ভূতের গল্প হিসেবে ভালোই। ভালোবাসা/যৌনঈর্ষা। তা থেকে খুন। অপঘাতে মৃত সেই হতভাগ্য আত্মার পাকাপাকিভাবে সেখানে গেঁড়ে বসা - মোটিফগুলো খুবই চেনা। লেখার গুণে তারপরও উতরে গিয়েছে। একবার পড়াই যায়।
ভ্রমণ করতে গিয়ে ভূতের কবলে পড়ার ব্যাপারটা বেশ মজার। আবার সাথে কিছুটা অস্বাভাবিকও বটে। তবে এই ধরনের গল্পগুলো চমৎকার হয়। পাঁচকড়ি দে'র লেখা “সর্বনাশিনী” ঠিক এরকমই একটা গল্প।
বর্ণনাকারীর তুষারমণ্ডিত হিমালয় দেখার বহুদিনের ইচ্ছা। তাই সুযোগ পেয়ে দেরি না করে বন্ধু প্রবোধচন্দ্রকে সঙ্গে নিয়ে দার্জিলিং এর উদ্দেশ্যে রওনা হয়। যাওয়ার পূর্বে পরিকল্পনা হয় যে, হিমালয়ের প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে শিলিগুড়ি থেকে ট্রেনে করে না গিয়ে পদব্রজে যেতে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী শিলিগুড়ি পৌঁছালো তারা। সেখানে পরিচয় হলো দু-একজন বাঙালির সাথে। তারা একরকম জোর করেই তাদের বাসায় নিয়ে আতিথ্য করতে লাগলো। রাত থেকে পরদিন সকালে হিমালয়ের প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে দুর্গম পাহাড়ি পথ দিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হল, যদিও এই পাহাড়ি পথ দিয়ে চলার সময় সামান্য একটু অসাবধান হলেই মৃত্যু নিশ্চিত।
একজন পথপ্রদর্শক এবং তিনজন কুলির সাথে তারা পরদিন রওনা হল। পাহাড়ি পথ খুবই দুর্গম। সামান্য পা ফসকালেই সহস্র হাত নিচের খাদে পড়ে মারা যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। খুবই সাবধানে এবং কখনো কখনো হামাগুড়ি দিয়ে যেতে হচ্ছে। ক্রমে সন্ধ্যা নেমে এলো। আর হিমালয়ের সন্ধ্যা যেন হুট করেই অমাবস্যার রাত নেমে আসা। পথপ্রদর্শক থম্বিবেনাও যেন এখন পথ চিনতে পারছে না। তবুও তারা হামাগুড়ি দিয়ে পথ চলতে লাগলো। একসময় গিয়ে তারা বুঝতে পারল, যে পথ দিয়ে যাওয়ার কথা ছিল তাদের, তার উল্টো পথে তারা চলে এসেছে। থম্বিবেনা জানাই যে, সামান্য ঘুরে নিচে গেলেই দোকানপাট ও বস্তি রয়েছে। সে অনুযায়ী তারা ঘুরতি পথে রওনা দিল।
নিকষ কালো অন্ধকারে তাদের পথ যেন দুর্গম থেকে দুর্গমতর হয়ে উঠলো। হামাগুড়ি দিয়ে ফেরার সময় হঠাৎ করেই বর্ণনাকারীর পা পিছলে যায়। একই রকম ভাবে পিছনের সকলের পা-ই পিছলে যায় এবং হঠাৎ করে কোনো কিছুর সাথে ধাক্কা খেয়ে তারা নির্ঘাত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যায়। পরের দীপ জালিয়ে দেখা যায় যে এটা একটা শাল কাঠের প্রাচীর ঘেরা ছোট্ট নির্জন কুটির। তারা সিদ্ধান্ত নেয় সেখানেই রাত্রি যাপন করার এবং এখানেই তারা ভুলটা করে। সেখানে গিয়ে তারা কিছু চিঠি খুঁজো পায়। যেগুলো পড়ার পর তারা ভীতিকর রাত কাটিয়েছে।
বহুদিন যাবত পাঁচকড়ি দে'র লেখা পড়ব পড়ব করেও সংগ্রহ করা এবং পড়া উভয়ই হচ্ছে না। শেষপর্যন্ত একটা গল্প হলেও পড়ার সুযোগ হয়েছে। সেই ক্ষেত্রে একজন নতুন লেখকের লেখার সাথে পরিচয় হওয়া হলো।
প্রথমে ভাবলাম যে, হয়তো একটা চমৎকার ভ্রমণ অভিজ্ঞতা পড়ব। পরমুহূর্তেই কাহিনী কোথা থেকে কীভাবে যেন ভূতের গল্প বনে গেল। যাইহোক, গল্পের হুকআপটা ছিল দারুণ। গল্পের মধ্যে আমার মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে খুব একটা সময় নেয়নি। গল্পটা যেভাবে চলছিল, আমি মনে করেছিলাম ভ্রমণপথ চলার বর্ণনা শুনেই গল্পটা পেরিয়ে যাবে। কিন্তু তারপরই এলো সেই চিঠিগুলো। যেগুলো পড়তে পড়তেই পুরো গল্পটা শেষ হয়ে গেল। সেসব চিঠিতে উঠে এসেছে চমকপ্রদ ঘটনা। যেখানে প্রণয়, যৌন ঈর্ষা এবং তা থেকে সৃষ্ট খুনের কথা এসেছে।
ঘটনাগুলো কিন্তু খুবই সুপরিচিত। প্রণয় থেকে খুন, খুন থেকে ভৌতিক ব্যাপারের অভিজ্ঞতা, এগুলো খুবই পরিচিত ঘটনা। কিন্তু লেখকের বর্ণনাশৈলির কারণে এগুলো উৎরে গিয়েছে। পরিচিত ঘটনাও কল্পনাজগতে নতুন করে প্রভাব ফেলেছে। সাধু ভাষা পড়তে আমার বেশ কষ্টই হয়। তবে বিভূতি, মানিকদের লেখা পড়ে এখন অসুবিধাটা কমে এসেছে। পাঁচকড়ির লেখা সেগুলোর তুলনায় একটু মুশকিল ছিল। তবে বর্তমানে অপ্রচলিত শব্দগুলোর সাথে পরিচিত থাকায় সমস্যা মনে হয়নি। তবু অনেকের জন্য পড়তে সামান্য অসুবিধা হতে পারে।
পাঁচকড়ি দে'র লেখা প্রথমবারের মতো পড়া হলেও আমার জন্য সুখপাঠ্য ছিল। বর্ণনাশৈলির কারণে পড়তে দারুণ লেগেছে। ঘটনার প্রেক্ষাপট যে খুবই ভালো ছিল, এমনটা বলব না। তবে সবমিলিয়ে অন্তত একবার পড়ার মতো উপভোগ্য গল্প। পাঠকের মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারা নিয়েও সামান্য খেলেছেন লেখক। আমি পরবর্তীতে কিছু জায়গায় বাস্তবতা আর কল্পনা গুলিয়ে ফেলেছি। লেখাই হয়েছে এমনভাবে। সামান্য অস্পষ্ট। তবু এন্ডিংটা সবশেষে ভালোই লেগেছে।
পাঁচকড়ি দে'র লেখা এখনো পড়ে না থাকলে এই গল্পটা বইঘর অ্যাপ থেকে পড়ে নিতে পারেন। একবার পড়ার জন্য হলেও গল্পটা ভালো। আশা করি ভালো লাগবে।