পড়ুয়া কলিগ মাশরুর ভাই বসেন আমার পাশের ডেস্কেই। একদিন সকাল বেলা ওনার টেবিলে আবিষ্কার করলাম জলপাই রঙা কাভারের কবি বন্দে আলী মিয়ার "জীবনের দিনগুলি" বইটি। "বন্দে আলী মিয়া" নামটা দেখেই আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল আমার ছোটবেলার স্কুলের দিনগুলি। আমরা যারা নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে প্রাথমিকে পড়েছি, তাদের বাংলা পাঠ্যবইয়ে ছিল কবি বন্দে আলী মিয়ার আমাদের গ্রাম কবিতাটি।
"পাড়ার সকল ছেলে মোরা ভাই ভাই
একসাথে খেলি আর পাঠশালে যাই।
আমাদের ছোট গ্রাম মায়ের সমান
আলো দিয়ে বায়ু দিয়ে বাঁচাইছে প্রাণ।"
কী সুন্দর কবিতা! এই কবিতা দিয়েই তো সেই স্কুলবেলায় মনে গেঁথে যায় "বন্দে আলী মিয়া" নামটি। তারপর হারিয়ে যায় যেন কোথায়। কোন খোঁজ নেই। তাঁর আর কোনও লেখার খোঁজও পাই না। কিন্তু মনে গাঁথা থাকে-
"আমাদের ছোট গায়ে ছোট ছোট ঘর
থাকি সেথা সবে মিলে নাহি কেহ পর"।
বইটা হাতে নিয়ে পড়া শুরু করেই জানতে পারি বন্দে আলী মিয়া জীবনে আরও অনেক কিছুই লিখেছেন কবিতার পাশাপাশি। ছবি এঁকেছেন, নাটক লিখেছেন, উপন্যাসও লিখেছেন।
জীবনের দিনগুলি ঠিক কবির আত্মজীবনী নয়। স্মৃতিকথা। শিল্প- সাহিত্য অঙ্গণের রথী-মহারথীদের সাথে কাটানো কবির জীবনস্মৃতি।
'হে অতীত, কথা কও' বলে বাংলা ১৩২৮ সাল থেকে নিজের কবি হয়ে ওঠার স্মৃতি লেখা শুরু করেন বন্দে আলী মিয়া। সেই সময়ের নবম শ্রেনীর ছাত্র কীভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে কবিতা লেখা শুরু করলেন, ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখা, প্রবেশিকায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯২৩ সালে পাবনা ছেড়ে কলকাতায় গমন। এরপর সেখানে গিয়ে ধীরে ধীরে সান্নিধ্য পেয়েছেন কবি গোলাম মোস্তফা, মৌলানা আকরাম খাঁ, কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কবি বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়, শেরে বাংলা একে ফজলুল হকসহ আরও অনেক রথী মহারথীদের। তবে সবকিছু ছাপিয়ে এই স্মৃতিকথায় বেশী উজ্জ্বল হয়ে আছে নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের সাথে কাটানো স্মৃতি। তাঁদের সাথে সাহিত্য নিয়ে নানা তর্ক বিতর্ক, হিন্দু মুসলিম ভাবনা, সাম্প্রদায়িকতা সব আলাপই অত্যন্ত ঘরোয়াভাবে উঠে এসেছে বইটিতে। ঘরোয়া এসব আলাপ পড়তে আরামই পেয়েছি।
লিখেছেন, "কাজী সাহেবের দাবা খেলার বাতিক ছিল। চা ছিল ওঁর অতি প্রিয়। আমাদের মাঝে মাঝে বলতেন: চালাক যদি হতে চাও তবে লাখ পেয়ালা চা খাও।"
কাজী সাহেব বন্দে আলী মিয়ার কাছে মহান একজন। কবিগুরুও। কিন্তু শরৎচন্দ্রের সাথে সাক্ষাতের পর তিনি লেখেন, " শরৎ চন্দ্রকে দেখবার আগে তাঁর সম্বন্ধে কত কল্পনাই না মনে ছিল। রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে তাঁর যে ব্যক্তিত্ব (Personality)অনুভব করেছি, শরৎচন্দ্র ব্যক্তিগতভাবে যেন তেমনভাবে মনের উপর প্রভাব বিস্তার করেন না। তবুও তাকে আমার ভালো লাগলো।"
এই স্মৃতিকথায় প্রথিতযশাদের সাথে কবির স্মৃতির পাশাপাশি তাদের সম্পর্কে ব্যক্তিগত মতামত দিয়েছেন কবি। কালচারালি হিন্দু মুসলিমদের যে ভেদাভেদ ছিল তা বলতে গিয়ে লিখেছেন-
" অতবড় হিন্দু পাড়ায় আমি একঘর মাত্র মুসলমান। অদূরে মুসলমান পাড়ায় যে সকল মুসলমান ছিল তারা প্রায় সকলেই অশিক্ষিত। কাশীপুর গান শেল ফ্যাক্টরী বা ঐরূপ কোনো কল-কারখানায় তারা শ্রমিকের কাজ করতো। সুতরাং তাদের সঙ্গে মেলামেশা করবার কোনও সুযোগ ছিল না। কলকাতার আদিবাসী মুসলমানেরা লেখাপড়া করাকে সময়ের অপচয় বলে মনে ভাবতো। তাদের সাথে মেলামেশা করার সূত্র আমি আদৌ খুঁজে পেতাম না। তাই আমার স্মৃতিকথায় তাদের উল্লেখ একেবারেই নেই।"
বইটি পড়তে গিয়ে বন্দে আলী মিয়ার অন্যান্য লেখা পড়ার ব্যাপারে আগ্রহ তৈরী হল। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের কাছে প্লট নিয়ে লেখা শেষ লগ্ন ও কবিতার বই "ময়নামতির চর" পড়ার অপেক্ষায়।
সরল ভাষায় লেখা এমন জীবনস্মৃতি পড়তে আমার বরাবরই ভাল লাগে। বলা হচ্ছে এটি তাঁর জীবনস্মৃতির প্রথম খন্ড। এখানে বাংলাদেশ পর্ব মানে পাবনায় বেড়ে ওঠার স্মৃতিকথা লেখেননি তিনি। শুধুই রথী-মহারথীদের সঙ্গস্মৃতি হয়ে উঠেছে বইটি, যাতে দেশভাগের আগ পর্যন্ত কলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার চিত্রও মেলে কিছুটা।
সব মিলে আমার রেটিং ৩.৫/৫