২০২০ সালে নহলী পরিচালিত ক্রিয়েটিভ রাইটিং শেখার অনলাইন ফ্রি কোর্সটির শিক্ষার্থীদের লেখা গল্প নিয়ে গত বইমেলায় প্রকাশিত “কথানক” নামের যৌথ সংকলনটির ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের কোর্সের শিক্ষার্থীদের লেখা গল্প নিয়ে এবার প্রকাশিত হলো “কথানক-২”।
বইটিতে থ্রিলার, সাই-ফাই ও পরাবাস্তব জনরার চৌদ্দটি গল্প রয়েছে। নবীন লেখক হলেও চমৎকার এই গল্পগুলো পড়ে পাঠক আনন্দ পাবেন, রোমাঞ্চিত হবেন বা কল্পনার জগতে হারিয়ে যাবেন।
আমি তো একজন সাধারন পাঠক। আপাতত আমি শুধু পড়তেই জানি। লেখালেখি যে কতটা কঠিন এটা যারা লেখেন তারা যেমন বোঝেন, যারা পাঠক তারাও কিছুটা আঁচ করতে পারেন যেহেতু তারা পড়েন। সমসাময়িক লেখকের লেখা পড়লে বিষয়টা আরো ভালো করে টের পাই।
যাই হোক, আলোচ্য বইতে আসি। কথানক-২ বইটিতে মোট ১৪ টি গল্প। একেকটা গল্প একেকরকম। যেহেতু নবীনদের লেখা (শ্রদ্ধেয় বদরুল মিল্লাত স্যারের গল্পটি বাদে বাকি তেরোটি) সুতরাং চিরন্তন সাহিত্যকর্মে নিহিত মুন্সিয়ানা আশা করাটা বাড়াবাড়ি কিন্তু প্রত্যেকটি লেখায় যে পরিণতি ও পরিমিতিবোধ রয়েছে তা প্রশংসাযোগ্য। লেখালেখির প্রতি একাগ্রতা না থাকলে এটা সম্ভব নয়।
অবশ্যই সব গল্প আমার ভালো লাগেনি বা লাগাটা বাধ্যতামূলক তাও নয় (তার মানে এমন নয় যে গল্পগুলো খারাপ, এটা মনে করার কোন কারন নেই) একেকজনের রুচি একেকরকম। কিছু কিছু গল্প অনেকটাই সহজে অনুমানযোগ্য প্লটে লেখা। তাই গল্পের শেষে এসে বিস্মিত হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছি কিন্তু এইচ আর মিথেলের 'ভাইজান' থেকে বদরুল স্যারের "স্বপ্নের সমাধি" পর্যন্ত গল্পগুলোর কাহিনী রীতিমতো তেজি ঘোড়ার ন্যায় ছুটেছে। এটি পাঠক হিসেবে আমার জন্য আনন্দদায়ক তা তো বলা বাহুল্য।
মলাটেই লেখা রয়েছে গল্পগুলো কোন জনরার। সবথেকে ভালো লেগেছে যেই ব্যাপারটা তা হলো থ্রিলার, সাই-ফাই, পরাবাস্তবাদ ইত্যাদি বিষয়গুলোকে চাইলে যেকোন পটভূমিতে এনে চমৎকার সব গল্প লেখা যায় তা গ্রাম কিংবা শহর, বিদেশ অথবা দেশ, পারিবারিক কিংবা সামাজিক যেকোন পরিসরে তা সম্ভব। সেটাই এই নবীন লেখকবৃন্দ করে দেখিয়েছেন। আরেকটা ব্যাপার চোখে পড়ে তা হলো সুযোগ্য সম্পাদনা যা প্রশংসার দাবিদার।
প্রতিটা গল্পের ভাষা সহজ এবং প্রাঞ্জল। অতিলেখন চোখে পড়েনি, ঝরঝরে মেদহীন তাই একদিনেই ১১০ পৃষ্ঠার নাতিদীর্ঘ গল্পসংকলন শেষ করতে পেরেছি। আমার কাছে ৫-৭ এবং ৯-১৪ নম্বর গল্পগুলো অবশ্য পাঠ্য মনে হয়েছে।
অনেকদিন পর এমন কোন বই পড়ে আনন্দ পেলাম। পাঠক হিসেবে লেখকবৃন্দের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
যদি এক মলাটেই এমন রসদ থাকে, যেখানে কখনো দুইশত বছর আগে বপন করা ষড়যন্ত্রের বীজের সন্ধান মেলে, আর পরমুহূর্তেই হয়তো পাড়ি দেয়া যায় অজানা-অচেনা কোনো ভিনগ্রহে, যেখানে চলছে এক গোপন গবেষণা! পাতা উল্টোলেই কখনো সামনে চলে আসে লুসিফারের সাধনাকে ঘিরে তৈরি করা উত্তেজনাকর কোনো পরিস্থিতি, কখনো বা, হালকা আমেজে কলহাস্য করে উদঘাটন করা হয় বাড়িতে ঘটে চলা অদ্ভুতুড়ে সব ঘটনার রহস্য! একই প্রচ্ছদে এতসব স্বাদের গল্প পড়তে গিয়ে মনে হয় যেন থ্রিলার, পরাবাস্তবতা আর সাই-ফাইয়ের মিশেলে গড়া এক তুমুল বেগে ছুটে চলা রোলার কোস্টারে চেপে বসেছি!
বলছিলাম নহলী থেকে প্রকাশিত "কথানক-২" বইটির কথা। নহলী পরিচালিত ক্রিয়েটিভ রাইটিং কোর্স-৪ এর শিক্ষার্থীদের লেখার সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য মুখিয়ে ছিলাম শুরু থেকেই। তাছাড়া বইটিকে ঘিরে থাকা আগ্রহের পেছনে অন্যতম কারণ ছিল এর নজরকাড়া প্রচ্ছদ। জনরাভিত্তিক গল্পের সামগ্রিক আবহ, ভিন্নধর্মী প্রেক্ষাপটের বিস্তৃতি আর লেখকদের লেখার ধরণ বিবেচনা করলে "কথানক-২" প্রত্যাশার অনেকটাই পূরণ করেছে বলা যায়।
গল্পসংকলনের রিভিউ লিখতে গেলে পুরো বইটা নিয়ে একসাথে আলোচনা করা বেশ ঝামেলার। তাই সেটায় না গিয়ে বরং প্রতিটা গল্প নিয়ে আলাদাভাবে আলাপ করা যাক।
🌸আখ্যানপর্ব
১। "তোমার জন্য একশো লাল গোলাপ" - গল্পের শুরু হয় নবদম্পতি ফয়সাল এবং রুমকির প্রথম বিবাহবার্ষিকীতে ফয়সালের অনুপস্থিতিকে ঘিরে রুমকির উদ্বিগ্নতার মধ্য দিয়ে। দুর্যোগপূর্ণ রাতে একদিকে ড্রাগ ডিলার আর মাফিয়াদের বিরুদ্ধে অপারেশন, অন্যদিকে রুমকির সাথে ব্যালকনিতে চা খেতে খেতে বৃষ্টি উপভোগ - দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতির মাঝে ফয়সাল কোনটা বেছে নেবে? আদৌ কি সে কোথাও অনুপস্থিত থাকবে?
২। " এক পশলা বৃষ্টি" - গল্পটা একটা মেয়ের, মায়ের অপূর্ণতা পূরণের স্বপ্ন দেখতে গিয়ে যাকে মুখোমুখি হতে হয়েছে তীব্র যন্ত্রণার। মাইগ্রেনের ব্যথার কারণে গানের প্রতি তীব্র বিরক্তি থাকা সত্ত্বেও সে হঠাৎই নিজের আগ্রহে গানের আসরে মেতে ওঠে, উন্মুখ হয়ে পড়ে তার মায়ের অসুস্থতার খবর চারদিকে রটিয়ে দিতে। এসব কি সে শুধুই খেয়ালের বশে করে? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য?
৩। " দুঃস্বপ্ন" - স্বপ্ন কি নিছকই আমাদের মস্তিষ্কের এলোমেলো চিন্তাভাবনার প্রতিফলন? কখনো কখনো কল্পনার জালে গড়া স্বপ্নের মাঝে হয়তো লুকিয়ে থাকে বিশেষ কোনো বার্তা। বোনের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠা ফাইজা কি দুঃস্বপ্নের মাঝেই খুঁজে পাবে তার সব প্রশ্নের উত্তর?
৪। "অদ্ভুতুড়ে" - অদ্ভুত সব কাণ্ড ঘটে চলেছে শ্রাবন্তীদের বাড়িতে। প্রতিদিনই কিছু না কিছু হারিয়ে যায়, কিন্তু পরবর্তীতে সেসব ঠিকই খুঁজে পাওয়া যায় অন্য কোনো জায়গায়। কেউ যদি কিছু চুরি করতে চায়, তাহলে সেটা আবার রেখেই বা যাবে কেন?!
৫। "ভাইজান" - অপরাধের আড়ালে মূল অপরাধী সবসময়ই থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। "ভাইজান" নামধারী রুম্মানকে সামনে রেখে প্রতাপশালী ফিরোজ খানের গড়ে তোলা অপরাধের সাম্রাজ্য ধ্বংস করতে তাই আবির্ভাব হয় আরেক মুখোশধারীর! কিন্তু সে কে?
৬। "বহুরূপী" - বাইশ বছর বয়সী রিফা এক অদ্ভুত মানসিক রোগে আক্রান্ত। প্রায়সময়ই সে ডাক্তারের কাছে কাউন্সেলিং মিটিং এ এসে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে হওয়া কতগুলো হত্যার বর্ণনা করে চলে। তার লুকিয়ে রাখা এক ডায়েরিতেও পাওয়া যায় বীভৎস সব খুনের বিবরণ। একদিকে খুনের বর্ণনা আর অন্যদিকে হুট করে রিফার অস্বাভাবিক আচরণ করা- ডাক্তার আরমান কি পারবে এই দুটো ঘটনার মধ্যে লুকিয়ে থাকা সংযোগ বের করতে?
৭। "অমাবস্যায় জ্যোৎস্নালোক" - মুহিতের স্ত্রী নিতু মাঝেমাঝে যা-ই বলে কিংবা আশঙ্কা করে, সেটা সত্যি হয়ে যায়। তবুও মুহিত যখন তার বন্ধু সাইফের পাল্লায় পড়ে ভয়ংকর এক চক্রে ফেঁসে যায়, নিতু তখন নিশ্চুপ থাকে। এই নীরবতার পেছনে একটা সূক্ষ্ম উদ্দেশ্য ছিল। মুহিত কি সাইফের শর্তে রাজি হয়েছিল নাকি লোভের বিপরীতে ভালোবাসার জয় হয়েছিল?
৮। "পরাজয়" - গ্রামের বাড়িতে ঘুরতে গিয়ে দাদির ঘরে একটা ডায়েরি খুঁজে পায় মামুন। ডায়েরিটা তার মায়ের। বাড়ি থেকে ফিরে আসার দুদিন পর বিষ মেশানো পানি পান করে অসুস্থ হয়ে পড়ে সে। সন্দেহের তীর ছুটে যায় মামুনের সৎমা সেলিনা বেগম এবং তার এক দূর-সম্পর্কীয় বোনের মেয়ে রহিমার দিকে। ডায়েরিতে কী লেখা ছিল? মামুনকে বিষ খাইয়ে কে হত্যা করতে চেয়েছিল? রহস্যের বেড়াজালে শেষপর্যন্ত কার পরাজয় হয়েছিল?
৯। "ভয়ংকর যাত্রা" - ভার্সিটি বন্ধ দেয়ায় ছুটি কাটাতে মামার বাড়িতে যাবার পথে রাস্তায় হঠাৎ মাইশাদের বাস নষ্ট হয়ে পড়ে। বাস ঠিক করতে বেশ সময় লাগায় তার পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়ে যায়। যাত্রাপথে সে মুখোমুখি হয় ভয়ংকর এক দুঃস্বপ্নের, যার সমাপ্তি ঘটে বাস্তবতার অন্ধকার এক কুঠুরিতে।
১০। "জন্মান্তর" - প্রায় দুইশ বছর আগে রাঘবপুরের জোড় বাংলা হিন্দু মন্দিরে এক অতৃপ্ত আত্মার আবির্ভাবের কারণে মন্দিরের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিহিংসার জেরে পত্রলেখার করুণ পরিণতির সেই আখ্যান যেন দুইশ বছর পরে পুনরায় রচিত হয় ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে। জন্মান্তরের ময়দানে উন্মোচিত সেই কলঙ্কিত অধ্যায়ের অন্তরালে কী রয়েছে?
১১। "পরিকল্পনা" - জেসির সাথে সম্পর্ক শেষ করতে চাইলেও রবিনের জীবন থেকে সে কিছুতেই সরে দাঁড়াতে চায় না। কিন্তু ধর্ষিতাকে কোনোভাবেই নিজের স্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে চায় না রবিন। এদিকে শহরে পরপর তিনটে খুন হয়, যার সাথে কোনো না কোনোভাবে পুলিশ রবিনের যোগসূত্র খুঁজে পায়। পরিকল্পনার শেষ দানের অপেক্ষায় থাকে অপরাধী!
১২। "সিক্রেট প্ল্যান" - রেললাইনের ধারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা এক বীভৎস লাশকে ঘিরে গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। লাশটি ছিল ধনগ্রামের মেয়ে কোহিনূরের। কয়েকমাস তদন্তের পর কোনো কূল-কিনারা না হলে একে আত্মহত্যা বলে ধরে নেয়া হয়। তবে নতুন সাব-ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমানের নেতৃত্বে পরবর্তীতে নতুনভাবে তদন্ত শুরু হয়। ঘটনাচক্রে জোবায়েরের স্ত্রী তারিনের বয়ান থেকে জানা যায় অভিনব সব তথ্য। মাহফুজ কি কোহিনূর হত্যার মূল হোতা ও তার সহকারীকে খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়েছিল?
১৩। "সাইরাস-৩৭" - কৌতূহলের বশে একটা ফিশিং ওয়েবসাইটে ঢুকে পড়তেই নিজের অজান্তে সুজন অকল্পনীয় এক অভিযানের অংশ হয়ে পড়ে। এক সপ্তাহের মাঝেই তার মাধ্যমে নেটওয়ার্কের এই ছিদ্রাল পথে বায়োইনফরমেটিকস আর টেকনোলজির অদ্ভূত সমন্বয়ে তৈরি এক ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। সাইরাস-৩৭ এর সাথে এই ভাইরাসের কী সম্পর্ক?
১৪৷ "স্বপ্নের সমাধি" - গল্পের শুরুতে নীলকুঞ্জে আয়োজন করা এক পার্টি থেকে হঠাৎ দুর্ঘটনার মুখে পড়ে শিহাব। দুর্ঘটনার শেষটায় মোড় ঘুরিয়ে দেয়া নতুন এক গল্পের মুখোমুখি হয় সে। অলীক আর সত্যের অভেদ্য সব বিভ্রান্তির মাঝে বাস্তবতার শেষ থেকে স্বপ্নের শুরু হয়, নাকি স্বপ্নের সমাপ্তিতে বাস্তবতার পরত খুঁজে পাওয়া যায়?
🌸পাঠপ্রতিক্রিয়া
"তোমার জন্য একশো লাল গোলাপ" গল্পের প্লটটা বেশ আকর্ষণীয় ছিল, একেবারে গল্পের শেষ অবধি যেন রহস্যের রেশ রয়ে যায়। তবে শুরুর দিকে যেভাবে কাহিনী বিস্তৃত হয়েছে, শেষটায় গিয়ে মনে হয়েছে সবটা দ্রুত শেষ হয়ে গিয়েছে।
"এক পশলা বৃষ্টি" গল্পের সবচেয়ে উপভোগ্য ব্যাপার ছিল এই গল্পের বর্ণনার ধরণ। কথকরূপে দৃষ্টি যেন পাঠকের সাথে আড্ডার ছলে তার গল্প বলে গিয়েছে শেষ পর্যন্ত।
"দুঃস্বপ্ন," "ভয়ংকর যাত্রা," "সিক্রেট প্ল্যান" কিংবা "পরিকল্পনা" এই গল্পগুলো মূলত একই বিষয়কে কেন্দ্র করে রচিত হলেও প্রতিক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন আবহ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যেটা বেশ চমকপ্রদ ছিল।
তবে "পরিকল্পনা" গল্পের আইডিয়াটা দারুণ হলেও কিছু অংশে খাপছাড়া লেগেছে। লেখক পুরো গল্পটা একদিক থেকে সাজিয়েছেন, যেখানে রবিনকে সবকিছুর সাথে জড়িত দেখিয়ে রহস্য ঘনীভূত করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। তবে শুরু থেকে রবিনের উপর পুলিশের সতর্ক নজরদারির পরেও অন্যান্য সম্ভাবনা না খতিয়ে তাকেই বারবার দায়ী করার বিষয়টা তদন্ত প্রক্রিয়াকে বেশ দুর্বল করে ফেলেছে। আরেকটু বড় কলেবরে গল্পটা সাজানো হলে হয়তো এই একপেশে ভাবটা কাটিয়ে ওঠা যেত।
বইয়ের সবকটা গল্পের মাঝে মিষ্টি একটা গল্প ছিল "অদ্ভুতুড়ে।" থ্রিলার ব্যাপারটা যে খুন, ধর্ষণের মতো জটিল বিষয় বাদে ঘরোয়া পরিবেশের মাঝেও উপভোগ্য হয়ে উঠতে পারে, এই গল্পটা যেন তারই প্রমাণ।
"বহুরূপী" গল্পের এন্ডিংটা দারুণ ছিল। ডায়েরি, হত্যার ঘটনার বিবরণ আর সবশেষে মূল রহস্য উদঘাটন- লেখিকা এখানে মুন্সিয়ানার সাথে একটা প্রেডিক্টেবল গল্পের ইতি টেনেছেন বলা যায়।
"কথানক-২" এ নবীন লেখকদের গল্পগুলোর মাঝে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিপুণভাবে গড়ে তোলা একটা গল্প হলো "অমাবস্যায় জ্যোৎস্নালোক।" গল্পের এক্সিকিউশন খুবই ভালো ছিল। লেখিকা শুরু থেকে টুকরো টুকরো করে লেখা প্রতিটা ঘটনাকে শেষ পর্যন্ত সুন্দরভাবে জুড়ে দিয়েছেন। তাই প্রতিবারই যেসব ছোটখাটো প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছিল, গল্পের শেষে সবকিছুর উত্তর পেয়ে তৃপ্ত হয়েছি।
"পরাজয়" গল্পে অপরাধবোধের অনুভূতি জাগিয়ে তোলা, "ভাইজান" গল্পে অপরাধের সাম্রাজ্যে উদ্দেশ্য একই হলেও স্বার্থের লড়াইয়ে রুম্মান, ফিরোজ খান এবং এমপি বকুল খন্দকারের অবস্থান ও ক্ষমতানুযায়ী পার্থক্য প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে যেন গল্পের আড়ালে বাস্তবতার সূক্ষ্ম কিছু রূপ প্রকাশ পেয়েছে।
শেষবেলায় "জন্মান্তর" গল্পে দুইশত বছর আগের সময়ে পাড়ি দেয়ার ঘোর কাটতে না কাটতেই "সাইরাস-৩৭" এর মধ্য দিয়ে অদূর ভবিষ্যতের এক সম্ভাব্য জগত ভ্রমণ করে এলাম যেন! সবশেষে "স্বপ্নের সমাধি" গল্পের গতি রীতিমতো দুর্দান্ত ছিল! গল্পের শেষটা জানার জন্য আগ্রহের পাল্লা শেষ লাইন অবধি তেজি ঘোড়ার মতো ছুটিয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছি।
পাঠক হিসেবে আমি সাধারণত উপন্যাস পড়তে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলেও গল্পসংকলন যেন বর্তমানে অধিকাংশ নবীন লেখকদের লেখার সাথে পরিচিত হওয়ার সবচেয়ে প্রচলিত মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলশ্রুতিতে সাম্প্রতিক সময়ে ছোটগল্প পড়ার মাত্রাও আগের তুলনায় অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। তবে নবীন লেখকদের লেখা পড়তে গিয়ে সবচেয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় যখন গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লেখার ধরণ থেকে শুরু করে প্লট, টুইস্ট সব ঠিক থাকলেও তারা উটকো যুক্তি দিয়ে গোঁজামিলে ভরিয়ে গল্পের ইতি টেনে দিয়ে গোটা গল্পের স্ট্রাকচারটাকেই দুর্বল করে ফেলেন। এদিক থেকে কথানক-২ এর লেখকদের জন্য এই অভিযোগ খাটে না বললেই চলে। তবে বইয়ে কিছু কিছু গল্পে ভুল বানান বেশ চোখে পড়েছে। এছাড়া ৩০ নং পৃষ্ঠার দ্বিতীয় লাইনে "সবাই" শব্দটি দুইবার এসেছে।
টুকটাক মুদ্রণজনিত ভুল আর বিস্তৃতির অভাবে কিছু গল্পের আশানুরূপ সমাপ্তির ঘাটতির বাইরে পুরো বইটা দারুণ সব রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ ছিল। থ্রিলার, পরাবাস্তব আর সাই-ফাই জনরার নবীন লেখকদের এই বইটা ভালো হবে কি না সেসব না ভেবে টুক করে একটা গল্প নিয়ে বসে পড়লেই দেখবেন গল্পটাই আপনাকে শেষ পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে! আর শেষটায় গিয়ে হয় আপনি চমকে যাবেন, না হয় বিভ্রান্ত হয়ে পড়বেন, তবে আশাহত হবেন না, এ কথা আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি।
শ্রদ্ধেয় বদরুল মিল্লাত সম্পাদিত 'কথানক-২' বইটি সম্প্রতি পড়ে শেষ করেছি। স্যারের সম্পাদিত বইগুলো পড়ে বিশেষ প্রাপ্তি হলো ব্যক্তিগতভাবে লেখালেখিতে উদ্বুদ্ধ হই। মনে হয় যে, বইটি পড়ে কিছু না কিছু নতুনভাবে আমার সাথে যোগ হলো। এটার ক্ষেত্রেও তেমন প্রভাব পড়েছে।
ক্রিয়েটিভ রাইটিং কোর্স সম্পন্নকারী শিক্ষার্থীদের লেখা থ্রিলার, পরাবাস্তব ও সাই-ফাই গল্প সংকলন হলো কথানক-২। এতে মোট চৌদ্দটি গল্প রয়েছে।
০. বইয়ের প্রচ্ছদ - সুপ্রতীক সরকার বইটা মূলত নহলী ক্রিয়েটিভ রাইটিং কোর্স-২১ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের লেখা। বইটির অসাধারণ প্রচ্ছদটা করেছে আমাদের প্রিয় সুপ্রতীক। সেও এই ব্যাচের কোর্স সম্পন্নকারী শিক্ষার্থীদের একজন। এজন্য তাকে '০' বিশেষ ক্রমিক নাম্বার দিয়ে প্রকাশ করলাম।
১। তোমার জন্য একশো লাল গোলাপ - আফিফা পারভীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন সদস্য এবং তার স্ত্রীকে কেন্দ্র করে রচিত একটা গল্প। যাদের বিয়ের ঠিক এক বছর পূর্ণ হয়েছে। সেদিনই এই দম্পতির জীবনে নেমে এসেছে কালো অধ্যায়। সেই অঘটনের মধ্যেও এমন এক কাকতালীয় কিংবা অন্যরকম এক ঘটনার সাক্ষী হয়েছে রুমকি। যার প্রভাব হয়ত তার সাথে আজীবন থেকে যাবে!
গল্পটিতে ���্যাপ্টেন ফয়সালের দেশপ্রেম যেমন ফুটে উঠেছে, তেমনি স্ত্রী রুমকির প্রতি তার ভালোবাসা দারুণভাবে ফুটে উঠেছে।
২। এক পশলা বৃষ্টি - সিতাপ পাল দৃষ্টির সৎমা তাকে পছন্দ করেন না। একারণে সে মায়ের উপর চরম বিরক্ত। এতটাই বিরক্ত যে, তাকে কৌশলে হত্যা করার পরিকল্পনা করে ফেলে। পরিশেষে জানা গেল হত্যার অন্য আরেক রহস্য। যে ঘটনা তার জীবনকেই পাল্টে দিয়েছে।
৩। দুঃস্বপ্ন - ফারিয়া নাজনীন ছোটবোন রাইসা খুন হওয়ার কয়েকমাস পর থেকে ফাইজা প্রায়ই একটা দুঃস্বপ্ন দেখে। সেই দুঃস্বপ্ন বোনের খুনীদের চিহ্নিত করতে সাহায্য করে এবং খুনিদের তালিকায় চলে আসে কাছের মানুষও।
৪। অদ্ভুতুড়ে - ফারাভী তানজিনা শ্রাবন্তীদের বাড়িতে একের পর এক অদ্ভুত কিছু ঘটনা ঘটতে থাকে। যেটা তাদের পরিবারের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দেয়। অবশেষে মিন্টু মামা তার রহস্য উদঘাটন করলেন।
৫। ভাইজান - এইচ আর মিথেল আমাদের সমাজে ঘটে যাওয়া অপরাধকর্মের অপরাধী চিহ্নিত হয়। এই ধরনের অপরাধীরা ছাড়াও মুখোশের আড়ালে থেকে যায় প্রকৃত অপরাধীরা। এমনই এক অপরাধীর মুখোশ উন্মোচনের গল্প হলো 'ভাইজান'।
৬। বহুরূপী - নাদিয়া মাহমুদ (দিয়া) অস্বাভাবিক আচরণের জেরে রিফাকে নেয়া হয় সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে। ডাক্তারের কাছে সে একের পর এক খুনের স্বীকারোক্তি দেয়। খুনের ঘটনাগুলোর বর্ণনা সে ডায়েরিতেও লিখে রাখে। আসলেই কি সে খুন করে নাকি অন্য কিছু? অবশেষে ডাক্তার তার রহস্য উদঘাটন করেন।
৭। অমাবস্যায় জ্যোৎস্নালোক - নুসরাত জাহান লিজা মুহিত আর নীতুর সুখের সংসারে হঠাতই যেন টানাপোড়েন শুরু হলো। একদিকে নীতুর অতিপ্রাকৃত আচরণ, অন্যদিকে লোভের বশবর্তী হয়ে মুহিতের অন্য এক ফাঁদে পা দেয়ার ঘটনা। এই টানাপোড়েন শেষ হয়ে একদিন অমাবস্যায় জ্যোৎস্নালোক দেখা গেলেও থেকে গেল কিছু রহস্য!
৮। পরাজয় - কমল উদ্দিন মামুনকে হাসপাতালে নিয়ে জানা গেল সে বিষ খেয়েছে। অথচ তার স্বীকারোক্তি বিষ খাওয়ার বিপক্ষে। পরিশেষে এক চিঠির মাধ্যমে জানা গেল বিষ খাওয়ানোর আসল এবং খুব সূক্ষ্ম একটা রহস্য!
৯। ভয়ঙ্কর যাত্রা - সমিরুন নেছা শারমিন ছুটিতে মামার বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছে মাইশা। বাসের সিটে ঘুমিয়ে ভয়ঙ্কর এক স্বপ্ন দেখল। এটা নিছক স্বপ্ন হওয়ায় মনে কিছুটা প্রশান্তি কাজ করলেও বাস থেকে সে দেখল স্বপ্নের পুনরাবৃত্তি ঘটতে যাচ্ছে!
১০। জন্মান্তর - শান্তা নাজনীন দুইশো বছরের আগেকার ঘটনা কথককে নতুন আরেকটি ঘটনার সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে, যেখানে বেরিয়ে আসছে একটা খুনের রহস্য।
১১। পরিকল্পনা - শরীফুল ইসলাম পর পর তিনটা খুন। নিহতরা পরস্পরের বন্ধু। ধর্ষিতা নিজ হাতে তাদেরকে খুন করেছে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে প্রত্যেকটা হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে তার বয়ফ্রেন্ডের নাম!
১২। সিক্রেট প্ল্যান - নাফিসা ইয়াসমিন রেল লাইনে পাওয়া গেল কোহিনূরের ক্ষতবিক্ষত লাশ। সেটাকে নিছক আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিলেও একসময় পরিকল্পিত খুনের রহস্য বেরিয়ে আসে।
১৩। সাইরাস-৩৭ - বিনিয়ামীন পিয়াস সাইরাস-৩৭ নামের পৃথিবীর এক প্রতিবেশী গ্রহের বিজ্ঞানীদের রয়েছে পৃথিবী জয়ের নেশা। দীর্ঘসময় ধরে গবেষণার পর তারা সাফল্যও পেয়ে যায়। সুজন নামের এক যুবক হয়ে গেল তাদের নিয়ন্ত্রিত প্রথম সদস্য!
১৪। স্বপ্নের সমাধি - বদরুল মিল্লাত শিহাব নামের এক ভদ্রলোকের জীবনে অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে। কিন্তু সেই ঘটনাগুলো স্বপ্নে ঘটছে নাকি বাস্তবে? বাস্তবের কূল-কিনারা খুঁজতে গিয়েও রহস্য থেকে গেল!
বইটির প্রতি ছোট্ট অভিযোগ হলো বানান ভুলের ব্যাপারটা। এটা এড়াতে পারলে আরো ভালো হতো।
নবীন লেখকদেরকে কথানক-১, ২ বিশেষভাবে সাজেস্ট করছি। আশা করি অসংগতিহীন সাবলীল গল্প লেখার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।