সিন্ধু সভ্যতা আর মেসোপটেমিয়ার মাঝে হলো পারস্য , যা আজকের ইরান , দুই বিখ্যাত সভ্যতার মাঝে এই দেশ জুড়ে বহু প্রত্নক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে আধুনিক যুগে , যার খবর আমরা বিশেষ রাখি না। টেপে শিয়ালক , টেপে হিসার ইত্যাদি ক্ষেত্র দিয়ে একসময়ে স্টেলপথে বাণিজ্য হতো দুই সভ্যতার মধ্যে , মেসোপটেমিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে যে সব সিন্ধু সভ্যতার দামি রত্ন ও পাথর পাওয়া গিয়েছে তার আদানপ্রদান হতো ইরানের এই খোরাসান পথ থেকে।
এই বাণিজ্যের আধিপত্য দখল করার জন্যে যুদ্ধ হয়েছিল কৃষ্ট পূর্ব ৩০০০ পরবর্তী সময়ে। একসময়ে হারোপনদের বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। শহর ও সকতা জাতীয় শহরের পত্তন হয় এই সময়ে। হরপ্পান বহু শহর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।
কয়েকশো বছর বাদে হরূপানরা নিজেদের গুছিয়ে নেয় , আবিষ্কার করে জল পথে পারস্য উপসাগর দিয়ে বাণিজ্যের সম্ভবনা , দখল নেয় উত্তর আফগানিস্থান এর খনি , তৈরি হয় সার্তুগাই এর মতন খনিশহর , এবং অন্তিম আঘাতে ইরানের পূর্ব দিকে গড়ে ওঠা কেন্দ্র গুলিতে প্রবল আক্রমণ চালায়ে তারা।
লাপিস লাজুলি কর্ণেলিয়ন সিতীয়ত্বের বাজার দখল করায়ে কয়েকশো বছর ধরে চলা যুদ্ধ হয়েছিল ইতিহাসের প্রথম বাণিজ্য যুদ্ধ।
ইরানের প্রতি ক্ষেত্রে গুলির বিবরণ সহ সেদিনের উথালপাথাল ইতিহাস নিয়ে আমাদের এই পুস্তক , সিন্ধু সভ্যতার সমাজে নানা ঘাত প্রতিঘাত কথা ও জানা যাবে এই বই পাঠে।
"It is the maxim of every prudent master of a family never to attempt to make at home what it will cost him to make more than buy... If a foreign country can supply us with a commodity cheaper than we ourselves can make it, better buy it of them with some part of the produce of our own industry employed in a way in which we have some advantage..." (Adam Smith, 'Wealth of Nations', 1776) "A free people ought not only to be armed, but disciplined... Their safety and interest require that they should promote such manufacturers s tend to render them independent of others for essential, particularly military supplies." (George Washington, address to Congress on 8th January 1790) অষ্টাদশ শতাব্দীর এই দু'টি কথা দিয়ে বাণিজ্য এবং বাণিজ্য-যুদ্ধ— দুইয়েরই কারণ তথা চালিকা-শক্তিটিকে বুঝে নেওয়া যায়। প্রশ্ন হল, এর আগে কি এই ভাবনাগুলো বাস্তবায়িত হয়নি? এরা কি একান্তভাবেই আধুনিক উদ্ভাবন, বা আবিষ্কার? একেবারেই নয়! ইতিহাসের পাতায় একাধিক রাষ্ট্র, সমাজ, নিদেনপক্ষে জনগোষ্ঠীর মধ্যে আন্তঃক্রিয়ার যে-সব নিদর্শন নথিবদ্ধ হয়েছে, তাতে এমন আদান-প্রদান ও সংঘাতের নিদর্শন আছে অজস্র। আর প্রাগিতিহাসে? আছে— তবে তাকে খুঁজে নিতে হয়, বুঝে নিতে হয়। সেই লক্ষ্যেই প্রত্নতাত্ত্বিক, দলিলভিত্তিক, পুরাকথা-অনুসারী, এমনকি জিনগত উপাদানের ভিত্তিতে লেখক হরপ্পান সভ্যতাকে সমসাময়িক নানা সভ্যতা ও সংস্কৃতির পটভূমিতে দেখেছেন। তাদের সঙ্গে হরপ্পার বাণিজ্যিক সম্পর্কটি যথাসম্ভব যৌক্তিক আকারে তুলে ধরেছেন তিনি। তার সূচনায় ও অন্তে, একপ্রকার অনিবার্যভাবে, তিনি দৃষ্টান্ত দিয়েছেন বেশ কিছু ধ্বংস ও হত্যালীলার— যাদের একমাত্র মোটিভ হয়ে পারে বাণিজ্য-যুদ্ধ। বইটি শুরু হয়েছে 'ভূমিকা' দিয়ে, যাতে একেবারে হাল আমলের কোলটান এবং কঙ্গোযুদ্ধের বিবরণ দিয়ে পাঠকদের সামনে বাণিজ্য-যুদ্ধের সেই রূপটি তুলে ধরেছেন— যাতে শেয়ার-বাজারের উত্থান পতনের বদলে অস্ত্রের ব্যবহারটিই দেখা যায়। এই উদাহরণটি দিয়ে তিনি প্রবেশ করেছেন মূল আলোচনায়। সেখানে এই ক'টি অধ্যায়ে আলোচনা বিন্যস্ত হয়েছে~ ১) সিন্ধু-সভ্যতার বৃত্তের বাইরে কিছু কথা; ২) বেদ ও বেদের সমাজ; ৩) পণি ও অন্যদের পশ্চিমে গমন; ৪) মেসোপটেমিয়ার কথা (২৫০০ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত); ৫) মেসোপটেমিয়া ও ভারত-যোগ; ৬) ইরান ও সিন্ধু-সভ্যতা; ৭) গ্রেয় খোরাসান পথ; ৮) টেপে শিয়ালক এবং সুসা যাওয়ার দু'টি বাণিজ্যপথ; ৯) কয়েকটি প্রাসঙ্গিক কথা; ১০) কিছু অ-সেমিটিক সংস্কৃতির কথা; ১১) অসুরদের কথা; ১২) সিন্ধু-সিভ্যতায় আক্রমণ; ১৩) জরাথ্রুষ্ট, আবেস্তা ও আনুষঙ্গিক ইতিহাস; ১৪) ইরানের উপকথার রাজা ও ইতিহাসের অন্বেষণ; ১৫) মরহষি, এলাম ও ইরানের কথা; ১৬) অন্তিম যুদ্ধ; ১৭) আমাদের কথা। বইয়ের শেষে আছে গ্রন্থ ও প্রবন্ধ তালিকা। বইটির ভালো দিক কী-কী? প্রথমত, এই বিষয়টি আমাদের ইতিহাসে পড়ানোই হয় না। বাংলা তো দূরস্থান, ইংরেজিতেও এই নিয়ে কোনো সহজপাচ্য, এমনকি দুষ্পাচ্য বই সুলভ নয়। বিভিন্ন সাম্প্রতিক গবেষণাপত্র ও জার্নালে ছড়িয়ে আছে এই নিয়ে নানা অভিমত ও তথ্য, কিন্তু এমনভাবে একটিই বই আকারে... উঁহু, কিচ্ছু নেই। দ্বিতীয়ত, আলোচনাটিকে আক্ষরিক অর্থে একটি মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি আকার দিতে সক্ষম হয়েছেন লেখক। ভূগোল ও ইতিহাস, পুরাকথা ও প্রত্নতত্ত্ব, অর্থনীতি এবং ধর্মীয় ভাবনা তথা দর্শন— এদের সবার মাধ্যমে তিনি তুলে ধরেছেন মধ্য ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া জুড়ে একাধিক সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিবর্তন, সমন্বয় ও সংঘাতের ছবিটি। তৃতীয়ত, অজস্র মানচিত্রের সাহায্যে লেখাটিকে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। ফলে শুষ্কং কাষ্ঠং তথ্য ও তত্ত্বের সঙ্গে ভূগোলকে মিলিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছি আমরাও। চতুর্থত, মেসোপটেমিয়া সম্বন্ধে কিছু জানা থাকলেও ইরানের ইতিহাস বিষয়ে আমাদের অজ্ঞই বলা চলে। অথচ সংস্কৃতি ও অর্থনীতির বিচারে ওই দেশটির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। সেই শূন্যস্থান অনেকাংশে পূরণ করেছেন লেখক। বইটির খারাপ দিক কী? বইটির বর্ণ-বিন্যাস যত ভালো, অধ্যায়গত বিন্যাস ততটাই খারাপ। লেখক একটি সম্ভাব্য কালানুক্রম অনুযায়ী বইটিকে সাজিয়েছেন। অথচ আগে ভূগোল, তারপর প্রত্নতত্ত্ব, তারপর পুরাকথা ও অন্যান্য লিখিত উপাদানের বিশ্লেষণ, শেষে সিদ্ধান্ত— এইভাবে প্রতিপাদ্যকে পেশ করা হলে আমাদের পক্ষে লেখকের যুক্তিক্রম এবং বক্তব্য অনুসরণ ও আত্মস্থ করা সহজতর হত। এই ব্যক্তিগত অনুযোগটি সরিয়ে রেখেই পাঠকদের বলব বইটিকে সংগ্রহ ও পাঠ করতে। ভারতের ইতিহাসের এই অনালোচিত এবং অনালোকিত, অথচ অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি নিয়ে এমন তথ্যনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ শুধু বিরল নয়, অভূতপূর্বই বলা চলে।