'ওডিনের শেষ দিন'; বিষণ্ণ কাব্যিক একটা নাম। অন্তত আমার কাছে তো তাই মনে হয়েছে। বিষণ্ণ কাব্যিক নাম হলেও নজরুল ইসলামের লেখা এই উপন্যাসিকাটা কিন্তু মোটেও লিটার্যারি ফিকশন টাইপ কিছু না৷ বরং একটা মার্ডার মিস্ট্রির সাথে পুলিশ প্রসিডিউরাল এর জম্পেশ কম্বিনেশন।
উপন্যাসিকা শুরু হয় বিশিষ্ট ধনকুবের তরফদার গ্রুপ অব ইন্ড্রাস্ট্রির ম্যানেজিং ডিরেক্টর জাভেদ তরফদারের মৃত্যু দিয়ে। পাঠকরা অজ্ঞাত খুনীর দ্বারা খুনের সিন আবছা ভাবে প্রথমে দেখতে পেলেও সেটা স্রেফ পাঠকরাই জানেন, উপন্যাসের চরিত্ররা জানেন ৮০+ বয়সের জাভেদ সাহেব মারা গেছেন হৃদরোগে। ভদ্রলোকের শারীরিক অবস্থা এতটাই খারাপ ছিলো যে হৃদরোগে মারা না গিয়ে তিনি খুন হলেও হতে পারেন, এটা কারো মাথায়ই আসেনি। কিন্তু জাভেদ তরফদার মারা যাবার ৩ সপ্তাহ পর তার স্ত্রী সন্দেহ প্রকাশ করেন খুনের বিষয়ে৷ আর তখনই মাঠে নামে পিবিএই এর গোয়েন্দা আবুল হাসনাত আর সিদ্দিক জুটি। মিসেস জাভেদ সন্দেহ প্রকাশ করলেও কে খুন করতে পারেন সে সম্পর্কে কোন সন্দেহ প্রকাশ করেননি। ওদিকে অনেক ধনী পরিবারেই সন্তানদের মাঝে যে অসুস্থ প্রতিযোগীতা দেখা দেয়, এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়৷ জাভেদ তরফদারের দুই ছেলের যত না আগ্রহ বাবা খুনি চিহ্নিত করায় তারচেয়ে বেশি আগ্রহ একজন আরেকজন খুনী সাব্যস্ত করায়। উদ্দেশ্য, অপরজনকে ফাঁসিয়ে নিজে সিংহাসনে বসা। ওদিকে তাদের মা মিসেস জাভেদ, দুই ছেলের কাউকেই সমর্থন দিচ্ছেন না। দুই ছেলের কারো সাথেই না থেকে থাকছেন তাদের গাজীপুরের বাংলো বাড়িতে। এমনকি দেখাও করছেন না পরিবারের কারো সাথে। হাসনাত সাহেবের দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে সময় লাগেনা। বুঝতে পারেন, মা কোন ছেলেকেই সমর্থন দিচ্ছেন না কারণ তিনি সন্দেহ করেছেন, দুই ছেলের মাঝেই আছে তার স্বামীর খুনি। পুলিশের শরনাপন্ন হয়েছেন যাতে পুলিশ আসল খুনিকে খুঁজে বের করতে পারে এবং অপর ছেলেকে তিনি সমর্থন দিতে পারেন। কিন্তু আসলেই কি ঘটনা এত সহজ? আকিব তরফদার আর জাহিদ তরফদারের, এদের কেউই কি খুনটা করেছেন নাকি এর সাথে জড়িত আছে অন্য কেউ? যদি থেকেই থাকে তাহলে সে এই পরিবারের সাথে কিভাবে জড়িত? তবে কি ফিরে যেতে হবে খুন হওয়া ধনকুবেরের অতীতের দিনগুলোতে?
দারুণ কিছু সম্ভাবনা নিয়ে এগিয়ে গিয়েছে বাতিঘর থেকে অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত নজরুল ইসলামের উপন্যাসিকা 'ওডিনের শেষ দিন'। সাসপেন্স আর খুবই সুন্দর লিখনশৈলীতে ১৪৪ পেজের এই বইটি চাইলে এক বসায়ই শেষ করা ফেলা সম্ভব। বইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হচ্ছে লেখকের লিখনশৈলী। লেখক Don't tell, show এর নিয়ম মেনে ন্যারেটিভ স্টাইলে পাঠককে বলার যাইতে ঘটনাপ্রবাহ দিয়ে পাঠককে দেখাতে চেয়েছেন। যে কারণে, আকিব তরফদারের বদমেজাজী স্বভাবের বর্ণনা আমরা শুরুর দিকেই জানতে পারি। একই ঘটনা ঘটে দীপা চক্রবর্তী প্রসঙ্গে জাহিদ তরফদারের ক্ষেত্রেও। আমার মনে হয় লেখকের স্পেশালিটি এখানেই। আকিব তরফদার বদমেজাজী, জাহিদ তরফদারের নারী আসক্তি রয়েছে - এই লাইনগুলোর লিনিয়ার বর্ণনার চাইতে ঘটনাপ্রবাহ পাঠকের মনে বেশি ছাপ ফেলে। ঘটনা প্রবাহ পড়ার মধ্য দিয়ে পাঠক মনে মনে চরিত্রগুলোর একটা ছবি মনে অজান্তেই দাঁড় করিয়ে ফেল�� যেগুলো গল্পের বাঁকে বাঁকে তাকে আরো গভীরভাবে রিলেট করতে সাহায্য করে। এছাড়া লেখক পুলিশ প্রসিডিউরিং এ শুধু কেস অফিসারের কাজের বর্ণনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। বইতে যথাসময়ে এসেছে ফরেনসিক ও আইটি। এবং এদের সাথে হাসনাত সাহেবের কথোপকথনে শুধু উপন্যাসের কেস নিয়েই কথা হয়েছে এমনটা নয়। কেসের বাইরেও অন্য কেস নিয়ে কলিগদের মধ্যে যে সাধারণ গসিপ হয় সেটাও উঠে এসেছে এ বইতে, যা বইকে করেছে আরো বাস্তব সম্বলিত। এই ছোট ছোট রাইটিং টুলগুলোর ব্যবহারের কারণে নজরুল ইসলামের লেখা আমাকে মুগ্ধ করেছে। ১৪৪ পৃষ্ঠায় খুব বেশি চরিত্রায়নের সুযোগ না পেলেও আবুল হাসনাত চরিত্রটি আমার বেশ লেগেছে। তবে সিদ্দিক চরিত্রটি আরেকটু ডিটেইলিং পেলে আরো জমতো। তবে আরো জমিয়ে হাসনাত-সিদ্দিক জুটির লেখা আরো আসবে, লেখক যদি এমনটা ভরসা দেন তাহলে আর এ অভিযোগও থাকবে না। ও হ্যাঁ, যারা বইতে টুইস্ট ভালোবাসেন, 'ওডিনের শেষ দিন' তাদেরকে নিরাশ করবেনা। শেষের দিকে বেশ কিছু টুইস্ট আছে যা পাঠককে নিঃসন্দেহে বিস্মিত করবে।
দুয়েকটা ভুল যে চোখে পড়েনি, তা নয়। যেমন : জাভেদ সাহেবের ছেলেরা বলছিলো, ইপিজেড ওমুকের নামে লিখে দিয়েছে। এখানে বলতে চাই, আমি যদ্দুর জানি ইপিজেড সরকারী জায়গা। ওখানে ফ্যাক্টরী বানাতে চাইলে সরকারের পক্ষ থেকে অনুমতি নিয়ে, লিজ নিয়ে ফ্যাক্টরী বানাতে হয়৷ এটা কারো ব্যাক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি না যে চাইলেই ইপিজেড কাউকে লিখে দেয়া যাবে। আরেক জায়গায় দেখলাম, কোন একজনকে ধরতে সিদ্দিক আর হাসনাতকে সাহায্য করে ট্রাফিক পুলিশ। ট্রাফিক পুলিশ কেন সাহায্য করেছে সে প্রশ্ন করলে ট্রাফিক পুলিশ বলে, সে সিদ্দিক সাহেবকে দেখেছে একটা লোককে ধাওয়া করতে। তো পুলিশ যখন কাউকে ধাওয়া করে সে তো লোক ভালো নয়। তাই সে পুলিশকে সাহায্য করেছে৷ এখানে কথা হচ্ছে, সিদ্দিক যে পুলিশ তা ঐ ট্রাফিক পুলিশ বুঝলো কিভাবে? সিদ্দিককে আমরা পুরো বইতেই দেখেছি সাদা পোশাকে (জায়গায় জায়গায় সে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়েছে)। ওখানে কি সিদ্দিক পুলিশের পোশাকে ছিলো?
২০০ টাকা মুদ্রিত মূল্যের ১৪৪ পেজের বইয়ের প্রোডাকশন নিয়ে বলার কিছু নেই৷ বাতিঘরের রেগুলার প্রোডাকশন যেটা কিনা আমার কাছে ভালোই মনে হয়। তবে প্রচ্ছদটা আমি একদমই বুঝতে পারিনি। একে তো একেবারেই দায়সারা গোছের প্রচ্ছদ, যেখানে প্রচ্ছদ শিল্পীর হাতে একদমই সময় ছিলোনা বলে মনে হচ্ছে। আর তাছাড়া প্রচ্ছদে যে এলিমেন্ট ব্যবহার হয়েছে তাতে হুইলচেয়ার বাদে বাকি সবকিছুই আমার কাছে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও ক্ষেত্র বিশেষে মিসলিডিং মনে হয়েছে। এ বই কেউ পড়ে থাকলে এবং বইয়ের গল্পের সাথে প্রচ্ছদকে মেলাতে পারলে আমাকে ইনবক্সে বোঝানোর অনুরোধ রইলো।
তো এই ছিলো 'ওডিনের শেষ দিন' নিয়ে আমার পাঠ-প্রতিক্রিয়া। আমার ক্ষেত্রে বই পড়ে সময় এবং টাকা দুটোই উসুল হয়েছে। যারা মার্ডার মিস্ট্রি, পুলিশ প্রসিডিউরাল পছন্দ করেন তারা নিঃসন্দেহে বইটা পড়তে পারেন। আশা করি হতাশ হবেন না।