নদী দিয়ে ঘিরে রাখা নাম না জানা এক দ্বীপ-গ্রামে একটি প্রাচীন ভাঙা মন্দির দেখার জন্য বাবা আর মায়ের হাত ধরে ছোট্ট শিশু শায়ান। সঙ্গি হিসেবে তারা পায় ঘুরতে আসা তিন তরুণ বন্ধুকেও। কিন্তু পথিমধ্যে তাদেরকে গ্রামটা নিয়ে এক অদ্ভূত গল্প শোনায় আতশ নামের একজন মানুষ। নিজেকে সে পরিচয় দেয় একজন প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর হিসেবে। তবুও তাদের যাত্রাতে কোনও ছেদ পড়লো না। পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন এই গ্রামটিতে কী এমন রহস্য লুকিয়ে আছে? তারা কি পৃথিবীর গুপ্ত সম্পদ রক্ষাকারী যক্ষের দেখা পাবে? বাঁচতে হলে তাদের নিতে হবে জীবনের কঠিনতম সিদ্ধান্ত।
বারোমাসি বাজার নামে একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসস্ট্যান্ড থেকে কিছু দূরে একটি গ্রামকে ঘিরে রয়েছে নানা ধরনের কিংবদন্তি। বিভিন্ন কারণসবশত এক সকালে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হন ছেলেসহ এক দম্পতি, তিনজন ভ্রমণপিপাসু যুবক এবং অতিপ্রাকৃত নিয়ে কাজ করা এক ব্যক্তি। তাদের পরিণতি শেষ পর্যন্ত কী হয় তা নিয়ে লেখক তাকরিম ফুয়াদের 'যক্ষ' নভেলাটি লেখা।
'যক্ষ' নভেলাটি বেশ ছোট আকারের হরর ফিকশন। সে হিসেবে গল্পের সেটিং এবং অ্যাটমোস্ফিয়ারটি ভালো লেগেছে, তার সাথে লোকাল মিথের ব্যবহার গল্পের থিমের সাথে মিলে গিয়েছে। অবশ্য ছোট গল্প বলে কোন চরিত্রই নিজেকে মেলে ধরার জন্য পর্যাপ্ত সময় পায়নি। গল্পের বর্ণনাভঙ্গি এবং শেষটা এর প্লটের হিসেবে ঠিকঠাকই লাগলো। তবে সম্পাদনায় আরো কাজ করা যেতে পারতো, বিশেষ করে একটি চরিত্রের নাম বারবার অদল-বদল বেশ পীড়া দিয়েছে পড়ার সময়। যাই হোক, ছোট সাইজের রুরাল মিথ বিষয়ক হরর বই পড়তে চাইলে 'যক্ষ' বইটা পড়ে দেখতে পারেন।
এটাকে ঠিক কী বলা যায়? প্রশ্নটা আসা স্বাভাবিক।এটি হয়তো থ্রিলার ঠিকই কিন্তু বাজারচলতি থ্রিলারের থেকে এটি একটু আলাদা। স্বল্পদৈর্ঘ্যের এই বইটির কেন্দ্রে রয়েছে ছয়টি চরিত্র যারা সবাই এসে উপস্থিত হয় একটা স্টেশনে, তারপর সেখান থেকে ভাগ্যের ফেরে তারা পৌঁছয় এমন একটা দ্বীপে যেখানে গেলে ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব, যদি না একজনকে বলি দেওয়া হয় যক্ষের কাছে। আপাতদৃষ্টিতে এই হল বইটির মূল কথা, কিন্তু এর মধ্যেও লুকিয়ে রয়েছে অনেক কিছু। চরিত্রগুলোর ব্যাক্তিগত অনুভূতি, তাদের struggle, journey এখানে উঠে এসেছে। রয়েছে Survival of the fittest এই মানসিকতার সঙ্গে প্রাণাধিক প্রিয় কাউকে বাঁচানোর তীব্র ইচ্ছার একটা clash, এবং রয়েছে সেই কুয়াশাঘেরা একটা অদ্ভুত গ্রামের কথা যেখানে সময় থমকে যায়। নিজে সামান্য লেখালিখি করি বলে বুঝতে পারি world building is way too tough, and Takrim can do it really well. এখন অনেকে বলতেই পারেন যে বইটির আকার বা আয়তন অনেকটাই ছোট, আমি এখানে বলব একটি বই ততটাই বড় হবে যতটা তার গল্প দাবি করবে, সহজ ব্যাপার। অতিরিক্ত বড় করতে গিয়ে যদি এটি মেদবহুল হয়ে যেত সেটা মোটেও যুক্তিযুক্ত হতনা। হ্যাঁ, character building হয়তো আরেকটু সময় নিয়ে করা যেত কিন্তু যা আছে তাতেও অসুবিধে নেই, I can feel the complexity of those characters. তার মানে এই নয় যে অভিযোগ নেই, আছে এবং সেটা আছে বইটির সম্পাদনা যারা করেছেন তাদের প্রতি। মূল চরিত্রের নাম কখনো কবির হচ্ছে কখনো রকিব হয়েছে। আরেকটি চরিত্র জাহিদ কখনো হয়ে যাচ্ছে জিহাদ। এগুলোর দিকে নজর দেওয়া উচিত ছিল। আর হ্যাঁ, Takrim Fuad এর লেখার সঙ্গে পরিচয় ওর মাস্টারপিস বৃত্তবন্দীর মাধ্যমে। That was a brilliantly crafted thriller, I would say borderline perfect, এখন সেটি পড়ার পর যখন তাকরীমের পরের বইটি নিয়ে বসি তখন প্রত্যাশা বাড়ে বইকি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই বইটি কি সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছে? এর উত্তরটা একটু প্যাঁচালো, কারণ যদি আপনার মাথায় বৃত্তবন্দী ঘুরতে থাকে তাহলে এই স্বল্পদৈর্ঘ্যের উপন্যাস/উপন্যাসিকাটি আপনাকে হতাশ করলেও করতে পারে। কিন্তু যদি আপনি চান একটা অন্য ধরনের একটা প্যারানরমাল সুররিয়াল জগৎ যেখানে বাস্তব কল্পনা অতীত বর্তমান মিশে যাচ্ছে এবং চরিত্রগুলোর journey টাই মুখ্য, তাহলে বইটি তুলে নিন। Go for it, you won't regret, cheers...
শুরুতেই "কৃতজ্ঞতা স্বীকার" পেইজে গল্পের থিম না বলা থাকলে শেষ অবধি চমৎকার একটি সমাপ্তি দেখতে পেতো পাঠক। এমনিতেই লিখার গাঁথুনি অসাধারণ! তবে ঐ এক পৃষ্ঠা পড়েই পাঠক আসল মজা ধরে ফেলবেন! একজন পাঠকের পুর্ণাঙ্গ তৃপ্তির অন্তরায় এরকম কিছু রাখা উচিত নয়!
ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় হওয়ায় রাকিব, মুনা এবং তাদের ছোট্ট বাবু শায়ান রেল স্টেশনে বসে সময় কাটায়। স্টেশনে শুধু তারা তিনজন আছে তা নয়। আরো তিন বন্ধুর দেখা মেলে। রোহান, সুমীর ও জাহিদ। ট্যুর দিতে এসেছিল। ট্রেন আসতে লেট হওয়ায় আর কোনো উপায়ন্তর না দেখে স্টেশনে সময় কাটানো শুরু করে।
ট্রেন দেরীতে আসবে শুনে রাকিব ভাবলো তার পরিবারকে নিয়ে কোথাও যাওয়া যাক। যেখানে খাওয়া দাওয়া করতে পারবে আর একটু বিশ্রাম নিতে পারবে। এক চা দোকানির কাছ থেকে স্টেশনের কাছে অবস্থিত একটা গ্রামের খোঁজ পেলো সে। চিন্তামুক্ত হলো রাকিব। পরিবার নিয়ে বেরিয়ে পরে গ্রামের উদ্দেশ্যে। তাদের সাথে আবার ওই তিন বন্ধুও আছে।
নদী দিয়ে ঘেরা গ্রামটি। নদী পার হয়ে সেখানে প্রবেশ করে তারা। পথিমধ্যে তাদের সাথে দেখা হয় আতশের সাথে। সে একজন প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর। গ্রামে এসে তাদের মনো হলো যেন অন্য কোনো দুনিয়ায় চলে আসে। কুয়াশায় ঘেরা সে গ্রাম। সময় যেন থমকে আছে। গ্রামের মানুষরা আরো অদ্ভুত। তারা রাকিবদের গল্প শোনাতে চায়। হাজার বছরের পুরনো গল্প। যে গল্প তাদের আচ্ছন্ন করে ফেলে কোনো এক অন্ধকারে।
বলছিলাম যক্ষ বইটার কথা। তাকরীম ফুয়াদ আমার পছন্দের একজন লেখক। বৃত্তবন্দী, ইনিগমা, সার্কেল ট্রিলজি পড়ে বেশ ভালো লেগেছিল। সে ধারাবাহিকতায় যক্ষ বইটা সংগ্রহ করেছিলাম। আসলে, বইটা আমার কাছে আহামরি ভালো লাগে নি আবার খুব খারাপও লাগে নি। সেগুলো নিয়ে কথা বলি।
লিখনশৈলী ভালো লেগেছে। যার কারণে পড়তে বেগ পেতে হয় নি। আবার ভুলের পরিমাণও কম। বাক্যের ব্যবহার, শব্দচয়ন ভালো ছিল।
কিন্তু কিছু সমস্যাও আছে। যেমন: ১. গল্প যে কনসেপ্ট এর উপর লেখা সেটা আরো ভালোভাবে এক্সপ্লোর করার দরকার ছিল।
২. আতশ নামে যে ক্যারেক্টর টা আছে সেটার ব্যাকগ্রাউন্ড ভালোভাবে তুলে ধরা উচিত ছিল।
৩. গ্রাম্য পরিবেশে ভৌতিক একটা আবহ তৈরী করার প্রয়োজন ছিল। এটা ছাড়া আসলে এই।ধরনের বই পড়ার মজা পাওয়া যায় না।
৪. শেষটা আসলে মনমতো হয় নি। অন্তত আমার কাছে এমনটা লেগেছে।
এর বেশি কিছু বলা সম্ভব না। ছোট একটা বই। স্পয়লার দিয়ে ফেলার সম্ভাবনা আছে।
নদী বেষ্টিত একটা দ্বীপ। যে দ্বীপের নাম নেই। নাম নেই সে নদীরও। দ্বীপে গড়ে ওঠা গ্রামেরও নাম কেউ জানে না।
অদ্ভুত না? যেন জনমানুষের থেকে আড়ালে থাকা সেই দ্বীপ ও তার মানুষেরা আড়ালেই থাকতে বেশি ভালোবাসে। কিন্তু কেন?
জায়গাটির নাম বারোমাসি বাজার। যার এক নিষ্প্রাণ স্টেশনে দাঁড়িয়ে রকিব জানতে পারে, রেল লাইনের কোনো এক সমস্যার জন্য ট্রেন আসতে দেরি হবে। তার সঙ্গে স্ত্রী মুনা ও ছেলে সায়ান। এখন সকাল। বিকেলের আগে কোনো ট্রেন আসবে না। তাহলে উপায়? এই দীর্ঘ সময় কী করবে ওরা?
একই সমস্যায় পড়েছে তিন বন্ধু — রোহান, সুমির ও জহির। তারা ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। ছুটে বেড়ায়। যখন জানতে পারে এই কয়েক ঘণ্টা অখন্ড অবসর, তারাও খুঁজে বেড়ায় সেই অদ্ভুত মন্দির। যেখানে যাওয়ার জন্য বসে আছে এক প্যারসাইকোলজি ইনভেস্টিগেটর। সে শোনায় অদ্ভুত এক গল্প, যা ঘটেছিল সাত বছর আগে।
সব মিলিয়ে তারা জড়িয়ে পড়েছে এমন এক ঘটনায়, যেখান থেকে বেঁচে ফেরাটা দুষ্কর। কী ঘটেছিল ছয় বছর আগে? কী রহস্য জমে আছে সেই গ্রামে? কীসের মুখোমুখি ওরা সাতজন?
তাকরীম ফুয়াদের “যক্ষ” বইটা ছোট্ট এক উপন্যাসিকা। এক বসায় পড়ে নেওয়ার মতো বই। এর আগে লেখকের “বৃত্তবন্দী” বইটা পড়েছিলাম। দারুণ এক আন্ডাররেটেড বই লেখকের সে লেখা। সেই তুলনায় “যক্ষ” বইটা কেমন লাগল?
নাম শুনেই হয়তো কিছুটা আঁচ করা যায় বইয়ের বিষয়বস্তু। প্রাচীন মিথ, কাল্পনিক সত্তা যক্ষকে নিয়ে লেখক এই বইটি লিখেছেন। ছোট্ট বই। খুব যে অসাধারণ, এমন না। তবে পড়তে ভালো লেগেছে। লেখকের লেখার সাবলীলতা ও গতির কারণে কোথাও একটুও জড়তা বোধ হয় না। অতিপ্রাকৃত বিষয়ে জোর দিয়েছেন।
আমাকে যে বিষয়টা হতাশ করে, দেশীয় সাহিত্য হরর বা অতিপ্রাকৃত, যা-ই বলি না কেন; ভয়ের অনুভূতি জাগায় না। এখানেও তা স্পষ্ট ছিল। পড়তে ভালো লেগেছে, তবে সেই অনুভূতির সাথে যুক্ত হতে পারেনি। শুরু হতে না হতেই শেষ।
লেখক পুরোটা সময় গল্পের উপর নজর দিয়েছেন। ছোট্ট এই গল্পে ঘটনাপ্রবাহ, অতীত কাহিনি, প্রাচীন ইতিহাস সবকিছুই এনেছেন। কোথাও তাড়াহুড়ো মনে হয়নি। আবার কোথাও মেদযুক্ত লেখার উপস্থিতিও লক্ষ্য করিনি। লেখক বেশ পড়াশোনা করেই লিখেছেন। এবং তিনি জানতেন, তিনি কী লিখতে চলেছেন।
তবে আমার যে বিষয়টা দুর্বলতা মনে হয়েছে, সেটা চরিত্র। ছোট্ট এই বইয়ে চরিত্র নিয়ে তেমন কাজ করার সুযোগ ছিল না। কিন্তু লেখক এতগুলো চরিত্রকে গল্পে প্রবেশ করিয়েছেন, এটা বাড়তি মনে হয়েছে। ফলে কোনো চরিত্র ঠিকঠাক মেলে ধরতে পারেনি। কিছু চরিত্র কমানো যেত। বিশেষ করে অতীশ চরিত্রের একটা ভূমিকা এখানে প্রয়োজন ছিল।
শেষটা আবেগী। ভালো লেগেছে। মনে কিছু প্রশ্ন জেগেছে। স্পয়লার হওয়ার ভয়ে বলছি না। তবে একটা প্রশ্ন না বললেই নয়। চাইলে এড়িয়ে যেতে পারেন। জলা কেন সায়ানকে একা ফিরিয়ে দিলো। বাকিদের কেন দিলো না? মুদ্রা তো সবার নামেই ছিল। সব মুদ্রা ফেলে দিলে সবাই ফিরে আসত না?
শুনেছি বইটার দ্বিতীয় খন্ড আছে। সেখানে হয়তো উত্তর পাওয়া যাবে। তবে লেখক যেভাবে প্রথম খন্ড শেষ করেছেন। এখানে অভিযোগ করার সুযোগ নেই। ছোট্ট উপন্যাসিকা এভাবেই কিছু প্রশ্ন রেখে শেষ হওয়া এক প্রকার তৃপ্তি দেয়।
বাংলাদেশে খড়ের গাদায় সুচ খোঁজা যতটা কঠিন, তারচেয়েও বেশি কঠিন হচ্ছে একটা "মানসম্মত হরর" বই হাতে উঠানো। তবে তাকরীম ফুয়াদের মতো লেখকদের জন্যই যেনো এখনো বই হাতে ওঠানোর সময় সাহসটা পাই।
মনে করছি বইটা একেবারে ব্লাইন্ডলি পড়লে সবচেয়ে বেস্ট এক্সপিরিয়েন্স হবে। তাই বেশি কিছু বলতে চাচ্ছিনা।
রেটিং আরো বাড়িয়ে দিতাম, যদি চরিত্রদের নাম নিয়ে এত্তো বিধ্বংসী একটা ভুল না করা হতো। পড়ার সময় রীতিমতো প্যাঁচ লেগে যাচ্ছিল প্রায়শই। ধারণা করছি লেখক বইটা লিখা শেষে একজন প্রধান চরিত্রের নাম পাল্টে দিয়েছিলেন, কিন্তু সেটা বইয়ের কিছু জায়গায় পাল্টালেও অধিকাংশ জায়গাতেই পাল্টায়নি।