সুপ্রিয় চৌধুরী একজন অসাধারণ লেখক। তার গল্পের প্রতি পাতার মধ্যে থাকে টানটান উত্তেজনার একটা ছাপ। এই বইটি বাংলার আন্ডারওয়ার্ল্ড এর একটি বিবরণ হিসেবে অতুলনীয়। আমরা মহারাষ্ট্রে বা দিল্লি উত্তরপ্রদেশে মাফিয়া ডনদের নিয়ে ক্রাইমস্টোরির কথা শুনেছি বা পড়েছি,তবে বাংলায় সে ধরনের লেখা একেবারে হাতে গোনা।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে কলকাতার বাহুবলীদের কথা থেকে শুরু করে হালের আমলের সমাজবিরোধী প্রত্যেকের বিবরণই দুর্দান্ত উপস্থাপন করতে পেরেছেন সুপ্রিয় বাবু। এবং কোনক্ষেত্রেই মনে হয়নি যে লেখার মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ আছে, এক্ষেত্রে একেবারে নিউট্রাল থেকে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন লেখক। সমাজের মধ্যে থেকেই যে কারণে সমাজবিরোধী তৈরী হয় তাও লেখার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে, এছাড়াও ফুটে উঠেছে রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ যার কুফল ভোগ করছে বাংলা এবং সাধারণ মানুষ।
তবে লেখাটি কিছুক্ষেত্রে পক্ষপাতদুষ্ট হয়েছে সম্ভবতঃ নকশাল আন্দোলন নিয়ে লেখকের দুর্বলতার জন্য। একারণেই যতবারই বইয়ে নকশালদের কথা উল্লিখিত হয়েছে ততবারই যেন তাদের আদর দেওয়া অভিভাবক হিসেবে যেন দেখতে পেয়েছি লেখককে,তারা কোন ভুল করতেই পারে না এরকম একটা হাবভাব। কোথাও কোথাও আবার তারা সমাজের মসীহা হিসেবেও তুলে গ্লোরিফাই করেছেন লেখক।
আরেকটা বিষয় হলো লেখার মধ্যে সাড়ে পনেরো আনা শুধু কলকাতা কলকাতা করেই কাটিয়ে দিয়েছেন লেখক,দু একটি প্রসঙ্গে আসানসোল,খড়গপুর,মালদা এবং নদিয়ার উল্লেখ পেয়েছি,অথচ কলকাতার বাইরে যে একটা অন্ধকার সাম্রাজ্য আছে সে সম্পর্কে লেখকের ধারণা পোক্ত নয় বলেই বোধ হয়েছে। বিশেষ করে রেলশহর আসানসোল বা তার পার্শ্ববর্তী কোলিয়ারী এলাকাগুলি অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য সেসব জায়গায় কোন উল্লেখ নেই। উল্লেখ নেই স্মাগলিং এর আরেক টপ এলাকা শিলিগুড়ির, বর্ধমান শহরের কোন উল্লেখ পাই নি,ভাটপাড়া-জগদ্দল অঞ্চল অপরাধীদের মুক্তাঞ্চল সেও অনুপস্থিত।
এছাড়াও বিশেষ ভাবে পশ্চিমবঙ্গের অনেক অপরাধপ্রবণ অঞ্চকের কথাও অনুপস্থিত বইয়ে। সম্ভবত লেখকের এই বই সংবাদপত্র এবং লোকাল পরিচিতদের থেকে আহরণ করা তথ্য তাই হয়তো অন্যান্য অঞ্চলের গোপন খবর বা ক্রাইমগুলি অনেকাংশে অনুপস্থিত থেকেছে।
তবে ত্রুটিমুক্ত না হলেও বইটি নিঃসন্দেহে বাংলা অন্ধকার জগতের একটি অন্যতম সেরা দলিল বলাই যায়।