আলিফ মোহাম্মদ খুন হয়েছেন। উনি যে ধরনের লোক, মানে পেশাগত জীবনে যা করতেন তাতে তার পক্ষে খুন হওয়া আশ্চর্য কিছু না, তবে খুন হবার পরের ঘটনা স্বাভাবিকের চেয়ে একটু আলাদা। খুনের জায়গা থেকে প্রায় হাতেনাতে ধরা পড়ে তারই আপন ভাতিজা। কিন্তু, তার জবানবন্দিতে সে খুনের কথা স্বীকার করেনি।
আড়াই’শ বছর আগে এক মূল্যবান জিনিস বহুদূর থেকে ঘটনাচক্রে আসে দিনাজপুরের মাটিতে। এতগুলো বছর আত্মগোপনে থাকার পর অবশেষে আলোর স্পর্শ কি পাবে সেই মূল্যবান অজানা বস্তু? নাকি কিংবদন্তি আরও কিছুকাল কিংবদন্তি হয়েই থাকবে? সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন সেই জিনিসের সাথে আলিফ মোহাম্মদের খুনের কি কোনো সম্পর্ক আছে? কোনো প্রশ্ন না জেনেই ঈশান পা দেয় দিনাজপুরের মাটিতে। না, দেখতে সুন্দর ছিমছাম এই শহরের বুকে যেন জমে আছে কিছু অজানা কথা, কিছু রহস্য। ঘুঘুডাঙ্গার জমিদার বাড়ির আসল রহস্যের সমাধান করতে হবে তাকে। প্রশ্নগুলো আস্তে আস্তে খুঁজে পায় সে। এবার খুঁজতে হবে উত্তর। কে খুন করেছে আলিফ মোহাম্মদকে? প্রতিশোধ, ব্যাবসা, লোভ, পথের কাঁটা দূর— যে-কোনো কারণই হতে পারে। ঈশান কোনো প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজে পায় না। দিনাজপুরের সরল সমতল জমি ক্রমশ এক গোলকধাঁধা হয়ে উঠছে তার সামনে।
লেখক দিবাকর দাসের দুটো উপন্যাস পড়েছি আমি ইতিমধ্যে। তার লেখা সম্পর্কে তাই আগে থেকেই পরিচিত। নবরত্নে লেখার ধার আগের থেকে অনেক বেড়েছে। গুপ্তধন খোঁজের শেষটা একটু গতানুগতিক নাটকীয়তা পূর্ন মনে হয়েছে। মিথলজি বা ইতিহাসের তথ্য অতিরিক্ত যোগ করার চেষ্টা করেননি লেখক। আবার যতটুকু এসেছে ইন্টারেস্টিং ছিল। সাবলীল বর্ণনায় বলায় গল্পটা দারুণ ব্যস্ততার মধ্যেও পড়ে ফেলেছি। রাশেদ বা ডাক্তারের কৌতুকচরিত্রগুলো সামান্য অতিরিক্ত মনে হলেও খারাপ ছিল না। তবে কিছু কিছু চরিত্রকে, বিশেষ করে খল চরিত্রগুলোকে যতটা গুরুত্ব দেওয়া হলে ভালো হত সেইভাবে তারা ভূমিকা রাখতে পারেনি।
ঈশান সিরিজের প্রথম উপন্যাস 'রূদ্ধদ্বার' পড়া হয়নি। তাতে এটা পড়তে তেমন সমস্যা হয়নি, যেহেতু প্রতিটি উপন্যাস স্ট্যান্ড এলোন। গোয়েন্দা ঈশান রায়কে নিয়ে আলাদা করে বলতেই হয়। আমার অনেক দিনের অভিযোগ ছিল, থ্রিলার লেখকরা পুলিশি গোয়েন্দাদের ব্যবহার করেন ঝামেলা এড়ানোর জন্য। একেবারে সাধারণ কেউ যে আমাদের আশেপাশেই আছে, এমন একজন গোয়েন্দা পাবার আক্ষেপটা এবার মিটলো। ঈশান বুদ্ধিমান ও সতর্ক, কিন্তু অতিমানব নয়। আদিবাসী গ্রামে বল্লম নিক্ষেপে ঈশান তেমন দক্ষতা দেখাতে পারেনি, হম্বিতম্বি বা বুদ্ধির বড়ফাট্টাই দেখায়নি, এই স্বাভাবিকতা’টাই ভালো লেগেছে। ঈশান চরিত্রটিকে অন্য কোনো গোয়েন্দার সাথে কেউ মেলাতে পারবে না এবং এ ব্যাপারে লেখক সচেতন ছিলেন বলেই মনে হয়েছে।
গল্পের পটভূমি ছিল দিনাজপুরের জমিদারবাড়ি। ঈশান দিনাজপুরে আসে খুনের মামলায় অভিযুক্ত বন্ধুর ডাকে, কিন্তু এখানে এসে খুন আর গুপ্তধন - দুই রহস্য চলে সমান্তরালে। 'নবরত্ন'কে একটি নিখাঁদ রহস্য উপন্যাস বলা যায়। হালের থ্রিলারের মত এখানে টানটান একশন নেই, বরং ঈশান যেভাবে সূত্র ধরে রহস্য সমাধান করেছে সেটা উপভোগ করেছি। লেখক গল্পে রাজবংশী গ্রাম, জমিদার বংশ, মিথলজি, খিজির শাহের মাজার, গুপ্তধন শিকারী, নিহত ব্যক্তির পুরোনো শত্রুতাসহ অনেক তথ্য এক করেছেন। যার কিছু প্রয়োজনীয়, কিছু 'ডাইভারশন'। খুনের মোটিভ রাজনীতি, নাকি গুপ্তধন না ব্যক্তিগত সম্পর্ক - এমন মগজ খাটিয়ে রহস্যভেদ করে আনার সুযোগ ছিল পাঠকের।
হুমায়ুন আহমেদ আর সত্যজিৎ রায় দুজনকে খুব মিস করেছি গল্পটা পড়াকালে।
হুমায়ুন আহমেদ প্রায়ই কিছু চরিত্র দেখাতেন, যারা বাড়ির কাজের মেয়েদের প্রতি কিঞ্চিৎ দুর্বল। এই বইয়ে দেখা গেলো একই কাজের মেয়ের প্রতি বংশগত দুর্বলতা চাচা-ভাতিজার,যারা আবার জমিদার ছিলো। কাজের মেয়েরা একটু দুষ্টুবুদ্ধিরই হয়, এ বইয়ের সুরভীও একই। বাড়ির ছেলে তার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে সে তাকে পাত্তা না দিয়ে কি আর চাচার সাথে প্রেম করে নাহলে? যাই হোক, যুগটাই প্রেমের যে যার সাথে মন চায় করুক আমাদের কি। এই লাইনেই তো হুমায়ুন আহমেদকে মনে পড়ে গিয়েছিলো আমার;
"তুমি লতিফকে বিয়ে করে ফেলো। আমি জানি, লতিফ তোমার প্রতি দুর্বল। শুধু দুর্বল বললে ভুল হবে, সে তোমাকে ভালোবাসে। নিশ্চয়ই তুমিও তা জানো।"
দুর্বল হাসলো সুরভী, "যে ছেলের চাচায় আমারে গর্ভবতী করছে, আপনে আমারে সেই ছেলেরে বিয়া করতে বলতাছেন?"
এবার সত্যজিৎ রায়, সত্যি বলছি বিগত কয়েকদিন ধরেই ট্রেজার হান্টিং পড়তে ইচ্ছে করছিলো আমার। কিন্ত কোনো জাতের বই পেলাম না হাতের কাছে এমনকি ফেলুদা সমগ্র দুটো যে কই গেলো, অলস বলেই খুজে বের করতে পারলাম না। সেই কবে কোন স্কুলে থাকতে পড়েছিলাম, "ত্রিনয়ন, ও ত্রিনয়ন—একটু জিরো" ঘুরঘুটিয়ার ঘটনা-বোধ হয়। জীবনে ভুললাম না গল্পটা।
গল্পটার ভালো দিক হচ্ছে, চরিত্রগুলা পুরাই জেনজি। একটা করে সুত্র মিলায় গুপ্তধনের আর চিল করে। অনেকটাই বেখেয়ালি, বরাবরের মতো নায়ক সবচেয়ে স্মার্ট, আর বাকি সবাই কিছু জানেনা। এই বইয়ের আরেকটা স্মার্ট চরিত্র আছে, ভেবেছিলাম শেষের দিকে আবার আসবে কিন্ত সে আর আসেনি। স্মার্টে স্মার্টে ফাইট হলে ভালো লাগতো। শার্লক হোমসের লেস্ট্রেডও তো তবু মাঝেমাঝে শার্লককে গুল খাওয়াতো! টক্কর দিতে চাইতো, কিন্তু এখানের পুলিশরা মুখে স্মার্ট কিন্ত কাজে না, কোনো কিছুই করতে দেখা যায়নাই তাকে। (১/৫)
বিশাল ভারতবর্ষে বিপর্যয় নেমে আসার আগেকার কাহিনি। ১৭২১ সাল চলছে তখন, পঞ্চদশ মোগল সম্রাট মুহম্মদ শাহ-এর রাজত্বকাল। তবে ঘটনা মুহম্মদ শাহকে নিয়ে আবর্তিত হয়নি, হয়েছে দিনাজপুরকে ঘিরে। তৎকালীন সময়ে দিনাজপুরের জমিদার বাড়িকে রাজবাড়ি আর জমিদারদের বলা হতো রাজা। বর্তমানে কাহারোল উপজেলাধীন ঢেপা নদীর তীরে কান্তজিউ বা কান্তজির নামের একটি মন্দির অবস্থিত। কান্তজীউ হলেও কালের পরিক্রমায় বানান শুদ্ধিকরণে নামটা ‘কান্তজিউ বা কান্তজির’ হিসেবে বেশি মানানসই। যা-ই হোক, ❛নবরত্ন❜ উপন্যাসের মূল কাহিনি শুরু এই মন্দিরের স্থাপনা ও স্থাপত্যের পেছনের একটি গূঢ় রহস্যকে ঘিরে।
তৎকালীন রাজবাড়ির ইতিহাসের সবচেয়ে বড়ো জমিদারি ছিলেন রাজা প্রাণনাথ। ১৭০৪ সালে এই কান্তজির মন্দির তৈরি করার পরিকল্পনা তিনি হাতে নেন। কিন্তু কাজটি তিনি সম্পূর্ণ করে যেতে পারেননি। ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দে এই মন্দির নির্মাণ সম্পূর্ণ করেন ওনার পালক পুত্র রামনাথ। ❛নবরত্ন❜ উপন্যাসে সেই কান্তজির মন্দির নির্মাণে যে নয়টি চূড়ার কথা উল্লেখ রয়েছে, সেই চূড়ার সর্বস্তরে একটি রত্ন লুকায়িত রয়েছে। রত্নটির নাম—নবরত্ন। লুকায়িত এই রত্নের পেছনের রহস্য এবং উদ্দেশ্যে সব কিছুই বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা রয়েছে ❛নবরত্ন❜ উপন্যাসে।
রত্ন প্রাপ্তি নিয়ে মিথ, হিন্দু মিথলজি, ১৮৯৭ সালে কান্তজির মন্দির ও জমিদার বাড়ির ক্ষয়ক্ষতি, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং সবশেষে ২০২১ সালের কাহিনি সব এক সুতোয় বেঁধে কান্তজির মন্দিরের মতোই ❛নবরত্ন❜ উপন্যাস নির্মাণ করেছেন লেখক। রহস্য, টুইস্ট, সাসপেন্স এবং গুপ্তধন উদ্ধারের ধাঁধা মিলিয়ে দারুণ একখানা সাবলীল উপন্যাস হচ্ছে ❛নবরত্ন❜।
➤ পাঠ প্রতিক্রিয়া ও পর্যালোচনা—
তিনটি টাইমলাইন মেইনটেইন করে লেখক পুরো গল্প সাজিয়েছেন। তবে ১৭২১ সালের দুইটি অধ্যায় এবং ১৮৯৭ সালের জন্য একটি অধ্যায় খরচ করেন। বাকি আলোচনা, রহস্যের সমাধান এবং গুপ্তধন উদ্ধারের পুরো পরিকল্পনার জন্য বর্তমান প্রেক্ষাপটকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে সবচেয়ে বেশি।
উপন্যাসটি লেখকের ‘ঈশান রায়’ সিরিজের দ্বিতীয় গল্প। প্রথম গল্প ছিল ❛রুদ্ধদ্বার❜। তবে এই গল্পটি একেবারে স্ট্যান্ড অ্যালোন হিসেবে পড়া যাবে; যা আমি কোনো প্রকার জটিলতার সম্মুখীন না হয়ে পড়েছি। তবে ঈশানকে আরেকটু কাছ থেকে জানতে প্রথম উপন্যাসটি পড়াটা হয়তো জরুরি হতে পারে।
ঈশান মূলত দিনাজপুরে একটি খুনের তদন্ত করতে এসে ফেঁসে যায় গুপ্তধনের জালে। খুন ও গুপ্তধন দুটোর মাঝে তেমন কোনো অনুরূপতা একেবারেই ছিল না। গল্পটি মূলত দুইভাগে এগিয়েছে, একটি খুনের তদন্ত আরেকটি গুপ্তধন উদ্ধার নিয়ে। ঈশানের হেল্পিং হ্যান্ড হিসেবে ছিল ইমন এবং রাশেদ।
সম্পর্কের ছন্দপতন, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিশ্বাসঘাতকতা নিয়ে খুনের গল্প তৈরি হলেও অন্যদিকে গুপ্তধন উদ্ধারের জন্য রত্নের পেছনে লুকানো ঘটনা ও হিন্দু মিথলজি নিয়ে গড়া সূত্রের খেলা পুরো গল্পটাকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। ভিলেন থাকলেও গল্প তাদের ক্রিয়া ছিল একেবারেই নির্জীব। যতটা ইমপ্যাক্ট ফেলার কথা ছিল, ততটা একেবারেই ফেলতে পারেনি। বাতাস গা স্পর্শ করে যে-ভাবে চলে যায়, তাদের ক্ষমতা প্রদর্শিত হয়েছে ঠিক সেইভাবে। স্পর্শ করেছে কিন্তু নাড়াতে সক্ষম হয়নি। এ-ছাড়া লেখনশৈলী সাবলীল, বর্ণনাভঙ্গি ভালো তবে আরেকটু গোছানো হলে ভালো হতো। গল্পে হিউমার ছিল, শেষ টুইস্ট সবচেয়ে বেশি মজা লেগেছে। তিনটি টুইস্টের প্রথম দুটো জোড়ালো হলেও শেষটা হিউমারে পূর্ণ ছিল। সবমিলিয়ে ভালো সময় কেটেছে ❛নবরত্ন❜ উপন্যাসের সাথে।
● সূত্রপাত—
গল্প শুরু হয় ১৭২১ সালে রাজা প্রাণনাথ ও মন্ত্রী সুখলালের কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে। কান্তজির মন্দিরে নবরত্ন লুকানোর রহস্য নিয়ে। এর পরপর কাহিনি চলে আসে বর্তমানে। ঈশান রায় দিনাজপুরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয় মূলত বন্ধুর চাচার খুনের রহস্য সমাধান করতে। কিন্তু খুনি হিসেবে পুলিশ পাকড়াও করে ঈশানের বন্ধু লতিফকে! এরপরের কাহিনি না হয় বই পড়ে জানবেন।
● গল্প বুনট—
লেখক খুব সহজভাবে পুরো গল্পের সিকোয়েন্স সাজিয়েছেন। ইতিহাস ও পুরাণের সংমিশ্রণ ছিল একেবারেই মেদহীন। ইতিহাস নিয়ে জ্ঞান কপচানো অথবা পুরাণ নিয়ে লেকচার এইরকম কোনো কিছুই গল্পে যুক্ত করেননি। ঠিক লবণ যতটুকু দিলে তরকারি স্বাদ হবে, ততটুকু ব্যবহার করা হয়েছে। প্রেক্ষাপটে ও গল্পের কাহিনি অনুযায়ী যেটাকে আমি ঠিকঠাক বলব।
যেহেতু লেখকের উদ্দেশ্য ছিল এক বইয়ে দুটো কাহিনির জন্ম দিয়ে, দুইভাবে সেগুলোর সমাপ্তি টানবেন সেই উদ্দেশ্য যে সফল হয়েছে তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। খুনের সাথে গুপ্তধনের যোগসূত্র আছে কী নেই তা আমি বলব না, তবে দুটো সুন্দর সমাপ্তি ঘটেছে। এক্সট্রা আরও একটা সমাপ্তি রয়েছে। সেটা কী বলছি না। সব মিলিয়ে আরাম করে বইটা পড়ে শেষ করা যায়। আর প্লাস পয়েন্ট হিসেবে কিছু ইতিহাস আর পুরাণের জ্ঞান জেনে নিলেন না হয়।
● লেখনশৈলী—
লেখনশৈলী সাবলীল৷ তবে সাল অনুযায়ী পার্থক্য তেমনটা দেখা যায়নি। প্রয়োজনও যে আছে সেইরকম মনে হয়নি৷ কারণ, তিনটে অধ্যায় ছিল শুধু ইতিহাসের টাইমলাইন বর্ণনা করার জন্য। তাই পরিবর্তনের খুব একটা দরকার না হলেও চলে। গল্পে দার্শনিক উক্তি এবং হিউমার দুটোই ছিল; তবে সেগুলো যে বিঘ্ন ঘটিয়েছি তেমনটা একেবারেই মনে হয়নি। কয়েকটি সংলাপ বাদ দিয়ে। লেখায় বাংলিশ, কথায় কথায় ইংরেজি উক্তি একেবারে নেই বললেই চলে। এইটি ছিল আকর্ষণের আরেকটি দিক।
● বর্ণবিন্যাস—
পারিপার্শ্বিক বর্ণনা এবং চরিত্রের ভাবনা দুটোই গল্পে স্পষ্টভাবে উল্লেখিত রয়েছে। যেহেতু গঠনবৈশিষ্ট্য নিয়ে বেশকিছু আলাপচারিতা হয়েছে এবং সেই অনুযায়ী কাজও হয়েছে—সেই দিক থেকে বর্ণবিন্যাস ঠিকঠাক লেগেছে। তবে কিছুক্ষেত্রে চাইলে লেখক আরেকটু পোক্ত ছাপ রাখতে পারতেন। সেটাও সীমিত কিছু বাক্যে। আশা করি ফাইনাল সম্পাদনার পর টুকটাক যা অসংগতি দেখা গিয়েছে, সব ঠিক করা হবে।
● চরিত্রায়ন—
নির্দিষ্ট চরিত্র এবং আনাগোনা চরিত্রের মেলবন্ধনে মূল চরিত্ররা পুরো গল্পে জুড়ে নিজেদের কার্যকারিতা বজায় রেখেছে। অ্যান্টাগোনিস্টের ক্ষমতা নিরাশাজনক এবং রাশেদের কিছু কার্যকলাপ কিছুটা বিরক্তির উদ্রেক ঘটিয়েছে বটে। সিরিয়াস টাইমগুলোতে এমন রসিকতা অপরিপক্বতার লক্ষণ। ক্যারেক্টর বিচারে ঠিকঠাক হলে, ভদ্রতা অনুযায়ী বা শেখানোর পদক্ষেপে কিছুটা বেমানান মনে হয়েছে।
ঈশান রায় চিরাচরিত গোয়েন্দাদের থেকে কিছুটা ভিন্ন। একেবারে সুপার হিউম্যান বা সবজান্তা ট্যাগ নিয়ে চলার মতো সত্যান্বেষী না। স্বাভাবিক বুদ্ধি এবং বিচক্ষণতার পরিসীমা নির্দিষ্ট একটি গণ্ডি পর্যন্ত আবদ্ধ ছিল। বাকি হচ্ছে ইমন, যে ইতিহাসে আগ্রহ আর ব্লগে সেইসব নিয়ে লেখালিখি করে ভাইরাল ও জনপ্রিয়তা অর্জন করতে চাইছে। নথি বিশেষক এই ক্যারেক্টর ভালোই লেগেছে।
কিছু ক্যারেক্টর অপ্রয়োজনীয়ও ছিল। অর্থাৎ গল্পে না ঢুকালেও চলত টাইপ।
● অবসান—
শেষটা ভালো। গতানুগতিক তবে হালকা ধাক্কা খাওয়ার মতো অনুভূতি হবে। তিনটে টুইস্ট, সাসপেন্স বা প্রশ্নের উত্তর অনুযায়ী। প্রথম টুইস্ট ওকে, লজিক রয়েছে। দ্বিতীয়টা নাটকীয় এবং শেষটা হিউমারে পূর্ণ।
➣ লেখক নিয়ে কিছু কথা—
দিবাকর দাদার প্রথম কোনো বই পড়া। তা-ও প্রকাশের পূর্বে৷ অভিজ্ঞতা মিষ্টি। ভালো কেটেছে পুরো জার্নিটা। পাঠকবৃন্দ বইটি পড়ে মজা পাবে৷ পরবর্তী ঈশান রায়ের তদন্তের অপেক্ষায়। লেখকের জন্য শুভকামনা রইল। আরও ভালো ভালো কাজ উপাহার দিতে থাকুক আমাদের।
ঈশান রায় সিরিজের প্রথম বই 'রুদ্ধদ্বার ' চেয়ে দ্বিতীয় বই 'নবরত্ন 'বেশ গোছানো ছিলো। কান্তজিউর মন্দিরের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে সেই সাথে দিনাজপুরের প্রামান্যচিত্র। বইটা পড়ার পর দিনাজপুর অঞ্চল ঘুরে দেখার জন্য মাথাব্যথা শুরু হয়ে গেছে।
দিনাজপুরের ঘুঘুডাঙ্গা নিবাসী আলিফ মোহাম্মদ খুন হয়েছেন। মাছ ধরার ট্যাঁটা বা কোঁচ ছুঁড়ে আঘাত করে খুন করা হয়েছে তাঁকে। খুন হওয়া আলিফ মোহাম্মদকে সাদাসিধা বা ভালো মানুষ কোনটাই বলার সুযোগ নেই৷ সারাজীবন ধরে দুই নাম্বার ব্যাবসা করা এই মানুষটার পরিণতি বোধহয় এমনটাই হওয়ার কথা ছিলো। সমস্যাটা বাধলো অন্য জায়গায়। আলিফ মোহাম্মদকে খুনের দায়ে গ্রেফতার করা হলো তাঁরই আপন ভাতিজা লতিফ মোহাম্মদকে। খুনের পেছনে লতিফের মোটিভ আর এভিডেন্স, দুটোই বেশ পোক্ত।
একসময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু লতিফ খুনের দায়ে গ্রেফতার হওয়ায় তাকে সাহায্য করতে দিনাজপুর ছুটলো তরুণ গোয়েন্দা ঈশান রায়। এই যাত্রায় তার সঙ্গী হলো দুই বন্ধু ইমন আর রাশেদ। দিনাজপুরের ঘুঘুডাঙ্গায় পৌঁছে ঈশান জানতে পারলো ব্যাপারটা শুধু আলিফ মোহাম্মদের খুনের মধ্যেই আটকে নেই৷ বরং ঘুঘুডাঙ্গার জমিদার পরিবারের শেষ উত্তরাধিকারী লতিফের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া একটা ধাঁধাও এসবের সাথে জড়িত। বন্ধুকে সাহায্য করতে এসে ঈশান টের পেলো রহস্যটা ক্রমেই যেন আরো ঘনীভূত হচ্ছে।
আড়াইশো বছরেরও আগে দিনাজপুরের রাজা প্রাণনাথের হাতে এসেছিলো এমন এক অনন্যসাধারণ রত্ন, যেটা স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরীর থেকে খসে পড়া বলে জনশ্রুতি আছে। সেই সময়ের বাংলার শাসক মুর্শিদকুলী খানের নজর এড়িয়ে সেই মহামূল্যবান রত্নটাকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলেন রাজা প্রাণনাথ? আর এসবের সাথে পুনর্ভবার তীরে তাঁর প্রতিষ্ঠা করা কান্তজিউ মন্দিরের নবরত্ন চূড়ারই বা সম্পর্ক কি?
খুনের অভিযোগে ফেঁসে যাওয়া লতিফ মোহাম্মদকে সাহায্য করার জন্য পুরো দিনাজপুর চষে ফেলতে লাগলো গোয়েন্দা ঈশান রায়। এদিকে ঘুঘুডাঙ্গার জমিদারদের ধাঁধার পেছনে পড়ে আছেন এক স্বনামধন্য আর্কিওলজিস্ট। আলিফ মোহাম্মদের খুনের সাথে তাঁর কি কোন সম্পর্ক আছে? ধীরে ধীরে ঈশান যখন রহস্যের জট ছাড়ানোর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছালো, জানতে পারলো মানুষের ভেতরের অন্ধকার তাকে কতোটা অন্ধ করে তুলতে পারে।
লেখক দিবাকর দাস সৃষ্ট গোয়েন্দা ঈশান রায় বিষয়ক দ্বিতীয় বই 'নবরত্ন'। এবারের আখ্যানে ঈশান রায়কে গোয়েন্দা হিসেবে আরো খানিকটা পরিণত হিসেবে দেখিয়েছেন দিবাকর দাস। তার গোয়েন্দা সুলভ আচার-আচরণেও দেখা গিয়েছে আরো খানিকটা বেশি পরিপক্কতা। গোয়েন্দা ঈশান রায়ের এবারের কেসটাও একটা মার্ডার মিস্ট্রি। তবে এর সাথে উপরি পাওনা হিসেবে যোগ হয়েছে কিংবদন্তির এক আখ্যান আর তার সাথে সম্পর্কিত ট্রেজার হান্টের ব্যাপারটা। মার্ডার মিস্ট্রি আর ট্রেজার হান্টকে মিলিয়ে লেখক দিবাকর দাস 'নবরত্ন' উপন্যাসের কাহিনিটাকে সামনে টেনে নিয়ে গেছেন।
ডিটেকটিভ থ্রিলার হিসেবে 'নবরত্ন'-এর প্লট গোয়েন্দা ঈশান রায় সিরিজের প্রথম উপন্যাস 'রুদ্ধদ্বার'-এর চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় লেগেছে আমার কাছে। এটার কারণ গোয়েন্দা ঈশান রায়ের খুনি খুঁজে বের করা আর গুপ্তধনের সন্ধান একই সমান্তরালে চালানো দেখার আগ্রহ থেকে এসেছে সম্ভবত। 'নবরত্ন'-এর শুরুতে কাহিনি বেশ গতিশীল মনে হয়েছে। তবে সামনে এগোনোর সাথে সাথে বেশ কয়েকবার কাহিনি ঝুলে গেছে এমনটাও মনে হয়েছে। দিনাজপুর জেলার ইতিহাস, কান্তজিউ মন্দির নির্মাণের কাহিনি আর আদিবাসী রাজবংশীদের সম্পর্কে দিবাকর দাস তাঁর এই উপন্যাসে বেশ চমৎকার একটা ধারণা দিয়েছেন। ভালো লেগেছে মার্ডার মিস্ট্রিতে দেখানো দানবাক্সের অ্যাংগেলটাও। লেখক বেশ স্মার্টনেসের সাথে এক্সিকিউট করেছেন এই জায়গাগুলো। তবে 'নবরত্ন'-এর শেষটা আমার কাছে আশানুরূপ ভালো লাগেনি। ওভারঅল যদি বলি, তাহলে এটাকে দিবাকর দাসের আরো একটা অ্যাভারেজ টাইপ থ্রিলার মনে হয়েছে আমার কাছে।
পুরো উপন্যাস জুড়ে লেখক একটা কথা বারবার বলে গেছেন। সেটা হলো, খুন হওয়া আলিফ মোহাম্মদ দুই নাম্বার ব্যাবসা করতেন। এই দুই নাম্বার ব্যাবসার কথা প্রায় পুরো উপন্যাস জুড়ে থাকলেও সেই ব্যাবসাটা আসলে কি রিলেটেড, সেটা সম্পর্কে কোনকিছুই খোলাসা করেননি দিবাকর দাস। এই ব্যাপারটা আমার কাছে একটা মাইনাস পয়েন্ট বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। কিছু জায়গায় খেয়াল করেছি দিনাজপুরের লোকাল মানুষজন ঢাকার ভাষায় কথাবার্তা বলছে। উত্তরাঞ্চলের একটা শহরের লোকাল মানুষজন কেন ঢাকাইয়া ভাষায় কথা বলবে, এটা আমার কাছে স্পষ্ট না। ট্রেজার হান্ট আর ফাঁদ রিলেটেড কিছু ব্যাপারস্যাপার একটু বেশিই সিনেম্যাটিক আর আরোপিত মনে হয়েছে আমার কাছে। তবে কমিক রিলিফ হিসেবে ঈশানের বন্ধু রাশেদের কর্মকাণ্ড বেশ উপভোগ্য লেগেছে পুরো উপন্যাস জুড়ে। বেশ কয়েক জায়গায় জোরে হেসে উঠেছি রাশেদের কাণ্ডকীর্তির কথা পড়ে। ঈশান রায় বিষয়ক পরবর্তী উপন্যাসগুলোতেও এই রাশেদ চরিত্রটাকে আবারও দেখতে চাইবো একজন পাঠক হিসেবে আমি।
'নবরত্ন'-কে একটা অ্যাভারেজ ডিটেকটিভ থ্রিলার মনে হয়েছে আমার কাছে। ওয়ান টাইম রিড হিসেবে পড়ে দেখতে পারেন। দিবাকর দাস চেষ্টা করছেন ঈশান রায় নামের বাঙ্গালী গোয়েন্দা চরিত্রটাকে পাঠকদের সামনে গ্রহণযোগ্য ভাবে তুলে ধরতে। সেই চেষ্টা ধীরে ধীরে আরো সফলতা লাভ করবে আশা করি। পরাগ ওয়াহিদের করা প্রচ্ছদটা মোটামুটি ভালোই লেগেছে। বইটার প্রোডাকশনও ছিলো চমৎকার।
ঈশান রায়, #১ বেশি ভালো ছিলো। কিন্তু কেনো জানি বইটা ভালো লাগে নাই। সব থেকে বেশি বিরক্ত লেগেছে পিউ এর ব্যাপারটা, গল্পের মাঝে মাঝে এই পিউ এর ব্যাপার নিয়ে আসা খুব বিরক্ত লেগেছে আমার। সাথে শেষে খুন কে করেছে সেটা বের হয়েছে কিন্তু খুনির কি হলো তার কথা নাই।
আলিফ মোহাম্মদ নামক এক লোক খুন হয়ে গেলেন। জমিদার বাড়ির বংশধর এই লোকের খুনের দায়ে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হলো তারই আপন ভাতিজা লতিফ মোহাম্মদকে। কিন্তু লতিফ কিছুতেই স্বীকার করছে না যে সে খুন করেছে। সাহায্যের জন্য এগিয়ে গেলো এক সময়ের সহপাঠী ঈশান রায়। খুনের রহস্যের পাশাপাশি সমাধাণ করতে হবে এক গুপ্তধন উদ্ধার করার ধাঁধার। যে ধাঁধার সাথে জড়িয়ে আছে স্বয়ং মহাদেবের নাম। নবরত্ন নামক এই গুপ্তধনের সাথে কি সম্পর্ক আলিফ মোহাম্মদের খুনের??
#পর্যালোচনাঃ বইটা একদম শুরু থেকেই আমাকে হুকড করে রেখেছিলো। কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের সাথে বর্তমানের রহস্যের সেতুবন্ধন, এই ধরণের গল্প সব সময়েই আমাকে বেশ টানে। এই গল্পটাও তার ব্যতিক্রম নয়। সাথে ছিলো লেখকের মেদহীন ঝরঝরে লেখনশৈলী। আগের বই রূদ্ধদ্বার শুরুতে বেশ ধীর গতির হওয়ার যে সমালোচনাটুকু পেয়েছিলো এই বইয়ে তা সম্পূর্ন অনুপস্থিত। শুরুতে কান্তিজিউর মন্দির নির্মান এবং দেবতাদের যুদ্ধ থেকে পাওয়া "নবরত্ন" হারিয়ে যাওয়ার রহস্যটুকু খুব সামান্য পরিমাণে থাকলেও যথেষ্টই আগ্রহোদ্দীপক। এরপর শুরু হয় দিনাজপুরে ঘটে যাওয়া খুনের রহস্য উদঘাটনে ঈশানের জার্নি। ঈশানের সাথে এবার যুক্ত হয় তার দুই বন্ধু। বন্ধুদের খুঁনসুটির পাশাপাশি একাধারে চলা দুটো রহস্যের সমাধাণ পড়তে কখনোই বিরক্ত লাগেনি আমার। একভাগে চলছিলো আলিফ মোহাম্মদের খুনের তদন্ত। যেখানে পুলিশের ভূমিকা, খুনের মোটিভ, তদন্ত করার প্রক্রিয়া সবই বেশ আকর্ষনীয় ভাবে লিখেছেন লেখক।অপরদিকে সমান্তরালে চলছিলো গুপ্তধনের সংকেত উদ্ধারের প্রচেষ্টা। এটা কিছুটা গতানুগতিক হলেও ভালোই লেগেছে আমার কাছে। এর বাইরে রাজবংশীদের গ্রামের উৎসবের সিকুয়েন্সটুকুও পড়তে ভালো লেগেছে।
তবে এতো এতো ভালো লাগার উপলক্ষ্য থাকার পরেও বইটাকে আমি হতাশাজনক বলবো। এর কারন হলো বইয়ের এন্ডিং। বইয়ের শেষটা হয়েছে বেশকিছু প্রশ্ন এবং অসঙ্গতি রেখে দিয়ে। নিচে সেগুলো উল্লেখ করছি, তবে যারা বইটি এখনো পড়েননি তাদের উচিত হবে এই অংশটুকু এড়িয়ে যাওয়া।
***স্পয়লার এলার্ট***
০১। পিউ নামের এক মেয়েকে নিয়ে লেখক সম্ভবত বইয়ে হাস্যরসের উপাদান দিতে চেয়েছেন পাঠকদেরকে। যেটা একদমই ভালো লাগেনি।
০২। যে চায়ের দোকান থেকে দানবাক্সের মাধ্যমে যোগাযোগের ব্যবস্থার ব্যাপারে নিশ্চিত হয় ঈশান। সেই জায়গায়টাকে লেখক জনবিরল এবং শুনশান এলাকা হিসাবে উল্লেখ করেছেন। জায়গাটা এতোটাই আড়ালে যে সেখানে এমনকি রিকশাও পাওয়া যায় না। ঘুঘুডাঙ্গা এলাকা থেকে যে রিকশা নিয়ে ঈশান সেখানে পৌছায় সেই রিকশাওয়ালা পর্যন্ত অবাক হয়ে যায় যে শহর থেকে আসা লোক এখানে কেনো এলো!! তো এমন জনবিরল এলাকায় একটা এনজিও অফিস থাকা কি স্বাভাবিক? আচ্ছা ধরে নিলাম এটা হলেও হতে পারে, তাই বলে সেখানে সিসি ক্যামেরাও থাকবে?? যতোই বলা হোক এনজিও গুলোর ফান্ডে অনেক টাকা পয়সা থাকে তবুও অমন বিরান জায়গায় এটা কি একটু বেশী হয়ে গেলো না?? সেই সিসি ক্যামেরার ফুটেজ আবার ঈশান কোনো পরিচয়পত্র ছাড়া স্রেফ মুখে পুলিশের লোক বলেই এক্সেস নিয়ে নিলো!! এই জায়গাটুকু আসলে আমার কাছে সেই ধরণের "কাকতালীয়" ব্যাপার বলে মনে হয়েছে, যেখানে এসে লেখক ঠিক গুছিয়ে উঠতে পারছিলেন না কিভাবে সমাধান দিবেন, তাই এই পুরো বিষয়টার অবতারণা করেছেন। এছাড়া সেই ফুটেজ দেখেই ঈশান নিশ্চিত হয়ে যায় খুন কে করেছে, অথচ তার হাতে তখনো অকাট্য কোনো প্রমাণ নেই!
০২। রীতিমতো পড়াশোনা করা প্রখ্যাত একজন আর্কিওলজিস্ট যে ধাঁধার এক বিন্দুও ধরতে পারলো না, সেখানে ঈশান গোয়েন্দা হয়ে সব বুঝে ফেললো?? যদিও ঈশানের কোড ভাঙ্গার যুক্তিগুলো ভালোই লেগেছে পড়তে। তবুও এমনকি হিন্দু মিথোলজির উপর যার কোনো জ্ঞ্যন নেই, তার এই কোড ভাঙ্গার ব্যাপারটা ভালো মনে হয়নি। এবং ৬ প্যারার এই ধাঁধার মধ্যে প্রথম ৫ প্যারার সুন্দর সমাধান দেয়া হলেও, শেষ অংশের কোনো সমাধাণ দেয়া হয়নি। মহাদেবের বর ছুঁতে মানা করা হয়েছে, তারমানে এটা ভিন্ন কোনোভাবে হয়তো উদ্ধার করতে হতো। অথচ বইয়ে রিজোয়ান হায়দার সেটা ছোঁয়ার কারনে তার হাতে লোহার পিন ঢুকে গেলেও সে কিন্তু ঠিকি নবরত্ন বের করে আনতে পারে। ব্যাপারটা এমন হওয়ার কথা ছিলো না, এটা ধরতে গেলে আঘাত প্রাপ্ত হবে, তাই এটাকে ভিন্নভাবে উদ্ধার করতে হবে এমন হলে ভালো হতো৷
০৪। সবচেয়ে বড় কথা বইয়ের মূল খুনের রহস্যের সাথে এই গুপ্তধনের রহস্যের দূরতম কোনো সম্পর্কই নেই। মানে এই পুরো ব্যাপারটাকে এমনকি একটা সাব প্লট হিসাবেও বলা যাচ্ছে না। কারন সাব প্লট কোনো না কোনোভাবে মূল প্লটের সাথে গিয়ে মিলবে এমনটাই হয়। এখানে তার ছিটেফোঁটাও ছিলো না। যদিও এনজয়েবল ছিলো গুপ্তধনের রহস্যটা, তবুও এটা আরোপিত মনে হয়েছে।
০৫। তবে উপরের কোনোটাই নয়, সবচেয়ে হতাশ হয়েছি আমি বইটার লজিক্যাল কোনো এন্ডিং না পেয়ে। খুনী কে সেটা ঈশান বের করেছে খুবই বুদ্ধিমত্তার সাথে। কিন্তু সেই খুনীর ব্যাপারে পুলিশকে ঈশান কোনো ধরণের ইনফরমেশন দেয় না। শুরু থেকে পুলিশের প্রাইম সাসপেক্ট হিসাবে থাকা লতিফকে পুলিশ কেনো মামলা থেকে অব্যহতি দিবে তার কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। খুনের সময়ে তাকে সেখানে দেখা গিয়েছে, এবং খুনের অস্ত্রেও তার আঙুলের ছাপ আছে। তারপরেও ধরে নিলাম লতিফ কোনোভাবে সন্দেহের বাইরে চলে যায়, কিন্তু সেক্ষেত্রে এই খুনের কেস পুলিশ কিভাবে সমাধাণ দিবে?? মাঝে একবার লতিফকে আবারো পুলিশের সাথে যোগসাজশ করে গ্রেফতার করায় ঈশান। কিন্তু সেখানেও পুলিশকে একচুয়েলি কি বলে এই নাটক করতে রাজী করিয়েছে ঈশান তা বলা হয়নি। যেখানে ইন্সপেক্টর শুরু থেকেই লতিফকে নিশ্চিত খুনী ধরে রেখেছে, সেখানে তারা কেনো এই নাটকে অংশগ্রহণ করলো তার ব্যাখ্যা দেয়ার দরকার ছিলো। এছাড়া কালুকে কে খুন করলো কেনো খুন করলো?? ৩ জন সাসপেক্টের একজন সুরুজ হোসেনকে নিয়ে বেশ জলঘোলা করা হলো, অথচ তারও কোনো ধরণের ব্যাখ্যা নেই!!
বইটা এক নিমিষে পড়ে যাওয়ার মতো। আপনি পুরো বই বেশ আগ্রহ নিয়ে পড়বেন আর আশা করবেন শেষে এসে সব সুতো জোড়া লাগানো হবে সুন্দরভাবে। কিন্তু সেটা না হয়ে যদি উলটো এমন সব অসংগতি আর প্রশ্ন নিয়ে শেষ হয় তাহলে আক্ষেপ থেকে যায়। আর সেই আক্ষেপের কারনেই; বইটা পড়ার সময় যতোটা তৃপ্তি নিয়ে পড়েছিলাম, বইটা শেষ করার পর সেই তৃপ্তির ছিঁটেফোঁটাও অবশিষ্ট ছিলো না।
#প্রোডাকশনঃ এই জায়গায় প্রথমেই বলতে হয় বইটার চমৎকার প্রচ্ছদের কথা। প্রাচীন জমিদার বাড়ির ভাইবটা বেশ সুন্দরভাবে ফুটিয়েছেন সজল ভাই। তবে স্পাইনের অংশটুকুতে আগের বইয়ের মতো একটু ভিন্ন কিছু থাকলে দেখতে আরো ভালো লাগতো। বইয়ে মূদ্রণ প্রমাদ তেমন না থাকলেও পুলিশের ইন্সপেক্টরের নাম "হাসিবসাহেব" লেখাটা বেশ চোখে লেগেছে। এখানে হাসিব এবং সাহেবের মাঝে একটা স্পেস থাকা দরকার ছিলো। বাঁধাই পেইজ কোয়ালিটিও ভালো ছিলো।
#রেটিংঃ ৬/১০ (রূদ্ধদ্বার আর এই বইয়ের রেটিং একই। রূদ্ধদ্বারে পড়ার সময়ে যে অতৃপ্তি ছিলো, শেষ করার পর তা কেটে গিয়েছিলো। আর এই বইটায় তার উলটো হলো। পড়ার সময় যতোটা আনন্দ পাচ্ছিলাম, পড়া শেষে ততটাই হতাশ হলাম)
#পরিশিষ্টঃ ঈশান রায়ের শুরুটা খুব একটা মসৃন হলো না। তবে লেখকের লেখনশৈলী খুবই চমৎকার। দরকার শুধু রহস্যের সমাধাণে আরেকটু পরিপক্কতার। আবারো শুভকামনা লেখকের প্রতি। ঈশান প্রয়োজনে আরো অনেকদিন পরে ফিরে আসুক, তবে শক্তভাবে আরো পরিণত হয়ে ফিরে আসুক এটাই কামনা।
This entire review has been hidden because of spoilers.
ঈশান রায় সিরিজের কনসেপ্টটা দারুণ লেগেছে — দেশের ভিন্ন ভিন্ন জেলায় ঈশান ছুটে বেড়াচ্ছে রহস্য সমাধানের জন্য। ঠিক তেমনই নবরত্ন বইটির প্রেক্ষাপট জুড়ে রয়েছে দিনাজপুর। দিনাজপুর শহর, লাইব্রেরি, জমিদার বাড়ি, কান্তজিউ মন্দির, রাজবংশী গোষ্ঠী — অনেক কিছুই লেখক তুলে নিয়ে এসেছেন। দিনাজপুরের বিখ্যাত মুগডালের পাপড় আমার খুব পছন্দের, সেই ছোটবেলা থেকেই। নবরত্ন বইটি পড়ার সময় আগ্রহ নিয়েই অপেক্ষা করছিলাম যে লেখক পাপড়ের বিষয়টি লেখায় আনবেন কিনা। হ্যাঁ, পাপড় খুঁজে পেয়েছি। তবে এরকমই আগ্রহ নিয়ে পড়েছিলাম পুরো বইটাই — পড়তে ভালোই লাগছিল এবং ভালো লাগছিল বলেই শেষটায় হতাশও ভালোই হয়েছি।
একটা পুলিশ কেসে পুলিশের যেন কোনো ভূমিকাই নেই। তদন্তের ব্যাপারে তথবৈচ, পুরোটাই যেন ঈশানের ভরসায়। উপরন্তু কেসের খুব গোপনীয় তথ্যও নির্দ্বিধায় এমনভাবে ঈশানের সাথে শেয়ার করেছে যেন তারা ঈশানের হয়েই কাজ করছে। খুবই রিডিকুলাস! এই দুর্বলতার জন্যই অনেকখানি পিছিয়ে গেছে বইটা।
আরেকটা খুবই আপত্তিজনক ব্যাপার হলো — খুনী কে সেটা বের করার পর তাকে সেফ এক্সিট দেওয়া। পুলিশকে জানানোরও প্রয়োজন বোধ করেনি ঈশান। ব্যোমকেশের একটি বইতে ব্যোমকেশ খুনীকে সেফ এক্সিট দিয়েছিল — যদিও সেটা পোয়েটিক জাস্টিস বলেই। কিন্তু এখানে সেরকম ব্যাপার নেই। গোয়েন্দা হিসেবে ঈশানের এটি করা মোটেও উচিত হয়নি। শেষের এই ব্যাপারটি একদমই ভালো লাগেনি। বইটাকে খেলো বানিয়ে ফেলেছে।
ঈশান চরিত্রটি বেশ আশা-জাগানিয়া। বেশ প্রখর বুদ্ধির। ভালো লেগেছে। এই বইতে মূল রহস্যের গোড়াপত্তন খুন নিয়ে হলেও, আরেক সাবপ্লট ছিল — গুপ্তধন। দুটোর মধ্যে মিল নেই তেমন, তবে প্লটের এই ব্যাপারটা ভালো লেগেছে।
পিউ চরিত্র দিয়ে লেখক যে হাস্যরস সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন, তা খুবই নিম্নমানের। গল্পের ফ্লো নষ্ট করেছে বারবার।
.
ঈশান চরিত্র নিয়ে আমি আশাবাদী। আরও দুর্দান্ত রূপে দেখতে চাই তাকে। এই বইতেও ঈশান দুর্দান্ত, কিন্তু আশেপাশের অনেক কিছুর কারণে বইটি পিছিয়ে গেছে।
তাই লেখকের কাছে অনুরোধ — আশেপাশের বিষয়গুলোতেও যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়ার জন্য। নয়তো ঈশান দুর্দান্ত হয়ে উঠলেও, বই দুর্দান্ত হবে না।
স্বপ্ন কি? স্বপ্ন কি কেবল তাই যা আমরা ঘুমিয়ে দেখি? নাকি স্বপ্ন এমন কিছু যা আমাদের বেঁচে থাকার আগ্রহ ক্রমশ বৃদ্ধি করে? সদ্য একজন ভার্সিটি পাশ করা বেকারের কি স্বপ্ন থাকতে পারে?
ঈশান রায়। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড থেকে দর্শন বিভাগে পাশ করে বের হওয়া যুবক যে বহুবার চাকরি পরিক্ষায় অংশ নিয়েও উত্তীর্ণ হতে পারে নি। হঠাৎ একদিন মাথার উপরে থাকা বাবা নামক বটগাছের বিয়োগান্তে তার টনক নড়ে এই ভেবে যে তার স্বপ্ন কোনো সরকারি চাকরি নয়, বরং এমন কিছু যা তার বাবা তাকে ছোটবেলা থেকে শিখিয়েছেন। বাবার দেখানো সেই পথ ধরেই ঈশানের সি.আই.ডি-তে যোগ দেওয়া।
ঈশান কি পারবে তার বাবার স্বপ্ন; তার নিজের স্বপ্ন পূর্ণ করতে!! জানতে হলে পড়তে হবে দিবাকর দাস-এর ঈশান সিরিজ; রুদ্ধদ্বার ও নবরত্ন।
লেখক সদ্য ভার্সিটি পাশ করা বেকার যুবকের চোখ দিয়ে গোটা যুবক সমাজকে তুলে ধরেছেন। জীবনের সবচেয়ে প্রিয়মানুষের বিয়োগান্ত থেকে তার শোক কাটিয়ে উঠার মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন একজন সাধারণ যুবকের অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। যার দ্বারা সে সমাধান করেছেন একের এক সমস্যা এবং আবিষ্কার করেছেন "নবরত্ন"
ইতিহাসের শতভাগ সত্য আমরা কখনোই জানতে পারি না। কিছু জিনিস রয়েছে যা বইয়ের পাতায় বন্দী হওয়া উচিত নয়। কারণ ইতিহাস অনেক কিছুই নিজের মধ্যেই রাখতে চায়, শুধুমাত্র নিজের মধ্যেই। তবু কথায় আছে না, সত্য কখনো চাপা থাকে না! এমনই কোনো গুপ্ত জিনিসের কথা হঠাৎই আপনার সামনে আসলে আপনি কী করবেন?
১৭২১ সাল। দিনাজপুরের মহারাজ কান্তজিউর নামক মন্দির প্রতিষ্ঠার সময় হঠাৎই খুঁজে পান ইতিহাসের এক অমূল্য রত্ন। কিন্তু এই প্রাপ্তির পর আনন্দের চেয়ে বেশি চিন্তা চেপে বসল মহারাজের মাথায়৷ এই রত্নপ্রাপ্তির কথা বাইরে গেলে যখন-তখন যে কেউ আক্রমণ করে বসতে পারে সেটার জন্য। এখন একটাই উপায়, মন্ত্রী সুখলালের পরামর্শ। মহারাজ সুখলালকে ডাকলেন এবং পুরো বৃত্তান্ত খুলে বললেন। সবকিছু শোনার পর সুখলাল দিলেন এক গোপন পরিকল্পনা। কান্তজিউর মন্দিরের আরেক নাম হল নবরত্ন মন্দির।
আলিফ মোহাম্মদ দিনাজপুরের অদূরে থাকা ঘুঘুডাঙ্গার বেশ কুখ্যাত লোক। সেদিন রাতে পরিত্যক্ত জমিদার বাড়িতে তার কোনো অতি গোপন কাজ ছিল। কী কাজ, তা আলিফ মোহাম্মদই ভালো জানতেন। অন্ধকার সামান্য ঘনিয়ে আসতেই কাঁচের উপরে রঙিন কাগজ লাগানো টর্চ নিয়ে তিনি হাঁটা দিলেন জমিদার বাড়ির পানে। এই জায়গাটা এখন ঘাস লতাপাতায় পরিপূর্ণ। চলতে গেলে সেসব মাড়িয়ে যেতে হয়।
যে জিনিসটার খোঁজে আলিফ মোহাম্মদ এখানে এসেছিলেন তা তিনি টর্চের আলো ফেলে খুঁজতে লাগলেন। একসময় তার চোখে পড়ল সেই পাথরটি। খুবই সাবধানে আস্তে আস্তে পাথরটা তুলতে লাগলেন তিনি। তখনই তার অভ্যস্ত কান বুঝতে পারল, সে ফাঁদে পা দিয়েছে। সোজা হয়ে দাঁড়ানোর আগেই কেউ সজোরে ছুঁড়ে মারল মাছ ধরার একটি কোচ। কোচের ফলাগুলো আলিফ মোহাম্মদের পেট এফোঁড়ওফোঁড় করে দিল। একটি চিৎকার দিয়েই নেতিয়ে পড়ল আলিফ মোহাম্মদের দেহ। আর তখনই সেখান থেকে ধুপধাপ শব্দ করে পালিয়ে গেল কেউ।
বই পড়ছিল ঈশান। দুপাতা পড়তেই রাশেদ এসে উপস্থিত হল। বন্ধুরা বাসায় আসলে ঈশানের ভালোই লাগে এখন। মোটামুটি ঈশানের বাসাটাই এখন তাদের অন্যতম আড্ডাখানা। রাশেদের সাথে কিছু অপ্রয়োজনীয় কথা বলতেই ঈশানের ফোন বেজে উঠল। ওপার থেকে শোনা গেল দিনাজপুরের বন্ধু লতিফ মোহাম্মদের ভয়ার্ত কন্ঠ।
পুলিশ লতিফকে তার চাচার হ*ত্যাকারী বলে গ্রেফতার করেছে। যেই কোচ দিয়ে তার চাচাকে মা রা হয়েছে সেই কোচটা লতিফেরই। আর এলাকার মানুষজন মৃ ত দেহের কাছে সর্বপ্রথম লতিফকেই খুঁজে পেয়েছে। তাই পুলিশ লতিফকেই এখন খু নি ভাবছে।
আর কিছু বলার আগেই ফোন কেটে গেল৷ চিন্তিত মুখে ঈশান ফোন দিল এক জায়গায়। যে কাজের জন্য ফোন দিল তা মুহূর্তেই হয়ে গেল। এখন দিনাজপুর যাবার পালা। লতিফকে জেল থেকে বের করতে হবে। তারপর পুরো ঘটনাটার তদন্ত করতে হবে।
◼️ পাঠপ্রতিক্রিয়া (স্পয়লার থাকতে পারে) :
এই বইয়ে দুটো গল্প ফাঁদা হয়েছে। একটা হচ্ছে আলিফ মোহাম্মদের খু নে র তদন্তের, আরেকটা হল গুপ্তধন উদ্ধারের। দুটো গল্প বললে ভুল হবে। আসলে গল্প একটাই। তদন্তের পাশাপাশিই গুপ্তধন উদ্ধারের কাজটা চলে।
অনেক সময় দেখা যায় পাঠক ডিটেকটিভ উপন্যাস পড়তে গিয়ে বিরক্তবোধ করে গল্প বেশি লম্বা হওয়ার কারণে, যদি না গল্পটা লেখক ভালোভাবে ফাঁদে। এই বইয়ে লেখক এই জায়গায় সফল। তদন্তের ভেতরেই খুবই সূক্ষ্মভাবে গুপ্তধনকে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। যার দরুন গল্পের প্রতি পাঠকের আলাদা একটি আকর্ষণ কাজ করবে এবং পাঠককে গল্পে ধরে রাখবে।
এই সিরিজের পূর্বের বইয়ের তুলনায় নিঃসন্দেহে এটা সেরা। লেখকের প্রাঞ্জল ও সরল বর্ণনার কারণে পড়তে বেশ মজাই লাগছিল। গল্পের ফ্লোও যথেষ্ট ভালো ছিল। সবথেকে ভালো লেগেছে ক্যারেক্টার বিল্ডআপ। প্রতিটা চরিত্রকে মনের মধ্যে গেঁথে ফেলা যায়। আর কী বলব? এগুলো বিশ্লেষণ করার মতো কিছু নেই। এককথায় বলা যায়, লেখক এই বইয়ে অসাধারণ কাজ করেছেন গল্পের প্রতিটি এলিমেন্টস নিয়ে।
দিবাকর দাদার বইয়ের যথেষ্ট সুনাম রয়েছে বইপাড়ায়। বিশেষত মহাকাল ট্রিলজির কারণে। আমি ভেবে রেখেছিলাম, প্রথমে দাদার অন্য বইগুলো একটু পড়ে দেখব। ভালো মনে হলে মহাকাল ট্রিলজি পড়া যায়৷ এই বই পড়ার পর আমার যথেষ্ট ভালো লেগেছে। এখন কালতন্ত্র আর মহাকাল ট্রিলজি ঘরে তুলতে হবে।
এছাড়া বইয়ের প্রোডাকশনের কারণে বইটা নাড়তে চাড়তেও বেশ মজা লাগছিল। প্রিমিয়াম পাবলিকেশন্স এর প্রোডাকশন টপনচ লেভেলের। কিছু টাইপ মিস্টেক চোখে পড়েছে পড়ার সময়। তাছাড়া সবকিছুই ভালো।
পরিশেষে, সহজ-সরল, প্রাঞ্জল বর্ণনায় চমৎকার একটি ডিটেকটিভ গল্প পড়তে চাইলে নবরত্ন পড়াই যায়। ফেলুদা, ব্যোমকেশ পড়ার পর এ ধরনের উপন্যাসগুলো পাঠকদের আর তেমন আগ্রহ যোগায় না। প্রথমবার ডিটেকটিভ স্টোরি পড়ার মত ফিল অবশ্যই এখন আর পাবেন না। তবুও দেশীয় লেখাগুলো পড়া উচিত। পাঠকরা তাদের আগ্রহের কথা জানালেই লেখক সেই অনুযায়ী গল্প ফাঁদবেন। তাই পারলে পড়ে দেখবেন। অন্তত সময় নষ্ট হবে না।
ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.৫/৫
বই : নবরত্ন লেখক : দিবাকর দাস প্রকাশনী : প্রিমিয়াম পাবলিকেশন্স পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২০৭ মুদ্রিত মূল্য : ৩৫০ টাকা
আমি অনেক বই পড়ি অনেক কিন্তু রিভিউ ঠিকভাবে লিখতে পারি না তাই আর মানুষকে জানানোও হয় না। কিন্তু দিবাকর দাসের লেখা ঈশান রায় সিরিজের দ্বিতীয় বই নবরত্ন পড়ার পর আমার মনে হলো এইটা নিয়ে কিছু লেখা উচিত আমার।
এই সিরিজের প্রথম বই রুদ্বদ্বার।
উপন্যাসটা খুব সাবলিল ভাবেই শুরু হয়েছে,। আলিফ মোহাম্মদ খুন হয়েছেন, উনি যে ধরনের লোক উনি খুন হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু খুন হওয়ার পরের ঘটনা আর স্বাভাবিক না, খুনি হিসেবে ঘটনাস্থল থেকে হাতেনাতে ধরা পরে তার আপন ভাতিজা। ঘটনাক্রমে এই খুনের কেস আসে ঈশান রায়ের হাতে। আড়াই’শ বছর আগে এক মূল্যবান জিনিস বহুদূর থেকে ঘটনাচক্রে আসে দিনাজপুরের মাটিতে। এতগুলো বছর আত্মগোপনে থাকার পর অবশেষে আলোর স্পর্শ কি পাবে সেই মূল্যবান অজানা বস্তু? নাকি কিংবদন্তি আরও কিছুকাল কিংবদন্তি হয়েই থাকবে? সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন সেই জিনিসের সাথে আলিফ মোহাম্মদের খুনের কি কোনো সম্পর্ক আছে? কোনো প্রশ্ন না জেনেই ঈশান পা দেয় দিনাজপুরের মাটিতে। না, দেখতে সুন্দর ছিমছাম এই শহরের বুকে যেন জমে আছে কিছু অজানা কথা, কিছু রহস্য। ঘুঘুডাঙ্গার জমিদার বাড়ির আসল রহস্যের সমাধান করতে হবে তাকে। প্রশ্নগুলো আস্তে আস্তে খুঁজে পায় সে। এবার খুঁজতে হবে উত্তর। কে খুন করেছে আলিফ মোহাম্মদকে? প্রতিশোধ, ব্যাবসা, লোভ, পথের কাঁটা দূর—যে-কোনো কারণই হতে পারে। ঈশান কোনো প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজে পায় না। দিনাজপুরের সরল সমতল জমি ক্রমশ এক গোলকধাঁধা হয়ে উঠছে তার সামনে।
শেষের টুইস্টটা ছিলো অসাধারণ। আমি যাকে খুনের দায়ে সন্দেহ করেছিলাম, লেখক আমার সন্দেহ দূর করে দিলেন। গল্প শুরু করলে আপনি একটানে পড়ে ফেলতে পারবেন।
ঈশান রায় সিরিজের দ্বিতীয় বইয়ের মতো আমারও পড়া দিবাকর দাসের লেখা দ্বিতীয় বই এটা। আর প্রথমটাও ছিলো সিরিজের আগের কিস্তি, রুদ্ধদ্বার।
নবরত্ন আগের কিস্তি রুদ্ধদ্বার থেকে এগিয়ে থাকবে। লেখক ইতিহাসের আলোকে বেশ ভালোই একটা গল্প দাড় করিয়েছেন। তবে আমি বেশি কিছু বলবনা। বইএ দুইটা বিষয় একটু গন্ডগোল লেগেছে।। ১/ গল্পের গতি ও বর্ণনা অনুযায়ী খুনি কে হবে তা যাকে ভেবেছিলাম সে হয়নি। তবে তাদের মাঝেই হয়েছে। এক্ষেত্রে যাকে খুনি হিসেবে উন্মোচন করা হলো, তার না হয় আলিফ মোহাম্মদকে খুন করার যৌক্তিক কারণ পাওয়া গেলো। কিন্তু ওপর আরেকটা যে খুন একই ভাবে একই উপায়ে হলো। তার কোনো মিমাংসা হয় নাই। এটা দরকার ছিলো। কেননা সে প্রথম সাসপেক্টের একমাত্র সাক্ষী ছিলো। কিন্তু খুনি যদি দ্বিতীয় জন হতো তাহলে দ্বিতীয় খুনেরও যৌক্তিক কারণ পাওয়া যেতো। এবং ছিলোও।
২/ খুনের মামলা পরে কীভাবে নিষ্পত্তি হলো? কারণ খুনিকে তো প্রকাশ্যে আনা হলোনা! গোয়েন্দা হিসেবে তো ঈশান রায়ের এটা উচিত হয়নাই।
ঈশান রায়, #১ রুদ্ধদ্বার পড়ে শেষ করার পর নবরত্ন বইটি নিয়ে কিছুটা আগ্রহ ছিলো। আশা করেছিলাম বইটি আগের বইয়ের থেকে আরো বেশি সাসপেন্স নিয়ে আসবে। কান্তজিউর মন্দির এং দিনাজপুরের ইতিহাস লেখক সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন এছাড়াও ধর্ম এবং সংস্কৃতি নিয়ে বেশ কিছু জিনিস লেখক সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করেছেন। বইটিতে বেশ কিছু বিষয় অমীমাংসিত রয়ে গিয়েছে, যেমন কালুকে কে খুন করেছে। খুনির পরিচয় প্রকাশ হওয়া সত্ত্বেও পুলিশের কাছে যদি তা প্রকাশ না করা হয় তাহলে পুলিশ কে দিয়ে লতিফ কে আটকের নাটক করার যোক্তিকতাও ভালো লাগেনি। বইয়ের সবচেয়ে বিরক্তিকর অংশ ছিলো পিউ কে নিয়ে। পড়ার সময় উপভোগ করলেও সমাপ্তিতে কিছুটা আশাহত হলাম।
একদম তামাম দুনিয়ার মানুষের কাছে ঈশান রায় সিরিজের প্রথম বই 'রুদ্ধদ্বার' এর তুলনায় এ বইটা ভালো লেগেছে। স্বয়ং আমার বউ পর্যন্ত বলছে এটাই নাকি ভালো লেগেছে বেশি 😒 হ্যাঁ, বর্ণনার তুলনায় এ বইতে লেখকের পরিপক্বতা বেশি মনে হয়েছে আমারও। আবার ভালো কিছু ইতিহাস সুন্দর করে গল্পের মাঝে মাঝে ব্লেন্ড করে দেওয়া হয়েছে, যা মুখে বাঁধেনি। তবে রুদ্ধদ্বার বইটায় কেমন একটা বিষাদ-বিষাদ ভাব পেয়েছিলাম বোধহয়, আমি এ জিনিসটা খুবই মিস করেছি নবরত্ন-তে 😒 মাথায় বোধহয় গেঁথেই গেছিল যে ঈশান রায়ের সাথে থাকার সময়টায় গম্ভীর হয়ে থাকব। যাকগে সেসব। মুখরোচক একটা বই। যেকেউ অবসরে টুক করে পড়ে ফেলতে পারবে।
দিবাকর দাসের দৈহিক বয়স কত আমি জানি না। তবে তার মানসিক বয়স আর দেখার বয়স বেশ পরিণত, অন্তত দারুণ একটা ট্রাকে আছে। প্রমাণ পাওয়া যায় ৮৪ পৃষ্ঠায় হারমোনি নিয়ে কথা বলায়, প্রমাণ পাওয়া যায় ধর্ম-সংস্কৃতি নিয়ে তার দারুণ চিন্তভাবনায়।
তবে সবথেকে ভালো লাগার বিষয় হচ্ছে একেবারে সহজাত প্রবৃত্তিতে গল্প বলতে পারার কৌশল ভালো রপ্ত করেছেন লেখক।
লেখক রহস্যের জাল ফেলেছেন, সাথে ইতিহাসের ভালো একটা ব্লেন্ড করেছেন। আর পরতে পরতে জুড়ে দিয়েছেন নিজের চিন্তাভাবনা।
তবে কিছু নাটকীয়তা কেমন যেন অপ্রয়োজনীয় ঠেকেছে। আর সাথে হুড়ুমুড় করে বাংলা সিনেমার মত ব্যাপারটা আমাকে বেশি কষ্ট দিয়েছে। পরিণতির ছাপটা এখানেও ফেলার প্রয়োজন ছিলো।
এ বাদে বইজুড়ে দারুণ হিউমারের দেখা পাওয়া গেছে। কিছু হিউমার সস্তা লাগেনি তাও বলতে পারব না। তবে হিউমার নিয়ে আপত্তি খুব একটা নেই।
সময়ের অভাবে কবিতা পড়তে পড়তে কিছুটা ক্লান্ত মনে হয়েছে নিজেকে। এজন্য কিছুটা সময় বের করে টুক করে কিছু ফিকশন গিলছি। বেশ লাগছে।
খারাপ লাগেনি তবে খুব দারুণ কিছু পড়ে ফেললাম তেমনও লাগেনি। পড়ার সময় কেনো যেনো খুনি কে সেটা জানতেই ইচ্ছা করেনি। শুধু গুপ্তধন উদ্ধার নিয়েই মন উস খুশ করছিলো। মালেক চাচাদের গ্রামের উৎসবের কাহিনীটা ভালো লেগেছে। রাশেদ - পিউ নিয়ে লেখক যে স্যাটায়ার আনতে চেয়েছেন আমার খুবই ক্রিঞ্জ লেগেছে। সেটা যতবার হয়েছে ততবারই বিরক্তিকর লেগেছে। সব মিলিয়ে চলনসই আরকি। গোয়েন্দা "ঈশান রায়" সিরিজের দুইটা এভারেজ বই তো পড়ে ফেললাম। আশা করি পরবর্তী বইটাতে লেখক দারুণ কিছু উপহার দিবেন।
সিরিজের প্রথম বইয়ের চেয়ে এই বইটা বেশ ভালো আমি বলব। কিন্তু ঈশান রায়কে জানতে হলে আপনাদের প্রথম বই পড়া উচিত। বেশ ভালো ছিলো। দুইটা অভিযান বলা যায় এই বইয়ে। একটা খুনের রহস্য আর একটা গুপ্তধনের।
কিছু বই আছে, যেগুলো পড়তে শুরু করলে মনে হয় “আর একটু পড়ি, তারপর উঠব।” নবরত্ন ঠিক তেমনই একটি থ্রিলার, যেখানে কৌতূহল একবার তৈরি হলে থামা কঠিন।
এই উপন্যাসের মূল কন্সেপ্ট দাঁড়িয়ে আছে একটি রহস্যময় খুন এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক প্রাচীন গুপ্তধনের গল্পকে ঘিরে। একটি জমিদারবাড়ি, সন্দেহভাজন চরিত্র, আর অতীত থেকে উঠে আসা ‘নবরত্ন', সব মিলিয়ে গল্পটি ধীরে ধীরে সাধারণ ক্রাইম কেস থেকে বড় একটি ধাঁধায় রূপ নেয়। খুনের রহস্য আর গুপ্তধনের অনুসন্ধান পাশাপাশি চলতে থাকে, যা গল্পকে আরও টানটান করে তোলে।
চরিত্রের দিক থেকে ঈশান রায় আলাদা করে চোখে পড়ে। সে কোনো অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন গোয়েন্দা নয়, বরং পর্যবেক্ষণ, যুক্তি আর ধৈর্যের ওপর ভর করেই সে এগোয়। এই বাস্তবধর্মী চরিত্রায়ণ গল্পটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। পাশাপাশি ‘নবরত্ন’ নামক ধারণাটি শুধু সম্পদের লোভ নয়, মানুষের লালসা আর অতীতের অন্ধকার দিককেও তুলে ধরে।
দিবাকর দাসের ভাষা সহজ ও সাবলীল। অপ্রয়োজনীয় বর্ণনা নেই, দৃশ্যগুলো দ্রুত বদলায়, ফলে গল্পের গতি কখনোই ঢিমে হয় না। রহস্য তৈরি করার ক্ষেত্রে লেখক তথ্য ধীরে ধীরে দেন, যা পাঠককে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখে।
নবরত্ন এমন একটি উপন্যাস, যা প্রমাণ করে ভালো থ্রিলারের জন্য শুধু চমক নয়, দরকার শক্ত গল্প আর ধৈর্যশীল নির্মাণ। রহস্য ভালোবাসলে, এই বইটা হাতছাড়া করা ঠিক হবে না।
লেখকের ফ্যান হয়েছিলাম পঞ্চম দিয়ে। অভিমন্যু পড়ে আরো বেশি ভালো লেগেছে। লেখনী অনেক স্ট্রং। নবরত্নের ঈশানকে রুদ্ধদার এর ঈশানের তুলনায় বেশ স্ট্রং লেগেছে। এই বইটাতে একটু তিনগোয়েন্দার ফ্লেভার পাচ্ছিলাম। ঈশান, কিশোরের মত। মগজের কাজে বিজি। রাশেদ মুসার মত ফানি, পেটুক ও৷ আর ইমন রবিনের মত নথিপত্রে বিজি৷ লাইব্রেরি, থানা, রাজবংশীদের গ্রাম, ক্রাইম সিনে ঘুরাঘুরি করে তদন্ত, গুপ্তধন উদ্ধার পুরোটাতেই ছোটবেলায় তিনগোয়েন্দা পড়তে গিয়ে যেই অ্যাডভেঞ্চারাস ফিলিংটা হতো, সেটা পাচ্ছিলাম। খুব সিরিয়াস রগরগে থ্রিলার না৷ বরং, হালকা মেজাজের থ্রিলার বলা যায়। মজা লেগেছে পড়তে।