্তু দারুণ লেগেছে। হামিম কামালের 'এক রবিবার' গল্পটিতে একটি শিশুর চোখে বাবার কর্মস্থলের চিত্র ফুটে উঠেছে। সুন্দর পরিপাটি একটি গল্প। আবরার আবীরের 'কলহগাথা' গল্পে বংশপরম্পরায় প্রেম পিরিতির গল্প পড়ে পাঠক হাসতে বাধ্য। মাহবুব ময়ূখ রিশাদের 'এভাবেও কেউ ভালোবাসে' গল্পের অনুরাগ কি জানে ২০২২ সালে মেসি তার বহুল আকাঙ্ক্ষিত শিরোপার স্বাদ পেয়েছেন? তানজীম রহমানের 'ভোজ' গল্পটি সুন্দর ছিল। মোহাম্মদ সাইফূল ইসলামের 'কলম্বাসের মহাজাগতিক প্রেতাত্মা' গল্পটি আমাদের প্রতি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, আসলেই কি আমরা এই মহাবিশ্বে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের দাবি রাখতে পারি? মোহাইমিনুল ইসলাম বাপ্পীর 'মহাজাগরণ' গল্পটি অসাধারণ বিজ্ঞান কল্পকাহিনী। একই নামে আরেকটি বই দেখেছিলাম। বইটা কি এই গল্পেরই বর্ধিত অংশ! হতে পারে। জাহিদ হোসেনের 'মায়ের দোয়া স্টোর' গল্পটাও ভালো লেগেছে।
এক তৃতীয়াংশ গল্প একেবারেই ভালো লাগেনি। কিছু গল্প একটু বেশিই ভালো ছিল। বাকিগুলো মোটামুটি রকমের। রবিন জামান খানের 'শেষ ঠগি' গল্পের ঘটনা শ্রীপান্থের বইতে পড়েছিলাম। নতুন কিছু মনে হয়নি। তানজিরুল ইসলামের 'লিহুয়ান' গল্পটি সম্ভবত পুরোটা আসেনি বইতে। বাদ পড়ে গেছে। সম্পাদনার ঘাটতি। নিয়াজ মেহেদীর 'পাপবৃক্ষ' গল্পটি লেখকের একক গল্পগ্রন্থে অন্য নামে সংকলিত আছে। শুধু নামটা পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে।
আসলে এতগুলো নবীন প্রবীণ লেখকের গল্প পড়লে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আসাটাই স্বাভাবিক বলে মনে করি। গল্পগুলোর ভিন্নতা যেমন আছে, তেমনি অনুভূতি সৃষ্টিতেও ভিন্নতা আসবে পাঠকের। ভিন্ন স্বাদের এক ঝাঁক লেখকের গল্পের সাথে সময় কাটাতে বইটি হতে পারে আপনার পাঠ্য। হ্যাপি রিডিং।
উপন্যাসের জয়জয়কার আজকাল। ওয়ার্ড কাউন্ট করে বিশাল উপন্যাস লেখার ফাঁকে ছোট গল্প কেমন কোণঠাসা হয়ে গেছে। তবে আমার সবসময়ই গল্প পড়তে ভালো লাগে। আমার মতো যারা গল্প-প্রিয় পাঠক তাদের জন্য 'গল্পরথ' মাস্টরিড মনে করি। বাংলাদেশ ও কলকাতার নবীন প্রবীণ লেখকদের বাছাই করা সব গল্প এক করেছেন এখানে ওয়াসি আহমেদ। বেশিরভাগ গল্পই মনে রাখার মতো।
ছোটগল্প বরাবরই টানে আমাকে। তাই চেষ্টা করি গল্পসংকলন পড়তে আর সংগ্রহে রাখতে। তাই নিয়েছিলাম অবসর প্রকাশিত আর ওয়াসি আহমেদ সম্পাদিত 'গল্পরথ'। বলতেই হয়, হতাশ হওয়ার কোনো সুযোগ ছিলো না।
যেসব গল্প মন ছুয়ে গিয়েছে: আলী ওয়াহাব সৌহার্দ্যের 'চর্মকার'। (এটা ৫/৫) নিয়াজ মেহেদীর 'পাপবৃক্ষ'। (গল্পটা আগেও পড়েছি, চমৎকার) নাবিল মুহতাসিমের 'তাম্বুল রাতুল হৈল'। (এটা ৫/৫, নিজেকেই ভালোবাসতে হবে) মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের 'আহনাফদের ছাদে বহির্জীব'। (টুইস্ট সেরা ছিলো 😂) আবরার আবীরের 'কলহগাথা'। (বংশপরম্পরায় ফষ্টিনষ্টি 🥴) মোহাইমিনুল ইসলাম বাপ্পীর 'মহাজাগরণ। (নিজে সাইন্সের স্টুডেন্ট, তার উপর সাইকো���জি নিয়ে হালকাপাতলা ঘাটাঘাটি করার অভ্যাসও আছে। তাও পুরো গল্পটা দুইবার পড়তে হয়েছে বুঝতে, আর বুঝতে পেরে তন্ময় হয়ে বসেছিলাম কিছুক্ষণ)
সম্পাদকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, তানজিরুল ইসলামের 'লিহুয়ান' গল্পটা শেষ হয়নি।