যেসকল পেশা কালের পরশে হারিয়ে গিয়েছে সেইসব নিয়ে এই বই। যেমন : আলতা পরানো নাপতিনী, সিঁধেল চোর, কম্পাউন্ডারবাবু, রানার, টোলের পণ্ডিত, পুরাতন-ভৃত্য ইত্যাদি। সাথে আছে হারিয়ে যাওয়া আরো নানান জিনিসের খোঁজ। লেখক নিজে ছোট্টবেলায় এদের দেখা পেয়েছিলেন। তাদের নিয়ে লিখতে গিয়ে একটু করে তাদেরই স্মৃতিচারন করেছেন এখানে। মিষ্টি মিষ্টি একটা বই।
সময়ের সাথে সাথে কিছু জিনিসকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যেতে হয়। আবার সময়ের প্রয়োজনে কিছু জিনিস এমনিতেই হারিয়ে যায়। স্মৃতি হাতড়ে তখন সেই জিনিসের সঙ্গে লেপ্টে থাকা আবেগ অনুভূতি বারবার পুলকিত করে।
হারিয়ে যাওয়া কিছু পেশা বা জীবিকা এবং কিছু বুলি বা মুখের কথা আমরা হারাতে হারাতে একেবারেই হারিয়ে ফেলেছি তেমন সব জীবিকা ও পেশা নিয়ে কিন্নর রায় এর 'লুপ্তজীবিকা লুপ্তকথা'।
কোন কাজই ছোট নয়- এমনটা বলা হলেও সব পেশা বা জীবিকা হয়তো সম্মানের বা আনন্দের নয়। তেমনই কিছু ছিল, হয়তো খুবই ছোট তবুও সেগুলো দৈনন্দিন জীবনের সাথে মিশে থাকতো। একটা সময় এসে সেই জিনিস গুলো বুঝে বা জেনে উঠার আগেই একেবারে নাই হয়ে গেলো-- পুকুর-ডুবুরি, কম্পাউন্ডার, দুধ-মা, পোস্টকার্ড-কালি-কলম, ঘটি-তোলা, সাজো-ধোপা, কাসুদ্দি, ক্যাচার- এমন আরও অনেক কিছু। এর কিছু হয়তো নাই হতে হতে তবুও একটু খানি থেকে গেছে একটু আলাদা কায়দায়।
লেখক ছোট বেলায় এসব দেখেছেন, সময় কেটেছে এর মধ্যে থেকেই। সেই সব জিনিস নিয়ে মধুর এক স্মৃতিচারণ। যদিও এটা মোটেই স্মৃতিচারণ মূলক বই না৷ তবে লেখকের লেখায় অতীত স্মৃতি স্পষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছে। দারুণ একটা বই।
"...তখন ডুবুরি ভরসা। মথায় বড়জোর চার ফুট দশ। খুব কালচে চোখ। কালো রঙ। একমাথা চুল টেনে, উলটে পেছন দিকে আঁচড়ানো। কাঁধে একটা বড় ঝুড়ি। হাতে লোহার শিক। তখন গাজনের ঢাকের শব্দে শিমুল তুলোর ফল ফাটো ফাটো। সজনে ডাঁটা ফেটে গিয়েছে কোথাও কোথাও। রোদ ভীষণ কড়া..."
এরকম অপুর্ব কিছু বর্ণনা দিয়ে শুরু হয়েছে কিন্নর রায়ের লুপ্তজীবিকা লুপ্তকথা। পুকুরজলের ডুবুরি। চীনা সিন্দুর বিক্রেতা। দুধ মা। বহুরূপী।
তবে বইটা কিছু কিছু জায়গায় একটু গ্যাদগ্যাদে নস্টালজিয়ায় দুষ্ট। আর নিজের ছোটবেলার স্মৃতি থেকে লেখক যেখানে অন্য কথা লিখেছেন, সেখানের লেখনীও তত পুরুষ্টু নয়। সব মিলিয়ে, আড্ডা আসরের গল্প শোনার মত করে পড়লে দিব্যি বই। তার বেশি আশা করলে নয়।
কোনো কাজই ছোটো নয়, এমন কথা বলা হলেও, সব জীবিকা সমান আনন্দের বা সম্মানের ছিল না। কিন্তু তবুও তারা ছিল। আমাদের ছেলেবেলার অনেকটা সময় নিয়ে ছেয়ে থাকতো তারা। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ করেই তারা একদিন নেই হয়ে গেলো। যদিও অনেক জীবিকাই আমার দাদু-দিদাদের আমলেই হারিয়ে গেছে। যারমধ্যে একটা হলো 'রানার'।
দাদুর একমাত্র আদরের নাতনি। দাদুবাড়ি গেলে সবসময় আবদার থেকেই থাকতো গল্প না শুনে ঘুমাবো না। আর নাতনির আবদার তো ফেলা যায় না। তখন সেই গল্প বলার তাগিদে দাদু ফিরে যেতো তার স্মৃতিবিজড়িত বাল্যকালে। দাদুর দাদু অর্থাৎ ঠাকুরদা ছিলেন রানার। কাঁধে ঝোলা ব্যাগ, হাতে ঘুঙুর লাগানো লাঠি নিয়ে রাতের পর রাত তিনি ছুটে বেড়াতেন গ্রামের পর গ্রাম চিঠি পাঠানোর উদ্দেশ্যে। আর সেই যাত্রাপথে যেসকল অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলেন, সেই সকল ঘটনা দাদুর মুখে রাতের ঘুম ঘুম চোখে শুনে এক আলাদাই রোমাঞ্চে পুলকিত হতাম তখন আমি। সত্যি বলতে আজও সুযোগ পেলে দাদুকে মাঝে মধ্যে বলি, সেই ঘটনাগুলো আবার বলতে।
শুধু রানার কেন? ৫০-৬০ এর দশকে গ্রামবাংলায় সিঁধেল চোর, ডাকাতের হুজ্জুতিও কম ছিল না। দিদার মুখে শোনা, তাদের বিয়ের পর বাড়িতে দুবার ডাকাত এসেছিল। আর ডাকাতরা তখন নাকি এতোটাই বেপরোয়া ছিল যে, তারা আসবে, সেকথা তারা আগাম জানিয়েও রাখতো। কিন্তু সৌভাগ্যবশত তারা বিশেষ কারও কোনো ক্ষতি করেনি, কেবল ঘরের কয়েকটা জিনিস নিয়ে গিয়েছিল। এই ঘটনা এখন পুলকিত করলেও, তখনকার পরিস্থিতির কথা ভাবলে সত্যিই ভয়ই লাগে।
তবে শুধু দাদু-দিদার কাছ থেকে নয়, বাবা-মায়ের কাছ থেকেও শুনেছি হারিয়ে যাওয়া জীবিকার কথা। যেমন- বায়োস্কোপ, যাত্রাপালা, বহুরূপী ইত্যাদি। মায়ের মুখে শুনেছি, যাত্রাপালা দেখতে তার এতো ভালো লাগতো যে বেশিরভাগ সময় যখনই যাত্রা আসতো তখনই নাকি মা তার ঠাকুমাকে পাকড়াও করে নিয়ে যেতো যাত্রা দেখতে। যেহেতু মায়ের ঠাকুমা যেতো সাথে, তাই দাদুও আর না করতে পারতো না। অবশ্য দাদু-দিদা সহ পরিবারের অন্যরাও একসাথে যেতো মাঝে মধ্যে। আর বাবা তো ছিল এক কাঠি উপরে। স্কুল থেকে লুকিয়ে এসে নাকি মাঝে মধ্যে যাত্রা দেখতে যেতো। কারণ ঠাম্মা জানলে একটা মারও মাটিতে পড়বে না তাই।
তবে শুধু দাদু-দিদা, বাবা-মা কেন, আমরা ৯০এর দশকের মফঃস্বলের ছেলে-মেয়েরাও এমন বেশ কিছু জীবিকা দেখেছি, যা আজ কতো কাল হলো হারিয়ে গেছে। লেখক সেইসকল বিভিন্ন হারিয়ে যাওয়া জীবিকার কথা তুলে ধরেছেন এই বইতে।
অবশ্য শুধু জীবিকা নয়, লেখকের লেখায় ফুটে উঠেছে হারিয়ে যাওয়া আরও নানান ধরনের জিনিস। যেমন- আগেকার দিনে বাড়ির বড়োরা আমের সময়ে আমসত্ত্ব বানাতো। এখনকার মতো আর্টিফিশিয়াল রঙ-গন্ধ মেশানো আমসত্ত্বের ছোঁয়া তখন ছিল না। শুধু আমসত্ত্ব কেন, বাড়িতে ডালের বড়ি, কাসুন্দি, পাঁপড় আরও কত কীই না বানানো হতো তখন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেইসব প্রায় হারিয়েই গেছে।
নতুনকে জায়গা দিতে পুরনোকে সবসময় সরতে হয়, এটা কালের নিয়মে হয়েই আসছে। ঠিক তেমনই কালের নিয়মে পরিবর্তন হয়ে গেছে নিমন্ত্রণ বাড়ির মেনু থেকে শুরু করে, লেখার কাগজ-কালি-কলম ইত্যাদি। হারিয়ে গেছে আগেকার অনেক মাছ। যেসব মাছ আজ থেকে ৩০-৪০ বছর আগেও মানুষের নিত্যদিনের খাওয়ার পাতে দেখা যেতো, তা আজ কেবল স্মৃতির আঙিনায় ভাসে।
সামাজিক বিন্যাসের বদলে যাওয়াতে, কর্পোরেট পৃথিবীর দুরমুশে, টেকনোলজির সমবেত আক্রমণে, সেইসব জীবিকা, জিনিসগুলো আজ কেবল স্মৃতির বেড়াজালেই ধরা দেয়, বাস্তবের মাটিতে নয়। আর এই স্মৃতির বেড়াজালে লেগে থাকা আবেগ পুলকিত করে তখন বারবার।
অসম্ভব ভালো একটি বই। লেখকের স্মৃতিবিজড়িত এই লেখা পড়ে মনে হচ্ছিল যেন টাইম মেশিনে করে চলে গেছি সেই ৫০-৬০ এর দশকে। বড়ো মায়া ধরানো লেখা। ভাষাও খুব সহজ সরল, ফলে পড়তে কোনো অসুবিধা হয় না। খুব দ্রুততার সাথেই শেষ হয়ে যায়।
পাঠকদের বলবো একবার পড়ে দেখতে বইটা। আশা করি ভালো লাগবে। পাঠে থাকুন।