Bande Ali Mia was a Bangladeshi poet, lyricist, novelist, dramatist, essayist, children’s writer, and journalist. He also worked as a graphic artist and designer. For his contribution to children's literature, he was awarded several prizes.
বর্তমানে বিস্মৃতপ্রায় কবি বন্দে আলী মিয়ার আত্মজীবনী 'জীবনের দিনগুলি'। বইটির প্রথম খণ্ডের প্রকাশক আহমদ পাবলিশিং হাউস। মাত্র এক শ বাইশ পাতার বইটিতে লেখক নিজের সাহিত্যজীবনের কথা লিখেছেন। যেখানে প্রাসঙ্গিকভাবে তৎকালীন মুসলিম লেখকসমাজের চিত্র আমরা পাই। রবীন্দ্র ও নজরুলের স্নেহধন্য বন্দে আলী মিয়ার এই স্মৃতিকথা।
কবি হওয়ার সুতীব্র ইচ্ছা ছোটবেলা থেকেই ছিল বন্দে আলী মিয়ার। তখন ছাপার অক্ষরে স্বনামে লেখা প্রকাশিত হওয়া ছিল বড় ব্যাপার। বিশেষ করে, পশ্চাৎপদ বাঙালি মুসলমান সমাজে। নবম শ্রেণির ছাত্রথাকাকালে পহেলা কবিতা প্রকাশিত হয় তার এরপর সাহিত্যচর্চা কখনো থামাননি।
ছবি আঁকতে খুব ভালোবাসতেন বন্দে আলী মিয়া। এন্ট্রান্স পাসের পর কলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তি হন। সেই সময়ে বাঙালি মুসলমানের ছেলে চিত্রকলা শিখবে তা ভাবা যেতো না। তাই লেখকের দাবি অনুযায়ী তিনি সেখানকার প্রথম মুসলমান শিক্ষার্থী। সাহিত্যচর্চা করতে গিয়ে অনেকের সাথেই পরিচিত হলেন। যেমন: কবি গোলাম মোস্তফার সাথে দেখা করতে গিয়ে বন্দে আলী মিয়া আবিষ্কার করেন ইতোমধ্যে গোলাম মোস্তফা তার লেখা পড়েছেন! কারণ হিসেবে গোলাম মোস্তফা বলেন, বাঙালি মুসলমান লেখালিখি করে খুব কম। তাই বাকিদের ভিড়ে তখন খুব সহজেই একজন বাঙালি মুসলমানের লেখা চোখে পড়তো।
কাজী নজরুল ইসলামের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন বন্দে আলী মিয়া। কবি নজরুল সব সময় হাসি,গানে ও কথায় মজলিশ মাতিয়ে রাখতেন। সময়জ্ঞান কবির বড় বেশি ছিল না। তাই একাধিকবার দেখা গেছে কবি কথা দিয়েও অনুষ্ঠানের দিন আসেননি। তাকে খুঁজেই পেতো না আয়োজকমণ্ডলী। নজরুলের গজল সমাদৃত হয়েছিল মুসলিম সমাজে। তার লেখা শ্যামাসংগীতের জন্য তিনি হিন্দুদের কাছে কত আদরণীয় ছিলেন তার সাক্ষী বন্দে আলী মিয়া নিজে। সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করতেন না নজরুল। বৈষয়িক বিষয়ে অসচেতনতার কারণে কীভাবে ঠকতেন তার প্রমাণ নজরুলের গ্রামোফোন রেকর্ড বিক্রির দোকান। তার ইয়ার-দোস্তরা রেকর্ড নিয়ে যেত। কিন্তু টাকা দিতো না। নজরুলও চাইতে পারতেন না। এভাবেই ব্যবসায়ী নজরুলের অপমৃত্যু হয়। স্ত্রী আশালতা অসুস্থ হয়ে গেলে প্রচলিত চিকিৎসাপদ্ধতি ছাড়াও তন্ত্রমন্ত্রে আস্থাশীল হয়ে ওঠেন নজরুল। এমনই একজন তান্ত্রিকঘরানার চিকিৎসকের কাছে নজরুলের সঙ্গী হয়ে গিয়েছিলেন বন্দে আলী মিয়া।
তখনকার সাহিত্যসমাজ সম্পর্কে বন্দে আলী মিয়া ও কবি কায়কোবাদের কথোপকথনে ধারণা পাওয়া যায়:
'আমি এ প্রসঙ্গ এড়াবার জন্যে বললাম : আপনার ‘মহাশ্মশান' কাব্য বাংলা সাহিত্যের বিশেষ সম্পদ ।
কবি কায়কোবাদ হাসলেন। ধীরে ধীরে বললেন : ওটা আজ
কাল) ক্লাসিকের পর্যায়ে চলে গেছে। পাঠকগোষ্ঠী পড়ে না।কিন্তু সম্মান করে – যেমন মাইকেল আর বঙ্কিমচন্দ্রের বই। - কথায় আমি মৃদু হাসলাম । জবাব দিলাম : অনেকটা বটে। কিন্তু মাইকেল আর বঙ্কিম অতীত হয়েছেন, আপনি আজও আমাদের মধ্যে রয়েছেন—যেমন রবীন্দ্রনাথ আছেন। : রবীন্দ্রনাথের কথা উল্লেখ করছো! রবীন্দ্রনাথের সমাজের লোকেরা যতটা শিক্ষিত ও গুণগ্রাহী — আমাদের সমাজ কি তাই! তিনি পেয়েছেন হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে একটা বিরাট গোষ্ঠিকে । তুমি হয় তো জানো, হিন্দুরা মুসলমানের লেখা বই ছোঁয় না। কিন্তু মুসলমানেরা হিন্দু লেখকের বই কিনে পড়ে। মুসলমান গ্রন্থকারদের কী চরম দুরবস্থা একবার ভেবে দেখ । কায়কোবাদ বক্তব্য শেষ করে একটা চুরুট ধরালেন। কবির এ অভিযোগ মর্মান্তিক সত্য — সুতরাং নীরব হয়ে রইলাম । কবি কায়কোবাদ পুনরায় বললেন : নজরুলকে দেখ। তাঁর সমকক্ষ কবি বাংলায় আর দু’টি নেই। কিন্তু মুসলমানদের কাছে তাঁর লেখা হিন্দুরা আদর করে — হিন্দু প্রকাশকেরা অনাদৃত। তাঁর তাঁর বই ছাপে—তাই আজও দু’টি খেতে পাচ্ছেন। নইলে তাঁর দুর্দশার শেষ থাকতো না। '
কেন বাঙালি মুসলমান লেখকদের এই হাল তার উত্তরে কায়কোবাদ বলেন,
' ঈর্ষা, পরনিন্দা আর দলাদলি মুসলমানদের মজ্জাগত। আপনার সমাজের প্রতি তার এতটুকু মমত্ববোধ নেই। সে হিন্দুর পদলেহন করবে। কিন্তু নিজের সমাজের লেখক আর প্রকাশকদের কথা এতটুকু ভেবে দেখবে না। '
রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য বন্দে আলী মিয়া রবীন্দ্রনাথকে জিজ্ঞেস করেছিলেন তার রচনায় কেন মুসলমান সেভাবে নেই। রবীন্দ্রনাথ জবাব দেন,
'মুসলমান সমাজ সম্পর্কে বিশেষ কিছু আমি জানি না। শিলাইদায় যদিও অনেক কাল ছিলাম তথাপি সুযোগ করে উঠতে পারিনি। এক একবার ভাবি—লিখবো, কিন্তু সাহসে কুলায় না। বঙ্কিমচন্দ্রের মতো গালমন্দ খেতে হবে ভয়ে পিছিয়ে আসি। সাম্প্রদায়িকতাকে আমি প্রশ্রয় দিই না। এর প্রমাণ কেউ আমার শান্তিনিকেতনে গেলেই বুঝতে পারবে। কিন্তু গল্পে মুসলমান চরিত্র সৃষ্টি করতে গেলে মনে হয়, হয়তো ঠিকভাবে আঁক্তে পারছি না। হয়তো যথার্থ রূপটি দিতে পারছি না। তবে একেবারে যে লিখিনি তা নয়। আমার গল্পগুচ্ছ পড়ে থাক্লে নিশ্চয়ই সাক্ষাৎ পেয়েছো। '
বঙ্কিমচন্দ্র তার কট্টর মুসলমান বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িকতার জন্য সমালোচিত হন। রবিবাবু যদি সাম্প্রদায়িকতার আশ্রয় না নেন তাহলে তো কোনো সমস্যা নেই। অহেতুক বঙ্কিমের উদাহরণ টানতে হলো কেন তাকে? তিনি কী মনে করতেন বঙ্কিম সাম্প্রদায়িক নয়?
'৪৬ সালের দাঙ্গার সময়ে হিন্দুপ্রধান এলাকায় থাকতেন লেখক। সেই সময়ের কথা কথা স্মরণ করে লিখেছেন, কলকাতায় মুসলমানরা সংখ্যালঘু। 'প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস' পালনের জন্য তিনি নিজেও ময়দানে গিয়েছিলেন। কারণ দাঙ্গা হতে পারে এমন ধারণা তখন মুসলমানদের ছিল না।
সবকিছু মিলে 'জীবনের দিনগুলি' অসাধারণ কোনো আত্মজীবনী নয়। তবে একবার পড়ার মতো।
পড়ুয়া কলিগ মাশরুর ভাই বসেন আমার পাশের ডেস্কেই। একদিন সকাল বেলা ওনার টেবিলে আবিষ্কার করলাম জলপাই রঙা কাভারের কবি বন্দে আলী মিয়ার "জীবনের দিনগুলি" বইটি। "বন্দে আলী মিয়া" নামটা দেখেই আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল আমার ছোটবেলার স্কুলের দিনগুলি। আমরা যারা নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে প্রাথমিকে পড়েছি, তাদের বাংলা পাঠ্যবইয়ে ছিল কবি বন্দে আলী মিয়ার আমাদের গ্রাম কবিতাটি।
"পাড়ার সকল ছেলে মোরা ভাই ভাই একসাথে খেলি আর পাঠশালে যাই। আমাদের ছোট গ্রাম মায়ের সমান আলো দিয়ে বায়ু দিয়ে বাঁচাইছে প্রাণ।"
কী সুন্দর কবিতা! এই কবিতা দিয়েই তো সেই স্কুলবেলায় মনে গেঁথে যায় "বন্দে আলী মিয়া" নামটি। তারপর হারিয়ে যায় যেন কোথায়। কোন খোঁজ নেই। তাঁর আর কোনও লেখার খোঁজও পাই না। কিন্তু মনে গাঁথা থাকে-
"আমাদের ছোট গায়ে ছোট ছোট ঘর থাকি সেথা সবে মিলে নাহি কেহ পর"।
বইটা হাতে নিয়ে পড়া শুরু করেই জানতে পারি বন্দে আলী মিয়া জীবনে আরও অনেক কিছুই লিখেছেন কবিতার পাশাপাশি। ছবি এঁকেছেন, নাটক লিখেছেন, উপন্যাসও লিখেছেন।
জীবনের দিনগুলি ঠিক কবির আত্মজীবনী নয়। স্মৃতিকথা। শিল্প- সাহিত্য অঙ্গণের রথী-মহারথীদের সাথে কাটানো কবির জীবনস্মৃতি।
'হে অতীত, কথা কও' বলে বাংলা ১৩২৮ সাল থেকে নিজের কবি হয়ে ওঠার স্মৃতি লেখা শুরু করেন বন্দে আলী মিয়া। সেই সময়ের নবম শ্রেনীর ছাত্র কীভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে কবিতা লেখা শুরু করলেন, ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখা, প্রবেশিকায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯২৩ সালে পাবনা ছেড়ে কলকাতায় গমন। এরপর সেখানে গিয়ে ধীরে ধীরে সান্নিধ্য পেয়েছেন কবি গোলাম মোস্তফা, মৌলানা আকরাম খাঁ, কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কবি বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়, শেরে বাংলা একে ফজলুল হকসহ আরও অনেক রথী মহারথীদের। তবে সবকিছু ছাপিয়ে এই স্মৃতিকথায় বেশী উজ্জ্বল হয়ে আছে নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের সাথে কাটানো স্মৃতি। তাঁদের সাথে সাহিত্য নিয়ে নানা তর্ক বিতর্ক, হিন্দু মুসলিম ভাবনা, সাম্প্রদায়িকতা সব আলাপই অত্যন্ত ঘরোয়াভাবে উঠে এসেছে বইটিতে। ঘরোয়া এসব আলাপ পড়তে আরামই পেয়েছি।
লিখেছেন, "কাজী সাহেবের দাবা খেলার বাতিক ছিল। চা ছিল ওঁর অতি প্রিয়। আমাদের মাঝে মাঝে বলতেন: চালাক যদি হতে চাও তবে লাখ পেয়ালা চা খাও।"
কাজী সাহেব বন্দে আলী মিয়ার কাছে মহান একজন। কবিগুরুও। কিন্তু শরৎচন্দ্রের সাথে সাক্ষাতের পর তিনি লেখেন, " শরৎ চন্দ্রকে দেখবার আগে তাঁর সম্বন্ধে কত কল্পনাই না মনে ছিল। রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে তাঁর যে ব্যক্তিত্ব (Personality)অনুভব করেছি, শরৎচন্দ্র ব্যক্তিগতভাবে যেন তেমনভাবে মনের উপর প্রভাব বিস্তার করেন না। তবুও তাকে আমার ভালো লাগলো।"
এই স্মৃতিকথায় প্রথিতযশাদের সাথে কবির স্মৃতির পাশাপাশি তাদের সম্পর্কে ব্যক্তিগত মতামত দিয়েছেন কবি। কালচারালি হিন্দু মুসলিমদের যে ভেদাভেদ ছিল তা বলতে গিয়ে লিখেছেন-
" অতবড় হিন্দু পাড়ায় আমি একঘর মাত্র মুসলমান। অদূরে মুসলমান পাড়ায় যে সকল মুসলমান ছিল তারা প্রায় সকলেই অশিক্ষিত। কাশীপুর গান শেল ফ্যাক্টরী বা ঐরূপ কোনো কল-কারখানায় তারা শ্রমিকের কাজ করতো। সুতরাং তাদের সঙ্গে মেলামেশা করবার কোনও সুযোগ ছিল না। কলকাতার আদিবাসী মুসলমানেরা লেখাপড়া করাকে সময়ের অপচয় বলে মনে ভাবতো। তাদের সাথে মেলামেশা করার সূত্র আমি আদৌ খুঁজে পেতাম না। তাই আমার স্মৃতিকথায় তাদের উল্লেখ একেবারেই নেই।"
বইটি পড়তে গিয়ে বন্দে আলী মিয়ার অন্যান্য লেখা পড়ার ব্যাপারে আগ্রহ তৈরী হল। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের কাছে প্লট নিয়ে লেখা শেষ লগ্ন ও কবিতার বই "ময়নামতির চর" পড়ার অপেক্ষায়।
সরল ভাষায় লেখা এমন জীবনস্মৃতি পড়তে আমার বরাবরই ভাল লাগে। বলা হচ্ছে এটি তাঁর জীবনস্মৃতির প্রথম খন্ড। এখানে বাংলাদেশ পর্ব মানে পাবনায় বেড়ে ওঠার স্মৃতিকথা লেখেননি তিনি। শুধুই রথী-মহারথীদের সঙ্গস্মৃতি হয়ে উঠেছে বইটি, যাতে দেশভাগের আগ পর্যন্ত কলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার চিত্রও মেলে কিছুটা।