শেষ করলাম বিসর্জনের দ্বিতীয় সত্তা। নিজের কমফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী একটা কাজ করেছেন লেখক বাপ্পী ভাই। সমকালীন বা সামাজিক জনরার সাথে কিছুটা অপরাধের মিশ্রণ ঘটিয়ে অন্যরকম একটা লেখা বিসর্জনের দ্বিতীয় সত্তা। গ্রামের সরল সহজ এক লোককে পরিস্থিতির ফাঁদে ফেলে, বোকা বানিয়ে নিঃস্ব করে দেয়া, এরপর ওই লোকের হারানো সবকিছু ফিরে পাওয়ার লড়াই নিয়েই লেখা নভেলাটা। মানুষ যে নিঃস্ব অবস্থাতেই সবথেকেই ভয়ঙ্কর সেই প্রমাণ আবারও পাওয়া গেল বইটাতে। হাসিরাজ নামক চরিত্রটা ভালো লেগেছে, বিশেষ করে তার ছোটছোট কৌতুক ও তার রহস্যময়তা। লেখনশৈলী অকল্পনীয়। আবেগ দিয়ে সাজানো হয়েছে বাক্যগুলো। আবার বাক্য দিয়েই আঘাত করা হয়েছে পাঠককে। বইয়ে চরিত্র মাত্র কয়েকটা। এই ছোট বইয়েও লেখক প্রত্যেকটা চরিত্রই ভালোভাবে ডেভেলপ করেছেন। নভেলাটা ক্যারেক্টার বেজড। চরিত্ররাই কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। সবমিলিয়ে গল্পটা প্রতিশোধের, মহানুভবতার, ভালোবাসার। যারা ভিন্নধর্মী কিছু পড়তে চান তারা অবশ্যই পড়বেন।
বাপ্পী ভাইয়াকে ধন্যবাদ বইটা উপহার দেয়ার জন্য। বইমেলাতে পাওয়া আমার প্রথম উপহার এই বইটা।
কম্ফোর্ট জোন থেকে বের হয়ে লেখা অনেক কষ্টসাধ্য কিন্তু সেটা যদি ভালো ভাবে তুলে ধরতে পারেন তাহলেই লেখক সফল। বাপ্পী খানের এই বইটাও তেমন। সমকালীন জনরায় সাধারণ একটা গল্পে দুইজনের জীবন সুন্দর ভাবে মেলে ধরেছেন লেখক। একজন আছেন প্রতিশোধের আগুনে জলন্ত আরেকজন বুক ভরা গান বিলিয়ে দেওয়ায় কর্মরত। সমাপ্তিটা সুন্দর ছিল।
P.R: 3/5 একদমই ব্যতিক্রমী বা অসাধারণ কোনো গল্প নয় তবে ছোট্ট এই গল্পটি মনে ধরার মত। আর এর মূল নিমিত্ত হচ্ছে লেখকের সুন্দর লেখনশৈলী। গুটিকয়েক সাধারণ মানুষের গল্প এটি। তাদের ভাগ্যের পরিহাস এবং পরিস্থিতির গল্প এটি। গল্পটি কিছুটা সামাজিক ব্যাখ্যান, কিছুটা প্রতিশোধ, আর অনেকটা ভালবাসা ও কষ্ট মিশ্রিত। প্রতিশোধ গল্পের মুলে থাকলেও এটাকে "revenge-thriller" জনরাতে ফেলা ভুল হবে। বলা যায় এটি একটি সমকালীন বা সামাজিক নভেলা।
বইটি পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে কিছু ক্ষেত্রে একটু তড়িঘড়ি করা হয়ে গিয়েছে। গল্পটা আর একটু বড় হলে মন্দ হত না। কিছু বানান ভুল ছিল আর ২ জায়গায় সুরুজ ও কদম নামদুটি অদল-বদল হয়ে গিয়েছে। এছাড়া সামগ্রিক প্রোডাকশন, প্রচ্ছদ ভাল ছিল।
আমার পড়া লেখকের প্রথম বই এটি। তার লেখনশৈলী ও গল্প বলার ধরন বেশ প্রশংসনীয়। অনেকদিন পর কোনো কনটেম্পোরারি বইয়ে "soliloquy" এর ব্যাবহার দেখে ভালই লাগল। তার আরও কিছু বই সংগ্রহে আছে। খুব শীঘ্রই ওগুলো শুরু করব।
আমরা নিজের আবেগ-অনুভূতি, দুঃখ-কষ্ট যতটা বুঝতে পারি অন্যেরটা সেভাবে বুঝতে পারি না অথবা বোঝার চেষ্টা করি না। হাসির আড়ালে চাপা কষ্ট গোচরেই থেকে যায়। একেকজনের জীবনের গল্পের দৃষ্টিভঙ্গিও ভিন্ন। জীবনে সুখের আশায় কারো চাওয়া হয়তো পাহাড় সমান, কেউ আবার অল্পেই খুশি। সুরুজ দ্বিতীয় কাতারের। সন্তান আর প্রিয়তমা স্ত্রীকে নিয়ে সুখে দিন গুলজার করতে পারাটাই তার লক্ষ্য। বিয়ের আগে নানা দস্যিপনা করা সুরুজ সংসারে মন দিয়েছে, সুখে আছে এর থেকে ভালো আর কী হতে পারে?
কিন্তু সুখ তো সবার কপালে সয় না। কারো সুখে নজর লেগে যায়। তাতে ছারখার হয়ে যায় সব। সুরুজের সংসারে কালো দৃষ্টি ছিল চেয়ারম্যানের ছেলে সুষমের। ধীরে ধীরে তাকে গ্রাস করে নিচ্ছিল সে। ঘুণাক্ষরেও টের না পাওয়ার পরিণতিতে তাকে ভুগতে হয়েছিল সর্বস্ব হারিয়ে। এরপর কেটে যায় দীর্ঘ এক সময়। সুরুজ অতীতের হিসেব চুকাতে ঘুরছে এক বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে। সফল হতেই হবে এবার। আগেরবারের মতো বেণী পুড়ে হাতে আসলে হুশ হবার উপায় নেই আর। সকলকে হাসিতে মাতিয়ে রাখা লোকটা পরিচিত ❛হাসিরাজ❜ নামে। মজার কৌতুক, গল্প আর বলার ভঙ্গিতে লোকে হেসে একাকার হয়ে যায়। এতে পকেটও ভরে তার। সদা হাস্যোজ্জ্বল মানুষটার দিকে একটু নজর দিলে বোঝা যায় চোখের কোথায় যেন এক পুকুর দুঃখ। ভেতরে যেন বইছে অজানা এক বিস্বাদ। স্টেশনে লোক হাসিয়ে একসময় বেশ বদলে বাসে চেপে কোথায় চলে সে? স্টেশনে বসে থাকা সুরুজ আর হাসিরাজের মাঝে কোন এক অতীত আছে। অতীত খুঁড়তে গিয়ে নিজের কাছে কোন সত্য উন্মোচন হবে? প্রথমবার বিসর্জনের কষ্ট থেকে দ্বিতীয়বার মুখোমুখি হওয়া সত্যের বিসর্জনের মাত্রা কতটুক হবে?
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
কথায় আছে, ❛আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারী❜। ❝বিসর্জনের দ্বিতীয় সত্তা❞ বইটা নেয়ার সময় আমার এই প্রবাদটাই কাজ করেছে। দেখতে সুন্দর বইটা আমি কোনো চিন্তা না করেই সংগ্রহ করেছি। লেখক বাপ্পী খানের লেখা প্রথমবারের মতো পড়লাম। সামাজিক বা সমকালীন ধারার উপন্যাসিকা এটি। পড়তে মন্দ লাগেনি। গ্রামীণ পরিবেশের মধ্যে বেড়ে ওঠা কাহিনিটা এগিয়েছে শহরেও। ব্যাপ্তি খুব একটা ছিল না। তবে যেটুক ছিল সেখানে লেখকের লেখার মুন্সিয়ানা প্রকাশ পেয়েছে ভালো। গ্রামীণ রাজনীতি, ক্ষমতার দাপটে সব হাসিল করা এবং পরিণতি ছিল সুন্দর। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ লেখক সাজিয়েছেন সুন্দরভাবে। চরিত্রের উপস্থিতিওছিল সামান্য। তবে যারা ছিল তারা প্রত্যেকেই পরিমিত। সুরুজ, হাসিরাজ চরিত্রের মাধ্যমেই পুরো গল্প এগিয়েছে। তাদের দুজনের মনস্তাত্ত্বিক বর্ণনা এবং আবেগ, অনুভূতির মাধ্যমে বাকি চরিত্রদের আগমন ঘটেছে। দুইজনের ভিন্ন চিন্তাধারার ব্যাপারটা আমার বেশ লেগেছে। আসলেই আমরা আমাদের দিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অনেক কিছুই ব্যাখ্যা করি, ভেবে বসি। তার কতটুকু সত্য বা মিথ্যা সেটা ঠাওর করি কম। উপন্যাসিকায় এই দিকটি লেখক সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন। শুরুর দিকের ঘটনা এবং মাঝের দিকের ঘটনা থেকে শেষটা আঁচ করতে পারছিলাম কেমন হতে পারে। এবং তাই হয়েছে। মাঝের দিকে এসে আমার কিছুটা একঘেয়ে লাগছিল। মনে হচ্ছিল একটু বাড়তি লেখা আছে। তবে পুরো উপন্যাসের চুম্বক দিক ছিল শেষ দৃশ্য বা শেষের কয়েক অধ্যায়। সমাপ্তিতে লেখক যে আবেগপ্রবণ দৃশ্যের অবতারণা করেছেন সেটা দারুণ ছিল। বিশেষ করে হাসিরাজ চরিত্রটা মন ছুঁয়ে যাবার মতো। লেখকের প্রায় সব লেখাই অতিপ্রাকৃত বা ভৌতিক ধারার। নিজের কমফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে নিরীক্ষামূলক এই উপন্যাসিকা লেখার প্রয়াস হিসেবে ভালোই হয়েছে।
প্রচ্ছদ:
শুরুতেই বললাম রূপ দেখে বইটা নিয়েছিলাম। দারুণ এবং কোমল ধরনের এই প্রচ্ছদ বইমেলা ২২ এর অন্যতম সুন্দর প্রচ্ছদ ছিল।
"সব ত্যাগ আর বিসর্জনের খবর সবাই জানে না। জানতে পারে না।কিছু কথা মানুষের মনেই গোপন থেকে যায়।" টানা পড়ে শেষ করলাম। বইটি আমার কাছে অনেক ভাল লেগেছে। নিঃস্বন্দেহে বইটি এবারের বইমেলায় প্রকাশিত অন্যতম সেরা নভেলা। বেশি কিছু বললে স্পয়লার হয়ে যাবে, শুধু বলব যাঁরা নভেলা পড়তে পছন্দ করেন তাঁরা অবশ্যই বইটি পড়ে দেখবেন। মন ছুঁয়ে যাবার মতো একটি বই 💗 হ্যাপি রিডিং
নাম: বিসর্জনের দ্বিতীয় সত্তা লেখক: বাপ্পী খান জনরা: সামাজিক থ্রিলার প্রচ্ছদ: বাপ্পী খান প্রকাশনী: বাতিঘর প্রথম প্রকাশ: মার্চ ২০২২ পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১১০ মুদ্রিত মূল্য: ১৫০/-
তোমারে যে চাহিয়াছে ভুলে একদিন, সে জানে তোমারে ভোলা কি কঠিন। — কাজী নজরুল ইসলাম
সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়াও অতি সাধারণ হয়। তেমনি একজন সুরুজ মিয়া। তবে তা আজ অতীত। এক লহমায় বদলে গেছিল সুরুজ মিয়ার সাজানো-গোছানো টোনাটুনির সংসার। কী বা সে চেয়েছিল জীবনে? জোহরাকে নিয়ে একটু সুখে থাকতে, পিচ্চি রাণীর ছোটখাটো আবদারগুলো পূরণ করতে; এতটুকুই তো! কিন্তু ভাগ্যবিধাতার মর্জি ছিল অন্যরকম। সুরুজ মিয়ার জীবন থেকে হারিয়ে যায় জোহরা আর রাণী, সাথে করে নিয়ে যায় জীবনের সব রঙ...
দীর্ঘ বারো বছরের ক্ষত বুকে নিয়ে ঘুরছে সুরুজ মিয়া। কীভাবে ভুলে যাবে জোহরার বিশ্বাসঘাতকতা? যে প্রিয়তমা স্ত্রী অন্যের হাত ধরে বিপদে রেখে পালিয়ে ছিল, তাকে কি মাফ করা যায়? তার সুখের সংসারে যে আগুন লাগিয়ে ছিল আজ সে পরিচিত ❝হাসিরাজ❞ নামে। অন্যকে যে হাসিয়ে বেড়ায় সারাজীবনের কান্না সে লিখে দিয়েছে সুরুজ মিয়ার কপালে। অতিসাধারণ সুরুজ মিয়া আজ আর অতিসাধারণ কেউ নয়, নামের আগে লিখা হয়ে গেছে ❝খুনের সাজাপ্রাপ্ত আসামি❞। আদরের একমাত্র সন্তান রাণীকে ফিরে পেতে চায়, চায় প্রতিশোধ সকল অন্যায়ের! ভাগ্য কি এবার সহায় হবে?
সামাজিক থ্রিলার শুনলেন মনে ভেসে ওঠে সম্পর্কের জটিল সমীকরণ সাথে রহস্য, একটুখানি খুনখারাবি, পক্ষে বিপক্ষে বিরোধ ; এই তো? সামাজিক উপন্যাস হিসেবে ❝বিসর্জনের দ্বিতীয় সত্তা❞ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় তবে থ্রিলার কিনা এনিয়ে মনে প্রশ্ন থেকে যায়। আদতে থ্রিলারের স্বাদ তেমন পাইনি কিন্তু সম্পর্কের মারপ্যাঁচ ভাবিয়েছে। রহস্যের হালকা ছোঁয়া আছে।
জীবন বড়ই জটিল। জীবনের সংজ্ঞা সকলেই কাছে একই নয় তেমনি একই নয় চাওয়া-পাওয়া। শুরু যেভাবে হয়েছিল তাতে মনে হয়েছে সুরুজ মিয়ার থেকে দুঃখী কেউ হতে পারে না। তবে সমাপ্তি তো বলে অন্য কিছু! বেশ উপভোগ্য ছিল। লেখনশৈলীর জন্য পড়তে কোনো বেশ পেতে হয়নি। এককথায় ঝরঝরে। অল্পকথায় উঠে এসেছে চরিত্রগুলোর অতীত-বর্তমান, সেক্ষেত্রে বলা যায় দুই টাইমলাইনে এগিয়েছে বইয়ের কাহিনী। সার্কাস ব্যবসা, গ্রামীণ জীবন, শহুরে সমাজব্যবস্থা তিনের মিশ্রণে প্রেক্ষাপট। সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে ❝কদম❞ চরিত্রটি। অসমাপ্ত সমাপ্তি তবে তৃপ্তিদায়ক। কিছুটা হতাশ হয়েছি কারণ থ্রিলার বলা হলেও থ্রিলারের কোনো চিহ্ন আসলে পাইনি। আছে কিছু অপরাধ আর প্রকৃতির বিচার। এটাই কি থ্রিলার? আমি সন্দিহান। ওভারঅল ভালোই লেগেছে।
বাতিঘরের প্রোডাকশন নিয়ে আলাদা করে তো কিছু বলার নেই, ভালোই। তবে কিছু বানান ভুল আর টাইপিং মিস্টেক আছে। বিশেষ করে স্বরবর্ণ ও কার এর ব্যবহারে। প্রচ্ছদ ও নামলিপি বেশ নান্দনিক। প্রচ্ছদের কালার কম্বিনেশনটা চোখে পড়ার মতো।
গল্পটা থ্রিলার বলবো নাকি সামাজিক? সুরুজ মিয়ার জীবনে মর্মান্তিক কিছু ঘটে গেছে। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে পড়ে থাকে সে, খুঁজছে কাউকে। অনেক খুঁজাখুঁজির পর এ ঠিকানায় এসে পৌঁছেছে সে। সংসার জীবনে সুরুজ মিয়া বড়ই একা। কী ঘটেছিলো তার সাথে, কেনই তার এ অবস্থা, কাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে সে? এসবের প্রশ্নোত্তরের সাথে একটা ব্যাক স্টোরি দিয়ে একটা ছোট্ট উপন্যাস। সাধারণ এ গল্পটা চাইলে আরও বড় করা যেতো। তবে লেখক সিম্পল রেখেছেন, সুন্দর একটা প্রেজেন্টেশন এর মাধ্যমে।
একটা জীবনে মানুষের চাওয়া পাওয়ার শেষ নেই। মানুষের যত আছে, তার আরও চাই। বেশি চাই। তবে এমন কিছু মানুষ আছে, যাদের চাওয়া সীমিত। একটু ভালো থাকতে পারলে আর কিছু চাওয়ার থাকে না। পরিবার নিয়ে নিশ্চিন্তে দিনযাপনের আশায় চেষ্টার ত্রুটি থাকে না। কিন্তু, জীবন বড়ো অদ্ভুত। জীবনের প্রতিটি পরিচ্ছদে গল্পের বাঁক, যার সাথে মানুষের প্রাপ্তির কিঞ্চিৎ মিল পাওয়া যায়। আবার অনেক সময় সেই মিল দূর মরীচিকা।
সুরুজ জীবনে বেশি কিছু চায়নি। নিজের স্ত্রী, সন্তানকে নিয়ে ভালো থাকতে চেয়েছিল। সুখে শান্তিতে বসবাস করতে চেয়েছিল। সেই সুখের ঘরে কারো বদ নজর পড়েছে যেন। গ্রামীণ রাজনীতির বলি হয়ে সুরুজের জীবনটা এক লহমায় বদলে গেল। ভেতরে ভেতরে গড়ে ওঠা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে হারিয়ে ফেলল নিজের জীবনের ভালো থাকাটুকু। সহজ সরল সুরুজ যা বুঝতে পারেনি। যখন বুঝতে পেরেছে, তখন বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছে।
হাস্যরাজ নামের ব্যক্তিটির হাসির আসর জমেছে বেশ। বিশেষ ভঙ্গিতে বলা কৌতুকগুলোতে হাসির রোল ওঠে। হাস্যরাজের যেন মানুষকে হাসিয়েই আনন্দ। তবে এই আনন্দের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিষাদ কেউ দেখে না। মুখের হাসির দিকে না তাকিয়ে, কেউ যদি চোখের দিকে তাকালে ধরা পড়ত চোখের তারায় থাকা অন্ধকার। তার আর সময় কোথায়? ব্যস্ত নগরীর ব্যস্ত মানুষগুলো ক্লান্ত পথে হাসি, আনন্দ খুঁজলেও কারো দুঃখের ভাগ নিতে চায় না। তাই হাস্যরাজরাও হাসির আড়ালে লুকিয়ে রাখে নিজেদের বেদনার দিনগুলো। যা কেউ জানে না। কেবল নিজের সত্তা-ই এর খোঁজ রাখে। কখনো কখনো ডুব দেয়, নিজের পেছনে ফেলে আসা অতীতে।
সুরুজ নিজের অতীত খুঁজছে। অতীতের টানে ঢাকার কমলাপুর স্টেশনে বসে দেখছে হাস্যরাজের হাসির আসর। হাস্যরাজের কৌতুকে সে বিরক্ত হয়। কৌতুকে বিরক্ত? না- কি সে বিরক্তি নিজের প্রতি? কে জানে? সাধাসিধে জীবনটা ওলটপালট হয়ে যাওয়ায় ক্ষোভ জমেছে মনে। ক্রোধের আগুনে সব ভস্ম করে দিতে ইচ্ছা করে। নিজের ভেতরে একটু একটু করে বাড়তে থাকা চাপা যন্ত্রণাকে পুঁজি করে স্মৃতি হাতড়ে বেড়ায়। সেই স্মৃতি জমা থাকে কিছু সুখ, অনেকখানি দুঃখ। হাহাকার করে ওঠে মন। অতীত খুঁজে পাওয়া যাবে?
লেখক বাপ্পী খানের "বিসর্জনের দ্বিতীয় সত্তা" উপন্যাসিকাটিকে সমকালীন বা সামাজিক জনরায় ফেলা যায়। আবার যেহেতু সেখানে অপরাধের মিশ্রণ ঘটেছে, তাই থ্রিলার বললেও ভুল হবে না। ঠিক থ্রিলার না। উপন্যাসিকাটিতে কিছু মানুষের জীবনের গল্প উঠে এসে। সামান্য একটা ঘটনা কিছু মানুষের জীবন এলোমেলো করে দিলো। একে বাটারফ্লাই ইফেক্টের সাথেও তুলনা করা যেত�� পারে।
লেখকের কোনো বই এর আগে পড়া হয়নি। প্রথম পড়া হিসেবে লেখকের লেখনশৈলী বেশ মুগ্ধ করেছে। গল্প বলার ধরন বেশ ছিল। এছাড়া চরিত্রায়ন ভালো লেগেছে। উপন্যাসিকায় খুব বেশি চরিত্র নেই। গুরুত্বপূর্ন দুয়েকটা চত্রিরই গল্পকে গতিশীলভাবে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। তবে শুরুর চেয়ে শেষটা ভালো লেগেছে। ভালো লেগেছে গল্পের মাঝে অতীতে গিয়ে স্মৃতিচারণ করা।
তবে কিছু আক্ষেপ থেকেই যাই। গল্প���র প্লট আর গল্পের ধরনে মনে হয়েছে, এত উপন্যাসিকা না হয়ে উপন্যাস হলে হয়ত আরো ভালো লাগত। একটু বড়ো হলে আরো সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হতো বলে আমার মনে হয়। তাছাড়া বানানের ক্ষেত্রে বলতে হয়, বাতিঘরের বইয়ে মুদ্রণ প্রমাদ বা বানানের ভুল না থাকলে বাতিঘরের বই বলে মনে হয় না। সেগুলো থাকবেই। তবে কিছু সাধারণ বানান ভুল হলে আসলেই খারাপ লাগে। সেগুলো কেবল মুদ্রণ প্রমাদ, না বানানের ভুল; তা জানি না। শুরুর দিকে যেই ভুলগুলো চোখে লেগেছিল, শেষে তা অনেক কমে এসেছিল।
এছাড়া আনুষঙ্গিক প্রোডাকশন ভালো ছিল। বইয়ের প্রচ্ছদ বিশেষ ভালো লেগেছে। লেখকের নিজের করা প্রচ্ছদটি এবারের বইমেলায় অন্যতম সেরা প্রচ্ছদ হতে পারে।
পরিশেষে, "বিসর্জনের দ্বিতীয় সত্তা" আসলে কীসের গল্প? কখনও মনে হয় প্রতিশোধের আগুনে দগ্ধ হওয়া একজন অসহায় মানুষের। আবার কখনও মনে হয় অসীম মহানুভবতার। কিন্তু সবশেষে ভালোবাসার। যেখানে প্রিয়জনের ভালোবাসা, কিংবা ভালো থাকার জন্য নিজের আবেগকে বিসর্জন দেওয়া যায়।
বই : বিসর্জনের দ্বিতীয় সত্তা লেখক : বাপ্পী খান প্রচ্ছদ : বাপ্পী খান প্রকাশনী : বাতিঘর প্রকাশনী পৃষ্ঠা : ১১০ মুদ্রিত মূল্য : ১৫০৳ ব্যক্তিগত রেটিং : ৩/৫
অনেক সময় চোখের সামনে যা দেখা হয়, যা ভাবা হয় সেটাও সত্য না-ও হতে পারে। প্রতিটি নির্মম সত্যের পেছনে একটি সরল সত্য থাকে লুকিয়ে থাকে...
গল্পটা দুজন মানুষের। দুই অঞ্চলের দুজন মানুষ; দুজনের পেশাও ভিন্ন; নেই কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক। তবুও জীবনের একটা পার্টে এসে তারা দুজনেই এক। বিসর্জন! হ্যাঁ বিসর্জনই তাদের দুজনকে এক সুতোয় গেঁথে দিয়েছে। দুজনকেই নিজেদের জীবনযাপন, পেশা, রূপ বিসর্জন দিতে হয়েছে অন্যের জন্য। কিন্তু সব বিসর্জন কি চোখে দেখা যায়?
কিছু কিছু বই আমি শুধু প্রচ্ছদ দেখেই কিনে ফেলি। যেমন এই বইটা। কি সুন্দর প্রচ্ছদ! কি সুন্দর কালার কম্বিনেশন! প্রচ্ছদের দিকে তাকালেই একধরনের মুগ্ধতা কাজ করে... বইয়ের গল্পটাও ঠিক তেমন। ছোট, সুন্দর, ছিমছাম একটা গল্প। লেখকের লেখনশৈলী বেশ ভালো। পড়তে আরাম। সর্বোপরি বইটা ভালো লেগেছে।
বিসর্জনের দ্বিতীয় সত্তা বাপ্পী খান বাতিঘর প্রকাশনী
এই বইটা বেশ ভালো লেগেছে। হালকা চালে বেশ সাবলীল ভঙ্গিতে গল্প বলে গেছেন লেখক। এক বসায় পড়ার জন্যে পারফেক্ট একটা নভেলা। গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে সামাজিক উপন্যাস বরাবরই ভালো লাগে। হাসিরাজের কৌতুক, সুরুজের অপেক্ষা আর এক অজানা রহস্য যা তাদেরকে বেঁধে রেখেছে এক সুতোয়, বইটাকে ভালোই উপভোগ্য করে তুলেছে। ছোট্ট নভেলা হলেও লেখক চরিত্রায়নে বেশ এফোর্ট দিয়েছেন। বইয়ের দুই প্রধান চরিত্রই ভালোভাবে ফুটে উঠেছে। সমাপ্তিটা ছিল একটা ভালো আহারের পর সুস্বাদু ডেজার্টের মতো। নভেলা পড়তে চাইলে এই বইটা পড়ে দেখতে পারেন।
বলতে গেলে বইটা একনিশ্বাসে পড়ে গেছি। বেশ কিছু ব্যাস্ততার কারণে সকালে শেষ করতে পারিনি। রাত শেষ করলাম। লেখকের লেখনী দারুণ। একটানা পড়ে যাওয়া যায়। কাহিনি বিন্যাস, গতি একেবারে পার্ফেক্ট। কাহিনি কোথাও ঝুলে যায় এই ১১০ পৃষ্ঠার বইয়ে। বেশ মসৃণভাবে বইটা এগিয়ে গিয়েছে। কাহিনির বেশি কিছু বললেই স্পয়লার হয়ে যাবে। যারা নভেলা পড়তে চান তাদের জন্যে আশা করি সুখপাঠ্য একটা বই হবে।
বইটার রিভিউ দেয়ার যোগ্য মনে করছি না নিজেকে...কারণ আমার মনে হয়না আমার রিভিউ বইটাকে জাস্টিস দিতে পারবে...
বাপ্পী খানকে থ্রিলার লেখক হিসেবেই চিনতাম, তাই যখন দেখি বইটা সমকালীন জনরার, আমি দ্রুত কিনে ফেলি পড়ার জন্য।
গল্পটা দুজন মানুষ আর তাদের সাথে সম্পর্কিত সবার জীবনকে সাথে নিয়ে এগিয়ে এক বিন্দুতে এসে জড়ো হয়েছে..☝🏼
এই সামাজিক নভেলাটিতে অসাধারণ কোনো গল্প বলা হয়নি...এখানে বলা হয়েছে কিছু সাধারণ মানুষদের প্রতিশোধ নেয়ার আকাঙ্ক্ষা, মনে জাগিয়েছে আশা, কষ্ট দিয়েছে হৃদয়ে, দেখিয়েছে তাদের নেয়া পদক্ষেপগুলোর প্রভাবে কিভাবে আকার পায় তাদের ভবিষ্যৎ...
"জীবনের সব বিসর্জন তো আর চোখে দেখা যায় না, কিছু ঘটনা আড়ালেও ঘটে...🌻✨"
শেষের দিকে গল্পটা এভাবে শেষ হবে কখনো ভাবতেও পারিনি, কিন্তু আমি সন্তুষ্ট... চোখের পানিতো আর মিথ্যা বলে না, তাই না..?