মোট ১৫টি ছোটগল্প নিয়ে "অর্বাচীনের উপাখ্যান ও অন্যান্য"। মূলত সাধারণ মানুষ ও তাদের জীবনের বিক্ষিপ্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে গল্পগুলো গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের কথা বলা হলেও গল্পে থাকা নাটকীয়তা, চরিত্রের বিশ্লেষণে অতিরিক্ত অলংকার, গল্পের বিষয়বস্ত নির্বাচনে কোনোকিছু আর সাধারণ থাকেনি। আবার কিছু অসাধারণও হয়ে ওঠেনি, যা দীর্ঘদিন মনে থাকবে৷
বইয়ের পজেটিভ দুটি দিক হলো- শব্দচয়ন আর সাবলীল উপস্থাপন। যার কারণে পড়ে শেষ করতে অসুবিধা হয়নি। 'রাহুর দশা' আর 'সমাজ-দেহে অস্ত্রোপচার' গল্প দুটি বেশ ভালো ছিল। কিন্তু বাকিগুলো পড়ার সময় মনে হয়েছে চাইলে সেগুলো আরও ছোট করা যেতো। কোনো কারণে তা বড় করতে গিয়ে গল্প তার আবেদন হারিয়েছে।
বইটি একবসায় পড়ে ফেলা সম্ভব। প্রোডাকশন সুন্দর। ছোটগল্প পছন্দ হলে ট্রাই করে দেখতে পারেন। হ্যাপি রিডিং।
(পাঠ-পর্যালোচনা: অর্বাচীনের উপাখ্যান ও অন্যান্য|তকিব) ◾ “সাদামাটা মনের মানুষ নেই এখানে। সবাই রঙিন। এতটাই রঙিন যে দেখতে কুৎসিত লাগে খুব। একটা রঙের সাথে আরেকটার কোনো মিল নেই। চোখ বুজে এক কোণে পড়ে থাকতে ইচ্ছে করে ভীষণ। সেটুকু পারি না। এখানে চুপ থাকা যায় না। কিছু বলার থাকুক কিংবা না থাকুক, কিছু একটা বলে যেতেই হবে; ভোগ করে যেতেই হবে এমন করুণ সুযোগ সুবিধা। বলবার স্বাধীনতা সবারই অভিলাষ। সেই অভিলাষ আবার কারো কারো জীবনে সর্বনাশ।
আমার এখন ভালো লাগে ছায়া, সম্ভব হলে ঘনকালো অন্ধকার। শতরঙা মানুষের ঘেঁষাঘেঁষিতে আমি অতিষ্ঠ। এত রং! এত রং কেন? কীসের এত প্রয়োজন হয়!”
১. এরিস্টটলের বিখ্যাত উক্তি- ‘মানুষ সামাজিক জীব’। এই সামাজিক জীব নিয়ে প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় অদ্ভুত কিছু রেওয়াজের প্রচলন। সেই চাচার কথা আমার মনে পড়ে, যার ছোট্ট একটা টঙের দোকানের উপর নির্ভর করে ছয় সদস্যের একটি পরিবারের জীবনযাপন। ‘বিভিন্নজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে যিনি মেয়ের বিবাহানুষ্ঠান সম্পন্ন করলো মাত্র গতকাল, পরেরদিন খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে বিশ কেজি মিষ্টি ও এক ঝুড়ি পান সুপারি নিয়ে মেয়ের শ্বশুড়বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়, মনস্তাপের রেশ যার চোখমুখে স্পষ্ট ফুটে উঠে।’ নিজে খেয়ে থাকুক বা না থাকুক তিনি যেন মেয়ের শ্বশুড়বাড়িতে এসব পৌছিয়ে দিতে দায়বদ্ধ। এই দায়বদ্ধতার শিখলে উনাকে আটকে দিল সমাজের কুসংস্কার। এসব যথাযথ পালন না করলে সমাজের কথিত সম্মানিত শ্রেণি উনার প্রতি কটূক্তির বিষবাষ্প ছুড়ে দিতে মোটেই সংকোচ করবে না। কথিত সম্মানিত শ্রেণি দম্ভভরে, সমাজের প্রতি দায়িত্ব নিয়ে এসব কটুকথা শুনিয়ে যাবে। সমাজে প্রচলিত উদ্দেশ্য সম্মিলিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন প্রথার বাইরে কেউ কোনো কাজ করলে এসব কথিত সম্মানিতদের চোখে সে যেন সমাজের আর কেউ নয়! নতুন চিন্তা নিয়ে, কুসংস্কারের পথ এড়িয়ে এবং কথিত সম্মানিতের কথায় কান না দিয়ে কেউ পথচলতে চাইলেই কুসংস্কারে হাবুডুবু খাওয়া সমাজব্যবস্থার অদৃশ্য থাবা তার উপর গিয়ে পড়ে।
গল্পগ্রন্থের প্রথম গল্প “গোঁড়া সমাজের জলসাঘর”এ বর্তমান সমাজের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। খলিল মাস্টারের মেয়েকে বিয়ে করে জালাল। মেয়ে বিয়ে দিলে অর্থাভাবে সমাজের লোকদের একবেলা খাবার খাওয়ানো হলো না খলিল মাস্টারের। এ নিয়ে সমাজের সম্মানিত শ্রেণির মনজ্বলা শুরু হয়ে যায়। “কউ তো মাস্টার, তোমার মতো মানুষ কেমনে এমন কাজটা করতে পারল? সমাজ বলে যে একটা ব্যাপার আছে সে তো তোমার বেশি জানা কথা!” সাক্ষীর উপস্থিতি, ছেলেমেয়ের সম্মতি সবকিছু ঠিক রেখে বিয়ে করলেও সমাজের চোখে সেটা হয়ে যায় অপকর্ম। “এইডারে বিইয়্যা কয় না, এইডা যিনা। এই পাপের বিচার আমরা হগলে চাই।” এরকম খলিল মাস্টার, জালাল ও জুলেখার মতো অনেকের সামাজিক কুসংস্কারের মুখে পড়তে হয়। ওরা রুখে দাঁড়াতে চাইলেও পারে না। কুসংস্কারাচ্ছন্ন প্রথাগুলো পালনে এরা রীতিমতো অঙ্গীকারবদ্ধ।
▫ “ঝিলাম স্বামীকে ছেড়ে, নিজের ভূমি ছেড়ে আসতে চায় নি। কয়েক রাত সে কেঁদে কেঁদেই কাটিয়েছে। আমন তা কর্ণপাত করেনি। মাতব্বরের সিদ্ধান্তকেই উত্তম বলে গ্রহণ করল সে। ঝিলামকে পাঠিয়ে দিল ঢাকায়।” সমাজের কথিত সম্মানিতের চোখে এদের মানুষের মতো দেহ আছে, নিঃশ্বাস আছে, প্রাণ আছে তবে নিজের মতো করে যাপনের জন্য কোন জীবন নাই। সমাজের বধুদের সবসময় জিম্মি হয়ে থাকতে হবে স্বামীর তারউপর সমাজের। ঝিলামরা বিয়ে করে স্বামীর কাছ থেকে সুন্দর জীবনযাপন করতে চাওয়া পাপ, তাদেরকে অন্যের সিদ্ধান্তের গোলামি মেনে নিতে হবে। এটা আমাদের সমাজব্যবস্থার নিত্য রূপ। এসব চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তের বলি হয়ে অন্তঃসত্ত্বা ঝিলামদের প্রসববেদনায় জীবন দিতে হয় চলন্ত রেলে। “আল্লাহ একজনরে দুনিয়্যাই পাঠায়লেন, আরেকজনরে লইয়্যা গেলেন।” কথিত সম্মানিত মাতব্বর শ্রেণির দিকে ইঙ্গিত করে ‘অর্ধেক নারী, অর্ধেক ঈশ্বরী’তে আহমদ ছফা বলেছেন, “পৃথিবী থেকে সাপ এবং শকুনের বিশেষ প্রজাতি বিলুপ্ত হলে কোনো ক্ষতি -বৃদ্ধি হবেনা, একেক টাইপের মানুষের মধ্যে এই সাপ -শকুনেরা নতুন জীবনলাভ করে বেঁচে থাকবে!”
ঝিলামরা মারা যায়, তাদের প্রাণহীন দেহ মর্গে পড়ে থাকে। কিন্তু, “ঘটনার এক সপ্তাহ কেটে গেল। ঝিলামের কোন আত্মীয়স্বজনের খোঁজ পাওয়া গেল না।” পাওয়া যাবেই না, এ সমাজ তাদের মতো আত্মবিসর্জিত নারীদের আত্মীয় করে নেয় না। তারা শুধুই সাময়িক ব্যবহার উপযোগী মানুষের মতো প্রাণী।
পৃথিবীতে কিছু মানুষের মধ্যে যতই নিষ্ঠুরতা ভর করুক। আনাস মোল্লাদের মতো মানুষ মানুষের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসবে। নয়তো পৃথিবীতে মানুষের বিচরন হতো কি করে? নিছক প্রাণীরা ঘুরে বেড়াত।
▫ শহীদুল্লাহ কায়সার যদিও বলে, “জীবনকে যেমন, মৃত্যুকেও তেমন স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে হবে।” কিন্তু পৃথিবীতে কিছু মৃত্যুকে সহজে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে চাই না মন। আশরাফ সাহেবের স্ত্রী “রাবেয়ার নিথর দেহ পড়ে আছে মেঝেতে। কিছুক্ষণ পরপর জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে। কান্নার শব্দ নেই। চোখে জল নেই তবে জল গড়ানোর প্রলেপ রয়ে গেছে চোখের নিচে।” “চুপচাপ এক কোণায় বসে আছে সাদিক। আঘাতপ্রাপ্ত সে। বাবার আদর্শ নিয়ে বড় হওয়া ছেলে বাবার মৃত্যুতে অনেক বেশি কষ্ট পেয়েছে।” কবিগুরুর কথামতো পিতার আদর্শ নিয়ে বড় হওয়া এইসব “পুত্রের মাঝে পিতা নিজেকে উপলব্ধি করে।” পিতারা চলে গেলেও তারা তাদের সন্তানের মাঝে সর্বদা জীবিত থাকে। জীবনানন্দ লিখেছে, “মানুষের মৃত্যু হ’লে তবুও মানব থেকে যায়; অতীতের থেকে উঠে আজকের মানুষের কাছে।” অদৃশ্য এই থাকা, না থাকাটার কথা বলে।
কবর! একটা ঘর একার জন্য। মানুষ মরে গেলে কী একা হয়ে যায়, একদম নিঃসঙ্গ? কবর কি একেবারে অন্ধকার? গল্পে দেখা যায়, “একে একে সবাই কবর এর পাশ থেকে চলে গেল। অন্ধকার কবরে আশরাফ সাহেব একা। চারিদিক অন্ধকার হয়ে আসছে।”
▫ ২৫ মার্চ! কালোরাত! অপারেশন সার্চলাইট! মহাবিশ্বের বুকে ঘটে যাওয়া নৃশংস এক গণহত্যার নাম। বাঙালি তখন নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াইয়ে নেমেছিল, বাঙালি তার পরিচয়কে আঁকড়ে ধরেছিল। তখনই বর্বর পাকিস্তানিরা নামিয়েছিল ভয়ঙ্কর এক কালোরাত! গণহত্যার রাত! রক্ত ও মানব লাশের গন্ধ মিশে গিয়েছিল বাঙলার মাটি ও বাতাসে। শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার সংগ্রাম, কবির কবিতায় ফুটে ওঠে, “তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা, শহরের বুকে জলপাইয়ের রঙের ট্যাঙ্ক এলো দানবের মত চিৎকার করতে করতে তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা, ছাত্রাবাস বস্তি উজাড় হলো। রিকয়েললেস রাইফেল আর মেশিনগান খই ফোটালো যত্রতত্র।”
খই ফোটানো সেই মেশিনগান ও রাইফেলের মুখে কেউ বাবা হারালো, কেউ পুত্র হারালো, কেউ মা, কেউ ভাই, কেউ বোন আবার কেউ প্রিয়জন। অনিরূদ্ধ ও তিথির ভালোবাসা দিবসের ছয় বছর পূর্ণ হবে আগামীকাল। তা নিয়ে দু'জনের কত আয়োজন। কিন্তু, “অনিরুদ্ধ ও তিথির স্বপ্নগুলো অপূর্ণ রয়ে গেল। দুজনের কারোরই হলো না দেখা শেষবারের মতো ভালোবাসার মানুষের মুখটি।” পরেরদিনের সূর্যটির রক্তিম বর্ণে তাদের রক্তের রঙ মিশে যায়। ভয়াল রাত্রি শেষে ভয়ংকর এক প্রথম প্রহর।
▫ “মা! ও মা! কেঁদো না, কেঁদো না গো। আমি আর বাবার কথা কথা জানতে চাইব না।” মেয়েটির পতিতা হওয়া মেয়েটির দোষ, কিন্তু মেয়েটিকে পতিতালয়ের দুয়ারে ঠেলে দেওয়া মানুষগুলো নিষ্পাপ! আমাদের সমাজ এখনো উদ্যোক্তা কোন মেয়ে দেখলে তাদের দেখে নাক ছিটকাতে দেরি করে না। তাদের প্রতি বিষযুক্ত কথা ছুড়ে মারে। জহর আলীর মতো প্যারালাইজড রোগীর স্ত্রী মলিনাদের অসহায়ত্ব তাদের ঠেলে দেয় ভিন্ন এক বিশ্রী দুনিয়ায়। সেই দুনিয়ায় ভালোবাসা নাই, মায়া নাই, স্নেহ নাই, দায়ভার নাই শুধু বেঁচে থাকার জন্য দুমুঠো অন্নের প্রয়োজন। সেই প্রয়োজনের তাগিদে মলিনারা ভিন্ন মায়ের মেয়ে রুবিনার মতো নিষ্পাপকে তুলে দেয় ক্ষুধার্তের হাতে! বিষবৃক্ষের নিষ্পাপ ফলের কাছে রুবিনাদের কোন উত্তর থাকে না।
▫ এই যেন আমারই জীবন, আমারই কথা গল্পকার তার গল্পে লিখেছেন। “এখানে সবাই অভিনয় করে, আমিও অভিনেতাদের ভিড়ে আটকা পড়ে গেছি। সবখানে রং আর রং। হরেক রকমের রঙের মিশ্রণে কী যে বিশ্রী অবস্থা! যেন কুৎসিত রুচিকে মানিয়ে নেয়ার পাঁয়তারা। যার সব নেই তার তো নেই, যার অনেক আছে তার আরও চাই! যার কিছু কিছু আছে সে-ই যেন সব থেকে সভ্য থাকে কিন্তু লড়ে যাওয়ার দারুণ যুদ্ধে দিন শেষে সে পুরষ্কার হিসেবে আঘাত পায়, হেরে যায়। অসহনীয়, অনমনীয়, অনুভূতিহীনতায় ভোগে সবাই; আমিও।” আমরা যেন নির্ধারিত এক ঘূর্ণমান জীবনচক্রে দৌড়ে চলছি ঘুরেফিরে। যত দৌড়াই পথ তত বেড়ে চলে গন্তব্যের দূরত্ব। “আমি অন্ধকার ভালোবাসি। এ চাওয়া পিছিয়ে পড়া নয়। এই এক নীরব প্রতিবাদ, নিঃসঙ্গতার শহরের নিভৃত এ নাগরিকের কঠোর আন্দোলন। যার থেকে অনেক কিছুই হয়তো এই শহর, বন্দর কিংবা দেশ জাতি পেত। আজ তা থেকে তারা বঞ্চিত।” এই কথা শুধু একটি হৃদয়ের নয়, শতশত তরুণের মন এই আন্দোলন করে যায় যাদের কন্ঠস্বর, মনোস্পৃহা চেপে ধরা হয়। এগিয়ে চলা মানুষকে পিছুটান দিতে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকা লোকের অভাব এখানে নাই বরং চলার পথে মনোবল জুগানো মানুষের অভাব। যারা ভালো চাই, যারা সুন্দর চাই তাদের পেছনে সর্বদা ‘পাছে লোকে কিছু বলে।’ কাজের যথাযথ বিচার পূর্বে এদের কানজ্বলা কথা ভেসে আসে। তবুও যারা এগুতে বেড়িয়েছে তাদের থামাবে কে? তারা নিজের গন্তব্যের সাথে সাথে পাছে কথা বলা লোকদেরও জয় করে নেয়।
▫ বিশ্বাস গড়া এবং ভাঙা। মানুষ যত দ্রুত বিশ্বাসের খুঁটি বসিয়ে দেয় মনে তা ভাঙতেও তাদের দ্রুততম বিচরণ। নিজের মনে বিশ্বাস নিয়ে বসে যাওয়া মানুষটি বিশ্বাসঘাতকতা নিয়ে উপস্থিত হবে একপর্যায়ে এটা মনে আনতে পারে না বিশ্বাসের কারণে। মিত্রতা দেখিয়ে যে বিশ্বাসের বীজ বপন করে, সেই বিশ্বাসের বীজ যখন একটি বৃক্ষের রূপ নেয় তখন তা উপড়ে ফেলা বিশ্বাসঘাতককে লেখক বলেছেন, “সে শত্রুরও শত্রু।” পৃথিবীতে অনেক মানুষের হাসি নিজের হাসির সাথে দৃশ্যমান হয় তবে সব হাসি আনন্দের নয়, কিছু কিছু ছলনাময়ী; “তবে কোনো না কোনো মিত্র ঠিক বেঁচে থাকার উছিলা হয়ে ওঠে।”
▫ সেদিন বন্ধু ও নিজে অনেক করে চাইছিলাম একটা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, একটা চর্চা কেন্দ্র তবে তাদের শক্তির জোয়ারে ভেসে গেলে আমাদের স্বপ্ন। যেদিন জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষটিকে হারিয়ে ফেলেছিলাম কাঁদতে চেয়েও কাঁদতে পারি নি যেন এক নির্জীব নিষ্ক্রিয় এক বস্তুতে পরিণত হয়েছিলাম। অনুভূতিরা হারিয়ে গেছিল। যে স্বপ্ন ছিল জীবনের উদ্দেশ্য তা হারিয়ে ফেলেছিলাম। লেখকের ‘অন্ধকার ভেঙে প্রান্তরে’ আমি নিজেকে খুঁজে পাই। আমি চেষ্টা করেও স্বপ্ন দেখতে পারি নি; লেখক লিখেছেন, “স্বপ্ন দেখা চেষ্টার কাজ নয়। চেষ্টা মানেই জোরজবরদস্তি। জোরজবরদস্তি করে আর যাইহোক, স্বপ্ন দেখা যায় না।” হয়তো তাই আমার আর স্বপ্ন দেখা হয় নি। “সোসাইটির সাথে মিলিয়ে যে দৌড়ে আপনি শামিল তা স্বপ্ন নয়, জীবনের বাধ্যবাধকতার একটি।”
▫ আরবি একটা প্রবাদ আছে, “তীরের আঘাতের চেয়ে কথার আঘাত ভয়ঙ্কর।” লেখক লিখেছেন, “কথার ফাঁদে ফেলে কারো মৃত্যু ঘটালে সেটাও এক প্রকার খুন। সুরুজও খুনি।” কথা দিয়ে মানুষকে হত্যা করা যায়। মেরে ফেলা যায় মানুষের জীবন, মানুষের স্বপ্ন। সুরুজ যার মায়ের স্তন্যপান করে কথকের বেঁচে থাকা তার অন্যায়ের প্রতিও কথকের কিছু বলার নাই তার ঋণের শোধে কথকের জীবন, স্বাধীনতা সবকিছু ঢেলে দিতে হয়। সুরুজরা জীবনভর এরকম কথক ও নানাদের কথা দিয়ে খুন করে গেলেও তাদের খুনি বলে না সমাজ। অন্যদিকে অসহায়ত্ব নিয়ে বেড়ে ওঠা ছেলেটি বখাটে, তার না বুঝা অপরাধ, তাকে মিথ্যা অভিযোগের কারণে হয়রানি পোহাতে হয়।
▫ “মানুষ সৃষ্টির সেরা তবুও কী যে ভয়ংকর! কী করে যে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে! আচ্ছা আমিও তো মানুষ, তাহলে আমিও কি....!” স্বার্থ ছাড়া আদতে কেউ সাথে চলে কী? জালালুদ্দিন রুমি হয়তো তাই বলেছিলেন, “সাথে হাঁটার লোক পাবে তবে তোমার জন্য কেউ হাঁটবে না।” যারা সাথে হাঁটবে তারা মুখও ফিরাতে পারে। কেউ দেখুক না দেখুক, হাঁটুক বা না হাঁটুক, যে মুহুর্তে যা কিছু সাথে আছে তার মাঝে নিজেকে খুঁজে নিতে হবে, জাগাতে হবে মনোবল। উপভোগ করতে হবে সেই সময় ও অবস্থানকে। কথকের মতো বলতে হবে, আমি “মানুষ কুকুরের নিদারুণ সম্পর্ক উপভোগ করতে লাগলাম।”
▫ কথক মানুষের ভিড়ে কেন মানুষ খুঁজে? এত শত মানুষ তবুও মানুষ খুঁজে পাই না। ফারাজদের হত্যা নিয়ে এখানে কেউ কথা বলে না। সবাই কী “অমানুষ হয়ে মানুষের অধিকার লুট করছি”? হয়তো। এখনো কী মানুষ না আমি? না কি শুধুই দেহটা মানুষের মতো দেখতে! যারা নিশ্চুপ তাদের মতো আমিও একজন, আমিও অন্যায় দেখে ঠাঁই নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকি। কথক বলে, “আমরা মানুষ হয়ে জন্মেছি; মানুষের সংজ্ঞাই আমাদের জন্য ধার্য। সে সংজ্ঞা গড়নেই আমরা দুর্বল, তাই পশুর সংজ্ঞা ঠাঁয় পাবার নিদারুণ এক প্রকৃতির প্রশ্রয় পায়। আর আমরা মানুষ দেহে জন্মাই ঠিক, ধীরেধীরে পশু হয়ে যাই।” ▫ “তোরা চাইয়্যা চাইয়্যা কী তামাশা দেখোশ! এলোপাতাড়ি কোপা হালার'পো গো। যারে সামনে পাইবি তারেই কোপাবি।” এই চিৎকার কলেজের ভেতরে। হিমাংশুকে মারা হচ্ছে পত্রিকায় লেখবার অপরাধে। হিমাংশু সত্য বলেছে তাকে আর বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। বিরোধী পাটির সদস্য সামাদ সামনে পড়লে তারে মেরে একেবারে মাথা ফেটে দেয়, দরদর করে রক্ত বেরিয়ে আসে। এ যেন বর্তমানের বাস্তব চিত্র। এতে স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায় আমাদের সমাজের মর্মান্তিক দৃশ্য। ▫ শেষ গল্পটায় আমি থমকে উঠি। আমি অসুস্থ! আমি মরে গেলাম! আমার মৃত্যুর ঘোষণা হচ্ছে মসজিদের মাইকে। “একটি শোক সংবাদ, একটি শোক সংবাদ!.....” কথক যেটাকে মুক্তি বলে সেটা মৃত্যু! দুনিয়া বা জীবনের ঝঞ্জাট থেকে মুক্তি মানে মৃত্যু? জীবন ও মৃত্যুর দেয়ালের ওপাশ অনেককিছু বলতে চেয়েও কথক বলতে পারে না। “যা বলে সব এই দেয়ালের এই পাশেই রয়ে যায়, ওপাশের বাসিন্দা অবধি পৌঁছায় না।”
২. অন্যের গল্প বলতে বলতে হঠাৎ নিজের গল্প বলা শুরু। প্রথম গল্পগুলোর মূলে সমাজ তারপরের গুলোর মূলে মানব। মানুষের মৃত্যু হতে শুরু করে শুরুর গল্প থেকে শেষের গল্পে এ��ে নিজের মৃত্যু! এটি যেন একটি গল্পগ্রন্থও আবার উপন্যাসও। একটি গল্পের সাথে অন্য গল্পের স্বাভাবিক অমিল দৃশ্যত তবে গর্ভে আজীব মিল! বর্তমান সমাজের প্রতিচ্ছবি যেন এই বইটি। সমাজের কুসংস্কারাচ্ছন্ন প্রথার মুখে জ্বলে পোড়ে ছাই হয়ে যায় মানুষের দেহ। একধরণের সম্মানিত শ্রেণির সিদ্ধান্তের বলি হয় ভালোবাসা, বলি হয়ে অন্তঃসত্ত্বা মায়ের প্রসববেদনায় রেলপথে মারা যাওয়া। অপ রাজনীতি নিয়ে হৈ-হুল্লোড়ে মেতে থাকা ক্যাম্পাস, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর চেয়ে শিক্ষালয়ে এদের মূল্যায়ন বেশি। তাদের ইচ্ছেমতো তারা পিটিয়ে যে কাউকে মারতে পারে, যেন এখানের সব স্বাধীনতা ওদের, ওরা অপব্যবহার করুক সমস্যা নাই। আদর্শের ছেলের দেখা বাবার মৃত্যু। কালোরাতে ঘটে যাওয়া নৃশংস হত্যাকাণ্ডে মিশে যায় ভালোবাসা। অর্থ যোগানে দেহের বলিদান, জঠরের মেয়ে না হওয়ায় তাকে পতিতালয়ে ঠেলে দেওয়া এবং তা থেকে বিষবৃক্ষের নিষ্পাপ ফল। মানুষরূপী অমানুষের জয়জয়কার, মুখোশধারী সমাজপতির প্রভাবে জরাজীর্ণ সমাজের অবয়ব, নারীর পাশের সিটে বসতে পুরুষদের প্রতিযোগিতা, প্রতিটি গল্পে মুড়ানো বর্তমান সমাজের বাস্তব চিত্র। কথকের কথাগুলোতে আমি নিজেকে খুঁজে পাই। এ যেন ভিন্ন সাধের লেখা গল্প। এই গল্প আমার, আপনার, সকলের। এই গল্পগুলো পড়তে পড়তে মনে চিকন এক আন্দোলনের সূচনা হয়েছে আমার।
গল্পগ্রন্থের বেশিভাগ গল্প আমি নদীর তীরে বসে বসে পড়েছি। নদীর তীরে আমাদের শাক, সবজি, মরিচের খেত। তার পাশে বসে পড়া এই গল্পগুলোর অনেকটা। সামনে নদী, উপরে বিশাল আকাশ, স্নিগ্ধ বাতাস সাথে বাগান থেকে ভেসে আসা কাঁচা মরিচের সুগন্ধ, পাশে সেচের পানির কলকল শব্দ, পাখিদের কিচিরমিচির এবং মনকাড়া সব গল্প। জীবনকে উপভোগ করার মতো দারুণ সময় ছিল।
বইটির উৎসর্গপত্র হৃদয় ছোঁয়া। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে আহমদ ছফাকে। আহমদ ছফা তার লেখাগুলোতে সমাজের রোগগুলোকে তুলে ধরেছেন এই গল্পগ্রন্থের গল্পেও বর্তমান সমাজের সমস্যাগুলি সামনে আনা হয়।
গল্পগুলোতে সমস্যার উল্লেখ থাকলেও নেই সমাধানের কথা নেই। কারণ আছে প্রতিকার নেই। অসুখ আছে ঔষধ নেই। সেই সমাধান, প্রতিকার, ঔষধ আমাদের খুঁজে নিতে হবে।
৩. সমাজের বাইরের দৃশ্যমান অবয়ব থেকে নিয়ে অদৃশ্যমান সমাজের অন্দর পর্যন্ত সবকিছু মনের চোখে দেখেছেন; সেই দেখার প্রতিফলন গল্পগুলো। “লেখাগুলো জীবনী নয়, জীবনের বিক্ষিপ্ত ঘটনা আশ্রিত”। এই বিক্ষিপ্ত ঘটনার মধ্যে উঠে আসলো বর্তমান সমাজের প্রায়ই সবকিছু। আমরা তো হাঁটছি প্রতিদিন আমাদের চেনা শহরে, চেনা অচেনা মানুষের সাথে, আমাদের পরিচিত পথগুলোতে কত কত স্মৃতি। স্মৃতিময় সেই পথে, চেনা শহরে ও চেনা-অচেনা মানুষগুলোর সাথে আরেকটি সফরে বের হতে পারেন গল্পগুলোর ভেতরে। বাস্তবতা, প্রেম, রাজনীতি, সমাজ ও মানুষ অল্পকথায় দীর্ঘ একটা সফর। 〰 বই: অর্বাচীনের উপাখ্যান ও অন্যান্য লেখক: তকিব তৌফিক (Tokib Towfiq) ধরন: গল্প প্রচ্ছদ: সব্যসাচী মিস্ত্রী প্রকাশক: অক্ষরবৃত্ত (Anis Sujan) মুদ্রিত মূল্য: ৳২৮০/=
... খোবাইব হামদান ০৮.০৩.২০২২ | ২৩:৩৮ মিয়াখাননগর, চট্টগ্রাম
The first story " Gora Somajer Jolshaghor" explores the mindset of the orthodox society. Mob culture where people can become cruel within moments notice is carefully depicted in this story. When humans participate in collective violence the weight of guilt is divided indeed. I wanted to take a peak into the perspective of Zulekha. I wondered why she was muted in the narrative. The answer lies within the tale of orthodox society where women are deliberately suppressed.
The second story describes death and loyalty. He portrays death carefully in the story. Despite the overall morbidity in the story, he carefully averts our attention to the group of women taking bath. We all run with the mute child and follow his curiosity where writer is taking us next.
"Neelsagor Express" is undoubtedly my favorite story in the book. Amon and Jhilam, just like their names, represented man and woman whose religious identities were not explored. I was on a train ride with Jhilam and joined her on the journey to maternity. Imam saheb's hands join in gratitude with response to a namaskar. The newborn has been sent by God in the purest form from heaven with no names and no religion. Subtleties in this story about humanity are like gems waiting to be found by the reader.
The first story " Gora Somajer Jolshaghor" explores the mindset of the orthodox society. Mob culture where people can become cruel within moments notice is carefully depicted in this story. When humans participate in collective violence the weight of guilt is divided indeed. I wanted to take a peak into the perspective of Zulekha. I wondered why she was muted in the narrative. The answer lies within the tale of orthodox society where women are deliberately suppressed.
The second story describes death and loyalty. He portrays death carefully in the story. Despite the overall morbidity in the story, he carefully averts our attention to the group of women taking bath. We all run with the mute child and follow his curiosity where writer is taking us next.
"Neelsagor Express" is undoubtedly my favorite story in the book. Amon and Jhilam, just like their names, represented man and woman whose religious identities were not explored. I was on a train ride with Jhilam and joined her on the journey to maternity. Imam saheb's hands join in gratitude with response to a namaskar. The newborn has been sent by God in the purest form from heaven with no names and no religion. Subtleties in this story about humanity are like gems waiting to be found by the reader.