আফগানিস্থানের ভবিষ্যৎ দিব্য চক্ষে দেখতে পাচ্ছি। এই দেশের তিন দিকে যে সকল দেশ আছে এক রুশিয়া ছাড়া প্রত্যেকটি দেশের রাষ্ট্রনৈতিক পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। সেই পরিবর্তনের সময় আফগানিস্থানও আপনা হতেই রূপ বদলাতে বাধ্য হবে। আফগানিস্থানের লোকসংখ্যা খুবই কম এবং দেশটা পর্বতমালায় সমাকীর্ণ। নূতন পরিবর্তনের সময় দেশের লোকক্ষয় কমই হবে, সেজন্য আফগান জাত কারো কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করলেও চলবে। যদি তাদের কারো কাছে কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করতে হয় তবে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে তাদের দেশের পর্বতমালার কাছে। পর্বতমালা হবে তাদের আশ্রয়।
রামনাথ বিশ্বাস একজন ভারতীয় বিপ্লবী, সৈনিক, ভূপর্যটক ও ভ্রমণকাহিনী লেখক। তিনি ১৯৩৬ ও ১৯৩৭ সালে সাইকেলে চড়ে বিশ্বভ্রমণ করেছিলেন। রামনাথ ১৮৯৪ সালের ১৩ জানুয়ারি অসমের সিলেট জেলার বানিয়াচং গ্রামের বিদ্যাভূষণপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন; যা বর্তমানে বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার অন্তর্ভুক্ত। হবিগঞ্জের জাতীয় ভান্ডার সমিতির ম্যানেজার পদ যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। জাতীয় ভান্ডার সমিতির মোটর কারখানা থাকার সুবাদে মোটর চালনা শিক্ষা করেন। এখানে থাকাকালীন তিনি সাইকেল চালনারও সুযোগ পান এবং তাতে বিশেষ পারদর্শী হয়ে ওঠেন। এরপর জাতীয় ভান্ডার সমিতির কাজ ছেড়ে অন্য একটি চাকরিতে যোগ দেন। এই সময়েই গোপনে অনুশীলন সমিতিতে যোগদান করেন। কিন্তু তাঁর বিপ্লবী যোগ প্রকাশ হয়ে গেলে তিনি চাকরি থেকে বহিষ্কৃত হন। ইতিমধ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হলে যুদ্ধে যোগ দেন। বাঙালি পল্টনের সঙ্গে মেসোপটেমিয়ায় যান। ১৯২৪ সালে মালয়ে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর একটি চাকরিতে যোগ দেন।
১৯৪৭ সালে দেশভাগ হলে অসমের সিলেট জেলা পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। রামনাথ বানিয়াচঙ্গেই থেকে যান। কিন্তু তিনি তাঁর ভ্রমণকাহিনী নিয়ে বই প্রকাশ করতে চাইলে কোন প্রকাশক এগিয়ে আসেনি। অগত্যা নিজেই পর্যটক প্রকাশনা ভবন নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা খুলে নিজের বই প্রকাশ করতে শুরু করেন। এরপর তিনি পূর্ব পাকিস্তানের পাট চুকিয়ে দিয়ে পাকাপাকিভাবে কলকাতায় চলে যান।
কলকাতায় বসবাসকালে রামনাথের ভ্রমণকাহিনী আনন্দবাজার পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হত। পরে তা গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়। তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা তিরিশের উপর।
ভূ-পর্যটক রামনাথ বিশ্বাস একা একা যেভাবে নতুন দেশ ভ্রমণে যেতেন, তাকে রীতিমতো দুঃসাহসী অভিযান বলা যায়। আফগানিস্তান ভ্রমণের কথাই ধরা যাক। সাইকেলে করে প্রায় শতবর্ষ আগে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি আফগানিস্তান গিয়েছিলেন। লেখকের মধ্যে একটা বেপরোয়া ভাব ছিলো ( অর্থাৎ যা হওয়ার হবে।) নিজের আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র বিচলিত হতেন না তিনি। আফগানিস্তানে বিপদগ্রস্ত অবস্থায় ঠাঁই পেয়েছিলেন এক মসজিদে। এসব ব্যাপারে বিধিনিষেধ কতোটা কঠোর আমরা তো জানি। সহিষ্ণুতার বিপরীতে গোঁড়ামির গল্পও আছে অনেক। বইয়ে আফগানিস্তানের ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক অবস্থা ও ভূ-প্রকৃতির বর্ণনা আছে। আফগানদের স্বাধীন মনোভাব, সেখানকার হিন্দুদের মধ্যকার বিভিন্ন কুপ্রথা ও কৌলীন্য নিয়ে আলোচনা যেমন আছে, তেমনি আছে কপর্দকহীন রামনাথের অর্থ জোগাড়ের বিভিন্ন প্রচেষ্টার কথাও। অর্থ জোগাতে সহায়তা পেতে প্রায়ই সরকারি অফিসে ধর্না দিতে হতো তাকে, নিতে হতো নানান প্রচেষ্টা (যা একইসাথে করুণরস ও হাস্যরস সৃষ্টি করে।) অসুস্থতাও ছিলো ভ্রমণের প্রতিবন্ধক। কিন্তু রামনাথ দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। অসীম মনোবল ও দৃঢ় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে তিনি সব বাঁধা পেরিয়েছিলেন।
রামনাথ বিশ্বাসের মতো ভূ-পর্যটক জগৎ-সংসারে বড়ো বিরল। আশ্চর্যরকম নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখেছেন আফগানিদের। সুন্দর ও সরল ভাষায় লিপিবদ্ধ করেছেন তার ভ্রমণকথা।
তখনও অবিভক্ত ভারতবর্ষ ইংরেজদের কবলে। সেই সময়ে সাইকেল নিয়ে ভ্রমণে বের হলেন রামনাথ বিশ্বাস। এবার গন্তব্য আজাদ ভূখণ্ড পাঠানদের আফগানিস্তান।
যাত্রাপথে দুর্বলতার দরুন গুজরাটের কোনো একটি স্থানে রাস্তাতেই আচমকা জ্ঞান হারান। আশ্রয় জোটে আর্যসমাজিদের পরিচালিত একটি বালিকা স্কুলে। কিন্তু রামনাথ বিশ্বাস হতবাক হয়ে গেলেন আর্যসমাজিদের আচরণে। কেউ সামান্যতম সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিল না। আবার, এই চিত্রের সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা হলো খাস কাবুলিদের মুলুকে। রমজান মাসে আশ্রয় পেলেন মসজিদের বারান্দায়। ইমাম সাহেব নিঃশঙ্কোচে একজন হিন্দুকে উপাসনালয়ে থাকার ব্যবস্থার পাশাপাশি আন্তরিক আচরণের মাধ্যমে মুগ্ধ করেন রামনাথ বিশ্বাসকে।
ভারতবর্ষে ধর্মের গোঁড়ামি আর ছুঁৎমার্গ দেখে ঘেন্না ধরে গিয়েছিল লেখকের। পাঠান মুলুক নিয়ে লোকে কত সত্য-মিথ্যা কেচ্ছা ছড়ায়। বাস্তবে নিজে এসে প্রমাণ পেলেন পাঠানদের দরাজ দিলের। সেই বর্ণনার সাথে আপনার-আমার ধারণা মিলবে না।
পাঠান মানেই মুসলমান নয়। বরং সনাতনী ও আর্যসমাজি বলে দু'ধরনের হিন্দু ধর্মাবলম্বী পাঠান আফগানিস্তানে দেখেছেন রামনাথ বিশ্বাস। পাঠান মুলুকের হিন্দুদের নিয়ে যে ধরনের কথা রামনাথ বিশ্বাস লিখেছেন তা অন্য ধর্মের যে-কেউ লিখলে সাম্প্রদায়িক বলে গাল খেতেন। হয়তো লোকে তাকে বয়কটের ডাক দিত!
আফগানি মোল্লাদের ছাড় দেননি রামনাথ বিশ্বাস। তারা নিজস্ব স্বার্থে কীভাবে আফগানিদের দারিদ্র্যকে আরও প্রকট করে রেখেছে সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন।
আফগানিস্তানের প্রধান প্রাদেশিক শহরগুলোর প্রায় সবগুলো ঘুরে দেখেছেন রামনাথ বিশ্বাস। কোথাও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে সহৃদয় পাঠান কিংবা কোথাও লেখক নিজে সরকারি সহায়তা জোগাড়ে সমর্থ হয়েছেন।
আজ থেকে প্রায় আশি বছর আগে পাঠান মুলুক চষে বেড়িয়েছেন রামনাথ বিশ্বাস। এত বছরে অনেককিছুই বদলে গেছে। তবে, আফগানিদের স্বাধীনচেতা মনোভাব একটুও বদলায়নি। যেমন পরিবর্তন ঘটেনি সেখানে মোল্লাতন্ত্রের প্রভাব।
খুব সুন্দর বই। কলেবরে আরও বড়ো হলেও পাঠক হিসেবে আমি বিরক্ত হতাম না।
সুখপাঠ্য ভ্রমণকাহিনি। আফগানিস্তান এখনকার সময়ে যেমন দুর্গম ও দূরের দেশ মনে হয় আমাদের কাছে, প্রায় শতবর্ষ আগেও তেমন ছিল অনেকটা। আফগানিস্তান ও আফগানিদের নিয়ে ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল ভীতিকর অনেক গল্প।
রামনাথ বিশ্বাস কুসংস্কারগ্রস্ত মানুষ ছিলেন না। আফগানিস্তানের মানুষ এবং তাদের জীবনকে কাছ থেকে দেখছেন তিনি এবং বিরক্তি প্রকাশ করেছেন সেসব জরাগ্রস্ত মানুষদের ওপর যারা এতদিন ধরে অহেতুক গালগল্প ফেঁদেছেন আফগানিদের নিয়ে। অনেক এলাকা ঘুরেছেন তিনি, কিন্তু কোথাও কেউ তার ওপর ঢাল তলোয়ার নিয়ে আক্রমণ করেনি, কেউ তার স্বল্প সম্পদ কেড়ে নিতেও চায়নি। উল্টো আফগানিদের আন্তরিকতা দেখে মুগ্ধ হয়েছেন তিনি।
রামনাথের লেখায় আফগানিস্তানের বেশ কয়েকটি অঞ্চলের মানুষের জীবনধারা, চিন্তাধারা ও আতিথেয়তা সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণা পাওয়া যায়।
আজ বিকেলেই আফগানিস্তান ভ্রমণ বইটি পড়ে শেষ করলাম। রামনাথ বিশ্বাস নামক পরিব্রাজকের সাথে পরিচয় আমার এই বইয়ের মাধ্যমেই। লেখক নিজেকে কখনও লেখক দাবি না করে বিশ্বভ্রমণকালীন সময়ে তার ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে পাঠকের জ্ঞানবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে টুকে রেখেছেন। আফগানিস্তান ভ্রমণ বইটির মাধ্যমে আপনারা জানতে পারবেন তৎকালীন অনগ্রসর(যা বর্তমানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য), অনুন্নত ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন আফগানিস্তান সম্পর্কে। এছাড়াও আফগানিস্তাদের অশিক্ষা, দারিদ্র্য ও জাতিগত বৈষম্যের চিত্রও লেখক এই বইতে তুলে ধরেছেন। স্বাধীন আফগানিস্তানের ইতিহাস ও সামাজিক এবং রাজনৈতিক অবস্থাকেও খুব কাছে থেকে আফগানদের সাথে মিশে উপলব্ধি করার চেষ্টা চালিয়েছেন পরিব্রাজক রামনাথ বিশ্বাস। তবে শুধু আফগানিস্তানের দুর্নাম রটিয়ে থেমে থাকেননি রামনাথ বিশ্বাস। আফগানিস্তানের অধিবাসীদের সাহস, সংগ্রাম ও আতিথেয়তার খুঁটিনাটি বিষয়াদিও লেখক অকৃপণ হাতে বর্ণনা করেছেন। আফগানিস্তানের প্রকৃতির সৌন্দর্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বারবার তার পাহাড়ের মাঝে লেখক হারিয়ে যেতে চেয়েছেন এবং বর্ণনা করেছেন সেসবই। 'বিলেতে সাড়ে সাতশ দিন' এর মত খুব সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ বা অধ্যায়ভিত্তিক বর্ণনা না পেলেও, বইটি পড়ে বেশ আরাম পাবেন। রামনাথ বিশ্বাসের লেখনী খুবই সহজ ও সাবলীল। লেখক চোখের সামনে যা দেখেছেন, মূলত তারই বাস্তব প্রমাণ বইতে রেখে গিয়েছেন।
সবশেষ বলতে হয়, প্রায় শতবছর পূর্বে শুধু সাইকেল পায়ে রামনাথ বিশ্বাস যেভাবে দুর্গম আফগানিস্তানকে জয় করেছেন, সেটা প্রশংসার দাবিদার৷
পেপার ভয়েজার থেকে প্রকাশিত রামনাথ বিশ্বাসের প্রথম বই 'অন্ধকারের আফ্রিকা' পড়ে আমার এই ক্ষুদ্র ভ্রমণ পিপাসু মনে রামনাথ বিশ্বাসকে জানার আগ্রহ, তার ভ্রমণকাহিনী পড়ার আগ্রহ জন্মায়। সেই আগ্রহ থেকেই আফগানিস্তান ভ্রমণ বইটি পড়া। বইয়ের কাহিনী খুবই সাবলীল মনে হচ্ছে, বইটি পড়ে মনে হচ্ছিলো আমিও বুঝি আফগানিস্তানে আছি। এটা আমার একটা সমস্যা ও বলা যায়, যখন যে বই পড়ি ভ��জ্যুয়ালাইজ করার চেষ্টা করি। এতে পড়ে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। যারা ভ্রমণ পছন্দ করেন, তারা নিঃসন্দেহে বইটি পড়তে পারেন। শুধু এ বইটিই না, রামনাথ বিশ্বাসের পুরো সিরিজই পড়ার অনুরোধ রইলো।
বইটি সুখপাঠ্য বলা চলে। তবে লেখকের বর্ণনা ততটা সুন্দর নয়। অনেক জায়গাতে চলিত ভাষা আর কথ্যভাষার মধ্যে তিনি জগাখিচুরি বানিয়ে ফেলেছেন। ভাষাগত দিক বাদ দিয়ে বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে কথা বললে বইটি অর্ধেকটা সার্থক মনে হয়। ভ্রমণকাহিনি হিসেবে কোনো দেশ,ঐ দেশের মানুষ আর সংস্কৃতি নিয়ে যথেষ্ট বর্ণনা থাকা চাই৷ বিশেষ করে ভ্রমণ কাহিনির মধ্যে দেশের মানুষের সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৃপ্ত হওয়া চাই। লেখক এই কাজটি খুব পারদর্শীতার সাথে করেছেন। আফগানিস্তানের তৎকালীন বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সম্বন্ধে একদম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লিখেছেন। কিন্তু বইয়ের বিষয়বস্তুকে অনেকটা বরবাদ করেছেন ধর্ম নিয়ে অতিরিক্ত অপ্রয়োজনীয় বর্ণনা করে। বর্ণনা না বলে সমালোচনা বলা যায়। লেখক নিজে কমিউনিস্ট হওয়ায় তার ধর্মকে অপছন্দ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু দুনিয়ার সব বিষয়ের মধ্যে ধর্মের দোষ টেনে বের করার কু-অভ্যাস খুব লক্ষণীয়।লেখা পড়া মনে হয়েছে, তার কাছে কমিউনিস্ট শাসনে শাসিত দেশগুলোকে অনেকটা ধার্মিকদের কথিত 'স্বর্গরাজ্য' এর মতো হয়। স্বাধীনভাবে চিন্তা করার কথা বলেছেন কিন্তু সেই মানুষের পর্দাপ্রথা অনুসরণ করা না করার উপর প্রগতিশীলতার মাপকাঠি নির্ধারণ করেছেন। এত স্বাধীন চিন্তাশীল একটি মানুষ শুধু কমিউনিউজম চর্চার উপর মানুষকে ভাগ করেছেন। জিনিসটা যেন গোঁড়া ধার্মিকদের মতো ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে ভাগ করার মতো হয়ে গেল। বইটি পড়ে এমন মনে হয়েছে যে, কমিউনিজম তার ধর্ম আর তীর্থস্থান হচ্ছে 'রুশিয়া'।
বইটি সেই সময়কার আফগানিস্তান এর একটি খুব "interesting" চিত্র তুলে ধরে। অন্তত কিছু গুরুত্বপূর্ণ শহরের, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাও তিনি অনেক টাই তুলে ধরেছেন, একজন বহিরাগত ভ্রমণপিপাসু র ভূমিকা থেকে যতটা দেখা যায় তার বেশী ই দেখেছেন আর আমাদের দেখিয়েছেন। হারিয়ে যাওয়া সময়ের দলিল।
বাংলা ভ্রমণকাহিনী যারা পড়েন বা যাদের ভালো লাগে তাদের প্রত্যেকেরই রামনাথ বিশ্বাস এর "আফগানিস্তান ভ্রমণ" বইটা ভালো লাগবেই আশা করা যায়।
হাইস্কুলে পড়াকালীন সেকায়েপের কল্যাণে। বিশ্বাসাহিত্যের ক্ল্যাসিকের কিশোর উপযোগী অনুবাদগুলো পড়ে অ্যাডভেঞ্চারের চেয়ে ভ্রমণের উপর বেশি নেশা হয়। রবিনসন ক্রুসো,অ্যারাউন্ড দি ওয়ার্ল্ড ইন এইটটি ডেইজ, হোয়াইট ফ্যাঙ,লা মিজারেবল,বইগুলো পড়ার সময় অচেনা সেইসব জায়গাগুলোর কথা কল্পনা করে এক রোমাঞ্চর অনুভূতির সৃষ্টি হতো।তাই বেশি বেশি অনুবাদ পড়তে চাইতাম আর বাংলায় এধরণের বই খুঁজতাম কিন্তু "এক এক চাঁদের' পাহাড় ছাড়া আর তেমন কোনো বই পাইনি। সম্ভবত ক্লাস নইনের বাংলা বইতে "প্রবাস বন্ধু" প্রবন্ধ পড়ে ভ্রমণকাহিনী সম্পর্কে ধারণা পাই। তখন আফগানিস্তান আর "দেশে বিদেশে" বইয়ের উপর আগ্রহ জেগে ওঠে। যদিও নানা প্রতিকূলতায় "দেশে বিদেশে" এখনো না পড়া হলেও আফগানিস্তান সম্পর্কে লেখা অন্য লেখকের অন্য একটি ভ্রমণকাহিনী পড়ে ফেললাম। রামনাথ বিশ্বাস পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো ভ্রমণ করে কলকাতা ফিরে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত হয়ে আফগানিস্তান থেকে ইউরোপে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। তার সেই আফগানিস্তানে কাটানো সময় নিয়েই এই বই। লেখকের ভাষায় ভারতীয়রা আফগানদের খুব একটা ভালো চেখো দেখতো না বিধায় অনেকেই তাকে সেখানে যাওয়ার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করেন। তবে আফগানিস্তানে প্রবেশের পর দেখা যায় শুনেছেন তার প্রায় সবটাই মিথ্যে। লেখকের সাথে আফগান পাঠানদের ব্যবহার মুগ্ধ করার মত। লেখক পথ চলতে লেখক তাদের সাথে কথা বলেছেন,চায়ের দোকানে বসে গল্প করেছেন,তাদের বাড়িতে অতিথি হয়েছেন। বই পড়ার সময় মনে ইচ্ছে হচ্ছিলো ইশ যদি লেখকের সঙ্গী হয়ে আফগানিস্তান ঘুরে দেখতে পারতাম। তার সাথে কাবুল,কান্দাহার বা হেরাতের কোনো পাঠানের বাড়িতে অতিথি হতে হতাম। লেখক বইতে তুলে ধরেছেন আফগানিস্তানের ভূ প্রকৃতি, তার সাথে পাঠানদের আচার ব্যবহার ও তাদের মন মানসিকতা। এছাড়া লেখক আফগানিস্তানের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে খোঁজ করেছেন স্থানীয় হিন্দুদের জীবনব্যবস্থা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, তার নিজের ধর্মীয়, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী। এছাড়াও বইতে উঠে এসে আফগানিস্তানের ইতিহাস মাহমুদ ও তার স্ত্রী আমিনাকে নিয়ে রচিতে আফগান লোককথা। তবে বই শেষ করে আফগান যুবক ইয়াবুক আর বাঙালী তরুণী লক্ষ্মীর কথা আরো জানতে ইচ্ছে করছে। সাথে জানতে ইচ্ছে করছে আফগানিস্তানের শেষ গ্রাম "ইসলাম কিল্লা"র কথা যেটা লেখক তার পারস্য ভ্রমণে সবিস্তার বলবেন বলে উল্লেখ করেছেন। এখন লেখকের ইরান ভ্রমণের কাহিনী জানতে মনের মধ্যে উস খুস করছে। তবে দুঃখের লেখকের এই বইটা কবে প্রকাশিত হবে বা আদৌও হবে কিনা সেটা পেপার ভয়েজার প্রকাশনীই ভালো বলতে পারবে।
সত্যি বলতে কখনো ভাবিনি যে আফগানিস্তান যাবার ইচ্ছা জাগবে মনে। কিন্তু রামনাথ বিশ্বাসের অবিশ্বাস্য এই ভ্রমন কাহিনী পড়ছি আর যেন মন চলে যাচ্ছে হিন্দুকুশের ছায়াস্নিগ্ধ আফগান মুলুকে।
আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগে, হিন্দু বাঙালি পরিব্রাজকের চোখ দিয়ে দেখলাম পাঠান, উজবেকে, হিলজাই, ওরাকজাই এর দেশ।
শুধুমাত্র ভ্রমণের বিবরণই না, অসাধারণ লেখনীতে ফুটে উঠেছে সে সময়কার ভূরাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় আর অর্থনৈতিক চিত্র। লেখক কিংবা পরিব্রাজক শুধুমাত্র তাঁর অভিজ্ঞতাই বর্ণনা করে ক্ষান্ত হননি বরং তাঁর নিকটস্থ প্রতিটা মানুষের জীবনের গল্পও অনবদ্যভাবে বর্ণনা করেছেন, ইকবাল, লক্ষ্মী, পূজারী ভোলানাথ, ড্রাইভার অথবা চায়ের দোকানের বয়।
সবচেয়ে মনে ধরেছে রামনাথ বিশ্বাসের তৎকালীন আফগান হিন্দু সমাজের আত্মঘাতী কৌলিন্যতার বাস্তব সমালোচনা… প্রতিটি পাতা যেন আফগান গ্রাম আর তুষারঢাকা বুনো শহরের এক বিচিত্র প্রতিপাদ্য…
আফগানিস্তান নিয়ে আমার কৌতুহল বেড়েই চলেছে। লেখক ১০০ বছর আগে যা দেখেছে তাতে সেরকম কোন পরিবর্তন এখনও হয়নি আসলে তারা সত্যিই স্বাধীন জাতি যাদের গর্বের ঝুলিতে ৩ সাম্রাজ্যের কবর দেওয়ার সুনাম