সাব ইন্সপেক্টর হারুনুর রশীদের হাতে এক জটিল কেস এসে হাজির হল। ভিক্টিমের পকেট থেকে পাওয়া গেল একটি বাসের টিকিট। যার গায়ে লিখিত তারিখ, জুন ২, ২০১৯। কিন্তু আজ তো ২০১৯ সালের মে মাসের ২০ তারিখ। তাহলে ১২ দিন পরের টিকিট ভিক্টিমের কাছে কি করে এলো? এটা কি শুধু মাত্রই টাইপিং মিসটেক? নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো রহস্য? এ সমাজের একজন সামান্য রিকশা চালক, আব্বাস মিয়া। গ্যারেজের রিকশা চালাতে-চালাতে যখন সে ক্লান্ত, তখন মনের ভেতর একটি নতুন রিকশা কেনার স্বপ্ন বুনছে। কিন্তু এতগুলো টাকা সে পাবে কোথায়? তার চারদিক ঘিরে, নানান অনৈতিক কাজের প্রস্তাব। আর নিজের ভেতর যত্নে রাখা সততা। কিন্তু সে কি পারবে সততা ধরে রাখতে? নাকি সুখের লোভে পা বাড়াবে অন্য কোনো পথে? এদিকে উপন্যাসের আরেক চরিত্র, আহসানুল আলম। এক সরকারী কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের সিনিয়র শিক্ষক। নগণ্য বেতন, অসুস্থ স্ত্রী আর কলেজ পড়ুয়া একমাত্র ছেলেকে নিয়ে তার অভাবগ্রস্ত জীবন। সে-জীবনে হঠাৎ করেই কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতে শুরু করল। যা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে, অতীত ভ্রমণকে। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের এই শিক্ষক তা মানতে নারাজ। কারণ স্টিফেন হকিং তো অনেক আগেই বলে গেছেন, "টাইম ট্রাভেল যদি সত্যিই হয়, তাহলে ভবিষ্যতের আগন্তকেরা সব গেল কোথায়?" আব্বাস, হারুনুর রশীদ এবং আহসানুল আলমের এই তিন গল্প, সেই সাথে টাইম ট্রাভেলের কাল্পনিক ধারণা এবং মানুষের জীবনের বাস্তিবক রুপকে কেন্দ্র করে এগিয়ে যাওয়া এক থ্রিলার উপন্যাস, "যেখানে সময় থমকে যায়।"
প্রথমেই জানাই প্রথম বইয়েই টাইম ট্র্যাভেল এর মত জটিল এবং বিতর্কিত বিষয় নিয়ে লেখার সাহস করার জন্য লেখক আবিদ হোসেন জয় কে বাহবা প্রাপ্য।জানি না ভবিষ্যতে কতটুকু বড় লেখক হবেন তবে সর্বপ্রথম বইয়েই এত সুন্দর এবং সাবলীল লেখনীর মাধ্যমে একদম ফাটাফাটি মানের না হলেও যথেষ্ট গোছানো একটা গল্প লিখেছেন লেখক।
কাহিনি সংক্ষেপ :
সমাজের একজন সামান্য রিকশাচালক হচ্ছে আব্বাস মিয়া।গ্যারেজের রিকশা চালাতে চালাতে যখন ক্লান্ত তখন মনের মধ্যে নিজের একটা রিকশা কিনার স্বপ্ন উঁকি দেয়।কিন্তু বউ,বাচ্চা নিয়ে অভাবের সংসার,রিকশা কিনার টাকা কোথা থেকে পাবেন তিনি?একদিন সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে সারাদিনের কাজ শেষে বাড়ি ফিরে দেখে একজন খুন হয়ে পড়ে আছে তাঁর বাসায়!! সে বা তার স্ত্রী বাড়ি ছিল না তাহলে খুন করল কে তাও তাঁর নিজের বাড়িতে?অচেনা সেই ব্যাক্তি ঢুকলই বা কিভাবে বাড়িতে?
অন্যদিকে গল্পের আরেক চরিত্র হচ্ছে সাব-ইন্সপেক্টর হারুনুর রশীদ।কেসের তদন্তের ভার এসে পড়ল তাঁর উপর।কিন্তু তদন্ত করতে গিয়ে বের হয়ে আসল অদ্ভুদ এক জিনিস। ভিক্টিমের পকেট থেকে পাওয়া গেল বাসের এক টিকিট যেটার তারিখ খুন হওয়ার দিনের থেকে আরও ১১ দিন সামনের!তাহলে আসল কিভাবে এই টিকিট?টাইপিং মিসটেক শুধু নাকি ভৌতিক কিছু?
উপন্যাসের আরেক চরিত্র পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক আহসানুল আলম।স্ত্রী,পূত্রকে নিয়ে অভাবগ্রস্থ সংসারে।হঠাৎ অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতে শুরু করল তাদের জীবনে।সবকিছুই যেন ইংগিত করছে অতীত ভ্রমণ কে!!টাইম ট্র্যাভেল তো সম্ভব না বিজ্ঞানীরা অনেক আগেই বলেই দিয়েছে তাহলে হচ্ছে টা কি?এসবের পিছে আছে কে?
পাঠ-প্রতিক্রিয়া :
পোস্ট এর শুরুতেই বলেছি লেখকের প্রথম বই তাই এক্সপেকটেশন ও কম ছিল।কিন্তু সাবলীল লেখনীর সাথে ধীরে ধীরে গড়ে উঠা গল্পের বুনন আমাকে মুগ্ধ করেছে।সাধারণত কোন লেখকের প্রথম লেখায় লেখনশৈলী এত সাবলীল হয় না কিন্তু এক্ষেত্রে লেখকের লেখনী ছিল এক কথায় চমৎকার।শব্দচয়ন, বাক্যগঠন সবকিছুই ছিল একদম পারফেক্ট।কোন বিজ্ঞানের ভারী ভারী থিওরি কপচানো বুলি নেই,রোবট,হলোগ্রাফি,টেকনোলজির উৎকর্ষতা ইত্যাদি ইত্যাদি এসবের বিন্দুমাত্র বর্ণনা ছাড়াও যে একটা টাইম ট্র্যাভেল এর গল্প লিখা যায় তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে এই উপন্যাস টা।
উপন্যাসটির মধ্যে তিনটি মুখ্য চরিত্র হচ্ছে রিকশাওয়ালা আব্বাস মিয়া,সাব-ইন্সপেক্টর হারুনুর রশীদ এবং পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক আহসানুল আলম।তিনজনকে কেন্দ্র করে মূল গল্প এগিয়েছে। কোথাও হুট করে তাড়াহুড়ো করা হয় নি।দুম করে কোন চরিত্র এনে গল্পের মাঝে ঢুকিয়ে দেয়া হয় নি।তিন ক্যারেক্টার কে গল্পের প্রয়োজনে যথেস্ট সময় দিয়ে বিল্ড আপ করা হয়েছে।
গল্পের শক্তিশালী দিক হচ্ছে এর সাবলীলতা এবং সরলতা।আমাদের নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং দরিদ্র ফ্যামিলির দৈনন্দিন সহজ সরল জীবনযাপনের চিত্র যেন ফুটে উঠেছে গল্পে।অভাবের তাড়নায় থাকা গরীব এক রিকসাওয়ালার গল্প,দিন আনা দিন খাওয়া কলেজের এক প্রফেসরের নিম্ন মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির চিত্র,একজন সৎ সাব ইন্সপেক্টরের দৈনন্দিন চোর ছ্যাচড়া দের ধরার গল্প ব্যাস এইটুকুই যা বাস্তব জীবনে হরহামেশাই দেখা যায় আমাদের সমাজে।উক্ত ঘটনাগুলোর সাথে সংযোজিত একটি মার্ডার মিস্ট্রি এবং টাইম লুপ দুটির সমন্বয়ে তৈরি উপন্যাস হচ্ছে "যেখানে সময় থমকে যায়"।
গল্পের নেগেটিভ পয়েন্টে একটু দৃষ্টিপাত করা যাক, উপন্যাসটি প্রচুর স্লো।গল্পের প্রথম ৯০ পৃষ্ঠা লেগে গেছে গল্পের মূল ঘটনা শুরু হতেই।এতই স্লো ছিল যে প্রথম দিকে এগোচ্ছিলই না।সহজেই পরিধি কমিয়ে গল্পটিকে আরেকটু ছোট করা যেত।যারা ফাস্ট দুরন্ত গতির গল্প পড়তে পছন্দ করেন এটা পড়তে তাদের প্রচুর ধৈর্য্য লাগবে। এছাড়া মূল পুলিশ অফিসারের ক্যারেক্টারটিকে একটু বেশি বোকা বোকা বানিয়ে ফেলা হইছিল আমার কাছে মনে হয়েছে।যেহেতু একটা মার্ডার ছিল সাথে সাথে কিছু পুলিশ তদন্তের খুটিঁনাটি দেখালে আরো বেটার হত।
প্রচ্ছদ টা সুন্দর।টাইম ট্র্যাভেলের গল্পের বইয়ে বরাবরের মত ঘড়ি জিনিসটা কমন থাকে যেটা এখানেও আছে কিন্তু এখানে একটা ট্রেনের ছবি দেওয়া আছে যেটা একদম গল্পের শেষে বুঝতে পারবেন কেন প্রচ্ছদে এই ছবিটি দেওয়া ছিল। এছাড়া বাঁধাই,পৃষ্ঠার মান সবকিছুই ভাল ছিল।অনায়াসেই দুই পাশ খুলে সাবলীলভাবে পড়া গেছে। বানান ভূল তো ছিলই এটা নিয়ে বেশি কিছু বললাম না আর!
সায়েন্স এর ভারী ভারী থিওরির জন্য সময় পরিভ্রমণ এর মত সাইফাই গল্প যারা এড়িয়ে যান তাঁরা নিঃসন্দেহে এই বইটি পড়তে পারেন।তবে হ্যাঁ বইটি চূড়ান্ত রকমের স্লো।সেটা একপাশে রেখে যদি দেশীয় প্রেক্ষাপটে একটা সরল টাইপের সাইফাই গল্পে মশগুল হতে যান তবে এই উপন্যাসটি পড়ে ফেলুন।
P.R: 4/5 টাইম ট্র্যাভেল কিংবা টাইম লুপের কনসেপ্ট বরাবরই উৎসুক করে তোলে আমাকে। চলচিত্র ও সাহিত্যে এর উপর অনেক অনেক কাজ করা হয়ে থাকলেও এই কনসেপ্টটি এখনও উদ্দীপনা জাগাতে বিফল হয় না। বিশেষ করে যদি গল্পটি "যেখানে সময় থমকে যায়" এর মত রহস্যের জালে মোড়ানো হয়। লেখক আবিদ হোসেন জয় তার প্রথম মৌলিক গল্প হিসেবে বেছে নিয়েছেন এই জটিল ও বিতর্কিত বিষয়টি এবং আমার মনে হয়েছে বেশ সন্তোষজনকভাবেই সে কাজটি সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছেন। তার এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে ভবিষ্যতে বাংলা সাহিত্যে অনেক প্রশংসনীয় অবদান করতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস।
লেখকের লেখনী অনেক সাবলীল আর অলংকৃত। প্রতিটি দৃশ্যের বিবরণী অনেক বিশদ ও বাস্তবিক। বর্ণনাগুলো পড়ে মনে হবে অনেক যত্নে অলঙ্কার দিয়ে সাজানো হয়েছে প্রতিটি শব্দকে; বাক্যকে। মূল গল্প একদম নতুন কিংবা out of the box না হলেও সাইন্স ফিকশনের সাথে থ্রিলারের বা এক মার্ডার মিস্ট্রির সংযোজন বেশ ভালমতই করতে সক্ষম হয়েছেন। এখানে আপনাকে গল্পের ফলাফল আগে থেকে জানিয়ে দেয়া হলেও সেই ফলাফল অবধি পৌছনোর যাত্রাটা বেশ উপভোগ্য এবং আকর্ষণপূর্ণ। টাইম ট্র্যাভেল, টাইম লুপ, ওয়ার্মহোল সাথে একটি মার্ডার... এক মজাদার ভ্রমনের জন্য আর কি লাগে!
উপরে উল্লেখিত প্রথম পয়েন্টই গল্পের একটি minor negative point হিসেবে ধরা দিয়েছে আমার কাছে। লেখকের বর্ণনা অনেক সুন্দর হলেও কিছুক্ষেত্রে তা অপ্রয়োজনীয় লেগেছে। Sometimes it felt like; too much descriptive. চাইলেই অনেক জায়গার বর্ণনা ছাঁটাই করে গল্পের ধারা আরও গতিশীল করা যেত। মূল গল্পে ডুব দিতে একটু বেশি সময় নিয়ে ফেলেছে। ২৭৩ পৃষ্ঠার গল্পে প্রায় ৮০ পৃষ্ঠার মত লেগে যায় মূল ঘটনার সূত্রপাত হতে। কাজেই একটু ধৈর্য নিয়ে এগোতে হবে পাঠকদের।
4.5/5 অত্যন্ত সাবলী ও প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপন টা বেশ লেগেছে। প্লট গুলো গুছানো হয়ছে ভালো করেই। লেখক বন্ধুর প্রথম বই হিসেবে তার সাহসের তারিফ করাই লাগে। অত্যন্ত জটিল একটা ��িষয়ের উপর সে তার প্রতিভা দেখাতে বদ্ধপরিকর ছিলেন বলেই বোধহয় এমন একটা বই পাওয়া গেলো।
সহজ সুন্দর করে গুছিয়ে লিখেছেন সব কিছু।
থ্রিলার জনরা হিসেবে যতটা পাঠক আশা করে ততটা দিতে না পারলেও নতুন লেখকের মৌলিক গল্প হিসেবে কাউকে সেরকম আশাহত করবে না। গল্পটা স্লো লাগতে পারে কিন্তু লেখকের সুচনান্তের বিষয় গুলা পরিশেষে যে কতটুক সহজ করে দিয়েছে সেটা বেশ উপভোগ্য।
অনেক কিছুই লিখা যেত বই টা নিয়ে। বেশি কিছু লিখছিনা তবে বিরক্ত হবার অবকাশ হয়তো বইয়ে নেই।
টাইম ট্রাভেল নিয়ে বেশি বই পড়া হয়নি আমার তবে অনেক মুভি দেখেছি। টাইম ট্রাভেল নিয়ে খুব আগ্রহ আমার কারন সবার মতন আমিও চাইতাম বা এখনও মাঝে মাঝে চাই অতীত ঘুরে আসতে অথবা কৌতূহলবশত নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে । যাকগে, টাইম ট্রাভেল শুনলে আমরা কিংবা আমি নিজে যেটা ধারণা করি যে মেশিন জাতীয় কিছু হবে অথবা ফ্যান্টাসি জাতীয় কিছুই হবে। বইটা পড়ে ধারণা পাল্টে গেলো আমার। ভাবতেও পারিনি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন নিয়ে এতো অসাধারণ ভাবে একটা টাইম ট্রাভেল এর গল্প লেখা যায়। যতটুকু জানি এটা লেখকের প্রথম লেখা দারুণ লিখেছেন 😊 টাইম ট্রাভেল নিয়ে ব্যতিক্রম একটা কাহিনী একদম শেষ না করা পর্যন্ত লেগেই ছিলাম। মাত্রই শেষ করলাম খুব ভালো লেগেছে আমার কাছে যেখানে সময় থমকে যায় 😊 লেখকের কথা পৃষ্ঠায় লেখক চেয়েছিলেন তাকে যেন একটা ইমেইল করে রিভিউ দেই সেটাও করবো 😇 ব্যাক্তিগত রেটিং ৪/৫ ⭐ 😇
দেশীয় প্রেক্ষাপটে থ্রিলার ঘরানার বিজ্ঞান কল্পকাহিনী— সবাই নিশ্চই টান টান উত্তেজনা নিয়ে লোমহর্ষক কোনো গল্প শুনতে চাইবেন, কিন্তু এমন চাওয়ায় জীবনের গল্পগুলো প্রায়শই বাদ পড়ে যায়। তবে লেখক এখানে বিভ্রান্ত হননি, তিনি আমাদের জীবন অনুভূতিগুলোকে বিস্তৃত প্রয়াস দিয়েছেন যা পাঠককে একটি সার্থক উপন্যাস উপহার দিতে পেরেছে। সায়েন্স ফিকশন কিংবা থ্রিলারও যে মানুষের মন ছুঁয়ে যেতে পারে, দিতে পারে জীবনদর্শন তা এই বইটি বাংলা সাহিত্যের সম্পদ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে রইবে।
উপন্যাস : যেখানে সময় থমকে যায় লেখক : আবিদ হোসেন জয় জনরা : সাই-ফাই থ্রিলার প্রকাশনী : বাতিঘর প্রকাশনী
বইঃ যেখানে সময় থমকে যায় লেখকঃআবিদ হোসেন জয় প্রকাশনিঃ বাতিঘর প্রচ্ছদঃ কৌশিক জামান মুদ্রিত মূল্যঃ তিনশত টাকা মাত্র
বইয়ের ফ্ল্যাপ থেকেঃ
সাব ইন্সপেক্টর হারুনুর রশীদের হাতে এক জটিল কেস এসে হাজির হল। ভিক্টিমের পকেট থেকে পাওয়া গেল একটি বাসের টিকিট। যার গায়ে লিখিত তারিখ, জুন ২, ২০১৯। কিন্তু আজ তো ২০১৯ সালের মে মাসের ২০ তারিখ। তাহলে ১২ দিন পরের টিকিট ভিক্টিমের কাছে কি করে এলো? এটা কি শুধু মাত্রই টাইপিং মিসটেক? নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো রহস্য?
এ সমাজের একজন সামান্য রিকশা চালক, আব্বাস মিয়া। গ্যারেজের রিকশা চালাতে-চালাতে যখন সে ক্লান্ত, তখন মনের ভেতর একটি নতুন রিকশা কেনার স্বপ্ন বুনছে। কিন্তু এতগুলো টাকা সে পাবে কোথায়? তার চারদিক ঘিরে, নানান অনৈতিক কাজের প্রস্তাব। আর নিজের ভেতর যত্নে রাখা সততা। কিন্তু সে কি পারবে সততা ধরে রাখতে? নাকি সুখের লোভে পা বাড়াবে অন্য কোনো পথে?
এদিকে উপন্যাসের আরেক চরিত্র, আহসানুল আলম। এক সরকারী কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের সিনিয়র শিক্ষক। নগণ্য বেতন, অসুস্থ স্ত্রী আর কলেজ পড়ুয়া একমাত্র ছেলেকে নিয়ে তার অভাবগ্রস্ত জীবন। সে-জীবনে হঠাৎ করেই কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতে শুরু করল। যা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে, অতীত ভ্রমণকে। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের এই শিক্ষক তা মানতে নারাজ। কারণ স্টিফেন হকিং তো অনেক আগেই বলে গেছেন, "টাইম ট্রাভেল যদি সত্যিই হয়, তাহলে ভবিষ্যতের আগন্তকেরা সব গেল কোথায়?" আব্বাস, হারুনুর রশীদ এবং আহসানুল আলমের এই তিন গল্প, সেই সাথে টাইম ট্রাভেলের কাল্পনিক ধারণা এবং মানুষের জীবনের বাস্তিবক রুপকে কেন্দ্র করে এগিয়ে যাওয়া এক থ্রিলার উপন্যাস, "যেখানে সময় থমকে যায়।"
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ
বইটা শেষ করার পর মনেই হচ্ছে না, লেখকের প্রথম বই এটা। বেশ গোছানো লেখা। তাড়াহুড়োর ছাপ নেই। বাকিসব বাদ দিলেও স্টোরিটেলিংয়েই পাসমার্ক পেয়েছে বইটা।
আমি রিভিউয়ার নই, বই নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করার অভ্যাস নেই। কাজেই লেখকের পরিপক্ক লেখনির মতো পরিপক্ক একটি রিভিউ উপহার দিতে পারলাম না।
বইটার ফ্ল্যাপের লেখা পড়ে আর প্রচ্ছদ দেখে সায়েন্স ফিকশন মনে হতে পারে। হালকা ক্রাইমের ছোয়াও আছে ফ্ল্যাপে।
তবে বইটা আগে একটা উপন্যাস; এটা ধরে নিয়েই পড়া ভালো।
বইটা সায়েন্স ফিকশনও বটে। তবে এতে বিজ্ঞানের কঠিন সব থিওরির আলোচনা নেই। কিংবা ভারী ভারী সব যন্ত্রের কেরামতি নেই।
লেখক বলতে চেয়েছেন কিছু মানুষের জীবনের সাথে জড়িয়ে যাওয়া ট্রাইম ট্রাভেল নিয়ে এবং তাতে তিনি সফল।
বিজ্ঞানের থিওরি আর যান্ত্রিকতা এড়িয়ে নিখাদ একটি গল্প বলেছেন তিনি।
টাইম ট্রাভেলের বৈধতা যাচাইয়ের ঝামেলা নেই। তর্ক বিতর্ক নেই। অতীত কিংবা ভবিষ্যত নিয়ে বড়সড় টানাটানি নেই।
টাইম ট্রাভেল সম্ভব ধরে নিয়ে, কিছু মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো লেখক বলতে চেয়েছেন; এটাই তার সবথেকে বড় কৃতিত্ব।
মোটাদাগে বইটাকে সামাজিক থ্রিলার বলা যায়। পাতায় পাতায় থ্রিল নেই, রুদ্ধশ্বাসে দৌড়াদৌড়ি নেই, তবে মন ভরিয়ে দেয়া গল্প বলেছেন লেখক।
এই সমাজেরই একজন গরীব রিকশাচালক আব্বাস মিয়া,যার দীর্ঘদিনের ইচ্ছা নিজের একটা রিকশা কেনা। কিন্তু সামর্থ্য নেই তার। সে পায় কিছু অনৈতিক কাজের প্রস্তাব।
গল্পে ঢুকে গেলে পাঠক বুঝবেন আব্বাসের মতো সৎ লোকের পক্ষে অনৈতিক কাজ করা সম্ভব নয়। কিন্তু আব্বাস পেয়ে যায় রিকশা কেনার মতো টাকা।
কিন্তু রিকশা কেনার আগেই একটা খুনের সাথে জড়িয়ে পালিয়ে বেড়ায় সে। এরমধ্যেই সে জড়িয়ে পড়ে টাইম ট্রাভেলের সাথে। কী করে?
সাব ইনস্পেক্টর হারুনুর রশিদের হাতে আসে অদ্ভুত এক কেস। যেখানে ভিক্টিম মারা যায় রাত এগারোটায়, কিন্তু তার এক বন্ধুর জবানবন্দি অনুযায়ী ভিক্টিম রাত একটায়ও আড্ডা দিয়েছে তার সাথে! পাঠক খানিকটা থ্রিল অনুভব করবেন এই জায়গায়,যখন জানবেন তার বন্ধু আসলে সত্য কথাই বলেছে!
এ সমাজের আরেকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি ফিজিক্সের শিক্ষক আহসানুল আলম। টাইম ট্রাভেলের মূল নায়ক এই চরিত্র। অথচ তিনি বিশ্বাস করেন অতীতে টাইম ট্রাভেল সম্ভব নয়। কিন্তু তার সাথে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা আসলে নির্দেশ করে টাইম ট্রাভেল।
তবে? টাইম মেশিন ছাড়াই কী করে টাইম ট্রাভেল করলেন আহসানুল আলম, আব্বাস মিয়া বা হারুনুর রশিদ?
এখানে পাঠকের একটা বিষয়ে খটকা লাগবে, তা হলো সরকারী কলেজের ফিজিক্সের শিক্ষক কী করে অস্বচ্ছল হন? এখানে লেখক আহসানুল আলমকে অস্বচ্ছল দেখিয়েছেন কিন্তু যথাযোগ্য কারণ দেখাননি বা কারণ অস্পষ্ট।
আরেকটা বিষয়ে অস্বস্তি হতে পারে, মূল গল্পে ঢোকার আগে লেখক বেশ খানিকটা সময় নিয়েছেন।
বইয়ের ফ্ল্যাপের শুরুতেই লেখা রয়েছে হারুনুর রশিদের কেসের কথা যেখানে ভিক্টিমের হাতে পাওয়া যায় বাসের টিকিট।
আমি মনে করি লেখক চাইলেই এই গল্প আরেকটু আগে শুরু করতে পারতেন।
তা বাদে বইটির স্টোরিটেলিং সুখপাঠ্য। কঠিন শব্দ নেই, জটিল বাক্য নেই। অস্পষ্ট কোনো লাইন নেই।
একটা মেজর টুইস্ট আর কিছু ছোট ছোট টুইস্ট আছে। লেখক প্রতিটা চ্যাপ্টারের প্রচ্ছদগুলোর শেষে কিছু প্রশ্ন বা চমক রেখেছেন যেগুলো পাঠকের আগ্রহ বাড়াবে। থ্রিলের খানিকটা অভাব হলেও লেখক বেশ সাসপেন্স তৈরি করেছেন।
খুবই ওয়েল বিল্ড একটা গল্প। ছোট ছোট কিছু ঘটনা আছে যেগুলো অযাচিত মনে হতে পারে তবে সেগুলোই আসলে প্রশ্নগুলোর জট ছাড়াতে সাহায্য করবে।
বইটার সমাপ্তি দারুণ। পাঠক সবগুলো প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন শেষে। এবং বইটা শেষে দারুণ এক ভালো লাগা কাজ করবে।
ছবিতে প্রচ্ছদ কেমন লাগছে জানি না,তবে হাতে নিলে মাখন ফিল হয়।
পাঠক, হতে পারে আবিদ হোসেন জয়ের প্রথম বই এটি, তবে তিনি উপহার দিয়েছেন পরিপক্ক এক গল্প।