‘আড়িয়াল খাঁ’: মাসরুরীয় কৈশোরনামা
মাহমুদ হাফিজ
‘মানুষের ডুকরে ওঠা উচ্চকন্ঠ বিলাপের শাঁসটুকু বোঝার ক্ষমতা নদীর জলের থাকতে পারে, কী কাক-চিল-শকুনদেরও থাকতে পারে, কিন্তু তা অন্য মানুষের নেই। কারণ, তাদের বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতার মধ্যখানটা এই ফাঁকা পৃথিবীর ফাঁকা এক অনিশ্চয়তা দিয়ে মোড়া বলে তারা কোনো প্রমাণ ছাড়া মানতেই রাজি না যে, মৃত্যু এ জীবনে কোনো ব্যাপার। আর সেই মৃত্যু যদি হয় রামদা-র কোপে কি নদীর জলে ভেসে গিয়ে, তাহলে সেটা তো নিছকই হঠাৎ হয়ে যাওয়া দুর্ঘটনা মাত্র, যা দেখবার শেষে এক ধুত্তুরিমার্কা-কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেই ওঠা যায়, “রহমত আলি, তোমার নরসিংদীর ষাঁড়ের মাংসের লেজের দিক থেকে যদি নিই তো সাফ সাফ বলো যে, সের কতো?”—মাসরুর আরেফিন, ‘আড়িয়াল খাঁ’।
পঠনঋদ্ধ মানস, জীবনদৃষ্টি ও স্রষ্টাপ্রদত্ত সৃজনশক্তির মর্মমূলে দাঁড়িয়ে কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন ‘আড়িয়াল খাঁ’ নামের এক আমূল দার্শনিক উপন্যাস পাঠকের সামনে হাজির করেছেন। উপন্যাসটি পড়ার পর আমপাঠকের প্রেক্ষণবিন্দুতে পাঠপ্রতিক্রিয়া লেখার কসরতকে কেন্দ্র করে নিচের এতো এতো কথা। উপন্যাসের সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে সাহিত্যবোদ্ধা বিদ্বজ্জনের অনুভূতি হতে পারে যে, এই আলোচক উপন্যাস বিবেচনায় ভাসা-ভাসা, অসম্পূর্ণমানস, একচক্ষু । কবুল করে নিচ্ছি সেই ভাবনাটাই সঠিক। কারণ, লেখালেখি ব্যতিরেকে ব্যক্তি মাসরুরকে আলোচক খুব বেশি এবং বেশি দিন চেনেন না। শিল্পপাঠের মাধ্যমে ব্যক্তির সম্পূর্ণ-মানসের খণ্ডিত অংশই উপলব্ধ হয়। অথচ সৃজনশীলের আবিষ্কারশক্তির নির্যাস বিবেচনা করতে তার সমকালের প্রবাহ, বেড়ে ওঠার পরিবেশ আর এর দ্বারা লেখকমানস কীভাবে গঠিত হচ্ছে তার পূর্ণাঙ্গ খনন কর্তব্য। এ পরিসরে সে সুযোগ কম। রচনাটিকে তাই ‘আড়িয়াল খাঁ’র খণ্ডিত এক বিবেচনা হিসেবে নিলেই আমার তৃপ্তি।
মাসরুর আরেফিনের বেড়ে ওঠা বরিশাল শহরে। আশির দশকে। ওই এলাকার প্রেক্ষাপট, জীবন-প্রকৃতিকে পুঁজি করে প্রাতিস্বিক কারুকর্মে কৃতবিদ্য মাসরুর এমন এক উপন্যাস লিখেছেন, যাতে কিশোরের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি কালের জীবনপ্রবাহ উঠে এসেছে অকপট, সাহসী, ভাঁড়ামিহীন ভাষ্যে। লেখক নিজেই এর আখ্যানটির সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে: ‘“ভাটিখানা-বরিশাল” ট্রেডমার্ক লাগানো কমেডিটার মধ্যে চলতে থাকা এই এতগুলো বিষয় কীভাবেই না ওখানে হাত ধরাধরি করে চলত সেই ১৯৮১ সালের বরিশালে—সবাইকে খালি হাসাতে ও মজা দিতে’।
বলাবাহুল্য, রোজকার জীবনসংস্কৃতির অন্দরমহলকে প্রকৃতির পটভূমিতে দাঁড় করিয়ে মাসরুর ছুঁয়ে গেছেন জাদুবাস্তবতাময় এক অনিবর্চনীয় অলৌকিক, বিজ্ঞানঅসিদ্ধ জগত, যার ভরকেন্দ্র নক্ষত্রখচিত আড়িয়াল খাঁ নদীর পানি, আর পটভূমি টমেটা বাগানের শেষে শুরু হওয়া জঙ্গলে ঠেস দিয়ে দাঁড়ানোর দেবদারু গাছ, যে-গাছটির চারপাশ ঘিরে আছে লতাগুল্মমানুষপ্রকৃতিরক্তহাঙ্গামাসমকামলিঙ্গকর্তনখছাকগুধু আর রিকশাওলা সামছু।
‘আড়িয়াল খাঁ’ প্রতীকী নদী। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার সমকালে সেই নদীতে রাতের বেলা যেতে চায় কিশোর জাহেদ। রাতে আকাশের নক্ষত্র যখন ছিটকে পড়ে নদীর পানি আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠবে, সেই পানি বোতলে ভরে বাড়িতে নিয়ে আসতে পারলে হয়ে যাবে হীরা মণি-মাণিক্য। ধর্মশিক্ষক মালেক হুজুর ইরানী বইয়ে পড়ে নিজের বিশ্বাস থেকে জাহেদকে ধনী হতে গুপ্তধন আয়ত্তের এই বুদ্ধি শিখিয়ে দিয়েছে। সামষ্টিক দৃষ্টিকোণে তা মিথ্যা, হাস্যকর ও কৌতুকময় হলেও তেরো বছরের কিশোরের জন্য এই-ই সত্য। জাদুবাস্তবতাকেন্দ্রিক উপন্যাসটির আখ্যানে প্রেম, মৃত্যু, লিঙ্গকর্তন, সমকাম, দেহ-ব্যবসা, শঠামি, অবৈধজন্ম, কৈশোরিক মুর্খতা, মহল্লার মস্তানি, সাম্প্রদায়িক মানসকিতা, সবই উঠে এসেছে। উঠে এসেছে সত্যের মোড়কে কল্পনার মিথ্যা—ফিকশনের দাবিও তাই-ই।
কাহিনীর কঙ্কাল বিবেচনা করে ‘অশ্লীল’ শব্দটি সামনে আনলে স্বভাবিক রকমে এ প্রশ্ন আসে যে, প্রেমকামপরকীয়াময় সাহসী ও কথিত ‘অশ্লীল’ উপন্যাস লিখে আগেই আলোচনা-বিতর্কের জন্ম দিয়ে গেছেন স্বনামখ্যাত অনেক লেখক। অর্ধশতক আগে সৈয়দ শামসুল হকের ‘খেলারাম খেলে যা’ উপন্যাসে লম্পট বাবরের সীমাহীন যৌনাচার নাঙা করে দেখানো নিয়ে সেকালে বিতর্ক কম হয়নি। বুদ্ধদেব বসু ‘রাত ভরে বৃষ্টি’-তে সাহসী পরকীয়া সমাচার তুলে ধরে এমন হৈ-চৈ ফেলে দেন যে, বেরসিক বৃটিশ প্রশাসন তা নিষিদ্ধ করে। বেশি উদাহরণ দিয়ে কলেবর আর না বাড়াই।
তাহলে সমাজমনস্ক সাহিত্যের সরস চর্চার পথে না হেঁটে মাসরুর আরেফিন সমকাম, শিশ্নকর্তন, অবাধ যৌনাচার, মস্তানি, খুন-খারাবির বিষয়কে সঙ্গী করে যে ‘আড়িয়াল খাঁ’ লিখেছেন, এর শৌর্যটি কোথায়? মনে হয়, মাসরুরের শৌর্য হচ্ছে দৃশ্যমান সমাজের ডামাডোলের ভেতরে চলতে থাকা শিহরণজাগানো কদর্যতা উন্মোচনের মাধ্যমে শিল্পভোক্তাদের কান খাড়া করা, যেখানে ব্যক্তিমানুষ হওয়ার বোধ ক্রমশ: মুছে যেতে থাকে—‘সমষ্টির শেখানো ঝাপসা-বিভ্রান্তিকর এক সমষ্টির বোধের সঙ্গে মিলিয়ে যাবার স্বার্থে’…আর সেই খাড়া ও খোলা কানে অদ্ভুত ভাষাভঙ্গিতে থাকে তাঁর গুঁজে দেওয়া নিজস্ব দর্শন যেখানে—‘মানবজীবনের এই লক্ষণ দাস সার্কাস ও আহত ভোমরায় ভরা জীবনের এ সমস্ত দায়বোধ আসলে অন্য পৃথিবীর, এ পৃথিবীর নয়’।
দুই.
উপন্যাসের কঠিন ভাবগাম্ভীর্যে না গিয়ে যদি এর আঙ্গিক নিয়ে মেতে উঠি, দেখতে পাবো এখানে খেলা করছে গদ্যবুননময় মায়া ও প্রাণপ্রকৃতির এক অদ্ভুত সুরেলা জগৎ, যেখানে গ্রাম-বাংলার অপরূপ লতাগুল্মময় প্রকৃতিকে ছাপিয়ে পাঠক চিত্ত প্রমোদিত করে তোলে বরগুনার আগুনখাওয়া মিজানের সুরেলা কন্ঠ; যেখানে ‘তোমার সমাধি ফুলে ফুলে ঢাকা’ গানের সুরের রেশ বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই মৃত্যু হয় সমাজ-সজ্জন বৃদ্ধার; যেখানে কারো কাছেই টাকা নেই পৌনে এক কেজি খাশির মাংস কেনার; যেখানে অন্যের মৃত্যুতে নকল কান্না কেঁদে সামাজিক হওয়াটা এক বড় বিষয়।
‘সন্ধ্যা দ্রুত পায়ে এই শহরের প্রান্তসীমার গ্রাম-গ্রাম এলাকাটাতে নামছে আর তেরো বছরের বাচ্চা ছেলে জাহেদের ততই বেশি করে মনে হচ্ছে, আজ রাতের নৌকায় বাবার সঙ্গে আড়িয়াল খাঁ নদীতে যাবার ব্যাপারে এ বাড়ির লোকগুলোকে রাজি করানোর সময়টুকু তার কমে আসছে, কমেই আসছে।
“রাতের নৌকা”, শব্দ দুটো নিয়ে ভাবলো সে। তার মনে হল, ব্যাপারটার মধ্যে কেমন এক শান্ত ও কম্পনশূণ্য কী যেন আছে, আর সারাদিন ধরে গড়িয়ে চলে রাতে পৌঁছানো দিনের মধ্যেও তো আছে কেমন অচাঞ্চল্য, স্থিরতা’ (পৃষ্ঠা-৭)।
‘মেঘেরাই দল বেঁধে উস্কে দেয় চাঁদকে তাদের ওপরের দিকটায়, যেহেতু চাঁদ সেখানে উঠতে চায় না, চাঁদ সেখানে থাকতে চায় না। চাঁদ শুধু পালায়—মেঘেদের ভেড়ার লোমের মতো থোকা থোকা বিস্তার থেকে পালিয়ে সে সরে সরে যায়…’ (পৃষ্ঠা-১২)।
বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় উপন্যাসে, মণীন্দ্রগুপ্ত আত্মজীবনীতে তৃণলগ্ন প্রকৃতির বর্ণনা কী ও কাহাকে বলে তা দেখিয়ে দিয়েছেন। ‘পথের পাঁচালী’ ও ‘অক্ষয় মালবেরি’র প্রকৃতি পাঠকমনে বসিয়ে দিয়েছে কালজয়ী দাগ। পরের বা সাম্প্রতিক কোনো উপন্যাসে প্রকৃতিকে এমন নিখুঁতভাবে ধরা দিতে দেখা যায় কদাচিৎ—
‘অড়বরইয়ের দুই গাছের একটায় গোল গোল বল বল অড়বরই ফলের গা থেকে এক লেজকাটা টিয়া “যা ভাগ, যা ভাগ” বলে লাথি মেরে সরিয়ে দিচ্ছিল একটা চাপাখি ধরনের লম্বা-ঠোঁট কালো টিঙটিঙে পায়ের চা-পাখিকে, যে চা-পাখিগুলো ঠোঁট বাঁকা করে বেহায়ার মতো ঘুরে বেড়ায় আমানতগঞ্জের বিলে’ (পৃষ্ঠা-১৪)।
‘জামের বাগানটা আরও জঙ্গলাবৃত, আরও কেমন অন্ধতমসাচ্ছন্ন, অতএব আরও মনে হল ঝঞ্ঝাসমাকুল, আরও মানুষের হৃদয়-উৎসারিত অসংখ্য শোকপ্রবাহে ভরা’ (পৃষ্ঠা-৪১)।
‘পুকুরের পানিতে শাপলা-কলমি-হেলেঞ্চা-পদ্মের পাশ ঘিরে সেই হাওয়ার চক্করে পড়ে দেখা যায় তখন আরও ঘুরে চলেছে অজস্র পানা। আহা! পানির ওই শাকগুলো মানুষ কতোটা খায়, আর কতোটা খায় সাপ-ব্যাঙ-কচ্ছপে’?( পৃষ্ঠা-৫০)।
‘হুজুর তাকে টেনে পুকুরের পাড়ের ঘাসের ওপরে বসালেন, নিজেও বসলেন পাশে। এই জায়গাটা ভরা এক সারি কেলিদকম গাছ দিয়ে, বিশটা তো হবেই, আরও বেশি হতে পারে। একঝাঁক সবুজ-ডোরা কাঠঠোকরা উড়ে গেল কেলিকদমের লাইনটা ধরে।’
(পৃষ্ঠা-৫৪)।
‘আহহারে, তুমি জলপাই খাও নাই? চুকা। বরইয়ের মতম। রাইখ্যা দিবা তো আমড়ার মতম বিচ্ছায় আইস্যা ছাইয়া ফেলবে। বোঝতেয়াছ?…আমাগো এইহানে কেলিকদমরে কয় কুরিয়ারি। আমার মায় কয় ফুটিকদম। কেমন সুন্দর না গাছগুলা, জাহেদ’? (পৃষ্ঠা-৫৫)।
‘এখন নদীর দুইপাশে খালি আমরুল, জারুল, আর গাওছা লতা, আর খালি বনচাইলতা, খালি বনচাইলতা।…একটু পরে নদী যাইবে কান্নি খাইয়া হালকা ডাইনে, আর তহন শুরু হইবে তেলাকুচ, তেল, জিকা আর গাব-গাব আর গাব। নারিকেল ও শুফারি তো থাকিবেই। ওই গাবের ঝাড়ের যেই শ্যাস হইবে, তখন তুমি বোঝবা যে আড়িয়াল খাঁ আসিয়া গেছ’ (পৃষ্ঠা-১৫৩)।
রোজকার, দৈনন্দিন, আটপৌরে জীবনের যে চালচিত্র, তা থেকে নেয়া চরিত্র ও সংলাপের ওপর ভর করে এগিয়েছে ‘আড়িয়াল খাঁ’-র আখ্যান। বর্ণনা, সংলাপ ও জীবনঘনিষ্ঠ চিত্রকল্পের নিরেট-নিখুঁত উপস্থাপনের কারণে উপন্যাসটিকে ‘ভাটিখানা-বরিশাল’ ট্রেডমার্কের সাদামাটা জীবনচিত্র বলে দৃশ্যত: মনে হতে পারে:
‘তারপর (একটা কুকুর) পেছনের দুই পা একসঙ্গে উঁচু করে টমেটোর ঝাড়টাকে লাথি মেরে স্প্রিংয়ের মতো লাফিয়ে উঠে দৌড়ে গেল বড় লোক মুরাদদদের বাড়ির দিকে’। (পৃষ্ঠা-৯)।
‘জাহেদ তাকিয়ে দেখছিল মমতার সেই বিদায় বেলার চোখ—তাতে যেমন ছিল লজ্জাশূন্য-বেশরম চাহনি, তেমনই পৃথিবীর মানুষগুলোর জন্য করুণাহীন এক কষকষ, মমতাশূন্য এক ঝাল।’ (পৃষ্ঠা-১৬)।
‘হুজুরের হাত তোলা দেখেই কিনা, পুকুরের ওপারের ডেউয়া, বউলা গোটা, বট গোটা, পাকুড় ও তিতিজামের লাইন ধরে মাটিতে বসে থাকা কাকগুলো একসঙ্গে উড়ে পানির ওপরে স্থির থাকল এক মুহুর্ত, তারপর জাহেদদের দিকে ছুটে এসে আকস্মিক ওপরে উঠে চলে গেল মসজিদের টিনের চাল ছাড়িয়ে বরিশাল বরাবর’ (পৃষ্ঠা-৫৬)।
‘রাতও ছিল সেটা একটা বটে—দশ কালো হাত পা বাড়িয়ে দশ দিকে ছড়ানো এবং একটু পরপর ম্যাপলের মতো পাতা ও সজারুর কাঁটার মতো ফলে ভরা ঘাগরা শাকের অজস্র ঝাড় ঘিরে বাজতে থাকা পুলিশের বাঁশি’।
‘জাহেদের স্রেফ মনে আছে নদীতে চলা নৌকার টিমটিমে আলোয় দেখা যাচ্ছিল এই পাড় ধরে দাঁড়ানো মৃসণ দেহের গগণশিরীষ গাছগুলোকে’ (পৃষ্ঠা-৬২)।
‘তার রিকশার পথ থেকে সরে গেল লুলা ভিখিরির দল, যারা সন্ধ্যারাতের ভিক্ষাতে নেমে ইতোমধ্যে শুরু করে দিয়েছে তাদের গান: ‘আমার আল্লাহ নবীজির নাম…’( পৃষ্ঠা-৭১)।
‘তখন দোকানদার বৃদ্ধ বলে উঠলেন, ‘মা, তোমার বয়স আমি পার হয়ে আসছি। তুমি পঙ্কজকান্তি কিনতে আসো নাই। তুমি আসছ আড়িয়াল খাঁয় নাগর নিয়া ঘুরতে। তোমার লাগবে রাজা কনডম, মাইন্ড কইরো না’ (পৃষ্ঠা-১২৮/২৯)।
সমাজচিত্রের এই সারল্যে দৃশ্যত: স্থান-কাল -পাত্রও হয়ে ওঠে সরল, নিরাভরণ, সাদামাটা। চরিত্রের নাম সেখানে—জাহেদ, কাশেম, রহিমা বেগম, এনায়েত, ইলতুতমিশ, শাহেদ, নাঈম, পারভিন, মালেক হুজুর, মিজান, আনোয়ারা, মন্টু খাঁ, সালাম, ফোরকানউদ্দিন, আঁখি, শামছু, বামন হায়দার, ঈমান, ডাক্তার হরলাল, ওমর, রিয়াজ, মিরাজ, মমতা বা মুরাদ। আছে আড়িয়াল খাঁ, কীত্তনখোলা, ভাটিখানা, কুষ্টিয়ার আল্লার দরগা, এমভি নাগেশ্বর, লক্ষণদাস সার্কাস, আমানতগঞ্জ বিল, তালতলী, মহাবাজ মোড়, চাখার, বেলতলা, কাউনিয়া, বৃস্টল সিগারেট, রাজা কনডম, এপি’র পঙ্কজকান্তি, জামবাক, ডন প্রোডাক্টসের খাতা, গ্যাকোটাচ, বোরিক ফর্মুলা, আর্নিকা হেয়ার ওয়েল, বিচিত্রার ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন এর মতো বিষয়, যা লেখকের সময়চেতন মন ও গভীর জীবনদৃষ্টির প্রমাণ দেয়।
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে উপন্যাসটিকে আশি-একাশিতে ভাটিখানা বরিশালের ঘটনাকেন্দ্রিক সরল উপাখ্যান ভাবলে বিভ্রম হবে বড়। বরঞ্চ লম্বা সময়কে একটি প্রহরের ছকে বেঁধে লেখক নায়ক জাহেদের প্রেক্ষণবিন্দুতে উথলে উথলে ওঠা প্রলম্বিত সময়ের নানা ঘটনার যোগান দিয়েছেন, যে যোগানের ছোট ছোট ঘটনা লেখকের বেড়ে ওঠার কালের নষ্টালজিয়া-উৎসারিত কৈশোরনামা বলে ভাবতে ভাল লাগে। সাদামাটা জীবনোপাখ্যানের ওপর ভর করে মাসরুর কখনো তেরো বছরের কিশোর নায়ক জাহেদের, কখনো অন্য চরিত্রের প্রেক্ষণবিন্দুতে বলতে চান পৃথিবী ও মানবসভ্যতার অর্থময় কিংবা অর্থহীন দর্শন, যা গুরুগম্ভীর, দ্বন্দ্বক্ষুব্ধ ও বাস্তবতা-উর্ধ্ব। তাই ঘটনার রোমহর্ষক বর্ণনা আর তৃণলগ্ন গুল্মলতাময় অসাধারণ প্রকৃতিকে ছাপিয়ে ক্ষণে ক্ষণে উচ্চকিত হয়ে ওঠে লেখকের সেই দর্শন:
‘মানুষেরা প্রজাতি হিসেবে হাস্যকর। তারা গর্বোন্মাদ, কুৎসিত, স্বার্থপর ও নিজেদের ব্যাপারে ভুল ধারণায় আত্মভোলা। (পৃষ্ঠা-২২)।
‘এই পৃথিবী অনেক পুরোনো এবং সে বার বার একেকজনের কাছে নতুন হয়ে ওঠে ক্রোধ ও ঘৃণা তাকে নতুন নতুন রূপ দেয় বলেই’ (পৃষ্ঠা-৩৯)।
‘এখানে ভাল মানুষেরা বহিরাগত, অনাহূত, তারা সমাজচ্যুত; তারা হতাভাগা ও নিরাশ্বাস, যেহেতু পৃথিবী মুরাদদের মতো অসভ্য মানুষদের শাসনে থাকা এক পান্তামুখী হাঁস’।
‘পৃথিবী পুরনো হতে পারে, আকাশজুড়ে ছুটে চলা ধুমকেতুদের সঙ্গে ভাটিখানার প্রতিটা বাড়ির প্রতিটা ইটের সম্বন্ধ থাকতে পারে, কিন্তু পৃথিবীর তালা এক স্থির ও মোটা পাথরে বানানো তালা এবং সে তালার কোনো চাবি কারও কাছে নেই, ক���রণ পৃথিবীর আত্মা বলে কিছু আসলে নেই’ (পৃষ্ঠা-৪০)।
‘এই যে লজিক ছাড়া আমরা গু নিয়ে, আমরা তোমাদের মেয়েদের মান্থলি পিরিয়ড নিয়ে এই পরিমাণ ঘৃণা বুকে ধরে বসে আছি, তার কারণেই আমার মনে হয় যে, জীবনের সত্যগুলো চিরকাল দূরেই থেকে যায়’ (পৃষ্ঠা-১৩০)।
‘এই পৃথিবী যদি হয় কোনো বৃটিশের, তাহলে তা সমানভাবে কোনো বুরকিনা ফাসোর লোকেরও বটে; এই পৃথিবী যদি হয় সালাম জমিদার ও মোহন মিয়াদের, তাহলে তা সমানভাবে তারও, তার ভগ্নদশা ও ভীত বাবারও এবং সার্কাসের গুয়াহাতি নামের হাতিটারও’ (পৃষ্ঠা-১৭২)।
মফস্বল শহরের সরল নিরাভরণ জীবনের রোজকার ক্যাঁচাল আর দর্শনের জটিলতার ঘুর্ণাবর্ত উপন্যাসের পরতে পরতে চিরচেনা জগতের পাশাপাশি কল্পনাশ্রিত দুর্বোধ্য ভিন্ন জগতে উঁকি মেরেছে। তখন আমরা অপ্রচলিত নামের চরিত্র ও বিষয়ের সন্নিবেশ দেখি, যা সচরাচর সমাজবিরল। ভোরোটটি গান্ডু ওরফে ছেঁচকি ওরফে রাজা ভক্তি মিশ্র, চিট্টাগুড় চাচা, লেনজা, বাহার বাজু, পাক্কি মিয়া, বাঙ্গরা দাস, ম্যাকেনরো, নিউটন, রাঙ্গা, আলমাজী, প্রেডিক্ট ডি সুজা, ফৌজি—এরকম বহু নামে তারা সক্রিয়। নায়কের বাড়ির পোষা তিন মুরগি—ভগীরথ, কোকিল, কসাই; পান্তামুখী হাঁস গুধু, কুকুর বইঠো, পাশের বাড়ির বিজয় মহাজনের গুইসাপ খছাক, সার্কাসের মাছ অঙ্গরূপা, হাতি গুয়াহাতি, এরা হয়ে ওঠে একেকটি জীবন্ত চরিত্র। অতীতপ্রথা ভেঙে মানুষ ছাড়াও প্রাণ-প্রকৃতি এমনকী জড় পদার্থকে চরিত্র করে তোলা আমার পড়া উপন্যাসে খুব দেখেছি বলে মনে পড়ছে না এখন।
‘কাঠের শো কেসের ভেতরে থাকা সব উলের পুতুল, ঝিনুকের পুতুল, কাঠের পুতুল, তুলার পুতুল, এবং যত যত কাপড় ত্যানা, ন্যাকড়ার সস্তাদর্শন ধুলোকালি মাখা পুতুল রয়েছে, তারা সব একসঙ্গে তার মায়ের উদ্দেশে চিল্লিয়ে উঠেছে ‘খেঁয়াও’ বলে’ (পৃষ্ঠা-২৫)।
‘নানির লাশ রাস্তায় পচবে শুনে ওই মাত্র বাড়ির ভেতরে ক্ষেপে উঠল নানির প্রিয় পান্তামুখী হাঁস গুধু। সে প্রকাণ্ড জোরে ডাক দিয়ে পাড়া কাঁপিয়ে ফেলল—প্যাঁক-প্যাঁক-প্যাঁক’-(পৃষ্ঠা-১৯)।
‘অন্ধকারের মধ্যে শুয়ে থাকা, অন্ধকারের গায়ে লেপ্টে থাকা, মিশে পিষে থাকা নৌকাগুলো থেকে এবার একসঙ্গে আওয়াজ এল—ড্যাডাং ড্যাডাং’(পৃষ্ঠা-৬৪)।
‘তার মনে হল ওইটা পানিদের নিজস্ব ভাষা, যেমন এখন এই পানিগুলো একে অন্যকে ডিণ্ডিম ডিণ্ডিম হোমমঙড-হোমমঙড-মডি-মডি বলে ঘুম থেকে তুলে বলছে—"ছেলেটা গুপ্তধন আজ পাইল না, দু:খের বটে"’ (পৃষ্ঠা-১৭১)।
লেখক কোথাও কৌশলী, কোথাও অকপট, নিরাভরণ। নায়িকার সঙ্গে তার প্রেমিকার অন্তরঙ্গতার মুহুর্তের বর্ণনা: ‘আর জাঙ্গিয়া নামাতেই ঝাঁ করে হিলিয়াম-নিয়ন-ক্রিপটনের অগ্নিবাহু ছড়িয়ে প্রায় জামের ডাল বরাবর চোখ রাখল এক চড়া ও তেজালো শিরতোলা হাঁপরে ভাজা শাবল’ (পৃষ্ঠা-৪২)।
উপন্যাসের শিল্পবোধটি সূক্ষ্ম, গম্ভীর ও দার্শনিক মানি। কিন্তু আমাদের আপামর আমপাঠক উপন্যাস হিসাবে চায় রোমান্টিক প্রেমাখ্যান। সরল ও তরল উপাখ্যান পড়ে পড়ে আপামরের পাঠরুচি এমন হয়েছে যে, এখন তারা আর গভীরে যেতে চায় না। তারা খোঁজে সরল প্লট, তরল গল্প আর রোমান্টিক আবহ। পাঠকতুষ্টির সে পথে না গিয়ে লেখকের গুরুগম্ভীর প্রকৃতিকেন্দ্রিক দর্শনে যাওয়ার কারণ নিয়ে আমার দোলাচল আছে। হতে পারে নিজস্ব একটি কন্ঠস্বরের উচ্চায়ন তার উদ্দিষ্ট, তবে তা বিবেচনার ভার সাহিত্য সমালোচকদের ওপরই থাক।
উপন্যাসে মাসরুর আরেফিনের ভাষা বাঁক নিয়েছে বিশ্বচারীতা থেকে নিভৃতলোকে, শহর ছেড়ে তৃণলগ্ন জীবনাচারে। সিরিয়াস বিষয়কে এখানে শহুরে গল্পের ছকে রাখা হয়নি। রাশান ও লাতিন সাহিত্যের বিপুলবৈভব এর আঙ্গিককে হয়তো প্রভাবিত করে থাকতে পারে, তবু তা বাংলার—মণীন্দ্রগুপ্তীয়, বিভূতীয় কিংবা মাসরুরীয়। আটপৌরে জীবন ও প্রকৃতির পটভূমিতে দাঁড়িয়ে লেখক ‘আড়িয়াল খাঁ’-তে অনায়াসে পৃথিবীর সহজ বা গুরুগম্ভীর অর্থময় বা অর্থহীন দর্শন উপস্থাপন করেছেন, যার নায়কের গন্তব্য দিগন্তশেষের কাল্পনিক দুনিয়া ‘তেগুচিগালপা’। আর এর দর্শনকে ভাল করে বুঝতে পাঠককে চোখ রাখতে হয় লক্ষণদাস সার্কাস মঞ্চে অভিনয়মান জীবনাট্যের দ্বিতীয় অঙ্কে: নাম যার ‘গোলাপপ্রতিম’।