আমরা যাকে মুগ্ধতা বলি তার বিপরীতে থাকে প্রত্যাখ্যান। প্রেমের অপর প্রান্তে অপ্রেম। সততার অন্য দিকে প্রতারণা। মিলনের বিপরীতে বিচ্ছেদ। নারী-পুরুষের সামাজিক সম্পর্কের এসব জটিল রসায়ন আমাদের প্রতিদিনের জীবনে ঘটে চলেছে। এই গল্পগ্রন্থে রয়েছে যোগাযোগের এমন বিচিত্র মনস্তত্ত্ব উন্মোচনের টুকরো টুকরো কাহিনি।
ফয়জুল ইসলামের জন্ম ২৪ নভেম্বর ১৯৬৩, ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীতে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়েছেন পাবনা জিলা স্কুল ও পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পরে উন্নয়ন অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন যুক্তরাষ্ট্রের উইলিয়ামস কলেজ থেকে। প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘নক্ষত্রের ঘোড়া’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে। ফয়জুল ইসলাম ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। তাঁর ‘খোয়াজ খিজিরের সিন্দুক’ বইটি প্রথম আলো বর্ষসেরা বইয়ের পুরস্কার লাভ করেছে।
খোয়াজ খিজিরের সিন্দুক, ফয়জুল ইসলামের বিখ্যাত গল্পগ্রন্থ, আমাকে মুগ্ধ ও কিছু ক্ষেত্রে হতাশ করেছিলো। বইটা নিয়ে বলার মতো ভালো বিষয় আছে অনেক। এর মধ্যে প্রধান হচ্ছে লেখকের অত্যন্ত স্বাদু গদ্য, রসবোধ ও নিখুঁতভাবে গল্পের পরিবেশ তৈরি করার দক্ষতা। কিন্তু আমার একটাই আফসোস ছিলো। সেটা হচ্ছে - ঠিক সময়মত থামতে না জানা (মনে হচ্ছিলো যবনিকাপাতের উপযুক্ত মুহূর্ত পার হয়ে যাচ্ছে কিন্তু অযথা কাহিনি টেনে বড় করা হচ্ছে) বা জম্পেশ কাহিনির অতি সাধারণ পরিসমাপ্তি।
"ঘুমতৃষ্ণা" তাই আশংকা নিয়ে শুরু করেছিলাম। দারুণ একটা গল্প শেষ মুহূর্তে এসে নষ্ট হওয়ার আশংকা। প্রথম গল্পটা সেই আশংকার পালে কিঞ্চিৎ হাওয়া দিয়েছে কিন্তু দ্বিতীয় গল্প "মাছরাঙা" থেকে লেখক চমকে দিয়েছেন। কথাসাহিত্যিক হিসেবে তিনি আরো সংহত, আরো সাবলীল, আরো অন্তর্ভেদী হয়েছেন। গল্পগুলোর মূল বিষয় নারী পুরুষের অন্তর্গত সম্পর্ক, নৈঃসঙ্গচেতনা ও যাপিত জীবন।গল্পের পটভূমি হিসেবে আছে অনিদ্রায় আক্রান্ত এক যুগল(ঘুমতৃষ্ণা), যুদ্ধে স্বামী হারানো এক রমনী(মাছরাঙা), নিঃসঙ্গ এক যুবার বাসায় রিজাস মাকাক প্রজাতির বানরের আগমন("লয়ে যাও আমায়",বইয়ে আমার সবচেয়ে প্রিয় গল্প), এক ছা-পোষা কেরানীর স্মার্ট ফোন কেনা ও যৌনতা বিষয়ক ফ্যান্টাসি(বেইজক্যাম্পের দিনগুলি), পৌঢ় এক পুরুষের স্থবির যৌনজীবন সচল করার আপ্রাণ চেষ্টা(যৌবনের জন্য শোকগাথা)।
লেখকের ভাষা এতো প্রাণোচ্ছল!এতো সহজ!তিনি গল্প লেখেন (বা বলেন) বৈঠকি ঢঙে, আয়েশ কোরে। গল্পে নারী পুরুষের বিচিত্র রসায়ন পরিস্ফুট হয়ে ওঠে।এরা খুবই সাধারণ মানুষ, খুব সাধারণ তাদের চাহিদা কিন্তু সেগুলোই পূরণ হয় না, জন্ম নেয় বিচিত্র সব ঘটনা। কিছু চরিত্রের যৌনতাভিত্তিক চিন্তা অতিরিক্ত পর্যায়ের হলেও তাদেরকে ঠিক "লম্পট " মনে হয় না।লেখক তাদের মানুষ হিসেবেই যথার্থভাবে নির্মাণ করেন। পুরুষের সাধারণ যৌন কার্যক্রম - হস্তমৈথুন, আড়চোখে মেয়েদের বুক ও শরীরের দিকে তাকানো থেকে শুরু করে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন সবই লেখক অবলীলায় বর্ণনা করেছেন(বাংলা সাহিত্য প্রাপ্তবয়স্ক হচ্ছে ধীরে ধীরে!) গল্পগুলোর পরিণতি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই "শেষ হইয়াও হইলো না শেষ।" যেমন "বেইজক্যাম্পের দিনগুলি "তে নায়ক মোতাহার এর মনোবাঞ্ছাকে লেখক পূর্ণতা দ্যান না কিন্তু তাকে আশাহতও করেন না। তার ঝুলন্ত আশার মতো তাকেও ছেড়ে দ্যান মাঝপথে।
গল্পগুলোর সরল, একরৈখিক ও হাস্যমুখর বাতাবরণ এর মাঝে একসময় ঘনিয়ে ওঠে তীব্র একাকীত্বের বোধ, কোনো কিছুর সাথে সংযোগ স্থাপনের নিদারুণ চেষ্টা, নিজেকে প্রতিমুহূর্তে বাঁচিয়ে ও ভুলিয়ে রাখার এক আপ্রাণ যুদ্ধ। যৌনতা ও সরলতার বেষ্টনী ভেদ করে তাই "ঘুমতৃষ্ণা" আমাদের সবার গল্প হয়ে ওঠে।
(১১ ডিসেম্বর, ২০২২)
২১.০১.২০২৫ এ মারা গেলেন প্রিয় গল্পকার ফয়জুল ইসলাম। তার বইগুলো কি টিকে থাকবে? লোকজন কি এই শক্তিমান গল্পকারের লেখা পড়বে? চিন্তা হয়।
গুডরিডসের মোটো হচ্ছে 'Meet your next favorite book'। ঘুমতৃষ্ণা বইটার ক্ষেত্রে সেই কথাটা একদম শতভাগ প্রযোজ্য৷ শুধু ঘুমতৃষ্ণাই নয়, গুডরিডসের অ্যালগরিদমের কারণে বেশ কয়েকটা ভালো বই খুঁজে পেয়েছি আমি। তবে তন্মধ্যে ইংরেজি বইয়ের সংখ্যাই বেশি৷ আশা করি বাংলা বইয়ের ডাটাবেজও একসময় এরকম আরো শক্তিশালী হবে৷
এবারে আসি আলোচ্য বইয়ের বিষয়ে। ফয়জুল ইসলাম ভীষণ স্বাদু গদ্যে গল্প বলেন। একদম আয়েশী, বৈঠকী ভঙ্গিতে। লেখক হিসেবে তার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা সত্যিই মুগ্ধ করেছে আমাকে। এই প্রথম তার কিছু পড়লাম, কিন্তু গুণী লেখককে চিনতে খুব বেশিদূর যেতে হলো না। আমার ধারণা ভদ্রলোক নির্দিষ্ট একটা থিম বেছে নিয়ে গল্পগুলো লিখেছেন; তবে থিমটা বেশ ক'টা লেয়ারে মোড়ানো। আর সেটা হচ্ছে মানব-মানবীর সম্পর্কের রসায়ন, যৌনতা এবং নিঃসঙ্গতা নিয়ে ভাবনা। সবকিছুই একদম পরিমিত পরিমাণে থাকায়, টানা পড়ে যাওয়া যায়।
প্রথম গল্পে আমরা দেখতে পাই অনিদ্রায় আক্রান্ত এক যুগলকে,আক্ষরিক অর্থেই ঘুমের জন্যে যাদের যাবতীয় তেষ্টা৷ তৃতীয় গল্পে একাকী দিনাতিপাত করা এক লোকের বাড়িতে হঠাৎ রিজাস মাকাক প্রজাতির বানর আস্তানা গাড়ে৷ হঠাৎ শেষ হয়ে যাওয়া বেইজক্যাম্পের দিনগুলোতে এক সাধারণ চাকুরের স্মার্টফোন কেনা ও যৌনতা বিষয়ক ভাবনাগুলোই ঘুরপাক খায় বারবার। বইটা শেষ হয় এক প্রৌঢ়ের স্থবির যৌনজীবনকে সচল করার চেষ্টার মাধ্যমে। স্থানবিশেষে লেখক শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে অবলীলায় লিখে গেলেও আরোপিত বা অতিরিক্ত মনে হয়নি কিছুই৷
আপাত সাধারণ এই গল্পগুলো পড়তে পড়তেই হঠাৎ আমরা কিভাবে যেন সংযোগ স্থাপন করে ফেলি চরিত্রগুলোর সাথে, ঘটনাক্রমের সাথে, দৈবের সাথে। আর গল্প শেষে মনে হয়, শেষ হয়েও হইলো না শেষ।
লেখকের ষষ্ঠতম গল্পগ্রন্থ দিয়েই আমার ডেব্যু হইল। উনার দ্বিতীয় বই "খোয়াজ খিজিরের সিন্দুক" প্রথম আলো বর্ষসেরা পুরস্কার প্রাপ্ত। পরবর্তীতে অইটা পড়ার ইচ্ছে আছে।
ঘুমতৃষ্ণা পাঁচটি ভিন্ন ধরানার গল্ল নিয়ে সংকলন। গল্প পাঁচটার মধ্যে মিল হচ্ছে বেশিরভাগেরই কাহিনী ঘটছে পাবনাতে। পাবনার আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার হইছে। যদিও বুঝতে অসুবিধা হয় নাই। বরঞ্চ গল্পে একটা ভাইভ দিছে।
প্রথম গল্প অর্থাৎ নামগল্প ঘুমতৃষ্ণা এক জোড়া যুবক যুবতী নিয়ে কাহিনী যারা ঘুমাতে পারে না। তাদের ঘুমের প্রতি যে আকুল তৃষ্ণা সেটা নিয়েই গল্প। গল্পটা পড়তে বেশ লাগতেছিল কিন্তু কেন জানি মনে হচ্ছিল শেষ হচ্ছে না কেন। আরেকটু আগেই শেষ হইলেই গল্পটা পার্ফেক্ট হইত।
দ্বিতীয় গল্প টা বেশ লাগছে। গল্পের নাম মাছরাঙা। মিথলজির সাথে মিশ্রণ টা বেশ জমছে। শেষে জাদুবাস্তবতা দেখানো হইছে। এটা আমার মতে এই বইয়ের শ্রেষ্ঠতম গল্প।
তৃতীয় গল্পের নাম লয়ে যাও আমায়। এই গল্পে বিবর্তনের ভাষায় আমাদের জ্ঞাতি ভাইদের সাথে সংযোগ যাপনের একটা চেষ্টা দেখানো হইছে। এই গল্পে বাগান করা কিংবা গাছ নিয়ে বিস্তর আলাপ আছে। অনেক নতুন গাছের নাম জানলাম গল্পের মারফতে।
চতুর্থ গল্প বেইজক্যাম্পের দিনগুলি গল্পটা স্মার্টফোন কেনা কেন্দ্র করে এক নায়িকার স্টান্ট ডাবল মেয়ের প্রেমে পড়ার কাহিনী নিয়ে লিখা। স্মার্টফোন কিভাবে আমাদের জীবনে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়ায়ে গেছে সেটার বিরূপ সাইড ও এই গল্পটা দেখাইছে। তবে এই গল্পটা মনে হইল কেন জানি হঠাৎ করে শেষ হয়ে গেছে।
পঞ্চম গল্প সবচেয়ে বড় গল্প খুব সম্ভবত। পড়তে গিয়ে আমার বড়ই মনে হচ্ছিল। প্রকৃতি বৃদ্ধবয়সের পর আমাদের যৌনক্ষমতা যে কেড়ে নেয় তা নিয়ে এক বৃদ্ধ বৃদ্ধার যে হতাশা তা খুব সুন্দর করে পোট্রে করা হইছে।
ফয়জুল ইসলাম সাহেবের গল্পের লেখনী বেশ। পড়ে বেশ আরাম। ইদানীং যাই পড়তেছি সব ই কেন জানি ভাল লাগতেছে। এই বইটাও অনেক ভাল লাগছে।
বইটা ছোটগল্পের। সবগুলো গ��্প পড়া শেষে একটা জিনিস খুঁজে পেলাম, তা হলো "সম্পর্ক"। যেমন 'ঘুমতৃষ্ণা' গল্পটিতে দুইজন মানুষের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। যারা একটি সীমানায় মিলিত হওয়ার জন্য তৎপর। পরের গল্প 'মাছরাঙা', এইখানে যুদ্ধে যুদ্ধে জোড় হারানো এক নারী মাছরাঙা হয়ে যাওয়ার অভিপ্রায়ে দিন যাপন করেন। 'লয়ে যাও আমায়' গল্পটিতে 'রিজাস মাকাক' একজন নিঃসঙ্গ পুরুষের একটি বানরের সাথে সখ্যতা তুলে ধরার গল্প বলেছেন লেখক। এই গল্পটা খুব ভালো লেগেছে। লেখকের পরিমিতিবোধ, এবং বাকি সবকিছু একেবারে যথাযথ। 'বেইজক্যাম্পের দিনগুলি' এবং 'যৌবনের জন্য শোকগাথা' নামে আরো দুইটি গল্প আছে, এর প্রথমটিতে একজন ব্যাচেলর এবং মেসে বাসকারী একজন ব্যাক্তির জীবনে হঠাৎ করে আসা রমণীর কথা বলা হয়েছে অন্যদিকে 'যৌবনের জন্য শোকগাথা' গল্পটিতে যৌবন পার করে বৃদ্ধ হতে যাওয়া একজন পুরুষের যৌন আকাঙ্খা ফুটে উঠেছে। গল্পগুলো পড়ে মজা পাওয়া যায়, কোথাও কোনকিছুর ভারে ন্যুব্জ হয়ে যাওয়া নেই। নদীর মতো প্রবাহমান অথচ শান্ত সহজ প্রতিটি লেখা। পড়তে পড়তে একটা জিনিস মাথায় চলে আসে। তা হলো, গল্পের চরিত্রগুলো খুব সাধারণ, কোন চাকচিক্য নেই তাদের মাঝে। অনেকগুলো চরিত্রের মাঝে ভর করে আছে একরাশ সরলতা এবং চরিত্রগুলো যেন আমাদের চেনাশোনা জগতেরই। এভাবেই তারা দখল করে নেই পাঠকের মনোজগৎ। শব্দগুলো জীবন্ত হয়ে ধরা দেয় আমাদের চোখের সামনেই। আর এভাবেই একটা ভালো লাগা কাজ করে আমাদের মাঝে। কারণ আমরা গল্প বলতে এবং পড়তে ভালোবাসি।
একবার টানা সতেরো দিন না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিয়েছিলাম আমি। কি করিনি শুধু ঘুমকে বশে আনার জন্য! মেডিকেশন, মেডিটেশন—এমনকি ইউটিউবের বিভিন্ন টোটকাও বাদ গেলো না। সারাদিনের ইঁদুরদৌড় শেষে যখন দু'চোখের পাতা একটু এক করতাম—ঘুমটা ঠিক আর আসতো না। এমন অসংখ্য দিন-মাস-বছর কাটিয়ে দিয়েছি না ঘুমিয়ে। সকাল হলেই ফ্লাইট ক্লাবের ইনসমনিয়ায় ভোগা ন্যারেটর এর মত দু'চোখ জ্বলা নিয়ে ঝিমিয়ে-গড়িয়ে পার করতাম দিন।
এমনই এক ঘুমহীন দু'জন মানুষের গল্প কি সুন্দর এফোর্টলেসলি বলে গেলেন লেখক ফয়জুল ইসলাম। দু'জন অচেনা মানুষ। যে মিউচুয়াল ব্যাপারটাতে তাদের মিল—সেটা হলো, দুজনেই ঘুম তৃষ্ণার্ত। একটু ঘুমানোর জন্য যত আয়োজন। 'ঘুমতৃষ্ণা' শিরোনামের প্রথম গল্পটা জানালো কি করে যৌনতার থেকেও প্রলোভন জাগানিয়া বিষয় হয়ে উঠলো ঘুম। ব্যস্ততা, ক্লান্তিকে পাশ ফিরিয়ে রেখে ঘুমের মুশকিল আসান এর যে গল্প তিনি বলতে চেয়েছেন তার ভেতরে আদতে ছিল—ঘুমকে স্বস্থির, ভরসার আর বিশ্বাসের একটা পারস্পরিক জায়গা হিসেবে উপস্থাপন করার কৌশল।
গ্রিক মিথোলজির সমন্বয়ে সঙ্গী হারানোর যে গল্পটা—সে গল্পটার নাম 'মাছরাঙা'। গল্পকথকের বাল্যবন্ধু নাহরিন রেদোয়ানি'র মাছরাঙা হওয়ার ইচ্ছেটা পূরণ হলো কিনা সেটাই আদতে দেখার বিষয়।
'রিজাস মাকাক' প্রজাতির বানরের সাথে হাসিনুর নামের এক বৃক্ষপ্রেমীর বন্ধুত্বের পেছনের গল্প 'লয়ে যাও আমায়'; প্রাইমেট অর্ডারের এ দুই প্রানীর গল্পটা দারুণ! বানর হোক কিংবা মানুষ—সবাইকেই ঠিকঠাক বুঝে উঠতে উঠতে সময় চলে আসে প্রস্থানের। এ গল্পে একটা ইন্টারেস্টিং ফ্যাক্ট হচ্ছে, লেখক তার প্রাক্তন স্ত্রী কে একজন 'সাদা খরগোশ' বলে সম্বোধন করলেন; কেন খরগোশই, কেন অন্য প্রানী নয়—এ নিয়ে কৌতুহল হলে খোঁজ নিয়ে দেখি খরগোশ প্রানীটির বেঁচে থাকার কৌশল হচ্ছে পালিয়ে যাওয়া।
'বেইজক্যাম্পের দিনগুলি' এবং 'যৌবনের জন্য শোকগাথা' গল্প দুটোয় একদম নগ্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যৌনতাকে। বিশেষ করে 'যৌবনের জন্য শোকগাথা' গল্পটাতে যৌনতার মাত্রা ছিল অতিমাত্রায় তীব্র। যা সকল বয়সের জন্য নয়। কেননা ষাট ছুঁই ছুঁই ক'জন পুরুষের আড্ডার একমাত্র বিষয়বস্তু হচ্ছে যৌনতা। এ বয়সেও শরীরকে তারা উর্বর করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা তারা চালিয়ে যাচ্ছে। শরীরের মাপ নেওয়া থেকে শুরু করে গল্পের প্রধান চরিত্র পৌঢ় জলিল একরকম জাল ফেলে তার যৌন কামনা মেটানোর খায়েশ করে চলছে কখনো প্রাক্তন, কখনো বিধবা এমনকি দুঃসম্পর্কের কমবয়সী কোন আত্মীয় এর সঙ্গে। ছেলে-মেয়ে কিংবা অনুর্বর স্ত্রী চুলোয় যাক, তাতে তার কি-ই বা আসে যায়! বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসে দাঁড়ালে আড়ালে-আবডালে এমন ঘটনা অহরহ।
লেখনীর কথায় আসি। পরিণত লেখা, প্রথম লাইনে পাঠককে আকৃষ্ট করবার মত একটা ব্যাপার আছে লেখনীর মধ্যে। এর পরে একটানা পড়া যায়। তাছাড়া এ বইটাতে বিরামচিহ্নের যে নিখুঁত ব্যবহার ছিল—এ ব্যাপারটা খুবই সন্তোষেজনক। সচরাচর এমন তো দেখি না! কয়েকদিন আগেই একটা রিলে আমি এ বইটাকে আন্ডাররেটেড হিসেবে যুক্ত করেছিলাম কেবলমাত্র এ বইয়ের মাত্র একটা গল্প পড়েই। তাতেই বোধ হয়েছিল লেখা বেশ প্রমিজিং! এবং বাকি গল্পগুলো প'ড়ে আমি আশাহত হইনি মোটেও তাই আমার সাজেশনে এ বইটি থাকবে কম মূল্যায়নের বইয়ের তালিকাতেই!
চোখ জ্বালা করে অদ্ভুত এক ঘুমে আমি জেগে থাকি... অনুপম রায়ের কাতর কন্ঠে গাওয়া ‘ঘরবাড়ি' গানের দুলাইনের এই কলিতে শতশত মানুষের তীব্র হাহাকার শ্রুতিমধুর হয়ে ভেসে উঠে নির্ঘুম চোখের সামনে। সেসব মানুষের ভীড়ে নিজেকেও বাদ দিতে পারছি না। শ্রদ্ধেয় প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ স্যার ব্যক্ত করছেন এভাবে– ক্লান্ত চোখ ও ক্লান্ত চোখের পাতা তাহার চেয়েও ক্লান্ত আমার পা। মাঝ উঠোনে সাধের আসন পাতা একটু বসি? জবাব আসে, ‘না।’ অস্ফুট ক্লান্তি নিয়ে হেঁটে চলেছি জানা কিংবা অজানা গন্তব্যের দিকে। চোখের পাতা এক করে জিরিয়ে কিছুটা শান্তির অবকাশ পাচ্ছিনা যেন। নিত্যদিনের কলহ–হট্টগোল ছাপিয়ে একটু বিছানায় গা এলিয়ে ক্লান্তি দূর করার বৃথা চেষ্টা চলমান রাখতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। চোখ দুটো বুজে ঘুমতৃষ্ণা কিছুতেই মেটানো যাচ্ছে না। আদিম সেই তৃষ্ণা নিবারণের অভিনব এক গল্প লিখলেন জনাব ফয়জুল ইসলাম ‘ঘুমতৃষ্ণা’ শিরোনামের ছোট্ট গল্পটিতে। যেখানে দৈনন্দিন জীবনের বেড়াজালে আবদ্ধ ঘনিষ্ঠ যুগল চরিত্রের কাছে যৌনতা থেকে মুখ্য হয়ে উঠে ঘুম!
‘মাছরাঙা’ শিরোনামের গল্পে একজন নারীর যুদ্ধে হারানো স্বামীর জন্য তীব্র প্রণয়ের বহিঃপ্রকাশ দেখি গ্রীক মিথলজি আর জাদু বাস্তবতার নিরিখে।
আমার কাছে বইয়ের সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং গল্প ‘লয়ে যাও আমায়'– এ মাঝ বয়েসী বৃক্ষপ্রেমী হাসিনুরকে রিজাস মাকাক প্রজাতির একটা বানরকে বোঝার খানিকটা প্রয়াস দেখতে পাই। এই বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে প্রোটাগনিস্টের স্ত্রীকে (যাকে কিনা মুহতারমা খরগোশ বলে সম্বোধন করা হচ্ছে) নিয়ে স্মৃতিকাতর হতে দেখা যায় অকপটে। আগন্তুক বানর আর মুহতারমা খরগোশ স্ত্রীকে হয়তো পুরোপুরিভাবে বোঝার আগেই প্রস্থান হয় তাদের। প্রোটাগনিস্টের তখন মনে হয় বিচ্ছেদই মৌলিক, মিলন নয়। নিঃসঙ্গতা আর একাকীত্বকে প্রাইমেট অর্ডারের দুটো প্রাণী দিয়ে বিচক্ষণতার সাথে পোর্ট্রে করা হয়েছে অসাধারণ এই গল্পটিতে।
‘বেইজক্যাম্পের দিনগুলি’– তে দেখা যায় ব্যাচেলর মোতাহার আর সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করা শিলামণিকে একটা স্মার্টফোনকে কেন্দ্র করে একে অপরের গল্পে জড়িয়ে পড়তে। একটা সুপ্ত আকাঙ্ক্ষার অপূর্ণতা দিয়ে গল্পটির ইতি টানা হলে বলাই যায় এ যেন শেষ হইয়েও হইলো না শেষ!
‘যৌবনের জন্য শোকগাথা’– গল্পে একজন ষাটের ঘরের বয়েসী প্রবীণের স্থবির যৌবনকে উর্বর রাখার তীব্র প্রচেষ্টা অবলীলায় লিখে ফেললেন গল্পকার। যেখানে প্রোটাগনিস্ট প্রৌঢ় জলিলের শারীরিক আকাঙ্ক্ষা পূরণের তাগিদে যৌনতাকে টগবগিয়ে ফুটে উঠতে দেখবো আমরা। আর তাই আন্ডারএইজ পাঠকদের জন্য এখানটাতে সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ।
কথাসাহিত্যিক ফয়জুল ইসলামের বিচক্ষণ আর সাহসীকতার প্রতিরূপ হিসেবে বইটিকে ধরে নিলে একদমই ভুল হবেনা। যেখানে তিনি সাবলীল ভাষায় অকপটে গল্প বলেছেন স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে। পড়া শুরু করলে আপনাআপনি একটা রিডিং ফ্লো চলে আসলে তখন শেষ না করে বইটা রেখে দেয়া ভীষণ মুশকিল!
আমার মতে ফয়জুল ইসলামের শ্রেষ্ঠ গল্পগ্রন্থ 'ঘুমতৃষ্ণা'। সামাজিক ট্যাবু থেকে কিছুটা জাদুবাস্তবতা হয়ে নিঃসঙ্গতার চরম গল্প তিনি আমাদের এই বইয়ে শুনিয়েছেন। গল্পের বুনন বেশ আঁটসাঁট, ভাষার গতি যথেষ্ট মসৃণ।
১. দীর্ঘদিন ধরে একটা নির্ঝঞ্ঝাট ঘুমের অভাবে মানুষ যে আস্তে আস্তে পাগল হতে থাকে তা কী জানেন! জানেন এই ইট-পাথরের শহরের জঙ্গলে এমন অজস্র মানুষ হেঁটে চলেছে এক রাশ ক্লান্তি নিয়ে অথচ সেই ক্লান্তি কাটানের ঘুমের অভাবে দিনের পর দিন ঘুমের তৃষ্ণা তাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। ঠিক তেমনই দুটো মানুষ সায়কা আর মাহবুব। জীবনের ভারে ক্লান্ত এই দুই মানবমানবী তাদের ঘুমের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য শতাব্দীর প্রাচীন যে সমাধানটি বের করেছিলো সেই সমাধান বাস্তবতায় প্রয়োগে তাদের প্রতিনিয়ত লড়ে যেতে হয় জাগতিক দায়িত্বগুলোর সাথে।
বিপত্নীক মাহবুব আর প্রেমে ধোঁকা খাওয়া সায়কার যান্ত্রিক জীবনের ভারে ঘুম উড়ে যাওয়া থেকে একটুখানি ঘুমানোর জন্য একসাথে সংগ্রাম করে যাওয়া সেই গল্প চমৎকার ভাবে উপস্থাপন করেছেন লেখক। পাঠক হিসেবে আমি যে গতানুগতিক চিন্তাটুকু করেছিলাম সায়কা আর মাহবুবকে নিয়ে, লেখক সেই চিন্তাকে পাশকাটিয়ে ঘুমতৃষ্ণাতেই সীমাবদ্ধ থেকেছেন, ভালো লেগেছে সেই সীমাবদ্ধতায় গল্প পড়ে। লেখকের বর্ণনাও ঠিক গতানুগতিক বলা যায় না, সংলাপ নির্ভর না হয়ে বরং বর্ণনাতেই বেশিরভাগ গল্প এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন অনেকটা নন-ফিকশনের মতো।
২. বাল্যবন্ধু নাহরিন রেদওয়ানির ইচ্ছে ছিলো মাছরাঙা হওয়ার। তার এই মাছরাঙায় রূপান্তরিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষার পেছনে গ্রিসের একটা মর্মস্পর্শী পৌরাণিক কাহিনি জড়িয়ে ছিল। মধ্য-গ্রিসের ত্রাকিস নামের এক রাজ্যের রাজা সিক্সের মৃত্যু ঘটেছিল ইজিয়ান সাগরে, জাহাজ ডুবিতে। সিক্সের মৃত্যুর তার প্রিয়তম স্ত্রী আলচিওনি-উত্তাল ইজিয়ান সাগরের বুকে শোকে সেচ্ছায় ঝাঁপ দিয়েছিল। আলচিওনির দুর্ভাগ্য তখন ভয়ানক অপরাধবোধের জন্ম দিয়েছিল দেবতাদের মনে। সাগরে ডুবে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে দেবতারা আলচিওনিকে নীল পিঠ আর সাদা বুকের সুন্দর একটা মাছরাঙায় রূপান্তরিত করেছিল। শুধু তাই-ই নয় মৃতদের ভূমি থেকে তারা পুনরুত্থিত করেছিল মৃত সিক্সকে। সেই থেকে ইজিয়ান সাগরের ত্রাকিস এলাকার সাগরবেলায় নীল মাছরাঙাদের জোড়া বেঁধে ঘুরতে দেখা যায়।
আমাদের নাহরিন রেদওয়ানেরও এক রাজা সিক্স ছিলো, যে শহীদ হয়েছিলো ৭১এর যুদ্ধে। যে যুদ্ধ কেড়ে নিয়েছিলো আরো সহস্র আপনজনকে। সেই প্রভাবে স্বামী হারানোর শোক নাহরিন রেদওয়ানকে বিচ্ছেদের যন্ত্রণা তাকে বাস্তব জগৎ থেকে সরিয়ে কল্পনার জগতে নিয়ে যায়। যেখানে সে মাছরাঙা হয়ে খুঁজে ফিরতে চায় তার রাজা সিক্সকে। গল্পটা সৃতিচারণ বলা যেতো পারে, এক বন্ধুর চোখে অন্য বন্ধুর শোকের সহচারী হয়ে দুঃখবোধের গল্প তুলো এনেছেন লেখক। এক নারীর সঙ্গী হারানোর আর্তনাদের সাথে গ্রীসের মিথের সমান্তরাল গল্পকে টেনে নিয়ে গিয়েছেন শেষ প্রান্তে। চমৎকার একটা গল্প বলতে হয়, অন্তত প্রথমটার চেয়েও কেন যেন এই গল্পটাই এগিয়ে থাকবে আমার কাছে।
৩. ঢাকার শংকর এলাকার বাসিন্দা হাসিনুর একজন বৃক্ষপ্রেমী মানুষ। তার বাড়ির উঠোন আর বারান্দা জুড়ে হরেক রকমের গাছ। ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচিত হওয়া গাছ-বন্ধুদের সঙ্গে তিনি নিয়মিত চারা বিনিময় করেন। নিজের হাতে পরম যত্নে গাছ বড় করা আর সেগুলোর বংশবৃদ্ধি দেখাই তার অবসরের আনন্দ। এক শুক্রবার সকালে মানুষের তাড়া খেয়ে একটা বানর এসে হাসিনুরের বাড়ির বারান্দার পুরোনো মাইক্রোওয়েভ বক্সের আড়ালে এসে আশ্রয় নেয়।
প্রথমে বানরটি হাসিনুরকে শত্রু ভেবে চিৎকার করে ওঠেও আস্তে আস্তে দুই জনের মাঝে সখ্যতা গড়ে উঠে। গল্পটা অন্যদুটোর চেয়ে তুলনামূলক ভাবে বড়ো, গল্পটা যতটা না সংলাপ নির্ভর তারচেয়েও বর্ণনাতেই গল্প শেষ হয়েছে। গল্পের পরতে পরতে উঠে এসেছে মানুষের জৈবিক চিন্তা, প্রকৃতির সাথে বন্ধন আর একটা বাঁদর আর হাসিনুরের নির্ভেজাল সংযোগ। গল্পটা শেষ করে অবশ্য একটা গভীর বিষাদ ও সত্য অনুধাবন করা যায়, মানুষ আর প্রকৃতির মধ্যকার আদিম যোগাযোগের যে ভাষা আজ আমরা তা হারিয়ে ফেলেছি। গাছপালা আর বন্যপ্রাণীদের প্রতি এই নিষ্ঠুরতা আসলে আমাদের নিজেদের পরিবেশকেই ধ্বংস করছে প্রতিনিয়ত।
৪. ঢাকার এক মেসবাড়ির সাধারণ হিসাবরক্ষক মোতাহার। রুমমেটদের দামী স্মার্টফোনের নেশা দেখে তার মনেও একটি ফোন কেনার তীব্র ইচ্ছা জাগে। স্বল্প আয়ের মোতাহার বন্ধুদের বুদ্ধিতে 'বিক্রয় ডট কম'-এ পুরনো ফোন খুঁজতে থাকেন।সেখান থেকেই পরিচয় ফোনের বিক্রেতা ফেরদৌসি (ওরফে শিলামণি) সাথে যাকে দেখতে ঠিক সিনেমার নায়িকার মতো সুন্দরী মনে হয় মোতাহারের। গল্পটা একটা প্রযুক্তিহীন জীবন থেকে প্রযুক্তিতে আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ার গল্প, সেখান থেকে সৃষ্টি হওয়া একটা সম্ভাব্য প্রণয়ের গল্প। কেন সম্ভাব্য বলছি পড়লেই বুঝতে পারবেন। গল্পের লেখনশৈলী আগের মতোই নন-ফিকশন বিস্তারিত ধরনের। তাছাড়া শেষ করার পর শেষ হয়েও হইলো না শেষ ধরনের মনে হয়েছে। মোটামুটি ভালোই লেগেছে।
৫. আটান্ন বছর বয়সে এসে আবদুল জলিলের মনে এক বিচিত্র হাহাকার জেগে ওঠে। বার্ধক্যে যৌবনের উন্মাদনায় সে তার চারপাশের পরিচিত নারীদের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাতে শুরু করে। এই তালিকায় প্রথমেই ছিল নূরি। নূরি তার বন্ধু শরিফের ছোট বোন, যে একসময় জলিলকে ভালোবেসে চিঠি লিখেছিল। এরই মাঝে নিউমার্কেটে একদিন তার দেখা হয় রুহি নামের এক তরুণীর সাথে। জলিল তাকে আকর্ষণ করার জন্য মিথ্যা বলে যে সে-ও কাপড় কিনতে এসেছে। তাকে জোর করে ডিওডোরেন্ট কিনে দেয়, কোকাকোলা খাওয়ায় এবং চিমটি কাটার মতো চপলতা করে সখ্য গড়তে চায়। গল্পের আরেকটি বাঁক আসে বিধবা মোমেনাকে নিয়ে। এক অন্ধকার রা���ে লোডশেডিংয়ের সময় মোমেনার পাশে বসে জলিলের মনে পড়ে যায় তার কিশোর বয়সের কথা। মোমেনার বড় বোন মিতুলের সাথে তার একসময়কার ঘনিষ্ঠতার কথা।
পুরো গল্পটি আসলে আবদুল জলিলের এক মানসিক সংকটের গল্প। একদিকে বার্ধক্যের শারীরিক সীমাবদ্ধতা, আর অন্যদিকে হারানো যৌবনকে ফিরে পাওয়ার এক তীব্র তৃষ্ণা। সেই তৃষ্ণায় ঘুরেফিরে এই দরজা থেকে ও দরজায়। শেষ পর্যন্ত না-পাওয়ার হাহাকার আর অতৃপ্তি নিয়েই জলিলের জীবনের 'যৌবনের শোকগাথা' হিসেবেই এই গল্প। গল্পটা পুরুষতান্ত্রিক, এখানে হয়তো নারীদের একটা বিষয়বস্তু হিসেবেই উপস্থাপন করেছেন লেখক, কিন্তু পাঠক পড়ার পর বুঝতে পারবেন গল্পটা বাস্তবিক, যে গল্পে রুহি যেমন আছে, আছে মোমেনাও তারা দুই মেরুর নারীর দুটো দিকের প্রতিনিধিত্ব করে। এই বইয়ের সবচেয়ে বড়ো গল্প, কিছুটা অ্যাডাল্ড হলেও দিন শেষে মূল কথাটা ধরতে পারলে ভালো লাগবে। যৌবন যে ক্ষণস্থায়ী সে উপলব্ধিটা হলে গল্পের অনেকে কিছুই খোলাসা হয়ে যাবে।
0. বইটা যখন নিয়েছিলাম তখন জানতামও না এটা গল্পগ্রন্থ, উপন্যাসই ভেবেছিলাম��� মাত্র কয়েকপাতায় গল্পটাতে লেখক ৫টা গল্প বলেছেন, যার প্রতিটিতেই সম্পর্কের কথাই ভিন্ন ভিন্ন রূপে উঠে এসেছে। প্রকৃতি, যান্ত্রিকতা কিংবা জৈবিক চাহিদা সবকিছুকে নিয়েই লেখক গল্প বলেছেন। রতিটা গল্পই নন-ফিকশনের মতো বিশদ আলোচনায় উপস্থাপন করেছেন, সংলাপের চেয়ে বর্ণনাকেই লেখক বেশি গুরুত্ব দিয়ে লিখেছেন। প্রতিটি গল্প চমৎকার হলেও আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে ২ নম্বরটা। মিথ আর বাস্তবতার মিশেলে মানবিক শূন্যতাটুকু লেখক গল্পটাতে চমৎকার ভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন।
কথাপ্রকাশের প্রোডাকশন, প্রচ্ছদ, সম্পাদনা বরাবরই চমৎকার হয়েছে। অল্প পৃষ্ঠার বইখানা আমি বেশ রয়েসয়ে রস আস্বাদন করেই পড়েছি। তাড়াহুড়ো করে শেষ করার মতো বই এটা নয়, এক একটা গল্প পড়ে উপলব্ধি করার মতো বই। বইয়ের কিংবা গল্পের নামকরণ আমার বেশ ভালোই লেগেছে।
২০২৬ রিভিউ বিষয়ঃ বই রিভিউঃ ২১ বই : ঘুমতৃষ্ণা লেখক: ফয়জুল ইসলাম প্রচ্ছদঃ সব্যসাচী হাজরা জঁরাঃ ছোটগল্প
আমি সাধারণত ছোট গল্পের বই বেশ পছন্দ করি। এই বইটা পছন্দের তালিকায় অন্যতম হয়ে থাকবে। আমি অত মন দিয়ে, প্রতি গল্প ধরে ধরেও লিখিনা। কিন্তু এই গল্পের বইটা নিয়ে যদি না লিখি তা অন্যায় হবে।
প্রথমেই আসে, বইয়ের নামকরণে লেখা গল্প– ঘুমতৃষ্ণা। বলুন তো, এক দন্ড শান্তির ঘুমের জন্য আপনি ঠিক কতদূরে যেতে পারবেন?
মাহবুব ছা পোষা চাকুরে। স্ত্রী নাই, ছিল কোন এক সময়। সে অনেক বছর আগের কথা। স্ত্রীর সাথে যত বছরের বিচ্ছেদ, প্রায় তত বছরের নির্ঘুম রাত! ওষুধেও কাজ করে না। সায়কা, কোন না কোন কারণে তার ও খটমটে একটা নাম আছে। সহজ নাম ইনসমনিয়া! ছোট্ট চাকুরীর পাশাপাশি চেষ্টা করে একটু ঘুমানোর। ঘুমতৃষ্ণা রোগে ভোগা এই দুই অচেনা মানুষের পরিচয় হুট করেই।
যারা ঘুমের ওষুধ খেয়েও আমার মত নির্ঘুম জেগে থাকেন, তারা বুঝবেন ঘুমের তৃষ্ণা কী জিনিস। কতটা ব্যাকুল হলে দিন-তারিখ ঠিক করে কিছু মানুষ, সায়কা-মাহবুবের মত মানুষ আকুল হয়ে ঘুমাতে চায়। ওরা ঘুমোতে চায় একসাথে।
কিন্তু সায়কার ঠিক করা দিনে মাহবুবের সময় মেলে না, সায়কার সময় মেলে না যেদিন মাহবুবের সময় থাকে হাতে। একসাথে ঘুমাতে চাওয়া এই দুই নরনারীর চাহিদা পূরণ হবে? ঘুমতৃষ্ণা মিটবে?
অমলকান্তি যেমন রোদ্দুর হতে চেয়েছিল, নাহরিন ঠিক তেমন হতে চেয়েছিল মাছরাঙা! তাই গল্পের নাম ও মাছরাঙা। মিথে আছে, একবার এক নারী তার নিজের সঙ্গীকে হারিয়ে ফেলে। ইজিয়ান সাগরে সলীল সমাধি হয় সম্রাট সিক্সের। স্বপ্নে এসে স্ত্রী আলচিওনি জানানো হয় স্বামীর মৃত্যুর খবর। প্রার্থনা, কান্না, আর্তনাদ আর দেবতার বরে সে আর তার জোড়, মৃতদের ভূমি থেকে ফিরে এসে, হয়েছিল মাছরাঙা! নাহরিনের স্বামীর মৃত্যু হয়েছে ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে! সেই সময়, তার আগে পরে বন্ধুদের সবারই কোন না কোন প্রিয়জন হারিয়েছে! সবাই মৃতদের শহর থেকে ফিরিয়ে আনতে চায় প্রিয়জনকে। কিন্তু সে নিয়ম যে নেই!! তবুও জীবন চলে, কেটে যায় দিন। কিন্তু নাহরিন তো আলচিওনির মত অপূর্ব সুন্দর মাছরাঙা হতে চায়। বার বার ঘুরে ফিরে, সকাল সাঝে সেই মিথের কথা বলে, যেন সেই মিথেই মোহাবিষ্ট সে। নাহরিন নিজেই যেন পৌরাণিক কোন চরিত্র। নাহরিন কি মিথ থেকে বের হতে পারবে? সে আদতে কী চায়?
আমরা মনের ভাব কথা বলেই প্রকাশ করি? মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম ভাষা! যা দিয়ে মনের ভাব প্রকাশ হয় তাই তো ভাষা! আমরা মানুষের ভাষা বুঝি৷ কিন্তু অন্য প্রাণীর? গাছ ভালোবাসে হাসিনুর। তাই এর সাথে, তার সাথে নিজের তৈরি চারা বিনিময় করে। ওই রাস্তার মোড় থেকে পড়ে পাওয়া ডাল এনে পুঁতে দেয়! সবুজ বিনিময় সঙ্ঘের সদস্যদের সাথে সাক্ষাত করে গাছ বিনিময় করে। বাকী ৫ দিন অফিসের শাটল বাসে ঝুলে অফিস করে। এক শুক্রবারে একাকী হাসিনুরের বাসায় আসে বয়স্ক এক বানর! ঠিক কোত্থেকে এল সে?
বেশ ক'দিন হাসিনুরের ঘরে থাকে সে, প্রথমে না বুঝলেও ধীরে ধীরে ভাব বিনিময় করতে শিখে যায় হাসিনুর আর এই বানর। বানর হাতুড়ি মেরে বাদাম খাওয়া শেখে, বানরকে খেলতে দেখে হাসিনুর নূড়ি পাথর এনে দেয়। এর মধ্যে চলে খরগোশ আর দিলশাদের প্রতি হাসিনুরের মনোলগ। এই নতুন আসা বন্ধু বানরের নাম রাখে সে অ্যালবার্ট! ধীরে ধীরে সে প্রাইমেট প্রজাতির না বলা ভাষা বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু পারবে কি? খরগোশ আর দিলশাদ কে সে নিজের ভাব বোঝাতে পেরেছে কি? কার প্রতি আকুল আবেদন হাসিনুরের লয়ে যাও আমায় গল্পে? বন-অরণ্য উজাড় করে করতে করতে আমরা মানবতার ভাষাও যে হারিয়ে ফেলেছি। সেই সবুজে ফিরে যাওয়া, নিয়ে যাওয়ার আবেদন?
বেইজক্যাম্পের দিনগুলি গল্পটার নাম স্মার্টফোনের দিনগুলি হলে ভালো হত। মোতাহার ছাপড়া টিনের ঘরে থাকে রুমমেটদের সাথে। স্কুলের হিসাব রক্ষক হলেও জুতা সেলাই থেকে চন্ডী পাঠ সবই করা লাগে। এক সময় সারাদিনের ক্লান্তি দূর হত মেসমেট দের সাথে তাস পিটিয়ে, নয়তো দারু টেনে। সবার হাতে তখন সেই ক্ল্যাসিক ফোন! ধীরে ধীরে সব বদলে যায়, মোতাহারের নোকিয়া ফোন, বাকী সবার হাতের ওই স্মার্টফোনে অন্য এক দুনিয়া। উনত্রিশ খেলতে এখন ৪ জন সঙ্গী লাগে না, লাগে হাতের ফোন। পচা ভিডিও দেখার জন্য আর সুযোগ খুঁজে বের করতে হয় না, হাতের ওই জাদুর বাক্সে সব আছে। মোতাহারও একদিন “বিক্রয় ডট কম” থেকে, ভালো করে পচা ভিডিও দেখার জন্য হলেও মোবাইল কিনতে চায়! মোবাইল কিনতে গিয়ে পরিচিত হয়, জনপ্রিয় এক নায়িকার ডামি শীলামনির সংগে। প্রথম দেখার পর থেকে সঙ্গ চায় সে শীলামনির। কিন্তু? সম্ভব? বাটনফোন থেকে স্মার্টফোনে আসা, এই প্রযুক্তির খেলা!
যৌবন ফুরিয়ে যায়। যৌবনের জন্য শোকগাঁথা গল্পের জলিল, বাজারে প্লাস্টিকের দোকান আছে। বয়স ষাট ছুই ছুই। অসুস্থ স্ত্রী তার চাহিদা পূরণ করতে পারে না। কিন্তু নারী দেখলেই জলিলের কামনা-বাসনা উতলে ওঠে। মোমেনা-রুহী আরো কত নারীর কাছে ছোকছোক করে। কে তার আহবানে সাড়া দেবে? যৌবনের ওই উত্তেজনা এই প্রায় প্রৌঢ়বয়সে এসে থাকা সম্ভব? এ কী আদৌ সেই চাহিদা না কি অন্য কিছু। নারীর যৌবন ফুরায়, পুরুষের ফুরায় না?
একজন নারী তার ডাকে সাড়া দেয়, অন্যদিকে অসুস্থ স্ত্রী স্বামী সঙ্গ পেতে রোজ কেজি করে আংগুর ঠুসে যাচ্ছে। কিন্তু এ রোগ কী সেরে যাবে?
আটান্ন বছরের এই প্রায় প্রৌঢ়ের শারীরিক চাহিদা, তার অপূর্ণতা-পূর্ণতা, আশেপাশের মানুষের কিছু চিন্তা ভাবনা নিয়েই এই গল্প। শেষ পর্যন্ত কী জয়ী হয়? কে জয়ী হয়? এ সমস্যা কি একা জলিলের? না আরো অন্য কারো? কে কীভাবে, এই বয়সে, হাই প্রেশার-ডায়াবেটিসের সাথে পাল্লা দিয়ে এই অসুখের(!) ওষুধ খুঁজে পাবে?
বইটা কোন উপন্যাস ভেবেছিলাম। কিন্তু হাতে নিয়ে দেখি ছোটগল্প সংকলন। লয়ে যাও আমায় আর মাছরাঙ্গা গল্পটা বেশ পছন্দ হয়েছে। মাছরাঙা গল্পে, মিথ-পুরান-বাস্তবতার যে সুন্দর মিশেল, যে কারো ভালো লাগতে বাধ্য। মৃতদের শহর থেকে সবাই তো চাই প্রিয় মানুষদের ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু তাদের জন্য মাছরাঙা হতে কে চায়? সে হোক জোড়, প্রিয় বোন কিংবা ভাই?
লয়ে যাও আমায় গল্পে, গাছের প্রতি হাসিনুরের ভালোবাসা, বন উজাড় করে দেওয়ার বলে বাসস্থান হারানো অবলা এক প্রাণী আর হাসিনুরের ভাবের আদান-প্রদানের এই ব্যাপারটা অনেক বেশি সুন্দর। নগরায়ন! কত পাখি-বানর-হনুমান হারাচ্ছে বাসস্থান আর আমরা হারাচ্ছি অক্সিজেনের সাপ্লাই। আর ভুলতে বসেছি ঠিক কেমন করে ওদের সাথে ভাবের আদান-প্রদান করতে হয়।
ঘুমতৃষ্ণা! গত রাতে,ঘুমের ওষুধ খেয়েও প্রায় ৩-৪টা পর্যন্ত জেগে। যারা ইনসমনিয়ার শিকার তারা জানি ঘুমের তৃষ্ণা কতখানি! প্রচন্ড পিপাসায় পানির তৃষ্ণা যেমন, নির্ঘুম শত শত দিন পার করবার পরে ঘুমের তৃষ্ণা ও তেমন। সায়কা-মাহবুব একসাথে ঘুমাতে চায়। দুই জন নরনারীর একসাথে ঘুমানো বলতে যা বুঝি এও কী তাই?
স্মার্টফোনের গল্পে প্রেম প্রেম ভাব হলেও শেষে কী ছিল জানিনা। লেখক পাঠকের উপরে ছেড়ে দিয়েছে। তবে এনালগ থেকে ডিজিটাল হবার একটা চিত্র দেখবেন এই গল্পে। যেখানে প্রযুক্তির কাছে আমরা বন্দী। কথা বলতে পাশের বন্ধু নয়, মুঠোফোনের ওপারে থাকা বন্ধুই যেন বেশি নির্ভরযোগ্য।
যৌবনের শোকগাথা গল্প কিছুটা বড়। প্রায় প্রৌঢ়বয়সী দম্পতি কিংবা পুরুষটির চাহিদা এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। নিজেকে হামবড়া ভাবা মানুষকেও হার মেনে নিতে হয় এক সময় গিয়ে। তবে সে স্বীকার করবে কি না! এইটা বড় প্রশ্ন রেখে যায়।
গল্পগুলোর মধ্যে একটা টান ছিল, একটানেই গল্প শেষ করে ফেলা সম্ভব। প্রতিটা গল্প বাস্তব চিত্র। স্লাইস অফ লাইফ বলা যায়। এই প্রতিটি চরিত্র আমাদের সমাজের, আমাদের আশেপাশের। কেউ মাছরাঙা হতে চাই, কেউ এক দন্ড ঘুমোতে চাই,কেউ চাই আমাদের না বলা কথা বুঝুক, ম্যাসেঞ্জারে ওই ম্যাসেজের টিং শব্দে যেন নিজে যা আসলে বলতে চাই, সেটা অপরপ্রান্তের মানুষ বুঝে নিক। প্রযুক্তি যেন আমাদের আর গ্রাস না করে, কেননা এখন আমরা প্রযুক্তির এক বেড়াজালে বন্দী। আর বয়সের সাথে সাথে চলা উচিত। নিজের আশেপাশে, নিজ ক্ষমতা নিয়ে বড়াই না করা ভালো। তাই না?
একটি সংকলনের সকল গল্প সমান হবে না এটাই স্বাভাবিক। এখানে ৫ টি গল্পের মধ্যে লেখক তুলে ধরতে চেয়েছেন মানুষের অন্যতম একটি সহজাত প্রবৃত্তি-যৌনতা, এক যুগল এর একে অপরের সঙ্গে মিলিত হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। সেটা মৃত্যু এর আগে হোক কিংবা পরে। তীব্র আকাঙ্ক্ষিত বস্তু যৌবন আগলে রাখার বৃথা চেষ্টা,হারানোর দুঃখ। খুবই সহজ লেখনীর কারণে পড়তে কখনো অনিচ্ছা জাগে নি।
এমন অনেক দিন আছে আমার জীবনে, চোখভর্তি ঘুমে টলমল করে হাঁটছে আমার দুটো পায়ের পাতা। শরীরটাকে টেনে পাঁচতলা সিঁড়ি ডিঙিয়ে কোনরকমে ঘরে ফিরে বিছানায় এলিয়ে দিয়েছি। কিন্তু শেষপর্যন্ত ঘুম আর ঘুমটা হয়নি। গভীর ক্লান্তিতেও এক ফোঁটা ঘুমাতে পারিনি। সাত বছর আগের কোনো এক মুচির সাথে স্যান্ডেল সেলাই নিয়ে দর কষাকষির সংলাপও জ্বরের ঘোরে খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে মাথায় বাজতে থাকে। এমন সব দিনে ঠিক অমন অসং্খ্য কণ্ঠস্বর ঠেলাঠেলি করে তাদের গুরুত্বপূর্ণ সংলাপগুলো পেশ করতে চায় আমার মস্তিষ্কের পোডিয়ামে। ঘুমের আর জায়গা হয়ে ওঠেনা। ঘুমের তৃষ্ণা বিষয়টি কি তখন আমি বুঝতে পারি। লেখক ফয়জুল ইসলাম ঘুম নিয়ে চমৎকার একটা গল্প রেখেছেন তার ছোটগল্পের বই 'ঘুমতৃষ্ণা'-তে।
দুজন সম্পর্কহীন নারীপুরুষ, হঠাৎ করেই মিলিত হন, এবং আবিষ্কার করেন তাদের জীবনে ঘুমের প্রচন্ড অভাব। তারা দুজনই রাতে ঘুমাতে পারছেন না। দুজন মিলে ঠিক করেন তারা একসাথে ঘুমাবেন! একজন নারী-একজন পুরুষ, সম্পর্কহীন; সমাজে তাদের একসাথে ঘুমোবার বালিশটা কোথায় খুঁজে পাওয়া যাবে? ইন্টারেস্টিং একটা ব্যাপার। তারচাইতে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার লেখক ফয়জুল ইসলাম এমন চমৎকার ভাবে কথাচ্ছলে লেখেন, পড়তে পড়তে একফোঁটা ক্লান্তি আসেনা। ৫টি গল্প সবগুলোই প্রায় শহরতলীর গল্প, সবগুলোই সমান্তরাল শ্রেণীর মানুষদের নিয়ে, তাই সহজেই যোগটা ধরা যায়।
যৌনতার মত তীব্র একটা বিষয়, যা নিয়ে নাড়াচাড়া করলেই অস্বস্তি লাগতে থাকে। সেরকম একটা বিষয় নিয়ে 'বেইজক্যাম্পের দিনগুলি' আর 'যৌবনের জন্য শোকগাঁথা' শিরোনামের দুটো গল্প তিনি লিখেছেন কোনপ্রকার রাখঢাক না রেখেই। প্রথম গল্পটি ঢাকা শহরের মেসে থাকা পুরুষদের ভেতরকার যৌনতার আষ্ফালন আর মোতাহের এর শিলামনি নামের সিনেমায় কাজ করা এক মেয়ের প্রতি অত্যন্ত আকৃষ্ট হয়ে পড়া নিয়ে লেখা। দ্বিতীয় গল্পটা পঞ্চাশোর্ধ এক লোকের যৌবন হারিয়ে ফেলার হতাশা, যৌনতার তৃষ্ণা আর শারীরিক আকাঙ্খা নিয়ে লেখা তীব্র একটি গল্প। দুটো গল্পই অত্যন্ত সহজ ভাষায় লেখা। এতে আড়চোখে চেকআউট করে দেখা নারীদের অসং্খ্যভাবে বর্ণণা আছে। কোনো একটা কারণে সেইসব বর্ণণা রগরগে বা অতিরঞ্জিত মনে হয়নি একদমই। মনে হয়নি জোর করে চাপিয়ে দিচ্ছেন লেখক। খুব স্বাভাবিকভাবেই লেখক তার সাহিত্যে যৌনতাকে স্থান দিয়েছেন। কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক কোথায় যেন বলেছিলেন- যৌনতা মানুষের অস্তিত্বের প্রমাণ, তার তৃষ্ণা ও তৃপ্তি দুইই জীবনকে চালায়।
সব গল্পই তাই বলে যৌনতা নিয়ে নয়। মাছরাঙা গল্পটা ৭০ এর দশকের সাথী হারা এক নারীর গল্প। জিনি গ্রিক মিথোতলজির গল্পের মত সংকল্প করেন মাছরাঙায় রূপান্তরিত হতে। তার সাথীকে ফিরে পেতে। এই বইয়ের সবচাইতে মন খারাপ করা এবং চমৎকার গল্প এটাই। আর বাকি যে গল্পটা সেটা একাকিত্ব নিয়ে। একটি রিজাস ম্যাকাক বানর হঠাৎ হাসিনুর নামের এক বৃক্ষপ্রেমি একাকি লোকের জীবনে এসে পড়ে। সেখান থেকে দুই প্রাইমেট গোত্রীয় প্রাণের সখ্যতার একটা চমৎকার গল্প উপহার দিয়েছেন লেখক।
ফয়জুল ইসলাম এর 'খোয়াজ খিজিরের সিন্দুক' বইটির নাম হয়তো অনেকেই শুনেছেন। শোনেননি হয়তো এবছরের শুরুর দিকেই তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। আমিও ভুলে গিয়েছিলাম। বাকি বইগুলো নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে আবার আবিষ্কার করলাম। মন খারাপ হয়ে গেল।
ঘুমতৃষ্ণা’ পাঠককে নিয়ে যায় মানবসম্পর্ক, ঘুম ও তৃষ্ণার সূক্ষ্ম অনুভূতি, প্রেম ও যৌনতার বহুমাত্রিকতা, এবং একাকীত্বের নিভৃত জগতে। প্রতিটি গল্পে রয়েছে কাব্যিক আবহ ও মর্মস্পর্শী সুর, যা পড়তে পড়তে মনে গভীর প্রতিধ্বনি তোলে। সরল অথচ পরিশীলিত ভাষায় রচিত এই সংকলন পাঠকের আবেগ ও চিন্তাকে এমনভাবে ছুঁয়ে যায় যে বইটি শেষ হওয়ার পরও তার রেশ দীর্ঘদিন থেকে যায়। বইটি আমার পক্ষ থেকে রেকোমেন্ডেড।
ফয়জুল ইসলাম সম্পর্কে আমার জানাশোনা ছিল না। হারুন ভাইয়ের কল্যাণে এই বইটা দিয়ে শুরু হলো। অন্য সব গল্প বাদ দিয়ে বরং নামগল্পটা নিয়ে একটু কথা বলা যাক।
প্রথম লাইনেই গল্পকার আমাদের গল্পের সাথে জড়িয়ে ফেলেন। তিনি জানান দুইটা চরিত্র একসাথে ঘুমাতে চায়। আমাদের সমাজব্যবস্থায় দুই নারী-পুরুষের একসাথে ঘুমানোকে আমরা ঘুমানো ভাবি না। কিন্তু, এই গল্পের চরিত্রদের ঘুম—আক্ষরিক অর্থেই ঘুম। ঘুমানোর পথে তারা কীভাবে নানা বাধার মুখোমুখি হয়, কীভাবে সামলে উঠে শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য স্পর্শ করতে সক্ষম হয় তা এখানে আমরা দেখতে পারি।
ফয়জুল ইসলাম তার বড় বড় অনুচ্ছেদে লিখে যাওয়া গল্পতে স্পষ্টতা রেখেছেন, তাই পড়তে গেলে ধন্দে পড়েছি মনে হয় না।
Mid age crisis নিয়ে অন্য কোন বাঙালি লেখক কি লিখেছেন? লিখলেও sexual life এর টানাপোড়েন নিয়ে কি কেউ লিখেছেন? তবে কোন কোন সময় মনে হয়েছে লেখক অন্য কারো থেকে ধার করেছেন। গল্প বলার সাবলীলতা উপভোগ করেছি। আর বিসয় গুলো দারুন - মনে হচ্ছিলো আমার বা আমার পাশের কারও গল্প।