পূর্ব নির্ধারিত সত্য বিশেষ কোন কারনে আড়ালে চলে গেলেও একদিন নিজস্ব আলোকচ্ছটায় প্রকাশিত হবেই। অতীতকে নিয়ে আম্মিরার আত্মবিস্মরণ হলেও সেই বিশেষ সত্তাগুলো এখনো যেন তার নিঃশ্বাসে মিশে আছে। ক্ষণে ক্ষণে তাদের উপস্থিতি অনুভব করতে পারছে। বিশেষ করে হাতের শিরাগুচ্ছ সবুজ বর্ণ ধারণ করলে। কেন এমন হয় তা সে জানে না। মাঝে মাঝে তার স্মরণে আসে যে জীবনটা সে উপভোগ করছে সেই জীনটা আসলে তার নয়। আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতন জীবনযাপন করলেও, রাস্তার পাশের বাদামী কাঠের বাড়ির সামনে দাঁড়ানো ছেলেটার নীল চোখ তাকে সময়ে সময়ে উদাসীন করে তোলে। সবটা হারিয়ে যাবার পরে নতুন করে ফিরে পাবার গাঁথা কেমন হবে? নাকি ফিরে পাবার মানেই হচ্ছে হারিয়ে ফেলা?
অনেকটা হতাশা নিয়েই শেষ করলাম ২য় খন্ড। প্রথম কিছু পৃষ্ঠা পর থেকেই প্রচন্ড অনীহা কাজ করছিল। তারপরও শেষ করেছি আলহামদুলিল্লাহ্ ।বইটির প্রধান কিছু সমস্যার মধ্যে প্রধানতর হচ্ছে ক্যারেক্টার বিল্ডআপ। ইলহানা, জিবাদের মতো অনেকগুলো সম্ভাবনাময় চরিত্র ছিল। অবশ্য প্রধান চরিত্র 'আম্মিরা'র যে অবস্থা তাতে বাকি চরিত্রগুলো ঠিক ই আছে। প্রথম বইয়ের প্রথম অংশে 'আনাহিতাকে' যেভাবে রিপ্রেজেন্ট করা হয়েছিল তার ছিটোফোটা দুটো বইতে খুঁজে পেলাম না। তাছাড়া শেষের এই বস্তাপচা ক্লিফহ্যাঙ্গার দেখলে বড্ড মেজাজ খারাপ হয়।
আমার মতে, প্রচন্ড সম্ভাবনাময় শক্তিশালী একটা গল্প হতে পারতো এইটা। কলেবর ছোট করতে গিয়ে বেশি বিপত্তিটা ঘটিয়েছে। আরো বড় পরিসরে, চরিত্রগুলোকে আরেকটু সময় দিয়ে বাড়তে দিলে চমৎকার কিছু অবশ্যই পাওয়া যেত।
জিন সম্পর্কিত এই ফ্যান্টাসি সিরিজের প্রথম বইটা প্রকাশিত হওয়া মাত্রই লুফে নিয়েছিলাম, আর অপেক্ষায় ছিলাম পরবর্তী খন্ডের। শেষের দিকে ঘটনায় যে মোচড় দিয়েছিলেন লেখিকা, তারই সূত্র ধরে দ্বিতীয় খন্ডের সূচনা। আম্মিরা তার পুরোনো জীবনকে ভুলে গিয়েছে, ভুলে গিয়েছে তার ভালোবাসা এসমাদকে। আর এসমাদ এখন আফারীতদের বাদশাহ, মহলে অসংখ্য পত্নী থাকা সত্তেও তার মনটা ডুবে আছে এক ইনসানের প্রেমে। ওদিকে ঘৌল আর ইরফিতরা বুনছে ষড়যন্ত্রের জাল। যুদ্ধ আসন্ন। তারই মাঝে এক ইনসান আর জীনের বাদশাহর প্রেম। প্রথমেই বলে নিই বইয়ের শুরুটা ছিলো দারুণ। প্লটটাও অসাধারণ- প্রেম, রাজনীতি, যুদ্ধ, মিথ আর ফ্যান্টাসি- সব মিলেমিশে একাকার। কখনোবা মনে হয় হয়ত এসমাদ, জীবাদ কিংবা নুসরারা আমাদের আশেপাশেই আছে- অন্যকোন রূপে। অন্যকোন নামে। হয়ত অদেখা কোন জগতে ঘটছে অন্যরকমের কোন যুদ্ধ। লেখিকার কল্পনাশক্তির প্রশংসা করতেই হয়, বিশেষ করে এই বইয়ের ম্যাজিক সিস্টেম আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। কিন্তু ততটাই দূর্বল লেগেছে ওয়ার্ল্ডবিল্ডিং। আগের বইয়ে আরশিনগরের সম্পর্কে যতটুকু জেনেছি, এই বইয়ে তা বিস্তার লাভ করলেও পুরোপুরি ফুটে উঠতে পারে নি। রাজনীতি, ষড়যন্ত্র, যুদ্ধ- সবই ভালো ছিলো, কিন্তু আবার সবই হারিয়ে গিয়েছে বইয়ের কলেবর কমাতে গিয়ে। মাত্র ১৫৮ পেজ এত বড় প্লটের জন্য যথেষ্ট নয়। খুব তাড়াতাড়ি ঘটে গিয়েছে ঘটনাগুলো, তাই কোনটাই মনে তেমনভাবে দাগ কাটতে পারে নি। ইলহানার চরিত্র ঠিক একই কারনে সম্ভাবনাময় হয়েও সেই সুযোগ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এসমাদকে এবারে ভালো লেগেছে, কিন্তু আম্মিরা আগের মতই প্যাসিভ চরিত্র ছিল। বইয়ের নায়িকা হলেও, তার আসল কার্যক্রম খুবই কম। বাকিরাও পৃষ্ঠার অভাবে ফুটে উঠতে পারে নি। আর শেষটাতে আবারও একটা ক্লিফহ্যাঙ্গার দিয়ে লেখিকা শেষ করেছেন। মানে আরো বই যোগ হতে চলেছে এই সিরিজে, নইলে গল্পটা যেন অপূর্ন রয়ে যাবে। সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে- লেখনির আড়ষ্টতা। অতিরিক্ত তৎসম শব্দের ব্যবহার সাবলীলতাকে নষ্ট করছে। লেখিকার লেখার ধাঁচের সাথে ঠিক শব্দগুলো যুতসই লাগে নি। অথচ প্রথম বইয়ের অনেক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্তেও কলেবর এবং সাবলীলতা দুটোই অনেক বেশি ছিলো। মোট কথা এবারের বইটি বড় সিরিজের "মিডল বুক সিনন্ড্রমে" আক্রান্ত বলে মনে হলো। আশা করি লেখিকা পরবর্তী বইয়ে তার সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারবেন। তারপরেও অপেক্ষায় থাকবো পরবর্তী বইয়ের। কারণ শেষের অংশে যা ঘটছে, তারপরে এসমাদ আর অন্যান্য প্রিয় চরিত্রদের ভাগ্যে কি ঘটলো তা জানবার ইচ্ছা রয়েই যাবে আরো একটা বছর।
প্রথম বইয়ের থেকে লেখায় কিছুটা উন্নতি এসেছে। তবে শব্দ প্রয়োগ এবারেও সাবলীল নয়। গল্পের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কৌতূহল রেখে যাওয়াটা সবসময় ভালো লাগে না- এটা কি, কেন হল, সে কে- এ জাতীয় প্রশ্ন অতিরিক্ত রেখে যায়। কিন্তু গল্পের শেষ সাসপেন্স আর সমগ্র গল্পের প্লট দারুণ উপভোগ্য। 3 star দিলে কম লাগে আবার 4 star দিলে বেশি মনে হয়!