একঘরে এক নারী- যে কথা বলতে পারে, কিন্তু বলে কম। আর এক মগ্ন পুরুষ- যে বলতে চায়, কিন্তু পারে কম। সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ের একদল হোমো সেপিয়েন্স, শেষপর্যায়ের কিছু হোমো নিয়ান্দারথাল, আর সচল সবল প্রকৃতি। সব মিলিয়ে কেমন ছিল প্রাগৈতিহাসিক সেই সমাজ? কেমন ছিল তাদের জীবন জগৎ আর শিকার অস্বীকার? কেমন করেই বা তারা প্রস্তুত হচ্ছিল ভবিষ্যৎ-আমাদের এগিয়ে চলার শক্তি হতে? এসবেরই গল্প শোনায় স্বরূপকথা নামের এই উপন্যাস।
"স্বরূপকথা" নিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া মিশ্র। প্রথমেই আদিম গুহাবাসী মানুষদের নিয়ে এতো বড় পরিসরে উপন্যাস লেখার দুঃসাহস দেখানোর জন্য লেখককে ধন্যবাদ। বইয়ের প্লট অসাধারণ। লেখকের গদ্যশৈলীও যথেষ্ট আকর্ষণীয়। কিন্তু খুবই ছোট ছোট কিছু বিষয়ে খামতির জন্য আমি বইটা পুরোপুরি উপভোগ করতে পারি নি। প্রাচীন শিকারভিত্তিক সমাজ সম্পর্কে আমরা যা জানি তার সাথে বইকে মেলাতে গেলে অনেক কিছুতেই খটকা লাগবে।যেমন -এ সমাজে বিয়ের প্রচলন ছিলো না কিন্তু লেখক সঙ্গী নির্বাচনের বিষয়টিকে বারবার "বিয়ে" বলে উল্লেখ করেছেন। সঙ্গিনীকে উল্লেখ করেছেন "বউ" বলে। নারী নির্যাতনের ধারণাটি আধুনিক মানুষের। তাই একজন গুহাবাসী যখন "বউকে তো পেটানো যায় না" জাতীয় আধুনিক চিন্তাভাবনা করে তখন সেটা মেনে নেওয়া যায় না। এ সময়টা ছিলো যোগ্যতমের টিকে থাকার আর হিংস্রতার।অথচ গল্পের চরিত্ররা অস্বাভাবিক রকম কোমল।মানুষগুলোকে ঠিক আদিম মানুষ বলে মনে হয় না। এ বিষয়গুলো বাদ দিলে বলা যায়, মানুষের ধীরে ধীরে মানুষ হয়ে ওঠার এ গল্পটি প্রাণবন্ত ও চিত্তাকর্ষক। আফার বদান্যতা, হু-র দৃঢ়তা, মানের অনুসন্ধিৎসা আমার বহুদিন মনে থাকবে।আর শেষটা তো দুর্দান্ত! সবমিলিয়ে এই হচ্ছে "স্বরূপকথা" পাঠের অভিজ্ঞতা।
যার গৃহ নাই, সে গৃহ খোঁজে। ক্ষুধার্ত প্রাণ খোঁজে খাদ্য। পাথরে পাথর ঘষলে আগুন জ্বলে, আবার অতলান্ত জলে স্পষ্ট দেখা যায় জেলেদের অস্তিত্ব। বিচ্ছিন্ন অনেক জীবন, জীবনের অনেক সাধ, সংগ্রাম, প্রেম, যুদ্ধ কিংবা সার্ভাইভেল ফর দ্যা ফিটেস্ট থিয়োরি দমকা হওয়ার মতো ফিরে ফিরে এসেছে 'স্বরূপকথা' উপন্যাসে, আল্পনা আঁকার মতো করে জীবনের চেয়েও বড় ক্যানভাসে আশান উজ জামান এঁকেছেন জীবনের অমোঘ গল্প।
উপন্যাস নিয়ে বিস্তারিত বলার আগে পাঠক হিসেবে নিজেকে নিয়ে একটু কথা বলা খুব জরুরী, পাঠক আমি মারাত্মক ইম্পালসিভ, পাঠে আনন্দ না পেলে, গদ্যের ভাষা আমাকে না টানলে, গল্প / আঙ্গিক / আইডিয়া/ ডিটেলিং / মনোলগ/ স্টিম অব কন্সাসনেস আমাকে টাচ না করলে, আমি খুব দ্রুত হারাই কন্সেন্ট্রেশন। বড় উপন্যাসে ক্ষেত্রে হয়তো গল্প ঝুলে যাওয়ার এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে, দেড় লাখ কিংবা তারও অধিক শব্দের উপন্যাসে লেখকের জন্য এই প্রসেসটা, এই জার্নিটা সেইম টেম্পো মেইনটেন করে ধরে রাখা এবং পারফেক্টলি শেষ করা রীতিমত চ্যালেঞ্জিং একটা ব্যাপার। স্বরূপকথা সম্ভবত ১ লাখ ৫২ হাজার শব্দের উপন্যাস। আমি উপন্যাসটা পড়া শেষ করেছি আড়াই দিনে। উপন্যাসের ন্যারেটিভ, গল্প আমাকে টেনে নিয়ে গেছে চুম্বকের মতো। পেইজ টার্নার উপন্যাস বলতে আমরা যা বুঝি, 'স্বরূপকথা' ঠিক তাই।
'স্বরূপকথা' একটি পিওর ফিকশন। গল্পধর্মী উপন্যাস। এই গল্পের মধ্যে এতো প্রাণ ছিল, পড়তে শুরু করার পর, আই গট হুকড। খুব কম উপন্যাসই আমি শেষ করেছি এতো আগ্রহ নিয়ে। উপন্যাসের ভাষা ঝরঝরে। ছোট ছোট বাক্য। পড়ে যাওয়া যায় ক্লান্তিহীন ভাবে, তবে মাঝেমধ্যে থামতে হয়, কারণ প্রকৃতির বর্ণনা লেখক এতো চমৎকারভাবে করেছেন, মনে হয় মিষ্টি কোন বাতাস সঙ্গ দিচ্ছে পুরোটা সময়, মনে হয় না থেমে যদি দৌড়াই তাহলে হয়তো পুরো রস পারবো না নিংড়ে নিতে।
শিকার, গুহাযুগ কিংবা ঐ প্রেক্ষাপট নিয়ে লেখা উপন্যাসে সাস্পেন্স থাকা খুবই জরুরী। 'স্বরূপকথা' উপন্যাসেও পাঠক পাবে থ্রিলারের স্বাদ। উপন্যাসের শেষ পাতা পর্যন্ত এক অতিস্তব্ধ অন্তহীন রহস্য পাঠকমনকে ব্যস্ত রাখবে এবং গল্পের পরিণতি আবিষ্কারের সাথে সাথে পাঠকও হবে পরিণত।
ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্টে আশান উজ জামান যে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন, সে কথা বোল্ডলি না বললে পাপ হবে। হু, মান, আফা, অব, মোমো, পারা থেকে শুরু করে সকল চরিত্রই নিজের জায়গায় আলাদা আলাদাভাবে উজ্জ্বল। প্রতিটা চরিত্র আশান উজ জামান শূন্য থেকে এনে শূন্যে শেষ করে পূরণ করেছেন চক্র। বিশেষকরে প্রোটাগনিস্ট হিসেবে হু'এর চরিত্র আমার মনে থাকবে অনেক অনেকদিন। এইসব চরিত্র নির্মাণের দিকে যখন তাকাই সচেতনভাবে তখন মনে হয় জল-স্থল-অন্তরীক্ষে কোথাও কোন ফাঁক নেই।
রাইটিং টেকনিকের দিক থেকেও এই উপন্যাস আধুনিক। স্টোরিটেলিংয়ে এসেছে ব্যাক অ্যান্ড ফোর্দ টেকনিক, প্রফেসির মতো এসেছে কিছু চরিত্র। নতুন গোত্র এসেছে নতুন ডায়মেনশন নিয়ে, ফলে গল্পের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন নতুন লেয়ার আর প্রতিটি লেয়ারের রঙ আলাদা। প্যারালালি বলা দুটো গল্পের মধ্যে জাম্প এতো স্মুথ যে পাঠককে অস্বস্তিতে পড়তে হবে না মোটেও বরং মনোযোগ বেড়ে যাবে আরও।
'স্বরূপকথা' উপন্যাসটি লেখা হয়েছে গুহাযুগকে উপজীব্য করে, যদিও এই উপন্যাসের গল্প পলিটিক্যালি এখনও প্রাসঙ্গিক। অন্য অনেক বিষয় বাদ দিলেও অন্তত এই এটারনাল ফিল দেয়ার জন্য উপন্যাসটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। উপন্যাসের চরিত্রগুলোর মধ্যে অপারগতা, হিংস্রতা কিংবা মায়ার যে ছায়া আছে তা জেনারেশন থেকে জেনারেশনে ছড়িয়ে গেছে। সভ্যতার কারণে এসেছে বদল, কিন্তু অনুভূতি এখনও ঠিক তেমনই আছে।
জোসেফ কনরাড, হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড, জোনাথন সুইফট কিংবা ফিলিপ কে ডিক'এর লেখার বিচ্ছিন্নভাবে অন্য কোন সময়ে আমি যে ভ্রমণের স্বাদ পেয়েছি, তা 'স্বরূপকথা'তে এসে পেয়েছে পূর্ণতা। বাংলা ভাষায় আমি এমন উপন্যাস আগে পড়িনি এবং এই উপন্যাসের একটা মজার ব্যাপার হচ্ছে, উপন্যাসটা অন্য যে কোন ভাষাতেও লেখা হলেও, উপন্যাসের আবেদন মোটেও কমতো না, কারণ 'স্বরূপকথা' একটি গ্লোবাল উপন্যাস।
সর্দারের বলা গল্পের মতো বহুবছর পরও মানুষ হয়তো এই উপন্যাস নিয়ে গল্প করবে, শিকার ভাগ করতে করতে হয়ে যাবে গাছ আর পুরো আবহের মধ্যে থাকবে একটা জাদুকরী জার্নি, আমি জানি।
সে অনেক আগের কথা। কত আগের কথা? প্রায় ত্রিশ হাজার বছর আগের! অত আগের কথা কি আমরা ভাবতে পারি? এখন তো দশ বছরেই সবকিছু পুরোনো হয়ে যায়। বদলে যায় ভাষা, বদলে যায় গেজেট, বদলে যায় সঙ্গীত, বদলে যায় জীবন যাপনের যাবতীয় অনুষঙ্গ। মহাকালের আবর্তে আমরা ক্রমশই তলিয়ে যাই। এই মহানিমজ্জনের কালে কেউ যদি শোনায় আমাদের গুহাবাসী আদিপিতাদের কথা, যারা পাথর খুঁদে তৈরি করতো অস্ত্র, কাঁচা মাংস আগুনে ঝলসে খেয়ে মেতে উঠতো জীবনের উল্লাসে, সেই গল্প শোনার ধৈর্য এই প্রজন্মের হবে কি না জানি না, তবে মহাপুস্তকের পাতায় এই গল্পের জন্যে অবশ্যই একটা বিশেষ স্থান থাকা উচিত। সেই গল্পটাই শুনিয়েছেন আশান উজ জামান তার সাম্প্রতিক উপন্যাস “স্বরূপকথা”তে, বাংলা ভাষায় এমন লেখা, তাও আবার এত বড় পরিসরে আছে বলে আমার জানা নেই।
ত্রিশ হাজার বছর আগের পৃথিবীর গল্প বলতে হলে প্রচুর প্রস্তুতি প্রয়োজন। তৈরি করতে হবে পৃথিবীর বুকে এক টুকরো নতুন পৃথিবী। কোথায় গেলে পাওয়া যাবে জলের সন্ধান, কোথায় মিলবে সাগরসোহাগী অন্তরীপ, দেবগাছ আর আলোপাতার মাঝখানে আছে ঘাসফুলের কোন বংশ, নিজের বসতি থেকে কতদূর গেলে বনমানুষদের আক্রমণের শঙ্কায় মনের তন্ত্রী বাজানো শুরু করবে বিপদের সংকেত এমন অসংখ্য বিস্তারিত উপাদান দিয়ে একটা প্রতিবেশ তিনি তৈরি করেছেন নিপুণ হাতে। একজন লেখকের রিসোর্স হতে পারে কয়েকরকম। প্রচুর বই, অভিজ্ঞতা, এবং কল্পনা। স্বরূপকথা’তে কল্পনার সুচারু প্রয়োগ বিস্ময় জাগায়। তার ভাষা এতটাই চিত্রময়, যে চোখের সামনে দৃশ্য ভেসে অঠে। বইয়ে�� শেষে ভেবেছিলাম সহায়ক গ্রন্থের একটা বড় তালিকা থাকবে। সেটা না থাকাতে নিশ্চিত হওয়া যায় তার ধ্যান এবং নিমজ্জন এর ব্যাপারে।
বইটিতে লেখকের মূল প্রচেষ্টা ছিলো আদিম পৃথিবীর দিনকালকে নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করতে। বিশাল কলেবরের এই উপন্যাসটিতে তাই পাতার পর পাতা অনেকসময় থেকে গেছে তেমন কোন ঘটনা ছাড়াই। আপনি যদি লেখার আবহের সাথে ভালোভাবে সম্পৃক্ত হতে পারেন, তাহলে আপনার এই জল-জঙ্গল, সাগর-অন্তরীপে ঘুরে বেড়াতে এবং নতুন কোন শিকারের কৌশল উদ্ভাবন করতে, বিশ্রাম অথবা স্নানের জন্যে নতুন কোন জায়গা খুঁজতে খারাপ লাগবে না। তারপরেও যদি আপনার কাছে গতি ধীর মনে হয়, সময়মত পেয়ে যাবেন নতুন উত্তেজনা।
উপন্যাসটিতে আমরা কাছাকাছি জায়গায় দুটি মানবপ্রজাতিকে দেখতে পাই। হোমো স্যাপিয়েন্স আর নিয়ানডারথাল। হোমো স্যাপিয়েন্স নারী হু এর সাথে নিয়ানডারথাল নর অব এর প্রণয়পর্ব থেকেই মূলত হোমো স্যাপিয়েন্স পাড়ার দৈনন্দিকতা বের হয়ে কাহিনী গতি পাওয়া শুরু করে। হু আর অব এর সন্তান মান এর জন্মের পর থেকে কাহিনী জল-জঙ্গল চরিত বর্ণনের পাশাপাশি তুমুল গতিতে মানব মন আর আচরণকে অবলম্বন করে লতিয়ে ওঠে। অন্যদের চেয়ে আলাদা, জিজ্ঞাসু এবং কৌতূহলী মান এর জন্ম এবং বেড়ে ওঠার মাধ্যমে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিবর্তনের। এদিকে নিয়ানডারথাল পাড়ার ক্রমাগত মৃত্যু আর কমজোর হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে তাদের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার বেদনাদায়ক আখ্যান। তবে বইটিতে কোথাও হোমো স্যাপিয়েন্স অথবা নিয়ানডারথাল বলে আলাদাভাবে কিছু উল্লেখ করা নেই। এক প্রজাতির কাছে আরেক প্রজাতি হলো বনমানুষ। এটা পাঠকের মধ্যে কিছুটা সংশয় তৈরি করতে পারে। বইয়ের ফ্ল্যাপে অবশ্য ছোট করে উল্লেখ আছে, তবে সেটা অনেকের চোখ এড়িয়ে যেতে পারে।
পুরো বই জুড়ে যে দ্বান্দ্বিক অবস্থানটি রোমাঞ্চের আবহ যুগিয়ে গেছে তা হলো দলপতি নির্বাচন এবং নারীর দখল। পৃথিবীর আদিম অপরাধগুলি আজ নানা শাখা-প্রশাখা বিস্তার লাভ করেছে, তবে মূল কিন্তু ঐ দুটোই। নারী আর ক্ষমতা। তবে কেন যেন মনে হয়েছে উপন্যাসের দলপতিরা একটু বেশিই সদয়। যেমন সর্দার আফা রাবাকে মারার সিদ্ধান্ত নিলে পারা তাকে নিষেধ করে। আবার বনমানুষের সাথে শুয়ে এসে কৃশকায় সন্তান জন্মদানের পরেও হু’কে হত্যা না করে আলাদা গুহায় বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়। কিছুক্ষেত্রে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনের যুক্তিকে অতিমাত্রায় জটিল মনে হয়েছে সে সময়কার মানুষের তুলনায়। যেমন, হু’কে যখন দলপতি হিসেবে নির্বাচন করার প্রস্তাব তোলা হয়, তখন হু প্রত্যাখ্যান করে এই বলে, সে দলপতি হলে তার ছেলের প্রতি অন্যায়-অবিচারের বিচার করতে গিয়ে সে বেশি কঠোর হয়ে যাবে, তাই দলপতি হবে না।
কিছু কিছু জায়গায় শব্দচয়ন এবং বাক্যের ব্যবহার যথাযথ মনে হয় নি। যেমন, কয়েকজায়গায় ‘শিশু’ বোঝাতে ‘পিচ্চি’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এক জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে “খবর আছে”। উপন্যাসের প্রথম দিকে ‘বিয়ে’ শব্দটি ব্যবহৃত হলেও পরে সেটি বদলে “ঘরে তোলা” ব্যবহৃত হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কোন প্রয়োগটি সঠিক? আমি যতদূর জানি বিয়ের প্রচলন আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে। তাই ত্রিশ হাজার বছর আগের গল্পে বিয়ে শব্দটি থাকা সমীচীন নয়। বিশেষ করে যখন একটি নারী চরিত্র তার পুরুষটিকে বলে “মেয়ে বড় হচ্ছে, বিয়ে দিতে হবে”, তখন যেন আদিম আবহটা হুট করে কেটে যায়।
হোমো স্যাপিয়েন্স আর নিয়ানডারথালদের ভাষার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রাখা হয়েছে। নিয়ানডারথালদের ক্ষেত্রে সেটা যথাযথ ছিলো, তবে হোমো স্যাপিয়েন্সদের ক্ষেত্রে কিছু কিছু জায়গায় মনে হয়েছে আরেকটু সরল হলে ভালো হতো। যেমন, কোন এক জায়গায় কাউকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে “ তুমি ঠিক আছো তো? কোন সমস্যা?” এরকম খুব বেশি জায়গায় নেই অবশ্য।
স্বরূপকথা পড়েছি প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে, ধীরে ধীরে। এখন আবার ফিরে যাবো শহুরে বাস্তবতায়। হাতে তুলে নিবো কোন ডিস্টোপিয়ান উপন্যাস, অথবা ম্যাজিক রিয়ালিজমের কৌশল দেখানো গল্প। নিজেও লিখতে বসবো এরকম কিছুই। এখন আর লিখতে এমন কি কালি কলমও লাগে না। ভার্চুয়াল অক্ষরে সাজাই শব্দদল। এই মধ্যবিত্ত আয়েশ এসেছে বহুদিনের ত্যাগ আর তিতিক্ষার ফলে। আমাদেরই পূর্বপিতারা কোন একসময় গুহাচিত্রে হরিণ এঁকেছিলেন বলেই আমরা এখন পরাবাস্তবতা চর্চা করতে পারি। সেই সময়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে আশান উজ জামানকে ধন্যবাদ। বইয়ের শেষ লাইনে সমুদ্রের গর্জনের সাথে মানুষের ধ্বণি মিলেমিশে যে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়া হয়, তা আমাদের জীবনচর্চায় রাখা উচিত।
আশান উজ জামানের এই বইটা মানুষের আদি পর্যায়ের। তবে মানুষ হয়ে ওঠার না। তারা তখনো প্রায় কাঁচা মাংস খায়। আগুণ জ্বালানো শিখছে তবে সবাই সেই কায়দাটা জানে না। হান্টিং গ্যাদারিং চলতেছে। সেই সময়ের একটা গোত্র বা দলরে কেন্দ্র করে উপন্যাস। আর সেখানে প্রধান হয়ে উঠছো হু নামে এক নারী।
হারিরি আমি পড়ি নাই, তবে ভোলগা থেকে গঙ্গা পড়া। দুইটার মধ্যে মিল কিছু আছে কিনা জানি না কিন্তু সাংকৃত্যায়ন আমার পছন্দের। ভোলগা অনেকেরই পড়া তবে খুব কম লোকই হয়ত বনফুলের 'স্থাবর' পড়ছেন। আমার মাথায় 'স্বরূপকথা' পড়তে গিয়া প্রথমেই আসছিল, সাংকৃত্যায়ন আর বনফুলের দুইটা বইর পর কি স্বরূপকথা আদৌ দরকার ছিল?
দরকার হইত না, যদি আশান উজ জামান গল্পটা অন্যভাবে বলতেন। তিনি যে গল্পটা বলেছেন সেটা একটা নামহীন গোত্রের। সেকালের মানুষ কেমন করে দলবদ্ধ জীবন যাপন করত, আধো বোলে কথা শুরু করেছিল, কেমন করে খাবার চিনত সেই সবই এই উপন্যাস বলে। পাশাপাশি এখানে হু হয়ে উঠেছে প্রধান চরিত্র। আদি নারীর মানস, প্রেম, কাম থেকে শুরু করে স্বপ্নও লেখক প্রকাশ করেছেন।
দুই একটা জায়গা বাদ দিয়ে আখ্যান আর গল্পের স্রোত গতিময়। শেষের দিকটা আরেকটু আঁটো হতে পারত। তবে সব মিলে যা মনে হলো লেখক যা লিখতে চেয়েছেন তা লিখতে পেরেছেন নিজের মতো করে।
স্বরূপকথা। এবছর আমার পড়া প্রথম বই। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে পড়া শেষ করি। রিভিউ লিখবো, লিখবো করেও লেখা হচ্ছিলো না। আসলে কিছু বই থাকে যেসব বই নিয়ে লিখতে ইচ্ছা করে না। এই লিখতে ইচ্ছা না করার কারণটা কিন্তু ভিন্নরকম।
স্বরূপকথা সম্পর্কে আমাকে প্রথম যে বলেন সে একটা বাক্যে রিভিউ দিয়েছিলেন। বাক্যটি মাথায় রেখে পড়তে বসে তাকে ভুল প্রমাণিত করার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণে মেতে ছিলাম। তবে তাকে ভুল প্রমাণ করতে পারিনি। বরং আশান উজ জামানের লেখার মায়ায় পড়ে গেছি। কী ছিলো বাক্যটি, জানতে ইচ্ছা করছে তো? এক লাইনের বই বিশ্লেষণে আমার সেই পরিচিতজন বলেছিলেন, 'স্বরূপকথা'কে টপকে যেতে পারবে এমন উপন্যাস সমসাময়িক লেখকদের কাছে আগামীতে খুবই কম পাবে।'
বই তো কতো'ই পড়া হয়, কিন্তু যে বই পড়ে মনে তৃপ্তি পাবো সে বই পাওয়া যায় কালেভদ্রে। আর যেহেতু আমি উপন্যাসের মানুষ, ভালো উপন্যাস খুঁজে পেলে পড়ার তৃষ্ণা কয়েকগুণে বেড়ে যায়।
স্বরূপকথা প্রাগৈতিহাসিক এক সমাজের গল্প বলে, সে সমাজে এক মগ্নপুরুষ - যে বলতে চায়, কিন্তু পারে কম। আবার একঘরে এক নারী যে কথা বলতে পারে, কিন্তু বলে কম। কেমন ছিলো তাদের জীবন, সেই সময়কার সমাজ? কেমন করে তারা নিজেদের প্রস্তুত করছিল ভবিষ্যতে আমাদের জীবিকার, সামনে এগিয়ে চলার শক্তি হতে?
আর লেখক আশান উজ জামান এর কাছে জানতে ইচ্ছা করে, 'গাছটার শিকড় ছেঁড়া। বাঁচবে তো?'
যারা ভিন্নধর্মী বইয়ের খোঁজে আছেন তারা নিঃসন্দেহে এই বইটি সংগ্রহ করতে পারেন। বইটির প্রকাশকাল গতবছর হলেও, আজীবন সংগ্রহে রাখার মতো একটি বই।
সত্যি বলতে ‘স্বরূপকথা‘ পাঠ এক দারুণ অভিজ্ঞতা। অভিনব প্লট নিয়ে স্বরূপকথা সামনে হাজির হয়। নিয়েন্ডারথালদের শেষ সময়কাল মাথায় রাখলে এ উপন্যাসের প্লটটা প্রায় ৪০,০০০ বছর আগের।
নিয়েন্ডারথালদের উপস্থিতি আছে বলে উপন্যাসটা পড়তে পড়তে আমার মাথায় বারবার ঘুরেছে সাম্প্রতিক সময়ের বিখ্যাত এনিমেশন সিরিজ Genndy Tartakovsky এর Primal। এটা আমার বেশ পছন্দের সিরিজ। প্রাইমাল এর প্রধান চরিত্র স্পিয়ারের সাথে না চাইলেও স্বরূপকথার অব, জব, চটদের তুলনা করে ফেলি অবচেতনেই। কারো যদি প্রাইমাল সিরিজ দেখা থাকে তাহলে সম্ভবত তারা জেনে থাকবেন প্রি-হিস্টোরিক যুগের পৃথিবী ভয়ংকর ও রুথলেস ছিল। প্রাচীন পৃথিবীর মূল চ্যালেঞ্জই ছিলো সার্ভাইবাল ও খাবার সংগ্রহ। সে বিবেচনায় রুথলেসনেস অবধারিত ধরে নেয়া যায়। প্রাইমাল সিরিজে সার্ভাইবাল কিংবা খাবার সংগ্রহে ব্লাডশেড ও রুথলেসনেসের দিকেই জোর দেয়া হয়েছে বেশি। খাবার সংগ্রহ করো, টিকে থাকো, প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করো- এ তিন নীতিই ওই সময়কালের মূল বিষয়। স্বরূপকথায় ওইসময়কালের সত্যিকারের চিত্রটা ঠিক যেন ফোটে না। এটা স্বরূপকথার প্রধান ঘাটতি। আরেকটু পরিষ্কার করে বলতে গেলে, ওই সময়কালের শিকারের সময় মানুষের যে প্রবল প্রচেষ্টা, মরিয়া চেষ্টা... তার খুব অল্প চিত্র এসেছে এ বইয়ে। একদম প্রথম দিকে কিছু দৃশ্য থাকলেও ঠিক ততটা জোরালো হয়ে ফোটেনি সেসব। মানুষের শিকারের বর্ণনা প্রাধান্য পায়নি এ উপন্যাসে। অথচ মানুষের টিকে থাকার প্রধান উপায়ই ছিল ওই শিকার।
সম্ভবত প্রাইমাল সিরিজটা দেখার পর স্বরূপকথা পড়তে গিয়েই হয়তো ঝামেলাটা লেগেছে। পড়তে পড়তে আমার কাছে মনে হতে হয়েছে, স্বরূপকথা বড়জোর ভিন্ন প্রেক্ষাপটে রচিত একটা রোমান্টিক উপন্যাস। এর বেশি কিছু না। নিঃসন্দেহে আনন্দদায়ক উপন্যাস। উপভোগ্য। একবার হাতে নিলে পড়ে শেষ করতে হয়। চেনা গণ্ডীর বাইরের প্লট হওয়ায়, পাঠের ভিন্ন স্বাদ পাঠক এ উপন্যাস থেকে পাবেন। গড়পড়তা বাংলা যে উপন্যাসগুলো টেস্টের হয় তার থেকে যে স্বরূপকথা আলাদা, এটা সহজেই বোঝা যায়। একটা বিষয় নজরে পড়লো যে, নিয়েন্ডারথালদের যখন বারবার দৃশ্যপটে নিয়ে এসেছেন লেখক তখন মনে হয়েছে খুব দায়সারাভাবে কাজটা সারছেন। এলোমেলোভাবে আনছেন। উপন্যাসটা বাজারে আনার ব্যাপারে খুব তাড়াহুড়ো ছিলো কিনা আমি জানি না। কিন্তু অমনই মনে হয়েছে। এখানে সম্পাদনার দুর্বলতাই দায়ী মনে হলো। পাশাপাশি হোমো সেপিয়েন্স ও নিয়েন্ডারথালদের বিবরণ আনার ব্যাপারে যথেষ্ট ভারসাম্য ছিলো না। দেখা গেছে হোমোসেপিয়েন্সদের গল্প বলতে বলতে হঠাৎ যেন মনে পড়েছে এ ভঙ্গিতে নিয়েন্ডারথালদের প্রসঙ্গ নিয়ে আসা হচ্ছে। নিয়েন্ডারথালদের জীবন-চিত্র দেখাতে গিয়ে আলাদা যত্ন লেখক নেননি। তবে অব ও হু’র প্রেমের দৃশ্যপট ফুটিয়ে তুলতে লেখক মোটেও কার্পণ্য করেননি। কার্পণ্য করেননি হু ও মান এর চরিত্র-জীবন বর্ণনায়। পড়লেই বোঝা যাবে, বেশ মমতায় ও যত্নে সাজিয়েছেন চরিত্রগুলো। দৃশ্যপট বর্ণনায় আশান উজ জামান টপক্লাস লেখক। কিন্তু দৃশ্যপট বর্ণনা, খাবার সংগ্রহ, খাবার ভাগ- এসবের বিবরণ এত বেশি যে, এতে উপন্যাসের মেদটাই কেবল বেড়েছে। একটু নজর দিলে সহজেই এ উপন্যাসে আনুমানিক দুইশোর মতো পৃষ্ঠা ছেটে ফেলা যেত। এখানে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রাচীনকালের দৃশ্যপট সরিয়ে দিয়ে যদি অন্য কোনো দৃশ্যপটে পুরো গল্পটা বসানো যেত তাহলে গল্পটা আহামরি কিছু মনে হতোও না পাঠকের কাছে। তাই, এদিক বিবেচনায় দৃশ্যপট এক অর্থে এ উপন্যাসের অলংকার। গল্পটা সে বিবেচনায় গৌণ। বোধহয় একারণেই, লেখক দৃশ্যপট রচনায় বেশি জোর দিয়েছেন। তবু, অলংকার কিছু না কিছু ছেটে ফেলাই যায়।
পুরো উপন্যাস জুড়েই হু ও মানের আধিপত্য ছিল। মান চরিত্রটা যেহেতু সৃজনশীল ও নতুন কিছু আবিষ্কারে দারুণ উৎসাহী তার চরিত্রটা পাঠককে টানবে বেশি। গুহাবাসীদের নিয়ে তৈরি `দি ক্রুডস’ এনিমেশন মুভিটা কারো দেখা থাকলে সেখানের চরিত্র ‘গাই’-কে নিশ্চয় মনে থাকবে। আর ‘গাই’-এর চরিত্রটা মাথায় থাকলে স্বরূপকথার ‘মান’-কে বুঝতেও সুবিধা হবে।
মান-এর একটা আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো, সে যুক্তিবাদী। গাছকে দেবতা মেনে নিতে সে নারাজ। সে অন্যদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করে গাছ সত্যিকারের দেবতা নয়। যদিও, এ পর্যায়ে মান-এর মাধ্যমে ধর্মীয় চিন্তার নানান উৎপত্তি ও ডেভেলপমেন্ট লেখক দেখাতে পারতেন। বেশ ইন্টারেস্টিং হতো। কিন্তু সেদিকে বোধহয় আগ্রহ ছিল না। কিন্তু উপন্যাসে এ বিষয়ে আলাপ তিনি সামনে বাড়িয়ে নেননি।
রাহুল সংস্কৃতায়ন, হুবহু না হলেও প্রায় কাছাকাছি বিষয়ক বই ‘ভোলগা থেকে গঙ্গা’-তে ভারতীয় উপমহাদেশের ধর্মীয়-সামাজিক সংস্কৃতি সেই প্রাচীন অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত বয়ে আসার একটা চিত্র আঁকার চেষ্টা করেছেন। ছোট ছোট ভাগে প্রি-হিস্টোরিক যুগ হতে মানবসভ্যতার নানান সংঘাত ও সংঘর্ষের ভেতর দিয়ে বর্তমান সময়ে উন্নীত হওয়ার পর্যায়গুলো দেখাতে চেষ্টা করেছেন। অন্যদিকে আশান মনোযোগ দিয়েছেন নিয়েন্ডারথালদের বিলুপ্তি ও হোমোসেপিয়েন্সদের উত্থানের সময়টায়। স্বরূপকথার গল্প প্রি-হিস্টোরিক যুগেই শেষ হয়ে যায়, ভবিষ্যতের পথরেখা এঁকে।
মোটাদাগে বলতে গেলে স্বরূপকথায় বিগ থিম, হাই থট এসব পাওয়া যাবে না। বরং মিহি এক পাঠআনন্দই পাঠককে উপহার দেয় এ বই। কিন্তু এ সকল আলাপ কি আশানকে মনক্ষুণ্ন করবে? করা উচিত নয়। আশান জাতশিল্পী। তাই আমার ধারণা, তার সমালোচনা সমালোচনা নেবার সক্ষমতা আছে।
স্বরূপকথা পাঠে আর যাই হোক না কেন, একটা চিন্তা আমাকে বারবার ছুঁয়ে গেছে। সেটা হলো, বাংলায় সামনের সময়ে শক্তিশালী যে সকল কথাসাহিত্যিকের নাম আমরা শুনব, তাদের ভেতর আশানকে আমরা সামনের কাতারেই দেখব ইনশা আল্লাহ। আশানের জন্য ভালোবাসা।