মানুষের জীবনে মাঝে মাঝে এমন কিছু পর্যায় আসে যখন সে বুঝতে পারে না যে কোনটা ভুল আর কোনটা ঠিক, কী করতে হবে আর কী করতে হবে না! কাছের মানুষদের ধীরে ধীরে বদলে যেতে দেখে। ঠিক তেমনই একটা অদ্ভুত সময় কাটছিলো অভির জীবনে। তারপরেই হুট করে সবকিছু বদলে গেলো!
মাঝে মাঝে যেন নিজের অজান্তেই অন্য এক জগতে হারিয়ে যায় সে, নির্জন আর নিষ্প্রাণ এক জগৎ। সত্যিই কি এমনটা হয়? নাকি সবই ওর কল্পনা? ততোদিনে বাস্তবতার ভয়াবহতা চরমভাবে আঘাত করে চলেছে ওকে। কোনটা বেশি ভয়ংকর? বাস্তবতা? নাকি অতিপ্রাকৃত শক্তি?
সত্যিই কি ডিপওয়েবে রেড রুম নামে এমন কিছু সাইট আছে? যেখানে দর্শকদের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী মানুষকে নির্যাতন করে হত্যা করে। উপস্থাপক?
এলাইজা আসলে একটি অর্থহীন কাহিনী। কারণ এখানে সমাজের এমন এক শ্রেণীর মানুষের কথা বলা হয়েছে যাদের কে নিয়ে কেউ ভাবে না, সাধারণ মানুষের চোখে এরা অর্থহীন!
অনুবাদক লুৎফুল কায়সার আমার খুব পছন্দের।এই প্রথম তার মৌলিক লেখা পড়লাম।"এলাইজা"র গল্প আবর্তিত হয়েছে অভিকে ঘিরে।প্রেমিকা হারানোর শোকে কাতর,ভার্সিটিতে ব্যাকলগের বোঝা নিয়ে পর্যুদস্ত অভি'র বিভ্রম শুরু হয়।সে হঠাৎ হঠাৎ আরেক জগতে চলে যেতে শুরু করে।ডার্ক ওয়েবের রেড রুম নিয়েও ভাবিত হয় অভি।পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিলো লেখক সিনেমার কথা মাথায় রেখে গল্প সাজিয়েছেন।এর ভালো খারাপ দুই দিকই আছে। গল্পের হরর উপাদান মোটামুটি ভালো লেগেছে।আমাকে দারুণ আকর্ষণ করেছে গল্পের মনস্তাত্ত্বিক দিক। একটা ভালো হরর কাহিনিতে গভীর মনস্তাত্ত্বিক দিক থাকাটা স্বতঃসিদ্ধ।লেখক হিসেবে লুৎফুল কায়সারের শক্তিমত্তা টের পাওয়া গেছে ক্লাইম্যাক্সে এসে।অভি'র ব্যর্থতা, অচরিতার্থতার সাথে ভৌতিক গল্পের চমৎকার সংযোগ ঘটিয়েছেন লেখক।
গল্পটা শুরুই হয় ক্রিপিপাস্তা দিয়ে। এইটার মানে ইন্টারনেট ঘেটে জানতে পারলাম। মানে হল হরর লেজেন্ড যাকিনা ইন্টারনেটে শেয়ার করা হয়। গল্পের মূল নায়ক অভির নেশা হল ক্রিপিপাস্তা রেডরুম। রেডরুমের কাজ হল একটা রূমে এনে কোন মানুষকে অত্যাচার করতে করতে মারবে। এখানে ভিউয়াররা আবার রেকমেন্ড করে কিভাবে মারলে বেশী মজা লাগবে দেখতে। কি ভয়ংকর অসুস্থ চিন্তাভাবনা। ভার্সিটি লাইফে থাকতে হোস্টেল নামক এক মুভি দেখা শুরু করেছিলাম। শেষ করতে পারি নাই। বমি চলে আসছিল। সে যাই হোক, অভি হল ইউনিভার্সিটি ড্রপআউট একজন। কোচিং করে ভালই চলে তার। হঠাৎ করেই জিদ করে অভি কোচিং বাদ দিয়ে ভার্সিটি শেষ করতে লেগে যায়। প্রচন্ড মানসিক চাপের মধ্য থেকেই অভি শেষ করতে থাকে অবশিষ্ট বিষয়গুলা। কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ করেই অন্যএক জগতে চলে যায় অভি। সেখানে পুরো জগতটাই প্রাণহীন, ভয়ংকর বিষন্ন এবং রক্তে ভরা চারপাশ। এর মধ্যেই অভির হত্যা করার এক প্রচন্ড ইচ্ছা জেগে উঠতে থাকে। নিজের মানসিক সমস্যার কথা শেয়ার করে এক সাইকায়িট্রিস্টের কাছে। কিন্তু ঔষুধে লাভ হয় না কিছুই। এর বেশী কিছু বলা উচিত হবে না। বইটা পড়বেন। লেখক অনেক কিছুর ব্যাখা করেছেন। এর মধ্যে যেমন রেডরুমের মত নৃশংস কন্সেন্ট যেমন আছে, ঠিক তেমনি ফিজিক্স আর অন্যান্য বিষয়ের আলাপ আলোচনা আছে। মাঝে মাঝে আপনি পাবেন অদ্ভুত সব অতিপ্রাকৃত সত্য ঘটনার বর্ণনা। সব মিলিয়ে আপনার সময়টা ভালই যাবে। ভয়ের ঘটনাগুলা বর্ননা বেশ হচ্ছিল। গায়ে প্রায় কাটা দিয়ে উঠতে উঠতে আর উঠে নাই। কোথায় জানি কেটে যাচ্ছিল সুরটা। তবে লেখকের পটেনশিয়ালটি নিয়ে আমি খুব আশাবাদী। উনার লেখা ভাল, পড়াশুনা করেন আর এই দুইটা মিলায়া বেশ ভাল মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারের কাঠামো দাড়া করাতে পারেন। সুতরাং ভবিষ্যতে আরো ভাল কিছু আশা করতেই পারি।
বই: এলাইজা একটি অর্থহীন কাহিনী লেখক: লুৎফুল কায়সার জনরা: কসমিক হরর প্রচ্ছদ: কৌশিক জামান প্রকাশনী: বাতিঘর প্রকাশনী প্রথম প্রকাশ: মার্চ ২০২২ পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২৮৭ মুদ্রিত মূল্য: ৩৪০/-
ভয়...!!! ভৌতিক অনুভূতি, অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকেরই কমবেশি ভালো লাগে। সোজা কথায়, ভয় পেতে ভালো লাগে! আপনার হরর ভালো লাগে? কারণ কী ভয় পেতে ভালো লাগে নাকি অন্যকিছু? বইয়ে হরর গল্পের কিংবদন্তি জোসেফ সারিডন লে ফানুর একটা সাক্ষাৎকার আছে। ওনাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো হরর গল্প উনি কেন লিখেন, ওনার জবাব কী ছিল জানেন?
❝আমার পাশের বাড়িতে একটা ছোট্ট মেয়ের পায়ে চোট লেগে একটা বেশ বড় ক্ষত হয়েছিল। পরে সেটা বিষিয়ে বড় আকৃতির একটা ঘা হয়ে যায়। সারাদিন মেয়েটা কাঁদতো, আর আমি শুনতাম। এতো ভয়ংকর অভিজ্ঞতা আর কোনোদিন আমার হয়নি। দুমাস পর মারা যায় ও। আমি সারাজীবন হরর গল্প লিখে নিজের কাছে নিজে প্রমাণ করতে চেয়েছি যে বাস্তবতা ভয়ংকর নয়! এর চাইতেও ভয়ংকর কিছু থাকতে পারে!❞
বাস্তবতা থেকে পালানোর জন্যই হোক বা নিজের অবস্থান ভালো কল্পনা করেই হোক ভৌতিক বিষয় কল্পনা করতে ভালো লাগে। ভালোলাগা নিয়ে তো অনেক আলোচনা হলো এবার বইয়ের পালা।
জীবনটা কোনোরকমে চলে যাচ্ছিল অভির। কোচিংয়ে ম্যাথের ক্লাস নিয়ে খরচ চালানো খুব একটা কষ্ট না হলেও মনে একটা খচখচানি ছিল। ক্যাম্পাস থেকে তার ব্যাচ বহু আগেই বের হয়ে গেছে কিন্তু তার ঘাড়ে বোঝা হয়ে এখনও অনেক লগ ঝুলছে। প্রতিনিয়তই মা'কে মিথ্যে বলতে হচ্ছে, নিজের কাছেই নিজে ছোট হচ্ছে। অবশেষে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে ক্যাম্পাসে আবার ফিরে যাবে সে। গ্রাজুয়েট না হওয়া পর্যন্ত সে কোনোভাবেই শান্তি পাবে না। এরইমধ্যে অদ্ভুত কিছু অভ্যাস করে ফেলেছে। রেড রুম নিয়ে বিভিন্ন আর্টিকেল পড়া, ওয়েবসাইট ঘাটাঘাটি করা! বিভিন্ন ক্রিপিপাস্তা নিয়ে খোঁজখবর রাখা! প্রতি শুক্রবার রাতে অদিতির আইডিতে ঢুঁ মারা। ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে তাতে কি প্রিয় মানুষটাকে এতো সহজে ভোলা যায়?
হঠাৎই আজব কিছু ঘটা শুরু হলো অভির সাথে! কিছুখনের জন্য আশেপাশের জীবন্ত সকল কিছু উধাও হয়ে যায়! চলে যায় কোনো নতুন জগতে কিন্তু চারিপাশের জড়বস্তুগুলো ঠিকঠাকই থাকে শুধু পড়ে থাকে রক্ত! সত্যিই ঘটছে এমন কিছু নাকি সবই তার মনের ভুল দ্বিধায় পড়ে যায় অভি। ডা. সাইফের মতে সে অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোমের রোগী!
অনেকদিন পর এতো দারুণ একটা বই পড়লাম। বলতে গেলে ঘোরের মধ্যে চলে গেছিলাম! তবে শুধু কাহিনী না পরিবেশও দায়ী এরজন্য। পরিবেশ কীভাবে দায়ী সেটা পরে আগে বইয়ের কাহিনী নিয়ে বলি। বইয়ের প্লটকে তিনভাগে ভাগ করা যায়: ১) ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়া এক ছাত্র অভি। যার সেমিস্টারে অনেকগুলো লগ থেকে গেছে। তার ব্যাচ গ্রাজুয়েট হলেও সে বের হতে পারে নায়। একাডেমিক তাকে প্রতিনিয়তই যেন তাড়া করে ফিরছে ভুতের মতো। ২) হিব্রু প্রাচীন মিথের মহাবিশ্ব, প্যারালাল ইউনিভার্স, নাস্টিসিজম, ডেমাইয়ার্জ, মালাখ, বিশৃঙ্খলা তত্ত্ব নিয়ে থিওরি। ৩) রেড রুম, ডার্ক ওয়েব, ক্রিপিপাস্তার বিভিন্ন আর্টিকেল।
অভির একাডেমিক স্ট্রাগেলিংয়ের অংশটা আমার কাছে বেশি ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে। লেখক যেভাবে ঘটনাগুলো তুলে ধরেছেন যে অভির কষ্টগুলো জীবন্ত হয়ে উঠেছে! একজন স্টুডেন্টের কাছে একাডেমিক স্ট্রাগেলিংয়ের থেকে ভয়ংকর কিছু হতে পারে না। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিভিন্ন সাবজেক্ট, টপিক, সিস্টেম নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্টুডেন্টরা আরও বেশি রিলেট করতে পারবে এজন্য। অভির একটা ডায়লগ না বললেই না,
❝আমি গ্র্যাজুয়েট হতে চাই স্যার, আমার কাছে মালাখের প্রভাব থেকে বাঁচার চাইতে এটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ!❞
প্যারালাল ইউনিভার্সে ভৌতিক এলিমেন্ট যথার্থ। ইউনিভার্সের থিওরি, পয়েন্ট অব ভিউ, সিনগুলো ভাবনায় ফেলে দিয়েছিল। পুরো পৃথিবীতে একা থাকতে বললে কেমন লাগবে যখন সঙ্গী হবে মালাখ? শেষটা অনুমেয় তবে ভালো লেগেছে। সহজ সমাধান হলেও মানানসই মনে হয়েছে।
বিভিন্ন সিরিজ, মুভির বদৌলতে রেড রুম ও ডার্ক ওয়েব নিয়ে মোটামুটি একটা ধারণা আগেই ছিল। টুকিটাকি কিছু ক্রিপিপাস্তাও পড়েছি বেশ কয়েকমাস আগে। বইয়ের যে আর্টিকেলগুলোর আলোচনা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে কো���ো কানেকশন বা মিল না থাকলেও ইন্ডাইরেক্টলি প্যারালাল ইউনিভার্সের অংশের সাথে কিছু জায়গায় রিলেট করা হয়েছে। ক্রিপিপাস্তাগুলো পড়ে মজা পেয়েছি। রেড রুমের অস্তিত্ব নিয়ে বইয়ের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মতামত দেখানো হলেও শেষে যেয়ে একটা ❝কিন্তু❞ রেখে দিয়েছেন লেখক। সেক্ষেত্রে ওপেন এন্ডিংও বলা যায়। অদিতিকে নিয়ে কোনো রহস্য আছে, কেন জানি বারবার মনে হচ্ছিল। বইয়ে যতবারই অদিতির কথা উঠছিল ততবারই অলকের মুখে। কেন জানি মনে হচ্ছিল যে অলক অদিতিকে নিয়ে কিছু জানে বা কোনো কিছু হয়েছে যা সে লুকচ্ছে কিন্তু এমন কিছুই হয়নি বলে কিছুটা হতাশ হয়েছি।
পরিবেশ কীভাবে দায়ী বলবো বলেছিলাম এখন বলি রহস্যটা... প্রায় প্রতিদিনই রাতে এবং আমার লাস্ট সেমিস্টারের এক্সামের মধ্যে বইটা শেষ করলাম। তিনদিন পর আমার রোবটিক্স এক্সাম আর আমি কিনা কসমিক হরর পড়ছি! ভয়+ভয়= দ্বিগুণ ভয়!!!!!
বইয়ের সম্পাদনায় যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। বানান ভুল, নামে গন্ডগোল, কয়েকটা শব্দ একসাথে জোড়া লেগে যাওয়ার সংখ্যা অনেকই বলতে গেলে। প্রচ্ছদটা বেশিই সাধারণ হয়ে গেছে। বাঁধাই, পেইজের মান মোটামুটি ভালোই।
অভি একজন মেধাবী ছাত্র। পড়ছিলো দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে। সুখ দুঃখ ভাগ করার জন্য একটা প্রেমিকাও ছিলো তার। কিন্তু পড়াশোনার সিস্টেমে যাতাকলে পিষ্ট অভি আস্তে আস্তে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ে। ব্যাকলগ জমা হতে হতে এমন অবস্থা হয় যে, তার ব্যাচের ছাত্ররা বের হয়ে গেলেও আটকে যায় অভি। প্রেমিকা শুরুর দিকে সাপোর্ট দিলেও আস্তে আস্তে সে সম্পর্কও ফিকে হতে থাকে। সবমিলিয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হয় অভি।
কিন্তু অভি ঠিক করে এভাবে আর না। নিজেকে টেনে তুলতে হবে তার নিজেরই। সে লক্ষ্যেই ব্যাকলগ ক্লিয়ার করার মিশনে নামে অভি। কিন্তু ডিপ্রেসড অভি বুঝতে পারে না কিভাবে নিজেকে মন মানসিকতা অন্যদিকে ডাইভার্ট করে রাখবে সে। আর সে লক্ষ্যেই নেট ঘাটতে ঘাটতে একদিন পেয়ে যায় রেড রুম ক্রিপিপাস্তার খোঁজ। এই রেড রুম কি শুধুই মিথ নাকি আসলেই এর পেছনে লুকিয়ে আছে সাইকোপ্যাথ কিছু মানুষ? খুঁজতে শুরু করলে পাল্টে যায় অভির জীবনও। কিন্তু অভিও দাঁতে দাঁত চেপে সিদ্ধান্ত নেয় এর শেষ তাকে দেখতেই হবে।
ক্রিপিপাস্তা বিষয়ক যে কারো চেয়ে বেশি জানেন লুৎফুল কায়সার, অন্তত এ পরিচয়েই ওনার সাথে অনলাইনে পরিচয় আমার। তাই যখন শুনলাম উনি ক্রিপিপাস্তা সংক্রান্ত কোন ফিকশন নভেল লিখেছেন, তখন যারপরনাই আগ্রহী হলাম আমি। বই শেষ করে বুঝলাম; নাহ, হতাশ করেননি লেখক। সুন্দর প্লটের 'এলাইজা : একটি অর্থহীন কাহিনী' কিছু কিছু জায়গায় ইনফো ডাম্প মনে হলেও তার লিখনশৈলী ছিলো দারুণ সাবলীল, স্মুথ। এতটা ঝরঝরে লেখা যে, চাইলে ২৮৭ পৃষ্ঠার এ বইটি এক বসায় শেষ করা সম্ভব। ক্যাওস, স্যাটানিজম, ক্রিপিপাস্তা এ বিষয়গুলোয় ইন্টারেস্ট থাকলে এ বইটি নির্দ্বিধায় হাতে তুলে নিতে পারেন আপনি। আশা করি হতাশ হবেন না।
“The basis of all true cosmic horror is violation of the order of nature, and the profoundest violations are always the least concrete and describable.”― H.P. Lovecraft, Selected Letters III: 1929-1931 - ❛এলাইজা: একটি অর্থহীন কাহিনী❜ - অভি, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বেশ কয়েকটি ব্যাকলগ থাকায় তার ব্যাচের সাথে বের হতে পারে না সে। একটি কোচিং এ ক্লাস নিয়ে এবং প্রাইভেট টিউশনি করিয়ে কোনরকমে দিন চলছিলো তার। কিন্তু সমাবর্তনের দিন ঘনিয়ে আসায় সে ঠিক করে আবারো বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ব্যাকলগ গুলো ক্লিয়ার করবে। - এদিকে ইন্টারনেটে একদিন 'এলাইজা' নামে একটি ক্রিপিপাস্তা শোনার পর থেকে অভির জীবনে অস্বাভাবিক কর্মকান্ড ঘটা শুরু হতে থাকে। হঠাৎ করেই সে প্রাণহীন এক দুনিয়ায় চলে যেতে শুরু করে কিছু সময়ের জন্য। এ কারণে ইন্টারনেটে রেড রুম এবং এ সংক্রান্ত ক্রিপিপাস্তাগুলো ঘাটাঘাটি করা শুরু করে সে। - এখন অভি কী আসলেই কিছু সময়ের জন্য প্রাণহীন কোন দুনিয়ায় চলে যায়? রেড রুম বলে কী আসলেই কিছু আছে নাকী এটি ইন্টারনেটের কোন মিথ? এ সব কিছুর উত্তর জানার জন্য পড়তে হবে লেখক লুৎফুল কায়সার এর হরর ফিকশন ❛এলাইজা: একটি অর্থহীন কাহিনী❜। - ❛এলাইজা: একটি অর্থহীন কাহিনী❜ বইটি মোটাদাগে একটি কসমিক হরর ফিকশন। বইটির সবচেয়ে ইউনিক দিক হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নানা কারণে পিছিয়ে পড়া ছাত্রদেরকে কোন পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে হয় তার একটি প্রতিচ্ছবি দেখানো। বইয়ের হরর এলিমেন্টের থেকে এই দিকটিই আমাকে আকর্ষিত করেছে বেশি রিলেটেবল সিনারিওর কারণে। তারপরেও গল্পের মাঝে কসমিক হরর টাইপ এলিমেন্ট ভালোভাবেই মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। - ❛এলাইজা: একটি অর্থহীন কাহিনী❜ বইয়ের চরিত্রগুলোর ভেতরে অভি চরিত্রটি খুবই রিলেটেবল লাগলো বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে। বাকি চরিত্রগুলোর বেশিরভাগই অবশ্য গতানুগতিকই লাগলো। বইয়ের প্লট অনুসারে এর লেখনশৈলী মানিয়ে গিয়েছে। বইয়ের কাহিনির ভেতরে বিভিন্ন ক্রিপিপাস্তার ঘটনা যেভাবে লেখা হয়েছে তা পড়তে বেশ ভালোই লাগলো। তবে যেভাবে পুরো বই জুড়ে সাস্পেন্স ক্রিয়েট করা হয়েছে তার সমাধান শেষে এসে একটু বেশিই সহজভাবে দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে মনে হলো। - ❛এলাইজা: একটি অর্থহীন কাহিনী❜ বইয়ের প্রোডাকশন টিপিক্যাল বাতিঘর প্রকাশনীর মতোই। বইয়ের কাহিনির হিসেবে প্রচ্ছদ খুব একটা ভালো লাগেনি। বইয়ের বানান ভুল এবং টাইপো ভালো পরিমাণেই ছিলো, বিশেষ করে অনেক সময়ই একাধিক শব্দ জোড়া লেগে গিয়েছিলো, এই স্পেস বিভ্রাট পড়ার সময় বেশ দৃষ্টিকটু লেগেছে। - এক কথায়, বাংলা হরর ফিকশন হিসেবে প্রোটাগনিস্টের কাহিনির পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে ভাবলে বেশ অন্যধরনের এক হরর ফিকশন হচ্ছে ❛এলাইজা: একটি অর্থহীন কাহিনী❜। তাই যারা অন্যধরনের বাংলা হরর ফিকশন পড়তে পছন্দ করেন তাদের বইটা ভালো লাগার কথা।
রহস্য, রোমাঞ্চ, অলৌকিক— এইসব ধারার ঔপন্যাসিকদের বিরুদ্ধে প্রায়ই অভিযোগ ওঠে, তাঁরা নাকি 'অবাস্তব' বিনোদন জুগিয়ে পলায়নবাদী মানসিকতাকে (মানে যাকে সাদা বাংলায় এসকেপিস্ট মেন্টালিটি বলা হয়) উৎসাহ দিয়ে থাকেন। আলোচ্য বইটিকে এই ধরনের প্রচারের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে দাখিল করা যেতে পারে। কেন? এই বইয়ের কেন্দ্রে আছে অভি— এই সময়ের সমাজের এক একান্ত বাস্তব চরিত্র। ঘোরতর বাস্তব একগুচ্ছ সংকটের মধ্যে পেঁচিয়ে থাকা সেই মানুষটা সাময়িক বিনোদনের জন্য আমার-আপনার মতো করেই নেট ঘাঁটে আর ইউ-টিউব দেখে। সেই করতে গিয়ে সে অনিচ্ছাসত্বেও সাময়িকভাবে একটা অদ্ভুত জগতে গিয়ে পড়ল। তখনকার মতো রেহাই পেলেও অভি বুঝতে পারল, ওই জগতে এমন কেউ বা কিছু আছে, যার হাত থেকে তার রেহাই নেই। কী করবে সে? তার ব্যক্তিগত জীবনের নানা টানাপোড়েনের সমান্তরালে চলতে থাকল অনুসন্ধান— যার সূত্র ধরে জানা গেলে একের পর এক ক্রিপিপাস্তা বা আর্বান লেজেন্ড। বারবার উঠে আসতে লাগল ডিপ ওয়েবের এক কুখ্যাত ধারণার কথা, যার নাম 'রেড রুম'। আপ্রাণ চেষ্টায় নিজে উপর ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে ঠেকিয়ে রাখল অভি। কিন্তু ক্রমেই স্পষ্ট হ��়ে গেল, তাকেই মোকাবিলা করতে হবে ওই ভয়ংকর শক্তির। না হলে শুধু সে নয়, হারিয়ে যাবে আরও কেউ-কেউ। এই অলৌকিক উপন্যাসটি অভি এবং অন্য একগুচ্ছ বাস্তব চরিত্রের জন্যই অলৌকিকের সীমা ছাপিয়ে বাস্তবের সঙ্গে মিশে গেছে। অন্তর্লীন আতঙ্ক মিশে গেছে মহাজাগতিক ভাবনায়— যেমনটি আমরা পাই লাভক্র্যাফটের লেখায়। ঠিক এইজন্যই অভির ব্যক্তিগত "ফিরে আসা, ফিরে আশা"-র কাহিনিটি হয়ে ওঠে আমার, আপনার, সবার। আর সেজন্যই উপন্যাসের শেষে উঁকি দেওয়া সম্ভাবনা আমাদের নতুন করে কাঁপিয়ে দিয়ে যায়। সে বলে, কল্পনার চেয়েও ক্রূর বাস্তব আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে— ��য়তো ঘোরতর চেনা পরিবেশেই, চিরচেনা মানুষের মধ্যেই। চমৎকার লেখা। বইটি সুমুদ্রিত হওয়ার পাশাপাশি সু-অলংকৃতও হয়েছে বলে ভারি ভালো লাগল। অলৌকিক সাহিত্যের অনুরাগী হলে বইটি আপনারও ভালো লাগবে বলে আমার ধারণা।
বইটি ভালো লেগেছে। বেশ ইউনিক ছিল। বইটি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত দারুন মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। ডার্ক ওয়েবের বিষয়গুলো এবং বেশ কিছু ক্রিপিপাস্তার বর্ণনাগুলি আমার কাছে সবথেকে বেশি আকর্ষণীয় লেগেছে।
বইঃ এলাইজা, একটি অর্থহীন কাহিনী লেখকঃ লুৎফুল কায়সার জনরাঃ কসমিক হরর,সাই-ফাই,স্প্ল্যাটারপাংক হরর (এ সাবজনরায় গোর,ভায়োলেন্স থাকে) প্রকাশনীঃ বাতিঘর গায়ের দামঃ ৩৪০ টাকা ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৪.৫/৫
অভি দেশের স্বনামধন্য সরকারি একটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ডিফল্টার ছাত্র। ব্যাচ বের হয়ে গেলেও সিস্টেমের সাথে তাল মিলাতে না পেরে সে বের হতে পারেনি। আর এসব সরকারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে একবার ট্র্যাক থেকে বের হয়ে গেলে ট্র্যাকে ফিরতে গিয়ে বাস্তব জীবনে যে হররের মুখোমুখি হতে হয়,তা হাড়ে হাড়ে টের পেতে থাকে অভি,তার বেস্ট ফ্রেন্ড অলক,এছাড়াও জামি, কাছের জুনিয়র শ্রীকান্ত সহ অন্যরা। এরা হয়ে পড়ে সমাজের এমন একটা শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত, যাদের নিয়ে সমাজের মূলধারার ভাবার সময় নেই,কারণ এরা তথাকথিত 'লুজার' ক্লাসের সদস্য, বিশৃঙ্খলার প্রতীক। এর সাথে যোগ হয় অভির ব্যক্তি জীবনের না পাওয়ার হিসাবগুলো। কিন্তু অভি হাল না ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
বাস্তব জীবনের ভয়াবহতা থেকে মনোযোগ ঘোরাতে অতিপ্রাকৃত নিয়ে অনলাইনে ঘাটাঘাটি শুরু করে সে,আর এভাবেই ডার্ক ওয়েবের 'রেড রুম' মিথের খোঁজ পায়। রেড রুম ডিপ ওয়েবের একটি লাইভ সেগমেন্ট,যেখানে একটি মানুষকে একটি রুমে নানাভাবে অত্যাচার করে হত্যা করা হয়,আর এই অত্যাচার ও হত্যা হয় অর্থের বিনিময়ে লাইভে থাকা দর্শকদের ইচ্ছা অনুযায়ী। নিজের অজান্তেই রেড রুম নিয়ে এক ধরনের মোহে পড়ে যায় অভি। আসলেই কি রেডরুমের অস্তিত্ব আছে? বিভিন্ন সময় ঘটে যাওয়া নৃশংস, আপাতভাবে অকারণ হত্যাকান্ড গুলোর সাথে কি এর কোনো সম্পর্ক আছে? এলাইজা নামের ক্রিপিপাস্তার ( নেটে ছড়িয়ে থাকা "বাস্তব" ব্যাখাতীত হরর অভিজ্ঞতা) সাথেই বা এর কি সম্পর্ক? প্রায়ই নিজের চেনা পৃথিবী ছেড়ে অন্য এক অদ্ভুত, জনশূন্য, নিস্প্রাণ পৃথিবীতে কেন চলে যাচ্ছে অভি? মাল্টিভার্স থিওরি,থার্মোডাইনামিক্সের সূত্র, নাস্টিসিজমের দুই মহাবিশ্ব মিথ, হিব্রু মিথ সব মিলেমিশে একাকার হয়ে কোন প্রলয়ের ইঙ্গিত করছে? অলক কি সত্যিই তেমন যেমনটা ওকে মনে হয়? উজ্জ্বল আলো দিয়ে কি আসলেই অন্ধকারকে ঢেকে ফেলা যায়?
রিভিউঃ আফ্রিতার পর এলাইজা লুৎফুল কায়সারের দ্বিতীয় মৌলিক উপন্যাস। আফ্রিতা লেখকের প্রথম কাজ হিসাবে প্রশংসার যোগ্য। তবে সীমাবদ্ধতাও ছিলো কিছু। কিন্তু নিজের দ্বিতীয় উপন্যাস দিয়ে রীতিমত বাজিমাত করেছেন লেখক। আফ্রিতার সংলাপ নির্ভর প্রবাহ কাটিয়ে উঠেছেন তিনি। প্লট বিল্ড-আপ অনেক ম্যাচিউরলি করেছেন। বাক্সের বাইরে চিন্তা করেছেন লেখক, অনন্য এক কনসেপ্ট নিয়ে উপন্যাসের কাহিনী গড়ে তুলেছেন। লেখক যা লিখেছেন,তা পাঠককে বিশ্বাস করাতে পারানোর মধ্যেই লেখকের সফলতা। এলাইজার লেখক এই দিক দিয়ে সফল। এই বিশ্বাস আনতে গিয়ে প্রচুর ঘাটাঘাটি করতে হয়েছে লেখককে, তা বেশ বোঝা যায়। কোনো কিছুই অতিকল্পিত মনে হয়নি এই বইতে।
প্রথম পৃষ্টা থেকেই মনোযোগ কেড়ে নিতে পেরেছে এলাইজা। গল্পের গতি-প্রবাহ বা পেসিং ছিলো অসাধারণ। লেখা যথেষ্ট ফ্লুইড,যে কারণে ২৮২ পৃষ্টার বই চাইলে এক বসায় শেষ করা সম্ভব। একটি হরর কাহিনীর যে উদ্দেশ্য, সেটি পূরণে প্রায় শতভাগ সফল এলাইজা। তার মানে হলো,এলাইজা ভয় পাওয়াতে সক্ষম। আর এ ভয় মোটেই কোনো বিকৃত মুখ ওয়ালা জম্বি বা সিলিং থেকে ঝোলা ছায়ামূর্তির ভয় না। এ ভয় তার চাইতেও আদিম। এ ভয় অস্তিত্বহীনতার ভয়,নিজের আরেক সত্তার কাছে হেরে যাওয়ার ভয়,চেনা পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়ার ভয়।
পুরো বই জুড়ে ডার্ক আর ডিপ্রেসিং একটা টোন ছিলো। লাভক্র্যাফটিয়ান একটা স্পর্শ অনুভব করা গেলেও কাহিনী এক পর্যায়ে অন্য দিকে মোড় নিয়েছে।
মিথের সাথে বিজ্ঞানের যে মেলবন্ধন,আর সেখান থেকে যে ক্রিয়েটিভ লিবার্টি আসে, তার অনেকটাই সফল ব্যবহার করেছেন লেখক। যারা বিজ্ঞান নিয়ে একটু চিন্তা-ভাবনা করেন,তাদের জন্যে এটা একটা ট্রিট বলা যেতে পারে। তবে বৈজ্ঞানিক টার্ম গুলো নিয়ে আলোচনার কিছু পর্যায়ে আরেকটু প্রগলভ হওয়া যেতো বলে মনে হয়েছে।
বেশ কিছু জায়গায় মুদ্রণত্রুটি চোখে পড়েছে। যারা একটু বেশি অনুভূতি-প্রবণ,বইয়ের কিছু জায়গা তাদের জন্যে ডিস্টার্বিং মনে হতে পারে। ইঞ্জিনিয়ারিং যে টার্ম গুলো ব্যবহৃত হয়েছে,তা নন-ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাকগ্রাউন্ডের অনেকের কাছেই হয়তো আকর্ষণীয় মনে হবেনা। বারবার অন্য পৃথিবীতে চলে যাওয়াটা এক পর্যায়ে প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই ঘটছে বলে মনে হয়েছে।
একটি উপন্যাসের সফলতা বহুলাংশে তার এন্ডিং বা সমাপ্তির উপর নির্ভর করে। অনেক ভালো বিল্ড-আপের উপন্যাস ও এন্ডিং এর কারণে অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়,যার অনেক ভালো একটি উদাহরণ স্টিফেন কিং এর 'দ্যা স্ট্যান্ড''। এলাইজা সে দিক দিয়েও সফল। এন্ডিং যথেষ্ট তৃপ্তিদায়ক। শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও পাঠককে চুপচাপ বসিয়ে রেখে সেটা নিয়ে ভাবানোর ক্ষমতা সব উপন্যাসের থাকেনা। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় যাকে বলা যায় 'শেষ হইয়াও হইলোনা শেষ'। এলাইজা আপনাকে ভাবাবে,নিঃসন্দেহে।
আচ্ছা, "করেছিলাম না", "করেছিল না" এগুলা কেমন ধরনের ক্রিয়া! আর পুরা বইয়ে একেকটা ইতিহাস এমন বোরিং ভাবে বর্ণনা করসে যে ধৈর্য্য ধরা মুশকিল। কে কী বলে থাকে না বলে থাকে এগুলা সব একবারে লিখে ফেললে পড়ে আরও মজা পেতাম। যদিও শয়তানটাকে হারানোর সিস্টেম অনেক আগেই বুঝে ফেলসিলাম, তাও মজা পাইসি। লেখকের লেখার ধরণ এমনিতে সুন্দর।
একটা সময় জীবন অর্থহীন হয়ে পড়ে। কাছের মানুষ দূরে চলে যায়, জীবনের গতি থেমে যায়, পড়াশোনার উম্মাদনা হারিয়ে যায়। এমন মানুষ বেঁচে থাকার আশাও হারিয়ে ফেলে। অন্যের কাছে এরা বাতিল, অথর্ব। জীবনে কিছু করতে না পারা নিষ্কর্মার দল। এদের কেউ মনে রাখে না, কেউ তাদের কথা বলে না। এমন অর্থহীন মানুষদের নিয়ে ভাবতে গেলে সেটা সময় অপচয় ছাড়া কিছুই না।
▪️কাহিনি সংক্ষেপ :
কোচিংয়ে ম্যাথ পড়িয়ে দিব্যি চলে যাচ্ছে অভির। ভালোই কাটছে সময়। তবুও কিছু একটার কমতি শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। জীবনের অনেক দিক দেখে ফেলা অভির তাই স্বস্তি নেই। প্রেমিকা ছেড়ে চলে গিয়েছে বহুদিন হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ে পিছিয়ে পড়েছে বেশ। অনেকগুলো কোর্স জমে গিয়েছে। ব্যাকলগের বোঝা বইতে বইতে অভি সিদ্ধা��্ত নিলো, আর না! এবার সব শেষ করতে হবে। চাইলেই কি সব শেষ করা যায়? পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের যে ঝক্কি পোহাতে হয়, তা অভির মতো মানুষরাই জানে।
এই ঝুট-ঝামেলা থেকে মানসিক শান্তির খোঁজে অভি পড়ে থাকে ইন্টারনেটে। রেডরুম নিয়ে নানা ধরনের খোঁজখবর নিচ্ছে সে। নিছকই কৌতূহল? রেডরুম আসলে কী? রেডরুম হচ্ছে একটি বদ্ধ লাল ঘর। যেখানে লাইভ ভিডিওতে মানুষকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়। ভিডিও দেখা মানুষগুলোর কমেন্টের প্রেক্ষিতে সঞ্চালক নিজে সে কাজ করেন। আছে কি এমন কোনো ঘর?
এলাইজা নামক ক্রিপিপাস্তা দেখতে দেখতে বদলে গেল অভির জীবন। হঠাৎ করেই এক অদ্ভুত জগতে চলে যায় সে। যেখানে জনমানুষের চিহ্ন নেই। কেবল সুনসান নীরবতা। মাঝে মাঝে রাস্তায় দেখা যায় রক্তের দাগ। কেন এমন হচ্ছে? এটা কি নতুন আরেক মহাবিশ্ব, যা আমাদের মহাবিশ্বের সমান্তরালে চলে? এর রহস্য খুঁজতে গিয়ে এক চরম সত্য সামনে এলো অভির। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? একমাত্র মৃত্যুই নিস্তার দিতে পারে এর বিভীষিকা থেকে। তবে কি অভি..... শেষ পর্যন্ত নিজেকে বাঁচাতে পারবে তো?
▪️পাঠ প্রতিক্রিয়া :
অনুবাদক হিসেবে লুৎফুল কায়সার আমার অন্যতম পছন্দের। তার কোনো মৌলিক বই প্রথম প্রথম পড়লাম। ঝরঝরে সাবলীল লেখনী। অত্যন্ত ফাস্ট রিড বই দ্রুততার সাথে পড়ে নেওয়া যায়। লেখনশৈলী চমৎকার। শব্দের গাঁথুনি বেশ ভালো। সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে গল্প বলার ধরন। লেখক সাধারণভাবে নিজের গল্পটা বলে গিয়েছেন। এতে কিছু টুইস্ট এসেছে। চমকে যাওয়ার উপলক্ষ্য পাওয়া গিয়েছে। তবে অধিকাংশ টুইস্ট আগেই বুঝে যাওয়া সম্ভব। তারপরও এমন বই পড়তে খারাপ লাগে না। লেখকের বর্ণনা ভালো ছিল। কিছু ভৌতিক, গা ছমছমে আবহ খুব ভালোভাবেই ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন।
"এলাইজা - একটি অর্থহীন কাহিনী" উপন্যাসে লেখক একাধিক টুকরো টুকরো গল্পের অবতারণা করেছেন। যা ক্রিপিপাস্তা নামে পরিচিত। সেগুলোর অনেকটাই হয়তো অর্থহীন, একটির সাথে আরেকটি কোনো সংযোগ নেই। আবার হয়তো কোনো সংযোগ খুঁজে পাওয়া যায়। আগ্রহ জাগানিয়া সেসব গল্প মাঝে মাঝে নন-ফিকশনের অনুভূতি দিচ্ছিল। একাধিক সেসব গল্প সমাজের বিশৃংখলের দিকে ইশারা করে। কেননা, এ জগতে বিশৃংখল-ই সত্য।
লেখক ভূমিকায় বলেছেন, যারা নিখুঁত বই খুঁজেন তারা এড়িয়ে যেতে পারেন। আমিও তাই মনে করি। এ জগতে নিখুঁত বলে কিছু হয় না। অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। আবার শেষে এসে লেখক কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। শেষটা আমার কাছে ভালো লেগেছে। তবে আরেকটু ভালো হলে শতভাগ তৃপ্তি পেতাম। কিছুটা তাড়াহুড়ো মনে হয়েছে। তবে ওই যে! শতভাগ নিখুঁত কিছু পাওয়া যায় না।
"এলাইজা - একটি অর্থহীন কাহিনী" উপন্যাসে লেখক যেসব কাহিনির অবতারণা করেছেন, তাতে বোঝা যায় তিনি বেশ পরিশ্রম করেছেন। এতকিছু টুকরো টুকরো, সংযোগহীন একাধিক গল্প এক সুতোয় বাঁধা সহজ কাজ নয়। সেই জায়গা থেকে লেখক সফল। গল্পের ছলে বা সংলাপে লেখক যে হিউমার দেখিয়েছেন, তার প্রশংসা করতেই হয়। এভাবে লেখক সমাজের বা শিক্ষা ব্যবস্থার অনেকগুলো অসঙ্গতি তুলে এনেছেন। সেগুলোও প্রশংসনীয়।
▪️চরিত্রায়ন :
"এলাইজা - একটি অর্থহীন কাহিনী" উপন্যাসে লেখক পিছিয়ে পড়া এক ছাত্রসমাজ দেখিয়েছেন। যারা সময়ের পড়া সময়ে না করার কারণে কী নিদারুণ সমস্যায় জর্জরিত। ব্যাকলগের বোঝা মাথায় নিয়ে চলতে ফিরতে হচ্ছে। অপমান, অপদস্ত হতে হচ্ছে নানান জায়গায়।
উপন্যাসের প্রধান চরিত্র অভি। তাকে কেন্দ্র করে গল্প এগোয়। তার সাথেই উঠে আসে তার কিছু বন্ধু, সিনিয়র, জুনিয়র, ডাক্তার। গল্পের প্রয়োজনে এসে আবার হারিয়েও গিয়েছে। সবাইকে তেমন প্রয়োজন ছিল না।
অভিকে নিজের সাথে সংযোগ করতে পারছিলাম। যেন আমারই কোনো এক প্রতিচ্ছবি। অনেক ক্ষেত্রেই মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল বিধায় এই চরিত্রকে খুব আপন মনে হয়েছে।
আমার মেজাজ খারাপ লাগছিল অলকের উপর। অভির বন্ধু অলককে দেখে মনে হচ্ছিল, তার কাজ বন্ধুর উপর থেকে চাপ কমানো না। আরও বেশি প্যারা দেওয়া। তবে শেষের টুইস্টটা অনেক বেশি প্রশ্ন রেখে গিয়েছে।
▪️বানান ও সম্পাদনা :
সম্পাদনার ত্রুটি ছিল চোখে পড়ার মতো। বানান ভুলের সংখ্যাও ছিল অধিক। বিশেষ করে দুইটি প্রচলিত বানান ভুলের কথা মাথায় আসছে। 'গুরুত্ব' কে সব জায়গায় 'গুরত্ব' লেখা হয়েছে। আবার 'ছাত্রী' বানান হয়ে উঠেছিল 'ছাত্রি'। এছাড়া অনেক জায়গা একাধিক শব্দ যুক্ত হয়ে গিয়েছিল।
কথোপকথনে সহজেই বোঝা যাচ্ছিল বন্ধু বা সিনিয়র/জুনিয়রের মধ্যে কথা হচ্ছিল। তবুও প্রতিটি সংলাপে 'দোস্ত/মামা/ভাই' সম্বোধন একটু দৃষ্টিকটু লেগেছিল। এছাড়াও গল্প বলায় বা সংলাপে 'সেটাই বা যাইহোক' জাতীয় শব্দের আধিক্য ছিল চোখে পড়ার মতো। সম্পাদনা করে এগুলো কমিয়ে আনা যেত বলে মনে হয়েছে।
▪️প্রচ্ছদ ও বাঁধাই :
প্রচ্ছদ আবার ভালো লেগেছে। এক রহস্যময় বইয়ের রহস্যময় আবহ তৈরি করেছে। বাঁধাই চলনসই। পৃষ্ঠার মানও ভালো।
▪️পরিশেষে, এ জীবনে বাঁচতে হয় নিজের জন্য। অন্যের জন্য বাঁচতে গেলে, অন্যের চিন্তা করতে গেলে জীবনটা অর্থহীন হয়ে পড়ে।
▪️বই : এলাইজা - একটি অর্থহীন কাহিনী ▪️লেখক : লুৎফুল কায়সার ▪️ প্রকাশনী : বাতিঘর প্রকাশনী ▪️পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২৮৭ ▪️মুদ্রিত মূল্য : ৩৪০ টাকা ▪️ ব্যক্তিগত রেটিং : ৩.৭৫/৫
মানুষের জীবনে বাস্তবতা এবং কল্পনার মাঝে কোন পার্থক্য আছে কি? বাস্তবের মানুষ একসময় প্রাকৃতিক কারণে বিদায় নেন কিন্তু বিখ্যাত কাল্পনিক চরিত্রগুলো তো মানবসভ্যতা জুড়ে টিকে থাকেন। কল্পনা কি তাহলে বাস্তবতার চাইতে অনেক বেশি শক্তিশালি নয়? মিথ, কল্পনা, গল্প, উপন্যাস সবকিছুই আসলে আরেকটি বেশি ক্ষমতাধর বাস্তবতা ছাড়া আর কিছু নয়।
ব্যাকলগের পর ব্যাকলগে থাকা ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র অভি জীবনের এক প্রচন্ড প্রেসারের সময় দিয়ে যাচ্ছে। সেটা বাসায় মা কে ক্রমাগত মিথ্যা বলে যাওয়া হোক বা ক্যাম্পাসে হেয় হওয়ার ভয়ে না যাওয়া হোক। প্রেমিকার আচরণও পাল্টে যাচ্ছে। সমাজে ব্যর্থদের নিয়ে ভাবার বা তাদের মূল্যায়ন করাটা অর্থহীন মনে করা হয়। সমাজ সবসময় সফলদের জয়গানে মুখর।
এর মধ্যে অভি ইন্টারনেটের বিভিন্ন ক্রিপিপাস্তা নিয়ে রীতিমত গবেষণায় নেমে যায়। বিষন্নতার সময় মানুষ সেল্ফ ডিফেন্স ম্যাকানিজমের জন্য কত কিছুই না করে!
সেখানে রহস্যময় রেড রুম এবং এর সাথে সম্পৃক্ত নারকীয় নৃশংসতা সম্পর্কে জানতে পারে অভি এবং তাঁর বন্ধু অলক। এসবের সবই কি সত্য? যারা ইউটিউব, ইন্টারনেটে সাঁতার দিয়ে বেড়ান তাঁরা খুব ভালোই জানেন এসবের বেশিরভাগই ফেইক ব্যাপার-স্যাপার। তবে বিষয়টি এমন যে পুরোপুরি বিশ্বাস করে না মানুষ, আবার পুরোপুরি অবিশ্বাসও করেনা। ভায়োলেন্স, মেন্টাল সিকনেসের হিস্ট্রি তো মানবজাতির ইতিহাস থেকে খুব একটা কমবয়সী নয়।
কোচিং সেন্টারে পড়িয়ে ভালোই আয়-ইনকাম ছিল অভির কিন্তু আবার কেন সে ফিরে যেতে চায় সেই দুঃস্বপ্নের মত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে? গ্র্যাজুয়েট হয়ে বের হওয়াটা তাঁর জন্য প্রায় অসম্ভব একটি বিষয় এ���ন।
এর মধ্যে আছে আবার অভির হ্যালুসিনেশন। অন্য এক জগতে চলে যাওয়া। আবার ফিরে আসা। এসব কি শুধুই হ্যালুসিনেশন? ভয়ানক সেই জগত থেকে কি মুক্তি মিলবেনা অভির?
প্রেমে ব্যর্থতা, ভার্সিটিতে অপমানিত হয়ে চলা, টাকা-পয়সার টানাটানি এবং পরীক্ষার মত প্রকান্ড পর্বতের মুখোমুখি হওয়া এই খারাপ ছাত্রের কাছে কোন জগতটি সত্য? এত চ্যালেঞ্জের মাঝেও এমন এক জগতে সে প্রবেশ করে যা নারকীয়। ভেবে দেখুন অভির বাস্তব এবং কল্পনা (!) দুটিই ভয়ানক। বেছে তো নিতে হবে একটিকে।
গল্প বেশ দ্রুত পড়ে শেষ করে ফেলার মত। আমার এই স্টোরির মধ্য দিয়ে দ্রুত ছুটে যেতে সমস্যা হয়নি। লেখক লুৎফুল কায়সার ভূমিকায় এই কাহিনীকে অর্থহীন বলেছেন। এবং বলেছেন নিখুঁত বই যারা পড়তে চান তাঁরা যেন এটি এড়িয়ে যান। পারফেক্ট বই বলে কি আসলে কিছু আছে? লেখকের মতে তিনি নামটিও অপ্রাসঙ্গিক দিয়েছেন। এটা সত্য পুরো গল্পের প্লট একদম আহামরি না হলেও বিশৃঙ্খলা বা ক্যাওসে ভর্তি এই আখ্যান আমার কাছে বেশ সুখপাঠ্য লেগেছে। লুৎফুল কায়সারের লিখা প্রথম কোন বই পড়লাম। লেখক দুই লেয়ারে কাহিনী লিখেছেন। পাঠক চাইলে যেকোন একটি ব্যাখ্যা নিজের মত করে নিতে পারেন।
স্টোরিটেলিঙে মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন লুৎফুল কায়সার। এই বই অত্যন্ত ফাস্ট রিড। একই সাথে জটিল কিছু বিষয়কে ঝরঝরে সহজ ভাষায় লিখেছেন তিনি। যদিও স্টোরির একটি টুইস্ট আমি প্রথমদিকেই বুঝে ফেলেছি। হয়তো লেখক সেটাই চেয়েছেন যাতে সচেতন পাঠক সেটা বুঝে ফেলুক তবে বইয়ের জায়গায় জায়গায় টুইস্ট দেয়ার কোন চেষ্টা লেখক করেননি। তিনি প্রাঞ্জল ভাষায় গল্পকারের কাজ করে গেছেন। রাইটিং এর অনেক ট্র্যাডিশনাল ক্রাফ্টস ব্রেক করেছেন তিনি সচেতনভাবেই। ক্যাওসের মধ্যেও একটা প্যাটার্ন থাকে সেটা দেখিয়েছেন।
এলাইজার কাহিনীর অর্থহীনতার মাঝেই সচেতন পাঠক কিছু অর্থ খুঁজে পাবেন। জীবনের অর্থহীনতার মাঝে অবিরাম অর্থ খুঁজে পাওয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টার মতোই।
বাংলাদেশে হরর জনরার বই আর পূর্ণাঙ্গ অনুবাদকে ছেলেখেলা বানিয়ে ফেলা লুৎফুল কায়সারের দ্বিতীয় মৌলিক বই 'এলাইজা' পড়লাম। হরর জনরার বই হলেও হরর এলিমেন্ট ছিল নামেমাত্র। লেখনী ভালো। ক্লাইমেক্স বেশ সাদামাটা। শেষের টুইস্ট অপ্রয়োজনীয় ও বাহুল্য। তবে হরর বই পড়ে হরর ভাইবটাই না আসলে সমস্যা। বইয়ের অধিকাংশটা জুড়ে একজন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া ছাত্রের ব্যাকলগ ক্লিয়ারের চেষ্টার বর্ণনা। প্রচুর ইনফরমেশন ডাম্প করা হয়েছে যা অনেকের পছন্দ না হলেও আমার ভালো লেগেছে। বইয়ের চরিত্র হাতেগোণা, তাও যেন তারা ফোকাসের বাইরে। সব মিলিয়ে, চলনসই।
এলাইজা খুব সম্ভবত লুৎফুল কায়সার ভাইয়ের দ্বিতীয় মৌলিক গ্রন্থ। অনুবাদক হিসেবে পরিচয় থাকলেও তার কোন বই আমার আগে পড়া ছিল না।
মুলত লাভক্র্যাফ্টিয়ান হরর বা কসমিক হরর নিয়ে আগ্রহ থাকলেও এ নিয়ে আমার পড়াশোনা মোটামুটি শূন্যের কোঠায়। সেখানে একটা নতুন বই যোগ হলো "এলাইজা।"
"এলাইজা" মুলত অভি নামে একজন যুবকের একাডেমিক আর লাভ লাইফের হতাশা দিয়ে শুরু। পুরো বইজুড়ে যার অস্তিত্ব বিদ্যমান। এর মাঝেই ডিপ ওয়েবের রেডরুম নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে গিয়েই আমাদের মুল গল্পে প্রবেশ।
বইটার ভালো দিকগুলোর একটা হলো, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার একটা ভয়াবহ অবস্থা নির্দ্বিধায় তুলে ধরছেন তিনি৷ আর এর ভেতরে থাকা অসহায় মানুষগুলোর হতাশা তীব্রভাবে অনুভব করতে পারছি এটা পড়ে।
মুল যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে বইটা এগিয়েছে তা বেশ ইন্টারেস্টিং। প্যারালাল জগৎ, শয়তান ইত্যাদি নিয়ে বেশ কিছু থিওরি পড়ে ভালো লেগেছে। হরর হলেও খুব একটা ভয় লাগেনি তবে শিউরে ওঠার মত বেশ কিছু অংশ বইটায় আছে। মজার ব্যাপার হলো তার বেশীরভাগই বাস্তব ঘটনা।
ছোট ছোট অধ্যায়ে ভাগ করা বইয়ে প্রথমদিকে বেশ কিছু ক্রিপিপাস্তা দেয়া আছে। যা অনেক সময় মুল কাহিনি থেকে আমায় দুরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। আমার কাছে বিষয়টা খুব একটা ভালো লাগেনি। আবার ধরে নেয়াই যায় যে, এই বিষয়গুলো মুল চরিত্রের মানসিক অবস্থা বোঝানোর জন্য দেয়া হয়েছে৷ তাহলেও মন্দ হয় না। আর শেষে দেয়া টুইস্ট টা অনুমেয় ছিল। বিষয়টা বিশ্বাসযোগ্যও মনে হয়নি।
বইয়ের পৃষ্ঠা, মলাট, প্রচ্ছদ চলনসই। তবে বানান ভুল আর স্পেস-বিভ্রাট পাঠকদের ভালো ভোগাবে।
বই : এলাইজা: একটি অর্থহীন কাহিনী লেখক : লুৎফুল কায়সার জনরা : কসমিক হরর পৃষ্ঠা : ২৮৭ প্রকাশক : বাতিঘর প্রকাশনী
বইটা পড়ে যতটা না গল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি, তার চেয়ে বেশি ‘ক্রিপি’ সব ঘটনাগুলোই আমাকে বেশি টেনে নিয়েছে। 'ক্রিপি' ঘটনাগুলো আমার ভালো লেগেছে- এমন না, কিন্তু বইটাই এমনভাবে লিখা। গল্পের চেয়ে বরং এই ফ্যাক্টগুলাতেই বেশি জোর দেয়া হয়েছে। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে এই সবগুলা ফ্যাক্টই সত্য। ডার্কওয়েব, ডিপওয়েব, ক্রিপিপাস্তা, রেডরুম, নাস্টিসিজম, মালাখ, 'Sad Satan' ইত্যাদি- এসব বিষয়গুলো অনেক ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে। কিন্তু এই ফ্যাক্টগুলার সাথে গল্পটার ধারাবাহিকতা সবসময় ছিলো বলে আমার মনে হয় না।
বইয়ের টাইপোতে, সম্পাদনায় ভুল ছিলো অনেক জায়গায়; অনেক জায়গা পড়ে মনে হচ্ছিলো লেখক জোর করে পৃষ্ঠা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। কেউ একটা গান শুনছে এটার বর্ণনা দিতে গিয়ে পুরো গানের লিরিক্স তুলে দেয়ার কোনো প্রয়োজন ছিলো না, যেখানে শেষের গান বাদে অন্য গানগুলোর সাথে গল্পের কোনো ঘটনার মিল নেই।
অলকের টুইস্টটা দিয়ে যে গল্পটা শেষ হবে এটা বেশিরভাগ পাঠকই একদম বইয়ের মাঝামাঝি অলকের বদ্ধ রুমের কথা আসার সাথেসাথেই বুঝে ফেলবেন। বয়সে ছোট কেউ হলে হয়তো ধরতে পারবে না। কিন্তু এই বই ছোটদের জন্য উপযুক্তও না।
অভির স্ট্রাগল, ব্যাকলগারদের কষ্ট, আধুনিক যুগের প্রেমের ফিলোসফি, ভার্সিটি লাইফ ইত্যাদি বিষয়গুলা জেনজি হিসেবে ভালোই রিলেট করতে পেরেছি। বইটা একদম খারাপ না,কিন্তু মূল ঘটনার সাথে ফ্যাক্টগুলোর আরও বেশি যোগাযোগ থাকা উচিত ছিলো।
দিনশেষে একমাত্র টুইস্ট - "সেরা সাবান হ্যাকু সাবান..........."
৪/৫ গল্পের শুরুতে লেখকের টীকা দিয়েই দিয়েছেন যে "যারা নিখুঁত বই পড়তে চান তারা দয়া করে এটি এড়িয়ে চলুন" আর বইয়ের নামেও বলা আছে "একটি অর্থহীন কাহিনী "
লুৎফুল কায়সারের পড়া প্রথম বই ছিলো এটা আমার।
মোটামুটি রকমের ভালো একটা গল্প। ভিন্ন কিছু পড়তে চাইলে পড়া যায় বইটা। এতো যুক্তি খুঁজতে গেলে কাহিনী টা উপভোগ করা যাবে না। এটা একটা বই আর স্বাভাবিক ভাবেই এতে লেখক তার কল্পিত গল্পকথা তুলে ধরেছেন। কিছু Quote ভালো লেগেছে খুব। যেমন
***"পৃথিবীতে সবচেয়ে অসুস্থতম প্রতিযোগীতা হলো দ্বিতীয় হওয়া��� প্রতিযোগীতা"
***"জুনিয়র ব্যাচের সাথে ক্লাস করতে গেলে প্রতি ক্লাসে স্যাররা দাঁড় করিয়ে ব্যাকলগ আসার কারণ জানতে চান। যেটা অনেকেরই ইগোতে লাগে। অনেক ছাত্রের ভার্সিটি ছেড়ে চলে যাওয়ার এটাও একটা কারণ।" - দারুন বলেছেন 👌
***মানুষের জীবনে এমন কিছু সময় আসে যখন কোনো যুক্তি কাজ করে না।
হাই স্কুলের বন্ধুত্ব নিয়ে যে ব্যাখ্যাটা দেয়া হয়েছে অসাধারণ ছিলো 👌 সরকারি ভার্সিটি গুলোর ব্যাপারে অনেক বাস্তবিক কথা তুলে ধরা ও হয়েছে।
এই বইটার হররাঙ্গিক কিঞ্চিৎ ভিন্ন। এটা তথাগত হরর নয়, কিছুটা ফ্যান্টাসি এলিমেন্ট আছে। আবার কেউ কেউ লাভক্রফটিও ফ্লেবারও পেয়ে যেতে পারেন। এখানে পিছিয়ে পড়া একজন ছাত্রের জীবনের মধ্য থেকে দক্ষভাবে তুলে আনা হয়েছে হররের স্বাদ। হতাশায় মোড়া এক অদ্ভুত আখ্যান। এরমধ্যে আছে ক্রিপিপাস্তা আর অন্য এক জগতের হাতছানি।
উফফ্ কি পড়লাম! মাথা ঘুরে গেছে একদম। ডিপ ওয়েব, স্যাটানিজম এইসব টপিক নিয়ে আমার পড়া প্রথম বাংলা বই, এলাইজা। এক বসায় শেষ করেছি। পড়ার সময় ভয় পেয়ে উঠেছি বহুবার। আলাদা এক জগতে ট্রান্সপোর্ট হয়ে গেছিলাম যেন। দারুন একটা বই, দশে দশ!
প্লট টা আমার কাছে এভারেজ লেগেছে। হুট করে শুরু আর হুট করে শেষ। যদিও ভূমিকাতে লেখক বলেই দিয়েছেন বিষয় টা। তবে ডার্ক ওয়েব আর রেড রুম নিয়ে অনেক কিছুই জানতে পারলাম।
লুৎফুল ভাইয়ের পড়া প্রথম মৌলিক এটা। যদিও তার অনুবাদ পড়ে অভ্যস্ত। তবে তার চিন্তাধারা আর কাল্পনিক চিত্রটি বেশ অন্যরকম ধরনের। পুরো গল্পটাই কিছুটা স্লো হলেও ইন্ট্রেস্টিং আর এন্ডিং টা পছন্দসই